৩
শ্রাবণ মাসের আকাশটা ভীষণ ছিঁচকাদুনে। ঝিরঝিরে বৃষ্টিটা একভাবে হয়ে চলেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এমনভাবে গর্জাল যেন বিকেল থেকে কোলকাতাকে খুঁজতে হলে ডুবুরি নামাতে হবে। কোথায় কী? এ যেন আরও জ্বালা। চারপাশে কেমন একটা প্যাচপ্যাচে ভাব। বেরোতে হলে ছাতা বা রেনকোট নিয়েই বেরোতে হবে। বর্ষার আকাশটাকে একদম বিশ্বাস করা যায় না। উত্তর কোলকাতার সুরিলেন বেশ বনেদি জায়গা। বেনারসের মতো সরু গলিগুলো সাপের মতো এঁকেবেঁকে এলাকাটাকে ঘিরে রেখেছে। কত পুরনো বাড়ির বারান্দাগুলো হাড়গোড় বের করে একশো বছরের বৃদ্ধের মতো ঝুলে রয়েছে। এখানে পঞ্চাশ বছরের মুদিখানার পাশাপাশি হাল আমলের দোকানও হয়েছে কয়েকটা। দক্ষিণ কোলকাতার মতো উত্তরেও ইতিউতি গজিয়ে উঠেছে শনি মন্দির। সুরিলেনের গলির মুখে এমন একখানা মন্দিরেই পুজো করেন পঞ্চান্ন পেরোতে চলা লোকটা। গালভর্তি দাড়ি, চোখের তলায় কালি, নাকের নীচের কাঁচা-পাকা গোঁফটা ওপরের ঠোঁট পর্যন্ত নেমে এসেছে। পাতলা চেহারা। লম্বা, তবে অনটন আর জীবনের ঝড়ঝঞ্ঝার কারণে পিঠের মেরুদণ্ডটা কাঁধের কাছাকাছি আসতেই একটু বেঁকে সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে বোধহয়। মাথার চুলেও বেশ পাক ধরেছে। এসবের কারণেই বয়সে বড়রাও ঠাকুরমশাইয়ের সঙ্গে বেশ সমীহ করে আপনি-আজ্ঞে সম্বোধনে কথা বলে। স্বভাবে ধীরস্থির। কিন্তু দায়িত্বে অটল। ঝড়-জল-বৃষ্টি কোনও কিছুই পুরোহিতমশাইকে আটকাতে পারে না। আশেপাশের লোকজন এনাকে মিশ্রঠাকুর বলেই জানেন। ডাকেও এই নামে। কারণ লোকটার পদবি মিশ্র। কিন্তু নামটা যে কী তা এই তল্লাটে কেউ জানেন না। বলা ভালো খোঁজ রাখার প্রয়োজন হয়নি কখনও ।
আজও মিশ্রঠাকুরের হাতে গ্রহরাজ আর দক্ষিণাকালীর আরতি-প্রদীপ ঘুরে চলেছে। সামনের রাস্তাটা বেশ খালি। একটানা বৃষ্টির জন্য লোকজন বিশেষ বেরোয়নি। কেবল সকালে যাঁরা অফিসে গিয়েছিলেন তাঁরা ফিরছেন একে একে। চেনার উপায় নেই কাউকেই। কারও মাথা ছাতায় ঢাকা বলে স্ট্রিট লাইটের আলো পড়েনি মুখে আবার কেউ বা আপাদমস্তক বর্ষাতি ঢেকে ভেজা রাস্তায় সাবধানে পা ফেলে এগোচ্ছেন ৷
গলির মুখের উল্টোদিকের ফুটে স্ট্রিট লাইটের আলোটা পেরিয়ে খানিকটা অন্ধকারে একটা গাড়ি এসে দাঁড়াল। সাদা রঙের ক্যাব। মিশ্রঠাকুর হাতে ধরা পিতলের ঘণ্টিটা আরতির শেষে কাঁসার থালার ওপর রাখলেন। কপালে হাত ঠেকিয়ে প্রণাম করলেন। অন্যান্য শনিবারগুলো এই সময় মন্দিরের দোরে বেশ কয়েজনের পেন্নাম জমা পড়ে। কিন্তু আজ একজন মহিলাই এসেছিলেন। মিশ্রঠাকুর কুশি করে চরণামৃত মহিলার হাতে দিতেই সামনে চোখ আটকে যায়। ছাতা মাথায় এক মহিলা এগিয়ে আসছে। নীল রঙের স্লিভলেস টপ আর হাল্কা রঙের জিন্স। প্রথমে বুঝতে না পারলেও কাছে আসতেই চশমার পুরু কাচের মধ্যে দিয়ে মেয়েটিকে চিনতে পারেন মিশ্রঠাকুর। হালকা হেসে কুশি করে একটু চরণামৃত এগিয়ে দেন তার দিকে। ছাতা মাথায় ধরা অবস্থাতেই মেয়েটা বলে ওঠে, ‘না ঠাকুরমশাই। ওসবের আর কোনও প্রয়োজন নেই আমার।’ ঠাকুরমশাইয়ের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। পাশের মহিলাটি চলে যেতে গিয়েও থমকে গেলেন। এ আবার কেমনধারা কথা! ঠাকুরের চরণামৃত প্রত্যাখ্যান করছে! যত সব বড়লোকের দেমাকি বউ! মুখ বেঁকিয়ে নিজের রাস্তায় এগিয়ে গেলেন মহিলাটি।
-ঠাকুরের চরণামৃত ফেরাতে নেই মা।
-কী হবে ঠাকুর মেনে? আমার কোন প্রবলেমটা সলভ করেছেন তিনি? যেমন আপনার ঠাকুর, তেমনি আপনি। আস্ত ঢপবাজ ।
কথাটা শুনেই মিশ্র ঠাকুরের গা-টা চিড়বিড় করে উঠল। এমন করে সরাসরি অপমান আজ অব্দি কেউ করেনি মিশ্রঠাকুরকে। ‘এসব কী বলছ অরুণা? কী হয়েছে?’ অবাক হয়ে বললেন মিশ্রঠাকুর। বেশ অনেকদিনের আলাপ অরুণার সঙ্গে। প্রতি শনিবার এই মন্দিরে এসে প্রণাম করে প্রসাদ নিয়ে যায়। দেবদ্বিজে বেশ ভক্তি আছে বলেই জানতেন মিশ্রঠাকুর। কিন্তু অরুণার আজকের কথাগুলো এক নিমেষে সেই বিশ্বাস ভেঙে দিল। বৃষ্টিটা বাড়ল একটু। রাস্তার দিক থেকেই কারও একটা গলা শোনা গেল। বেশ রাগত স্বরেই কোনও অজ্ঞাত পরিচয়ের নাম জিজ্ঞেস করছেন ‘এই কে রে? কে?’। বর্ষার অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নির্ঘাত কোনও চ্যাংড়া ছোড়া রকে বসে আড্ডা মারতে মারতে কারও পিছনে লেগেছে। উত্তর কোলকাতায় এ দৃশ্য হামেশাই নজরে পড়ে। অরুণা দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠল, ‘আপনিই তো বলেছিলেন মিশ্রঠাকুর আমার সব প্রবলেম সলভ হয়ে যাবে। কদিন অপেক্ষা কর। গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান ঠিক নেই। সাত তারিখের পর তুমি শান্তি পাবে। আর যে শয়তানি করছে সে জব্দ হবে। আজ তেইশ তারিখ আমার জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। এত বড় সাহস, আমাকে খুন করার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। শয়তান দুশ্চরিত্র একটা। বাড়িতে বউ রেখে বাইরে অন্য মেয়ের সঙ্গে…।’ একটানা বলতে বলতে একটু থামল অরুণা। তারপর কেঁপে ওঠা গলাটা ঝেড়ে আবার বলল, ‘যে শয়তানি করছে, সে করেই চলেছে। আর যার কোনও দোষ নেই সেই আমাকে আজ বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে। আমি তো শূন্যই থেকে গেলাম ঠাকুরমশাই। আপনার কথা তো কিচ্ছু ফলল না। এই আপনি লোকের ভাগ্য বলতে পারেন? আপনি একটা ভণ্ড।’
অরুণার মাথার ঠিক নেই। রাগে থরথর করে কাঁপছে। এত অপমানের পরেও মধ্য বয়স পেরিয়ে চলা পুরোহিত নিজেকে শান্ত রাখেন। স্থির রেখে বলেন, ‘আমি কোনও দিন কাউকে বলিনি মা যে আমি লোকের ভাগ্য বলতে পারি। তোমাদের মতোই কিছু মানুষ এই কথা ছড়িয়েছে। হয়তো কোনওদিন কাউকে কিছু বলেছিলাম। সেটা ফলে গিয়েছিল। তারপর যাকে যা বলেছি সেগুলোও হয়েছে। তাই লোকে বলে মিশ্রঠাকুর ভাগ্য বলতে পারে।’ সলজ্জ ভঙ্গিতে দুপাশে ঘাড় নাড়েন। তারপর বলেন, ‘আমি কেউ না অরুণা। সবই আমার গ্রহরাজ। সেই কাল। সেই সব পাপপুণ্যের হিসেব কষে কড়ায়গণ্ডায় শোধ দেন। তোমার সুবিচার পাওয়ার সময় সত্যিই হয়েছে মা। কিন্তু তুমি তো অপেক্ষাই করলে না। আমি বলেছি সাত তারিখের পর। কিন্তু কোনদিন সেটা তো নির্দিষ্ট করে কিছু বলিনি।’
-হ্যাঁ জানি৷ সেফ সাইডে খেলেছেন। আপনি আপনার বুজরুকি নিয়ে থাকুন। আমি চললাম। আর দয়া করে আমার মত আর কোনও মেয়েকে মিথ্যে আশ্বাস দেবেন না। চলি।
আর একটাও কথা না বলে উল্টোমুখো হয়ে রাস্তা পেরিয়ে সেই সাদা ক্যাবে উঠে গেল অরুণা। সঙ্গে সঙ্গে ক্যাবটা স্টার্ট দিল। হুশ করে রাস্তার জমা জলে ঝড় তুলে ছুটে গেল গাড়িটা। বিষন্ন মুখে মিশ্রঠাকুর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে করুণ চোখে শনি দেবতার মূর্তির দিকে তাকালেন।
সুরিলেনের বেশ খানিকটা ভিতরে বহু পুরনো একটা বাড়ি। মোটা দেয়াল থেকে নখ-দাঁত বার করে গলি-রাস্তার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে আদ্যিকালের বাড়িটা। শ্যাওলা রঙের মোটা কাঠের দরজা। পুজো সেরে ঝমঝমে বৃষ্টি ঠেলে প্রায় দেড়ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরলেন মিশ্রঠাকুর। পুজোর শেষে পাড়ার কয়েকজনের বয়স্ক মানুষের সঙ্গে আড্ডা মেরে ঠাকুরমশাই বাড়ি ফেরেন। কিন্তু বেয়াড়া বৃষ্টিটা আজ সব ভেস্তে দিল। পুজো শেষে এমন জোরে বৃষ্টি এল যে মন্দির থেকে বেরোতেই পারলেন না। একটু ধরতে কালো বড় ছাতাটা মাথার ওপর মেলে ধরে ধীর পায়ে বাড়ি ফিরলেন। পকেট থেকে একটা মোটাসোটা চাবি বের করে দরজার কাছে দাঁড়াতেই একটু যেন থমকে গেলেন। ভুরুটা কুঁচকে গেল। তালা খোলা। কী যেন ভাবলেন। চশমার পুরু কাচের মধ্যে দিয়ে কালো ভ্রমরের মতো চোখদুটো দুবার পিটপিট করল। তারপর ভারী দরজাটা এক হাতে ঠেলে খুলে ফেললেন। ভিতরের মূমুর্ষু অন্ধকারটা যেন বাইরের আলো পড়তেই নড়ে উঠল। দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করে ভালো করে খিল তুলে দিলেন। মিশকালো প্যাসেজটা অবলীলায় পেরিয়ে ঘরের দিকে উঠে এলেন। পুরোনো খিলানগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখলেন একটা ঘর থেকে হলুদ আলোর ছিটে ছেঁড়া রোদের মতো এসে পড়েছে। সেই আলোতেই অনবরত পায়চারি করা একটা মানুষের ছায়া পড়ছে। হঠাৎ যেন কীসের তাড়া পড়ল ঠাকুরমশাইয়ের। দ্রুত পায়ে ওই আবছা অন্ধকার হাতড়ে পৌঁছে গেলেন ঘরের সামনে। দেখলেন পায়চারি করতে থাকা ছায়াটা স্থির হয়ে গেল।
-কাজের প্রথম দিন কেমন হল?
মিশ্রঠাকুর প্রশ্ন করলেন। ঘরের মধ্যে পায়চারি করতে থাকা গলদঘর্ম লোকটা উত্তর দিল, ‘ভালো।’ ‘বাজার করেছ?’ আবার প্রশ্ন করলেন ঠাকুরমশাই। লোকটি জবাব দিল, ‘রান্নাঘরে।’ ঠাকুরমশাই কাঁধের ওপর থেকে নামাবলিটা তক্তপোশের ওপর রাখলেন। কাঁধের ঝোলাটা দেয়ালের হুকে ঝুলিয়ে দিলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে মিশ্রঠাকুর বললেন, ‘আমি রান্না চাপাচ্ছি।’
-আমি একটু ড্রাম প্র্যাকটিস করব।
-ওই করো। বুড়ো হাড়ে আমি খেটে মরি আর তুমি মাঝ রাত্তিরে ড্রাম পেটাও। যদি আশেপাশের বাড়ি থেকে আপত্তি জানায়?
-বড় ভুলভাল জিনিস ভাবো মামা। পুরোনো বাড়ি। এই মোটা দেয়াল ৷ কারও কানে গেলে তো জানাবে। পাশের দুটো বাড়ি তো ভূতের বাড়ি হয়ে বন্ধ পড়ে আছে। উল্টোদিকের বাড়ির লোকও শুনতে পাবে না৷ বর্ষায় দরজা-জানলা সব বন্ধ।
মিশ্রঠাকুর হাত উল্টোলেন। হাসিতে ভাগ্নেটির ঠোঁট চওড়া হল।
