ম্যাও – ৩২

৩২

-রবিঠাকুরের একটা গান আছে। গানটির সুর পাওয়া যায় না। এখন অবশ্য এক শিল্পী তাতে সুর করেছেন বলে শুনেছি। গানটি হল, ‘ঝাঁকড়া চুলের মেয়ের কথা কাউকে বলিনি, কোন দেশে যে চলে গেছে সে চঞ্চলিনী।’ স্বয়ম্ভুর মুখে কথাগুলো শুনে তিরু চোখ তুলে তাকায়। চেনা মানুষটার সঙ্গে বড্ড মিল যে গানটার। স্বয়ম্ভূ পরের চরণগুলো বলতে থাকে, ‘সঙ্গী ছিল কুকুর কালু, বেশ ছিল তার আলুথালু / আপনা-‘পরে অনাদরে ধুলায় মলিনী। হুটোপাটি ঝগড়াঝাঁটি ছিল নিষ্কারণেই, দীঘির জলে গাছের ডালে গতি ক্ষণে ক্ষণেই। পাগলামি তার কানায় কানায় খেয়াল দিয়ে খেলা বানায়, উচ্চহাসে কলভাষে কল-কলিনী। রবিঠাকুরের এই গানটার সঙ্গে কী ভয়ানক মিল আমার গল্পের মেয়েটার। মেয়েটার নাম শ্রীদেবী মণ্ডল।’ মৃত্তিকা লজ্জায় নামিয়ে নেয়। পাশেই বসে দীপায়ন। মৃত্তিকাকে দুহাতে ধরে আছে। মুখ

-মেদিনীপুরের গ্রামের একটা সাধারণ মেয়ে শ্রীদেবী। ছোট থেকেই সে ভীষণ চঞ্চল। প্রাণখুলে হাসে। কারণে কিংবা অকারণে।

প্রিয়াংশু মুখে হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বয়ম্ভূ সবার মাঝে নিজের মতো হাঁটছে আর বলছে। ‘শ্রীদেবীর মা তাকে মুখ ঝামটা দিত। সেটা কতকটা ভালোবেসেই। কিন্তু তার মধ্যেও তার মাথায় কাকের বাসার মত ঝাঁকড়া চুল, গায়ের রং চাপা, বাচালের মত হাসি এই নিয়ে খোঁটাও লুকিয়ে থাকত। সারা পাড়ার লোক মেয়েটাকে ঝাঁকড়া পাগলি বলে ডাকত। ওর একটা পাড়াতুতো ঠাকুমা ছিল। তার সঙ্গে সম্পর্কটা অনেকটা ওই কাঁচা মিঠে আমকে যখন তেল নুন মরিচ দিয়ে মাখা হয় তখন তার যেমন স্বাদ হয় সেরকম। শ্রীদেবীর মরা পৃথিবীতে একমাত্র ওই মানুষটাই ওর প্রাণবায়ু। ওর বন্ধু। শ্রীদেবীর এক ভাই ছিল। বছর তিনেকের ছোট। নাম শ্রীকুমার। দিদিকে খুব ভালোবাসত। আরেকজন ছিল। ওদের পাড়াতেই থাকত। যার নাম তপা। শ্রীদেবীর চেয়ে বয়সে বড়। পড়াশুনোতেও বেশ ভালো। তাই তার ওপরেই ভার ছিল এই ঝাঁকড়া পাগলিকে পড়াবার। কিন্তু ছেলেটি মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলে। অনেকবার ঠারেঠোরে বলতে চায়। কিন্তু শ্রীদেবী এতটাই সরল যে ভালোবাসার কথা সে বোঝেই না। মেয়েটি উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর শহরে চলে আসে পড়বার জন্য। কারণ ওর মা কেবলই বলত অমুকের ছেলে বাইরে গেল, তমুকের মেয়ে কোলকাতা গেল পড়তে। তোর কিসসু হবে না। এটা ভালো লাগত না মেয়েটার। জেদ চেপে গেল। ও শহরে গিয়েই পড়বে। হিস্ট্রি অনার্স নিয়ে ভর্তি হল কলেজে। একা থাকতে শুরু করল একটা বাড়িতে। ভাড়ার অনেকটাই দিত তপা। কারণ শ্রীদেবীদের অবস্থা ভালো ছিল না। সে তুলনায় তপাদের অবস্থা বেশ ভালো। তপা টিউশন পড়িয়ে শ্রীদেবীর বাড়ি ভাড়া দিত। ওই যে বললাম, ভালোবাসত। কিন্তু কলেজে পাঁচটি বিচ্ছু ছেলেমেয়ের নজরে পড়ল গাঁয়ের এই ঝাঁকড়া পাগলি।’

মৃত্তিকা ডুকরে ওঠে। দীপায়ন অবাক হয়ে তাকায় স্ত্রীর দিকে। কিছুই বুঝতে পারে না। স্বয়ম্ভূ কলেজের গোটা ঘটনাটাই বর্ণনা করে নাম উল্লেখ না করে। শেষে বলে, ‘অপমানিত, লজ্জিত হয়ে মেয়েটি স্বেচ্ছায় নির্বাসন নেয় ৷ কিন্তু ছোট ভাইটির চোখে সেদিনই প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। বাড়িতে ফেরার পর গাঁয়ের লোকের হাজারটা প্রশ্ন, কুৎসা প্রতিদিন ছিঁড়েখুঁড়ে খেতে থাকে মেয়েটাকে। সরযু ঠাকুমা বুদ্ধি দেয় নীলিমাকে। বলেন, গ্রামে রটিয়ে দাও শ্রীদেবী শহরের একটি ছেলেকে বিয়ে করে মন্দিরে গিয়ে। তারপর সেই ছেলেটি শ্রীদেবীকে ঠকিয়ে ভেগে যায়। এই সন্তান তারই। অন্তত কুমারী মায়ের অপমানের হাত থেকে তো রেহাই পাওয়া যাবে। তাতেও বিশেষ ফল হয় না। গর্ভবতী অবস্থাতেই মেয়েটি পাগল হয়ে যায়। শ্রীকুমার আর তপা পরিচিত একটা মেন্টাল অ্যাসাইলামে রেখে আসে শ্রীদেবীকে I মেয়েটি সেখানেই একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেয়। মেয়েটি বুঝতেও পারে না সে মা হয়েছে। শ্রীকুমার আর তপা দুজনে মিলে বাচ্চাটিকে একটি অনাথ আশ্রমে রেখে আসে। তার কিছুদিন পরে শ্রীদেবী গলায় দড়ি দেয়।’

অনেকক্ষণ কান্নাটা চেপে ছিল তিরু। কিন্তু পারে না। চোখে হাত চাপা দিয়ে কেঁদে ফেলে সবার সামনেই। স্বাভাবিকভাবেই সকলের নজর পড়ে তার দিকে। স্বয়ম্ভূ তিরুর দিকে চেয়ে বলে ওঠে, ‘আমরা যাকে মিশ্রঠাকুরের ভাগ্নে বলে চিনি সেই ত্রিদিব মণ্ডলই হল শ্রীদেবীর ভাই শ্রীকুমার ওরফে তিরু। আর যে পাঁচজনের জন্য একটা সরল মেয়েকে মরতে হয় সেই পাঁচজন হল, অরুণা, দিয়া, সুস্মিতা, মৃত্তিকা আর প্রিয়াংশু।’ দীপায়নের দুটো হাত মৃত্তিকার কাঁধ থেকে ধীরে ধীরে সরে যায়। মৃত্তিকা দীপায়নের দিকে তাকায়। চোখ ভর্তি জল। দীপায়ন উল্টোদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। বাঁধভাঙা কান্না যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে মৃত্তিকার বক্ষবিদীর্ণ করে। স্বয়ম্ভু কিছুক্ষণের বিরতির পর বলে, ‘আর সেই ছেলেটা, যার জন্য শ্রীদেবীর গর্ভে সন্তান এসেছিল। তার নাম প্রিয়াংশু। শ্রীদেবীর সন্তানের বাবা। যদিও প্রিয়াংশুর বয়ান অনুযায়ী উনি জানেন না মেয়েটা তার বেঁচে আছে না মরে গেছে। তাই তো প্রিয়াংশুবাবু?’ এতক্ষণ মুখের ওপর হাত চাপা দিয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রিয়াংশু। স্বয়ম্ভুর প্রশ্নের উত্তর দিতে মুখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নেয়। কিন্তু নীরব থাকে। স্বয়ম্ভু হাসে। ‘এরপর এই গল্পটার প্রথমার্ধের শেষ অংশটায় আসি। যেটা আমি নয়। নিজের মুখে বলবে শ্রীকুমার। কী তিরুভাই, আর তো লুকোবার কোনও জায়গা নেই বুঝতেই পারছ। এবার বাকিটা অন্তত তুমি বলো ৷

চোখের জল মুছে বলতে শুরু করল তিরু, ‘দিদিকে দাহ করার পর শ্মশানে বসেই তপাদা আমায় বলে এর প্রতিশোধ নেবার কথা। আমি এক কথায় রাজি হয়ে যাই। কিন্তু আমরা দুজনেই বুঝতে পারি না ঠিক কীভাবে প্রতিশোধ নেব। তপাদাই বলে আমায়, ওই চারটে মেয়ে আর প্রিয়াংশুর ওপর আমাদের নজর রাখতে হবে। আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতেও হবে। নজর রাখার দায়িত্বটা আমি নিলাম। তপাদা এমনিতেই পড়াশুনায় ভালো ছিল। তাই ও লেখাপড়া চালিয়ে গেল। আমি পড়াশুনো ছাড়লাম। দিদির কাছ থেকে কয়েকজনের ঠিকানা আমি জেনেছিলাম। বাকিদেরটা জোগাড় করতে অসুবিধে হল না। আমি কোলকাতায় শিফট করলাম। তপাদার মায়ের নামে সুরিলেনের বাড়ি। সেখানেই থাকতে শুরু করলাম। দোকানে কাজ করতাম। মাঝেমধ্যে লুকিয়ে যাঁদের বাড়ি চিনতাম তাদের বাড়ির সামনে লক্ষ্য রাখতে শুরু করলাম। এই চারটে মেয়ের একে অপরের বাড়িতে যাতায়াত ছিলই। তাই যাদের বাড়ির ঠিকানা জানতাম না তাদের ফলো করে আমি চিনে নিয়েছিলাম সব। পাড়ার দোকানগুলোতে মাঝেমধ্যেই জিনিস কিনতে যেতাম। যাতে পরিচয় জমে ওঠে। গল্প করা যায়। নইলে ওদের খবর পাব না। ওদিকে তপাদা লেখাপড়া করতে শুরু করল পুলিশে চাকরি করবে বলে।’

-মানে তুমি খোচরের ট্রেনিং নিতে শুরু করলে আর ও নিজে পুলিশ হবার জন্য উঠেপড়ে লাগল? বেশ। তারপর?

গল্পের মাঝে সোজাসাপ্টাভাবে একটা লাইন যোগ করে দিল স্বয়স্তু ।

-এরপর হঠাৎ করেই একটা সুযোগ হাতে এসে যায়।

বলতে শুরু করল শ্রীকুমার, ‘খবর পাই অরুণা, দিয়া, সুস্মিতা আর মৃত্তিকা ডুয়ার্স বেড়াতে যাচ্ছে। তপাদাকে জানাই। তপাদা সঙ্গে সঙ্গে আমার টিকিট কেটে দেয়। ওদের পৌঁছোবার আগেই আমি পৌঁছে একটা হোটেলে উঠি। একদিন বাদে ওরা আসে। ওরা কোন হোটেলে উঠেছে সেটা জানতাম না। ওরা যখন গিয়েছিল তখন সবে সিজন শুরু হচ্ছে। খুব বেশি ভিড় ছিল না। তাই ওদের চারজনের খোঁজ পেতে অসুবিধে হল না।’

-কীভাবে পেলে? হোটেলে হোটেলে খোঁজ করলে?

-না। তাহলে ওরা জেনে যেত। ওরা ডুয়ার্স যখন গেছে তখন জঙ্গল ট্রেইল করবেই। আর তার জন্য ওদের লাটাগুড়ি টিকিট কাউন্টারে আসতেই হবে। ঠিক তাই হল। ওরা এল। ওদের ড্রাইভারের কাছ থেকে গল্প করে জেনে নিলাম ওরা কোথায় উঠেছে? আমিও চট করে আমার হোটেল বদলে নিলাম ।

-আর ঠিক সেইখানেই, সেই হোটেলেই রান্নার কাজ করত রামাইয়া। স্বয়ম্ভুর কথায় চমকে উঠল মিশ্রঠাকুর। কতদিন বাদে নামটা কানে এল তার।

-কী মিশ্রঠাকুর? নামটা খুব চেনা, কাছের মনে হল না?

মিশ্র চুপ। ‘ক্যারি অন শ্রীকুমার।’ স্বয়ম্ভু বলল।

সদ্য পড়া শীতের উষ্ণীষ গায়ে জড়িয়ে সন্ধে নেমেছিল জঙ্গলের রাজত্বে। বাইরে সমবেত ঝিঁঝিঁর ডাক। ঘরে সন্ধের চা আর পকোড়া দিয়ে গেছে। হোটেলের ঘরে পায়চারি করছে আর মোবাইলে কথা বলছে শ্রীকুমার। ‘ইচ্ছে করছে আজ রাতেই চারটেকে একদম শেষ করে দিই। তুমি যে কেন প্রিয়াংশুকে ছেড়ে রেখেছ জানি না। সবার আগে তো ওই জানোয়ারটাকে মারা উচিত। তারপর এই মেয়েগুলো।’ কথাটা শেষ করতে না করতেই বাইরে থেকে একটা হইচইয়ের শব্দ ভেসে এল। একটা মেয়ে চিৎকার করছে।

-তপাদা এখন রাখছি। বাইরে কীসের যেন ঝামেলা হচ্ছে।

ফোনটা কেটে দরজা খুলল শ্রীকুমার। গাছের আড়াল থেকে উঁকি দিল দিয়া আর অরুণা মাতাল অবস্থায় বেরিয়ে এসে বাওয়াল করছে। কথা শুনে মনে হল কোনও একটা বেড়াল ওদের দামী মদের বোতল ভেঙে দিয়েছে। হোটেলের ম্যানেজার হাত-পা নেড়ে অনেক কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছে। ওদের শান্ত করার চেষ্টা করছে। দিয়া আর অরুণা সেই এঁড়ে তর্ক করেই যাচ্ছে। শেষে ম্যানেজার গলা তুলল। বেশ রেগেই ডাকল, ‘এ রামাইয়া, রামাইয়া। বাহার আ।’ তড়বড় করতে করতে বেরিয়ে এল এক বিহারী মহিলা। ম্যানেজার ধমকাল। ‘নিজের বেড়ালকে সামলে রাখতে পারিস না যখন পুষিস কেন? টুরিস্টদের কত ক্ষতি করে দিয়েছে। এবার ক্ষতিপুরণ দেবে কে?’ মহিলাটি মাথায় ঘোমটা টেনে অসহায় মুখে দৌড়ে গেল৷ কিছুক্ষণ বাদে একটা বেড়াল বাচ্চা হাতে করে নিয়ে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে গেল। অরুণা হুমকি দিল ম্যানেজারকে, ‘আর একবার যদি বেড়ালটাকে এখানে দেখি না শেষ করে দেব একেবারে।’ নেশার চোটে টলে পড়েই যাচ্ছিল অরুণা। ম্যানেজার হাত দিয়ে সামলে নিল।

পরেরদিন রাত। সামনের ফাঁকা রাস্তাটায় একটু হাঁটতে বেরিয়েছিল শ্রীকুমার। ঠাণ্ডাটা প্রতিদিন বেশ লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। জ্যাকেটের হুডিটা মাথায় দিয়ে ঘরে ফিরছিল। হঠাৎ একটা গান শুনতে পায় সে। দাঁড়িয়ে পড়ে। নিজের ঘর টপকে ভিতর দিকে ঢুকে যায়। অরুণাদের কটেজ থেকেই গানের আওয়াজ আসছে। ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দমদমাদম’ গানটা গেয়েই চলেছে। কখনও একজন। কখনও সবাই মিলে। সঙ্গে একটা বেড়ালের গলার আওয়াজ। সন্দেহ হয় শ্রীকুমারের। চারবন্ধুর উল্লাস দেখলেই ওর শিরায় আগুন ছোটে। জানলাটা ভেজানোই ছিল। অল্প একটু ফাঁক করতেই চমকে ওঠে শ্রীকুমার। পকেট থেকে তৎক্ষণাৎ মোবাইলটা বের করে ভিডিয়ো রেকর্ডিং করতে থাকে। দেখতে দেখতে কান গরম হয়ে ওঠে। হাতও কাঁপতে থাকে। বেড়ালের আওয়াজটা বন্ধ হলে শ্রীকুমারও মোবাইলটা বন্ধ করে দৌড়ে নিজের ঘরে চলে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণ চুপ করে বিছানায় বসে রাগে দুঃখে ফুলতে থাকে। অবশেষে কেঁদে ফেলে।

সেদিন রাতে ঘুমোয় না শ্রীকুমার। ঘুম আসে না তার। ভোরের দিকে একটা ডাক শুনতে পায় সে। ‘আলোওওওওওক, এ আলোওওওক। কাঁহা গয়ে রে? আজা বেটা। আলোওওওওক!’ ঘর থেকে বেরিয়ে উঁকি দিল শ্রীকুমার। দেখল চোখ কচলাতে কচলাতে গ্রিন জাঙ্গল রিসর্টের ম্যানেজার বেরিয়ে এল। ভুরুর মাঝে এক রাশ বিরক্তি। গায়ের চাদরটা এক ঝাপটায় ডান কাঁধে ছুড়ে গলা তুলল, ‘আরে এ রামাইয়া! পাগল হয়ে গেলি নাকি? অভি ভি ট্যুরিস্ট লোগ সো রহে হ্যায় অউর তু…’। কথা শেষ করতে না দিয়েই বিহারী বউটা বলে উঠল, ‘দেখো না সুখেনদা, কাল শাম সে আলোক ঘর মে নেহি আয়ে। কব সে ঢুন্ড রাহা হুঁ! কৌন জানে কিসকে ঘর মে ছুপ কর ব্যাঠে হ্যায় বদমাশ।’

-কারও ঘরে থাকলে এতক্ষণে রিসর্টে হুজ্জোত বেঁধে যেত। সেটা যখন হয়নি তখন নিশ্চিন্ত থাক আশেপাশে কোথাও আছে। এখন ঘর যা। সময় মতো চলে আসিস 1

-উস দিনভি ইয়েহি বোলে থে না আপলোগ। আলোক আশপাশ আছে!

সবে শীতার্ত কুয়াশা আর জঙ্গলের অন্ধকার ভেদ করে কয়েক রেখা আলো এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ছিল। ঠিক তখনই রামাইয়ার গলাটা গুমরে ওঠা মেঘের মতো গুমগুম করে উঠল। সুখেন যেন একটু গুটিয়েই গেল। রামাইয়া ফিরসে গলা তোলে, ‘আলোওওওওক, এ আলোওওওওক, কাঁহা গয়ে রে। আজা আজা।’ এরপরেও বেশ কিছুক্ষণ রিসর্টের চারপাশে রামাইয়ার স্বর ভেসে বেড়াতে লাগল। রামাইয়ার সুর করে ডাকটা এক সময় রাস্তা পেরিয়ে পাশের জঙ্গলের ভিতর ঢুকে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সুখেন। জ্যাকেটটা গায়ে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্রীকুমার। রামাইয়াকে দূর থেকে ফলো করাটা খুব একটা অসুবিধে হল না। কারণ ওর গলাটা শুনতে পাচ্ছিল।

এক জায়গায় আটকে গেল রামাইয়া। গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল শ্রীকুমার। খুব সন্তর্পণে দুটো পা এগিয়ে গেল রামাইয়া। তারপরেই সারা জঙ্গল কেঁপে উঠল রামাইয়ার ভয়ার্ত আর্তনাদে। আগাছার ওপরেই লুটিয়ে পড়ল সে। শরীর, মস্তিস্ক বা চেতনা তাকে কাঁদবার সুযোগটুকুও দিল না। ছুটে গেল শ্রীকুমার। রামাইয়া অচেতন হয়ে পড়ে আছে। তার কিছু হাত দূরেই মদের বোতলের বাক্সের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আছে মাটির সাথে চেপ্টে মরে থাকা তুলতুলে সাদা বেড়াল ছানাটা। মুখটা হাঁ করা। খুদে খুদে দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়েছে যন্ত্রণায়। শ্রীকুমারও তাকাতে পারেনি আর।

আজকেই চেক আউট করবে চারটে মেয়ে। কথা ছিল আরও একদিন থাকার। হঠাৎ করে কেন এমন সিদ্ধান্ত বদল সেটা বুঝতে অসুবিধে হল না শ্রীকুমারের।

-আপনাদের আজকের রান্নাটা কিন্তু মোটেই আগের দুদিনের মতো হল না।

ম্যানেজার সুখেন বলল, ‘আসলে ম্যাডাম যে মেয়েটি আমাদের মেন রান্নাটা করে সে আজ আসেনি। সকাল থেকে ফোনটাও তুলছে না ৷

-এসব বাজে এক্সকিউজ। আপনাদের এত বড় হোটেল। এত এক্সপেনসিভ ঘর। সেখানে একজন মাত্র কুক? তার তো শরীর খারাপ হতেই পারে। আর কোনও ভালো অপশন রাখবেন না তা বলে?

সুখেন গলা তুলে রান্নাঘরের দিকে মুখ করে বলে উঠল, ‘এই বাপন রামাইয়াকে ফোন করেছিলি আর?’ রান্নাঘর থেকেই উত্তর এল, ‘করেছিলাম। বেজে গেল।’

-দয়াকে কল করে জিজ্ঞেস কর। ওর বউ এল না কেন? এভাবে হলে তো লোক পাল্টাতে হবে। ওদের জন্য আমায় কেন কথা শুনতে হবে? গলায় বেশ ঝাঁঝ নিয়ে কথাগুলো বলল সুখেন ।

টাকাপয়সা মিটিয়ে মেয়েগুলো টেবিল থেকে ব্যাগগুলো তুলতে গেল। দূরে আরেকটা টেবিলে বসে এক মনে খেয়ে চলা শ্রীকুমার জ্যাকেটের হুডিটাকে মাথায় তুলে দিল। রিসেপশনে সুখেনের কাছে রান্নাঘর থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এসে জানাল, দয়া লাটাগুড়িতে নেই। রাজাভাতখাওয়া গেছে কী একটা কাজে। মেয়েগুলো হেলতে-দুলতে, নাচতে-নাচতে বেরিয়ে গেল। গাড়ি ছাড়ার শব্দ হল। সুখেন বলল, ‘একবার কাউকে রামাইয়ার বাড়ি পাঠাত। দ্যাখ গিয়ে ছেলের শোকে আবার মুচ্ছো গেল কিনা! যত জ্বালা আমার ৷’

-বাপন গিয়ে ভয়ানক একটা খবর আনল। রামাইয়ার ঘরের দরজা খোলাই ছিল। ঢুকে দেখে মাটিতে দুটো বেড়াল ম্যাও ম্যাও করে ডেকেই চলেছে। আর সিলিং থেকে ঝুলছে রামাইয়ার মৃতদেহ।

-আপাতত তোমায় একটু পজ করছি শ্রীকুমার

স্বয়ম্ভু বলল। শ্রীকুমার চুপ করে গেল। ঠাকুরমশাই…’ ডাকল স্বয়ম্ভু। মিশ্রঠাকুর মুখ তুললেন ।

-এবার তো আপনার পালা। দয়া করে দয়াময় সান্যাল যেন আর কিছু না লুকোয়। কারণ তাতে লাভ নেই। বরং ক্ষতিই। আমিই বলতে পারি। কিন্তু মুশকিলটা হল আমি বললে একটা শোনা, প্রমাণ পাওয়া গল্প বলব । কিন্তু আপনি যদি আপনার গল্পটা বলেন তাহলে সেখানে আপনার অনুভূতিটাও বেরিয়ে আসবে। দয়াময় সান্যাল কী করে, কেন পঙ্কজ মিশ্র হল সে কথায় পরে আসছি। সবার আগে আপনার বয়ানটা শোনা যাক।

চশমা খুলে চোখের জল মুছলেন মিশ্রঠাকুর ওরফে দয়াময় সান্যাল। ‘রামাইয়া, আমার ভালোবাসা। আমার স্ত্রী।’ মিশ্রঠাকুর শুরু করলেন তার জীবনের গল্প বলা। ‘আমি বিহারী মেয়েকে বিয়ে করেছিলাম বলে আমার বাড়ি থেকে কেউ মেনে নেয়নি। বাবা ত্যাজ্য করেছিলেন। রামাইয়া আমার জীবনের লক্ষ্মী ছিল। ও আসার পরই আমার কনস্টেবলের চাকরি পাওয়া। লাটাগুড়িতে ট্রান্সফার হওয়া। নিজেদের সংসার বসাই। সুখের সংসার। রামাইয়ার হাতের রান্না ছিল অমৃতের মতো। বছর ঘুরতেই আমাদের একটা ছেলে হয়। নাম রাখি আলোক। ও আমাদের দুজনেরই নয়নের মণি। ছেলেটার পাঁচ বছর বয়স হয়। রামাইয়া চেয়েছিল ওর পাঁচ বছরের জন্মদিনটা বড় করে করতে। তাই হয়েছিল। ছেলেটা আমার সে কী খুশি! এত্ত গিফট পেয়ে ঘুমই উড়ে গেল তার। জন্মদিনের ঠিক দুদিন পর আমি সকালে কাজে বেরিয়ে যাই। লাস্ট এক বছর ধরে রামাইয়া লাটাগুড়ির গ্রিন জাঙ্গল রিসর্টে রান্নার কাজ করে। সুখেনই ডেকে নেয়। ওরও একটা কাজ হয়। সারাদিন বাড়িতে থাকতে ওরও আর ভালো লাগছিল না। ছেলেটাও বড় হচ্ছিল। খরচা বাড়ছিল। তাই রামাইয়াও কাজটা আনন্দ করেই করছিল। সেদিনও হোটেলে রান্নার কাজ করছিল রামাইয়া। ছুটির দিন ছিল বলে সঙ্গে করে ছেলেকে হোটেলেই নিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা সময়ে খেয়াল করে আলোক নেই। খুঁজতে শুরু করে। ম্যানেজার বলে কারও ঘরে ঢুকে বসে আছে দ্যাখ। কিন্তু ছেলেটাকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। এদিকে থানায় খবর আসে লাটাগুড়ি জঙ্গলের পাশে একটা লরি নাকি অ্যাক্সিডেন্ট করেছে। আমরা সবাই ছুটে যাই। গিয়ে দেখি…!’ গলা বুজে আসে মিশ্রঠাকুরের। ‘ছেলেটার ওপর দিয়ে লরির চাকা চলে গেছে। রক্তাক্ত থ্যাঁতলানো নরম শরীরটা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।’

রামাইয়াকে সামলানো যাচ্ছে না কিছুতেই। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তার ওপরেই আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে। দয়াময় জাপটে ধরে রাখার চেষ্টা করছে । কিন্তু গায়ের জোরে পিছলে ছেলের মৃতদেহের কাছে ছুটে যাচ্ছে বারবার। দয়াময়ও রামাইয়াকে বুকে জড়িয়ে ধরে হাপুস নয়নে কাঁদছে। এক সময় লাশটাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হল। রামাইয়া তখনও সাপের মতো এঁকেবেঁকে শরীরটাকে দুমড়েমুচড়ে দিচ্ছে আর নিজেকে দায়ী করে বিলাপ করে চলেছে। রামাইয়াকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল সবাই মিলে। ঠিক তখনই রামাইয়ার কানে ভেসে আসে আরও একটা কান্না। তাকিয়ে দেখে রাস্তার ওপরেই একটা বেড়ালের পিষে যাওয়া দেহ। তার সামনে বসে ছোট্ট একটা সাদা বেড়ালছানা মিউ মিউ করে কেঁদেই চলেছে। রামাইয়া দাঁড়িয়ে পড়ে। আঙুল দিয়ে বেড়ালটার দিকে দেখায়। পাশ থেকে একজন স্থানীয় লোক বলেন, ‘ওই লরিতে এ বেড়ালটাও চাপা পড়েছে। এই বাচ্চাটা বোধহয় ওরই।’ আরেকজন বলে ওঠেন, ‘ইসসস আহা রে! মাত্র কয়েকদিন আগেই হয়েছে বোধহয়।’ আরেকজন বলেন, ‘কে জানে, তোমার আলোক হয়তো এই বেড়ালটাকেই ধরবে বলে দৌড়োচ্ছিল। তারপর দুজনেই একসাথে…!’ ফুঁপিয়ে ওঠে রামাইয়া। হাত ছাড়িয়ে বেড়ালছানাটার দিকে এগিয়ে যায়। দয়াময় বলে ওঠে, ‘রামাইয়া, কী করছ? চলে এসো।’ বেড়ালছানাটাকে মৃত মায়ের পাশ থেকে কোলে তুলে নেয় রামাইয়া। আদর করে চুমু খেয়ে বলে, ‘মেরা আলোক। ‘

-তারপর থেকে ওই বেড়ালছানাটা নিয়েই ছেলের শোক ভুলেছিল রামাইয়া। ক’দিন বাদে কাজেও জয়েন করে। আমায় একটা বিশেষ কাজে রাজাভাতখাওয়ায় পাঠানো হয় দুদিনের জন্য। ওখানেই খবরটা পাই। ছুটে এসে দেখি রামাইয়ার নিথর শরীরটা বিছানায় শোয়ানো। টেবিলে হিন্দিতে লেখা একটা চিঠি। ‘ম্যায়নে ফিরসে আলোক কো খো দি। ম্যায় তুমহারা লকশমি নেহি। অলকশমি হুঁ। মুঝে ভুল যাও।’ আমি তখন কিছুই জানতাম না। রামাইয়াকে দাহ করে ফিরে নিজের ঘরে যখন একা বসে তখন আমার বাড়ি খুঁজে শ্রীকুমার আসে। ও ভিডিয়োটা দেখায় আমায়। রাগে আমার মাথায় আগুন জ্বলে যায়। রামাইয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমিও ওই ছোট্ট ছানাটাকে আলোক বলেই ডাকতাম। যখনই ডাকতাম উত্তর পেতাম, ম্যাও। মনে হত আমার আলোক বেটাই সাড়া দিচ্ছে। তাকেও ওরা বাঁচতে দিল না। কী নৃশংসভাবে মেরেছে বেড়ালের বাচ্চাটাকে। ওই চারটে মেয়ের জন্য আমি আমার লক্ষ্মীপ্রতিমার মতো স্ত্রীকে হারিয়েছি। শপথ নিই, আমি ওদের ছাড়ব না। কিছুতেই ছাড়ব না। আমার জীবনে তো হারাবার আর কিছু নেই। তাই ভয়ও করেনি।

মিশ্রকে থামিয়ে এবার স্বয়ম্ভূ বলতে শুরু করে। শ্রীকুমারও তার প্রতিশোধ নেবার কথা আপনাকে জানায়। তখন আপনি, শ্রীকুমার আর তপা মিলে প্ল্যান করেন ঠিক কীভাবে এগোবেন। কিন্তু নাম বদলের বুদ্ধিটা আপনাদের মধ্যে কার মাথায় আসে প্রথম?’ মিশ্রঠাকুর বলেন, ‘আমিই বলি । আমরা কেউ খুনি নই। কিন্তু ওই চারটে মেয়েকে আমরা খুন করতে চাই। হ্যাঁ, আমরা ওদের খুন করতেই চেয়েছি। কারণ আমি জানি, আমি আমার স্ত্রীয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছি, একটা অসহায় প্রাণের বলি হয়ে যাওয়ার প্রতিশোধ নিচ্ছি, একটা সহজ সরল মেয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিচ্ছি।’ কথাগুলো বলতে বলতে রাগে কাঁপতে থাকেন মিশ্রঠাকুর। ‘আমার পুলিশের ট্রেনিং নেওয়া আছে। তপাকে আমিই যাবতীয় হেল্প করেছি। বেশ করেছি। কাজটা যাতে বাধা ও প্রমাণহীনভাবে করতে পারি তার জন্যে নামবদলের খেলাটা আমিই শুরু করি।’

-খেলাটা ভালোই ছিল। শুধু নাম বদলই নয়, নিজেদের মধ্যে নামের অদলবদলও করলেন। যাতে পুলিশ যদি কখনও খোঁজ নিতে শিকড়ে পৌঁছে যায় তাহলে যেন তারাও ঘেঁটে ঘুঘনি হয়ে যায়।

শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, ‘এত বছর সময় লাগল আপনাদের প্রতিশোধ নিতে?” স্বয়ম্ভু বলল, ‘নাম বদল কী আর একদিনে হয় শিবাঙ্গী? ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে সবকিছু পালটানো তারপর একটা এলাকায় বাস করে লোকের বিশ্বাস অর্জন করা, স্থানীয় বাসিন্দা হয়ে ওঠা। যাতে বিশ্বাসযোগ্যতাটা আরও বাড়ে। এর ভেতরেও রহস্য আছে। সেখানে পরে আসছি। তার আগে সেই ভয়ানক ভিডিয়োটা দেখে নিই একবার ।

মৃত্তিকা চিৎকার করে ওঠে, ‘নাআআআআ, প্লিজ না।’ দীপায়ন বলে, ‘প্লিজ স্বয়ম্ভুবাবু, ওই ভয়ানক ভিডিয়োটা আপনি চালাবেন না।’

-আপনি যেটা ভাবছেন এটা সেই ভিডিয়ো নয় দীপায়নবাবু। এটা এমন একটা ভিডিয়ো যেটা খুনি সুস্মিতাকেও পাঠিয়েছিল। সুস্মিতা ভয় পেয়ে সেটা নিজেই ডিলিট করে। দুবার ট্রাই করেও সেটা রিট্রিভ করা যায়নি সম্ভবত এই ভিডিয়োটাই দিয়াকেও সেন্ড করা হয়েছিল। অবশেষে গতকাল রাতে খুনি আমাদের সেই ভিডিয়ো দেখার সুযোগ করে দেয় মৃত্তিকার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে।

মৃত্তিকা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। মৃত্তিকার হোয়াটসঅ্যাপে কী ভিডিয়ো এসেছে সেটা ওঁরা জানলেন কোত্থেকে? মনের কথা পড়তে পেরে স্বয়ম্ভু বলল, “সরি মৃত্তিকা, সুস্মিতার খুনের পর থেকেই আমরা আপনার মেল, হোয়াটসঅ্যাপ সব হ্যাক করেছিলাম। ফোন কলও ট্যাপ করা ছিল। নইলে আজ আপনাকে বাঁচাতে পারতাম না। এবার ভিডিয়োটা চালানো যাক।’

বড় স্ক্রিনে চলতে শুরু করল শ্রীকুমারের মোবাইলে রেকর্ড করা ভিডিয়োটা। চারটে মাতাল মেয়ে দিয়া, অরুণা, সুস্মিতা আর মৃত্তিকা গোল করে ঘুরে ঘুরে নাচছে। প্রথমে দিয়া গাইছে, ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে….’ তারপর বাকিরা সমবেত স্বরে বলছে, ‘দমদমাদম’। আবার পরের লাইনটা একইভাবে। না, এই দৃশ্যে মেয়েদের হাতে মদের বোতল ছাড়া আর কিছু নেই। যা কিছু সর্বনাশ হয়ে চলেছে সেটা তাদের পায়ের নীচে। একটা ছোট্ট তুলতুলে সাদা বেড়ালছানা। গানের তালে নাচের ছন্দে চারবন্ধু এক এক করে ছানাটাকে মাড়িয়ে চলে যাচ্ছে। বেড়ালছানাটা কেঁদে উঠে পালাতে চাইছে বলে অরুণা গোড়ালি দিয়ে মারল ছোট্ট ছানাটার পিছনের কচি পায়ে। মিউউউ করে যন্ত্রণায় কেঁদে উঠল। কচি পা-টা ভেঙে মাটির সঙ্গে মিশে গেল। আর টানতে পারছে না নিজেকে। তাও চেষ্টা করছে। মৃত্তিকার ভারী পা এসে বেড়ালছানাটার ঘাড়ের কাছে ধপ করে লাফিয়ে উঠল। ঘাড় ভেঙে গেল কিনা বোঝা গেল না। বাচ্চাটা আবার কোঁকিয়ে উঠল৷ মাকে ডাকল বোধহয়! চারবন্ধু উত্তাল আনন্দে নারকীয় উল্লাসে নেচে চলেছে। দিয়ার পায়ের আঘাতে পিছনের আরেকটি পাও মুচড়ে গেল ছানাটার। প্রচণ্ড ব্যথায় চিৎকার করে নুইয়ে পড়ল। মা তুমি কোথায়? এরা যে আমায় বাঁচতে দিল না মা! চারটি মেয়ের সাধ আর মেটে না। গানের লয় বাড়িয়ে দিল। সঙ্গে বেড়ে গেল মৃতপ্রায় বেড়ালছানাটার পিঠের ওপর উঠে নাচানাচির ধুম। কথায় বলে বেড়ালের কান্না ভীষণ অশুভ। তাকে বেশিক্ষণ কাঁদতে দেওয়া যায় না। তাই দিয়া, অরুণা মুতিা তিনজনে একবার করে সাদা ছানাটার পিঠে জোড়া পায়ে লাফিয়ে উঠে ডিঙি মেরে টুইস্ট করতে থাকে। ছোট্ট শরীরটার ভিতর নাড়িভুঁড়ি যা যা ছিল সবই মাটির সঙ্গে পিষে গেল । বেড়ালছানাটা শেষবারের মতো তার মাকে ডেকে উঠল। মুখটা হাঁ হয়ে ক্ষুদে ক্ষুদে দাঁতগুলো বেরিয়ে এল। তারপরেও লাফালাফি চলল। কিন্তু বেড়ালটা আর ডাকল না যখন তখন বন্ধ হল চারবন্ধুর উল্লাস। মদের বোতল হাতে নিয়ে হো হো করে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ল তারা। ভিডিয়োটা এখানেই শেষ।

-ছিঃ মৃত্তিকা ছিঃ। তুমি না মা? তোমরা এইভাবে একটা অবলা প্রাণীকে… দীপায়নের তিরষ্কার বজ্রপাতের মতো আছড়ে পড়ল মৃত্তিকার মাথায়। ‘আমার ঘেন্না করছে তোমায়। তোমার মা হওয়ার কোনও যোগ্যতাই নেই।’ মৃত্তিকা কাঁদতে কাঁদতে দীপায়নের হাত চেপে ধরল, ‘আমি অন্যায় করেছি। মানছি। কিন্তু আমরা সবাই নেশার ঘোরে ছিলাম।’

-শাট আপ। শাক দিয়ে মাছ ঢাকছ? কাল যদি আমি নেশা করে এসে তোমায় খুন করি তাহলে সেটা দোষ নয়? আইন ছেড়ে দেবে আমায়? লোকে ভুলে যাবে সব। ছিঃ! আমার ঘেন্না করছে তোমার পাশে বসতে।’ দীপায়ন সরে যায় মৃত্তিকার পাশ থেকে । মৃত্তিকা কান্নায় ভেঙে পড়ে। তার পাশে এসে সান্ত্বনা দেবার মত কেউ নেই। মুখ দেখাবার উপায়ও নেই ।

-দীপায়নবাবু, মানুষই ভুল করে আবার মানুষই সেটা শুধরে নেয়। সুস্মিতার মনেও এটা নিয়ে যথেষ্ট অনুশোচনা ছিল আশা করি। নইলে যে মেয়েটা এইভাবে একটা বেড়ালছানাকে মারতে পারে সে নিজে কেন বেড়াল পুষবে?

স্বয়ম্ভুর কথার রেশ ধরেই প্রিয়াংশু বলে ওঠে, ‘আজ আমারও তাই মনে হচ্ছে স্বয়ম্ভুবাবু। ও হঠাৎ করেই বেড়াল পোষার জন্য পাগল হয়ে উঠেছিল। আমি বলেছিলাম কুকুর পোষো। কিন্তু ও বেড়ালটাই চেয়েছিল।’

-আসলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ম্যাচিওরিটি আসে। ভাবনা চিন্তার বদল ঘটে। মানুষ আরও সহনশীল হয়। অরুণার মধ্যেও পরিবর্তন এসেছিল কিন্তু সেটা অন্য কারণে। আজ এসে মনে হচ্ছে সেই কারণটাও ম্যান মেড। শেষ কথাটা মিশ্রঠাকুর আর তিরুর দিকে তাকিয়ে বলল স্বয়ম্ভু।

দুজনেই সেই ইঙ্গিত বুঝে চোখ সরিয়ে নিল।

-অভিনব নিয়ে এস।

স্বয়ম্ভুর হুকুম হওয়া মাত্রই অভিনব আদেশ পালন করল। গালভর্তি দাড়ি, মুখে মাস্ক, পরনে পুলিশের খাঁকি পোশাক। চোখে কালো চশমা ৷ লোকটা এসে দাঁড়াতেই স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করে, ‘মীনাক্ষী দেখো তো চিনতে পারো কিনা।’ দেখামাত্রই মীনাক্ষী আঁতকে ওঠে, ‘হ্যাঁ স্যার, এই এই তো। এই লোকটাই এসেছিল বুটিকে। ওর হাতে একটা কাটা দাগও আছে।’ স্বয়ম্ভু হাত উলটে সবাইকে দেখায়। বাঁহাতে সেলাইয়ের দাগ। স্বয়ম্ভু নিজের হাতে লোকটার নকল দাড়িগোঁফ, চশমা সব খুলে দেয়। পুলিশের কেউ কেউ চমকে যায়। কারণ সবাই এই রহস্য জানে না। বেরিয়ে আসে লোকটার আসল চেহারা। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে বলে স্বয়ম্ভু তার চিবুক ধরে ওপরের দিকে তুলে ধরে আর বলে, ‘এই আমার বিশ্বস্ত চালক তপন অধিকারী।’ শিবাঙ্গীর চোখে অপার বিস্ময়! কত প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে মনের মধ্যে। কিন্তু শিবাঙ্গীও প্রশ্ন করার শক্তি হারিয়েছে কিছুক্ষণের জন্য।

-মাথা নিচু কেন তপন? এত ভালো খেলা সাজিয়েছ! আমাদের বিশ্বাস নিয়ে একেবারে পাকাপোক্তভাবে খেলেছ। তোমায় প্রাইজ দেওয়া উচিত। বলেছিলাম না শিবাঙ্গী, সরষের মধ্যেই ভূত! 1

শিবাঙ্গী এখনও সবটা জানে না। অবশেষে মুখ থেকে শব্দ বের করে জিজ্ঞেস করল, ‘তপন! কীভাবে? মানে কেন?’

-আরে বাবা, তপনই তো তপা। পুরো নাম তপন অধিকারী। যদিও এটা পরিবর্তিত নাম। আসল নাম ত্রিদিব অধিকারী। সুপ্রভা অধিকারীর ছেলে। যে সুপ্রভা অধিকারীর বাড়িতে তার ভাইয়ের পরিচয়ে থাকেন মিশ্রঠাকুর ওরফে দয়াময় সান্যাল এবং তার পাতানো ভাগ্নে তিরু। যার আবার ভালো নাম ত্রিদিব মণ্ডল। এটাও তার পরিবর্তিত নাম। অর্থাৎ নিজেদের মধ্যেই এরা নামের আদানপ্রদান সেরেছেন যাতে প্রশাসনকে ধোঁকা দিতে পারেন। ওদের এই কাজটা করার জন্য এমন একটা বাড়ির দরকার ছিল যেখানে গুপ্তকক্ষ আছে। এমন একটা ঘর যেখান থেকে মানুষ মারার কোনও শব্দ পাবে না। আর উত্তর কোলকাতার বা মফস্বলের বেশ কিছু বাড়িতে এখনও আন্ডার গ্রাউন্ড রুম আছে। সুপ্রভা দেবীর বাড়ির গুপ্তকক্ষটা দারুণ। কেউ বুঝতেই পারবে না চট করে দেখে। সবাই ভাববে ওটা বাথরুমের তাক। আসলে পুরনো দিনের এমন একটা বাথরুমে এত বড় তাক থাকাটাই আশ্চর্যের লেগেছিল। কর্পোরেশন থেকে পাঠানো লোকের ছদ্মবেশে ওরা দুজন আমারই লোক ছিল মিশ্রঠাকুর। ওদের তোলা ছবি দেখেই আমি আপনার বাড়িতে হিসু করতে যাই। গিয়ে তাকটা ফাঁক করতেই দেখি একটা সিঁড়ি নেমে গেছে। এই গুপ্তকক্ষেই যে আপনাদের হত্যালীলা চলে সেটা নিশ্চিত হয়ে যাই। শুধু ঢুকতে পারি না ভেতরে। তাহলে আপনি আবার বাইরে দাঁড়িয়ে সন্দেহ করতেন। আমার জলঢালার শব্দ পেয়ে একটা ছায়া সেদিন বাথরুমের সামনে থেকে সরে যায়।’

স্বয়ম্ভুর চোখে চোখ রাখতে পারে না মিশ্র ।

-মৃত্যুর শব্দ যাতে বাইরে কোনওভাবেই না আসে তাই শ্রীকুমার মাঝরাতে মাঝে মাঝেই ড্রামস বাজাত। তাই তো শ্রীকুমার ।

উত্তর আসে না। তাও হাসে স্বয়ম্ভু। বলতে থাকে, ‘আর এই সব বুদ্ধির কারিগর ছিল তপা ওরফে তপন অধিকারী। মনে কর শিবাঙ্গী, কলেজস্ট্রিট থেকে আমরা যেদিন বৃষ্টির রাতে ফিরছিলাম, এগারোটা বেজে গিয়েছিল। তপনই কিন্তু আমাদের বলেছিল গাড়িটা ঘুরিয়ে সুরিলেনের মধ্যে দিয়ে শিয়ালদায় বেরোবে। কারণ সামনের রাস্তায় জ্যাম। আসলে জ্যাম নয় । তপন দুটো কাজ সরেজমিনে তদন্ত করতে চেয়েছিল। এক, দিয়ার অচৈতন্য শরীরটা আনা হয়েছে কিনা আর দুই, দীপায়নবাবু সময় মতো সুরিলেনে পৌঁছতে পেরেছিলেন কিনা!

-তার মানে সেদিন গাড়ি থেকে গাঁঠরি নয়। দিয়াকে নামানো হচ্ছিল মারবে বলে?

-রাইট ।

শিবাঙ্গী আফশোসে চোখ বন্ধ করে ফেলে। ‘সেদিন একবারের জন্যেও যদি আমরা নেমে দেখতাম স্যার!’

-নিয়তি । সবটাই নিয়তি। আচ্ছা দীপায়নবাবু, দিয়া যে রাতে খুন হয় সেই রাতে আপনি তো জোড়া গির্জার কাছে দাঁড়াননি। তাহলে মিথ্যে বলেছিলেন কেন? আর কেনই বা অত রাতে আপনি মিশ্রঠাকুরের বাড়ি গিয়েছিলেন?

মিথ্যে বলার জন্য দীপায়ন বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। কুণ্ঠিত কন্ঠে বলে, ‘বলা বারণ ছিল!’

-কার?

-মিশ্রঠাকুরই বারণ করেছিলেন। আমি যেদিন মিশ্রঠাকুরকে আমাদের বাড়ি আসতে বলি সেদিন উনি আসতে পারেননি। উনি যেদিন আসবেন বলেন সেদিন আবার আমি বাড়িতে থাকতে পারিনি। ওই যেদিন শিবাঙ্গী ম্যাডাম যান মৃত্তিকার সঙ্গে দেখা করতে সেদিনই উনি প্রথম আসেন । অন্নপ্রাশনের নানান কথা বলার ফাঁকে উনি হঠাৎ বলেন…

-তুমি কি কোনও কারণে খুব ভয় পেয়ে আছ মা?

অচেনা একটা লোক হঠাৎ করে মন পড়ে ফেলাতে চমকে যায় মৃত্তিকা। লুকোতে পারে না। ‘হ্যাঁ ঠাকুরমশাই। কেন জানি না মনে হচ্ছে কোনও বিপদ আসতে চলেছে। ‘

-ঠিকই মনে হচ্ছে মা। তোমার সামনে বিপদ আছে ।

-আপনি ভাগ্য বলতে পারেন?

মৃত্তিকা লাফিয়ে ওঠে। মিশ্র লাজুক হাসি ছড়িয়ে বলেন, ‘না না, অত বড় কেউ নই। তবে কিছু বুঝতে পারি।’

-আপনি কিছু একটা করুন না ঠাকুরমশাই। আমার একেক সময়ে পাগল-পাগল লাগছে।

-চিন্তা কোরো না। মেয়ের অন্নপ্রাশনের আগে তোমার বিপদ কাটানোর দরকার। তাই বিপদভঞ্জন পুজো দাও।

-সেটা কীভাবে কোথায় দেব?

-দিনক্ষণ একটু দেখতে হবে মা। আমি জানিয়ে দেব। তবে খুব শিগগিরিই হবে।

পরেরদিনই মৃত্তিকা ফোন করে ঠাকুরমশাইকে। ‘আপনি ফোন করেননি দেখে আমিই করলাম ঠাকুরমশাই। ওই পুজোটার ব্যাপারে যদি বলেন।’

-শোনো। গ্রহরাজের বিশেষ পুজো তো। এর কিছু নিয়ম আছে। অন্যথা হলে অনর্থ হবে।

-আপনি বলুন না, আমি সব মানব।

-পুজোটা তোমার আর তোমার স্বামীর নামে হবে। এই পুজোর নিয়ম হল, যাঁদের নামে পুজো হবে তাঁদের মধ্যে অন্তত একজনকে পুজোর সামগ্রী কিনে দক্ষিণা সমেত পুরোহিতের হাতে তুলে দিতে হবে। আর সেটা করতে হবে রাত্রি দ্বিতীয় প্রহরের শেষ লগ্নে। দ্বিতীয় প্রহর কখন জানো? –না ঠাকুরমশাই ।

-রাত এগারোটা থেকে বারোটার মধ্যে। আর এই সম্পূর্ণটা করতে হবে অত্যন্ত গোপনে।

দীপায়ন আরও বলতে থাকে, ‘আমি সেদিন রাতে পুজোর সামগ্রী তুলে দিতেই ঠাকুমশাইয়ের কাছে যাই। কারণ তার পরেরদিন ভোরবেলাতেই পুজোটা ছিল।’

-আর ফোন? ঠিক ওই সময়েই ওই লোকেশনেই সুইচড অফ হল?

-ঠাকুরমশাই আমায় ঘরে ডেকে নিয়ে যান। তারপর হাতের ঘড়ি, কোমরের বেল্ট সব খুলে বিছানায় রাখতে বলেন। এমনকি মোবাইলটাও । কারণ চামড়ার কোনও জিনিস অঙ্গে রাখা যাবে না।

-আপনার মোবাইল কী চামড়া দিয়ে তৈরি নাকি?

-না তা নয়। তবে বাইরের কোনও দ্রব্যই কাছে রাখা যাবে না। -বুঝলাম। তারপর?

-উনি আমায় নিয়ে পাশের ঘরে যান। ঠাকুরের সিংহাসনের সামনে দাঁড়াতে বলেন। তারপর মন্ত্র পড়ে আমার সারা গায়ে গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেন। এরপর উনি সব পুজোর জিনিসপত্র আমার হাত থেকে গ্রহণ করেন।

-আর এই ফাঁকে ঠাকুরমশাইয়ের সহযোদ্ধা তার আদরের ভাগ্নে তির আপনার মোবাইলটি সুইচড অফ করে দেন। যাতে লোকেশন ট্র্যাক করলে সুরিলেনের বাড়ির ঠিকানাটাই দেখায়। এখানে অনেকের মনে হতেই পারে এতে তো মিশ্রঠাকুর আর তিরুই ফেঁসে যাচ্ছে। লাভ কী হচ্ছে? কিন্তু না। এক্ষেত্রে বেশ গভীর একটা সাইকোলজিক্যাল প্ল্যান আছে। এই যে সুরিলেনের বাড়ির ওপর পুলিশের নজর পড়ল, এই বাড়িটাতে কারা থাকে? একেবারেই নিরীহ এক ঠাকুরমশাই। যে কিনা চারপাশে বলে বেড়াচ্ছেন, ভয়-ভয় মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই কথা রটিয়ে যে তিনি নাকি পুলিশের ভয়ে জড়োসড় হয়ে আছেন। দয়াময় সান্যাল পুলিশে চাকরি করতেন বলে এটা উনি খুব ভালো করেই জানেন অপরাধী যদি বুক ফুলিয়ে নিষ্পাপ মুখে অকুতভয় হয়ে ঘুরে বেড়ান তাহলে তার ওপরেই নজরটা বেশি থাকে। আর যে সব সময় সবার সামনে ভীত হয়ে ঘুরে বেড়ান নিজের অসহায়তা শোকেস করে তাহলে পুলিশের নজর তাদের প্রতি থাকলেও সেটা খুব কম। এক্ষেত্রে তার ভাগ্নেটি এই রটিয়ে বেড়াবার কাজটি করেছেন। শাড়ির দোকান থেকে পাড়া প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব সবাইকে বলে বেড়িয়েছেন যে তার মামার নাকি ঘুম হচ্ছে না। তিনি নাকি খাচ্ছেন না। সুগার প্রেশার বেড়ে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কারণ যে খুন হয়েছে সে সর্বশেষ তার সঙ্গেই কথা বলেছে আর এটা তিনি ভান করছেন পুলিশের কাছ থেকে লুকিয়ে যাবার। কিন্তু আদপে লুকোতে চাইছেন না। তাই পুরুতমশাইও কায়দা করে প্রথমদিনই আমাদের এইসব ভয়ের কারণ শুনিয়ে দিয়ে বলেছিলেন আমরা যেন পুলিশকে না বলি। তাহলে ব্যাপারটা দাঁড়াল কী, উনি নিজে মুখেই বললেন কিন্তু বললেন না। এতে ওনার নিষ্পাপ হওয়াটাই পোট্ৰে হল ৷ অথচ উনি ভালোই জানতেন যে আমরা পুলিশই। তাই প্রথম দেখাতেই অমন চমকে উঠেছিলেন। ভুল বলছি ঠাকুরমশাই?’

মিশ্রপুরোহিত নির্বাক। কোথায় কোনদিকে তাকাবেন বুঝতে পারছেন না। স্বয়ম্ভূ আবার বলতে শুরু করে, ‘তাহলে এখান থেকে বেঁচে গেল তপন। কারণ যেভাবে ওরা ছক সাজিয়েছে তাতে এই দুজনের পিছনে যে একজন তৃতীয় ব্যক্তি যে আছে সেটা বোঝা যেতেই পারে। যদি সেটা যায় তাহলে সেই তৃতীয় ব্যক্তিটি কে হবে? অনেক ভেবে মৃত্তিকার স্বামী দীপায়নকে বাছা হয়। এদিকে দীপায়ন আবার কলেজের প্রফেসর। সমাজে ভদ্র ভালোমানুষ বলেই পরিচিত। তাই চট করে দীপায়নের নামে অ্যালিগেশনও আনা যাবে না। আবারও পুলিশ ধন্দ্বে। অথচ মৃত্তিকার সুখের সংসারও ছারখার করে দেওয়া যাবে। আচ্ছা দীপায়নবাবু আপনার একটা পেনড্রাইভ হারিয়ে গেছে তো?

-বিশ্বাস করুন, ওটা আপনাদেরকে দিয়ে দেবার পর আমি বুঝতে পারি আমার ওইরকমই একটা পেনড্রাইভ ছিল যেটা মিসিং। কিন্তু আমি ভয়ে কিছু বলতে পারিনি। যদি আপনারা আমাকেই সন্দেহ করে বসেন।

-প্রথমে দেখে বুঝতে পারেননি?

-কী করে বুঝব? একইরকম তো অজস্র পেনড্রাইভ আছে। একই কোম্পানির। তাছাড়া আমার জিনিসে কেউ হাত দেয় না। মৃত্তিকাও না । তাহলে আমার পেনড্রাইভ ওভাবে বারান্দায় পড়ে থাকবে এটা অবিশ্বাস্য লেগেছিল ।

-বুঝলাম ৷

স্বয়ম্ভূ তরতর করে এগিয়ে যায় দীপার দিকে। দীপা অনেকক্ষণ বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে ভয়ে সিঁটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। স্বয়ম্ভু বাচ্চাটাকে দীপার কোল থেকে নিয়ে কপালে চুমু খায়। তারপর সোজা মৃত্তিকার কাছে নিয়ে গিয়ে বলে, ‘ধরুন তো।’

-না। ও আমার বাচ্চার গায়ে হাত দেবে না।

বাচ্চাকে কেড়ে নিতে আসে দীপায়ন। স্বয়ম্ভু প্রতিবাদ করে, ‘না দীপায়নবাবু। দুজন মায়ের কাছ থেকে তাদের সন্তানদের সরিয়ে দিয়ে যে ভুল মৃত্তিকারা করেছেন সেই একই ভুল আপনি করবেন না। মানুষ ভুল করলে তাকে শোধরাবার সুযোগটা দিতে হয়। আর আমার যতটুকু অভিজ্ঞতা তাতে স্পষ্ট বুঝতে পারছি এই মৃত্তিকা আর আগের মৃত্তিকার মধ্যে বিস্তর ফারাক। ওই কবিতাটা জানেন নিশ্চয়ই, বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। তাই বাচ্চাকে মায়ের কাছেই থাকতে দিন। নিন মৃত্তিকা ধরুন।’ কাঁদতে কাঁদতে অসীম কৃতজ্ঞতায় স্বয়ম্ভুর দিকে চেয়ে মেয়েটাকে কোলে তুলে নেয় মৃত্তিকা। স্বয়ম্ভু গলা নামিয়ে বলে, ‘সেদিন খুব ভালো একটা কথা বলেছিলেন। পাপ। যে পাপের তদন্ত হয় না। একটি বেড়ালের মৃত্যুর সত্যিই কোনও তদন্ত হয় না। শাস্তিও হয় না ।

এবার আবার সকলের মাঝখানে এসে দাঁড়ায় স্বয়ম্ভু। বলে, ‘দীপায়নবাবুর ওপর যাতে সহজেই সন্দেহ গিয়ে পড়ে সেই কারণেই তাঁর ব্যবহৃত পেনড্রাইভটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। কারণ পুলিশ আততায়ীরা যেহেতু পুলিশের কাজ সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল তাই তারা জানত যে পুলিশ ডিলিটেড ফাইল এখান থেকে উদ্ধার করবেই। আর সেটা উদ্ধার করলেই যার পেনড্রাইভ তার জিনিসপত্রই পাওয়া যাবে। হলও তাই। ডিলিটেড ফাইল থেকে দীপায়নবাবুর বিয়ের ছবি, মেয়ে হবার পর একসাথে সবাই মিলে একটা ছবি এবং দীপায়নবাবুর প্রকাশিতব্য উপন্যাসের পিডিএফ কপিটি পাওয়া যায়। সঙ্গে মৃত্তিকার ইউ এস জি রিপোর্ট। অতএব পুলিশের সন্দেহ খুব সহজেই দীপায়নবাবুর ওপর গিয়ে পড়ে। সবাই ভাবে আসল কালপ্রিট দীপায়ন চ্যাটার্জি। আমিও তার মধ্যে একজন। আমি ভাবি, যাতে দীপায়নের ওপর সন্দেহ না হয় তাই এই খুন করার ভিডিয়ো নিজের স্ত্রীকে দেখিয়ে ঘাবড়ে দিতে চেয়েছেন। পুলিশও ভুলভাল ভেবে তদন্ত করবে। আর ওদিকে আসল কালপ্রিট নিজেদের কাজ সাঙ্গ করে বেপাত্তা হয়ে যাবে।’ দীপায়নের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। ঘাম ভাঙছে শরীর থেকে। ‘

-সঙ্গে আরও একটি জিনিস সরানো হয়েছিল। দীপায়নবাবুর প্রকাশিতব্য উপন্যাসের চারটি পাতা। যেখানে দীপায়নবাবুর হাতের লেখায় নীল কালিতে প্রুফ দেখা হয়েছিল।

-আমার উপন্যাসের কথা আপনি জানলেন কী করে? ওটা তো এখনও বেরোইনি ৷

দীপায়ন প্রশ্ন করল। স্বয়ম্ভু দুটো ভুরু তুলে বলল, “ওইজন্যেই তো বললাম প্রকাশিতব্য। আর গোয়েন্দারা এইটুকু জানবে না?”

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল, ‘কিন্তু খুনি কী করে সরাল? কখন বাড়িতে ঢুকল?’

-খুনি কেন ঢুকবে? তার সহকারী ঢুকবে। কী দীপা দেবী? তাই তো? ঝট করে কথাগুলো ক্ষীপ্র বাঘের মতো আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল দীপার ওপর। ঘাবড়ে গিয়ে তুতলে উঠল সে। ‘মা… মানে? আমি কী করে জানব?

-আপনার স্বামীর নাম কী দীপা দেবী? কবে থেকে আয়ার কাজ করছেন?

-আমি… মানে অনেকদিন হল। মনে নেই ।

-স্বামীর নামও মনে নেই?

দীপা একদম চুপ। যতই হোক মেয়ে তো। স্বামীর নাম কী করে ভুল বলবে?

-ও বুঝেছি। হিন্দু নারীরা স্বামীর নাম মুখে আনেন না। তার ওপর তিনি যদি আপনার মত পতিব্রতা নারী হন। আমি বলে দিচ্ছি, আপনার স্বামীর নাম ত্রিদিব ওরফে তপন অধিকারী। কিন্তু আপনি বাপের বাড়ির পদবীই ব্যবহার করেন নিজেকে লুকিয়ে রাখতে। দীপা দেবনাথ। আর আপনি এই প্রথম আয়ার কাজ করেন। আপনার নামটা সেন্টারে এন্ট্রি করতে তপনই সাহায্য করে। যতই হোক পুলিশে চাকরি করেন আপনার স্বামী।

দীপা কেঁদে ফেলে। আঁচলে মুখ ঢেকে নেয়। মৃত্তিকা আর দীপায়নের চোখের সামনে বিশ্বব্রহ্মাণ্ড দুলে উঠছে। আর কী কী রহস্যের উন্মোচন হতে চলেছে সেটা একমাত্র ঈশ্বরই জানেন। শিবাঙ্গী বলে, ‘তার মানে স্যার তপনই মুখে মাস্ক দিয়ে ওই বড় জাঁতি তৈরি করাতে গিয়েছিল?’

-একদমই তাই। গায়ে রেনকোট, মুখে মাস্ক। তার ওপর এত নিখুঁত অভিনেতা যে দীপায়নের চোখের নীচের আঁচিল আছে সেটা যাতে কামারশালার লোকে নোটিস করে সেটার জন্য বারবার চুলকেছে। শুনলে না লোকটা বলল সেদিন। মুখে মাস্ক দিয়ে গেছে বলেই প্রথম চোটে লোকটা চিনতে পারেনি। তাই ঘটা করে দীপায়নের নাম বলেছে তপন। তার ওপর আঁচিল। ব্যস! কেল্লাফতে। আর ওই জাঁতিটা দীপায়নবাবুরই বইয়ের প্রুফ দিয়ে ভালো করে র‍্যাপ করে বস্তায় পুরে নেয়। অরুণাকে খুন করে খুনি শুধু লাশটাই পার্কসার্কাসের লাইনের ধারে ফেলেনি। ইচ্ছে করেই প্রুফের কাগজটাও ফেলে রেখেছিল। চোখে না পড়লে না পড়ল। যদি পড়ে যায় তাহলে পুলিশ খোঁজ করে ঠিক প্রকাশনায় পৌঁছে যাবে। পুরো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির ছবি। নিখুঁত দৃশ্য এঁকেছে। যত দূর যা এভিডেন্স পেয়েছি তাতে টোটাল চারটে পাতা সরিয়েছিল। একটি অরুণার বড়ির পাশে লাইনের ধারে, বাকি তিনটে সুরিলেনের বাড়ির আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে উদ্ধার করি। আর একটি আমরা সরিয়েছিলাম হিসেব মেলাবার জন্য। যেটা দীপায়নবাবুর বাড়িতে সার্চ করতে করতে ওনার পড়ার টেবিলের ওপর পাই। জিজ্ঞেস করছিলে না শিবাঙ্গী, এতদিন বাদে এসব কেন? এই যে বিপুল প্ল্যান,

তার মধ্যে পুলিশের চাকরি পাওয়া, শ্রীকুমার আর দয়াময় সান্যালের নতুন নামের এস্ট্যাবলিশমেন্ট সবকিছু করতে গিয়েই এতগুলো বছর কেটে গেল । শুধু তাই নয়, ওরা বোধহয় অপেক্ষা করছিল এই পাঁচজনের সুখের সময় আসার। যখন সবাই সুখী হবার পথে, জীবনে স্থিতি আসছে ঠিক সেই সময় ঝড়ের মতো এসে সবকিছু তোলপাড় করে দেবে। এটাই ওদের মোটো ছিল। শ্রীকুমার খুঁজছিল এই চারবন্ধুর করা আরও কোনও অঘটন যেটা ওদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়। সেটা ডুয়ার্সে গিয়েই পেয়ে যায়। যদিও এসব আমার অ্যাসাম্পশন। ভুল হলেও এই কেসে কিচ্ছু যায় আসে না ।

তপনের মুখের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় স্বয়ম্ভু। সোজাসুজি তাকিয়ে বলে, ‘চন্দ্রকোণায় সরযু দেবীর ছেলের কাছে শ্রীদেবী, শ্রীকুমার আর তপার ছবি না থাকলে এই ঘটনা হয়তো আরও দীর্ঘায়িত হত। শ্রীদেবী কোলকাতায় চলে যাবার আগে তোলা হয়েছিল ছবিটা। ভাগ্যিস। নইলে সরষের মধ্যেই যে ভূত সেটা তো জানতামই না। আমরা গাড়িতে বসেই কত কিছু আলোচনা করেছি। আমাদের প্রত্যেকের বাড়ি তপন চেনে। এমনকি আমার বাড়িতে ঢুকেছে, খেয়েছে। তাই আমার বাড়িতে এসে ফুলের স্তবক দিয়ে যাওয়া বা অরুণার পায়ের কাটা আঙুল গিফট করা কিংবা আমার মাকে মেরে মাথা ফাটিয়ে তার গলায় দিয়ার পায়ের কাটা আঙুলের মালা পরিয়ে দিয়ে যাওয়া এত সহজ হয়েছে। এমনকি শিবাঙ্গীর বাড়িতে লাশ ফেলতেও কোনও বেগ পেতে হয়নি। খুব সুন্দর সাজিয়েছ তপন। আমি মুগ্ধ হয়ে গেছি তোমার কাজ দেখে।’ তপন নিরুত্তর। মাথা নিচু। স্বয়ম্ভূ আরও বলে, ‘শ্রীকুমারকে দিয়ে সব সময় নজর রাখিয়েছ কে কীরকম আছে। কার জীবনে কী ঘটছে। অরুণা যখন সেটল করল তখন আবির্ভাব হল তর্পণা ম্যাডামের।’ স্বয়ম্ভুর মুখটা ঘুরে গেল তর্পণার দিকে। এগিয়ে গেল এক পা দু-পা করে। বলতে থাকল রহস্যের কথকতা। ‘আচ্ছা তর্পণা ম্যাডাম, আপনি দুম করে আই আই জে টি-র চাকরিটা ছাড়লেন কেন?” চমকে উঠলেন তর্পণা। ‘কে বলল আপনাকে?’

-গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন কীভাবে তার খবর জোগাড় করেছে সেটা তো আপনাকে জানাতে বাধ্য নয় মিসেস তৰ্পণা মিত্র মণ্ডল।

নাম আর পদবী বেশ ভেঙে ভেঙে বলল স্বয়ম্ভু। তর্পণা নিজেরই অজান্তে ক্ষণিকের জন্য ঈষৎ বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ফেলেছিলেন। ঠিক সেই সময়েই স্বয়স্তুর চোখের মণি খুব দ্রুততার সঙ্গে মেপে নেয় তিরু ওরফে শ্রীকুমারের মুখের অভিব্যক্তি। তারও একই অবস্থা। যদিও তর্পণা সঙ্গে সঙ্গে ভোলবদল করেন। যেটা সে এতকাল করে এসেছেন। স্বয়ম্ভূ তর্পণার উত্তরের অপেক্ষা না করে বলে, ‘এতদিন আপনাকে অনেক সময় দিয়েছি। আর দেওয়া সম্ভব নয়। রাত ক্রমে বেড়েই চলেছে। আমি বলছি আপনি শুনুন। আপনি হার্ডওয়্যার নেটওয়ার্কিং, আই টির অ্যাডভান্স কোর্স সবকিছু করেছেন। এবং যথেষ্ট ভালো র‍্যাঙ্ক করেছিলেন। জয়েন করেছিলেন আই আই জে টি-র মতো কম্পিউটার এডুকেশনাল ইন্সস্টিটিউশনে। সুনামের সঙ্গে পড়াচ্ছিলেন। সেখানেই একদিন শিক্ষার্থী হিসেবে যান শ্রীকুমার মণ্ডল। আপনারই ছাত্র ছিল শ্রীকুমার। এইসব এডুকেশনে ছাত্রকে যে বয়সে ছোট হতে হবে এমনটা মোটেও নয়। আপনারা একই বয়সী। সাধারণ মানের ছাত্র শ্রীকুমার ক’দিনের মধ্যেই বুঝতে পারে যে এসব পড়া তার কম্ম নয়। কিন্তু কিছু করার নেই। তপাদা ওকে ভর্তি করিয়েছে। এমনকি সেখানে শ্রীকুমারের অভিভাবক হিসেবে তপনের সইও আছে। লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে এথিক্যাল হ্যাকিং থেকে শুরু করে অনেক কিছুই শিখতে হবে। কিন্তু শ্রীকুমার ফেল করছে। তাহলে কী তপার সব পয়সা, প্রচেষ্টা জলে? উঁহু! শ্রীকুমার সাধারণ মানের ছাত্র হতে পারে। কিন্তু অসাধারণ বুদ্ধি তার। দেখতেও মন্দ না। বেশ একটা আলুথালু রোমিও ভাব আছে। তাই টিচারকে পটাতে বেশি সময় লাগেনি তার। তর্পণাও প্রেমের জালে ফেঁসে যায়। কে জানে? হয়তো জীবনের দুঃখ কষ্টের গল্প, শ্রীকুমারের দিদির ট্র্যাজিক কাহিনি শুনে তর্পণার মনটা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। তড়িঘড়ি ওরা বিয়ে করে নেয়। কিন্তু গোপনে জাস্ট রেজিস্ট্রি। যুক্তি ছিল একটাই, তর্পণার অসুস্থ মাকে শান্তি দিতে এই বিয়ে। তাই লোকজনকে ডাকা সম্ভব হয়নি। মা তো জেনে গেলেন যে মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এরপর শ্রীকুমার ইন্সটিটিউশন ছাড়ে। তর্পণাও জব ছাড়েন। কারণ ততদিনে শ্রীকুমার তর্পণাকে জানিয়ে দিয়েছে তার জীবনের উদ্দেশ্য। তর্পণা স্বামীকে সঙ্গ নাও দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি দিলেন। তিনিও ভালোবেসে অন্ধ হয়ে গেলেন। তার ওপর তপা পুলিশে কাজ ক’রে সে যখন ওদের পাশে আছে তখন ভয়ের খুব একটা কিছু নেই। তাছাড়া শ্রীকুমার নিজে হাতে তো কিছু করছে না। করবে অন্য লোকে। ও শুধু খবর দেবে। যোগাযোগ ঘটিয়ে দেবে। বাজার করে এনে দেবে আর বাড়িতে বসে রেঁধেবেড়ে খাবে অন্য লোক। আবারও তপার প্ল্যান অনুযায়ী আলাদা হল তর্পণা আর শ্রীকুমার। তর্পণা অবিবাহিত হয়েই রইল তার ফ্ল্যাটে। আজ থেকে মাত্র আড়াই বছর আগে ফুলের দোকান খুলল। ওদিকে শ্রীকুমার প্রথমে একটা প্রকাশনীতে কাজ নিল। সেখানে বছর দেড়েক করে শাড়ির দোকানে কাজ নিল। কাকতালীয়ভাবে যে পাবলিশারের কাছে শ্রীকুমার কাজ করত সেখানেই গিয়েছিলেন দীপায়নবাবু। মৃত্তিকা এবং তার স্বামীকে চিনত শ্রীকুমার। কিন্তু দীপায়নকে চাক্ষুষ করে প্রথম ওই পাবলিশারের কাছে। শ্রীকুমার তপাকে জানায়। তপা ভাবে শিকারি এবং শিকার একই জায়গায় কাজ করলে কোনও না কোনওদিন পুলিশ ঠিক ধরে ফেলবে। পুলিশের কাজটাও সহজ হয়ে যাবে। তাই তপাই শাড়ির দোকানে ব্যবস্থা করে দেয় শ্রীকুমারের কাজের। যদিও একটু ঘুরপথে। শাড়ির দোকানের পাশের গলিতেই একটা কার্ডের দোকান ছিল। সেই দোকানের মালিকের চেনা ছিল তপন। সেই লোকটিই শাড়ির দোকানের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। মনে আছে দীপায়নবাবু, আপনারা যেদিন মেয়ের অন্নপ্রাশনের জন্য আপনার স্ত্রীর শাড়ি কিনতে গেছিলেন তখন সেখান থেকেই আপনাকে পাশের একটা কার্ডের দোকানের রেফারেন্স দেওয়া হয়।’

দীপায়ন একটু হতবাকই হয়ে যায়। মনে করতে সময় লাগে না বিশেষ। ‘হ্যাঁ হ্যাঁ মনে পড়েছে। একজন বয়স্ক মানুষ ছিলেন যিনি আমাকে মিশ্রঠাকুরের সন্ধান দেন ।

-কারেক্ট। চারপাশে এত ঠাকুরমশাই থাকতে উনি কেন মিশ্রঠাকুরের কথাই বললেন বলুন তো? নিশ্চয়ই কেউ চুপিচুপি গিয়ে ওনাকে বলে দিয়েছিল কথাগুলো বলার জন্য। তাই উনি আগবাড়িয়ে এই কথা বলেন। কী শ্রীকুমার? তাই তো? এক বাক্স মিষ্টিও খাইয়ে এসেছিলে দিয়ার মৃত্যুর পরের দিন।’

শ্রীকুমার চুপ। শুধু চোখের পাতাটা চঞ্চল হয়ে উঠল।

-তুমি আমায় দেখোনি। কিন্তু আমি তোমাকে দেখেছিলাম। সেই সময় আমি কয়েকটা পাবলিকেশনে নিজে খোঁজ নিতে কলেজস্ট্রিট গিয়েছিলাম মৃত্তিকার বাড়ি থেকে ঘুরে। ওই কার্ডের দোকানের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিলাম আমি। ওই বয়ষ্ক মানুষটা যখনই তোমার কাছ থেকে মিশ্রঠাকুরের ফোন নম্বর চান তখনই নিশ্চিত হই তুমিই তার সেই ভাগ্নে। আর তুমিই কোনওভাবে লোকটাকে বলো যে মৃত্তিকা ও দীপায়নদের যেন তোমার মামার কথা বলা হয়। আর তর্পণা আপনি জানতে চাইছিলেন না, আমি কীভাবে জানলাম আপনার কীর্তিকলাপ? গতকাল রাতে আপনি যদি মৃত্তিকাকে বেড়ালের ম্যাও ডাক আর গান শোনাবার জন্য ফোন না করতেন তাহলে আমরা হাতেনাতে ধরতে পারতাম না আপনাকে। লালবাজারের সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট আপনার কল চলাকালীনই আসল আই পি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে ফেলে। আর সেই আই পির লোকেশন আপনার ফ্ল্যাটের ঠিকানা। অরুণার মৃত্যুর পর থেকে লালবাজারের সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট একটা রাতও ঘুমোয়নি। শুধু অদৃশ্য বেড়ালটাকে ধরবে বলে।’

আর চুপ থাকতে পারে না শিবাঙ্গী! প্রবল উত্তেজনায় বলে ওঠে, “তার মানে ঝুলির মধ্যে লুকিয়ে থাকা বেড়ালটা তৰ্পণা?”

স্বয়ম্ভুর মুখে আবার সেই হাসি। মৃত্তিকা, প্রিয়াংশু, দীপায়ন প্রবল আক্রোশে পারলে তৰ্পণাকে গিলেই নেবে।

-বারবার ভিপিএন নম্বর পাল্টে, নতুন নতুন আই পি অ্যাড্রেস ধরে নানান দেশ বিদেশ থেকে ফোন করতেন তর্পণা। সবই করলেন, শুধু গোয়েন্দাদের গাধা ভেবে সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসলেন। লালবাজারে যাঁরা বসে থাকেন তাঁরা কী বসে বসে ঘাস কাটেন বলে মনে হয়?’

এবার অভিনবর কৌতূহল, ‘কিন্তু স্যার তর্পণা ম্যাডাম যে আই আই জে টিতে পড়াতেন সেটা কী করে জানলেন?’ স্বয়ম্ভু মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ‘একটা অডিয়ো রেকর্ডিং শুনে। ইলেক্ট্রিশিয়ান ভাই…।’ পাতলা ছেলেটা দৌড়ে এল। স্বয়ম্ভূ হাত বাড়িয়ে একটা পেনড্রাইভ দিয়ে চালিয়ে দিতে বলল। ছেলেটি বড় স্ক্রিনের সঙ্গে লাগানো সাউন্ড বক্সে পেনড্রাইভটা লাগিয়ে দিল। একটা ফোন বাজার শব্দ হল। তারপরেই একটা মেয়ের গলা বেশ নেকিয়ে বলে উঠল, ‘হ্যাঁ নন্দিনী বলো।’ উল্টোদিক থেকে একটা ছেলের হাসি। ছেলেটি বলল, ‘ফাজলামো রাখো। জরুরি কথা আছে।’ মেয়েটির গলায় অভিমান, ‘আমরা তো সবসময় জরুরি কথাই বলছি শ্রীকুমার। কতদিন হয়ে গেল একান্তভাবে আমাদের কোনও কথা নেই ৷ ভালোবাসার কথা নেই। কেবলই মানুষ মারার প্ল্যান হয়ে চলেছে।’ ছেলেটির উষ্ণ ধমক, ‘কী করছ কী তর্পণা! ফোনের মধ্যে এত এক্সপ্ল্যানেশন দিয়ে কথা বোলো না।’ তর্পণা বলল, ‘তুমি হয়তো ভুলে যাচ্ছ এটা আমার সেকেন্ড ফোনটা। এর নম্বর কেউ জানে না। শুধু তুমি আর আমি ছাড়া।’

-নন্দিনীও না?

-ও ফোনটা আছে জানে। নম্বর-টম্বর জানে না।

-শোনো তর্পণা, আমাদের নেক্সট এবং লাস্ট টার্গেট মৃত্তিকা। -কবে?

-দুদিন বাদেই। মৃত্তিকার মেয়ের অন্নপ্রাশনের দিন।

-ইসসস! বেচারি মেয়েটাকে অন্নপ্রাশনেই মাতৃহারা করবে?

-এসব সেন্টিমেন্ট মনেও এনো না। তৈরি থেকো। অ্যাস সাচ তোমায় কিছু করতে হবে না এটার ক্ষেত্রে। কিন্তু যদি কিছু দরকার হয় তোমায় লাগতে পারে।

-আমি সবসময় তৈরি আছি।

-লাভ ইউ।

-এটা হয়ে গেলে আমরা আবার একসাথে থাকব তো শ্রীকুমার? আমরা নতুন করে সংসার পাতব তো?

-অবশ্যই। আমি তো দিন গুণছি মনে মনে। শুধু আমায় একটা ভালো চাকরি দেখতে হবে। এইসব শাড়ি-ফাড়ির দোকানে টাকা এত কম।

-চিন্তা কী? আমি তো আছি। আমি আবার আই আই জে টিতে কাজ নেব। ওখানে খারাপ মাইনে দেয় না। ততদিনে তুমিও খুঁজে নেবে। তারপর শুধু তোমার আর আমার সুখের সংসার হবে তাই না?

-নন্দিনীও থাকবে। ওকে আমি ছাড়তে পারব না। মনে রেখো, তুমি আর আমি দুজনেই ওকে দত্তক নিয়েছি অরফ্যানেজ থেকে ।

-জানি। আমার মনে আছে ৷

-এখন রাখি তর্পণা। খুব ঘুম পাচ্ছে।

-গুড নাইট ।

স্বয়ম্ভু আঙুলের ইশারায় বন্ধ করতে বলে। শ্রীকুমার চোখে হাত চাপা দিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। মাঠের মধ্যেই অসহায়ের মতো বসে পড়ে। তর্পণা কিন্তু এখনও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু দুচোখের কোল বেয়ে গড়িয়ে নামছে নোনতা জলের ধারা। ভাঙবে তবু মচকাবে না এই মহিলা। কিছুক্ষণের জন্য ভাড়াবাড়ির লনটায় পিন পতনের নিস্তব্ধতা। আত্মহত্যা আর হত্যার ভাগাড়ে চাপা পড়ে থাকে কত সুখের স্বপ্ন! স্বপ্নালু চোখগুলো শুধু পথ চিনে নিতে পারে না। ক্রোধ, প্রতিশোধস্পৃহা তাদের সঠিক পথ থেকে ঠেলে দেয় পাপের অন্ধকারে।

-পৃথিবীতে অসম্ভব বলে কিছু নেই মিসেস তর্পণা। আপনার ইচ্ছে যদি সৎ হয় তাহলে ঠিক কোনও না কোনও পথ আপনি পেয়ে যাবেন। ঠিক সেইভাবেই আমি আপনার গোপন ফোনের নম্বর পেয়েছি। এই ফোনটার হদিশ আপনার দোকানে যেদিন দ্বিতীয়বার গিয়েছিলাম সেদিনই পেয়েছিলাম । প্যাকেটের মধ্যে ফোনটাকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। সেই সময় কেউ একজন আপনাকে ফোন করাতে স্ক্রিনের আলোটা প্যাকেটের ভিতর থেকেই ব্লিঙ্ক করছিল। নম্বরটা ইচ্ছে করেই সেদিন চাইনি। তাহলে আপনি সচেতন হয়ে যেতেন আর আমিও এই রেকর্ডিং পেতাম না ।

তর্পণা বিস্মিত। যে নম্বর তর্পণা আর শ্রীকুমার ছাড়া কেউ জানে না সেটা স্বয়ম্ভূ জানল কী উপায়ে? নন্দিনীর জানার তো কোনও প্রশ্নই নেই। তাছাড়া নন্দিনী জানলেও বলবে কখন? সর্বক্ষণ তো তর্পণার চোখের সামনেই ঘুরঘুর করে মেয়েটা। কথাও বলতে পারে না যে ফোন করে নম্বরটা দিয়ে দেবে।

-জানি আপনি অনেক কিছুই ভাবছেন। কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর আমি আপনাকে দিতে বাধ্য নই। যাই হোক, এতক্ষণ তো পূর্ব ইতিহাস থেকে শুরু করে কীভাবে প্ল্যানটা সাজালেন সবাই মিলে সেটা বললাম। এবার আসি খুনের ধারাবিবরণীতে। কীভাবে খুনগুলো করলেন।

অনেকেই নিজেদের ইচ্ছেমত চেয়ার নিয়ে বসে পড়েছে। এবার স্বয়ম্ভূ একটা চেয়ার টেনে বসে পড়ে। ‘সরি, আমি একটু বসলাম। সেই কাল রাত থেকে ঘুম নেই তো। আজও তো রাত দুটো বাজতে চলল।’ শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘হ্যাঁ স্যার প্লিজ । আপনি বসুন।’ আবারও একটু চুপ করে ভাবল স্বয়ম্ভু । তারপর বলতে শুরু করল শুরু থেকে। ‘আমরা জানি যে তমালের সঙ্গে তর্পণা সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্ধুত্ব পাতায় এবং তারপরেই ওদের ঘনিষ্ঠতা । বন্ধুত্ব থেকে তমালের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে প্রেম। যে অসহায়তা এবং অসহ্য হয়ে ওঠাটা অনেকটাই তর্পণার জন্যেই সৃষ্টি হয়েছিল। আর এটাই ছিল লক্ষ্য। সূচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোনো। অরুণা দেখল তমাল আস্তে আস্তে ওর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। যে তমালকে অরুণা সুস্মিতার জীবন থেকে চুরি করে নিয়েছিল। তমালও সাড়া দিয়েছিল। তখন মানসিক যন্ত্রণা কাটাতে তার মা সুমিত্রা দেবীকে সব কথা বলে অরুণা। তিনি বলেন, একটা বাচ্চা নিতে। অরুণা পাগল হয়ে ওঠে একটা বাচ্চার জন্য। কিন্তু স্বামীর মনই নেই যার প্রতি তার কাছ থেকে সন্তান পাওয়ার আশাও বৃথা। তাও চেষ্টা করে দুজনেই। কিন্তু সন্তান হয় না। তমালের কাছে ধীরে ধীরে অরুণা অসহ্য হয়ে ওঠে। অরুণাও খিটখিটে হতে থাকে। ঝগড়া অশান্তি এমন পর্যায়ে পৌঁছোয় যে তমাল রাগের মাথায় অরুণাকে বলে খুন করে ফেলবে। সেই সময় তৰ্পণা শান্তিদায়িনী রমণী হয়ে প্রেমের আঁচলে বেঁধে ফেলে তমালকে। ইতিমধ্যে যে মেয়েটা কোনওদিন জ্যোতিষে বিশ্বাস করত না। ঠাকুর দেবতাও সেভাবে মানত না সে সুরিলেনের শনিমন্দিরে যেতে থাকে। কারণ লোকের মুখে শোনে মিশ্রঠাকুর নাকি যাই বলে তাই ফলে যায়। শিবাঙ্গী, অভিনব খেয়াল কর, এই যে মানুষের বিশ্বাস অর্জন এটার জন্যেই কিন্তু দয়াময় সান্যাল আর শ্রীকুমার এত বছর অপেক্ষা করেছিল। শুরু থেকে তো আর কেউ জানত না অরুণা বিয়ে হয়ে কোথায় উঠবে বা কে কী অবস্থানে থাকবে। কিন্তু দয়াময় যেহেতু নিজের বাড়িতেও পুজোয়াচ্চা করতেন তাই সেটাকেই প্রফেশন করে নেন। আর খবর রাখতে থাকেন শিকারের অবস্থান কীরকম৷ কপাল ভালো এদের। তাই অরুণা বিয়ে করে সুরিলেনের পাশের গলিতেই আসে। আর বাকিরা ইতিউতি ছড়িয়ে। সবাই একটা নির্দিষ্ট জায়গায় সেটল হবার পর এরা ফাইনাল প্ল্যান করে। যাই হোক, যেটা বলছিলাম, লোকের মুখে শুনে অরুণার দুর্বল মন প্রতি শনিবার করে ছুটে যেতে থাকে শনিমন্দিরে মিশ্রঠাকুরের কাছে। যেকোনও মানুষের মনের প্রকাশ সবার আগে তার মুখের অভিব্যক্তিতে ঘটে। যেটা অরুণারও ঘটেছিল। পাশাপাশি শ্রীকুমার এবং তর্পণার কাছ থেকেই মিশ্রঠাকুর ওরফে দয়াময় জেনে যেতেন অরুণার জীবনে ঠিক কী কী ঘটে চলেছে। সেটার ভিত্তিতেই তিনি একেবারে মুখ দেখে অরুণার ইহকাল পরকাল সব বলে যেতেন। অবিশ্বাসী অরুণার মনে খুব সহজেই জন্ম নেয় বিশ্বাস। মিশ্রঠাকুর আশা দেন। বলেন সময় এলেই ঠিক হবে সব। তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। অরুণা অপেক্ষা করে। এর মধ্যেই প্রতিদিন রাত্রে একটা অচেনা নম্বর থেকে কেউ ফোন করে বেড়ালের ডাক শোনাতে থাকে। অরুণার সন্দেহ হয়। বুঝতে পারে না কে ফোন করছে। কিন্তু সম্ভবত ওরও লাটাগুড়িতে ঘটিয়ে ফেলা অপরাধটার কথা মনে হতে থাকে। কিন্তু তার জন্য যে তাকে খুন হতে হবে বুঝতে পারেনি । এক সময় জানতে পারে সুস্মিতা বেড়াল পুষছে। এদিকে প্রেমঘটিত কারণে সুস্মিতার সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয় অরুণার। তাহলে কী সুস্মিতা কোনওভাবে অরুণাকে মেন্টাল টর্চার করতে চাইছে? সুস্মিতাকে ফোন করে অরুণা। কিন্তু কোনও লাভ হয় না। অরুণা আরও ঘেঁটে যায়। দিনটা শনিবার। ঝিরঝির করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। বাড়ি ছাড়ে অরুণা। ওদিকে মামার শরীর খারাপ বলে আগেভাগে শাড়ির দোকান থেকে ছুটি নিয়ে নেয় ত্রিদিব ওরফে তিরু কারণ তর্পণা তমালের কাছ থেকে ততক্ষণে খবর পেয়ে গেছে যে অরুণা আজ বাড়ি ছাড়ার জন্য ব্যাগ গোছাচ্ছে। ক্যাব বুক করে অরুণা। তিরু জানত শনিবার একবার না একবার সে আসবেই মন্দিরে। যদি না আসত তাহলে হয়তো তিরুবাবু তপাদার সঙ্গে আলোচনা করে অন্য প্ল্যান করতেন। কিন্তু না, অত কষ্ট তাকে করতে হয়নি। অরুণা রাস্তার পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে নামল। রাস্তা পেরিয়ে শনিমন্দিরে এল। মিশ্রঠাকুরের সঙ্গে কথা বলছে আর ওদিকে তিরুবাবু করলেন কী…।’

দুম করে চুপ করে গেল স্বয়ম্ভু। তিরুর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তিরুবাবু, কী করলেন বলুন একটু। ক্লোরোফর্ম দিয়ে যে ড্রাইভারকে ঘায়েল করেছেন সে তো জানি। কিন্তু প্রসেসটা কীভাবে হল?’ এবারের এই আপনি আজ্ঞে সম্বোধনটা গায়ের জ্বালা থেকেই করল স্বয়ম্ভু। তিরু মাটিতে বসেই গালের ওপর ঝরতে থাকা জল মুছে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। স্বয়ম্ভু ঘাড় গুঁজে একটা ভুরু তুলে অদ্ভুতভাবে হাসছে।

ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা বাড়ছে। ছাতা মাথায় দিয়ে রাস্তার ওপারে শনিমন্দিরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে মহিলা কাস্টমারটা। গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হতে এসিটাও ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই একটু জানলা খুলে দিয়েছে ড্রাইভার। এমনিতেই ক্যাবের ড্রাইভারগুলো এসি চালাতে না পারলেই বাঁচে। চোদ্দবার বলে বলে চালাতে হয়। বিরক্ত লাগছে ড্রাইভারের। তার ওপর আবার কে যেন পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে ফস করে মুখে কী একটা স্প্রে করে বেরিয়ে গেল। স্প্রেটা বেশ অনেকটাই ধেয়ে এসেছে মুখের ওপর। আচমকা চোখ বুজে মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড খাবি খেয়েছে ড্রাইভার। তারপর মুখের সামনে হাত নেড়ে কাশতে কাশতে ধাতস্থ হয়ে তড়পে উঠতে সময় লেগেছে তার। ততক্ষণে বেয়াড়া লোকটা ভ্যানিশ। ড্রাইভার মুহুর্তে মুখ বাড়াল বাইরের দিকে। ‘এই কে রে শালা বানচোদ?’ খিস্তিটা বৃষ্টিতে ভিজে ঝুপুস করে নেতিয়ে রাস্তায় গড়াগড়ি দিল। বৃষ্টিতে না পারল বেরোতে আর না পারল লোকটার টিকি দেখতে। ড্রাইভারের বান কোথা দিয়ে কার গায়ে গিয়ে লাগল সে শুধু দুটো স্ট্রিটলাইটের মাঝের অন্ধকারটাই জানে। কাউকেই এখানে দেখা যাচ্ছে না।

বৃষ্টিটা আবার বাড়ল। সিটে মাথা হেলিয়ে মিনিট চারেকের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছে ড্রাইভার। কালো বোরখা পরা একটা মানুষ খোলা জানলার পাশে এসে দাঁড়াল। ড্রাইভারের দিকে জানলা দিয়ে হাত ঢুকিয়ে দরজা খুলল। ড্রাইভারকে গাড়ির সামনের পাশের সিটে ঠেলে দিয়ে নিজে তাড়াতাড়ি উঠে ড্রাইভারের সিট দখল করল। ড্রাইভারকে সামনের সিটের ফাঁকা অংশতে ঢুকিয়ে দিতে চেষ্টা করল। কিন্তু চট করে সেটা পারল না। ওদিকে রাস্তা পেরোবার জন্য এগিয়ে এসেছে অরুণা। বোরখা পরা তিরু ঝট করে সামনের সিটটাকে পিছনের দিকে ঠেলে দিতেই অচৈতন্য ড্রাইভার সিটের সামনে পড়ে গেল। পা দুটোকে হাঁটুর কাছ থেকে মুড়ে ভাঁজ করে কোনওরকমে চেপে ঢুকিয়ে দিল চোখের আড়ালে। বোরখার নীচ থেকে দুটো সাদা বস্তা বের করে চাপা দিয়ে দিল লোকটাকে। যাতে চট করে কেউ খেয়াল না করে। অরুণা পিছনের গেট খুলে উঠে বসল। বসতে বসতে বিরক্ত হয়ে বলল, ‘সামনের সিটটা পিছিয়ে এল কীভাবে? এগিয়ে দাও।’

-সরি ম্যাডাম, ওটার লকটা আটকে গেছে। আপনি একটু এইদিকে চেপে বসবেন প্লিজ।

-খারাপ গাড়ি নিয়ে রাস্তায় বেরোও কেন? যতসব।

গজগজ করতে করতে ড্রাইভারের সিটের পিছনে সরে বসল অরুণা। ঠিক সেই সময় ডানহাতটাকে বাঁহাতের ফাঁক দিয়ে গলিয়ে পিছনের সিটের দিকে স্প্রে করে দিল ক্লোরোফর্ম। রাগের মাথায় কিছুই বুঝল না অরুণা। শব্দ হল না যে। বোরখার আড়ালে তিরুর নাকে দু-তিনটে মাস্কের পট্টি। যাতে ক্লোরোফর্ম কোনওভাবেই তাকে না বশ করে ফেলতে পারে। গাড়ি ছেড়ে মৌলালি পৌঁছতে না পৌঁছতেই অরুণা অজ্ঞান। গাড়িটা মৌলালি থেকে ডানদিকে ঘুরে এস এন ব্যানার্জি ধরে।

-তার পরের অংশটা আমার জানা তিরু। রফি আহমেদ কিদওয়াই রোড থেকে আবার গাড়ি ঘুরে জানবাজার হয়ে সুরিলেন। রাস্তায় একটা বাসের আড়ালে চলে যাবার পর আর সিসিটিভি পাওয়া যায়নি ঠিকই। কিন্তু পরের যা খুনের ইতিহাস তাতে এইটুকু বুঝতে বিশেষ অসুবিধে হয় না। সেই রাত্রেই নৃশংশভাবে হত্যা করা হয় অরুণাকে। পায়ে এঁকে দেওয়া হয় বেড়ালের দুটো কান। যেটা চট করে দেখলে গাছের পাতার মতো লাগবে । গাড়িতেই বস্তা ছিল। ক্যাব এসে দাঁড়াল তোমাদের বাড়ির পিছনের দরজায়। যার দেয়ালে আমি ব্লাডের ট্রেস পেয়েছিলাম। ওই লাশ নিয়ে যাবার সময় হয়তো কোনওভাবে লেগেছিল। খেয়াল করনি তোমরা। খুনের বর্ণনাটা আর নাই বা দিলাম। ওটা তো নিজেরাই রেকর্ড করে মৃত্তিকাকে সেন্ড করেছ। কিন্তু খুনটা করল কে? দুজনে মিলে? নাহ। একজন তো ড্রামস বাজিয়ে লোকের কানকে ধোঁকা দিতে ব্যস্ত। তার ওপরে বাইরে বৃষ্টি। তাহলে বাকি থাকে একজনই।’

সকলের চোখের মণিগুলো আতঙ্কের পর্দা ভেদ করে দেখতে থাকে মিশ্রঠাকুরকে। পঙ্কজ মিশ্র ওরফে দয়াময় সান্যাল নিতান্ত ভদ্র মানুষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। হাত দুটো তার পেটের কাছে জড়ো করা। স্বয়ম্ভু এগিয়ে এল দয়াময়ের সামনে। দয়াময় চোখ তুলল। তার চোখে চোখ রেখে স্বয়ম্ভু বলল, ‘আপনার পায়ে সেলাই পড়েছিল কেন?’ দয়াময়ের পাথর হয়ে যাওয়া চোখের পাতাগুলো কেঁপে ওঠে। বলেন, ‘পায়ে অপারেশন হয়েছিল। একটা জং ধরা লোহার শিকের অংশ ঢুকে গিয়েছিল। ‘

-ভিডিয়োটা করেই সবথেকে বড় ভুল করেছেন দয়াময় ঠাকুর। আপনি যখন স্টিলেটো পড়ে দিয়ার পেটের ওপর লাফাচ্ছিলেন তখন আপনার পায়ের ওই সেলাই করা অংশটা এক ঝলক বেরিয়ে পড়েছিল। আপনার লাফানোর সময় বোরখাটা উঠে গিয়েছিল। প্রথম যেদিন আপনার মন্দিরে যাই সেদিনই খেয়াল করেছিলাম আপনার পা-টা।

মুখ নামিয়ে নেয় দয়াময়। স্বয়স্তু এবার তিরুর সামনে এসে দাঁড়ায় তারপর হাঁটু মুড়ে বসে তিরুর মুখের সামনে নিজের মুখ এনে বলে, ‘ভিডিয়োতে আরও একটা গণ্ডগোল ছিল। ভিডিয়োটা যখন এডিট করলেই তখন আরও একটু নিখুঁত করতে পারতে। কিন্তু করবে কী করে? বাইরে তপাদা যে ওয়েট করছিল। এডিট করে পেনড্রাইভে নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি যে মৃত্তিকার বাড়ির বারান্দায় ফেলতে হবে। তারপরে লাশ ফেলার তাড়াও ছিল। একই ভাড়া করা গাড়িতে তিরু আর তপন বেরিয়ে প্রথমে দিয়ার লাশ ফেলে শিবাঙ্গীর বাড়িতে। তপন, মোবাইলটা অফ করে না। কারণ পুলিশের মোবাইল যখন তখন অফ করা যায় না সেটা ও জানে। এমার্জেন্সি কিছু হতেই পারে। তাছাড়া ও শিওর ছিল তপনকে কেউ সন্দেহ করবে না । যাই হোক, শিবাঙ্গীর বাড়ি থেকে সেই গাড়ি যায় মৃত্তিকার বাড়ি। বারান্দায় পেনড্রাইভ ফেলতে। মানে সত্যি আপনাদের কুর্ণিশ করতে ইচ্ছে করছে আমার। কী খাটুনিটাই না খেটেছেন আপনারা। কিন্তু ওই, এত খেটে ও শেষ রক্ষা হল না। এডিট যখন করলেন তিরুবাবু তখন তো একটু দেখে করবেন, একদম শেষে যে আপনার ড্রাম বাজানোর শব্দ চলে এসেছে এক কুচি।’ ডানহাতের বুড়ো আঙুল আর তর্জনির মাথা জুড়ে এক কুচি শব্দটা দেখাল স্বয়ম্ভু। ‘প্রথমে তো আমি বুঝিনি। পরে যখন আমার পাঠানো ছেলেটি ছবি তুলে আনল তখনই অনেকটা শিওর হয়ে যাই হত্যালীলা সুরিলেনের বাড়িতেই ঘটে চলেছে। তার ওপর দিয়ার খুনের ভিডিয়োতে মিশ্রঠাকুরের পায়ে সেলাইয়ের দাগ। মিশ্রঠাকুর আমায় বেমালুম মিথ্যে বলে গেলেন যেদিন আমরা ওনার বাড়িতে গেলাম। ভাগ্নে নাকি বাড়িতে নেই। এদিকে তিরু ওপরের সিঁড়িতে লুকিয়ে দিব্যি আমাদের সব কথা শুনছিল। বাড়িটা অন্ধকার হলে হবে কী? সিঁড়ি দিয়ে তো সূর্যের আলো ঢোকে। আর আলো যেখানে সেখানে ছায়া তো পড়বেই। তাই তো আবার উলটোপথে ঘুরে ঢুকলাম । আর শিবাঙ্গীকে পাঠালাম সামনের দরজা দিয়ে। ও মা! ভাগ্নেবাবাজি নাকি তার মধ্যেই সামনের দরজা দিয়ে ঢুকে এসেছেন। এদিকে শিবাঙ্গী ওখানেই ছিল। মিশ্রঠাকুর দেখছিলেন আমরা কদ্দুর গেলাম। যেই বাঁক নিয়েছি অমনি ঘরের ভিতর সেঁধিয়ে গেলেন। শিবাঙ্গীও দৌড়ে সামনের দরজায় আর আমি পিছনে ।

-ঠাকুরমশাই আরও একটা মিথ্যে বলেছিলেন স্যার।

শিবাঙ্গীর কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় স্বয়ম্ভু । ‘উনি আমাদের বলেছিলেন বাড়িটা নাকি ওনার পিতৃপুরুষের। এদিকে কর্পোরেশনের লোককে বলেন সুপ্রভা অধিকারী ওনার দিদি। এই বাড়িটা তাঁরই। তিরু নাকি আরও এক দিদির ভাগ্নে।’

-আসলে শিবাঙ্গী একটা মিথ্যে ঢাকতে গেলে আরও হাজারটা মিথ্যে বেরিয়ে পড়ে। যেদিন আমরা প্রথম মিশ্রঠাকুরের বাড়ি যাই সেদিন আমাদের সঙ্গে ড্রাইভার ছিল তপন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা তপনের সামনেই সবকিছু আলোচনা করে ফেলি। জঙ্গলের কথ” মিশ্রঠাকুরের নেপালি জানার কথা। ওনাকে যে আমরা সন্দেহ করছি সেকথাও বলাবলি করি। তপনের মাধ্যমে সেগুলো আমাদের পরম পূজনীয় ঠাকুরের কানে আসাতে সচেতন হয়ে যান। তাছাড়া কর্পোরেশনের লোক বলে যাঁদের পাঠিয়েছিলাম তারা শুরুতেই বলেছিল এটা সুপ্রভা অধিকারীর বাড়ি কিনা! তাই আর সেটা অস্বীকার করার জায়গা ছিল না। যাই হোক, আমি আবার লাইন থেকে সরে গেলাম। এবার দিয়ার খুন হবার পালা।

-না স্যার, ওই ক্যাব ড্রাইভার আর তমাল।

-ও হো। দেখেছ। উফফফ একসাথে এতগুলো হোমওয়ার্ক দিয়েছেন না ঠাকুরমশাই। সব কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। অরুণাকে বাড়িতে ঢোকাবার আগেই ক্যাব ড্রাইভারকে আরও ক্লোরোফর্ম স্প্রে করা হয়। যাতে লোকটার ঘুম না ভাঙে। তার আগে মোবাইলটা তো সুইচড অফ করেইছে। এরপরে আরও একবার স্প্রে করলেও করতে পারে। একেই মদ খেত লোকটা। তার ওপর এতবার ক্লোরোফর্মের ঠ্যালায় বেচারার প্রাণপাখিটাই বেরিয়ে যায়। এরপর তমাল! শিবাঙ্গী, তর্পণার দুটো ফোন নিয়ে নাও তো।’

শিবাঙ্গী এগিয়ে যায় তর্পণার কাছে। কড়া চোখে হাত পাতে। জল শুকিয়ে যাওয়া চোখ তুলে তর্পণাও তাকায়। তারপর দুটো মোবাইল দিয়ে দেয়। দ্বিতীয় গোপন মোবাইলটি ব্লাউজের ভিতর থেকে বের করে আনে৷ স্বয়ম্ভু ততক্ষণে অভিনবর কাছ থেকে হাতে তুলে নিয়েছে শ্রীকুমারের মোবাইল । -পাসওয়ার্ড কী শ্রীকুমার?

স্বয়ম্ভুর প্রশ্নের উত্তরে শ্রীকুমার বলে, ‘নন্দিনী।’ স্বয়ম্ভু ঠোঁট উল্টে মোবাইলের লক খোলে। তারপর পকেট থেকে নম্বর লেখা একটা কাগজ বের করে ডায়াল করে। তর্পণার দ্বিতীয় মোবাইল ভাইব্রেট করে ওঠে। শিবাঙ্গীর ভুরু কুঁচকে যায়। বিস্মিত মুখে ফোনের স্ক্রিনটা স্বয়ম্ভুকে দেখায়। স্বয়ম্ভুর ঠোঁটে আবারও সেই বিজয়ীর হাসি। এবার প্রথম ফোনটায় রিং করে। এবারও সেই একই নাম। তিরু, শ্রীকুমার, ত্রিদিব কিচ্ছু নয়। শ্রীকুমারের নম্বরটা তর্পণার দুটো ফোনেই নন্দিনীর নামে সেভ করা।

-এইবার বুঝলাম, সেদিন ক্যাফেতে তমাল আপনার ব্যাগ থেকে ফোন নিয়ে কেন স্থির হয়ে বসেছিল খানিকক্ষণ। আসলে তমাল প্রথমে ভেবেছিল নন্দিনী একটা বোবা মেয়ে হয়ে কীভাবে ফোন করবে? তাই অন্যের ফোন হওয়া সত্ত্বেও তমাল তর্পণার এই ফোনটা ধরে। ধরার পরেই চমক। ক্যাফের সিসিটিভিতে তমালকে ফোন ধরে একটাও কথা বলতে দেখা যায় না। বরং ও বেশ শকড হয়ে যায়। তাড়াহুড়ো করে ফোনটা আপনার ব্যাগে রেখে দেয়। আপনি আসার পরেই কী একটা বলে তমাল বেরিয়ে যায়। ক্যামেরাতে আপনারও অবাক করা মুখের ছবি ধরা পড়েছে তর্পণা ম্যাডাম। সেদিন যেন কত তারিখ ছিল!’ বলে একটু ভাবে স্বয়স্তু। ‘ইয়েস ছাব্বিশে জুলাই, মঙ্গলবার।’ মোবাইলে কী যেন খুঁজতে শুরু করে স্বয়ম্ভু। পরক্ষণে নিজেই বলে ওঠে, ‘ধুর, আমি এত খাটছি কেন? তর্পণা ম্যাডাম, এতদিন ধরে তো ঢপের পর ঢপ দিয়ে এসছেন। এবার একটা সত্যি কথা বলুন তো। তমাল ফোনে কী শুনেছিল? ও শ্রীকুমারবাবু, আপনি কী এমন টপ্পা গাইলেন ফোনের মধ্যে যে তমাল বেসামাল হয়ে ভেগে গেল?’

দুজনকেই চুপ থাকতে দেখে ধমকে উঠল শিবাঙ্গী। ‘কী হল কী? বলুন?” মনমিন করে শ্রীকুমার বলল, ‘পরের টার্গেট সুস্মিতা। ওর বাড়িতে কাটা আঙুলগুলো আমাকেই পৌঁছতে হবে। এবার আর তপাদা পারবে না।’ -ও হরি! আমি তো ভাবছিলাম তুমি বুঝি আমার বাড়িতে ওগুলো….

থামল স্বয়ম্ভু। আদুরে চোখে তপনের দিকে তাকিয়ে আহ্লাদি সুরে বলল, ‘তপন, ভেরি নটি। কিন্তু শ্রীকুমারভাই…।’ স্বয়ম্ভুর তীর আবার ঘুরে যায়। ‘হাতের লেখাগুলো তোমার তাই না? বেস্ট অফ লাক, ফুলকারি, গিফট এই তিনটেই তো তোমার লেখা ভাই। এফ অক্ষরগুলো একদম একইরকম। শুধু শেষের এই ‘ফাক ইউ’ শব্দটা আমাদের তপন বাবাজির। তোমার প্রেমপত্রটা যখন পাই না তপন, তখনই বুঝেছি এ লেখা আগেরগুলোর চেয়ে আলাদা। তার আগেই মেদিনীপুর থেকে ঘুরে এসেছি সব প্রমাণ সঙ্গে নিয়ে। আবার সেদিনই লালবাজারে ঢোকার সময় তোমার বিনয়ী মুখ দেখে মনে হল একটা পরীক্ষা করেই নিই। তাই তো ফুলবাগান থেকে ফালাকাটা লেখালাম। সেই আবার ‘এফ’ লেটারেই ফাক হয়ে গেলে।’ সকলের দিকে তাকিয়ে ভদ্রতা করল স্বয়ম্ভু, ‘সরি ফর মাই ল্যাঙ্গুয়েজ। এটা না বললে অংকটা সবার কাছে পরিষ্কার হত না।’ বড় করে একটা নিশ্বাস নিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, “তার মানে তমাল সেদিনই জেনে ফেলেছিল খুনি কে? না না সরি, খুনি কে জানতে পারার কথা নয়। খুনির সঙ্গে তর্পণা যে জড়িয়ে সেটা জেনেই ভড়কে গিয়েছিল। কারণ শ্রীকুমার নিশ্চয়ই ফোনে নিজের নাম বলবে না তাই না? সেটা যেই তৰ্পণা বুঝে গেলেন অমনি জানিয়ে দিলেন শ্রীকুমারকে। প্ল্যান হয়ে গেল সেদিনই কিছুক্ষণের মধ্যে তমালকে মেরে ফেলার। অথচ তপন আমাদের সঙ্গে ছিল। শ্রীকুমার সেদিনও সারাদিন শাড়ির দোকানেই ছিল। বাকি রইলেন, জয় বাবা মিশ্রঠাকুর। বড়ঠাকুরের বড় ভক্ত। তিনি তো আবার কনস্টেবল ছিলেন। তাই সেই পোশাক ওনার কাছে রয়েইছে। খাটের তলায় রাখা থাকে আট নম্বরের বুট জুতো সেটাও আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি। নকল দাড়ি, গোঁফ আর বাকি যা যা জিনিসপত্র সব সুরিলেনের খণ্ডহার থেকেই আমরা উদ্ধার করেছি। ও হ্যাঁ, শ্রীকুমার, তোমার ল্যাপটপটাও নিয়ে নিয়েছি ভাই। ওই আজ তোমরা যখন বাড়িতে ছিলে না তখন সামনের দরজার তালা খুলে পুলিশের লোক ভিতরে ঢোকে তারপর বাকি লোক বাইরে থেকে আরেকটা তালা মেরে দেয়। কারণ আমরা সবাই জানি তোমরা পিছনের দরজা দিয়েই ঢুকবে। তাই আর ওদিক দিয়ে ঢোকার রিস্ক নেয়নি কেউ। তারপর চিলেকোঠায় সেই সন্ধে থেকে অপেক্ষা করছিল আমাদের লোক। খুব মশা কামড়েছে ওদের জানো তো? যাই হোক, আবার ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যাই। মিশ্রঠাকুর তড়িঘড়ি মেক আপ নিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে বেরোলেন। ভিতরের রাস্তা দিয়ে হেঁটে পৌঁছে গেলেন তমালের বাড়ি। দরজা খুলল। থানা থেকে আসছি বলে ঢুকে গেলেন। কোনও একটা কথা বলে তমালকে ভিতরে পাঠালেন। সেই ফাঁকে জলের গ্লাসে পটাশিয়াম সায়ানাইড মিশিয়ে দিলেন। তমাল এমনিতেই টেনশনে ছিল। আপনাকে দেখে আরও টেনশনে পড়ে গেল। কী জানি, খুনের সাথে তর্পণার জড়িয়ে থাকার ব্যাপারটা হয়তো আপনাকে বলেছিল। তার পরে জল খেল। ভোগে গেল। আপনিও একটা ক্যাব বুক করে টুক করে চলে এলেন। না, আমরা সেই ক্যাবের হদিশ পাইনি ঠিকই। তবে আপনাদের এক প্রতিবেশী দুপুরে একজন খাঁকি পোশাক পরা পুলিশের লোককে আপনাদের বাড়ির পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে দেখেছিল। সে চিনতে পারেনি আপনাকে। আপনি হয়তো জানেন যে এখন কোলকাতা পুলিশের পোশাক সাদা। কনস্টেবলদের পোশাক খাঁকি। আর বেঙ্গল পুলিশ এবং আর পি এফের পোশাক খাঁকি। কিন্তু সুরিলেন, শিয়ালদা এগুলো তো কোলকাতা পুলিশের আন্ডারে। তাহলে তো সেখানে খাঁকি পোশাকের পুলিশ যাবে না। কোনও কনস্টেবলও তদন্ত করতে যাবে না। তবুও আপনার কিছু করার নেই। মুহূর্তের মধ্যে আপনি কী করে সাদা পোশাক জোগাড় করবেন? তাই এইটুকু রিস্ক আপনি নিয়েই নিলেন। ক’জন সাধারণ মানুষ আর এতসব জানেন? সবাই জানে খাঁকি মানেই পুলিশ। তার ওপরে দুপুরবেলা উত্তর কোলকাতার পাড়ায় বেশিরভাগটা নিঝঝুম থাকে। তাই মুখে মাস্ক দিয়ে চলেই গেলেন খুন করতে। ফিরে এসে আবার আপনার পুজো আছে। শ্রাবণ মাসের পুজো খুব ইম্পর্টেন্ট একটা ব্যাপার। তিরুও সুস্মিতার বাড়ি পার্সেল ডেলিভারি করতে গিয়েছিল একই মেক আপ করে। দাড়ি, গোঁফ, মুখে মাস্ক। এই কোভিডটা এসে আপনাদের বেশ ভালোই হয়েছে। চট করে নিজেদেরকে লুকিয়ে ফেলতে পারেন। কিন্তু তিরু সেদিন খেয়ালই করেনি নকল দাড়িটা কানের পাশ থেকে একটু খুলে ঝুলছিল। এই ঘটনা যদি আরও দুটো খুনের পর ঘটত তাহলে সেদিনই তিরুকে আমরা নজরবন্দি করে নিতাম। কিন্তু তখন সন্দেহ হলেও কে কোথায় কেন নকল দাড়ি আটকে ঘুরছে তার জন্য নজরবন্দি করা সম্ভব ছিল না। আমি বাইকটার নম্বরও নিইনি। ডেলিভারি অফিসে গিয়ে খুঁজেও পাইনি। তপন তুমি জোগাড় করে দিয়েছিলে বাইকটা?’

তপন কোনও উত্তর দিল না। স্বয়ম্ভু জোরও করল না। ‘যাক গে, ওসব নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই। দিয়াও খুন হয়ে যায় জন্মদিনের দিন। সেদিন পার্টিতে ভিড়ের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল শ্রীকুমার। সেদিনও বৃষ্টি। আসলে বৃষ্টিটা যেদিন-যেদিন হয়েছে ঠিক সেদিন-সেদিনই খুন হয়েছে। কারণ বৃষ্টিতে সিসিটিভির ছবি ঝাপসা থাকে। লোক কম থাকে। বেশিরভাগ লোক বাড়ির মধ্যেই থাকে। কোনও শব্দ হলে সেটা চাপা পড়ে যেতে পারে। এরকম অনেক সুবিধে। শ্রীকুমার দিয়ার ড্রিংকসে আগে থেকেই ওষুধ মিশিয়ে দেয়। যাতে একটা সময় পর দিয়া ঘুমিয়ে পড়ে। গভীর ঘুম। অনেকটা অচেতন হয়ে যাবার মত। এদিকে মদ খেয়ে মাতাল দিয়া। সেই সময় ডিজেকে হাত করে ওই ভয়ানক ভিডিয়োর অডিয়োটা বাজিয়ে দেয়। যাতে দিয়া প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যায়। সেটাই হল। দিয়ার পার্টনার কিয়ারা দিয়াকে নিয়ে গাড়িতে ওঠে। আর সেই গাড়িটাও শ্রীকুমার চালিয়েছিল। শ্রীকুমারই ওদের নিয়ে যায়। একদিকে দিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে পার্টি চলছে সবমিলিয়ে চূড়ান্ত ক্যায়োস। এর মধ্যে একজন সাহায্যের হাত বাড়িয়েছে। তাই তাকে বিশ্বাস যেকোনও মানুষ করবে। কেউই তখন লোকটির পরিচয় বা তার গাড়িটা পার্কিং থাকতেও কেন সাউথ সিটির সামনে রাস্তায় রাখা সেটাও জিজ্ঞেস করবে না। কিয়ারাও করেনি। শ্রীকুমার আবারও ক্লোরোফর্ম স্প্রে করে কিয়ারাকে অজ্ঞান করে। গাড়ি ঘুরিয়ে ট্যাংরার কাছে নিয়ে গিয়ে ফাঁকা জায়গা দেখে ফুটপাথে ফেলে দেয় কিয়ারাকে। ফেলার আগে ভারি কিছু দিয়ে হাঁটুর কাছে মেরে পা-টা ভেঙে দেয় বেচারির। এই অব্দি ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করা গিয়েছিল। কারণ শ্রীকুমার কিয়ারা বা দিয়ার ফোন সুইচড অফ করতে ভুলে গিয়েছিল। এরপর থেকে আর লোকেশন ট্র্যাক করা না গেলেও বোঝা যাচ্ছে তারা কোথায় এনে তুলেছিল। আমরাও সাক্ষী। তপন আমাদের সাক্ষী বানিয়েছিল। যাই হোক, এইভাবে দিয়াকেও আমরা হারাই। তার পায়ের নীচে এঁকে দেওয়া হয় বেড়ালের মুখের অবয়ব। কিয়ারা আজও হাসপাতালে ভর্তি। সুস্মিতার খুনটাও সবাই জানো। আলাদা করে আর প্রমাণ করার কিছু নেই। এক্ষেত্রে বেড়ালের দুটো চোখের ছবিও আমরা পাই। এখানেও তর্পণা ম্যাডামের অবদান কম নয়। সকালে গিয়ে ভালো করে দেখে আসেন কোথায় কোথায় সিসিটিভি আছে। ভিতরের ঘরে নেই তাই খুনটা সেখানেই হয়। মীনাক্ষী বলেন, খুনির বাঁহাতে কাটা দাগ। সেটাও আমি খেয়াল করি তপন যখন পকেট থেকে নোটবুক বের করে তখন। আবার আমাকে যখন কাগজটা দেয় তখনও। হাতে কী হয়েছিল তপন? যদিও এতেও কিছু যায় আসে না। তাও বলো শুনি।’

তপন মুখ তোলে। চোখের কোলে লেগে থাকা জলটা মুছে নেয়। মাথা উঁচু করে, বুক ফুলিয়ে একটা শ্বাস নেয়।

তখনও সন্ধে হয়নি। পাখিদের কলকাকলিতে চন্দ্রকোণা সরগরম। আকাশে রক্তমেঘের নির্মম ইশারা। চাইলেও আর একটুও আলো দেবে না আকাশ। সন্ধে নামবে ঝুপ করে। সবার চোখ এড়িয়ে পোয়াতি শ্রীদেবী বেরিয়ে পড়েছে বাড়ির বাইরে। হুঁশ খেয়াল নেই তার। নিজের নাম ভুলে যায়। আপনজনদের চিনতে পারে না। নিজের মনে বকতে থাকে। সেদিন হাঁটতে হাঁটতে কোথায় কত দূর চলে গিয়েছিল খেয়ালই ছিল না ওর। ওদিকে বাড়িতে দিদিকে খুঁজে না পেয়ে তপাদার কাছে ছুটে গিয়েছিল শ্রীকুমার। তারপর দুজনে মিলে শ্রীদেবীর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে সারা গ্রাম চষতে থাকে। কে জানে কী সব্বোনাশ ঘটিয়ে বসে আছে মেয়েটা। এমনিতেই সারা গ্রামে এখন চর্চার বিষয় ঝাঁকড়া পাগলি পোয়াতি হল কীভাবে? কে বিয়ে করল তাকে? সরযু ঠাকমার বুদ্ধিতে খুব একটা কাজ হয়নি। হঠাৎ এক জায়গায় দেখে কয়েকটা ছেলে ও বউ শ্রীদেবীকে ঘিরে ধরেছে। দ্রুত পায়ে কাছে যেতেই দেখতে পায় এক বউ শ্রীদেবীর কাঁধে ধাক্কা মেরে জিজ্ঞেস করছে, ‘এই মাগী, কোথায় গিয়ে মুখ পোড়ালি?’ সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা ছেলে বলে উঠল, ‘পেটে করে কজনের বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?’ আরেক মহিলা ঠেলে দিল পাশের মেয়েটাকে, ‘সত্যি বাবা, এই পাগলিকে কী আর একজন সামলাতে পারবে? ডজনখানেকের দরকার।’ উচ্চ অট্টহাসিতে যে পাখিগুলো ঘরে ফিরছিল তারাও মুখ ঘুরিয়ে অন্যত্র উড়ে গেল।

-সত্যি করে বল তো, আদৌ বিয়ে হয়েছে তোর?

-না।

বেশ জোরে উত্তরটা দিল তপা। ফ্যালফ্যাল করে শ্রীকুমার চেয়ে রইল তপাদার মুখে। এসব কী বলছে তপাদা? সবাই দেখল তপার চোখ দুটো রাগে লাল। হাতে একটা কাচের বোতল। গাছের তলায় বেশ কয়েকটা বোতল এখনও পড়ে আছে। সেখান থেকেই একটা তুলে নিয়েছে তপা। ‘শ্রীদেবীর বিয়ে হয়নি।’

-তপা তুই!

-শ্রীদেবীর বিয়ে হয়েছে না হয়নি তাতে তোমাদের কী? তোমরা ওর বাচ্চার দায়িত্ব নেবে?

-এই, তুই এত উর হয়ে সালিশী করছিস কেনে রে?

পাড়ার একটা ছেলে মহিলাদের ভিড় থেকে এগিয়ে এসে বলল ।

-তোমরাই বা একটা অসহায় মেয়েকে নিয়ে খিল্লি করছ কেন? লজ্জা করছে না?

-ইসসস! এ মাগীর মারিয়ে আসতে লজ্জা করল নি আর আমাদের খিল্লি করতে লজ্জা?

দেখাদেখি তড়পে উঠল পাড়ার কাকিমা গোছের এক মহিলা, ‘এটা ভদ্রলোকের পাড়া। এখেনে এসব নোংরামি চলবে নি।’

-সে তো তোমাদের ভাষা শুনেই বুঝতে পারছি এ পাড়ায় কী ধরনের ভদ্দরলোক থাকে ।

মহিলাটি বিষম খায়। ঢোঁক গিলে আবার তড়পে ওঠে, ‘আমরা পঞ্চায়েতে যাব। একটা অবিবাহিত মেয়ে পেটে অবৈধ বাচ্চা লিয়ে ঘুরবে আর আমরা বড়রা সেটা মেনে লিব ভেবেচু?”

মুহূর্তের মধ্যে তপা হাতে কাচের বোতলটাকে ভেঙে ফেলল। ভয়েতে পিছিয়ে গেল সবাই। শ্রীকুমার বলে উঠল, ‘তপাদা কী করছ?’ যাকে নিয়ে এত কিছু তার কোনও ভ্রুক্ষেপই নেই। সে দাঁড়িয়ে আছে বাধ্য মেয়ের মতো। নিজের মনে বকে চলেছে। হাসছে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে দেখছে সবার মুখের দিকে। তপন ভাঙা বোতলের কাচ দিয়ে বাঁহাতের তালুটা এক টানে ফালা করে দিল। ছিটকে বেরিয়ে এল রক্ত। মুহূর্তে মাটি লাল হতে শুরু করল।

-অবিবাহিত মেয়ের পেটে বাচ্চা বলে তোমাদের এত অসুবিধে তাই তো? বেশ। নাও তবে…

তপা হাওয়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে এগিয়ে এসে শ্রীদেবীর কপাল থেকে সিঁথি পর্যন্ত হাতের লাল রক্তে রাঙিয়ে দিল। সবাই হতবাক। বিস্ফারিত নেত্র। কারও কারও দমটাই বন্ধ হয়ে এল। সিনেমাতে এমন হিরোগিরি দেখে হাততালি দিয়েছে, পর্দায় পয়সা ছুড়েছে। কিন্তু চোখের সামনে এমন ঘটনা বাপের জন্মে কেউ কল্পনাও করেনি। চিৎকার করে ওঠে তপা, ‘আজ থেকে শ্রীদেবী আমার স্ত্রী। শান্তিইইইই? যাও সবাই। চলে যাও।’ আর কেউ একটাও কথা বলে না। যে যার মত সরে পড়ে। শ্রীদেবীর কপাল থেকে টাটকা রক্ত নাক বেয়ে গড়িয়ে পড়ে। সেদিন গোধূলি লগ্নে শ্রীদেবীর জীবনে ঠিক কী ঘটে গেল সেটা ও কতটা বুঝল কে জানে? শুধু অবাক হয়ে তপার দিকেই তাকিয়ে রইল। এক ঝাঁক ঘরে ফেরা পাখির দল কিচিরমিচির করে উলু দিতে দিতে গাঁয়ের আকাশ বাতাস মাতিয়ে তুলল।

আঁচলের আড়ালে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে দীপা। তপন দৃপ্ত কন্ঠে বলে, ‘সেদিন রক্ত বন্ধ করে হাতে সেলাই করতে হয়েছিল আমার। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হয়েছিল। রাতে ঘুমোতে পারিনি। শুধু এটুকু শান্তি ছিল যে, যাকে ভালোবাসি সকলের সামনে তার সিঁথি রাঙিয়ে দিয়ে পেরেছি। আর সেই চিহ্ন আজীবন আমার শরীরের সঙ্গে থেকে যাবে।’ বলতে বলতে নিজের হাতের তালুতে সেলাইয়ের দাগটার ওপর চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর আবারও স্বয়ম্ভুর চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমি যা করেছি আমার স্ত্রীয়ের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে করেছি। আমি আমার বিবেকের কাছে কোনও অন্যায় করিনি। আমি শ্রীদেবীকে ভালোবেসে যাব আজীবন। দীপাও আমার স্ত্রী। ওকেও ভালোবাসি আমি। বিচারে হয়তো আমার যাবজ্জীবন বা ফাঁসি হবে। হোক। আর কোনও আফশোষ নেই আমার। শুধু মৃত্তিকা বেঁচে গেল এই একটাই যা..!’ স্বয়ম্ভূ তপনের সামনে এগিয়ে আসে। প্রিয়াংশু অবাক চোখে তপনকে দেখে চোখ নামিয়ে নেয়। চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। স্বয়ম্ভুও বেশিক্ষণ জলভরা দৃপ্ত চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারে না। ওরও চোখটা কড়কড় করে ওঠে। শুধু গলা চেপে বলে, ‘আফশোষ তো হবেই। বেড়ালের গোঁফটা যে আঁকা হল না!’ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা শিবাঙ্গীকে হুকুম দেয় স্বয়ম্ভু, ওকে নিয়ে এস।’ শিবাঙ্গী ওপর নীচে মাথা নেড়ে বাড়িটার বাইরে চলে যায়। দয়াময়ের দিকে চেয়ে স্বয়ম্ভু বলে, ‘এত গবেষণা করে বুদ্ধি খাটিয়ে ছক সাজালেন অথচ ডায়লগ ডেলিভারিতে যে প্রবলেম রয়ে গেল ঠাকুরমশাই । মেদিনীপুরের লোক মিদনাপুর বলে, সচরাচর। যদিও এক্ষেত্রে মেদিনীপুর বলার যুক্তিটাও আপনার ভালো ছিল। লোকে নাকি ভ্যাঙায়। কিন্তু মুশকিলটা হল পরে। আমাদের সামনেই ফস করে নেপালি ভাষাটা বলে ফেললেন আপনি। তাও আবার লোকেশন সমেত। ফরেস্টের কাছে অত কমে নাকি পাওয়া যাবে না। লাটাগুড়ি ফরেস্টের কাছে আপনার বাড়ি। সেটাই আপনি এখন একটা নেপালি পরিবারকে ভাড়া দিতে চলেছেন। ওখানে থাকতে আপনার অনেক নেপালি বন্ধু ছিল। তাদের সঙ্গে থাকতে থাকতেই আপনার এই ভাষা শিক্ষা। কারণ আপনাকে অনেক সময়েই ঝালং-বিন্দুর দিকে যেতে হত। যদিও ওটা ভুটানের বর্ডার তবুও ওখানে নেপালি মানুষই বেশি।’ মিশ্রঠাকুর হাসলেন স্বয়ম্ভুর চোখে চোখ রেখে। এবার গলার স্বর খানিকটা উঁচু করে স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘কোলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা আমার বাড়িতে এসেছেন এটা ঠিক আমার জন্য আনন্দের না ভয়ের সেটাই বুঝতে পারছি না।’ এরপরেই গলাটা নরমাল হয়ে যায়, ‘আমরা যেদিন আপনার বাড়িতে প্রথমবার ঢুঁ মারি সেদিন ঢুকতে ঢুকতে আপনি এই কথাগুলো এইভাবেই বলেছিলেন তাই না ঠাকুরমশাই। মনে পড়ে? ওটা উত্তেজনায় নয়। ভিতরে যিনি লুকিয়ে আছেন তাকে জানান দেওয়া আসলে বাড়িতে কারা এসেছে। যাতে তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারেন। তাই তো?’ মিশ্রঠাকুর বলেন, ‘তুমি অনেক দূর যাবে, দেখে নিয়ো।’ ঝট করে শিরায় আগুন ছুটে গেল স্বয়স্তুর। ‘এটাও কী আপনার ভবিষ্যৎবাণী?”

আর কোনও কথা বলেন না মিশ্রঠাকুর ওরফে দয়াময় সান্যাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথাটা নিচু করে নেয়। স্বয়ম্ভু বলে, ‘পুরনো নামের ভোটার কার্ডটা খুব বুদ্ধি করে ব্যবহার করেছেন দয়াময়বাবু। শুধু আপনার মুখ থেকে নেপালি সংলাপ না বেরোলে আমি হয়তো আপনাকে ওভারলুক করতাম। যদিও গাড়ি ভাড়া নেবার সময়টা দিয়ার খুনের সময়ের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তার ওপর লাটাগুড়ির ঠিকানা। নেপালি কথা। সেই কথায় জঙ্গলের রেফারেন্স। সবমিলিয়ে কালীরামের ঢোলটা ফেঁসেই গেল। তার ওপর যে গাড়িটা থেকে সুরিলেনের একটি বাড়িতে রাতে কাপড়ের গাঁঠরি নামানো হচ্ছিল সেই গাড়িটাই সাউথ সিটির সামনে। দুটো গাড়িরই শেষ চারটে সংখ্যা উনিশশো উননব্বই আর পিছনের গ্লাসে বজরংবলীর স্টিকার যার একটা দিক ছেঁড়া। একদিকে আমার জন্মসাল অন্যদিকে বজরংবলীর কৃপা। ভুলি কী করে?’ দয়াময় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

ঠাকুরমশাইয়ের কাছ থেকে সরে এসে স্বয়ম্ভু বলে, ‘আজ এই যে এতগুলো প্রাণ চলে গেল। অকারণে। তার জন্য আসলে কে দায়ী জানেন, আমাদের লাগামছাড়া উশৃঙ্খল জীবন। যাকে আমরা যৌবনের তেজ, উন্মাদনা বলে আকছার ভুল করে থাকি। যৌবনের মানেটাই আমরা কেউ জানি না। -স্যার।

শিবাঙ্গী ডাকল। স্বয়ম্ভু সমেত সকলেই দেখল একটি মেয়েকে আনা হয়েছে তাদের মধ্যে। স্বয়ম্ভু মেয়েটিকে ডেকে নিল। সকলের সামনে দাঁড় করাল। তর্পণা আর শ্রীকুমার একে অপরের দিকে চেয়ে নন্দিনীর দিকে তাকাল। স্বয়ম্ভু সেন হঠাৎ নন্দিনীকে কেন আনল?

-এই মেয়েটির নাম নন্দিনী। বয়স তেরো বছর। ওর মায়ের নাম শ্রীদেবী মণ্ডল। আর বাবার নাম…

-প্লিজ স্বয়ম্ভুবাবু। প্লিজ ।

কাঁদো কাঁদো স্বরে আপত্তি জানাল প্রিয়াংশু। ‘কীসের লজ্জা প্রিয়াংশুবাবু?’

প্রিয়াংশু পিছন ঘুরে দাঁড়াল। ও সহ্য করতে পারছে

না বাচ্চা মেয়েটাকে ।

-জীবনে এমন কাজ করলেন যে একটা নিষ্পাপ বাচ্চার চোখে চোখ রাখতে পারছেন না?

মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করল, ‘এই মেয়েটি আমাদের প্রিয়াংশু আর শ্রীদেবীর মেয়ে?’

-হ্যাঁ মৃত্তিকা। যার জন্মের কারণ আপনি আর আপনার মৃত বন্ধুরা। যার সারাজীবনের অবহেলার

কারণ আপনি আর আপনার বন্ধুদের বেলেল্লাপনা। মৃত্তিকা নিজের মেয়েটাকে আরও আঁকড়ে ধরল বুকের কাছে। দীপায়নের চোখে বালির মতো কিরকির করছে মৃত্তিকার প্রতি ঘৃণা।

-আমি প্রথমদিন তর্পণার দোকানে গিয়ে মেয়েটাকে ভালো করে লক্ষ্য করি। পরে যখন আপনাকে দেখি প্রিয়াংশুবাবু তখন আমার ভীষণ চেনা চেনা লাগে। বলেওছিলাম বোধহয়। আসলে আপনাকে সেদিন প্রথম দেখলেও আপনার মেয়েটাকে আমি আগেই দেখি। দুজনের মুখের কী আশ্চর্য মিল!

শুধু তাই নয়, আপনার ডানকানের পিছনে একটু ওপরদিকে একটা কালো জরুল আছে। সেই একই জায়গায় একইরকম জরুল নন্দিনীরও।

নন্দিনীকে পাশ ফিরিয়ে কানের চুলের পিছনটা সবাইকে দেখায় স্বয়ম্ভু।

-সবই নিয়তি প্রিয়াংশুবাবু। এই মিলটা নাও থাকতে পারত। কিন্তু ওপরওয়ালা ঠিক করে রেখেছেন আপনাকে পালাতে দেবে না। তাই খুব যত্ন করে এই জরুলটা এঁকে দিয়েছেন মেয়েটার কানে।

মুহূর্তের মধ্যে নন্দিনীর গার্ডারটা খুলে দেয় স্বয়ম্ভু। এক মাথা ঠাসা কোঁকড়ানো চুল ছড়িয়ে পড়ে মুখের দুইপাশে। প্রিয়াংশুর সামনে মেয়েটাকে মেলে ধরে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘দেখুন তো, চিনতে পারেন কিনা! সেই ঝাঁকড়া চুল । সেই চোখ। শুধু জন্মের আগে প্রাণখোলা হাসিটা আপনি, অরুণা, মৃত্তিকা, সুস্মিতা আর দিয়া নিষ্ঠুরের মত কেড়ে নিয়েছেন ওর থেকে। শেষবেলায় শ্রীদেবীর কথা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। শোকে, যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে। হয়তো মেয়েটাও তাই কথা বলতে পারে না। শ্রীদেবী, রামাইয়া আর ওই বেড়ালছানাটাকে মেরে ফেলেছেন আপনারা। আর এই বাচ্চা মেয়েটাকে একটা জীবন্ত লাশ বানিয়ে দিয়েছেন।’

-চুপ করুন স্বয়ম্ভুবাবু, চুপ করুউউউউন। প্লিইইইজ।

দুকানে হাত চাপা দিয়ে কুঁকড়ে ধীরে ধীরে মাটিতে বসে পড়ে। কান্নায় শরীরটা কাঁপতে থাকে প্রিয়াংশুর।

-নন্দিনী বোবা। কথা বলতে পারে না। কিন্তু লিখতে পড়তে পারে। শুনতেও পায়। তৰ্পণা ম্যাডামের ফোনের কল রেকর্ডিং থেকে শুনে শুনে কাস্টমারদের ঠিকানা লিখে রাখে। তারপর সেই ঠিকানায় অর্ডারের ফুল পাঠায়। আর যদি কোনওভাবে ভুল হয়ে যায় বাচ্চা মেয়েটির তাহলে কপালে জোটে মামির হাতের মার।

শ্রীকুমার তড়িতাহতের মতো তর্পণার দিকে তাকায়। ফাঁদে পড়ে চিৎকার করে প্রতিবাদ করে ওঠে তর্পণা, ‘মিথ্যে কথা।’

স্বয়ম্ভু শান্তই থাকে। নরম সুরে বলে, ‘নন্দিনী আরেকটু ছোট হলে সবার সামনে ওর পিঠের দিকের জামা নামিয়ে দেখিয়ে দিতে পারতাম। একদিনে মারার সময় আপনার হাতে একটা পেন ছিল। অসাবধানতাবশত সেটা পিঠের মধ্যে গেঁথে যায়। আপনি তার চিকিৎসা করান এটা সত্যি। কিন্তু মারটা মেরেছেন আপনি। এরকম আরও আছে। শ্রাবণ মাসের ভরা বৃষ্টিতে রাত সাড়ে আটটার সময় মেয়েটাকে রাস্তার মোড়ের দোকান থেকে রুটি আনতে পাঠান। লজ্জা করে না আপনার। ফুলের দোকানের সব কাজ এই মেয়েটিই সামলায়।’

-তর্পণা! তুমি ওর সঙ্গে এরকম করতে?

উত্তেজনায় উঠে দাঁড়িয়ে পড়ে শ্রীকুমার। ‘আমি কত ভরসা করে তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলাম ওকে। ভেবেছিলাম তুমি ওকে মায়ের ভালোবাসা দেব। আদর করে বুকে জড়িয়ে রাখবে।’

তর্পণা অস্বস্তিতে ছটফট করতে থাকে। স্বয়ম্ভূ আবার বলে, ‘আপনাকে যেদিন প্রথম জিজ্ঞাসা করি তর্পণা, যে নন্দিনীর বাড়ি কোথায়। তখন আপনি ঠিকই বলেন। মেদিনীপুরে। কিন্তু সঙ্গে এও বলেন, ওর মামার কাছে থাকত। মামি অত্যাচার করত। আজ বুঝতে পারছি, আপনি এটাও ঠিক কথা বলেছিলেন। শুধু মামির ঠিকানা মেদিনীপুরের বদলে কোলকাতা হবে। সেদিন যখন আপনি বৃষ্টির মধ্যে নন্দিনীকে রুটি আনতে পাঠান মানে যেদিন প্রিয়াংশু এসেছিল আপনার বাড়িতে, সেদিন আপনার ফ্ল্যাটের নীচে আমি আর শিবাঙ্গী ছিলাম। নন্দিনীকে ফলো করি। কারণ আগেরদিন দোকানে নন্দিনী আমায় জল দিতে এসে আমার সামনে কায়দা করে ও আরেকটা হাত পাতে। দেখি সেই হাতে লেখা, ‘আপনার ফোন নম্বর’ বলে একটা জিজ্ঞাসা চিহ্ন দেওয়া। বুঝতে পারি ও কোনও বিপদে আছে। নইলে মালকিনকে লুকিয়ে ফোন নম্বর চাইবে কেন? এদিকে কথাও বলতে পারে না মেয়েটা। তারপর বেশ কিছুদিন কেটে যায় কিন্তু নন্দিনী কিছু জানায় না ৷ কোনও ফোনও আসে না। এদিকে প্রিয়াংশুকে ফলো করতে গিয়ে যেই ওর দেখা পাই অমনি আমরা ওর পিছু নিই। সেদিনই জানতে পারি আপনার গুণকীর্তন। ওর পিঠের ক্ষতচিহ্নটা আড়ালে গিয়ে শিবাঙ্গী দেখে কনফার্ম করে। ও কোনও সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ জানে না। তাই আমাদের বুঝতে বেশ অসুবিধে হচ্ছিল। আমি ওকে আমার মোবাইলটা দিই। বলি টাইপ করে দিতে। তখনই জানতে পারি সব। ওকে আমি একটা কাজ দিই। তর্পণার সেকেন্ড মোবাইল নম্বরটা জেনে আমায় বলতে। কিন্তু ওর তো ফোন নেই । কীভাবে আমায় পাঠাবে? আমিই ওকে শিখিয়ে দিই। আগেই ফোনের লক খোলার কায়দা দেখে রেখেছিল নন্দিনী। তর্পণা স্নানে যাবার পর সেকেন্ড মোবাইল থেকে পুরনো মোবাইলে একটা মিসড কল করে। তারপর কল লিস্ট থেকে সেটা ডিলিট করে। এদিকে কল হয়নি তাই কল রেকর্ডিং ও নেই। এবার পুরনো মোবাইল থেকে সেকেন্ড মোবাইল নম্বরটা আমায় এস এম এস করে দেয়। তারপর সেই এস এম এস আর কল লিস্ট থেকে মিসড কলটা ডিলিট করে দেয়। ব্যস! এটা নন্দিনী না করলে তর্পণার সেকেন্ড নম্বরটা ট্যাপ করা অসম্ভব ছিল। আর মৃত্তিকাও বাঁচত না।’

শ্রীকুমারের দিকে দাঁতে দাঁত চেপে তৰ্পণা ফুঁসে ওঠে, ‘দেখেছ শ্রীকুমার, কেন আমি ওকে শাসন করতাম? বুঝতে পেরেছ তোমার দিদি কাকে পেটে ধরেছে? শালা বেজন্মার বাচ্চা।’ তর্পণা যত না চিৎকার করে বলল তার থেকে বেশি উত্তেজিত হয়ে মাঠের মাঝে তেড়ে আসে প্রিয়াংশু, ‘একটাও বাজে কথা বলবে না তর্পণা। মেরে মুখ ভেঙে দেব তোমার। ব্ল্যাকমেইলার, ছোট লোক। এইটুকু মেয়েকে এত অত্যাচার করেছ, পড়াশুনো করাওনি, ঠিক মতো খেতে পর্যন্ত দাও কিনা সন্দেহ। আর আমার মেয়েকে দেখতে হচ্ছে বলে প্রতিমাসে পঁচিশ হাজার টাকা করে নিয়ে গেছ তুমি? জানেন স্বয়ম্ভুবাবু এই মহিলা হঠাৎ করে একদিন নন্দিনীকে নিয়ে এসে বলে এই মেয়ের জন্য পঁচিশ হাজার টাকা করে প্রতিমাসে আমায় দিতে হবে। নইলে ডি এন এ টেস্ট করে প্রমাণ করে দেবে ও আমার মেয়ে। আমার অফিসে গিয়ে সব বলে দেবে। সেই থেকে প্রতি মাসে আমি নন্দিনীর জন্য টাকা ট্রান্সফার করেছি। কোনও মাসে দেরি হলে ঠিক সুস্মিতার বুটিকে গিয়ে হুমকি দিয়ে আসত। অথচ এখন শুনছি মেয়েটার….।’

-আমি জানি প্রিয়াংশুবাবু। আমরা আপনার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট চেক করেছি। পার মান্থ আপনার অ্যাকাউন্ট থেকে তর্পণার অ্যাকাউন্টে টাকা যায়। তখনই বুঝতে পারি তর্পণার এত লপচপানি, এত বুটিকের দামি-দামি শাড়ি পরা, এসব হয় কীভাবে? ফুলের দোকান থেকে কতই বা রোজগার? ও, আরেকটা কথা তো বলতেই ভুলে গেছি। শ্রীকুমার আরও একটা চালাকি করে অরুণার ব্যাপারে। অরুণাকে খুনের পর তমাল আর তর্পণার প্রেমটাকে এস্ট্যাবলিশ করতে এবং আসল খুনি ও খুনের মোটিভ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে দিতে আমার বাড়িতে তর্পণার দোকান থেকে কেনা ফুলের স্তবক পাঠায়। যাতে আমরা তর্পণার পিছনে পড়ে থাকি। এদিকে আসল লোক কেল্লাফতে করে বেরিয়ে যাবেন। আপনাদের কোলাবরেশন ইজ জাস্ট আনবিলিভেল।

স্বয়স্তু একটা লোক দেখানো হাততালি দিয়ে ওঠে। নন্দিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘লেখাপড়া করবি?’ ভোর হওয়ার আগেই নন্দিনীর মুখে আলো। ঘাড় নাড়ে। নেচে ওঠে ঝাঁকড়া চুলগুলো। স্বয়ম্ভু বলে, ‘আমি তোকে পড়াব।’ নন্দিনী হাসে। শিবাঙ্গী স্বয়ম্ভুর দিকে তাকায়, মুগ্ধ দৃষ্টিতে। -স্বয়ম্ভুবাবু…

প্রিয়াংশুর দিকে তাকায় স্বয়ম্ভু। ‘এতদিন দূর থেকেই তো আমি ওর জন্য খরচা করে গেলাম। এবার না হয় মেয়েটা কাছেই থাক। কথা দিচ্ছি, কোনও অযত্ন করব না। দরকার হলে আপনারা খবর নিয়ে যাবেন এসে।’ নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভূ আবার জানতে চায়, ‘কী রে? বাবার কাছে থাকবি?” নন্দিনীর চোখে অদ্ভুত সংশয়। প্রিয়াংশুর দিকে তাকিয়ে দেখে ভালো করে। প্রিয়াংশু এগিয়ে আসে নন্দিনীর কাছে। হাঁটুমুড়ে বসে। দুটো হাত জড়ো করে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে। চোখে প্রায়শ্চিত্তের সরোবর। তার থেকে ঝরে পড়ে কয়েকটা ধারা। নন্দিনী তার চারটে আঙুল দিয়ে মুছিয়ে দেয়। প্রিয়াংশু মেয়ের বুকে মাথা রেখে দুহাতে জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে। শ্রীকুমার কাঁদছে না। হাসছে। কারণ সে একটা অন্য দৃশ্য দেখছে। নন্দিনীর ঝাঁকড়া চুলের আড়ালে বেরিয়ে আছে শ্রীদেবীর মুখ। একদিন তাকে যে অপমান করেছিল, মৃত্যুর অতল সাগরে নিমজ্জিত করেছিল আজ সে তার দিদির কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। শ্রীদেবীও তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে ক্ষমা করে দিল। দিদিটা তার সত্যিই পাগল ছিল।

দয়াময়ের আজ বড় কোনও শাস্তি হবে। হয়তো ফাঁসির আদেশ হবে। তা হোক। তবু আজ তার অনেকটাই শান্তি। যে উদ্ধত পাগুলো একদিন অসহায় একটা বেড়ালছানাকে পিষে মেরেছিল, পরোক্ষে তার সন্তানকে নির্মমভাবে দলে দিয়েছিল, ভালোবাসাকে ঝুলিয়ে দিয়েছিল নিকষ কালো মৃত্যুর দমবন্ধ করা ফাঁসে তাদের তিনজনকে অন্তত নিজের হাতে শাস্তি দিতে পেরেছে। নিজের পায়ের তলায় ঠিক একইভাবে পিষে মারতে পেরেছে। তাই যাবার সময় কারও প্রতি আর বিদ্বেষ নেই। তার গ্রহরাজ সত্যিই ন্যায়ের দেবতা।

তপন শুনতে পাচ্ছে একটা গান। দেখতে পাচ্ছে একটা দৃশ্য। স্বপ্ন নয়, একদিন এটাই সত্যি ছিল। সন্ধেবেলা সরযু ঠাকমার দাওয়ায় বসে আমতেল দিয়ে মাখা মুড়ির বাটি হাতে নিয়ে তপা আর শ্রীদেবী এক মনে গান শুনছে। দেয়ালে মাথা হেলিয়ে সরযু ঠাকমা গাইছে, ‘ভালোবেসে মরি যদি সেও ভালো, ঘর বেঁধে যদি মরি আরও ভালো। এসো এসো হে বঁধু জ্বলিতে জ্বলিতে মরণ আমার ভালো লাগে। কপালের লিখা সিঁদুরে ঢাকিয়া পথ চাওয়া আজও হল না, হল না। যদিও রজনি পোহালো তবুও দিবস কেন যে এলো না এলো না…!’ ঠাকমা আপন মনে গান গেয়ে চলেছে আর তপা আড়চোখে ঠায় চেয়ে আছে শ্রীদেবীর মুখের দিকে। ঝাঁকড়া পাগলিটা দেখেও দেখে না যে। আর দেখলেও বোঝে না কিছু

তর্পণা আর দীপাকেও পুলিশ গ্রেপ্তার করে খুনের সঙ্গে যুক্ত থাকার জন্য । মোটামুটি আসর যখন ফাঁকা। প্রিয়াংশু দাঁড়িয়ে তার নন্দিনীকে নিয়ে, মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে তার দেবীকে কোলে নিয়ে। দীপায়ন দাঁড়িয়ে তার ঘৃণা আর সংশয় বুকে নিয়ে তখন স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘মৃত্তিকা ম্যাডাম, এবার যে আপনার সুন্দর করে বাঁধা খোঁপাটি খুলতে হবে।’ দীপায়ন সবার আগে মৃত্তিকার দিকে তাকায় এক গোছা অবিশ্বাস নিয়ে। খোঁপার মধ্যে মৃত্তিকা কী কিছু লুকিয়ে রেখেছে নাকি? স্বয়ম্ভূ হাসতে হাসতে বলে, ‘আপনার খোঁপার মধ্যে ছোট্ট একটা যন্ত্র আছে। জিপিআরএস ট্র্যাকার। যেটা আমাদের নিখুঁতভাবে সব সময় জানান দিয়ে গেছে আজকে আপনি পার্লার থেকে বেরিয়ে কখন কোথায় যাচ্ছেন। তবেই না আপনাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম।’ মৃত্তিকার কেমন যেন ঘোর লাগছে এবার। একসঙ্গে এত রহস্যের উন্মোচন হয়ে চলেছে একটা রাতে যে সে আর আলাদা করে কিছু উপলব্ধি করার অবস্থায় নেই ।

-শিবাঙ্গী, যাও।

স্বয়ম্ভুর নির্দেশ পেয়ে শিবাঙ্গী এগিয়ে গেল। এক এক করে চুলের পরত খুলতে থাকে। স্বয়ম্ভু বলে, ‘এর ক্রেডিটটা কিন্তু সম্পূর্ণরূপে শিবাঙ্গীর। আমি এই ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। সেদিন এই কারণেই শিবাঙ্গী আপনাকে পার্লারের নাম জিজ্ঞেস করেছিল মৃত্তিকা। যে আপনার চুল বেঁধেছে সে পার্লারের কেউ নয়। আমাদের লোক।’

শিবাঙ্গী চুলের শেষ বাঁধনটা খুলে ছোট্ট মতন যন্ত্রটাকে বের করে আনে ৷ দীপায়ন দুহাত জড়ো করে স্বয়ম্ভুর কাছে এসে দাঁড়ায়। বলে, “আপনাকে ধন্যবাদ দেবার ভাষা আমার জানা নেই স্বয়ম্ভুবাবু। আজ থেকে আমরা যতদিন বাঁচব ততদিন জানব এ জীবনটা আপনারই দান।’ স্বয়ম্ভু এক গাল হাসি নিয়ে দীপায়নের জোড় করা হাতের ওপর হাত রাখে। বলে, “এটা আমার কর্তব্য। আমাদের কর্তব্য। দেখুন মানুষ ভুল করে। আবার মানুষই তা শুধরে নেয়। রাত প্রায় ফুরিয়ে এল। একটু পরেই নতুন ভোর হবে। যান, স্ত্রী আর কন্যাকে নিয়ে নতুন জীবন শুরু করুন।’ কথাগুলো মৃত্তিকার কানেও গেল। তার চোখ ভর্তি জল।

-ও হ্যাঁ, আপনি খুব ভালো লেখেন। আপনার বইটার জন্য আগাম শুভেচ্ছা রইল।

-থ্যাংক ইউ সো মাচ ।

-চলুন, আপনাদের বাড়িতে ড্রপ করে দিই।

মৃত্তিকাদের বাড়িতে ছেড়ে গাড়ি ছুটল শিবাঙ্গীর বাড়ির দিকে। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে নামিয়ে নিজে বাড়ি ফিরবে। এখন স্বয়ম্ভুই ড্রাইভ করছে। বেশ খানিকক্ষণ চুপ থাকার পর শিবাঙ্গী বলল, ‘গঙ্গার ধারে যাবেন?’ গাড়ি চালাতে চালাতে স্বয়ম্ভুর প্রায় বিষম খাবার জোগাড়। ‘মানে? এই শেষ রাতে গঙ্গার ধারে?’ শিবাঙ্গী খুব নির্লিপ্ত চিত্তে ভাবের আবেশে বলল, ‘হুম। শেষ রাত বলেই তো বলছি। ওই যে বললেন আপনি, একটু পরেই নতুন ভোর হবে। আজকের ভোরটা না হয় আমাদের দুজনের জন্যেও হোক।’ শিবাঙ্গীর কথার আঁচ লাগে স্বয়ম্ভুর মনে। শব্দের মারপ্যাঁচে কোন সুপ্ত কুঁড়িটি নব পাপড়িদল মেলে বিকশিত হতে চাইছে সেটা না বোঝার মতো শূন্য স্বয়স্তু নয়। একটু ভাবল। মনে মনে হাসল। দুরুদুরু বক্ষে স্বয়ম্ভুর উত্তরের অপেক্ষা করে রইল শিবাঙ্গী। একসময় শিবাঙ্গীর দিকে তাকিয়ে স্বয়ম্ভু হেসে বলল, ‘বেশ। তাই হোক।’

সঙ্গে সঙ্গে শিবাঙ্গী আঁতকে উঠে রে রে করে উঠল, ‘এই এই দেখে দেখে দেখে।’ স্বয়ম্ভু আচমকা হতবুদ্ধি হয়ে কোনওরকমে ব্রেক কষে দাঁড় করাল গাড়িটা। প্রতিবর্তক্রিয়ায় শিবাঙ্গীর ডানহাতটা খামচে ধরল স্টিয়ারিংয়ে রাখা স্বয়ম্ভুর বাঁ হাত। দুজনেই দেখল রাতের অন্ধকারে গুটিগুটি পা ফেলে খাঁ খাঁ করা রাজপথ পেরোচ্ছে একটি সাদা বেড়াল। গাড়িটা হঠাৎ থমকে যাওয়ায় সেও থমকে গেল। ঘাড় ঘুরিয়ে জ্বলজ্বলে দুটো চোখে গাড়ির দিকে তাকিয়ে ডেকে উঠল…..

ম্যাও!

***

2 Comments
নিঝুম May 6, 2026 at 8:48 am

অন্যসবার মতো মৃত্তিকার মৃত্যুটাও নির্মম করতে পারতেন লেখক। মা হয়েছে বলে সব ক্ষমা? আদিখ্যেতা

খুব সুন্দর একটা বই। Must read

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *