২৮
শ্মশান থেকে ফিরতে দুপুর হয়ে গেল প্রিয়াংশুর। চোখ মুখ লাল। ফ্ল্যাটের দরজাটা খুলতেই খাঁ খাঁ করে উঠল ডাইনিংটা। কে যেন কেঁদে উঠল করুণ স্বরে। নাকি পুষি ডাকল! দরজাটা বন্ধ করে খাবার টেবিলের দিকেও এগোতে ইচ্ছে করছে না প্রিয়াংশুর। ফ্ল্যাটটা নেওয়ার পর নিজে হাতে সাজিয়েছিল সুস্মিতা। সোফার কভার, ওয়াল কালার, কিচেনের খুঁটিনাটি সবকিছু নিজে হাতে করেছিল সুস্মিতা। প্রিয়াংশু সপ্রেম দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেছে শুধু। কলেজের সেই উড়নচণ্ডী বন্ধুত্ব এমন করে ঘর বসাবে কে জানত? নিজেরাই নিজেদের দেখে অবাক হয়ে যেত। সময়, পরিবেশ, জীবনবোধ সবকিছু ওদের শিখিয়ে দিয়েছিল কীভাবে গোছাতে হয় জীবনটাকে। যখন গুছিয়ে বসার লগ্ন এল তখনই সব ছারখার। আবারও কে কেঁদে উঠল কুঁই কুঁই করে। পুষি তো সামনেই আছে। জুলজুল করে দেখছে। তাহলে কাঁদছে কে? কান্নার শব্দটা বাড়ছে। ক্রমশ বাড়ছে। বাচ্চা কাঁদছে। ধীরে ধীরে সেটাই পরিত্রাহী চিৎকার হয়ে সোজা প্রিয়াংশুর কানে এসে আঘাত করছে। এক সময় বুঝতে পারে শব্দটা ওর বেডরুম থেকেই আসছে। বন্ধ ফ্ল্যাটে কে ঢুকে বসে আছে? বাচ্চাই বা এল কোথা থেকে? শোকে দুঃখে ভয়টাকে ভুলেই গিয়েছিল প্রিয়াংশু। অ্যামিবার মতো গুড়ি মেরে সেটা কখন আবার বুকের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। প্রিয়াংশু ঘরের দিকে এগোতে থাকে। পায়ে পায়ে যত এগোচ্ছে ততই শরীরটা তার ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। বাচ্চার কান্নাটা প্রিয়াংশুকে কালা করে দেবে এবার। দরদর করে ঘামছে। ঘরের মধ্যে মুখ বাড়িয়ে ও কী ভয়ানক কিছু দেখতে চলেছে? সুস্মিতার পর এবার কী প্রিয়াংশুকে টার্গেট করেছে সে? ঘরের মধ্যে উঁকি দিতেই কোনও একটা ভারি পাথর এসে সজোরে বুকের ওপর লাগে। দমটা বন্ধ হয়ে যায় প্রিয়াংশুর। নগ্ন শরীরে ঝাঁকড়া চুলের একটা মেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছে। তার যোনিদ্বার থেকে সরু নাড়ি বেরিয়ে বিছানার ওপর ঝুলে আছে আর সেই নাড়িটা সদ্যজাত রক্তমাখা একটা বাচ্চার নাভির সঙ্গে লেগে রয়েছে। সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাটি পরিত্রাহী চিৎকার করছে৷ মৃত মায়ের পেট থেকে নিজেই যেন বেরিয়ে সে ঝুলে পড়েছে বিছানার ওপর। ঝুলে থাকা মেয়েটার কোমরের কাছ থেকে রক্তাক্ত। মুখটা দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ যেন মুখের ওপর ঝুলে থাকা কোঁকড়ানো চুলগুলো দমকা হাওয়ায় উড়ে যায়। বিস্ফারিত চোখে ঘাড় ভেঙে জিভ বেরিয়ে আসা মুখটাকে চিনতে পারে প্রিয়াংশু ।
এক ঝটকায় ঘুম থেকে উঠে বসে প্রিয়াংশু। ঘামে শরীর ভিজে গেছে।
মাথার ওপরে সিলিং ফ্যানের দিকে তাকায়। নাহ, কেউ তো ঝুলছে না। বিছানাতেও কোনও বাচ্চা নেই। বাচ্চার কান্নার মত স্বরে পুষিটা ডেকে ডেকে সারা হচ্ছে। কী হবে ডেকে? যে ফিরবে না কোনওদিন! প্রিয়াংশু বুঝতে পারে ওর মাথার মধ্যে সব কিছু ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কিচ্ছু মাথায় থাকছে না তার। বিশেষ করে সুস্মিতাকে দাহ করে আসার পর ওর আরও পাগল-পাগল লাগছে। পুষি কাউকে খুঁজছে না। ওর খিদে পেয়েছে। সকাল থেকে বেচারিকে কেউ খেতে দেয়নি। প্রিয়াংশুর তো এসব অভ্যেসই নেই। চট করে বিছানা ছেড়ে উঠে ফ্রিজ খোলে। কালকের ভাত রয়েছে। দুধও আছে। খুব দ্রুততার সঙ্গে সেটা মেখে পুষির মুখের সামনে ধরে। পুষি পারলে বাটিটাকেই কামড়ে খেয়ে নেয়। কান্না পেয়ে যায় প্রিয়াংশুর। কেন? কার জন্য মন খারাপ ওর? সুস্মিতা? নাকি সুসের সঙ্গে আরও কারও জন্য! যে ওর একান্ত নিজের! কিন্তু অনেক দূরের!
-একটু আসবেন আমার ফ্ল্যাটে?… আসলে আমার শরীরটা একদমই ভালো লাগছে না। কিন্তু এখুনি আমায় অনেক কথা বলতে হবে আপনাকে । যদি আসেন…
কথাগুলো ভীষণ ক্লান্ত স্বরে ওপারের মানুষটির কানে পৌঁছোয়। উত্তর ভেসে আসে। প্রত্যুত্তর যায়, ‘থ্যাংক ইউ সো মাচ।’ সোফায় শরীরটা ছেড়ে দিয়েছে প্রিয়াংশু। কান থেকে মোবাইলটা সরাতেই হাতটা সোফার ওপর ঝপ করে পড়ে গেল। প্রিয়াংশুর চোখ ঝাপসা। বিন্দু বিন্দু স্মৃতিগুলো কীভাবে যেন প্রকাণ্ড এক সিন্ধুতে পরিণত হয়েছে।
কলেজ ক্যান্টিন। টেবিল যেখানে ড্রামস বা তবলা, চেয়ার হল থুম্বা। মাইকবিহীন অমায়িক কণ্ঠগুলো সেখানে সুরে-বেসুরে যুদ্ধ লাগিয়ে একেবারে সঙ্গীতের কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ফেলে। অরুণা, মৃত্তিকা, সুস্মিতা চারটে চেয়ার দখল করে বসে। একটা চেয়ার ওদের বাজনা। অন্য টেবিল থেকে একটি ছেলেকে তুলে দিয়া টেনে এনেছে আরেকটা চেয়ার। প্রিয়াংশু ওসবের ধারধারেনি। সটান দিয়ার কোলে ধপাস হতেই চটপটাপট চড় চাপ্পড় দিয়ে তুলে দিল। ‘আইস্যালারে, তোর হাত না ছণ্টি?’ দিয়াকে বলে উঠল প্রিয়াংশু। দিয়া একটু ভাও খেল। গলার শির ফুলিয়ে ছম্মা ছম্মা গাইছিল সুস্মিতা । টেবিলে তাল দিচ্ছিল অরুণা। দুজনেই হেসে ফেলল। সুস্মিতার গান গেল নড়ে। মৃত্তিকা ডেভিলে কামড় দিয়ে বলল, ‘ওপাশ থেকে একটা চেয়ার নিয়ে আয় না।’
-সব তো ভর্তি ।
-তাতে কী? একটাকে তুলে নিয়ে আয়। দেখিস ভাই, কোনও সুন্দরীকে তুলে ফেলিস না।
-তেমন সুন্দরী আর কই?
গলাটা চুলকে নিয়ে বলল প্রিয়াংশু।
সুস্মিতা চিৎকার করে উঠল, ‘ছম্মা ছম্মা। এই ম দিয়ে। ম দিয়ে কর । এবার অরুণার টার্ন। ওদিকে প্রিয়াংশুর চেয়ার খুঁজতে খুঁজতে একজনের ওপর চোখ আটকে গেছে। এক মাথা ঝাঁকড়া চুল। এক হাতে পাউরুটি ধরা, অন্যহাতে ডিমসেদ্ধ। সমানতালে দুটোতে কামড় বসিয়ে যাচ্ছে। মাঝেমাঝে ঝাঁকড়া চুলগুলো মুখের সামনে পড়লে ডানহাতের কবজি দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে। রীতিমত গপগপ করে খাচ্ছে। অরুণা গান ধরেছে, ‘মেরে দিলকা উও শাহেজাদা, মেরা দিলবর মেরা প্রেমী।’ প্রিয়াংশু এগিয়ে যায়। মেয়েটার সামনে দাঁড়ায়। কিচ্ছু বলে না। শুধু ঘাড় কাত করে তাকিয়ে থাকে । পিছন থেকে দিয়া হাঁক পাড়ে, ‘এই প্রিয়াংশু, আয়।’ ডিমসেদ্ধ দিয়ে পাঁউরুটি চিবোতে চিবোতে ঝাঁকড়া চুলো মেয়েটার এবার নজর পড়ে প্রিয়াংশুর দিকে। থমকে যায়। এইরকম হ্যাংলার মতো তাকিয়ে আছে কেন রে বাবা? খিদে পেয়েছে নাকি?
-কী নাম?
রেলা নিয়ে প্রশ্ন করে প্রিয়াংশু। অমনি এক গাল হেসে মেয়েটি বলে, ‘শ্রীদেবী মণ্ডল।’ নাম বলা মাত্রই যেন হ্যালির ধুমকেতু আছড়ে পড়ল । সামনে যারা বসেছিল তাদের মধ্যে একজন বলে উঠল, ‘বাওয়া, কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন!’ প্রতিবাদ করে উঠল প্রিয়াংশু, ‘হেই, চোখে দেখতে পাস না? ও কী ছেলে? ও তো মেয়ে।’ ছদ্মভয়ে রসিকতার ছলে কান মুলে ছেলেটি বলল, ‘উপস! সরি প্রিয়াংশুদা। গলতি মাফ কর দিজিয়ে।’ আবারও রেলা নিয়ে উত্তর দিল প্রিয়াংশু, ‘ঠিকাছে ঠিকাছে।’ শ্রীদেবী কিছু বোঝার আগেই প্রিয়াংশু বলল, ‘শোনো শ্রীদেবী, কেউ তোমায় কোনও ডিস্টার্ব করলে আমায় বলবে কেমন?’ খিলখিল করে হেসে ঘাড় নাড়ল শ্রীদেবী।
-বাহ! হাসলে তো একদম শ্রীদেবীর মতো লাগে তোমায়। সাৰ্থক নাম । লজ্জায় শ্রীদেবী চোখ নামাতেই টুক করে অন্যান্য ছেলেগুলোর দিকে চোখ মারে প্রিয়াংশু। বেশ একটা মজার খোরাক পাওয়া গেছে। ‘যাক গে, এবার ওঠো তো।’ হকচকিয়ে যায় শ্রীদেবী। ছেলেটা কী বলে? -খাচ্ছি তো।
-তাতে কী? আমার চেয়ারটা লাগবে। দাও। অন্য কোনও চেয়ার নিয়ে নাও প্লিজ। দাও দাও। আরে ছাড়।
প্রায় শ্রীদেবীকে সুদ্ধু চেয়ারটা টানাটানি করতে থাকে প্রিয়াংশু। উঠে পড়তে বাধ্য হয় শ্রীদেবী। প্রিয়াংশু সিটি দিতে দিতে চেয়ারটা নিয়ে তার বন্ধুদের মধ্যে চলে যায়। দুহাতে খাবার ধরে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে শ্রীদেবী।
এর মধ্যে এখানে প্রায় অর্ধেক বলিউড শেষ হতে চলেছে। হঠাৎ শ্রীদেবী তার খাবারটা নিয়ে অরুণা, মৃত্তিকা, প্রিয়াংশুদের টেবিলের ওপর উঠে বসে। সকলেই হতভম্ব। সবার একটাই প্রশ্ন, ‘এটা কে? কোত্থেকে এল?’ শ্রীদেবীর ভ্রুক্ষেপ নেই। সে মহানন্দে ডিম খাচ্ছে আর ঠ্যাং দোলাচ্ছে। অরুণা খিঁচিয়ে উঠল, ‘এ হ্যালো, দেখছিস না আমরা এখানে বসে গান করছি।’ -আমিও তো আমার জায়গায় বসে খাচ্ছিলাম।
সটান জবাব শ্রীদেবীর। প্রিয়াংশু হতভম্ব। ভাবতেও পারেনি মেয়েটার এত সাহস হবে। ‘ফার্স্ট ইয়ার তো?’ প্রিয়াংশুর প্রশ্নে শ্রীদেবী ঘাড় নাড়ল। -আমরা থার্ড ইয়ার। রেসপেক্ট দিতে শেখো। -তুমিও ।
-মানে?
-ভেবেছিলে বার খাইয়ে ক্ষুদিরাম করে আমার চেয়ারটা গেঁড়িয়ে নেবে আর আমি কিছু বলব না। মিদনাপুরের মেয়ে আমি। ভালোবেসে বলতে দিয়ে দিতাম। কিন্তু তুমি তো জোর করে কেড়ে এনেছ। -এই চপ।
ধমকায় প্রিয়াংশু। ঝট করে মুখটা হাঁড়ির মতো করে ভেবলে যাবার ভান করে শ্রীদেবী। তারপরেই সেই খিলখিলে গুড়গুড়ে হাসি। ‘ভয় পেয়ে গেছে। হে হে হে! নইলে এত ধমকায় নাকি?’ প্রিয়াংশুর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল। দিয়ার মুখের সামনে পেছন পেতে বসেছে শ্রীদেবী। তার ওপর হাসতে হাসতে ঢলে পড়ছে। বিরক্ত হয়ে উঠেই পড়ল দিয়া । ‘হোয়াট দ্য ফাক? এ মালটা কে?’ ঝট করে ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে বলল, ‘শ্রীদেবী। শ্রীদেবী মণ্ডল।’ মৃত্তিকা ভুরু কুঁচকে ফুট কাটল, ‘বাবা! বাপ মা আজকাল এমন নামও রাখে?’ মুখের সামনে থেকে চুল সরিয়ে শ্রীদেবী জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার নাম কী গো?’ ব্যাজার মুখে উত্তর দিল, ‘মৃত্তিকা ।’
-বাহ! মৃত্তিকা আর শ্রীদেবী।
নিজের নামে দেবী শব্দটার ওপর একটু জোর দিল। ফস করে বলে উঠল, ‘জানো, তোমাকে দিয়ে আমাকে গড়া হয়।’ মৃত্তিকা অবাক। ‘তুমি মাটি আমি দেবী।’ এরপর আবার সেই ক্যান্টিন কাঁপানো হে হে হে হি হি হি ‘কী মিল গো তোমার আমার!’ অরুণা বলে উঠল, ‘এই পাগলিচুদি নাম তো টেবিল থেকে। আমাদের গাইতে দে।’
-গাও না গাও। তোমরা গাও। আমি শুনি ।
বলেই পাঁউরুটিতে কামড় বসাল শ্রীদেবী। উদ্ভট আচরণে সকলেই বিরক্ত। কেবল প্রিয়াংশুর বেশ মজা লাগল। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছে সে। দিয়া রেগেমেগে বলে উঠল, ‘এই তুই নামবি টেবিল থেকে? -হ্যাঁ নামব। আমার চেয়ার দিয়ে দাও। আমি চলে যাচ্ছি।
দিয়া বলল, ‘চল ফোট। ফোট ফোট ফোট।’ আবারও হেসে গড়িয়ে পড়ল শ্রীদেবী, ‘আমি কী ফুল যে ফুটব? চেয়ার দিলে আমি উঠব। নইলে এখানেই ফুটে থাকব।’ সকলেরই কান গরম হয়ে যাচ্ছে রাগে। সুস্মিতা রাগের মাথায় ঘাড় ধরে শ্রীদেবীকে নামিয়ে বেশ জোরে একটা ঠ্যালা মারল। কয়েকটা খারাপ কথা বলে দূর করে দিল। অবস্থা বেগতিক দেখে শ্রীদেবীও আর মুখ লাগাল না। খাওয়া তার শেষই হয়ে গিয়েছিল। সেখান থেকে কেটে পড়ল। তবে খালি হাতে নয়। প্রিয়াংশুর পাশ থেকে ঝট করে টেনে নিল চেয়ারটা। সেটাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল যেখানে আগে সে বসেছিল। কিন্তু বসল না। চেয়ারটাকে যথাস্থানে রেখে কোঁকড়ানো ঝাঁকড়া চুল নাচিয়ে ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে গেল শ্রীদেবী। সবাই হাঁ। অরুণা বলে উঠল, ‘প্রিয়াংশু তুই কিছু বললি না?’ ব্যাঁকা হাসি ঠোঁটে নিয়ে প্রিয়াংশু বলল, ‘ক্লাস নিতে হবে।
-দেখো, আমরা সবাই বলি ইতিহাস পড়ছি। কিন্তু এই ইতিহাস তো শুধু একটা শব্দ। এর মানেটা কী? কোথা থেকে এল? সেটা আগে আমাদের জানতে হবে।
মাঝবয়সী এক মহিলা প্রফেসর পড়াচ্ছেন। ব্ল্যাক বোর্ডে লেখা অজস্র নোট। ক্লাস ভর্তি ছেলে মেয়েরা এক মনে শুনছে। কিন্তু কোথা থেকে যেন মাঝেমাঝেই টুকরো হাসির শব্দ ভেসে আছে। প্রফেসর পড়াতে পড়াতেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন। প্রায় সাঁইত্রিশ জন ছেলেমেয়ে। এর মধ্যে মুখ চাপা হাসির আওয়াজ খুঁজে বের করা মুশকিল। পাত্তা না দিয়েই প্রফেসর তাঁর কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। ‘দুটো শব্দের সংমিশ্রণে হিস্ট্রি শব্দের উৎপত্তি। একটা হিস্টর আরেকটা হিস্টরিকা। একটা ল্যাটিন আরেকটা গ্রিক। একটার মানে জ্ঞান, আরেকটার মানে অনুসন্ধান।’ আবারও ছেঁড়া ছেঁড়া হাসির শব্দ। কাউকে সন্দেহ হল প্রফেসরের। কিন্তু কিছু বললেন না। পড়াতে লাগলেন । ‘আমরা তো যা খুশি গল্প বানিয়ে বলতে পারি। প্রাচীনকালে এই ছিল। সে অমুককে মারল। তারপরেই সৃষ্টি হল তমুকের। বাট এটা কী ইতিহাস? না, এটা ইতিহাস নয়। ইতিহাস সেটাই যার প্রমাণ আছে। অর্থাৎ এভিডেন্স। এই যে মাটি খুঁড়ে কত কিছু বেরিয়ে এসেছে। শিলমোহর থেকে একটা গোটা সভ্যতার ধ্বংসস্তুপ। এগুলো একেকটা সময়ের দলিল। যথার্থ প্রমাণ। তাই এইগুলোই…।’ বলতে বলতেই থামলেন প্রফেসর। ‘এই মেয়ে, এই যে তুমি, কোঁকড়া চুল। ওঠো ওঠো।’ ঘাবড়ে গেল শ্রীদেবী। আশেপাশে বাকি ছাত্রছাত্রীরা ওর দিকেই তাকাল। অগত্যা উঠে দাঁড়াতে হল। -আমি দিদিমণি?
-দিদিমণি?
সারা ক্লাস হো হো করে হেসে ওঠে। প্রফেসর ডাস্টার দিয়ে টেবিলে আঘাত করে সবাইকে চুপ করান। ‘তখন থেকে খেয়াল করছি তুমি হেসে চলেছ। কী ব্যাপার? হাসছ কেন?’
প্রশ্নটা হাটের মাঝে পড়তেই আবারও খিলখিলে হাসি পেট গুলিয়ে বেরিয়ে এল শ্রীদেবীর। প্রফেসর তো ক্ষেপে আগুন। ‘আরে, তুমি পাগল নাকি? এমনি এমনি হাসছ?”
-না দিদিমণি। আসলে …
-এই ম্যাডাম বলো, তুমি কি গাঁয়ের স্কুলে পড়েছ নাকি? দিদিমণি আবার কী?
-না দিদি…এই ম্যাডাম। মিদনাপুর গ্রাম কেন হবে? ওটা টাউন।
-ডিসগাস্টিং। হাসার কারণটা বলো। আমাকে দেখে হাসি পাচ্ছে?
বেশ তেজ নিয়ে প্রশ্নটা করলেন প্রফেসর। উত্তরটাও তেমনি এল সপাটে, ‘হ্যাঁ ম্যাডাম।’ প্রফেসর তো অবাক হয়ে আগে নিজের জামাকাপড় ঠিক আছে কিনা দেখে নিলেন। তারপর তুতলিয়ে বললেন, ‘কী… কেন হাসছ?”
-আমাদের চন্দ্রকোণায় একবার খুব ঝড় হয়েছিল। আর আমাদের ঘরের পাশে একটা গাছ ছিল। সেখানে একটা লাউডগা সাপ থাকত।
এ যেন রূপকথার গল্প ফেঁদে বসেছে। প্রফেসর ম্যাডাম তো অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে রেখেছেন। শ্রীদেবী মনের আনন্দে গল্প বলে চলেছে। ‘সেই ঝড়ে হঠাৎ দেখি লাউডগা সাপটা ঝুলছে। খাবি খাচ্ছে। কিছুতেই ডালের মধ্যে নিজেকে বেঁধে রাখতে পারছে না। ঝড়েতে একবার এদিক আর ওদিক করছে।
-এতে হাসির কী হয়েছে?
-ম্যাডাম, আপনার মুখের পাশে যে চুলটা ঝুলছে সেটা পাখার হাওয়ায় ওই লাউডগা সাপটার মতোই দুলছে। হঠাৎ মনে পড়ে গেল।
মেয়ে কথা বলবে কী, নিজেই হেসে খুন। সঙ্গে সারা ক্লাস একই তালে কেঁপে উঠছে। ম্যাডাম বেচারি খুব স্টাইল মেরে চুল ঝুলিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু একটা গেঁয়ো ছাত্রী যে এইভাবে তাঁর খিল্লি করবে কল্পনাও করতে পারেননি। ঝট করে মুখের পাশের চুলটা কানের পাশে গুঁজে নিলেন । তারপর চিৎকার করে বললেন, ‘এই মেয়ে তুমি ক্লাসের বাইরে যাও তো। বেরোও। তোমায় ক্লাস করতে হবে না।’ এইবার শ্রীদেবীর মুখটা শুকিয়ে গেল।
-কেন ম্যাডাম? আমি তো সত্যি কথাই বললাম। মিথ্যে তো বলিনি। তাহলে আমায় শাস্তি দিচ্ছেন কেন?
-শাট আপ। গেট আউট ফ্রম মাই ক্লাস। এতটুকু শিক্ষাদীক্ষা নেই। তুমি প্রফেসরের সঙ্গে ফাজলামি করছ?
-ম্যাডাম মিদনাপুর যে ৷
একটি ছেলে টোন কাটল। আবারও গুমগুমে হাসিতে ভরে উঠল ক্লাস । ম্যাডাম তেড়ে ক্ষেপে উঠলেন, ‘বেরিয়ে যাও নয় তো আমি বেরিয়ে যাব।’ বাধ্য হয়ে দরজার দিকে এগোতে লাগল শ্রীদেবী।
-এই তোমার নামটা বলে যাও তো।
কাঁচুমাচু মুখটা ম্যাডামের দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘শ্রীদেবী মণ্ডল।’ অবাক লাগল শ্রীদেবীর। ওর নাম শুনেও হাসি পেল সব্বার! কই স্কুলে তো কেউ হাসত না? বরং এত সুন্দর করে তার নামটা বলত সকলে যে নিজেকে মাঝে মাঝে দেবীই ভাবত শ্রীদেবী। শহরের সবই যেন উল্টো ।
ক্লাসের বাইরে গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেন কিছুক্ষণ বাদেই ম্যাডাম তাকে ডেকে নেবে ক্লাসে এই ভেবে সে বাইরে দরজার ঠিক পাশটাতেই অপেক্ষা করল। স্কুলে ক্লাস থেকে বের করে দিলে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকত সবাই। কান ধরতে বললে কান ধরত। এখানে তো আর সেসব কিছু বলেনি।
দূর থেকে ফোর মাস্কেটিয়ার্স অরুণা, দিয়া, সুস্মিতা আর মৃত্তিকা দেখতে পেল শ্রীদেবীকে। হেঁটে আসতে আসতে দাঁড়িয়ে পড়ল ওরা। অরুণা কাকে যেন ফোন করে কী বলল। ক্লাস শেষ হল। ম্যাডাম বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে ঢুকে পড়ল কয়েকটা বিচ্চু পঙ্গপাল। কয়েকজন ক্লাস থেকে বেরিয়ে যেতে যাচ্ছিল। অরুণা, সুস্মিতা, দিয়া, মৃত্তিকা, আর প্রিয়াংশু সবাইকে বসতে বলল। এদের দেখেই শ্রীদেবীর মনটা কু গেয়েছিল। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। ‘গাইস, এবার আমরা তোমাদের ক্লাস করাব।’ দিয়ার কথা শুনে যথারীতি ফার্স্ট ইয়ারের সকলেই ঘাবড়ে গেল। কলেজের র্যাগিং সম্পর্কে সকলেরই কম বেশি জানা আছে। কিন্তু শ্রীদেবীর আছে কী? সবাই মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে দেখে অরুণা বলে উঠল, ‘এ কী সবার মুখ শুকিয়ে গেল কেন? আমরা কী বাঘ না ভাল্লুক?’ সুস্মিতা অমনি বলে উঠল, ‘আরে না না। পড়াফড়া ধরব না। আমরা জানি এই ফার্স্ট ইয়ারের ব্যাচে বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী আছে যারা হেব্বি ট্যালেন্টেড। এই যেমন আমরা। সুস্মিতা আঁকতে পারে। বিউটিফুল নকশা করতে পারে। অরুণা দুর্দান্ত প্রেম করতে পারে।’ ফিক করে হেসে ফেলে চোখ মারল অরুণাকে। ‘মৃত্তিকা দারুণ টেক স্যাভি। প্রিয়াংশু খুব ভালো খেলতে পারে। যেমন এখন ওর খেলার প্রস্তুতি চলছে।’ কপট লজ্জায় হাসল প্রিয়াংশু।
-আর আমি দিয়া, একটু একটু গান গাইতে পারি। ঠিক তেমনি এখানে যারা যারা ট্যালেন্টেড আমরা তাদের সঙ্গে একটু আলাপ করে ট্যালেন্টগুলো চেক করব। আর সঙ্গে কিছু প্রশ্ন থাকবে।’ অরুণা বলল, ‘সঠিক উত্তর দিলে পার। নইলেই মার।’
-এই ধ্যাত, বাচ্চাগুলোকে ভয় কেন দেখাচ্ছিস?
সুস্মিতা বলল। প্রিয়াংশু কিন্তু চুপ করে একজনকেই দেখে চলেছে। সুস্মিতা সেটা খেয়াল করেই অরুণাকে ঠেলা দিয়ে ফিসফিস করে বলে ওঠে, ‘প্রিয়াংশু কি লটকে গেল নাকি?”
-ও লটকাবার ছেলে নয়। খেলোয়াড়
-তাহলে আগে কার পালা?
প্রশ্নটা ক্লাস ভর্তি ছেলেমেয়েগুলোর দিকে ছুড়ে দিয়েই অরুণা একটি মেয়েকে তুলে আনল। নাম ধাম জিজ্ঞেস করে তাকে কীর্তন গাইতে বলা হল। সে যা কীর্তন গাইল তাতে রাধা কৃষ্ণ প্রেম করাই ভুলে যাবে। দিয়া ধমক দিল, ‘ওই, বাঙালি হয়ে জন্মেছিস একটা কেত্তন গাইতে পারিস না?’ সেই মেয়েটি বেচারি মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ‘গাইলাম তো দিদি।’ -হ্যাঁ, এটা তোর বাপের ছেরাদ্দে গাস।
মেয়েটি বিরক্ত হলেও কিছু বলতে পারল না। মৃত্তিকা বলে উঠল, ‘তুমি চন্দ্রবিন্দুর চাঁদ পেয়েছ। তাই এবার একটা প্রশ্নের উত্তর দাও দিকি ।’ মেয়েটি ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকাল।
-বলো তো মা, বাচ্চা কীভাবে হয়?
ক্লাসের ছেলেগুলোর পেট গুড়গুড়িয়ে হাসি উঠে এল। সুস্মিতা বলে উঠল, ‘কী রে বল। বাচ্চা কীভাবে হয়?’ প্রিয়াংশু ফিক করে হেসে উঠল। মুখে হাত চাপা দিয়ে আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মনে হচ্ছে প্র্যাক্টিকাল ক্লাস লাগবে।’
-তার আগে কান ধরে ওঠবোস কর।
অরুণা বলে উঠল। পঙ্গপালের গোটা দলটাই সায় দিল। মেয়েটিও বাধ্য হল কান ধরে দশবার ওঠবোস করতে ।
-এবার নাচ দেখার পালা।
প্রিয়াংশু বলল। অরুণা ঢেউ তুলল, ‘হোক হোক। সিল্পী কে ভাই?’ শ-এর উচ্চারণটা ইচ্ছে করেই স-এর মতো করল। দিয়া আঙুল নেড়ে চটুল হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি জানি আমি জানি।’
-এই কে রে দিয়া?
সুস্মিতার প্রশ্ন। দিয়া গাইতে শুরু করল, ‘ম্যায় খোয়াবো কি শেহেজাদি, ম্যায় হু হর দিল পে ছায়ি। বাদল হ্যায় মেরি জুলফে, বিজলি মেরি অংড়াই।’ প্রিয়াংশু, সুস্মিতা, অরুণা, মৃত্তিকা সবাই মিলে হোওওওও করে হাততালি দিয়ে উঠল। ঘটা করে নাম ঘোষণা হল তার। মৃত্তিকা ঘোষক, বম্বে কাঁপিয়ে ভারত নাচিয়ে এখন আমাদের মধ্যে নেত্য পরিবেশন করবেন শ্রীদেবীইইইই।’ সকলেই অট্টহাসির সঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠল। শ্রীদেবীর কানে সেগুলো পিশাচের খোলকরতালের মত বাজল। বারবার ডাকার পরেও যখন গেঁয়ো মেয়েটি তার আসন ছেড়ে নড়ছে না তখন দিয়া আর সুস্মিতা গিয়ে টেনে তুলল। আগেরদিন প্রিয়াংশুর থেকে যেভাবে চেয়ার টেনে নিয়ে গিয়েছিল কতকটা সেইভাবেই শ্রীদেবীকে পঙ্গপালের হাটে এনে দাঁড় করাল ওরা। প্রিয়াংশু চুপ। বাকিরা শ্রীদেবীকে ঘিরে ঘুরতে লাগল। অরুণা বলল, ‘লে লেড়কি নাচ।’ সুস্মিতা গাইল, ‘হাওয়া হাওয়াই, হাওয়া হাওয়াই।’ সঙ্গে সঙ্গে দিয়া বলে উঠল, ‘এই না না, এই গানটা নয়।’ বলেই গাইতে শুরু করল ‘ম্যায় তেরি দুশমন, দুশমন তু মেরা, ম্যায় নাগিন তু সাপেরা।’ সবাই সমস্বরে হো হো করে সমর্থন করল। শ্রীদেবী ঘাবড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা তার স্বভাববিরুদ্ধ। তাই আবারও খিলখিল করে হেসে উঠল। ওর হাসি দেখে বাকিরা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
-ধুস। ওসব নাচতে-ফাচতে আমি পারি না ।
-এই, পারিস না মানে? আমরা যখন বলেছি তখন নাচতে হবে। সুস্মিতা ধমকে উঠল। দিয়া গান ধরল। অরুণা শ্রীদেবীকে ধরে ঘুরিয়ে দিল। মাথার কোঁকড়া চুলগুলো ঝড়ে ওড়া কাকের বাসার মত ছড়িয়ে পড়ল। সুস্মিতা দুহাতে ঘেঁটে দিল শ্রীদেবীর মাথার চুল। শ্রীদেবী এবার যেন আর তল পাচ্ছে না। পঙ্গপালের দল থেকে বেরিয়ে যেতে চাইলে দিয়া পথ আটকে দাঁড়ায়। খপ করে ওর দুটো হাত ধরে নেয়। মাতালের মতো নাচতে শুরু করে। দুহাত মাথায় তুলে পিশাচিনীদের মতো খলখল করে হাসতে হাসতে উন্মাদের মতো ঘুরতে থাকে সুস্মিতা, দিয়া, মৃত্তিকা আর অরুণা। অসহায়কে জ্বালাতন করার যে বিপুল মজা সেটা এই মুহুর্তে তারা উপভোগ করছে। নাচতে নাচতেই দিয়া প্রশ্ন করে, ‘শ্রীদেবী, মেরি জাআআআন, বলো তো বাচ্চা কীভাবে হয়? কী হল বলো বলো!’ শ্রীদেবী প্রায় কাঁদো কাঁদো। কে বাঁচাবে ওকে? এখানে তো ভাই, তপাদা কেউ নেই। এতগুলো ছেলে মেয়ের সঙ্গে ও একা পেরে উঠবে না। দিয়া একটা হ্যাঁচকা টানে গোল করে ঘুরিয়ে ছুড়ে দেয় শ্রীদেবীকে। ঠিক সেই মুহূর্তে ফিল্মি হিরোদের মতো শ্রীদেবীকে লুফে নেয় প্রিয়াংশু। এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার সে ঝলসে ওঠে, ‘স্টপ ইট। অনেক হয়েছে।’ সবাই ঘাবড়ে গিয়ে চুপ করে যায়। প্রিয়াংশুর হঠাৎ কী হল কেউ বুঝতে পারে না। অবাক হয় শ্রীদেবীও। পড়তে পড়তে কোনও রকমে নিজেকে সামলে গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে নেয়। ঘেমে গেছে। চোখ লাল। প্রিয়াংশু রাগত স্বরে বলে ওঠে, ‘আমরা মজা করতে এসেছিলাম দিয়া। কিন্তু এবার সেটা অসভ্যতামি হচ্ছে। আর কেউ শ্রীদেবীকে বিরক্ত করবে না।’ জোড়া ভুরু হেনে প্রিয়াংশুর দিকে তাকায় শ্রীদেবী। প্রিয়াংশু নরম সুরে বলে, ‘সরি শ্রীদেবী।’ শ্রীদেবীকে দুহাতে ধরে প্রিয়াংশু। সিটের দিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে যত্ন করে বসিয়ে দেয়। শ্রীদেবী কাঁপছে। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে এমন হয় শুনেছিল। কিন্তু শহরের এই কলেজেও যে এরকম র্যাগিংয়ের শিকার হতে হবে সে ভাবেনি। এই জন্যেই মানুষকে ভয় পায় সে। ভীষণ ভয় পায়। শ্রীদেবীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে প্রিয়াংশু, ‘এরকম আর হবে না। কেউ যদি এরকম করে আমায় বোলো। নির্দ্বিধায়।’ ভয় পেয়ে শুকিয়ে আসা ঠোঁটে খুব নরম একটা হাসি ছিদ্র দিয়ে ঠিকরে আসা সূর্যের আলোর মতো চকচক করে ওঠে।
-শালা কী ঢ্যামনা রে!
দিয়া বিড়বিড় করল অরুণার কানে।
-শেষে কিনা এই বুনো মাল! ছি ছি ছি।
অরুণার উত্তর। প্রিয়াংশু কাছে এসে দাঁড়াতেই দিয়া বলে ওঠে, ‘কী ব্যাপার বল তো? হঠাৎ বিবেকানন্দ হয়ে গেলি?’ প্রিয়াংশু একবার কড়া দৃষ্টিতে তাকায়। বলে, ‘মেয়েটা গ্রাম থেকে এসে শহরে একা একটা বাড়িতে ভাড়া থাকে। নিজে রেঁধে বেড়ে খায়। কেউ করে দেবারও নেই। তোদের লজ্জা করে না? ওকে নিয়ে এইভাবে খিল্লি করছিস!’ কথাগুলো খুব আস্তে আস্তে বলেই গলা তুলল সকলের উদ্দেশে, ‘এই চল সবাই। চল চল চল।’
-যাঃ শালা। এই তোর হল কী?
দিয়া অবাক হয়ে প্রশ্ন করল বটে। কিন্তু উত্তর পেল না। প্রিয়াংশু গটমট করে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দেখাদেখি বাকিরাও। শ্রীদেবীর চোখটা ভিজে এল।
একা একা বাড়ি ফেরার পথে ফোন করল সরযু ঠাকমাকে। ছেমড়ির ফোন পেয়ে সরযু তো বেজায় খুশি। অলি গলি ধরে হাঁটতে হাঁটতে শ্রীদেবী ঠাকমাকে বলল, ‘তুমি ঠিকই বলেছিলে ঠাকমা, যখন কেউ একা বিপদে পড়ে। কেউ বাঁচাবার থাকে না। তখন ভগবান ঠিক তাকে বাঁচিয়ে দেয়। নইলে যে ছেলেটা আগেরদিন আমায় বিরক্ত করেছিল। খুব খারাপ মনে হয়েছিল সেই ছেলেটাই কেন আমায় বাঁচাবে বলো? ভগবানই তাকে পালটে দিয়েছে বলো ঠাকমা?
-তাই তো তাই তো। ছেলেটার সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখবি। ও হয়তো ওর ভুলটা বুঝতে পেরেচে।
শ্রীদেবী খেয়াল করেনি ওর পেছন পেছন প্রিয়াংশু আসছিলই। দেখতে পেয়েই তড়িঘড়ি ফোনটা রেখে দিল।
-একটা জরুরি কথা বলতে এলাম।
-বলো।
-তুমি কোনও প্রফেসরের কাছে ভর্তি হয়েছে? মানে প্রাইভেট টিউশন? -না না। ওসব লাগবে না। ও আমিই পড়ে নেব।
-পাগল নাকি?
শ্রীদেবী আবার কুরকুরিয়ে হাসল। ‘চন্দ্রকোণায় লোকে আমায় ঝাঁকড়া পাগলি বলে।’ বলেই আবার হাসতে শুরু করে। ফিক করে হেসে ফেলে প্রিয়াংশুও। বলে, ‘একা একা তো অনার্স পড়ে পাশ করতে পারবে না । -অ্যাঁ! কেন?
-পড়তে পড়তে বুঝবে কত শক্ত।
-তাহলে কার কাছে যাব! তাছাড়া কত টাকা নেবে তাও তো জানি না। বেশি পয়সা আমি দিতে পারব না।
-কিচ্ছু লাগবে না।
-মানে?
-আমারও তো হিস্ট্রি। আমার সব নোটসগুলো দিয়ে দেব তোমায়। বুঝতে অসুবিধে হল বোলো, আমি বুঝিয়ে দেব। -তাই সত্যি?
নেচে উঠল শ্রীদেবী। প্রিয়াংশুও হেসে বলল, ‘হ্যাঁ সত্যি। তবে এটা কাউকে বলা যাবে না। কেমন?’
-একদম।
-কালকে নোট নিয়ে আসব।
-আচ্ছা ।
-তুমি থাকো কোন বাড়িতে?
-এই তো সোজা গিয়ে ডানদিকে। চলো না যাবে?
-হ্যাঁ চলো ।
সঙ্গে সঙ্গে শ্রীদেবীর মুখটা ছোট হয়ে গেল। ‘এ মা! না গো তোমায় নিয়ে যেতে পারব না।’
-কেন?
-বাড়িউলি অ্যালাও করবে না। সবার প্রবেশ নিষেধ। এমনকি আমার ভাই আর তপাদাকেও থাকতে দেয়নি।
-তপাদা কে?
-আমায় পড়াত। পাড়াতে থাকে।
-ও। ঠিকাছে। নো প্রবলেম। তোমার বাড়ি অব্দি এগিয়ে দিই। তারপর চলে যাব। -আচ্ছা। এই
আমি না সরি।
-কেন?
-আমি সেদিন তোমায় খুব খারাপ ছেলে ভেবেছিলাম। মানে খুব বাজে বিচ্ছিরি ভেবেছিলাম তোমায় ।
-সেটাই তো স্বাভাবিক। আমি তো খারাপ কাজই করেছিলাম।
-তোমার বন্ধুরা ওরকম কেন?
-ওদের কথা ছাড়। ওরা ওরকমই। হিহিহিহি… আবার হাসি। ওরা দুজন হেঁটে চলল, পাশাপাশি। শ্রীদেবী বাড়িতে ঢুকে যাবার পর হাত নেড়ে প্রিয়াংশুও বাড়ি ফেরার পথ ধরে।
