১৭
‘দোলে কৃষ্ণ মেঘের ওই সৌদামিনী / হিন্দোলে দেয় দোল ব্রজগোপিনী । নির্ঝঞ্ঝাট বাড়িটার সকালগুলো প্রতিদিনই এই গানের সুরে মোহিত হয়ে থাকে। হাতের ধূপটা ইতিমধ্যেই পাশাপাশি দুটো ঘর ঘুরে ফেলেছে। ‘বাজায় নূপুর নাচে ময়ূরী ময়ূর / যমুনা উজান বয় ভরা শাওনে।’ অপর্ণা দেবী সকাল হতেই উঠে পড়েন। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা ঘুম থেকে উঠেই স্নান সেরে নেন । বাড়িতে গোপাল আছে তাঁর। ‘কুসুম দোলায় দোলে শ্যামরায় / তমালশাখে দোলা ঝোলে’ মেয়ের ঘরে ঢুকতেই গান থেমে গেল। গজগজ করলেন, ‘এত বড় মেয়ে হল তবু শোয়ার ঠিক নেই।’ বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে মেয়ে। হাঁটুর ওপরে উঠে গেছে লং স্কার্ট। অপর্ণা স্কার্টটা টেনে ঠিক করে দিল। একটু নড়ে উঠল শিবাঙ্গী। পাশের বালিশটাকে টেনে মুখটাকে গুঁজে দিল। অপর্ণা আবারও গান গাইতে গাইতে ধূপ ঘোরাতে থাকলেন। দেয়ালে ঝোলানো একটাই ঠাকুরের ছবি, মা ভবতারিণীর। সেখানে ধূপ ঘুরিয়ে ঘরের কোণে কাপড় চাপা হারমোনিয়ামটার সামনেও ধূপ দেখালেন অপর্ণা। ঘরের দরজা ভেজিয়ে বেরিয়ে গেলেন। সাদা পাঞ্জাবিটা গায়ে গলিয়ে ফেলেছেন শেখরবাবু। অপর্ণা বললেন, ‘আজকেও বাজার যাবে?’ পাঞ্জাবিটা ভালো করে গায়ে চড়িয়ে বললেন, ‘বাজার না করি দুধটা তো আনতে হবে। কাল কখন ফিরল মেয়ে?’
-রাত দেড়টা।
মুখে একটা পুচ করে শব্দ করে বললেন, ‘এরকম করলে শরীর থাকবে? একটা আঠাশ বছরের মেয়ে সারাদিন খালি চোর ডাকাতের পেছন পেছন ছুটে মরছে।’ অপর্ণা গুনগুন করে আবার গান ধরলেন। পরক্ষণেই থামিয়ে বললেন, ‘ও শোনো, গোপালের নকুলদানা ফুরিয়ে গেছে। মনে করে এনো।
-হুম ।
শেখর বেরোলেন। পিছন পিছন অপর্ণাও বাইরে বেরিয়ে এলেন৷ সিড়ির পাশ দিয়ে বেরিয়েই তুলসীমঞ্চ। সেটাকে ডানদিকে ফেলে পাঁচিল দেওয়া সরু প্যাসেজটা ছোট লোহার গেট পর্যন্ত চলে গেছে। শেখরবাবু গেটের দিকে এগিয়ে গেলেন। অপর্ণা তুলসী মঞ্চে ধূপ ঘোরাতে থাকেন। ওদিকে ছাতা খুললেন শেখর। অপর্ণা দেখলেন, পাঁচিলের ভিতর উঁকিঝুঁকি মেরে শেখরবাবু কী যেন দেখছেন। ‘কী গো, কী দেখছ?’
-এটা কীসের বস্তা গো?
-বস্তা?
অবাক হলেন অপর্ণা। এগিয়ে গেলেন। রাস্তার পাশেই এ বাড়ির পাঁচিল। পাঁচিলের এপারে বাড়ির দেয়ালের মাঝে আরেকটা সরু প্যাসেজ। এখানে ফুল গাছ রাখা। অপর্ণা গলা তুলে বললেন, ‘এ কী কাণ্ড! আমার ফুলের টব ভেঙে গেছে তো। এটা কীসের বস্তা? কে ফেলল?”
-দেখি ছাতাটা ধর তো ।
শেখরবাবুর হাত থেকে অপর্ণা ছাতাটা নিলেন। শেখর বস্তার কাছে গিয়ে টেনে তুলতে চেষ্টা করলেন, ‘বাবা রে, বেশ ভারী তো গো।’
-তুলতে যেও না। কাঁধে লাগবে তোমার।
-আরে তুলতে তো হবে নইলে দেখবেটা কে? কীসের বস্তা? কে ফেলল? মধুসূদন কিছু রেখে যায়নি তো?
-না তো। ও আর কী রাখবে? রাখার মধ্যে গাছের সার রাখে। সে তো সিঁড়ির নীচে রেখে যায়। বস্তাটার এপাশ ওপাশ দেখে শেখর মুখের বাঁধন খোলার চেষ্টা করলেন। একটু জোর খাটাতেই খুলে গেল। বস্তার মুখটা ফাঁক করতেই আঁতকে উঠে চার পা পিছিয়ে এসে টাল খেয়ে গেলেন। দমটা বন্ধ হয়ে যাবার আগে যেরকম শব্দ বেরিয়ে আসে শেষ হিক্কা ওঠার মত, সেরকমই একটা শব্দ বেরিয়ে এল শেখরবাবুর মুখ দিয়ে। ‘কী গো কী হল তোমার?’ অপর্ণার গলায় উৎকণ্ঠা। শেখরবাবুর দু-চোখ বিস্ফারিত। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেছেন। অপর্ণা এগিয়ে যায়, ‘দেখি কী আছে।’ শেখরবাবু বাধা দেন, ‘না না অপর্ণা তুমি দেখো না। সহ্য করতে পারবে না।’
-মানে? কেন কী আছে ওতে। আমি দেখবই ।
-অপর্ণাআআআআ…
স্বামীর বারণ না শুনে বস্তার মুখ ফাঁক করতেই গলা চিরে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে অপর্ণার। বস্তার মধ্যে থেকে ওপরের দিকে চেয়ে থাকা রক্তাক্ত এক মেয়ের মুখ। জিভটা ঠোঁটের বাইরে বেরিয়ে এসেছে খানিকটা। চোখ দুটো ঠেলে বেরিয়ে আছে। সারা গায়ে রক্ত মাখা। বস্তার ভিতর দিকে শরীরটা কেউ যেন কোনওরকমের ঠেলে দুমড়ে মুচড়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে। দুটো হাঁটু ওপরের দিকে উঠে আছে। চোখ অন্ধকার হয়ে আসে অপর্ণার। চিৎকার শুনে পাশের বাড়ি থেকে উঁকি দিয়েছে। পথ চলতি দুয়েকজন পাঁচিলের ওপারে থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। অপর্ণাকে নিয়ে শেখর কোনওক্রমে ভিতরে ঢুকতে যাবে, দেখল শিবাঙ্গী বেরিয়ে আসছে। ‘মা তুমি কী চিৎকার করলে?’ ঘুমের ঘোরে ঠাওর করতে পারেনি ঠিক কে চিৎকার করল। অপর্ণা হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের বুকে লুটিয়ে পড়লেন। শেখর থরথর করে কাঁপছেন।
ম্যুর এভিনিউয়ে এখন থমথমে নিস্তব্ধতা। চোরা আতঙ্ক চারিয়ে গেছে বাজারে, দোকানে, বাড়িতে বাড়িতে। একটা ক্যাব ধরে ঝড়ের গতিতে ছুটে এসেছে স্বয়ম্ভু। ততক্ষণে পুলিশের লোকজন ঘিরে ফেলেছে বাড়িটাকে। কেউ কেউ চিৎকার করে জায়গাটাকে ফাঁকা করতে বলছে। বস্তাটা টেনে রাস্তায় বের করা হয়েছে। বড় কাঁচি চালিয়ে বস্তা কাটা হল। পুরোটা খুলে যেতেই ক্ষতবিক্ষত লাশটা হাত-পা ছড়িয়ে নেতিয়ে পড়ে রইল রাস্তায়। লোকজন ঘেন্নায় চোখ কোঁচকাল। নাকে রুমাল দিল কেউ কেউ। কাটা, ছেঁড়া, থ্যাতলানো অস্থিমজ্জার ওপর চাবড়া চাবড়া রক্তের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে কিছু রক্ত ধুয়ে পিচের রাস্তাকে লাল করে দিচ্ছে। স্বয়ম্ভু চোখে হাত চাপা দিল। দুপাশে মাথা নাড়ল নিজের মনে। তারপর আঙুলের ফাঁক দিয়ে লাশের পায়ের দিকে তাকাল। দুপায়েরই চারটে করে আঙুল কাটা। ডানপায়ের নীচে এবারেও ধারাল কিছু দিয়ে খুনি এঁকেছে। অর্ধেক গোল মতন রেখা। গোলের নীচের দিকটা একটু ছুঁচলো। কারও মুখ আঁকতে গেলে যেরকমভাবে প্রথমে মুখাবয়বের রেখা টানা হয় ঠিক সেরকম। কার মুখ আঁকতে চাইছে খুনি? আদৌ কি মুখ নাকি অন্য কিছু? শিবাঙ্গী হতভম্ব হয়ে সিনিয়ারের দিকে তাকাল। বলল, ‘স্যার, এটা তো…’ আর কিছু বলার আগেই স্বয়স্তু মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে বলল, “এত পুলিশ প্রোটেকশন থাকা সত্ত্বেও বাঁচাতে পারলাম না?’
-হুমকি তো সুস্মিতাকে দিয়েছিল।
-ওটাই তো চালাকি শিবাঙ্গী। পাক্কা খেলোয়াড়ের মতো খুনি আমাদের নাকের ওপর তুড়ি মেরে বেরিয়ে গেল।
-বেচারি। যেদিন জন্ম, সেদিনই…
কোনও গোয়েন্দার সহকারী নয়, এক সাধারণ মানুষের মত বুকের ভেতর গুমরে ওঠা কথাটা উগরে দিল শিবাঙ্গী। ভিতর থেকে ও দুর্বল হয়ে পড়ছে? স্থানীয় পুলিশ অফিসারকে এ পাড়ায় সিসিটিভির কথা জিজ্ঞেস করল স্বয়ম্ভু।
-না স্যার, এখানকার পাড়াগুলোতে সিসিটিভি নেই। মেন রোড থেকে একটু ভেতর দিকে তো। তাই…
-এবার থেকে এখানেও সিসিটিভি লাগাবার ব্যবস্থা করুন।
-শিওর স্যার।
হঠাৎ কোথা থেকে মৌমাছির ঝাঁকের মতো লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে চলে এল বেশ কিছু মিডিয়া। যে যার নিজের মতো ভাষণ দিতে শুরু করল। ‘এই এখান থেকে তাড়াতাড়ি বডি সরাবার ব্যবস্থা কর।’ বিরক্ত হয়ে পুলিশের গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু। ড্রাইভার তপন গাড়ি নিয়ে হাজির হয়েছে। শিবাঙ্গীও স্বয়ম্ভুর পাশে এসে দাঁড়াল। ‘কাকু-কাকিমার কী অবস্থা?’ স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল।
-প্রচণ্ড ট্রমাটাইজড। মা তো সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিল। বাবা তাও শক্ত। -স্বাভাবিক। তুমি আজ কোথাও যেও না। ওনাদের সঙ্গে থাকো। আমি এ পাশটা দেখে নিচ্ছি ।
-কী বলছেন স্যার? আমি থাকব না?
স্বয়ম্ভূ তাকাল। বসের মতো নয়। অভিভাবকের মতো। বলল, ‘শিবাঙ্গী, জীবনে এর চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চময় কেস পাবে। কিন্তু আজ কাকুকাকিমার কিছু হয়ে গেলে সারা জীবন আফসোস করে কূলকিনারা পাবে না । যদি কোনও দরকার হয় আমি কল করে নেব।’
কথাগুলোর মধ্যে অদ্ভুত একটা অভিভাবকত্ব খুঁজে পেল শিবাঙ্গী। শান্ত অথচ কঠোর আদেশ। আর আপত্তি করল না। স্বয়ম্ভুর কথাগুলোই নতমস্তকে মেনে নিল সে। ‘আর শোনো’ ডাকল স্বয়ম্ভু ।
-হ্যাঁ স্যার।
-দিয়ার কোনও আত্মীয়ের খোঁজ জানো? ওর তো একজন বন্ধু ছিল। কী যেন নামটা!
-কিয়ারা। দিয়ার পার্টনার।
স্বয়ম্ভু একটু থমকে শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে রইল। ‘পার্টনার!’
-হ্যাঁ স্যার।
-ও। তা তার নম্বর কিছু?
-না স্যার। তবে আমি ডিরেক্ট লোক পাঠিয়ে দিচ্ছি দিয়ার ফ্ল্যাটে। সেও নিশ্চয়ই এতক্ষণে খোঁজ খবর নেওয়া শুরু করেছে।
-উঁহু। করেনি। করলে আমার কাছে খবর আসত। ওদের লোকাল থানায় আমার বলা আছে।
হঠাৎ দুজন মিডিয়ার লোক ধেয়ে এল স্বয়ম্ভুর দিকে। ‘স্যার স্যার, আপনি এই কেসটার তদন্ত করছেন তো? কী বুঝছেন? কে বা কারা করছে?” মেয়েটির কথা শেষ হতে না হতেই ছেলেটির প্রশ্ন, ‘এটা কি সিরিয়াল কিলিং? নাকি পার্সোনাল কোনও রিভেঞ্জ?’ সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ম্ভুর জিভ তীক্ষ্ণ বর্শার মতো আছড়ে পড়ল, ‘উইথ আউট এনি রিজন কি সিরিয়াল কিলিং হয়? এক্ষেত্রেও নিশ্চয়ই আছে যদি না খুনি উন্মাদ হয়ে থাকে তো। তবে সেটা পার্সোনাল রিভেঞ্জ কিনা এখুনি বলা সম্ভব নয়। তদন্ত চলছে।’ এরপরে প্রথম মেয়েটির উদ্দেশে বলল, ‘আর আপনি যে যে প্রশ্ন করলেন সেগুলোর উত্তর পেয়ে গেলে বোধহয় এই খুনটা হত না।’ আবার ছেলেটি প্রশ্ন করল, ‘গোয়েন্দার বাড়িতে ভিক্টিমের পায়ের কাটা আঙুল আর গোয়েন্দার সহকারীর বাড়িতে আস্ত একটা লাশ! খুনি কী শুধু ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টকে চ্যালেঞ্জ দিতেই চাইছে নাকি খুনির আসল রাগ আপনাদের ওপর? যাতে খুন হচ্ছে সাধারণ মানুষ?”
-তদন্ত সাপেক্ষ। এখন কিচ্ছু বলা যাচ্ছে না। প্লিজ আর কোনও প্রশ্ন নয় । প্লিজ ।
আরও কয়েকজনকে এগিয়ে আসতে দেখেই গাড়িতে উঠে গেল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীকে ঘরে যেতে বলল।
গাড়িটা ছাড়তে না ছাড়তেই ফোন বেজে উঠল। অজানা নম্বর। স্বয়ম্ভু ফোনটা ধরল। কিছুক্ষণ চুপ করে সব শুনল। তারপর বলল, ‘আমি এখুনি আসছি।’ ফোনটা কেটেই শিবাঙ্গীকে কল করে জানায়, ‘কিয়ারা ড্যাফোডিলে ভর্তি৷ পুলিশ কাল মাঝরাতে কিয়ারাকে একটা ফুটপাথ থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করে। মেরে পা ভেঙে দিয়েছে। আমি সেখানেই যাচ্ছি। এরপর কী হয় আমি জানাব তোমায়। ছাড়লাম।’
নার্সিংহোমে গিয়ে স্বয়ম্ভু শুনল কিয়ারাকে ওটিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মেরে পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে তার। মালাইচাকি ভেঙে দুটুকরো হয়ে গেছে। ‘পেলেন কোথা থেকে?’ পুলিশ অফিসারকে প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু।
-ট্যাংরার কাছে একটা জায়গায়। ফুটপাথে পড়েছিল।
-তারপর?
-রেসকিউ যখন করি তখন কোনও জ্ঞান ছিল না। অত বৃষ্টির জল মুখে পড়েও যখন জ্ঞান ফেরেনি তখন আর সময় নষ্ট না করে আমরা নার্সিং হোমে নিয়ে আসি। পকেটে যে পার্স ছিল সেখানে আধার কার্ডে ওনার নাম জানতে পারি কিয়ারা ঘোষ। এদিকে ফোনটাও নেই। তারপর যখন জ্ঞান ফেরে তখন প্রচণ্ড চিৎকার করতে থাকে যন্ত্রণায়। ডক্টর বলেন ওনার পায়ের অবস্থার কথা। ইমিডিয়েট অপারেট করতে হবে। এতো পেন হয় যে উনি আবার সেন্সলেস হয়ে যান। শুধু একটাই কথা বলতে পেরেছিলেন ।
-কী কথা?
-আপনার নাম। দু’বার বলেছেন।
-বুঝেছি। কতক্ষণ লাগবে অপারেশন?
বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। তবে আকাশের যা হাল আবার ঢালবে। নার্সিং হোমের বাইরে এসে মুখ নিচু করে বেশ খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল স্বয়ম্ভু। বারবার নিজেকেই দোষী বলে মনে হচ্ছে। নিজেই কাজের দায়িত্ব নিয়ে গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ব্যর্থ প্রমাণ করছে স্বয়ম্ভু। এবার লোকে বলতে শুরু করেছে যেখানে গোয়েন্দাকেই বারবার একটা সমাজ বিরোধীর থ্রেটের মুখে পড়তে হয় সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়?
-একদম ভুল স্যার। এসব কী আর আপনার হাতে? তাছাড়া যারা প্রশাসনিক বিভাগে কাজ করেন তারা কি অসাধারণ মানুষ?
শিবাঙ্গী সঙ্গে থাকলে কথাগুলো এইভাবেই সে বলত। এই সময় বড্ড দরকার ছিল শিবাঙ্গীকে। স্বয়ম্ভূ আজ অব্দি যেখানে গেছে শিবাঙ্গী ছিল তার ছায়া। তার ভরসা। কখনও তার সান্ত্বনাও। আচ্ছা, এইসব কথা এখন কেন মনে হচ্ছে স্বয়ম্ভূর? পাশে নেই বলে কী শিবাঙ্গীকে মিস করছে সে? চট করে আরও একটা বিষয় খেলে গেল স্বয়ম্ভুর মাথায়। প্রথমে একটা সিগারেট ধরাল। তারপর মোবাইলে মৃত্তিকার নম্বর ডায়াল করতে গিয়ে দেখল সেটা তার মোবাইলে সেভই নেই। একমাত্র শিবাঙ্গীর কাছেই থাকবে। ভাবতে ভাবতেই শিবাঙ্গী কলিং। চমকে উঠল স্বয়ম্ভু। ব্যাপারটা কী হল! একেই কী টেলিপ্যাথি বলে? ‘হ্যাঁ বলো শিবাঙ্গী।’
-স্যার, আপনার পারমিশন না নিয়েই একটা কাজ করে ফেলেছি।
-কী করেছ?
-মৃত্তিকাকে ফোন করে বলেছি কোনও পার্সেল এলে ওরা যেন না খোলে। সঙ্গে সঙ্গে আমাদের খবর দেয়। তারপর আমরা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেব।
এত চাপ, এত ব্যর্থতার গ্লানি, এত অসহায়তার মধ্যেও অনেকটা শান্তি লাগছে স্বয়ম্ভুর। ঠিক এই কারণেই ও মৃত্তিকার নম্বর খুঁজছিল এক্ষুনি। সেটা কীভাবে যেন শিবাঙ্গী জেনে ফেলেছে। শান্ত গলায় আলতো হাসি মুখে স্বয়ম্ভু বলল, ‘গ্রেট জব শিবাঙ্গী। একদম ঠিক সময়ে ঠিক কাজটা করেছ। কাকু-কাকিমার কী খবর?’
-ডাক্তার ডেকেছিলাম। এমনিতেই হাই প্রেশার মায়ের। আরও বেড়ে গেছে।
-তুমি কিন্তু সাহস যুগিয়ে যাও।
-হ্যাঁ স্যার। সাহস জোগাতে জোগাতে মুখ ব্যথা হয়ে গেল আমার ।
-দশ মাস দশ দিনের যন্ত্রণার থেকে সেটা অনেক কম।
ফোনের ওপারে শিবাঙ্গী বোধহয় ফিক করে হাসল। আর মিঠে সুরে ‘হুম’ বলল ৷
দীপায়ন সকালের চা খেতে খেতে খবরের কাগজের পাতা ওল্টাচ্ছে। মৃত্তিকা মেয়েকে কোলে নিয়ে বাইরের ঘরে এল। ‘তুমি এত সকালে উঠলে কেন?’ দীপায়নকে প্রশ্ন ছুড়ে আধো আধো আদুরে স্বরে মেয়ের সঙ্গে গল্প করছে মৃত্তিকা।
-কলেজে রেনি ডে বলে কিছু নেই মৃত্তিকা।
খকখক করে কেশে নিল দীপায়ন ।
-দেখেছ তো। কাল অত রাতে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফিরলে। তারপরে এসে ঘুমোলেও না।
দীপায়ন অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আবার আমার পড়ার ঘরে রাতে উঁকি মেরেছ?’
-উঁকি মারতে হয় না মশাই। ঘরে আলো জ্বললে বাইরে থেকেই বোঝা যায়।
-আলো জ্বেলে তো ঘুমোতেও পারি।
খবরের কাগজটা একটু ঝাঁকিয়ে বলে দীপায়ন।
মৃত্তিকার আধো আধো কথা শুনে মেয়েটাও নানান অচেনা ভাষায় উত্তর দিচ্ছে, হাসছে, চোখদুটোকে গোল গোল করে তাকাচ্ছে। মেয়ের দিক থেকে মনটা হঠাৎই সরে গেল মৃত্তিকার। জানলার বাইরে মেঘলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বড্ড ভয় করছে আমার। কোনও ক্ষতি হবে না তো?” আচমকা ঘরের ভিতরের হালকা পরিবেশটা মেঘলা আকাশের চেয়েও ভারী হয়ে উঠল। ‘আবার তুমি ওসব ভাবছ? আর এই গোয়েন্দাগুলোও হয়েছে। বাড়িতে ঢুকে পড়ে মধ্যবিত্তের শান্তিটাই নষ্ট করে দিচ্ছে।’ বিরক্তি উগরে দিল দীপায়ন। পরক্ষণেই পরিবেশটা আবার হালকা করতে দীপায়ন প্রসঙ্গ পাল্টায়। দুবার কেশে নিয়ে বলল, ‘মেয়েটাকে তুলে দিলে কেন? আরেকটু না হয় ঘুমোত।’
–হ্যাঁ, তোমার মেয়ে না হলে আর ঘুমোয় কে! খালি উঁ উঁ করে বাইরের দিকে হাত দেখাচ্ছে। সাত সকালে আমার পচা মেয়েটাকে বেডুবেডু করতে নিয়ে যেতে হবে।
শেষ কথাগুলো মেয়ের দিকে তাকিয়ে তার মত করে বলতেই মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল। ‘দেখেছ অবস্থা! যেই শুনেছে বেডুবেডু অমনি হাসছে।’ মৃত্তিকা বলল। দীপায়ন খবরের কাগজ ভাঁজ করে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে হাসল। যাক বউটার মন থেকে আপাতত আতঙ্কের মেঘটা সরানো গেছে। তারপর আবার কাগজের আড়ালে মুখ গুঁজে দিতে গিয়েই চোখ পড়ল বারান্দার দরজায়। চৌকাঠের কাছে মাটিতে কী যেন পড়ে আছে!
-এই মৃত্তিকা, ওটা কী দেখো তো।
-কোনটা?
-ওই যে মাটিতে কী পড়ে?
বারান্দার দরজার দিকে পিছন করে বসেছিল বলে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখতে একটু কষ্টই হল মৃত্তিকার। ‘পেনড্রাইভ মনে হচ্ছে।’ দীপায়ন উঠে কুড়িয়ে আনল। একপিঠ লাল আর অন্য পিঠ কালো ।
-এটা কার?
মৃত্তিকা বলল, ‘আমার তো নয়।’
-এটা কি তাহলে আমারটা?
-চালিয়েই দেখো না। কী আছে দেখলেই বুঝতে পারবে কার।
এই সময়েই ঘরে ঢুকে এল বাচ্চার আয়’। মৃত্তিকা বলল, ‘কী গো দীপা, আজ লেট হল?’
-আর বোলো না গো। কাল থেকে যা বৃষ্টি হয়েছে। বাড়ির সামনে এক হাঁটু জল। তার ওপর বাস নেই। দাঁড়াও, চট করে কাপড়টা পালটে আসছি।’
দীপা ভেতরে চলে গেল। দীপায়ন ঘর থেকে ল্যাপটপ আনতে গেল। দীপার কাপড় ছেড়ে আসতে আসতে দীপায়নের ল্যাপটপ অন হয়ে গেছে। ‘এবার ল্যাপটপটাকে পাল্টাতে হবে বুঝলে। এত সময় লাগছে অন হতে।’
দীপা বাচ্চাকে নিয়ে ঘরে চলে গেল। মৃত্তিকা একটু আড়মোড়া ভাঙল। সেও ল্যাপটপের দিকে চেয়ে রইল কী আছে দেখার জন্য। পেনড্রাইভে একটাই ভিডিয়ো ফাইল। দীপায়ন প্লে বটনটা ক্লিক করতেই একটা মেয়ের বিস্ফারিত চোখের নৃশংস রক্তাক্ত মুখ ভেসে উঠল। চমকে সরে এল দীপায়ন। মৃত্তিকা আঁতকে উঠল। একটা কালো জোব্বা পরা কেউ প্রচণ্ড আনন্দে মেয়েটার পেটের ওপর দু-পা তুলে লাফাচ্ছে। পায়ে তার সিলভার রঙের জুতো। নীচে সরু লম্বা হিল। ‘এটা তো দিয়া, দিয়া এটা।’ আতঙ্ক মেশা কাঁদো কাঁদো স্বরে বলে উঠল মৃত্তিকা। মুখে কাপড়ের শক্ত বাঁধন থাকলেও বন্ধুকে চিনতে পেরেছে মৃত্তিকা। ‘কী বলছ মৃত্তিকা’ দীপায়নের গা ঘিনঘিন করে ওঠে। আতঙ্কে শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসে। ভিডিয়োর অডিয়োতে একটা মেয়ে গাইছে, ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে…’ সঙ্গে সঙ্গে এক দল মেয়ে ধরছে পরের অংশটা, ‘দম দমা দম’। আবার একটা মেয়ের গলা ‘তুনে ক্যায়া সমঝা হ্যায় মুঝে….’ সমবেত মেয়েরা ‘দম দমা দম’। গানটা হয়েই চলেছে। সঙ্গে শোনা যাচ্ছে একটা বিড়ালের মৃদু আর্তধ্বনি। এই ভিডিয়োতে যেন দিয়ার মুখে কোনও বিড়ালের আর্তনাদ বসানো হয়েছে। নারকীয় হত্যার দৃশ্যে বেজে চলেছে পাঙ্গা নেওয়ার গান। জোব্বা পরা আততায়ী খানিকটা গানের তালে তালেই জোড়া পায়ে ওপরের কোনও একটা অংশ থেকে ঝুলে লাফাচ্ছে দিয়ার পেটে, বুকে। আসল অডিয়োটা থাকলে হাড় ভাঙার, মাংস থ্যাঁতলানোর শব্দও শোনা যেত। দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখা হয়েছে দিয়াকে ৷ ভেতর থেকে কতটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে সেটা দিয়ার মুখের ক্ষতবিক্ষত অভিব্যক্তি দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। একটু পরেই জোব্বা পরা পা দুটো পচ করে পেটের মধ্যে ঢুকে গেল। না, পচ শব্দটা দীপায়ন আর মৃত্তিকার মন শুনল। আসল ভিডিয়োটাতে গানটাই হচ্ছে। ক্যামেরাটা ঠিক সেইভাবেই ফিট করা যাতে ভিক্টিমের কষ্টটা ভিডিয়োর এপারের লোক দেখতে পায়। কিন্তু নরখাদকের পা দুটো প্ৰায় অফ ফোকাস। ক্যামেরাটা ধরা আছে ভিক্টিম মেয়েটার মুখকে ফোরগ্রাউন্ডে রেখে। মৃত্তিকা গলা তুলে বলে উঠল, ‘এই জন্যেই শিবাঙ্গী ম্যাডাম বলেছিল কোনও পার্সেল এলে খুলবেন না!`
-এটা যে সেই পার্সেল কীভাবে বুঝব?
কথাটা বলেই মৃত্তিকাকে ধরে দীপায়ন বলল, ‘তার মানে খুনি নিজে আমাদের বাড়িতে এসে এটা ফেলে দিয়ে গেছে?
ভয়েতে কেঁদে ফেলল মৃত্তিকা। আর নিতে পারছে না। দীপায়নের কথা বন্ধ হয়ে গেছে। ভিডিয়োটা আর দেখতে পারছে না ওরা। কিন্তু হাত বাড়িয়ে যে অফ করে দেবে সেই শক্তিটাও কেউ যেন শুষে নিয়েছে দীপায়ন আর মৃত্তিকার শরীর থেকে।
