৩১
এক জনে ছবি আঁকে এক মনে, ও মন
আরেক জনে বসে বসে রং মাখে, ও মন,
ও আবার সেই ছবিখান নষ্ট করে
কোন জনা, কোন জনা,
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা মন জানো না
তোমার ঘরে বসত করে কয় জনা।
ভাড়াবাড়ি সংলগ্ন মাঠ। বর্ষাকাল তাই কাপড় আর ত্রিপল দিয়ে ভালো করে মাথাটা ঢাকা। তার মধ্যেই আলোর চাঁদোয়া। বেলুন দিয়ে সাজানো প্রবেশ তোরণে উল্টোনো আধখানা চাঁদের মতো স্টাইলে ইংলিশে লেখা রাইস সেরিমনি, তার নীচে নকশা করে লেখা দেবোত্তমা। ইতিউতি ছড়িয়ে আছে গোল টেবিল ও তার চারপাশে চারটে করে চেয়ার। একটা দিকে নিয়ে ও ঘরেই তো খাওয়ালাম। ওদিকে কেউ যাচ্ছে না। তুমি যাও । একটু নিরিবিলিতে রেস্ট কর। দাদা এই জন্যে তোমায় খেতে বলে। রোগা হতে গিয়ে এবার শরীরটাই না খারাপ হয় ৷
-আমি যাচ্ছি।
দীপার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সাজানো দোলনায় শোয়ানো মেয়েটা আপনমনে খেলা করছে। মৃত্তিকা যেতে যেতে একটু টলে গেল। কেউ দেখল না ।
যাবার আগে দীপায়নের কাছে অনুমতি নিতে এলেন মিশ্রঠাকুর। দীপায়ন জিজ্ঞেস করল মৃত্তিকার সঙ্গে দেখা হয়েছে কিনা। ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। উনি ওইদিকে আছেন। ওনাকে বলেছি। আচ্ছা আসি হ্যাঁ? অনেক রাত হল ।’
-আসুন আসুন।
-ভালো থাকবেন ।
সহাস্যে ঘাড় নেড়ে ভদ্রতা করে আবার অতিথি আপ্যায়নে ব্যস্ত হয়ে পড়ল দীপায়ন।
মেন রোড থেকে বেশ খানিকটা ঢুকে এই ভাড়াবাড়ি। রাস্তার মুখ থেকে টিমটিমে স্ট্রিট লাইট ছাড়া আলো নেই অনেকটা পথ। তারপর থেকে আলোয় সাজানো। এদিকে ভাড়াবাড়ি সংলগ্ন এত আলো যে স্ট্রিটলাইটের আলো ভরা পথটা তার তুলনায় বেশ অন্ধকার লাগছে। অতিথিদের গাড়িগুলো পরপর লাইন দিয়ে রাখা। বেশ কিছু গাড়ি চলে গেছে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে। রাস্তার মোড়ের অন্ধকার ভেদ করে একটা সুইফট ডিজায়ার এসে দাঁড়াল সবকটা গাড়ির পিছনে। ঠিক অন্ধকারটা যেখানে শেষ হয়ে আলোর রাস্তা শুরু হয়েছে গাড়িটা ঠিক সেইখানে এসেই দাঁড়াল।
সবার অলক্ষ্যে হইহুল্লোড়ের বাইরে ভাড়া বাড়ির কোণের একটা ঘরে বিছানায় পড়ে আছে অচৈতন্য মৃত্তিকা। বিছানার পাশেই কালো পোশাক পরে দাঁড়িয়ে আছে আগন্তুক। আরেকজন ঘরের দরজাটা ভিতর থেকে দিয়ে দিল। তার গায়ে কালো বোরখা। কালো বোরখার আড়াল থেকে চটপট বেরিয়ে এল বড় সাদা বস্তা। পুরোটাই নাইলনের। আরেকজন কষে বেঁধে দিল মৃত্তিকার মুখ। বোরখা পরা মানুষটা মৃত্তিকার পা দুটো ধরে হাঁটু থেকে ভাঁজ করিয়ে পেটের কাছে নিয়ে গেল। মৃত্তিকা এখন একটা কুণ্ডলী পাকানো শরীর। আরেকজন তখুনি শরীরটার নীচ থেকে বড় বস্তাটাকে গলিয়ে দিতে চেষ্টা করল। বোরখা পরা মানুষটা সাহায্য করছে।
-এই দীপায়ন, ওয়াশরুমটা কোথায় রে?
-এই বারান্দায় ওঠ। সোজা ডানদিকে চলে যা। একদম কোণায় পাবি। লোকটি দীপায়নের সঙ্গেই কাজ করে। দীপায়ন নির্দেশিত পথেই এগিয়ে চলল সে।
ওদিকে কোণের ঘরেই চলছে মরণখেলার প্রস্তুতি। মৃত্তিকার অর্ধেক শরীর চেপেচুপে ঢুকিয়ে নিয়েছে প্রায়। ঠিক সেই সময়েই কোণের ঘরকে ওয়াশরুম ভেবে দরজা ঠেলতে যায় লোকটি। শব্দ হয় দরজায়। ঘরের ভেতরের আগন্তুক দুজন থমকে যায়। বাইরের লোকটি দরজা খোলা না পেয়ে এদিক ওদিক খুঁজতে থাকে ওয়াশরুম। চোখে পড়ে যায়। আরেকটু এগোতে হবে। লোকটা এগিয়ে যায়। জুতোর শব্দ সরে যেতে ঘরের ভেতরের কাজটা আরও হাত চালিয়ে হতে থাকে। একটা সময় মৃত্তিকার শরীরটা পুরোটাই বস্তার মধ্যে ঢুকে যায়। বাইরে দিয়ে আবার পায়ের শব্দ। থমকে গেল ঘরের ভেতরের সব কাজ। লোকটা ফোনে কথা বলতে বলতে যাচ্ছে। কথাগুলো দূরে হারিয়ে যেতেই পিছনের দরজা খুলে গেল । বস্তাসমেত শরীরটা বোরখার কাঁধে চেপে সুইফট ডিজায়ারের দিকে চলল। সকলের চোখের আড়ালে উঠে গেল গাড়ির মধ্যে। কালো পোশাক পরা লোকটি ড্রাইভারের সিটে বসে তৎক্ষণাৎ গাড়ি ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল ।
-এই দীপায়ন কী ভালো খেলাম রে। ক্যাটারারের নম্বরটা দিস তো আমার ভাইয়ের বিয়েতে এদেরকেই বলব ভাবছি।
বেশ গদগদ হয়ে বললেন প্রফেসর শিউলি। দীপায়ন বলল নম্বরটা হোয়াটসঅ্যাপ করে দেব। আরেক কলিগ বলে উঠলেন, ‘এই তোর গিন্নি কই? যাবার আগে একবার দেখা করে যাই।’
-সে কী আর এখানে আছে। হাওয়ায় ভাসছে। সন্ধে থেকে সাজগোজের যা সুখ্যাতি করছে সবাই ।
শিউলি অমনি পাশেরজনকে কনুইয়ের গুঁতো মেরে রসিকতা করলেন, ‘দেখেছিস প্রবুদ্ধ, ঠারেঠোরে কেমন বউয়ের রূপের প্রশংসা করতে হয় শিখে নে।’ দীপায়ন লজ্জা পেল, ‘তুৎ। আরে আমিও অনেকক্ষণ থেকে খুঁজছি। এই দীপাআআআ…।’ মেয়েকে কোলে নিয়ে ঘুরছিল দীপা। এগিয়ে এল দীপায়নের ডাকে। ‘হ্যাঁ দাদা বল।’
-তোমার বউদি কোথায় বলো তো?
-বউদির শরীরটা একটু খারাপ করেছিল।
-সে কি! কখন?
-না না। ভয় পাওয়ার মতো কিছু না। ওই মাইগ্রেন, যেমন হয়। আমি বললাম একটু ঘরে গিয়ে চোখ বুজে শুয়ে থাকো।
সঙ্গে সঙ্গে কলিগরা বলে উঠলেন যে তাঁরা আর দেখা করবেন না। রেস্ট নিক। পরে আরেকদিন না হয় কথা হবে। দীপায়ন সৌজন্যের হাসি হেসে সকলকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এল। একবার মৃত্তিকার খবর নিয়ে আসা দরকার। বেচারির মনের ওপর দিয়ে যা চলছে তাতে মাথাব্যথা হওয়াটাই স্বাভাবিক। সবে পা বাড়িয়েছিল ভিতরের দিকে, সঙ্গে সঙ্গে আবার কে যেন ডাকল। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল শিল্পী পায়েল চক্রবর্তী। দৌড়ে সেদিকেই গেল দীপায়ন।
মুখের কাছটা এত ব্যথা করছে কেন বুঝতে পারছে না। মুখ দিয়ে শব্দ বেরিয়ে আসতে গিয়েও গালের মধ্যে ধাক্কা খেয়ে গলার কাছে ফিরে যাচ্ছে। চোখটা টেনে খুলতে চেষ্টা করছে। হাত-পাগুলো কে যেন ধরে রেখেছে। ইচ্ছেমতো নাড়াতে পারছে না। ঝাপসা চোখেই দেখল মৃত্তিকা, সামনে এসে দাঁড়াল দুটো কালো অবয়ব। চোখ কচলে ঝাপসা ভাব কাটাতে চাইছে। কিন্তু পারছে না। বারবার মাথাটা ঝাঁকাচ্ছে। হঠাৎ চোখ বরাবর দুটো আঙুল এগিয়ে এসে কচলে দিল মৃত্তিকার চোখদুটো। এবার সব পরিষ্কার। মৃত্তিকা বুঝতে পারল তাকে আধো অন্ধকার একটা ঘরে বেঁধে রাখা হয়েছে। এমন একটা ঘর যেখানে আলো-বাতাসের চিহ্নমাত্র নেই। একটা ঝুল পড়া হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলছে মিটমিট করে। একজনের মুখ বোরখায় ঢাকা। আরেকজনের মুখে মাস্ক। দুজনেরই কালো পোশাক । মাথা ঘুরিয়ে দেখতে চাইছে মৃত্তিকা, কোথায় এসে পড়েছে সে। মুখ দিয়ে বোবার মতো শব্দ করছে। লোকগুলো চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কিচ্ছু বলছে না কেন? কারা এরা? হঠাৎ সেই গান, ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দমদমাদম । ‘ না কোনও মেয়ের রেকর্ডেড ভয়েজ নয়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দামড়া লোকদুটো আবরণের আড়াল থেকে গাইছে। আতঙ্কে শিউরে উঠছে মৃত্তিকা । কিন্তু বড্ড অসহায় সে। কিচ্ছু করার নেই। গান থেমে যায়। বোরখার আড়াল থেকে পুরুষকণ্ঠ বলে ওঠে, ‘দারুণ খেয়েছি মৃত্তিকা মা। একেবারে কবজি ডুবিয়ে।’ গলাটা চেনা। আজই সন্ধেল্গো এই গলাটাই কবজি ডুবিয়ে খাবার কথা বলেছিল মৃত্তিকাকে। বিস্ফারিত হয়ে গেল মৃত্তিকার চোখ। এ কী শুনছে সে! সেই গলাটাই আবার বলল, ‘কিন্তু আমার খিদেটা একটু বেশি জানো তো মা। বারবার খিদে পায়। সঙ্গে আবার আমার ভাগ্নেটাও আছে। তারও খিদে। জন্মের খিদে।’ মৃত্তিকা মাথা ঝাঁকাচ্ছে দুপাশে। পা ঝটকাচ্ছে। ‘লাভ নেই মা। যত ছটফট করবে তত ব্যথা লাগবে। অরুণা আর দিয়া এইরকম ছটফট করেছিল। বাঁচতে চেয়েছিল। তোমার মতোই মুখ দিয়ে উঁ উঁ শব্দ বের করেছিল। কথা বলতে পারেনি বেচারিরা। অবলা তো। তাই বেড়ালের মতো উঁ উঁ মিউ মিউ করে ডেকেছিল। কিন্তু আমরা বুঝতেই পারিনি তখন যে ওরা বাঁচতে চায়। ঠিক যেমন তোমরা বোঝোনি আমার আলোক বাঁচতে চেয়েছিল। কতবার পালাতে চেয়েছিল। তোমরা তাকে ধরে বেঁধে পিঠের ওপর লাফিয়ে পিষে চটকে মেরে ফেলেছিলে। মনে পড়ে মা?’ মৃত্তিকা হাউহাউ করে কাঁদছে। শরীরটাকে সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁকাচ্ছে। কিন্তু দড়ির বাঁধন তো খুলছেই না। বরং আরও কষে গিঁট পাকিয়ে যাচ্ছে।
-তোমরা যেভাবে মেরেছিলে আলোককে । আমিও ঠিক সেইভাবে মেরেছি অরুণা আর দিয়াকে। সুস্মিতার কপাল ভালো। ওদের মতো অত কষ্ট সে পায়নি কারণ তাকে অজ্ঞান করতে হয়েছিল। আর এই যে বেচারি ভাগ্নে আমার, তার দিদিকে তোমরাই মরতে পাঠিয়েছিলে তাই না?
মাস্কটা খুলে ফেলে ত্রিদিব ওরফে তিরু ওরফে শ্রীকুমার। কিন্তু মৃত্তিকা খুব একটা বুঝতে পারে না। তাই দেখেও চিনতে পারল না।
-উনি সেদিন অসুস্থ ছিলেন। আমাকে দেখেননি। তাই চিনতে পারছেন না। মামা, আর দেরি কেন? কাজটা সেরে ফেলি। শ্রীকুমার বলল কথাগুলো।
-সেই ভালো। তুই কী আজকেও ড্রাম পেটাবি নাকি?
-না মামা! শেষ ভোজটা কীভাবে রাঁধো আমি স্বচক্ষে দেখতে চাই। বাকিগুলোয় তো ড্রাম পিটিয়ে হাত ব্যথা করে ফেলেছি। আজ একটু দেখিই না হয় ৷
-সেই ভালো। সেই ভালো।
-আজ আর স্ট্যান্ডে রেখে ভিডিয়োও করব না। আমি নিজে করব। নিজের চোখে দেখব মৃত্তিকার তিলে তিলে তড়পে তড়পে মরাটা। আমি যত একে মরতে দেখব তত আমার দিদিটা শান্তি পাবে।
মিশ্রঠাকুর মুখের আড়াল সরিয়ে ফেলেন। ঘরের কোণের দিকে এগিয়ে যান। স্টিলেটো দুটো পায়ে গলিয়ে নেন। আরেক জোড়া ভাঙা স্টিলেটো পাশে পড়ে আছে। গায়ে তার রক্ত শুকিয়ে লেগে আছে। পাশেই রাখা বড় ধারালো জাঁতির মতো লোহার যন্ত্রটা হাতে তুলে নেন। স্টিলেটোতে খটখট করে শব্দ তুলে এগিয়ে আসেন মৃত্তিকার সামনে। মৃত্তিকা প্রাণপনে চিৎকার করতে চায়। কিন্তু পারে না। মুখ দিয়ে শুধু তীক্ষ্ণ সরু স্বরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসতে থাকে। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। মিশ্রঠাকুর মৃত্তিকার মুখের সামনে জাঁতিটা দুহাতে খুলে ধরে। পরক্ষণেই ঝট করে বন্ধ করতেই ধাতব শব্দ হয়। তিরু মোবাইল হাতে তৈরি। মৃত্তিকা দেখতে পায় ওর শরীরের ঠিক ওপরেই দুটো লোহার শিকলের সঙ্গে গোল রিংয়ের মত কব্জা ঝুলছে।
দিয়ার খুনের ভিডিয়ো সে দেখেছে। তাই আন্দাজ করতে পারছে মিশ্রঠাকুর এখন ওই কব্জা ধরে তার শরীরের ওপর ঝুলে স্টিলেটো পড়ে লাফাবেন।
-কী করি বল তো তিরু? আগে কী পায়ের আঙুলগুলো ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ করে কেটে ফেলব?
মৃত্তিকা দুপাশে মাথা ঝাঁকিয়ে না বলতে থাকে। মিশ্র বলেন, ‘ম্যাডাম কী না বলছেন? বেশ তাহলে বুকের কয়েকটা হাড় আর পেটে চামড়াটা ফুটো করে দিয়ে আঙুলগুলো কাটব না হয়। তারপর বাকিটা সেরে ফেলতে বেশি সময় লাগবে না। যতই হোক, বলির পাঁঠার শেষ ইচ্ছেটা তো মানতেই হবে।’ মৃত্তিকা আবারও গলা চিরে শব্দ করে ওঠে। মিশ্রঠাকুর জাঁতিটা মাটিতে নামিয়ে রাখেন। মৃত্তিকার পেটের কাছে গিয়ে দাঁড়ান। স্টিলেটোতে শব্দ হয় খটখটখট। ওপর থেকে নেমে আসা সিঁড়ির নীচে ঝুলতে থাকা লোহার রিং দুটোকে শক্ত মুঠোয় ধরেন মিশ্রঠাকুর। তাঁর মুখে হাসি। চোখে কামারশালার আগুনের ফুলকি। মৃত্তিকা জীবনের শেষ শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়াতে চেষ্টা করে।
-জয় গ্রহরাআআআআজ ।
বলে সবেমাত্র হাতের মুঠোয় চাপ দিয়ে শরীরটাকে শূন্যে ভাসিয়ে দিচ্ছিলেন মিশ্রঠাকুর। আঘাত হানার আগেই একটা ফাঁকা গুলির শব্দ। হুড়মুড় করে কতগুলো লোক নেমে এল সিঁড়ি দিয়ে। তিরুর হাত থেকে পড়ে গেল মোবাইল ।
-খেল খতম মিশ্রঠাকুর। চুপচাপ চলে আসুন।
স্বয়ম্ভুর হাতের রিভলবার তাক করা মিশ্রর দিকে। শিবাঙ্গীর হাতেরটার লক্ষ্য তিরু। মাটির তলার ঘরে নেমে এসেছে স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী, অভিনব ও আরও চারজন পুলিশ ।
-সরে আসুন মৃত্তিকার কাছ থেকে।
ধমক দিল স্বয়ম্ভু। মিশ্র বিস্ফারিত চোখ দুটোকে নামিয়ে নিলেন মাটিতে। ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। স্বয়ম্ভুর হুকুমে তিনজন পুলিশ মৃত্তিকাকে বাঁধনমুক্ত করতে ব্যস্ত হয়ে গেল।
-তাহলে মিশ্রঠাকুর নাকি দয়াময় সান্যাল, লাটাগুড়ি পুলিশ স্টেশনের কনস্টেবল! ওদিকে মূর্তিমান ত্রিদিব মণ্ডল ওরফে তিরু ওরফে শ্রীকুমার মণ্ডল। ভালোই খেলার ভেনুটা বেছেছেন। একদম থ্রিলার সিনেমার মত। এতদিন আপনারা শুট করেছেন। ভিডিয়ো বানিয়েছেন। ভেট পাঠিয়েছেন। আমার মাকেও রেহাই দেননি। আজকের ফাইনাল শুটিংটা আমরা করেছি। ওই দেখুন ।
স্বয়ম্ভূ ওপরের দিকে আঙুল দেখাল। সবাই ঘাড় তুলে দেখল মাথার ওপর ছোট্ট একটা ক্যামেরা লাগানো।
-পালাবার পথ নাই। এতদিন তো আপনি গ্রহরাজের পুজো করলেন ঠাকুরমশাই। শনিঠাকুর কীসের দেবতা সেটা নিশ্চয়ই জানেন? সত্যের দেবতা। ন্যায়ের দেবতা। এবার চলুন, আমরা আপনার পুজো করি। এই নিয়ে যাও এদের। দেখো, কষ্ট যেন না পায়
অনুষ্ঠানবাড়িতে এতক্ষণে তুলকালাম শুরু হয়ে গেছে। মৃত্তিকাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দীপায়নের পাগল-পাগল অবস্থা। মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে দীপার কোলে। সবাই টেনশন করছে। এত রাতে যে কজন আত্মীয় রয়েছেন তাঁরা সকলেই সমস্বরে মত দিয়েছেন থানায় যাবার জন্য। দীপায়ন প্রথমেই থানায় যেতে রাজি হচ্ছিল না। কিন্তু সকলের চাপে রাজি হতে বাধ্য হয়। ঠিক তখনই বাইরে থেকে একজন এসে খবর দেয় পুলিশ আসছে এখানে। সবাই হতভম্ব। স্বয়ম্ভু সেন সমেত সকলেই ঢুকে এলেন। পুলিশের লোক রীতিমতো ঘাড় ধরে সকলের সামনে নিয়ে এলেন মিশ্রঠাকুর ও তিরুকে। দীপা চমকে উঠল। এপাশ ওপাশ চোখ চালিয়ে সে মৃত্তিকাকে খুঁজতে লাগল। স্বয়ম্ভু সোজা স্টেজে রাখা মাইক হাতে তুলে নিল। ‘সবাইকে একটা অনুরোধ যে সকল আত্মীয় স্বজনদের খাওয়া হয়ে গেছে তাঁরা প্লিজ আজকের মত চলে যান। আর যাঁরা যাঁরা এখনও খাননি বা খাচ্ছেন তাঁরা শান্তিতে খেয়ে প্লিজ এই জায়গাটা খালি করে দিন। দীপায়নবাবু এরকম কী কেউ বাকি আছেন?’
-না না। সবাই মোটামুটি চলে গেছেন। এখন শুধু আমরা বাড়ির লোকেরাই…..
-বাহ! খুব ভালো। তাহলে প্লিজ এই জায়গাটা খালি করে দিন ।
দীপা এগিয়ে এসে দীপায়নকে বলল, ‘দাদা আমি দেবীকে নিয়ে ঘরে যাচ্ছি।’ দীপায়ন সম্মতি দিলেও কড়া হুকুম ভেসে এল মাইকে। ‘না দীপা । আপনি এখানেই থাকবেন।’ দীপার মুখটা শুকিয়ে গেল। অসহায় চোখে দীপায়নের দিকে তাকাল। দীপায়ন বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করল, ‘মৃত্তিকা কোথায় স্বয়ম্ভুবাবু?’
-ওই তো।
দেখা গেল শিবাঙ্গী মৃত্তিকাকে নিয়ে ঢুকছে। ঠিক মত হাঁটতে পারছে না। দীপায়ন ছুটে যায়। ‘মৃত্তিকা কী হয়েছে তোমার? কোথায় ছিলে তুমি?’ আবারও মাইকে উত্তর আসে, ‘ওনাকে কিডন্যাপ করা হয়েছিল দীপায়নবাবু।’ দীপায়ন চমকে ওঠে। ‘মানে? এসব কী বলছেন?’
-ওই যে দেখুন দুজন মূর্তিমান দাঁড়িয়ে আছেন। আপনাদের পেয়ারের মিশ্রঠাকুর আর তার নকল ভাগ্নে তিরু।
মিশ্রঠাকুরকে দেখে দীপায়ন আকাশ থেকে পড়ল। তিরুকে বেশ চেনা লাগল। স্বয়ম্ভু মাইক ছেড়ে মাঠে সবার মধ্যে নেমে এল। ‘আশা করি আত্মীয় স্বজন সবাই চলে গেছেন!’ দীপায়ন চারপাশ তাকিয়ে মাথা নাড়ল৷
-ব্যস। তার মানে এবার শুরু করতে পারি। এই শিবাঙ্গী, প্রিয়াংশু, তৰ্পণা আর মীনাক্ষীকে এখানে নিয়ে এস। আর কাউকে নয় কিন্তু । বাকিদের কড়া পুলিশি প্রহরায় রাখবে।
-ওকে স্যার।
শিবাঙ্গী তৎপরতা দেখিয়ে তিনজনকে সবার মাঝে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। প্রিয়াংশুর মুখে অজস্র প্রশ্ন থাকলেও সে চুপ। তড়পে উঠলেন তৰ্পণা, ‘এইভাবে একজন মহিলাকে রাতে তুলে আনা যায় না স্বয়ম্ভুবাবু।
-তুলে তো আনিনি। গাড়ি করে সসম্মানে নিয়ে এসেছি এখানে। আপনি নাইট শোয়ে সিনেমা দেখতে যাননি কোনওদিন? কী হল গেছেন?
তর্পণা রাগত চোখে কড়া গলায় বললেন, ‘না।’ স্বয়ম্ভুর মুখে হাসি। ‘ওই জন্যেই তো নিয়ে এলাম। আজ নাইট শোয়ে সিনেমা দেখব আমরা সবাই।’ -রাত এগারোটা বেজে গেছে। এখন রসিকতা করছেন?
-শাট আপ। অনেক বলেছেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকুন।
স্বয়ম্ভু তার কমনীয় মূর্তিটা মুহূর্তে পালটে ফেলল। হাটের মাঝে ঝাড় খেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন তর্পণা। মীনাক্ষীর মুখ চুন হয়ে গেছে । ‘স্যার, আমি কী করলাম যে আমায় এভাবে ধরে নিয়ে আসা হল?’ খুব নরম স্বরেই কথাটা জিজ্ঞেস করল মীনাক্ষী। স্বয়ম্ভুও নরম সুরে জবাব দিল, ‘একটু অপেক্ষা করুন। আপনাকে নিয়ে আসার কারণ নিশ্চয়ই জানতে পারবেন।’ বলেই গলা তুলল স্বয়ম্ভু, ‘ইলেক্ট্রিশিয়ান কে আছেন ভাই, ওই বড় স্ক্রিনটা একটু এগিয়ে নিয়ে আসুন তো।’ বলার সঙ্গে সঙ্গে কাজ হয়ে গেল । মঞ্চ প্রস্তুত। দর্শকও উদগ্রীব হয়ে দাঁড়িয়ে কিম্বা বসে আছে। এবার জমজমাট একটা থ্রিলিং নাটকের আখ্যান শুরু হবে।
