ম্যাও – ২৫

২৫

-এটা সুপ্রভা অধিকারীর বাড়ি তো?

দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গেই মহিলাটি নামটা বলল। মিশ্রঠাকুর গায়ে নামাবলিটা সবে চাপিয়েছিলেন বেরোবেন বলে। ঠিক তখনই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। মহিলাটির পাশে একটি লম্বা তাগড়াই চেহারার ছেলে । হালকা হলুদ শার্ট, কালো প্যান্ট। গলায় ঝোলানো ক্যামেরা। মহিলাটি বিনুনি করা। গায়ের রং চাপা। পরনে শাড়ি। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ, হাতে কভার ফাইল। মিশ্রঠাকুর অবাক হয়ে পরিচয় জানতে চাইলে মহিলাটি জানান তাঁরা কর্পোরেশন থেকে আসছে। এই এলাকায় যত পুরোনো বাড়ি আছে সেগুলো সার্ভে করছেন। কোনটা কত প্রাচীন, কোন বাড়ির কী অবস্থা এইসব।

-এখনি আসতে হল আপনাদের?

একটু উষ্মা প্রকাশ করলেন মিশ্রঠাকুর। মহিলাটি বললেন, ‘আসলে আমরা সকাল থেকে অনেক বাড়ি ঘুরছি। অসুবিধে হল?’

-তা তো একটু হল বৈ কি মা। মন্দিরে বেরোচ্ছিলাম তো।

ছেলেটি বলল, ‘এখনও তো সন্ধে হয়নি ঠাকুরমশাই।’ মিশ্র চশমার মধ্যে দিয়ে নাক সিঁটকে ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘শ্রাবণ মাসের শনিবার তো। তাই গ্রহরাজের পুজোটা একটু বড় করেই করতে হয়। এসব আর আপনারা কী করে…! আসুন।’

অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঘরের মধ্যে ডাকল দুজনকে। চারপাশ দেখতে দেখতে মহিলাটিই জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নাম তো পঙ্কজ মিশু?’

-হুম। দেখে আসবেন উঁচুনিচু আছে।

মিশ্রঠাকুর বললেন। ছেলেটি সামনের প্যাসেজের একটা ছবি তুলল। মিশ্রঠাকুর আরও একটু বিরক্ত হলেন।

-তাহলে সুপ্রভা অধিকারী কে?

মিশ্রঠাকুর ঘুরে তাকিয়ে মহিলাটিকে বললেন, ‘আমার দিদি।’ মহিলাটি

ঘাড় বেঁকিয়ে সন্দিগ্ধ চোখে জানতে চাইলেন, ‘দিদি মানে? নিজের দিদি?’ -হ্যাঁ। দিদি বিয়ের পর অধিকারী হয়। এটা তার খুশ্বশুরের বাড়ি ছিল। দিদিকে দিয়ে গেছেন ।

-দিদি কোথায় থাকেন?

-মেদিনীপুর। আমিও ওখানেই থাকতাম।

-মেদিনীপুরের কোথায়?

-চন্দ্ৰকোণা।

উত্তরটা দিয়ে একটু তাড়া দেখিয়েই মিশ্রঠাকুর বললেন, ‘এই ছোট্ট উঠোনের দুপাশে দুটো ঘর। একটা রান্নাঘর। ওই যে ওটা। আর বাথরুমটা এই সরু গলি দিয়ে গিয়ে। আগেকার বাড়ি তো তাই বাথরুমটা দূরে। এইটুকুই ব্যস।’

-সে কি! বাইরে থেকে তো বেশ বড় লাগে বাড়িটাকে। ওপরে কী আছে? -ওপরেও ঘর আছে একটা। সঙ্গে ছাদ। কিন্তু আমরা ব্যবহার করি না। থাকি তো দুটো মানুষ। লাগে না বিশেষ একটা।

ছেলেটি একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছে। মহিলাটি সোজা মিশ্রঠাকুরের ঘরের দিকে হাঁটা লাগালেন।

-আপনারা কী ঘরের ভিতরও ঢুকবেন নাকি ?

-অবশ্যই। নইলে বুঝব কী করে? শুধু ঘর নয়। আমরা আপনার বাথরুমটাও দেখব ।

-দেখুন আমায় না পুজোটা সময় মেনে করতে হবে। আপনারা বরং কাল আসুন। আমি নিজে সব ঘুরিয়ে দেখাব।

-সরি, এটা একেবারেই সম্ভব নয়। কাল রবিবার তো। হবে না। আমরা বেশিক্ষণ নেব না। মিনিট দশেক। এই সুবীর, সবকিছুর ভালো করে ছবি তুলে নাও যাতে চোখে ধরা না পড়লেও ছবিতে ধরা পড়ে।

কথাটা কি মিশ্রঠাকুরকে শুনিয়ে ইচ্ছে করে বলল মহিলাটি! মিশ্রঠাকুর আর একটাও কথা বললেন না। মিশ্রঠাকুরের ঘর ঘুরে খাটের তলা থেকে আলমারির খাঁজ সব দেখে পাশের ঘরে গেলেন। ঢুকতেই দেখলেন ঘরের মধ্যে অ্যাকোয়াস্টিক ড্রাম সেট রাখা। পুরোনো ঝর্ঝরে বাড়িতে এমন চকচকে ড্রামস কয়লাখনিতে হিরের মতো চমকাচ্ছে। ‘ড্রামস কে বাজায়?” প্রশ্ন করলেন মহিলাটি।

-আমার ভাগ্নে। কানের মাথা খেয়ে ফেলে। -কী নাম?

-তিরু। ?

-তিরু কী

-তিরু ডাকনাম। ভালো নাম ত্রিদিব মণ্ডল ।

মহিলাটি এবার বেশ বড়সড় হোঁচট খায়। ছেলেটিও ছবি তুলতে গিয়ে থমকে মিশ্রঠাকুরের মুখের দিকে তাকায়। মিশ্র বুঝতে পারেন। কোনও প্রশ্ন ধেয়ে আসার আগেই গুছিয়ে উত্তর দেন, ‘আমার ছোড়দির ছেলে। ছোড়দি আর জামাইবাবু যখন মারা যান তখন তিরুর বারো বছর বয়স। ‘

-ওনারা একসাথে মারা গেছেন?

এবার ছেলেটি মানে সুবীর প্রশ্ন করল।

-হ্যাঁ। দোলের সময় শান্তিনিকেতন যাচ্ছিল। একটা ট্রাক এসে সব শেষ করে দেয়। ভাগ্য ভালো তিরু তখন আমার কাছে ছিল। তিরুর ঘর আর মিশ্রঠাকুরের ঘরে মোটামুটি একই আসবাব। আলাদা শুধু ওই ড্রামসটাই । সবকটা ঘরেই সিমেন্ট খসে ইঁট বেরিয়ে এসেছে কিছু জায়গায়। রান্নাঘরেরও একই হাল। একটা পাম্প দেওয়া স্টোভ। কয়েকটা হাঁড়িকুড়ি, থালা, বাটি, হাতা, খুন্তি, সাঁড়াশি, বঁটি। ছোট একটা ফ্রিজ। মহিলাটি সেটা খুলতে যেতেই মিশ্রঠাকুর বেশ কড়া গলায় বলে উঠলেন, ‘আপনারা তো বাড়ির অবস্থা দেখতে এসেছেন। সেখানে পরের বাড়ির ফ্রিজ খুলে দেখার কী সম্পর্ক জানতে পারি?’ মহিলাটি হাতটা গুটিয়ে নেয়। মিশ্রঠাকুর হাত উলটে ঘড়ি দেখছেন আর পুচ-পাচ করে শব্দ করছেন মুখে। বাথরুমে ঢুকতেই চামসে গন্ধ। সঙ্গে প্রস্রাবের কটুগন্ধ। মহিলাটি নাকের নীচে দুবার আঙুল ঘষে নিল বেসিনটায় হলদেটে ছোপ। অনেক দিন পরিষ্কার হয় না বোঝাই যাচ্ছে। খুব জোরে না পেলে কমোডে বসতে কারও মন চাইবে না। দাঁত বের করা দেয়ালের গায়ে জং ধরা একটিই ট্যাপকল ঝুলছে। দুটো বালতি। দেয়ালে একটা আখাম্বা সাতখানা তাকের র‍্যাক। ওপর থেকে সোজা মাটি পর্যন্ত নেমেছে। একটাতে তেল, সাবান, শ্যাম্পুর শ্যাসে, ছোবড়া। আরেকটাতে দুটো মগ। বাকিগুলো প্রায় খালিই পড়ে আছে। কয়েকটাতে ঝুল পড়ে গেছে। ছেলেটা বাথরুমেরও গুছিয়ে ছবি তুলল। 1

-চলুন এবার ওপরটা ঘুরে বেরিয়ে যাব।

মিশ্রঠাকুর একটা বড়সড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন । একেকটা সিঁড়ি বেশ উঁচু। এখনকার মানুষের উঠতে বেশ বেগ পেতে হবে। মিশ্রঠাকুর অবলীলায় উঠে গেলেন। স্বাভাবিক, ওনার অভ্যেস তো থাকবেই। ওপরের ঘরটা আবর্জনায় ভর্তি। ঘর লাগোয়া ছাদখানা বেশ সুন্দর। নীচে নামতেই মিশ্রঠাকুর এবার বিরক্তি দেখিয়েই বললেন, ‘আশা করি আর কিছু নেই আপনাদের! যদি থাকেও সেটা এখন আর আমি দেখাতে পারছি না। কাল কিম্বা পরশু আসুন । ‘

-আর মাত্র দুটো কাজ বাকি ঠাকুরমশাই।

-উফফফ। কী?

অসহ্য হয়ে দুপাশে মাথাটা ঝাঁকিয়ে কথাটা বললেন। মহিলাটি একটা কাগজ বাড়িয়ে বললেন, ‘এখানে একটা সই করতে হবে। আর দুটো হাতের বুড়ো আঙুলের ছাপ।’ সই করা ও কালির মধ্যে বুড়ো আঙুল চুবিয়ে ছাপ নেওয়ার সময়েও চকাচক ছবি উঠল।

তিনবছর হয়ে গেল সুস্মিতার সঙ্গে একই ফ্ল্যাটে, একই ঘরে, একই বিছানায় সুখ-দুঃখের সময় ভাগ করে নিয়েছে প্রিয়াংশু। ইচ্ছে ছিল বছরখানেকের মধ্যেই বিয়েটা সেরে ফেলবে। লাল বেনারসি পরে কনেবউটি সেজে বিয়ে করবে না সুস। ওরকম পুতুল পুতুল বিয়ে একদম পছন্দ নয় ওর। ডেস্টিনেশন ওয়েডিং করবে। সমুদ্রে। কোন সমুদ্র সেটার একটা প্ল্যানিংও ছকে রেখেছিল। প্রিয়াংশুকে বলেনি। শুধু প্রিয়াংশু যখন ডেস্টিনেশন ওয়েডিংয়ে কত খরচ হবে সেটার হিসেব নিয়ে বসত তখন সুস্মিতা মুষড়ে পড়ত। সাধ আর সাধ্যের দ্বন্দ্ব লাগত তখন। তারপর রাতে প্রিয়াংশুর অফুরন্ত চুমু সুস্মিতার দুঃখ ভুলিয়ে নতুন এক সকাল আনত। পুষি কেবলই এ ঘর থেকে ও ঘর ঘুরে বেড়াচ্ছে। কখনও সোফার নীচে উঁকি দিচ্ছে। তুরতুর করে ঢুকে যাচ্ছে খাটের তলায়। কখনও ফ্ল্যাটে ঢোকার দরজার সামনে গিয়ে বসে আছে চুপটি করে। প্রিয়াংশু মায়াভরা চোখে পুষিকে দেখে চলেছে। একটা সময় সারা বাড়িতে কোথাও সুস্মিতাকে না পেয়ে প্রিয়াংশুর পায়ের কাছে এসে মিউ মিউ করে জানতে চাইছে তার মা কোথায়? কখন আসবে? মদের গ্লাসটা টেবিলে রেখে পুষিকে দুহাতে তুলে নিয়ে চুমু খায় প্রিয়াংশু। বেড়ালটার কানে কানে বলে, ‘তোর মা আর কক্ষনও আসবে না পুষি। কোনওদিন আসবে না।’ কথাটা বলতে বুকটা কেঁপে উঠল তার। কান্না পেল খুব। সুস্মিতার ক্ষতবিক্ষত লাশটা এখনও ঠাণ্ডা ঘরে শুয়ে। হঠাৎই সুস্মিতার খেয়াল চেপেছিল বেড়াল পোষার। একদিন রাতে সুস্মিতা আর প্রিয়াংশু যখন যুগলশয্যায় তখনই কথাটা পাড়ে সুস্মিতা। এবার বেশ গোলগাল নাদুসনুদুস পুষি চাই তার। প্রিয়াংশু বুঝতে ভুল করে বলেছিল, ‘তার মানে গোলগাল ছোট্ট মতন মেয়ে চাই তাই তো?’ সুস্মিতা আদুরে ঠোঁটটাকে উলটে বলেছিল, ‘না। অনেক ঝামেলা। তার চেয়ে একটা বেড়ালই ভালো। পার্শিয়ান ক্যাটগুলো দেখেছিস?” আরেকটু হলেই প্রিয়াংশু তড়াক করে লাফিয়ে উঠত, ‘পার্শিয়ান ক্যাট! খরচ কত জানিস?” -উফফফ! পার্শিয়ান ক্যাটই আমি চেয়েছি নাকি? বলেছি ওইরকম। নাদুসনুদুস। বেশ চটকাতে পারব।

-সত্যি কথা বলব?

-বল।

-তুই আসলে একটা পুতুলের মতো বাচ্চা চাইছিস। যাকে তুই প্রাণ ভরে আদর করতে পারবি। চটকাতে পারবি। কিন্তু অত ঝামেলা তো মহারানির সইবে না। তাই দুধের সাধ ঘোলে মেটাতে একটা নাদুসনুদুস বেড়াল। আবার কে চাইছে? না যে কিনা কুকুর বেড়ালের থেকে শত হাত দূরে থাকত!

কথাটা শুনে প্রিয়াংশুর বুকের ওপর থেকে উঠে বসেছিল সুস্মিতা। ভাবুক হয়ে গিয়েছিল সে। বলেছিল, ‘কুকুর না। আমার বেড়ালই চাই।’ প্রিয়াংশু বুঝতে পারেনি সুস্মিতার ইচ্ছের কারণ। তবে পরের কথার মানেটা সেদিন সে ভালোই বুঝেছিল। প্রিয়াংশুর মুখের দিকে চেয়ে সুস বলেছিল, ‘মেয়েও চাই না ৷’

মদের গ্লাসটা মুখের ওপর উপুড় করে দিল প্রিয়াংশু। কোল থেকে কখন যে পুষি নেমে গেছে খেয়াল করেনি। রক্তজবার মতো দুচোখের মণি। কান মাথা দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে। চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেছে। মুখের দুপাশের শিরাগুলো চামড়া ভেদ করে ফুটে উঠেছে। ঝট করে মোবাইলটা হাতে নিয়ে কন্ট্যাক্টের সার্চ বক্সে টাইপ করে ‘tarpana’। নামটা ভেসে উঠতেই বুড়ো আঙুল দিয়ে জোরে চাপ দেয় নামটার ওপর। চাপ দেবার সময় মুখটা হিংস্র হয়ে বেঁকে যায় প্রিয়াংশুর। শ্রীরাধার গলায় ‘লাবো সে চুম লো, আঁখো সে থাম লো মুঝকো’ বেজে উঠল। গানের কথাগুলো আরও আগুন জ্বালিয়ে দিল মাথার মধ্যে। বেশ খানিকক্ষণ কলারটিউন শুনিয়ে ফোনটা কেটে গেল। প্রিয়াংশু আবার কল করল। গান শুনিয়ে কেটে গেল। ধরল না তর্পণা। আরও চারবার একই গান। মদের গ্লাসটা দেয়ালে ছুড়ে দিতেই চুরচুর করে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল মাটিতে। মাথাটাকে প্রচণ্ড জোরে ঝাঁকিয়ে নিল। উঠে পড়ল সোফা ছেড়ে। টেবিল থেকে বাইকের বেরিয়ে গেল।

বাইরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। নন্দিনী হাতে একটা বড় ছাতা নিয়ে নিঃসাড়ে তর্পণার কাছে এল। তর্পণা খেয়াল করেনি। ইয়ার ফোনে চোখ বুজে গান শুনছে। নন্দিনীর হাতের স্পর্শ পেতে কান থেকে ইয়ার ফোনটা সরিয়ে তাকায়। ‘কী হয়েছে?’ নন্দিনী ঘড়ির দিকে আঙুল দেখাল। তৰ্পণা ঘড়ির দিকে তাকাতেই বলে উঠল, ‘সাড়ে আটটা বেজে গেল?’ খেল নন্দিনী হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছে। পয়সা চাইছে। ‘ওই টেবিলের ওপর থেকে আমার ব্যাগটা নিয়ে আয়।’ নন্দিনী এনে দিল। কুড়ি টাকার নোট বার, করল তর্পণা। নন্দিনীর হাতে দিয়ে বলল, ‘দোকানে বলবি আগেরদিনের মত রুটিগুলো যেন শক্ত না হয়।’ নন্দিনী টাকাটা হাতে নিয়ে ঘাড় নাড়ল ৷ টেবিল থেকে একটা কাগজ আর পেন নিল। তর্পণার কথাটাই লিখল সে। কাগজটাকে ভাঁজ করে বেরোতে যাবে কাছেপিঠে কোথাও একটা বাজ পড়ল। তর্পণার ভ্রুক্ষেপও নেই। কানে গান গুঁজে চোখ বন্ধ করে আছে। ভয় পেয়ে নন্দিনী একটু দাঁড়িয়ে তার মালকিনকে দেখে নিল। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে গেল।

স্বয়ম্ভু, শিবাঙ্গী, প্রদ্যুৎ চুপ করে বসে আছে। সামনে কম্পিউটারে লালনীল-হলুদ-সবুজ রঙের নানান আঁকিবুকি। শিবাঙ্গী বলল, ‘তর্পণার ফোনে প্রিয়াংশুর কল কেন এল? একবার নয়, তিন-চারবার। তাও আবার সেদিন এল যেদিন সুস্মিতা মারা গেছে। প্রিয়াংশুর কী কথা থাকতে পারে তর্পণার সঙ্গে?’ প্রদ্যুৎ বলেন, ‘মারা যাবার খবরটা দিতে পারে।’

-সারা শহরে তোলপাড় হচ্ছে প্রদ্যুৎ স্যার। সবাই জানে। আর এই খবরটা তর্পণা জানে না হতেই পারে না ।

স্বয়ম্ভু সম্পূর্ণ অন্যদিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, ‘আমি যখন কাউকে খুব জরুরি কিছু বলতে চাই তখনই বারবার ফোন করি। উল্টোদিকের লোকটা যখন ফোন তোলে না তখন আমরা কী করি?’

শিবাঙ্গী কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘তার কাছে চলে যাই।’ স্বয়ম্ভু ঝট করে শিবাঙ্গীর দিকে তাকায় ৷

নন্দিনী রাস্তা দিয়ে জল-কাদা বাঁচিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। বেশ খানিকটা হেঁটে গিয়ে রুটির দোকান। বৃষ্টির বেগটাও বাড়ছে। নন্দিনীর পা পড়ছে। পিছনে আরও এক জোড়া পা পড়ছে। বুট পরা এক জোড়া পা ছায়ার মতো অনুসরণ করছে বাচ্চা মেয়েটাকে। কিছুক্ষণ পর নন্দিনীর ষষ্ঠেন্দ্রিয় তাকে জানায় পিছনে কেউ আছে। হঠাৎ করেই কেঁপে ওঠে তার শরীরটা। চট করে ঘুরে তাকায়। জোড়া পা দুটো ঘুরে বিদ্যুৎবেগে আড়ালে চলে যায়। নন্দিনী বিশেষ কাউকেই দেখতে পায় না। ও আবারও হাঁটতে শুরু করে। একটু পরে সেই জোড়া পা দুটোও হাঁটতে শুরু করে নন্দিনীর পিছন পিছন ।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে এখনও গান শুনছে তর্পণা। হঠাৎ পায়ের কাছে রাখা আরেকটা মোবাইল ভাইব্রেট করে ওঠে। স্ক্রিনে লেখা নন্দিনী কলিং কান থেকে ইয়ার ফোনটা খুলে দ্বিতীয় মোবাইলটা কানে দিল, ‘বলো…। বহুবার করেছে।… পাগল নাকি? ওর ফোন ধরে মরি আমি!… তুমি কি ফিরেছ?… নন্দিনী একটু পাশের ফ্ল্যাটে গেছে। ওর এক বন্ধু হয়েছে। তার সঙ্গে একটু সময় কাটিয়ে চলে আসে।… কী বলে ওরাই বা কী বোঝে জানি না।… আমি বাধা দিই না… সারাদিন খাটে মেয়েটা। ওরও তো একটা জীবন আছে। তা তোমার পরের প্ল্যানটা বলো।’

কলিং বেল বাজতে তৰ্পণা বলে, ‘এই শোনো, তোমায় পরে ফোন করছি । কেউ একটা এসেছে।’ ফোনটা কেটে আলমারি খুলে শাড়ির ভাঁজে সেটাকে লুকিয়ে রাখল তর্পণা। দরজা খুলতেই সজোরে একটা ধাক্কা খেল। ‘এ কী তু…তুমি?’ অনুমতি না নিয়েই রক্তচক্ষু শানিয়ে ভিতরে ঢুকে এল প্রিয়াংশু। জামাকাপড় ভিজে একশা। তৰ্পণা পিছিয়ে গেল ভয়ে, ‘কী চাই কী তোমার?”

প্রিয়াংশু কথা বলল না। শুধু ঢুকে পা-টাকে পিছনে ভাঁজ করে দরজাটা ঠেলে দিল। দুম করে শব্দ হয়ে বন্ধ হয়ে গেল। তর্পণা ঢোঁক গিলে নিজের ভয়টাকে লুকিয়ে স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করল, ‘হ্যাঁ আমি পেয়েছি খবরটা। আমার কেমন যেন পাগল পাগল লাগছিল। তাই তোমার ফোন তুলতে পারিনি। এসব কী হচ্ছে বলো তো?”

-সেটাই তো আমি তোমায় জিজ্ঞেস করছি তর্পণা। কেন মারলে সুস্মিতাকে?

-মানে? এসব কী বলছ তুমি?

কান্নামেশা ধরা গলাটা ঝংকার দিয়ে উঠল প্রিয়াংশুর, ‘এই শালি, আমার সাথে একদম ন্যাকামি মারাবি না।’ তর্পণা পিছনে সরতে সরতে খাবার টেবিলের দিকে পিছিয়ে গেল।

-মাইন্ড ইওর ল্যাঙ্গোয়েজ প্রিয়াংশু। তুমি একটা মেয়ের সাথে কথা বলছ। এটা মাথায়….

-খুনি খুনি। আমি একটা খুনির সঙ্গে কথা বলছি ।

-গলা নামিয়ে কথা বলো। এখানে আরও দশটা মানুষ বাস করেন।

-জানুক লোকজন। সবাই জানুক।

তর্পণা এবার নিজের রাগ সম্বরণ করে শান্ত গলায় বলল, ‘প্রিয়াংশু,

প্রিয়াংশু কুল। আমি জানি এখন তোমার মনের অবস্থা। তুমি পরে কথা…’। -কোনও পরে কথা হবে না। এক্ষুনি জবাব দিতে হবে তোমায়। কেন? কেন মারলে সুস্মিতাকে?

-কেন পাগলের মতো কথা বলছ? আমি কেন মারব? ও কী আমার শত্রু ছিল?

-সেটাই তো জানার আছে। শ্রীকুমার তোমার কে হয়? যার জন্য এত রিস্ক নিচ্ছ তুমি?

-শুরুতেই তো বলেছিলাম । বন্ধু ।

-বন্ধু নাকি বিশেষ বন্ধু নাকি ধান্দার বন্ধু?

-শ্রীকুমার আমার যেই হোক তা জেনে তুমি কী করবে?

-বাহ! যার হয়ে তুমি টাকা আদায় করে যাচ্ছ মাসের পর মাস ধরে সে তোমার কে হয় সেটা আমি জানব না?

-এতকাল তো জানোনি ?

-প্রয়োজন পড়েনি।

তর্পণা হাসল। ‘কারণ তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগটা যে সত্যি সেটা তুমি প্রথমদিনেই বুঝেছিলে।’

-প্রত্যেক মাসে তো মোটা টাকা পেয়ে যাচ্ছ। তাহলে সুস্মিতাকে মারলে কেন? বলো।

চিৎকার করে উঠল প্রিয়াংশু। ‘আমি কাউকে মারিনি প্রিয়াংশু। মিথ্যে ব্লম দেবার চেষ্টা কোরো না ।

-সকালে বুটিকে গিয়েছিলে কেন? সরেজমিনে তদন্ত করে আসতে? তৰ্পণা চুপ।

-পুলিশ কিন্তু সব ফুটেজ পেয়ে গেছে। এবার আর তোমায় কেউ বাঁচাতে পারবে না।

-তাতে তোমার বিপদ কী কিছু কমবে প্রিয়াংশু?

-বাল ছেঁড়া যায় আমার বিপদের।

বলেই আচমকা তর্পণার গলাটা টিপে ধরল প্রিয়াংশু। টেবিলে রাখা কাটলারি স্ট্যান্ড উলটে পড়ল। দাঁতে দাঁত চেপে প্রিয়াংশু বলল, ‘পুলিশ কী করবে জানি না। আমি তোমায় ছাড়ব না। একদম জানে মেরে দেব।’

-পাগলামো কোরো না প্রিয়াংশু। অক অক। ছাড়ো আমায়। অক… চিৎকার করে উঠল প্রিয়াংশু, ‘সুস্মিতাকে মারলি কেন বল তুই। এরপর

থেকে টাকা তো দূর, আমি তোকে বাঁচতেও দেব না।’ -ফাক ইউ ।

-ফাক ইউ খানকি শালি ।

তর্পণা মুহূর্তের মধ্যে একটা কাঁটা চামচ তুলে প্রিয়াংশুর ওপর আঘাত করতে যায়। ঠিক তখনই দরজা খোলার শব্দ। দুজনেই একই অবস্থায় থেকে দরজার দিকে তাকায়। নন্দিনী এসেছে রুটি নিয়ে। ছাতাটা মাটিতে পড়ে গেছে। বিস্ফারিত চোখে চেয়ে আছে। প্রিয়াংশুর হাত তখনও তর্পণার গলা টিপে রয়েছে। আর তর্পণার হাতের কাঁটা চামচটা প্রিয়াংশুকে লক্ষ্য করে ওপরের দিকে তোলা। মেয়েটা কাঁপছে ভয়ে। প্রিয়াংশুর হাত মুহূর্তে আলগা হয়ে যায়। তপণার হাতও নেমে আসে। নন্দিনী গরম রুটিটাকে বুকে চেপে ঘরে ঢুকে আসে। বাচ্চা মেয়েটার মুখটা অন্ধকার থেকে আলোয় আসতেই প্রিয়াংশু কয়েক পলকের জন্য অবশ হয়ে যায়। পরক্ষণেই মুখটা সরিয়ে নেয়। এই ছোট মেয়েটার সামনে আর কোনও হিসেব নিকেষ করতে মন চাইল না প্রিয়াংশুর। লম্বা লম্বা পা ফেলে দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়াল। পিছু ফিরে চাইল একবার। তারপর সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই বাইক ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল প্রিয়াংশু। আড়াল থেকে সামনে এসে দাঁড়াল স্বয়ম্ভু সেন। সঙ্গে শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু চোখ তুলে দোতলার ফ্ল্যাটের দিকে তাকাল। শিবাঙ্গী জানে, স্বয়ম্ভুর এদিক ওদিক তাকানো মানে তার মাথায় কিছু একটা চলছে। এখনই হয়তো তর্পণার মুখোমুখি হতে চাইছে না স্বয়ম্ভু। এতদিন স্বয়ম্ভুর সঙ্গে থেকে ঠিক কতটা বুঝতে পেরেছে সেটা যাচাই করতেই প্রশ্নটা করল শিবাঙ্গী, ‘তর্পণার ফ্ল্যাটে যাবেন নাকি?’

-লাভ নেই। এক গুচ্ছ মিথ্যে কথা এমন করে বলবে… তাছাড়া এখুনি সতর্ক করে দিলে মুশকিল।

-আপনার কী মনে হচ্ছে স্যার, তর্পণা কী খুন করতে পারে?

-পারে।

-তর্পণা কী মিশ্রঠাকুরকে চেনে?

-বুঝতে পারছি না। সুস্মিতাকে যে খুন করেছে তার সঙ্গে তর্পণার যোগসাজশ তো আছেই ।

-শ্রীকুমার?

–সেই বা কে? কত বুদ্ধি আছে তার ঘটে? যে মেঘের আড়াল থেকে ইন্দ্রজিতের মতো লড়ে চলেছে। আমরা কোনও পদক্ষেপের কথা ভেবে স্টেপ নেওয়ার আগেই সে কাণ্ড ঘটিয়ে বসছে! আনপ্রেডিক্টেবল।

-শ্রীকুমারের সম্পর্কে তর্পণা কে হয়? শ্রীদেবীর কেসে তো তর্পণা নামের কোনও উল্লেখ নেই। তাহলে এই মহিলা এল কোথা থেকে?

নিজের মধ্যে ডুবে গিয়ে প্রশ্নগুলো করল শিবাঙ্গী। পাল্টা প্রশ্ন উঠে এল স্বয়ম্ভুর মুখ থেকে, ‘মীনাক্ষী বলল, লোকটার বাঁ হাতের তালুতে সেলাইয়ের দাগ আছে। আমি যাকে সন্দেহ করে লোক পাঠালাম তার হাতে কোনও দাগ পাওয়া গেল না। তার মানে সে খুনি নয়। অন্তত সুস্মিতাকে সে খুন করেনি।’

-আরেকজনের হাত দেখা বাকি স্যার ।

-ওই ভাগ্নেটি তো?

-হ্যাঁ।

-খোঁজ নিয়েছি। আজ সারাদিন সে দোকানেই ছিল। -তৃতীয় ব্যক্তি?

-আজ কলেজ হাফ -খুনটা তো পৌনে চারটে থেকে চারটের মধ্যে হয়েছে। কলেজ গড়িয়াহাট চত্বরেই। সেখান থেকে এখানে আসতে…

ডে। তিনটে পর্যন্ত সে কলেজেই ছিল।

– উঁহু।

স্বয়ম্ভু আপত্তি জানাল। ‘একটা বিষয় ভুলে যাচ্ছ। সে মেক আপ করেছিল। কলেজে সেটা সম্ভব নয়। তার মানে মাঝপথে কোনও একটা শেল্টারে সে বাইক রেখে মেক আপ…’

হঠাৎ কী মনে পড়াতে কথা থামিয়ে দেয়। ‘ও হো, আমরা ভেবে মরছি কেন? চলো গাড়িতে চলো।’ বলে দৌড়ে বোলেরোটায় উঠে পড়ল। ড্রাইভার কৃষ্ণ জিজ্ঞেস করল, ‘যাব স্যার?’

-হ্যাঁ চলো। আগে ম্যাডামকে নামিয়ে আমায় ছাড়বে।

গাড়ি ছাড়ল। স্বয়ম্ভু মোবাইল কানে তুলল, ‘এই রঞ্জিত, আজ সারাদিনে দীপায়নের লোকেশন কোথায় কোথায় ছিল জানাও তো। অ্যাসাপ।’

মিনিট পনেরোর মধ্যে খবর চলে এল। ‘সকালে ফুলবাগান থেকে বেরিয়ে গড়িয়াহাট। দুপুর তিনটে পাঁচে সেখান থেকে বেরিয়ে বাসন্তী দেবী কলেজের কাছে। আর এখন সেটা রয়েছে বেনিয়াপুকুরে। কিছুক্ষণ আগে বেরিয়েছে বাসন্তী দেবী কলেজের কাছ থেকে।’

হাত উলটে ঘড়ি দেখল স্বয়ম্ভু, রাত সোয়া ন’টা। ‘ওকে রঞ্জিত। থ্যাংক ইউ । ‘

-ওয়েলকাম স্যার।

ফোনটা কাটতে কাটতে ভুরু দুটো ভেঙে দুমড়ে মুচড়ে গেল স্বয়ম্ভুর। -কী বলল স্যার?

-দীপায়ন সকালে কলেজ গেছে। সেখান থেকে পড়াতে বাসন্তী দেবী কলেজের ওখানে। সেখান থেকে এখন বাড়ি ফিরছে।

-তাহলে খুনটা করল কে?

দুহাতে মুখ ঢেকে একভাবে অনেকক্ষণ রইল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী খোঁচাল না। আর একটা প্রশ্নও করণ না। জায়গা মতো নেমে গেল। গাড়ি ছুটল স্বয়ম্ভুর বাড়ির দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *