ম্যাও – ১৯

১৯

‘গত চার-পাঁচদিনে খুন হয়ে গেলেন দুজন মহিলা। একজন পুরুষ। থুড়ি, দুজন পুরুষ। প্রথমে অরুণা ব্যানার্জি, তারপরে তার স্বামী তমাল ব্যানার্জি। এই সূত্রে জানিয়ে রাখি, তমাল ব্যানার্জি যে খুন হয়েছেন সে খবর পুলিশের তরফ থেকে প্রায় চেপেই যাওয়া হয়েছিল। আমরা গোপনসূত্রে জানতে পেরেছি তমালবাবুর খুনের কথা। এর মাঝে অরুণা ব্যানার্জির ক্যাব ড্রাইভার মারা যান। এক অর্থে এটাও খুনই বলা যায়। কারণ অতিরিক্ত ক্লোরোফর্মের জন্য তিনি মারা যান। এবার মারা গেলেন দিয়া চৌধুরি। যে কিনা অরুণার বন্ধু ছিলেন। দেশপ্রিয় পার্কে ওনার নামে একটি ক্যাফেও আছে। দিয়ার বান্ধবী কিয়ারা, তাকে মধ্যরাত্রে তুমুল বৃষ্টির মধ্যে পুলিশ উদ্ধার করে ট্যাংরা অঞ্চলের কাছে একটি ফুটপাথ থেকে। আমাদের স্বপ্নের তিলোত্তমা, ভালোবাসার শহর কোলকাতা কি তাহলে মৃত্যুনগরী হয়ে যাচ্ছে? এসব কী হচ্ছে একের পর এক? ও হো, আরেকটা কথা তো বলতেই ভুলে গেছি । দিয়া চৌধুরির লাশ পাওয়া গেছে আমাদের গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন অর্থাৎ যিনি এই খুনের কেসগুলোর তদন্তে আছেন তাঁর সহকারী শিবাঙ্গী বসুর বাড়ির বাগানের মধ্যে থেকে। ধরে নেওয়া হচ্ছে খুনি ভয় দেখাতেই লাশ শিবাঙ্গী বসুর বাড়িতে ফেলে দিয়ে গেছে।’

কার্ডের দোকানের লোকটা হাঁ করে খবর গিলছিল। মাঝেমধ্যে আঙুলের ঠ্যালা দিয়ে নাকের ওপর নেমে আসা পুরু কাচের চশমাটা তুলে দিচ্ছে। আবার খানিক বাদে সেটা নেমে যথাস্থানে এসে থমকে থাকছে। এমন সময়েই এক বাক্স মিষ্টি হাতে করে ঢুকে এল ত্রিদিব, ‘ও কাকা, মিষ্টি খাও গো ।’

-বাবা! কী হল রে ত্রিদিব? হঠাৎ মিষ্টি খাওয়াচ্ছিস?

-ফুলবাগানের যে বাড়িটায় মামাকে রেফার করেছিলে ওই অন্নপ্রাশনের জন্য, ওটা কনফার্ম হয়ে গেছে৷

-হবে না? এমন করে বলেছি টোপ না গিলে যাবে কোথায়? তা এই শুকনো মিষ্টি খাইয়ে কাজ সারতে এসছিস হতচ্ছাড়া? কোথায় লাল টুকটুকে বউ এনে পেটপুরে মহাভোজ খাওয়াবি ভাবলুম। এই মিশ্রঠাকুরের ফোন নম্বরটা দে তো। ওনাকে বলি। ও হো, ওটা তো আগেরদিনই আমায় দিলি না? দাঁড়া, আজই কল করছি। এবার তোর বিয়ে দেব তারপর আমার শান্তি ৷

-আরে সে তো সময় লাগবে। এখন আপাতত মিষ্টিই খাও।

বয়স্ক মানুষটি এক গাল হেসে মিষ্টির বাক্স হাতে নিলেন। সামনের দাঁতটা ভাঙা। মাথার ওপর কয়েকগাছি চুল। ঘাড়ের কাছটায় সরু সরু ঝুরির মতো আরও কয়েকগাছি নেমেছে। ‘তুমিও এসব খবর দেখছ কাকা? বন্ধ কর তো।’

-বন্ধ করব কী রে, খুনি নাকি খোদ গোয়েন্দার বাড়িতে লাশ ফেলে গেছে।

-গোয়েন্দার সহকারীর বাড়ি।

-ওই হল। কী যে দিনকাল পড়ল কে জানে? কোনদিন দেখবি আমিই খুন হয়ে পড়ে আছি।

-কেন? তুমি কার ক্ষতি করেছ যে খুনি তোমায় মারবে?

-যেগুলো মরছে সেগুলো বলছিস কারও ক্ষতি করেছে?

-আমি কেন বলব? লোকে বলছে।

-কিন্তু খবরে তো সেরকম কিছু বলল না!

-শিয়ালদা থেকে বাসে চেপে কলেজস্ট্রিট এসো না একবার, দেখবে বাসভর্তি গোয়েন্দা। ওই শম্ভু সেন না কে যেন গোয়েন্দা তদন্ত করছে না? তার আর দরকার হবে না। সবাই মুখে মুখে মার্ডার কেসের ফাইল ক্লোজ করছে।

খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল বয়স্ক মানুষটা। ত্রিদিব কী যেন ভাবতে ভাবতে বলল, ‘কিছু না কিছু তো আছেই কাকা। নইলে খুনি টাকা নিচ্ছে না, ডাকাতি করছে না। অথচ প্রাণে মারছে। নিকুচি করেছে বাদ দাও। এসব খবর আর দেখো না। এইসব যত দেখবে আমার মামার মতো অবস্থা হবে।

-কেন? তাঁর আবার কী হল?

-রাতে ঘুমোচ্ছে না। ঠিক করে খাচ্ছে না। রাস্তা দিয়ে হাঁটছে চলছে আর এদিক ওদিক ঘুরে তাকাচ্ছে। কে যেন ওনাকে ফলো করছে। -বলিস কী? মিশ্রঠাকুরকে কে ফলো করবে?

-দুদিন বাদে মামাটা আমার ঠিক পেগলে যাবে দেখো ।

-ওসব মনের ভুল। ঠিক সময়ে বিয়েশাদি না করলে এমনই হয়। ওই জন্যে বলছিই…..

-আমি আসছি কাকা। দোকানে কাজ আছে।

বলেই ত্রিদিব শিস দিতে দিতে বেরিয়ে গেল। বয়স্ক মানুষটা চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে ত্রিদিবের উদ্দেশ্যে বলল, ‘সময় গেলে সাধন হবে না। তখন বুঝবি।’

বইয়ে ঠাসা ঘুপচি ঘর। দোকানের একদম ভিতর দিকে প্রকাশক বসে কোনও এক বইয়ের বিচ্ছিন্ন দুটো পাতায় চোখ বোলাচ্ছিলেন। খানিকবাদে স্বয়ম্ভু সেনের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এটা তো আমাদেরই প্রকাশনার বই। একটা ক্রাইম থ্রিলার উপন্যাস।’

-এই দুটো পাতাই কী একই বইয়ের?

-একদম। এখনও প্রকাশিত হয়নি। পরশুদিন ছাপাখানায় গেল সবে৷ কিন্তু এই প্রুফের পাতা আপনি কোথায় পেলেন?

স্বয়ম্ভু একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘সময়মতো জানতে পারবেন। তার আগে আপনি বলুন এই বইয়ের লেখক কে? কী নাম তার?’ -দীপায়ন চ্যাটার্জি।

বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো নামটা স্বয়ম্ভুর কানে বাজল। তবু স্বয়ম্ভু ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল,

‘আপনি শিওর? এই বইয়ের লেখক দীপায়ন চ্যাটার্জি?’ -কী মুশকিল! যে বই আমাদের এখান থেকে প্রকাশ হচ্ছে তার লেখকের নাম জানব না?

-ছবি আছে কোনও ?

-হ্যাঁ। আমরা বইয়ের লেখক পরিচিতিতে ছাপাব বলে ছবি নিয়েছিলাম। দাঁড়ান, এই শাশ্বত…

ঘরের আরেক কোণে ডেস্কটপের সামনে বসে থাকা ছেলেটা সাড়া দিল। প্রকাশক বললেন দীপায়ন চ্যাটার্জির ছবিটা ফাইল থেকে বের করে দেখাতে। ছেলেটি সেটাই করল। ছবিটা দীপায়নেরই। স্বয়ম্ভুর মগজে নতুন করে আঁকিবুকি কাটছে কেউ। এলোমেলো রেখার যত জট ফুটে উঠছে ততই ভাবনার অতলে তলিয়ে যাচ্ছে স্বয়ম্ভু। প্রকাশকের কানের কাছে মুখ নিয়ে আচমকাই একটা বেয়াড়া হুকুম করে বসে সে, ‘শুভদীপবাবু, এই বইটি আপনি এখুনি প্রকাশ করবেন না।’ প্রকাশকের মাথায় বাজ, ‘এ কী বলছেন স্যার? বই তো আর মাত্র কয়েক কপি ছাপাই বাকি।’

-আস্তে কথা বলুন ।

-সরি সরি।

সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল শাশ্বতকে। দূরে ডেস্কটপে বসে কাজ করছে।

-বই ছাপিয়ে গোডাউনে এনে রেখে দিন। যতক্ষণ না লালবাজার থেকে এই বই প্রকাশের হুকুম পাবেন ততক্ষণ এই বই যেন প্রকাশের আলো না দেখে। এই কথা যেন লেখকের কান পর্যন্ত না পৌঁছোয়। এটা শুধুমাত্র আপনার আর আমার কথা।

অত্যন্ত গোপনীয় ভঙ্গীতে কথাগুলো বলল স্বয়ম্ভু। ভাঁজ। ‘সেরেছে! দীপায়নবাবুকে কী বলব?’ শুভদীপের মুখে চিন্তার

-কিছু একটা বলে দেবেন। বলবেন, ছাপাখানার প্রবলেম। আর এক্ষুনি, এই ক্রাইম থ্রিলারটির একটা কপি আমার লাগবে।

ফ্ল্যাটের দরজা জানলা বন্ধ করে বসে আছে সুস্মিতা। আজ বুটিকেও যায়নি। প্রিয়াংশুকেও বেরোতে দেয়নি। সকাল থেকে ঠায় নিউজ চ্যানেলগুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে একই খবর দেখে চলেছে। শহরে সিরিয়াল কিলিং।

-একই খবর আর কতবার দেখবি? বন্ধ কর না।

মনে মনে প্রমাদ গুণছে সুস্মিতা। যদি একটিবারও খবরে বলে যে অপরাধীর হদিশ পেয়ে গেছে পুলিশ তাহলে কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। কিন্তু এটা যে অলীক কল্পনা সেটাও জানে সুস্মিতা। কোন অপরাধীকে ধরবে গোয়েন্দা? টিভিতে বারবারই দিয়ার মৃত্যুর খবর দেখিয়ে চলেছে। রসিয়ে রসিয়ে বলা হচ্ছে নৃশংসতার বর্ণনা।

-হারাধনের দশটি ছেলে কবিতাটা মনে আছে প্রিয়াংশু? -হঠাৎ!

বলেই বুঝল সুস কেন এই কথা বলছে। ‘ওফফ! আজেবাজে চিন্তাভাবনা বন্ধ কর সুস। প্লিজ। আমাদের কিচ্ছু হবে না দেখিস। আরে পুলিশ তোর ওপর নজর রাখছে। তোর আবার চিন্তা কীসের?”

কথাগুলো সুস্মিতাকে ধরে ঝাঁকিয়ে বলল প্রিয়াংশু। তাতে সুস্মিতার বুকের ভেতরটা যেন আরও কেঁপে উঠল। খপ করে প্রিয়াংশুর দুটো হাত আঁকড়ে বলে উঠল, ‘আমি কিন্তু তোকে ভালোবাসি প্রিয়াংশু। তোর ভালোমন্দ সবকিছু নিয়ে আমি তোকে ভালোবাসি।’ প্রিয়াংশু আলতো হেসে সুস্মিতার কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘আমি জানি।’ ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে সুস্মিতা বলে, ‘কিন্তু এবার যে আমার পালা প্রিয়াংশু। আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছি।’ প্রিয়াংশু সান্ত্বনা দেবার আগেই পোষা পুষিটা ম্যাও করে ডেকে উঠল। চমকে উঠল সুস্মিতা। তারপর নিজের ভ্রম বুঝতে পেরে চোখ বুজে একটু শান্ত হল। কিন্তু আবারও তাকে কাঁপিয়ে পাশে রাখা মোবাইলটা বেজে উঠল। সুস্মিতা ধরছে না। কেবল ভয়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। অপরিচিত নম্বর। ‘কী রে ধর। ফোন বাজছে তো।’

-ও আমায় বাঁচতে দেবে না প্রিয়াংশু।

-আরে ফোনটা ধর। পাগল কোথাকার।

ধরিস না, বলে ফোনের দিকে হাত বাড়াতে যেতেই সুস্মিতা ‘না না না, প্লিজ’ বলে কাঁদো কাঁদো হয়ে কাকুতি মিনতি করে ওঠে। কপট ধমক দিল প্রিয়াংশু, ‘কোনও দরকারি ফোন হতে পারে তো? পুলিশও তো হতে পারে। হয়তো তোকে কিছু জানাবে। দাঁড়া, আমি ধরছি।’ মুখ কাঁচুমাচু করে সুস্মিতা দেখল প্রিয়াংশু ফোনটা ধরেছে। ‘হ্যালো… না, আমি ওর… হ্যাঁ প্রিয়াংশু। আপনি?… ও আচ্ছা আচ্ছা ধরুন।’ কান থেকে ফোনটা দূরে সরিয়ে বলল, ‘নে কথা বল। বুটিক থেকে।’ সুস্মিতার যেন বিশ্বাস হচ্ছে না! দুপাশে হাত নেড়ে না বলছে। প্রিয়াংশু গলা চেপে ধমক দিল, ‘ধর বলছি। কথা বল।’ কাঁপা কাঁপা হাতে মোবাইল কানে চেপে ‘হ্যালো’ বলল সুস্মিতা। তারপরে ওপার থেকে কোনও বিশ্বস্ত গলা ভেসে আসতে নিশ্চিন্ত হল। দুটো কথা বলেই দাঁত খিঁচিয়ে উঠল। ‘একদিন আমি নেই আর তোমরা সামলাতে পারছ না? আমি না থাকলে তো ব্যবসা লাটে তুলে দেবে তোমরা। যা পারো কর। যা ইচ্ছে কর। আমায় ডিস্টার্ব করবে না।’ খটাস করে উল্টোদিকের ব্যক্তির মুখের ওপর ফোন কেটে দিল।

-এত মাথা খারাপ করার কোনও মানে নেই সুস। ওরা নয়, চললে তুই নিজেই তোর ব্যবসা লাটে তুলবি এইভাবে

পায়ের কাছে এসে পুষি ম্যাও ম্যাও ডাক ছাড়তেই কোলে তুলে নেয় প্রিয়াংশু ।

-ওই ছেলেটা আমায় বাঁচতে দেবে না প্রিয়াংশু ।

পুষিকে আদর করতে করতেই নিজের মনে যেন বলে ওঠে প্রিয়াংশু, ‘কোন ছেলেটা?”

-শ্রীকুমার ।

মুচকি হাসে প্রিয়াংশু। বলে, ‘তুই সত্যিই পাগল হয়ে গেছিস।’ বুকের মধ্যেকার ভয়টায় কীভাবে যেন অপার বিস্ময় মিশিয়ে দিল প্রিয়াংশুর হাসি । সুস্মিতা অবাক হয়ে তার প্রেমিকের দিকে তাকিয়ে রইল অজস্র প্রশ্ন নিয়ে

-কী বলছেন স্যার, দুটো একই বইয়ের পাতা?

-শুধু একই বই নয় শিবাঙ্গী, একই কালিতে প্রুফ চেক করা। ভেবে দেখো, একটা অরুণার বডির পাশ থেকে পাওয়া গেল আর অন্যটা খোদ লেখকের ঘর থেকে ৷

চামচে করে মাকে স্যুপ খাওয়াতে খাওয়াতে স্বয়স্তুর সঙ্গে ফোনে কথা বলছে শিবাঙ্গী। অপর্ণা একটু উঠে বসেছে। পিঠে বালিশ দিয়ে রিল্যাক্স করছে। চোখ এখনও আতঙ্কে জর্জর।

-তাহলে ঠিকুজিকুষ্ঠি সব জানতে হচ্ছে স্যার।

-সে তো হচ্ছেই। আমি এখন যাচ্ছি ড্যাফোডিলে। কিয়ারার নাকি সেন্স আসছে একটু করে।

-বাহ! এটা ভালো খবর।

-যতক্ষণ না কিছু জানতে পারছি ততক্ষণ কিছুই ভালো নয় শিবাঙ্গী।

শিবাঙ্গীর বাড়িতে বেল বাজল। ফোনের ওপার থেকে বেলের আওয়াজ কানে যেতেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘সাবধানে দরজা খুলবে শিবাঙ্গী। যদিও এখনই কিছু হবার সম্ভাবনা নেই তাও। ‘

-হ্যাঁ স্যার। এক সেকেন্ড ধরুন। বাবা, মাকে একটু খাইয়ে দাও না। অপর্ণা ক্লান্ত গলায় বলল, ‘থাক। আমি পারব। তুই দেখে দরজা খুলবি।’

বাইরে সিঁড়ির কাছে গিয়ে দরজা খুলতেই এক গাল হাসি আর অনেকটা বিস্ময় উছলে পড়ল। আপ্লুত হয়ে শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘জেঠিমা আপনি! আসুন আসুন। বাড়ি চিনলেন কী করে?’ জেঠিমা ডাকটা শুনেই স্বয়ম্ভুর মনে কেমন যেন খটকা লাগে। ‘কে এসেছে শিবাঙ্গী?’ শিবাঙ্গী হাসতে হাসতে কান থেকে ফোন সরিয়ে ফিসফিস করে সুচিত্রাকে বলল, ‘স্যার’। সুচিত্রা ফোনটা কানে চাপতেই বলে উঠল, ‘তোকে না বললাম ভোলা, মেয়েটাকে একটু ছুটি দে। সেই ফোন করে জ্বালাচ্ছিস?’ সুচিত্রার হাতে ধরা ভারী ব্যাগটাকে শিবাঙ্গী নিজে নিল। ওপার থেকে স্বয়ম্ভূ প্রায় আঁতকে উঠে বলল, ‘মা তুমি শিবাঙ্গীদের বাড়ি গেছ। দেখছ চারপাশে বিপদ ওঁৎ পেতে আছে।’

-এই শোন, সেই মাধ্যমিকের পর থেকে আমি তোকে একা বড় করেছি। আমায় ভয়ডর দেখাস না। রাখ এখন ।

-ঠিকানা কোথা থেকে পেলে?

সুচিত্রা দেবীর ঠোঁটে লেডি শার্লকহোমসের হাসি, ‘গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন আমায় পেটে ধরেনি। আমি তাকে পেটে ধরেছি।’

-হ্যাঁ বুঝেছি। তুমি অনেক বড় গোয়েন্দা। শিবাঙ্গীই বলেছে তোমায়

-এই বুদ্ধি নিয়ে গোয়েন্দাগিরি করিস? ছেড়ে দে। ও যদি আমায় ঠিকানা দিত তাহলে শুরুতেই বাড়ি চিনলে কী করে বলত? ফোনের মধ্যে সেটা নিশ্চয়ই শুনতে পেয়েছিস!

স্বয়ম্ভু চোখ-মুখ কোঁচকাল। সত্যিই এটা খেয়াল করেনি সে। গলা ঝেড়ে ব্যাপারটা ঘোরাতে গিয়ে বলল, ‘যাক গে, শোনো, বেশি বেলা করবে না। তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবে। আর বলছি, আজকেও কী মাসির বাড়ি যাবে? নাকি এ বাড়িই…।’

সুচিত্রা হাসল মনে মনে। মায়ের হাতের রান্না ছাড়া ভোলার মন ভোলে না এ তিনি ভালোই জানেন। তবু বললেন, ‘না রে ভোলা, আর দুটো দিন যাক। সবে আজ কাজ মিটেছে তো। রবিবার ফিরব।’ একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে ভোলা জানাল, ‘বেশ! তাই কোরো। রাখছি এখন।

-রাখ।

সুচিত্রা মোবাইলটা শিবাঙ্গীর হাতে ধরিয়ে দিতে দেখল ফোনটা কেটে গেছে।

-এসব কী এনেছেন জেঠিমা?

-আজ আর তোমাদের রেঁধেবেড়ে কাজ নেই। সকাল থেকে যা চলছে। তাই আর থাকতে পারলাম না। ওই দুটো তরকারি, ডাল আর চাটনি করে এনেছি। শুধু ভাতটা একটু করে নিয়ো।

-কোনও মানে আছে জেঠিমা? এত দূর থেকে। ইসস দেখেছেন, এতক্ষণ এখানেই দাঁড় করিয়ে রেখেছি। আসুন আসুন।

ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার তো আপনাকে ঠিকানা দেয়নি। তাহলে কে দিল?”

-তপন।

-তপন!

-আরে তোমরা বেশিরভাগ সময় যার গাড়ি করে ঘুরে বেড়াও। ওকেই একদিন জিজ্ঞেস করে রেখেছিলাম।

-ওরে বাবা।

ঘরের ভিতর থেকে শেখর বেরিয়ে এলেন। অবাক চোখে দেখতে লাগলেন। শিবাঙ্গী আলাপ করিয়ে ঘরে নিয়ে গেল। এইবারেই আসল ব্যাপারটা ঘটে গেল। শিবাঙ্গী এক্কেবারে ভেবলে ভ। সুচিত্রা ঘরে ঢুকে অপর্ণাকে দেখেই থমকে গেল। অপর্ণাও স্যুপের বাটিটা মুখের সামনে ধরে চুপ করে চেয়ে রইল। শিবাঙ্গী খেয়াল করল দুই বয়স্কার মুখে এক সঙ্গেই হাসি ফুটে উঠল। সুচিত্রা গলার শির ফুলিয়ে বলে উঠলেন, ‘অপু না! অপর্ণা তো?’ অপর্ণাও বললেন, ‘সুচি তুই? এ কী রে? তুই কীভাবে? কোথা থেকে?” -আকাশ থেকে টপকালাম। তুই সেই ভ্যাবলাই আছিস। কথাটা শেষ করেই অপর্ণাকে জড়িয়ে ধরল সুচিত্রা।

-এটা কী হল? তোমরা কী একে অপরকে চেনো নাকি?”

শিবাঙ্গীর প্রশ্নের উত্তরটা অপর্ণাই দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার ওপর দিয়ে হাত পা নেড়ে সুচিত্রা বলে উঠলেন, ‘চিনি মানে? ওরে এ যে আমার সেই ছোট্টকালের সই। একই রাণাঘাটের মেয়ে আমরা।’ অপর্ণার মুখটা অনেকক্ষণ বাদে ঝলমল করে উঠেছে। গলার স্বর থেকে উত্তেজনা ঝেড়ে মায়াভরা সুরে প্রশ্ন করলেন সুচিত্রা, ‘কতদিন পর অপু! এইভাবে যে দেখা হবে ভাবতেই পারিনি। কেমন আছিস রে?”

-আর থাকা। শুনেছিস তো সব।

-তোর আবার চিন্তা কী? ঘরে এমন লক্ষ্মীর মতো মেয়ে থাকতে ।

-লক্ষ্মী যদি লক্ষ্মী হয়ে থাকত তাহলে কী আর চিন্তা হত রে? তিনি তো চামুণ্ডা হয়ে দিনরাত অসুরদের তাড়া করে বেড়াচ্ছেন।

-দোষ তোর মেয়ের নয়। আমার ছেলেটার। দিনরাত খালি তোর মেয়েটাকে দৌড় করিয়ে মারে। দেখি তো।

-উফফ তোমরা কী শুরু করলে বলো তো। এটা তো আমাদের কাজ। নাকি!

শিবাঙ্গী ছদ্মরাগ দেখাল। সুচিত্রা বললেন অপর্ণাকে, ‘ওই দ্যাখ দেখলি। কারুর নামে কাউকে বলা যাবে না। আমারও কী কম চিন্তা ভোলাটাকে নিয়ে? কে জানে বাবা কবে কী অঘটন ঘটিয়ে বসে।’

-তোর বাড়িতে তো তাও পায়ের আঙুলগুলো ফেলেছে। আর আমার বাড়িতে দ্যাখ, গোটা লাশটাই ।

-উফফ মা থামো না ।

সুচিত্রা বড় বড় চোখ কপালে তুলে একবার শিবাঙ্গীর দিকে আরেকবার তার বন্ধু অপর্ণার দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমার বাড়িতে পায়ের আঙুল মানে? কই আমি তো কিছু জানি না? ও শিবাঙ্গী কী হয়েছে মা? ভোলা তো কিছু…!’ সুচিত্রা যে এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না সেটা ভালোই বুঝল শিবাঙ্গী ।

স্পন্দনরেখাগুলো ইচ্ছেমতন এঁকেবেঁকে একটা নির্দিষ্ট গতিতে সরে যাচ্ছে। টিক টিক করে শব্দ তুলছে যন্ত্রটা। আশঙ্কিত নীরবতা লোমশ জন্তুর মতো কিয়ারার কেবিনে থুম মেরে বসে আছে। নাকে নল দেওয়া। পায়ে আগাপাস্তা ব্যান্ডেজ। কপালের একটা দিক একটু লাল হয়ে ছড়ে গেছিল। সেখানে মলম লাগানো। হাতের চামড়া ভেদ করে স্যালাইন চলছে। বেডের পাশে কিয়ারার মুখের দিকে তাকিয়ে বসে আছে স্বয়ম্ভু। দু-তিনবার ডাকার পর চোখ খুলছে অল্প করে।

-নমস্কার। আমি স্বয়ম্ভু সেন।

ধীরে, বেশ গোটা গোটা করে উচ্চারণ করে বলল স্বয়ম্ভু। যাতে কথাগুলো একবারে বুঝতে পারে কিয়ারা। আলতো চোখ খুলেই জবাব দিল, ‘চিনি।’ মিডিয়া স্বয়ম্ভুকে রাতারাতি সেলিব্রেটি বানিয়ে দিয়েছে। তাই তাকে না চেনার কোনও কারণ নেই। স্বয়ম্ভু বলল, ‘আপনাকে বেশি প্রশ্ন করতে চাই না। আপনি শুধু আমায় বলুন আপনার এই অবস্থা কীভাবে হল? একদম পার্টি থেকে শুরু করে আপনার ফুটপাথে পড়ে থাকা পর্যন্ত।’ কথাটা শুনতেই কিয়ারার ভুরু কুঁচকে গেল। ও হয়তো জানেই না ওকে কোথা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘আপনাকে ট্যাংরার কাছে একটা ফুটপাথ থেকে পাওয়া গেছে। আপনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। পুলিশ আপনাকে এই হাসপাতালে নিয়ে এসেছে। কেউ বা কারা আপনার পা ভেঙে দিয়েছে। তাই অপারেশন হয়েছে। আপনি তো জ্ঞান ফেরার পর আমার নামও করেছেন শুনলাম। কী বলবেন ধীরে ধীরে বলুন। আপনার কষ্ট হলে চুপ করে যাবেন।’ একটানা এতগুলো কথা বলে থামল স্বয়ম্ভু। কেবিনের মধ্যে চাপ চাপ আতঙ্কটা আরও যেন চারিয়ে বসল। কিয়ারা বলতে শুরু করল, ‘পার্টি চলছিল। আমরা নাচছিলাম। বাইরে বৃষ্টি। তাও প্রায় সবাইই এসেছিল। কয়েকজন ছাড়া। হঠাৎ ডিজেতে গান পালটে গেল। একটা মেয়ে… না সঙ্গে আরও কয়েকজন মেয়ে গাইছিল।

স্বয়স্তুর ছড়িয়ে থাকা ভুরুটা কুঁচকে কাছাকাছি চলে এল। অন্তৰ্কৰ্ণ দুটো আরও সজাগ হল। প্রশ্ন করল, ‘কোন গান? লাইভ গাইছিল?” কিয়ারা দুপাশে মাথা নাড়ায়। ‘লাইভ নয়। সাউন্ড সিস্টেমে বেজে উঠেছিল। সঙ্গে একটা বেড়ালের ডাক।’ ভিতরের চমকানিটা বাইরে প্রকাশ করে না স্বয়ম্ভু। কিয়ারা বলে, ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দম দমা দম। একবার একটা মেয়ে, তারপর কোরাস। যতবার গাইছে ততবারই বেড়ালটা কেঁদে উঠছে।’

-আপনি ঠিক শুনেছেন? বেড়ালটা কাঁদছিল?

-ওইরকমই লাগল। এক্স্যাক্ট জানি না। কিন্তু গানটা ক্যাজুয়ালি রেকর্ড করা মনে হল। ওই মোবাইলে যেমন…

-তারপর?

-আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। দিয়া প্রচণ্ড রেগে গেল। ওর ততক্ষণে নেশা হয়ে গিয়েছিল। তবে এতটাও খায়নি যে

কথা জড়িয়ে যাবে। -কিন্তু দিয়ার কথা জড়িয়ে যাচ্ছিল।

স্বয়ম্ভূ যেন জানেই এটা হবে। কিয়ারা সায় দিল। স্বয়ন্তু প্রশ্ন করল, ‘ডিজে যে বাজাচ্ছিল সে কীভাবে গানটা পেল জিজ্ঞাসা করেননি?’

-ডিজে ছিল না। ওয়াশরুমে গিয়েছিল। তার আগে একটা ছেলে নাকি ডিজে বাজাবে বলে নিয়েছিল। ডিজে ছেলেটি ভেবেছিল ইনভাইটেড গেস্ট। তাই সেও চলে যায় ওয়াশরুম। আবার গান চলে। কিন্তু দিয়ার অবস্থা ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। ও ঝিমিয়ে পড়তে থাকে। আমি ভয় পেয়ে যাই। দিয়া বাড়ি যেতে চাইলে আমি ওকে নিয়ে বেরোই। দিয়া বারণ করছিল। শুধু ওকে গাড়িতে তুলে দিতে বলছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। সব গেস্টদের ভার একজনের ওপর দিয়ে আমি দিয়াকে নিয়ে বেরোবো বলে ক্যাব বুক করতে যাই। সেই সময় বোধহয় ওই হোটেলেরই একটা লোক আমায় বলে উনি আমাদের বাড়িতে ছেড়ে দেবেন।’

-লোকটা চেনা আপনার?

-না। তবে ওই রেস্টুরেন্টের ড্রেস পরেই ছিল মনে হয়। তখন আমাদের কারও অন্যদিকে নজর দেবার উপায় ছিল না। লোকটির কথায় রাজি হয়ে যাই। রূপক আর আমি দিয়াকে ধরে নিয়ে সাউথ সিটির বাইরে রাস্তায় আসি ৷

-রূপক কে?

-আমাদের বন্ধু।

-বাইরের রাস্তায় কেন এলেন? গাড়ি তো বেসমেন্টে থাকে।

-লোকটি বলল তার গাড়িটি বাইরে রাখা। ভিতরে রাখার জায়গা পায়নি । আমরা তখন বাড়ি যেতে পারলে বাঁচি। দিয়ার শরীর ভালো না। তার ওপর তুমুল বৃষ্টি৷ গাড়ি পর্যন্ত যেতে যেতেই ভিজে গেলাম। কোনওরকমে উঠে পড়তেই গাড়ি ছেড়ে দেয়। লোকটি গাড়িতে উঠেই ভালো করে স্যানেটাইজ করে দেয়।

-কী? স্যানেটাইজ করে?

-হুম। লোকটি খুবই হেলথ কনশাস মনে হল। নিজেও মুখের মাস্ক খোলেননি। গাড়িতে স্যানিটাইজার রাখেন। আমার বেশ ভালোই লাগল। কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পরেই আমার চোখটা কীরকম যেন টেনে আসতে থাকে। মাথা ঘুরতে থাকে। শরীরে অস্বস্তি হতে থাকে। আস্তে আস্তে ঝাপসা হতে থাকে সবকিছু৷ ঠিক কতক্ষণ পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি আমার মনে নেই। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন ফিল করলাম আমার ডান পায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। আমি এই বেডে শুয়ে আছি। আর কিছু মনে নেই।’

-হুম বুঝলাম ৷

-দিয়া কোথায় স্বয়ম্ভুবাবু? দিয়া…

বন্ধুর বিপদের আশঙ্কায় চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে কিয়ারার স্বয়ন্তু একবার ডাক্তারের দিকে তাকাল। ইশারায় জানতে চাইল, এখন বলাটা ঠিক হবে কিনা। ডাক্তারও চোখের ইশারায় সম্মতি দিলেন। স্বয়ম্ভূ বড় করে একটা নিশ্বাস নিয়ে বলল, ‘দিয়া আর নেই।’ কথাট শোনামাত্রই কিয়ারার আঁতকে ওঠার কথা ছিল। ছটফট করে ওঠা উচিত ছিল। কিন্তু কিছুই হল না। বরং নীরবে চোখ বন্ধ করে ফেলল। দুচোখ বেয়ে অবিরাম অশ্রু। স্বয়ম্ভুর একটু অবাকই লাগল। অপেক্ষা করতে থাকল কিয়ারা আর কিছু বলে কিনা তার জন্য। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন কিয়ারা কিছুই বলছে না তখন স্বয়ম্ভু নিজেই কিছু জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কথা বলে উঠল কিয়ারা, ‘আমি বলেছিলাম দিয়াকে।’

-কী বলেছিলেন?

-আপনাকে সবটা বলতে। কোনও কিচ্ছু গোপন না করতে।

স্বয়স্তু টানটান হয়ে বসল। ‘কী গোপন করেছেন উনি?”

-দিয়ার কাছে দুদিন ধরে একটা ফোন আসছিল। আননোন নম্বর থেকে -বেড়ালের ডাক?

উত্তরটা স্বয়ম্ভু দিয়ে দেওয়াতে দিয়া চোখে চোখ রেখে ওপর নীচে ঘাড় নাড়ল। ‘আমি রিংব্যাক করেছিলাম। ডাজ নট এগজিস্ট। ফোনটা এলেই দিয়া ক্ষেপে উঠত। রাগে কাঁপত।’

-রাগে না ভয়ে?

-হতে পারে। কিন্তু ও কীরকম একটা হয়ে যেত।

-কিন্তু কেন? কে ফোন করত সে ব্যাপারে কিছু বলেছে আপনাকে?

-না। দিয়া খুব ডেয়ার ডেভিল মেয়ে। একমাত্র ফোনটা এলেই ওকে ভয় পেতে দেখতাম। আবার পরক্ষণেই ব্যাপারটা উড়িয়ে দিতে চেষ্টা করত। ড্রিঙ্ক করত, গান গাইত। জোরে মিউজিক সিস্টেম চালিয়ে গান শুনত। কিন্তু আর কিচ্ছু বলত না।

-এমন কারও নাম বলতে শুনেছেন যাকে আপনি চেনেন না বা চেনেন! ফোন এলেই তার নাম বলত দিয়া!

-না ।

-আর কিছু? মানে কোনও পার্সেল বা কিছু এসেছিল?

দিয়া একটু চুপ করে ভাবল। তারপর বলল, ‘কোনও একটা ভিডিয়ো এসেছিল দিয়ার ফোনে

– কীসের ভিডিয়ো?

-জানি না ।

-ভিডিয়ো এসেছিল জানেন অথচ কীসের জানেন না?

-আমরা কেউ কারও পার্সোনাল জায়গায় নাক গলাতাম না। মেইনটেইন করতাম । প্রাইভেসি

-তাহলে আপনি কী করে জানলেন যে ভিডিয়ো এসেছিল? দিয়া বলেছিল?

-আমার সামনেই নোটিফিকেশন আসে। সেটাও একটা আননোন নম্বর। নোটিফিকেশনে ভিডিয়ো না অডিয়ো সেটা বোঝা যায়। আমি সেটুকুই বুঝেছিলাম। আমিই ফোনটা ওকে দিই। ও ইয়ার ফোন দিয়ে দেখতে শুরু করে। যত দেখে তত বুঝতে পারি ও প্রচণ্ড ভয় পাচ্ছে। চোখটা লাল হয়ে গিয়েছিল দিয়ার। আমি বলেছিলাম, কোনও প্রবলেম থাকলে বল। এখনও ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। স্বয়ম্ভুবাবুকে জানা সব। ও শোনেনি। সেদিন যদি একটিবার আমার কথা শুনত!

কেঁদে ফেলল কিয়ারা। স্বয়ম্ভু সান্ত্বনা দিল, ‘কাঁদবেন না প্লিজ। আপনার শরীর ভালো না।’

-দিয়া নেই। আমি আর বেঁচে কী করব স্বয়ম্ভুবাবু?

-রেস্ট করুন। আমরা আজ আসি। পরে হয়তো কথা হবে। বাই দ্য ওয়ে, দিয়ার বাড়ির কোনও লোক আছে? আপনি চেনেন?

-ওর মা, বাবা সবাই আছে। বেহালায় থাকে। পর্ণশ্রীতে। কিন্তু ওর সঙ্গে বিশেষ একটা সম্পর্ক নেই ।

-কেন?

একবার স্বয়ম্ভুর চোখের দিকে তাকিয়ে চোখটা নামিয়ে নিল দিয়া। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার কারণে?’

-হ্যাঁ ।

-ওদের ফোন নম্বর!

-আমার ফোনে ওর মায়েরটা ছিল।

-তাহলে তো পাওয়ার সম্ভাবনাই নেই। আপনাদের কারও কোনও ফোন পাওয়া যায়নি। সেটা টিল নাও সুইচড অফ। আসি কিয়ারা।

ফোনটা কেঁপে উঠল স্বয়ম্ভুর। কেবিন থেকে বেরিয়ে জিনসের পকেট থেকে ফোনটা বের করতেই দেখল ডক্টর তুহিনশুভ্র ফোন করেছে। ‘হ্যাঁ তুহিনদা বলুন।’

–আমার কাজ হয়ে গেছে। সত্যি বলতে আলাদা করে আর কিছু বলার নেই আমার

-সেম প্যাটার্ন তো?

-একদম। খুনটা হয়েছে রাত বারোটা থেকে একটার মধ্যে।

-কীভাবে খুন হয়েছে তার ভিডিয়োটাও পেয়েছি।

-মানে?

-আসছি। সব বলব ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *