২২
বাজের আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে গেল মৃত্তিকার। পাশেই ছোট্ট মশারিটার মধ্যে শুয়ে থাকা মেয়েটা নড়ছে। কী ভাগ্য কেঁদে ওঠেনি। দরজা-জানলা বেশ ভালোভাবেই আঁটসাঁট করে বন্ধ করা। তাও বাইরে থেকে যা শব্দ ভেসে আসছে তাতে বুকের মধ্যেটা হিম হয়ে যাচ্ছে। ঘরে নীল রঙের নাইট ল্যাম্প জ্বলছে। ছ’মাসের মেয়েটা ছোট্ট ছোট্ট হাত-পাগুলো নাড়িয়েই চলেছে। খিদে পেলে মেয়েটা এরকম করে। এদিকে ব্রেস্ট ফিডও করে না। নার্সিং হোম থেকে বাড়িতে আসার পর থেকেই কৌটোর দুধ খায় মেলে। মৃত্তিকার পাশের বিছানা খালি। এত রাত হল এখনও দীপায়ন লেখাপড়া করছে? উফফফ! একটু যে মেয়ের পাশে এসে বসবে সে সময়টুকু নেই। বিছানা ছেড়ে টেবিলের কাছে গেল মৃত্তিকা। বাইরে আবার একটা বাজ পড়ল। দুধের কৌটো হাতে নিতেই দেখল তাতে দুধ নেই। খেয়াল হল আগের দুধ সব ফুরিয়ে গেছে বলে দীপায়নকে দুধ আনতে বলেছিল। কিন্তু সে কী এনেছে? এখন মেয়েকে ঘরে একা রেখে বেরোতে হবে। ঘুম চোখে টলতে টলতে ঘর থেকে বেরোল মৃত্তিকা। ডাইনিং ঘুটঘুটে অন্ধকার। খুব সন্তর্পণে ঘরের দরজাটা ভেজিয়ে দিল। দু-পা এগোতেই অবাক হল সে। অন্য সময় দীপায়নের পড়ার ঘরে আলো জ্বলে। সেটা দরজা বন্ধ থাকলেও বোঝা যায়। বন্ধ দরজার নীচ দিয়ে আলোর রেখা চোখে পড়ে। কিন্তু আজ তো সেটা দেখতে পাচ্ছে না! মৃত্তিকার গা-টা কেন কে জানে ছমছম করে ওঠে। সকালে ওইরকম বীভৎস ভিডিয়োটা মৃত্তিকাকে ভীষণ ভয় পাইয়ে দিয়েছে। কে জানে, ওর কপালে কী নাচছে! দীপায়ন কী ওই ঘরেই ঘুমিয়ে পড়ল? বন্ধ দরজার কাছে এসে দীপায়নের নাম ধরে গলা চেপে দু-তিনবার ডাকল মৃত্তিকা। বাইরের ঝলসে ওঠা বাজের আলো ডাইনিংয়ে পড়তেই কী যেন একটা নড়ে উঠল। আঁতকে উঠে পিছনে তাকাল মৃত্তিকা। এক দলা অন্ধকার যেন চোখের পলকে সরে গেল। পরের ডাকটায় গলাটা কেঁপে উঠল মৃত্তিকার। দীপায়নকে কতবার বলেছে একটা রাতের আয়াও রাখতে। প্রত্যেকবার বাজে খরচের হিসেব দেখিয়েছে। এদিকে নিজেও পাশে থাকবে না। দিনরাত খালি ঘরে দোর দিয়ে বই মুখে করে বসে থাকবে। ‘এই দীপায়ন, শুনছ? কী গো?’ দরজার ওপর একটু চাপ দিতেই পাল্লা দুটো খানিকটা ফাঁক হয়ে গেল। দরজা খোলা! অন্যদিন তো ভিতর থেকে কষে বন্ধ করা থাকে। ডাকলেও সাড়া পাওয়া যায় না বলে ও ঘর থেকে এ ঘরে ফোন করতে হয়। বেচারা এই ঘরেই ঘুমিয়ে পড়েছে। মৃত্তিকা দরজা ঠেলে ঢুকে পড়ল। ‘এই শুনছ, মেয়ের দুধ এনেছিলে তুমি?’ অন্ধকার থেকে কেউ সাড়া দিল না। ঘরে দেয়াল হাতড়ে সুইচ টিপে দিল। ঘরটা আলোকিত হয়ে উঠল। পিছনে ফিরতেই চিৎকার করে উঠল মৃত্তিকা। ভয়ানক দৃশ্যটা দেখে বইয়ের ক্যাবিনেটে পিঠ ঠেকে যেতেই কয়েকটা বই দুমদাম করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। দীপায়নের রক্তাক্ত শরীরটা বইয়ের টেবিলের ওপর থেকে ঝুলে আছে। বুক, পেট থেঁতলে রক্ত-মাংস, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। চোখ উলটে বিস্ফারিত। জিভটা বাইরে বেরিয়ে এসে মুখের ডান পাশ দিয়ে লকলক করে ঝুলছে। টেবিল চুঁইয়ে মাটিতে নেমে আসছে গাঢ় তাজা রক্তের ধারা। চোখে অন্ধকার নেমে আসছে মৃত্তিকার। বাইরে বাজের তাণ্ডব আর বৃষ্টির উন্মত্ত লীলা আরও যেন বেড়ে গেছে। জোর করে চোখ টেনে ধরল মৃত্তিকা। মনে পড়ল ঘরে মেয়ে একা শুয়ে। কিন্তু দরজা-জানলা সব ভালো করে বন্ধ। তাহলে কে খুন করে গেল?
গেল?
নাকি এখনও এই বাড়িতেই আছে! ভারতেই বাইরের বৃষ্টি অঝোরে নামল মৃত্তিকার চোখের কোল বেয়ে। মোবাইলটা বিছানাতেই পড়ে আছে। পা দুটো প্রচণ্ড ভারী হয়ে গেছে মৃত্তিকার। কিছুতেই নড়াতে পারছে না । বাড়িতে ঢুকে এইরকম নৃশংসভাবে মেরে দিয়ে গেল আর ও কিচ্ছুটি টের পেল না? গলা ছেড়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে ওর। কিন্তু কেউ যেন ওর মুখ চেপে ধরে ফিসফিস করে বলছে, ‘চুপ চুপ। চিৎকার করিস না। সে শুনে ফেলবে। সে যে এখনও এই বাড়িতেই ঘুরে বেড়াচ্ছে! পা দিয়ে চেপে পিষে মেরে ফেলবে তোকে।’ দমটা বন্ধ হয়ে আসছে মৃত্তিকার। কিন্তু আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। ঘরে তাকে যেতেই হবে। মেয়েটাকে বাঁচাতে হবে। নিজের ভিতর থেকেই নিজেকে ঠেলে ঘরের বাইরে নিয়ে এল মৃত্তিকা। নিশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে খুব। সত্যিই কেউ যেন দুটো পায়ের চাপে হৃদপিণ্ডটাকে পিষে দিতে চাইছে। কে দাঁড়িয়ে আছে বুকের ওপর। হঠাৎ বাজের আওয়াজ ভেদ করে একটা সুর ভেসে এল। থমকে গেল মৃত্তিকা । কে গুনগুন করে গাইছে? কে? একটা লোকের গলা। না না, লোক নয়, ছেলে। মৃত্তিকা স্পষ্ট বুঝতে পারছে একটা কিশোর বয়স্ক ছেলেই গাইছে গানটা। ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুজে দম দমা দম!’ ঘর থেকে ছ’মাসের মেয়েটা কঁকিয়ে কেঁদে ওঠে। মৃত্তিকার হৃদযন্ত্রটা এবার পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। সেটা আর ফুলছে না। চুপসেও যাচ্ছে না। সব ভয়কে উপেক্ষা করে দৌড়ে ঘরে যায় মৃত্তিকা। দরজা খুলতেই নীল নাইট ল্যাম্পের আলোয় একটা কালো অন্ধকার যেন দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা বিছানায় নেই। সেই আগন্তুক আততায়ীর কোলে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো জোব্বায় ঢাকা মানুষটা গানটা গেয়েই চলেছে। মৃত্তিকা কান্না জড়ানো কাঁপা গলায় চিৎকার করে ওঠে, ‘ছেড়ে দাও আমায় মেয়েটাকে।’ লোকটি কথা শোনে। বলা মাত্রই কোলে ধরে থাকা মেয়েটিকে ছেড়ে দেয়। ছ’মাসের মেয়েটি আছড়ে পড়ে মাটিতে। বাচ্চাটির কঁকিয়ে ওঠা শেষ কান্নার সঙ্গে মিশে যায় মেয়ের নাম ধরে ডেকে ওঠা মৃত্তিকার আর্ত চিৎকার, শ্রীদেবীইইইইইই।’
‘ম্যায় তেরি দুশমন, দুশমন তু মেরা, ম্যায় নাগিন তু সাপেরা… ম্যায় নাগিন তু সাপেরা…’
-উফফ! কিছু নাচত!
কচুরিতে কামড় দিয়ে কথাটা বলল স্বয়ম্ভু। চোদ্দ ইঞ্চি রঙিন টিভিতে শ্রীদেবীর নাচ আজও সুপারহিট। শুধু শিবাঙ্গীই বুঝতে পারছে না সাত সকালে কী কারণে এই মৌলালিতে এনে নাস্তা করাচ্ছে তার বস। ‘কী গো কিছু বলো।’ শিবাঙ্গী অমনি গেয়ে উঠল, ‘আমার বলার কিছু ছিল ন । ব্যোমকে গেল স্বয়ম্ভু, ‘আরিত্তারা! গলায় তো দিব্যি সুর আছে?”
-মা ঘাড় ধরে দুবেলা রেওয়াজে বসাতো। রবীন্দ্রসঙ্গীতে ফিফথ ইয়ার আর নজরুলগীতিতে থার্ড ইয়ার কমপ্লিট। -বলো কী?
-বাজে কথা রাখুন। এত সকালে এখানে আমরা এসেছি কেন জানতে পারি? তার ওপরে এই কচুরি!
-ভালো না?
-মোটেও না ।
-যাহ! ভাবলাম তোমার ভালো লাগবে তাই নিয়ে এলাম। আর তোমার ভালোই লাগছে না?
-বুঝেছি। নির্ঘাত নির্দিষ্ট সময়ের আগে চলে এসেছেন তাই এইভাবে সময় কাটাচ্ছেন। একা একা বোর হবেন তাই আমায় ডেকেছেন৷
স্বয়স্তুর গলাটাই পালটে গেল। তুলতুলে রসগোল্লার মতো নরম মিষ্টি স্বরে বলল, ‘তোমার ভালো লাগছে না? সত্যি করে বলো!’
এ কী! স্বয়ম্ভু সেনের মুখে এ কেমন কথা! ঠাট্টা করছেন কি? শিবাঙ্গীর কথা হারিয়ে গেল কেন? হঠাৎ এই কথা কেন বলছেন উনি? ওনার শিবাঙ্গীর সঙ্গ সত্যি ভালো লাগে নাকি গতকাল শিবাঙ্গী খাবার কথা জিজ্ঞেস করে একটু বেশিই দরদ দেখিয়ে ফেলেছে বলে আজ আচ্ছা করে চাটছেন! এই লোকটার হাবভাব বোঝা বোধকরি শিবেরও অসাধ্য।
-বাবা রে বাবা! একটা সহজ কথাই তো জিজ্ঞেস করলাম ভাই। এতে এত কীসের ভাবনা?
-না না ভাবছি না।
লজ্জা পেল শিবাঙ্গী ।
-ভেবো না। ভালো না লাগলেও কচুরি খাও। সিনিয়াররা যা দেয় জুনিয়রদের তাই হাসিমুখে খেতে হয়। এটা সর্বদা মনে রাখব। শিবাঙ্গী হাসল ।
-আসলে কী বলো তো শিবাঙ্গী, কোনও বড় কাজে যাবার জন্য একটু খেয়েদেয়ে বুদ্ধি বাড়িয়ে নিতে হয়। পেটে না পড়লে তো ঘটে কিছু ঢোকে না, না?
-কার?
-অবভিয়াসলি তোমার!
-ভালোই তো খোঁটা দিতে পারেন। শুধু কচুরিটা যদি ভালো দোকানে হত তাহলে কাজের কাজ হত।
-ভালো করে কাজ কর। খাওয়াব।
-মাংসের খিচুড়ি।
চোখ উল্টিয়ে তাকাল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী যেন দেখতেই পেল না এমন ভান করে কচুরি চিবোতে লাগল।
স্বয়ম্ভুদের গাড়িটা সুরিলেনের মধ্যে ঢুকেছে। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে স্বয়স্তু এক পথচারীকে প্রশ্ন করল, ‘দাদা, সতেরোর বাই দুইটা কোথায়?” লোকটি পিছন ফিরে আঙুল তুলে দেখিয়ে বলল, ‘একদম সোজা চলে যান। রাস্তাটা ডানদিকে বেঁকে বাঁদিক নেবে। বাঁকের থেকে ডানহাতে চারটে বাড়ি পরেই সতেরোর বাই দুই ‘
-থ্যাংক ইউ দাদা।
গাড়ির কাচ তুলে তপনকে এগোতে বলল। শিবাঙ্গীর মোবাইলে লোকেশন ম্যাপ খোলা আছে৷ এক জায়গায় আসতেই শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘এই তো স্যার সতেরোর বাই দুই। তপন গাড়ি থামাও।’ গাড়ি থামল। শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভু নামল। শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার পরশুদিন এখান দিয়েই এলাম না?’ স্বয়ম্ভূ শুধু একবার হুম বলল ।
-স্যার এখানেই তো ওই পুরোহিতের বাড়ি।
স্বয়ম্ভু ভুরু কুঁচকে তাকাল। ‘এখানেই আশেপাশে কোথাও।’ তখন তপন বলল, ‘ওই কাপড়ের গাঁঠরি তুলছিল তো যে?’ শিবাঙ্গী বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ । এখানেই না?’ তপন বলল, ‘মনে হচ্ছে আরেকটু এগিয়ে গিয়ে গাড়িটা দাঁড়িয়ে ছিল। ওই সামনে যে ডানদিকে রাস্তাটা বেঁকেছে ওইদিকে।’ -রাইট রাইট।
শিবাঙ্গী বলল। স্বয়ম্ভু চারপাশটা ভালো করে দেখছিল। বলল, ‘এইখানে, এই সতেরোর বাই দুই বাড়ির সামনেই দীপায়নের বাইক থেমেছিল পরশু।’ -নক করি?
-চলো।
শ্যাওলা রঙের দরজায় কারও নাম নেই। কেবল মোটা দুটো লোহার কড়া ঝুলছে। সেটা ধরেই তিন-চারবার নাড়তে ভিতর থেকে দরজা খুলে গেল। তারপরেই দরজার এপার আর ওপারে অপার নীরবতা। এক তরফ বলল, ‘তোমরা!’ আরেক তরফের প্রশ্ন, ‘আপনি?’ পরের প্রশ্নটা ধেয়ে গেল স্বয়ম্ভুর দিক থেকে, ‘এই বাড়িটা আপনার?’
-অ্যাঁ হ্যাঁ। কেন? মানে তোমরা আমার কাছে!
মিশ্রঠাকুর বাড়িতে গোয়েন্দা দেখে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। মুহূর্তের মধ্যে স্বয়ম্ভুর স্বর পালটে গেল। ভাব বদলে গেল। কপাল চুলকে হেসে ফেলল। বলল, ‘দেখেছেন তো। দিনরাত খুনে ডাকাত, চোরছ্যাঁচড়দের পেছন পেছন ঘুরতে ঘুরতে মাথাটাই কাজ করে না। আমি আসলে আপনার কাছেই এসেছিলাম। ভাবলাম এই বাড়ির লোককে জিজ্ঞেস করি আপনার বাড়িটা কোনটা? কিন্তু এটাই যে আপনার বাড়ি ভাবতে পারিনি। সেদিন রাতে অন্য একটা জায়গায় দেখলাম আপনাকে তাই… যাক গে। আসতে পারি?’
-হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চয়ই। এসো এসো।
শিবাঙ্গী একদম চুপ। খেলা কোনদিকে ঘুরতে চলেছে বুঝতে পারছে না । শুধু এটুকু বুঝছে স্যার যেদিকে খেলা ঘোরাবে ওকেও সেদিকেই খেলতে হবে। সরু অন্ধকার প্যাসেজটা দিয়ে ঢুকতে ঢুকতেই বোঝা যায় বাড়িটা বহু প্রাচীন। দরজা দিয়ে ঢুকে খানিকটা গেলে ছোট্ট মতন একটা উঠোন। সেখানে ঘরের ঘুলঘুলি দিয়ে আলো আসার মত এক ফালি আলো মাথার ওপর খোলা আকাশ থেকে নামছে। বাড়িটার হাড়গোড় বেরিয়ে পড়েছে।
কেমন একটা চামসে গন্ধ। না, শুধু চামসে গন্ধ নয়। সঙ্গে আরও একটা বোটকা গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মারছে। এই ধরণের বাড়িগুলোতে এমন গন্ধ হামেশাই পাওয়া যায়। মিশ্রঠাকুর ছোট্ট উঠোনে এসে বেশ গলা তুলে বলে ওঠেন, ‘কোলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা আমার বাড়িতে এসেছেন এটা ঠিক আমার জন্য আনন্দের না ভয়ের সেটাই বুঝতে পারছি না।’
-আমরা তো সামনেই আছি পুরোহিতমশাই। এত চিৎকার করার কী আছে?
বোকা বোকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল মিশ্রঠাকুরের মুখে। সৌজন্যের হাসি ঠোঁটে নিয়ে বললেন, ‘আহ…আসলে, উত্তেজনায়। যত বয়স বাড়ছে ততই যেন অল্পেতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ছি।’
-কত বয়স আপনার?
ফস করে এমন একটা প্রশ্ন যে করা হবে বুঝতে পারেননি মিশ্রঠাকুর। -না… মানে, আমার বয়সের কী আর গাছপাথর আছে বাবা। বলো বলো, আমার কাছে কী দরকারে এসেছ?
স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী একবার চোখাচোখি করে নিল। দুজনেই বুঝেছে বয়সের কথা উনি বলতে চান না। স্বয়ম্ভু বলল, ‘একটু বসে কথা বললে ভালো হত।’ এবার বেশ লজ্জায় এবং অস্বস্তিতে পড়লেন মিশ্রঠাকুর। এই ভাঙাচোরা বাড়ি, স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল, শ্যাওলা পড়া উঠোন। এখানে কোথায় যে বসতে দেবেন ভেবে পেলেন না। অবশেষে নিজের ঘরেই নিয়ে গেলেন। যত্ন করে চাদর ঝেড়ে বসালেন। স্বয়ম্ভুর কাশি শুরু হল হঠাৎ করেই। মিশ্র তড়িঘড়ি দৌড়লেন রান্নাঘরের দিকে। কাশতে কাশতেই স্বয়ম্ভুর চোখ বনবন করে ঘরের কোণায় কোণায় ঘুরে নিল। চাদর তুলে খাটের তলা, আলমারির খাঁজ, আলনায় কাপড়-জামার আড়াল সবকিছু ছানবিন করে আবার নিজের জায়গায় বসল। ইতোমধ্যে জল হাতে চলে এসেছেন মিশ্রঠাকুর। স্বয়ম্ভু ঢক ঢক করে পুরো জলটা খেয়ে ফাঁকা গ্লাসটা খাটের পাশের টেবিলে রাখলেন। ‘বলো বাবা, আমি কী দরকারে লাগতে পারি।’ স্বয়ম্ভু গলা ঝেড়ে বলল, ‘আসলে আমার এক দাদার বিয়ে। এই সামনের মাসেই। আমার ইচ্ছে এই বিয়েতে আপনি পৌরহিত্য করেন। না করতে পারবেন না।’ -ওরে বাবা! না কেন করব? এ আমার সৌভাগ্য বৈ কি! তা কবে বিয়ে?
-একুশে অগাস্ট। ওই দিনটাই সবচেয়ে ভালো । -কোথায়?
-বেহালা। পর্ণশ্রী।
-ওরে বাবা। সে তো বিস্তর দূর। এই বয়সে আমি…. শুরুতেই বলেছি ঠাকুরমশাই। না বললে শুনব না। এখানে আপনার যা নাম-ডাক সে তো আর এমনি নয়। আমি সব খোঁজ নিয়েছি।
-গোয়েন্দা বলে কথা। খোঁজ তো নেবেই। বেশ। তুমি যখন বলছ তখন আমিই করব।
-নিশ্চিন্ত হলাম। উঠি ঠাকুরমশাই।
বলেই দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। মিশ্র অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘প্রথমবার এলে। শুধু মুখে যেতে হচ্ছে। ভাগ্নেটাও নেই যে একটু মিষ্টিফিষ্টি কিছু…।’
-ওসব কিচ্ছু লাগবে না। আপনার ভাগ্নে কোথায়?
-কাজে গেছে।
-এত সকালে শাড়ির দোকান খুলেছে?
-অ্যাঁ? না না, দোকানে তো পরে যায়। আগে তো ওকে গোডাউনে যেতে হয় ৷
-ও আচ্ছা। আজ তাহলে চলি ঠাকুরমশাই! তারিখটা মনে রাখবেন, একুশে অগাস্ট ।
আলতো হেসে ধীরে ধীরে ঘাড় নাড়লেন মিশ্রঠাকুর। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী গাড়িতে উঠে সামনে গিয়ে ডানদিকে বেঁকে গেল। মিশ্রঠাকুর হাসলেন। দরজা বন্ধ করতে করতে আপন মনে বিড়বিড় করলেন, ‘পাগল গোয়েন্দা একটা। সাত সকালে এসে ফাজলামো করে গেল! হে হে হে হে!’
ভিতরে আসতেই একটা ছায়া সিঁড়ির আলো থেকে মিশ্রঠাকুরের সামনে এসে দাঁড়াল। মিশ্রঠাকুর বললেন, ‘হুঃ! বীরপুঙ্গব একেবারে। আমি পুলিশের ভয়ে রাতে ঘুমোতে পারছি না বলে আমায় সান্ত্বনা দিচ্ছে। এদিকে বাড়িতে যেই গোয়েন্দা এল অমনি ঘরের কোণে সেঁধিয়ে গেলেন।’ তিরু জানতে চাইল, ‘কী বলল?’ হাসলেন মিশ্রঠাকুর। বললেন, ‘কী আর বলবে? অসহায় ন্যালাভোলা পুরুতের সঙ্গে একটু মশকরা করে গেল।’
-মানে?
মিশ্র ঘরের দিকে যাচ্ছিলেন। ফিরে তাকালেন ভাগ্নের দিকে। চোখের মণিদুটো শানিত তলোয়ারের মতো ঠিকরে আসা আলোয় ঝিকিয়ে উঠল তার। বললেন, ‘ভাদ্রমাসে ওনার দাদার বে দিচ্ছেন। আর সেই বে নাকি আমায় দিতে হবে।’ আবারও খ্যাঁকখ্যাঁক করে হাসতে হাসতে ঘরের দিকে যাবে বলে পা বাড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে আবারও দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। মিশ্রঠাকুর আর ভাগ্নে দুজনেই মুখোমুখি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন । বাইরের দরজায় দুবার কড়া নাড়ার শব্দ হতেই আরও একটা দিক থেকে দরজা ধাক্কাবার শব্দ হতে থাকে। তিরু অবাক হয়ে বলল, ‘পিছন দরজা কে ধাক্কাচ্ছে?’
-পাড়ার কেউ হবে হয়তো দেখ। আমি এদিকটা দেখছি। তুই আবার চট করে এধারে আসিস না।
দুজন দুদিকে চলে গেল। মিশ্রঠাকুর দরজা খুলতেই দেখলেন ওই গোয়েন্দার মেয়ে সহকারীটা দাঁড়িয়ে। শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার বোধহয় মোবাইলটা আপনার ঘরে ফেলে গেছেন । ‘
-ও হো। এসো এসো।
ওদিকে তিরু দরজা খুলতেই মাথায় বাজ। সানগ্লাস চোখে এঁটে দাঁড়িয়ে আছে গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন। স্বয়ম্ভু বিস্মিত হবার ভান করে বলল, “তুমিই তো মিশ্রঠাকুরের ভাগ্নে তিরু।’ আর তো লুকোবার উপায় নেই। তাই বাধ্য হয়েই ঘাড় নাড়তে হল।
-আমি তোমার মামাকে ভুল ডেট বলেছি জানো তো? দেখি সরো তো, আরেকবার গিয়ে বলে আসি 1
তিরু কিছু বলার আগেই স্বয়ম্ভু প্রায় হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ে। ঢুকেই বলে, ‘তোমাকে তো প্রচুর শাড়ি বাড়িতে এনে রাখতে হয় না?’ -হুম ।
-ইসসস কী কষ্ট। কিন্তু বাড়ির পেছন দিয়ে কেন আনো? এইরকম একটা ভয়ানক সরু গলি। তার ওপর আবার বাঁক। একটা মানুষই ঠিকমত যেতে পারে না। এবার থেকে সামনের রাস্তা দিয়ে মাল ঢোকাবে। যাক গে, তোমার মামাকে বলে আসি।
ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেও মোবাইলটা পাওয়া গেল না। শিবাঙ্গী প্ৰায় বোকার মত বাইরে বেরিয়ে এল। মিশ্রঠাকুর বললেন, ‘ওই মোবাইলে একটা কল করে দেখুন না ।’
-করেছি। বাজছে। কিন্তু কেউ ধরছে না। সাইলেন্ট করা আছে তো।
এই সময়েই মিশ্রঠাকুরের চোখ পড়ে স্বয়ম্ভুর দিকে। পিছনের প্যাসেজ দিয়ে হেঁটে আসছে। ‘দেখুন তো ঠাকুরমশাই, আবার গণ্ডগোল পাকিয়ে ফেলেছি। আপনাকে সম্পূর্ণ ভুল তারিখ বলে গেছি। ওটা একুশে অগাস্ট হবে না। পনেরোই অগাস্ট। একুশ তারিখটা তো ভাদ্র মাস পড়ে যাচ্ছে। হিন্দুদের কী ওই মাসে বিয়ে হয় নাকি? এদিকে আপনিও কিছু বললেন না। দিব্যি বললেন ওই দিন যাবেন। কী কাণ্ড হত বলুন তো?”
-পৌষেও বিয়ে হয় না। কিন্তু সে মাসেও আমি বিয়ে দিয়েছি। আসলে যারা বিদেশে থাকে তারা ওই মাসটায় ছুটি পায়। তাই দেশে ফিরে ওই সময় বিয়ে সেরে নেয়। আমিও সেরকমই কিছু ভেবেছিলাম ।
মিশ্রঠাকুরের মাথা থেকে পা পর্যন্ত মেপে নিল স্বয়ম্ভু। লোকটা ধূর্ত না বুদ্ধিমান?
-আপনার ভাগ্নে কখন এল? বললেন যে কাজে চলে গেছে ৷
-এই তো তোমরা ডানদিকে গেলে। আর ও বাঁদিক দিয়ে মানে মেন রোড দিয়ে এল। গোডাউনের একটা চাবি ওর কাছে ছিল। নিতে ভুলে গিয়েছিল।
-অ। তা এখন নিয়েছ তো তিরু?
তিরু নীরবে ঘাড় নাড়ল। ‘আপনার ভাগ্নেটি কথা কম বলে না?’ স্বয়ম্ভুর প্রশ্নে উত্তর দেবার সময়েই ঠাকুরমশাইয়ের ফোনটা ট্যাংট্যাং করে বেজে উঠল। আদ্যিকালের সেট। ফোনের রিংটোনটা কান জ্বালিয়ে দিল। ‘হ্যাঁ বলুন।’ ঠাকুরমশাই ফোনে কথা বলতে লাগলেন। ‘না না।… হ্যাঁ ঠিকাছে। আরে বাবা বুঝতে কেন পারছ না?… উফফফ কী করে বোঝাই! শোনো আমি পরে কথা… হ্যালো। হ্যালো… ধুস! নেটওয়ার্ক হয়েছে এক। একটা কথা ঠিক মতো বলা যায় না।’ নিজের মনে গজর গজর করে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকালেন। স্বয়ম্ভু বলল, ‘দেখেছেন, আবার ভুলে যাচ্ছিলাম। আপনার ফোন নম্বরটাই নেওয়া হয়নি। দিন দিন। এই শিবাঙ্গী, আমার ফোনটা তো পাচ্ছি না। তোমারটায় একটু সেভ করে নাও তো ।
-ইয়েস স্যার।
মিশ্রঠাকুর সবে বলতে শুরু করেছে, ‘নাইন এইট থ্রি ফাইভ…’ ট্যাং ট্যাং ট্যাং, আবার ফোনটা ঝনঝনিয়ে উঠেছে। মুহূর্তে ফোন রিসিভ করেই মিশ্রঠাকুর বলে উঠলেন, ‘মইলে ভনে পছারি কল গরছু। ফরেস্ট কো ছৌমা এতি কমতিমা হুদাইনা। পরে কল গরছু। (আমি বললাম তো পরে কল করছি। ফরেস্টের কাছে এত কমে হবে না। ব্যস্ত আছি। পরে কল করছি। ‘ বলেই ফোনটা কেটে দিলেন। কথার ধরণ শুনে মনে হল মিশ্রপুরোহিত ফোনের ওপারের লোকের প্রতি বেশ বিরক্ত। স্বয়ম্ভুর মুখের দিকে চাইতেই কিছু একটা আঁচ করলেন ঠাকুরমশাই। শিবাঙ্গী আর স্বয়ম্ভুর মুখে নির্বাক বিস্ময়! তিরু যেন একটু ছটফট করছে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘বাবা! উত্তেজনায় আপনি নেপালিও বলেন? নেপালে কোনও আত্মীয়-টাত্মীয় থাকেন নাকি?” মিশ্র কী বলবে বুঝতে পারে না। আমতা আমতা করে বলেন, ‘না না, নেপালে কেউ নেই। ওই চাকরিসূত্রে মেদিনীপুরে এক নেপালি বন্ধু জুটেছিল। তার সঙ্গে থাকতে থাকতেই এই ভাষাটা জেনেছি। সেই ফোন করেছিল।’
-বাহ! দারুণ ব্যাপার। কিন্তু কর্মসূত্রে মানে? আপনি চাকরি করতেন?
-হ্যাঁ, ওই বাবার ঠ্যালায় পড়ে ওখানকার কারখানায় কাজ শুরু করি। তারপর আর মন টেকে না। শনি মহারাজ ডেকে নেন। সেই থেকে পুজো করছি।
বটেই তো। বড় ঠাকুরের ডাক স্বর্গের কোনও ঠাকুর এড়াতে পারেন না, সেখানে মিশ্রঠাকুর এড়াবেন কী করে? তা বলছিলাম এই বাড়িটা তো আপনাদেরই?
মিশ্র ভালোই বোঝেন ঠারেঠোরে ঠিকুজিকুষ্টি জেনে নিচ্ছে গোয়েন্দাটি ।
‘হ্যাঁ আমাদেরই। ঠাকুরদার বাবা তৈরি করেছিলেন।’
-বাআআবাআ! শতাব্দী প্রাচীন! চলি ঠাকুরমশাই। ও হো, ফোন নম্বরটাই তো পুরো নেওয়া হল না।
মিশ্রঠাকুর ফোন নম্বরটা আবার বলেন। শিবাঙ্গী সদর দরজার দিকে এগোতে থাকলে স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘শিবাঙ্গী, গাড়ি তো পেছন দরজায়। ওদিকে চলো।’ তিরুর মুখের সামনে দাঁড়িয়ে এক গাল হেসে স্বয়ম্ভু বলে, ‘আসি তিরুবাবু। আবার দেখা হবে।’ কথাটায় কী কোনও শ্লেষ ছিল! তিরু সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
গাড়িতে উঠেই শিবাঙ্গী খেয়াল করল স্বয়ম্ভুর মুখে আলতো হাসি চলকাচ্ছে।
-স্যার হাসছেন? তার মানে ব্লু পেয়েছেন কিছু?
-ব্লু বলে ব্লু? অনেক কিছু মিলে যাচ্ছে!
-একটু শুনতে পারি?
-তার আগে তুমি কী বুঝলে বলো।
-আমি বুঝলাম বলতে, এই বাড়িটা আর এই লোকটা মানে মিশ্রঠাকুর বেশ রহস্যময়। পুরোহিত বেশ বুদ্ধিমানও। ভাগ্নে নেই বলে যে ঢপটা মেরেছিল সেটা শুধু ম্যানেজ করল তাই নয়, আপনার বলা ভাদ্র মাসে বিয়েটাও যে ভুল ছিল সেটা শুরুতেই ধরতে পেরেছিল।
-কারেক্ট। তাই পয়সাকড়ির কথা জিজ্ঞেসই করেনি। আর?
-মিশ্রঠাকুর ভুল ম্যানেজ করতে ওস্তাদ উইথআউট এনি ফাম্বেল অ্যান্ড হেজিটেশন ।
-আর?
-উমমম….
ভাবল শিবাঙ্গী। তারপর বলল, ‘আর একটা প্রশ্ন, বাড়ির সামনে অমন বড় দরজা থাকতে পিছনের দরজা দিয়ে কাপড়ের গাঁঠরি তোলে কেন? -আর?
শিবাঙ্গী এবার একটু অস্বস্তিতে পড়ল। ‘আরও?’
-সবথেকে বড় জিনিসটাই তো বললে না ।
-কোনটা?
-লোকটা শুরুর দিন থেকেই মিথ্যে বলে গেছে আমাদের। যারা মেদিনীপুরের লোক হয় তারা চট করে মে-দি-নী-পুর বলে না। মিদনাপুর বলে। কিন্তু মিশ্রঠাকুর পরিষ্কার করে বললেন, মেদিনীপুর। কথায় কোনও মেদিনীপুরের টানও নেই। উপরন্তু নেপালি ভাষায় বেশ পোক্ত। লোকটা ভিতরে ভিতরে সত্যিই আমাদেরকে দেখে ভয় পেয়েছে। স্পেশ্যালি আজকে।
কিন্তু শুরু থেকেই যেন কিছুই হয়নি সেরকম শান্ত গলায় আমাদের সঙ্গে কথা বলছিল। অথচ ব্যাটার বুকের মধ্যে দোদোমা ফাটছিল। হঠাৎ করে ফোনটা আসায় সেটাই বেরিয়ে আসে। সঙ্গে নেপালি ভাষা ।
-কিন্তু ওনাকে দেখে তো নেপালি মনে হয় না।
-তোমায় দেখে কী হিন্দিভাষী মনে হয়? নাকি ব্রিটিশ মনে হয়? কিন্তু তুমি তো হিন্দি আর ইংলিশটা ভালোই বলো।
-তার মানে ওই নেপালি বন্ধুর কেসটা সত্যি?
-ধুস। ওটাও ডাহা ঢপ। লোকটা এমন কোনও জায়গায় থাকত যেখানে নেপালি বলার চল আছে এবং জঙ্গল আছে। আমি শিওর সেখানে ওর কোনও বাড়িও আছে।
-কী করে?
-নেপাল বাদে কোথায় কোথায় নেপালি লোক থাকতে পারে?
-পাহাড়ে। মানে সিকিম, দার্জিলিং এইরকম নর্থ সাইডে।
-কিন্তু সেখানে জঙ্গল আছে কী?
শিবাঙ্গী চুপ করে ভাবল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘কোথায় গেলে লোকে জঙ্গলের কাছে থাকতে চাইতে পারে?’
-ডুয়ার্স!
-সেই সম্ভাবনাই বেশি। লাটাগুড়ি, চাপড়ামারি, রাজাভাতখাওয়া এইসব সাইডে খবর নিতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। শিবাঙ্গী খোঁজ লাগাও । -শিওর স্যার।
-আরও কিছু খটকা! ঘরের মধ্যে অত রুমফ্রেশনারের বোতল কেন? কোনও সাধারণ মানুষের বাড়িতে এত রুম ফ্রেশনারের বোতল থাকে নাকি?
শিবাঙ্গী প্রায় লাফিয়ে উঠে বলল, ‘হ্যাঁ আমিও খেয়াল করেছি। ঘরের মধ্যে তিনটে রুম ফ্রেশনার।’ এক ঝলক শিবাঙ্গীর দিকে দৃষ্টি হেনে স্বয়ম্ভু বলল, ‘খাটের তলায় আরও চারটে ছিল।’
-ও বাবা!
-শুধু তাই নয়। খাটের নীচে কালো বুট জুতো। আট নম্বরের। এদিকে সদর দরজার কাছে আরেকটা চটি সাত নম্বরের। মিশ্রঠাকুর বেশ লম্বা । তাই তার পায়ের মাপ অবধারিতভাবে আট। আর তিরুর হাইট তার মামার চেয়ে খাটো। পায়ের পাতাও ছোট। স্বাভাবিকভাবেই তার সাত নম্বর জুতো।
-ফরেনসিক এর ডক্টর তুহিনশুভ্র বলেছিলেন খুনির পায়ে সাত বা আট নম্বর জুতো ছিল। আর সে মেয়ে।
– সম্ভবত মেয়ে।
‘সম্ভবত’ শব্দটার ওপর জোর দিল স্বয়ম্ভু। ‘আমি তো তোমার জুতো পায়ে গলিয়ে কাউকে খুন করতেই পারি।’
-তাহলে তো এরা দুজনেই করতে পারে। কিন্তু কেন? খামোকা এদেরই বা খুনি বলে সন্দেহ করছি আমরা?
-ক্রমশ প্রকাশ্য ।
শিবাঙ্গী মনোক্ষুন্ন হল। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। স্বয়ম্ভু বলল, পুরোহিত বুট পরে কোথায় যাবে?” ‘একজন
-আগে কারখানায় চাকরি করত। হয়তো তখনকার।
-হতেই পারে। কারণ বুটটা বেশ পুরনো। কিন্তু এটা…
বলেই থেমে গেল স্বয়ম্ভু। চোখ বন্ধ করে মাথাটা পিছনদিকে হেলিয়ে দিল। গাড়িটা কিছুক্ষণ চুপচাপ এগিয়ে চলল গন্তব্যের দিকে। এক সময় স্বয়ম্ভু মাথাটা সোজা করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বলল, ‘আমাকে কয়েকদিনের জন্য একটু আউট অফ স্টেশন যেতে হবে। তুমি সামলাতে পারবে না?
ঝট করে এমন একখানা বোমা ফেলবে স্বয়ম্ভু সেটা ভাবতেও পারেনি শিবাঙ্গী। ‘আ…আমি! একা?’ ঘাবড়ে বলে উঠল।
-একা কেন? পুরো ডিপার্টমেন্ট তোমার সঙ্গে থাকছে। আমিও ফোনে ফোনে থাকব।
মুখের ওপর পারব না একথা বলা যাবে না। কিন্তু ভেতর থেকে জোরও পাচ্ছে না। তবু বাধ্য হয়ে বলল, ‘বেশ। কবে যাবেন?’ -কাল বা পরশু ।
অজান্তেই চোখগুলো বড় বড় হয়ে গেল শিবাঙ্গীর। বেচারির অবস্থা দেখে এত চিন্তার মধ্যেও মনে মনে হাসল স্বয়ম্ভু ৷
