ম্যাও – ৫

শিয়ালদায় তমালের বাড়ির সামনে আসতেই স্বয়ম্ভূ আর শিবাঙ্গী বুঝে যায় পুলিশ এসে গেছে। পুলিশের গাড়িটাকে পাশ কাটিয়ে সাদা রঙের গেট খুলে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে যায় দুজনে। পুলিশের প্রহরী বাধা দেওয়াতে কার্ড দেখায় স্বয়ম্ভু। স্যালুট ঠুকে ছেড়ে দেয়। বসার ঘরেই সকলে উপস্থিত। সুমিত্রা দেবীর স্বামী উৎকণ্ঠিত মুখে উঠে দাঁড়ায় স্বয়ম্ভুকে দেখে। পুলিশ ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করে, ‘আপনি কে?’ কার্ড শো করে পরিচয় দেয় স্বয়ম্ভু, স্বয়ম্ভু সেন। কোলকাতা পুলিশ, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্ট আর ইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইনস্পেক্টর শিবাঙ্গী বসু।’ কর্তব্যের খাতিরে পুলিশ অফিসার স্যালুট ঠুকলেন বটে সঙ্গে তার বিস্ময়টিও প্রকাশ করলেন, ‘মিসিং ডায়েরিতে ডিটেকটিভ!’

-আসলে আমি এখনও অফিসিয়ালি আসিনি। যে মিসিং হয়েছে সে আমার মাসতুতো বোন।

উত্তরটা দিয়েই স্বয়স্তু পালটা প্রশ্ন করল, ‘আপনি কোন থানা?”

-লেক পুলিশ স্টেশন। আসলে মিস্টার দত্ত আমাদের কাছেই ডায়েরি করেন এবং এনাদের সম্পর্কের ব্যাপারেও সবটা বলেন। এফ আই আর করেননি। তবে ভীষণভাবে রিকোয়েস্ট করেন আমরা যেন এখুনি ওনার জামাই মিস্টার তমাল ব্যানার্জিকে জেরা করি। সব শুনে আমাদেরও সেরকমই মনে হয়। তাই ওনাকে নিয়েই চলে আসি।

তমালের মুখের অজস্র বিরক্তির বলিরেখা। পাখার নীচে বসেও ঘামছে। এর মধ্যে স্বয়ম্ভুর মেসো হঠাৎ দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠলেন, ‘আমি বলছি ভোলা, তুই দেখে নিস…..

-মেসো মেসো মেসো। আমি দেখছি। তুমি চুপ করে বোসো।

মেসোকে কেন যে থামিয়ে দিল স্বয়ম্ভু সেন সে এখানে আর কেউ বুঝুক না বুঝুক শিবাঙ্গী ভালোই বুঝল। মেসো আবার গলা তুললেন, ‘তমালই আমার মেয়েকে সরিয়ে দিয়েছে, আমি নিশ্চিত।’

-হ্যাঁ আমার তো আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই। আপনার মেয়েকে নিয়ে থাকলেই আমার দিন কাটবে।

পুলিশের সামনেই শ্বশুরকে খেঁকিয়ে উঠল তমাল ।

-ঠিকই বলেছ তমাল…

স্বয়ম্ভু বলতে শুরু করল, ‘শুধুমাত্র বউকে নিয়ে কী আর দিন কাটানো যায়?’ ইঙ্গিতটা সরাসরি তমালের মস্তিষ্কে ঘা দিল। ‘মানে? কী বলতে চাইছ?’

-ওই তুমি যা বললে। আমিও তাইই বললাম। যাক গে, মিস্টার পাড়িয়া অরুণার ছবি এখুনি সবকটা থানায় পাঠিয়ে দিন। যেখান থেকে পারেন খুঁজে বের করুন।

পরিচয় ছিল না। অথচ একবারে নাম ধরে ডেকে ওঠায় প্রথমটা একটু ব্যোমকেই গেলেন পুলিশ অফিসার। তারপরেই খেয়াল হল ইউনিফর্মের সঙ্গেই সাঁটানো আছে তার নামখানি। অবাক হওয়ার ঘোর কাটিয়ে উত্তর দিলেন দিব্যেন্দু পাড়িয়া, ‘অলরেডি পাঠিয়ে দিয়েছি।’

-ভেরি গুড।

বলতে বলতে চেয়ারে বসে পড়ল স্বয়ম্ভু। দেখাদেখি সবাই যে যার জায়গা নিল। ‘আচ্ছা তমাল, ব্যাপারটা এবার খুলে বল তো।’

-কী বলব?

সপাটে এমন উত্তরের পরেই ভুরু তুলে স্বয়ম্ভু বলল, ‘সে কী! তোমার বউকে পাওয়া যাচ্ছে না, মানে বিয়ে করা বউকে। আর তোমার কিচ্ছু বলার নেই?’

এবারও গোয়েন্দা শ্যালকের খোঁচাটা বুঝতে পেরেও হজম করে নিল তমাল। ‘আমার যা বলার সবটাই বলেছি। এদের কাছ থেকে শুনে নাও।’

-আমি তোমার মুখ থেকে আবার শুনতে চাই। বেশি ভ্যানতাড়া না মেরে বলে ফেলো।

-ও নিজের ইচ্ছেয় এ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে।

-কেন?

-ওর পোষাচ্ছিল না আমার সাথে।

-কেন?

-ও আমার সঙ্গে সুখী হতে পারছিল না।

স্বয়ম্ভু এবার মুখটা বড় হাঁ করে খুলে বলল, ‘ক্যাআআআনোওও?’

-আমার সব কিছুই ওর অসহ্য লাগছিল। আমি যাই বলি তাতেই ওর আপত্তি। ও যা বলবে সেটাই আমায় শুনতে হবে। পায়ে পা দিয়ে অশান্তি করত।

-অরুণা তো তোমায় ভালোবেসে বিয়ে করছিল। বাড়ি থেকে পালিয়ে এসে। এতটাই গভীর প্রেম ছিল তোমাদের। যতদূর জানি তুমিই ওকে বলেছিলে এক ৰস্ত্রে বেরিয়ে আসতে। তাই তো?

-হুম ।

-তাহলে হঠাৎ কী এমন ঘটল, কবে ঘটল যে ওর তোমাকে অসহ্য লাগতে শুরু করল? নাকি তোমার ওকে অসহ্য লাগতে শুরু করেছিল?

-ব্যাপারটা দু-তরফেই। আমার আর বাড়ি ফিরতেই ভালো লাগত না । যদিও বা ফিরি ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই অরুণার প্রশ্নের পর প্রশ্ন। কোথায় ছিলে? কেন ছিলে? কার সঙ্গে ছিলে?

-কার সঙ্গে ছিলে?

তমালের মুখ থেকে কথাটা খাবলে তুলেই যেন ওরই দিকে ছুড়ে দিল স্বয়ম্ভু। বেশ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল তমাল। ‘কা…কার সাথে থাকব?”

-সেটা তো তুমি বলবে।

মেসো তড়পে উঠল, ‘মেয়েটার নাম বল নিজে মুখে।’

-কীসের মেয়ে। যতসব ফালতু কথা।

-দেখো তমাল, তুমি যদি নিজের মুখে কিছু স্বীকার না কর ইটস ফাইন। আমাদের আরও হাজার তরিখা আছে পেট থেকে কথা বের করার। মেসো, তুমি এক কাজ কর। তুমি অফিসিয়ালি এফ আই আর লঞ্চ কর। যাতে পুলিশ ওকে তুলে নিয়ে যায়। তারপর আমি দেখছি। এমনিও সম্পর্কে তমাল আমাদের জামাই। তাই জামাই আদরে এক বিন্দু ত্রুটি রাখব না।

তমাল ক্ষেপে গেল। ‘যা খুশি করে নাও তোমরা। আমার যা বলার বলে দিয়েছি। যে নিজে থেকে চলে যায় তার কোনও দায় আমার নয়।’

-সেটা তো প্রমাণ সাপেক্ষ তমাল। অরুণা নিজে থেকে গেছে নাকি তুমি তাকে বাধ্য করেছ বেরিয়ে যেতে! নাকি নিজে হাতে তাকে….

কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেল স্বয়ম্ভু। মেসো কেমন যেন অসহায়ের মতো তাকিয়ে আছে ওর দিকে।

-তমালের মোবাইলটা নিয়েছেন তো পাড়িয়াবাবু?

জিজ্ঞেস করল স্বয়ম্ভু।

-আজ্ঞে না স্যার।

-মানে… মোবাইল কী হবে?

পুলিশ আর স্বয়ম্ভুর কথার মাঝে বলে উঠল তমাল। স্বয়ম্ভূ পাড়িয়াকে বলল, ‘আগে ওটা নিন। সব কল লিস্ট চেক করুন।’

ঠিক এই সময় দিব্যেন্দু পাড়িয়ার মোবাইল বেজে ওঠে। ‘হ্যাঁ কিরণময় বলো।’ এরপর কয়েক পলকের বিরতি। দিব্যেন্দু চমকে উঠলেন, ‘হোয়াট?… কোথায়?… আচ্ছা। আসছি আমরা।’ ফোন কাটার সময়টুকুও দিলেন না স্বয়ম্ভুর মেসো। প্রচণ্ড দুশ্চিন্তায় বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন করলেন, ‘কী কিছু জানা গেল স্যার? অরুণার কোনও খবর এল? পাওয়া গেছে ওকে?’ পাড়িয়ার মুখ থমথম করছে। কী বলবেন বা আদৌ এখানে বলা ঠিক হবে কিনা এসবই ভাবছেন বোধহয়। তমাল কপালের ঘামটা মুছে নিয়ে ঢোঁক গিলল। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘কী হল মিস্টার পাড়িয়া? কার ফোন?’

-স্যার একটু বাইরে আসবেন?

-শিওর।

স্বয়ম্ভু জায়গা ছেড়ে উঠতেই মেসো বলে উঠলেন, ‘আমি…. আমি শুনব। আমার মেয়ের কোনও খবর? লুকোবেন না প্লিজ।’

-মেসো তুমি বোসো। আমরা কথা বলেই জানাচ্ছি।

-না না না। ভোলা কিছু লুকোসনি তোরা। এই টেনশন আমি কিন্তু নিতে পারছি না।

মেসোর পীড়াপিড়িতেই স্বয়ম্ভু বলল যা বলার এখানেই বলতে। পাড়িয়া গলা ঝেড়ে বললেন, ‘পার্ক সার্কাসের রেললাইনের ধারে এক মহিলার বডি পাওয়া গেছে। মুখটা অরুণা দেবীর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।’ নিমেষের জন্য স্তম্ভিত হয়ে গেল সক্কলে। টলে গিয়ে চেয়ারে বসে পড়লেন অরুণার বাবা পুলকেশ দত্ত। স্বয়ম্ভু ধরতে গেল মেসোকে। তমাল নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে। শিবাঙ্গী নিশ্চুপ। পাড়িয়া বললেন, ‘ছবির সঙ্গে মিললেও বডি আইডেনটিফাই করতে হবে স্যার।’ আকস্মিক আঘাতে কিছুক্ষণের জন্য স্বয়ম্ভুও হারিয়ে গিয়েছিল কোথাও। অফিসারের কথায় শুধু একবার ‘উঁ? হুঁ!’ বলে চুপ করে গেল।

পুলিশ পৌঁছোবার আগেই মিডিয়া খবর পেয়ে গেছে যে রেললাইনের ধারে একটা লাশ পাওয়া গেছে। মৌমাছির ঝাঁকের মতো ঘটনাস্থলের চারপাশে ভনভন করছে তারা। হন্তদন্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামল স্বয়ম্ভু সেন, শিবাঙ্গী বসু, দিব্যেন্দু পাড়িয়া, সঙ্গে অরুণার বাবা। স্পটে ঢোকার আগে মেসোকে বাধা দিয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘তুমি গাড়িতেই থাকো মেসো। আমি আইডেনটিফাই করছি।’ পুলকেশ রাজি হননি। শান্ত গলায় বলেছিলেন, ‘আমি সব সহ্য করত পারব। আমায় নিয়ে ভাবিস না।’ অনেক কষ্ট করে চোখের জল ধরে রেখেছেন। কান্নাটাও গলার কাছে এসে আছাড়িপিছাড়ি খাচ্ছে । কিন্তু পুলকেশ বেরোতে দিচ্ছেন না। স্পটে আসতেই মাঝারি উচ্চতার মাঝ বয়স পেরনো লোকটাকে দেখে হাত মেলালো স্বয়ম্ভু। গাড়িতে আসতে আসতে ও নিজেই ফোন করে ডেকেছে। লোকটার নাকের নীচে মোটা গোঁফ, থুতনির ডানদিকে কালো রঙের বড় তিল। তামাটে গায়ের রং। মাথায় ঠাস কাঁচাপাকা চুল। অবশ্য সাদা রংটা এখন বার্গেন্ডির আনুকূল্যে লালচে বর্ণ ধারণ করেছে। কাঁধ থেকে পায়ের নীচ পর্যন্ত একদম সমান মাপ। গায়ের মাংস কোথাও কোনও খাঁজের সৃষ্টি হতে দেয়নি। বরং সামনের দিকে শরীরের অতিরিক্ত চর্বিগুলো ঝুলে পড়েছে। যত দিন যাচ্ছে ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের ডক্টর তুহিনশুভ্র দাশগুপ্তর কোমরের বেল্টটা ছোটো হয়ে যাচ্ছে। তুহিনের সঙ্গে তার দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট রোহিত আর সাত্যকি এসেছে। দুজনেরই বয়স আঠাশ থেকে তিরিশের মধ্যে।

-দেখেছেন আপনি?

স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল। ডক্টর তুহিন জবাব দিলেন, ‘হুম।’

-কী দিয়ে?

পুলিশ জায়গাটাকে ঘিরে রেখেছে। সেদিকে যেতে যেতেই দুজনের মধ্যে কথা চালাচালি চলছে। তুহিন বললেন, ‘নো ডাউট মার্ডার। তবে অদ্ভুত।’

– কীরকম?

-তুমি দেখো আগে। তারপর বলছি।

আশেপাশে অজস্র লোকের ভিড়। লাশটা যেদিকে পাওয়া গেছে তার উলটোপাশেই সারে সারে বস্তি। মাঝে রেলের ট্র্যাক। বেশ ঘন আগাছার জঙ্গল দেখেই লাশটাকে ডাম্প করা হয়েছে। চট করে কারও চোখে যাতে না পড়ে। তার ওপর বৃষ্টি। তাই সকাল থেকে এ পথে লোক যাতায়াত খুব একটা নেই। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বডিটা এখান থেকে সরাতে হবে। ঘেরাটোপ পেরিয়ে স্বয়ম্ভূ এগিয়ে গেল। তাকে অনুসরণ করলেন পুলকেশ ও শিবাঙ্গী। মৃতদেহের মুখের ওপর থেকে সাদা চাদর সরে যেতেই নিমেষে নিস্তব্ধতা। মুখের চারপাশে চাপ চাপ রক্তের দাগ। গলার কাছটার হাড় বেরিয়ে কীরকম যেন চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। অরুণার চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে কপালের দিকে.উঠে রয়েছে।

ভয়ে! আতঙ্কে! নাকি পাহাড়প্রমাণ সন্তানশোকে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন পুলকেশ। মাটিতে বসে পড়েন। স্বয়ম্ভূ তুলে ধরার চেষ্টা করে। শিবাঙ্গী হেল্প করে। পুলকেশের কন্ঠ ঠেলে বুকফাটা হাহাকার শব্দ করে ওঠে, ‘এই দিন দেখার জন্যেই কি মেয়েটাকে বড় করে তুলেছিলাম? হা ঈশ্বর! তুমি কি নেই?’ এই সুযোগে চূড়ান্ত টিআরপি-র আশায় এক সাংবাদিক ক্যামেরা ঘাড়ে নিয়ে সবে রেকর্ড করতে শুরু করেছিলেন। স্বয়ম্ভুর ধমক খেয়ে পালিয়ে বাঁচে। সঙ্গে যে দুজন পুলিশ কনস্টেবল ছিলেন তাঁদের স্বয়ম্ভু বলল, ‘মেসোকে নিয়ে গিয়ে গাড়িতে বসান। জল দিন। আর দেখবেন কোনও মিডিয়া যেন কাছে ঘেঁষতে না পারে।’ কথামতোই কাজ হল। শিবাঙ্গীর চোখ ছলছল করে ওঠে। ওর এই এক প্রবলেম। কারও চোখে জল দেখলেই কোথা থেকে যেন ওর বুকেও শোকের জোয়ার আসে। তুহিনের নির্দেশে রোহিত আর সাত্যকি আশেপাশের জায়গা দেখতে শুরু করেছে। পুলকেশ চলে যেতে স্বয়ম্ভু মৃত অরুণার মুখের দিকে চায়। সে এমনিতে বেশ শক্ত মনের ছেলে। যে বিভাগে ও কাজ করে সেখানে আবেগের কোনও জায়গা নেই। তবু কেন যে ওর চোখটাও কড়কড় করছে আজ। আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে অরুণার পরিচয় ছিল বাচাল মেয়ে বলেই। স্বয়ম্ভুও যে ওকে খুব একটা পছন্দ করত তেমনটা নয়। তবু ছোট বোন তো। বছরে একটিবার ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দিতে অরুণাই সবার আগে ছুটে আসত। এই বছর থেকে দুটো ভুরুর মাঝের জায়গাটা খালিই থাকবে স্বয়ম্ভুর। কারণ অন্যান্য বোনেরা বাইরে থাকে বলে ভিডিও কলে ফোঁটা দেয়। কপাল পর্যন্ত পৌঁছোয় না।

-স্বয়ম্ভু…

ডক্টর তুহিন ডাকলেন পাশ থেকে। অরুণার রক্তাক্ত মুখের দিকে চেয়ে স্মৃতির জগতে হারিয়ে গিয়েও ফিরে এল স্বয়ম্ভু। তুহিন কিছু বলার আগেই স্বয়ম্ভু বলল, ‘বডিটা কাটাপুকুরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর।’ আর তাকিয়ে থাকতে পারল না। তুহিনের দিকে চেয়ে বলল, ‘গলার কাছটা খেয়াল করেছেন? মুখ দিয়ে প্রচুর রক্ত বেরিয়েছে।

-শুধু গলার কাছে বলে নয়। ভিক্টিমের পেট, বুক ভেঙে কেউ পিষে দিয়েছে।

নৃশংসতার বর্ণনায় চোখ ছোট হয়ে এল স্বয়ম্ভুর। যতই ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টে কাজ করুক বয়স তো মাত্র চৌত্রিশ। জীবনের কতটুকুই বা দেখেছে? সত্যি বলতে এর আগে যে কটা কেস স্বয়ম্ভু তদন্ত করেছে সেখানে এতটা নৃশংসতার মুখোমুখি হতে হয়নি। হল তো হল নিজের ছোট বোনকে দিয়েই শুরু হল জীবনের ভয়ানক যাত্রা। মনের যখনই কোনও ভাবনা এসে ভিড় করে তখনই কথা বলতে গেলে চোখ ছোট হয়ে যায় স্বয়ম্ভুর। সেভাবেই জিজ্ঞেস করে, ‘গাড়ি তো নয়।’ তুহিন দুপাশে ঘাড় নেড়ে বললেন, ‘নাহ!’ অরুণার মৃতদেহটা নিয়ে চলে গেল। কনস্টেবলরা চিৎকার করে লোকজনের ভিড় হালকা করতে থাকল। আশপাশটা ভালো করে দেখতে শুরু করল স্বয়ম্ভু আর তুহিন। কথা চলতে থাকল। তুহিনশুভ্র বললেন, ‘এমনকী ধারালো কিছু দিয়ে মারা হয়েছে বলে মনে হল না। যদিও বডির একটা পার্টে ধারালো কিছু দিয়ে আঘাতের চিহ্ন আছে।

-পায়ে।

-কোথায়?

-পায়ে

-পায়ে?

চারপাশে অজস্র নোংরার মাঝে চোখ চালাতে চালাতে অবাক হয়ে বলে উঠল স্বয়ম্ভু। ডক্টর বললেন, ‘পায়ের আঙুলগুলো কেটে দিয়েছে ।

-কী?

-হ্যাঁ ।

মাথায় কিছুই ঢুকছে না স্বয়ম্ভুর। আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে হঠাৎ একটা জায়গায় চোখ আটকে যায়। ডক্টর আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু স্বয়ম্ভু তার আগেই নিচু হয়ে ঝোপের মধ্যে থেকে একটা কাগজ হাতে তুলে নেয়। ভিজে মণ্ড পাকিয়ে গেছে। ডক্টর ভুরু কুঁচকে ভালো করে দেখতে চেষ্টা করেন। স্বয়ম্ভুর উচ্চতা ডক্টরের চেয়ে বেশ খানিকটা বেশি বলে ঘাড় উঁচু করে দেখতে থাকেন তুহিনশুভ্র। জিজ্ঞেস করেন, ‘এটা কী স্বয়ম্ভু?” খুব যত্ন করে কাগজের ভাঁজ খুলতে খুলতে স্বয়ম্ভু বলল, ‘এই ঝোপেই কী পড়েছিল লাশটা?”

-হ্যাঁ। এই তো ঝোপের পাতাতেও রক্তের দাগ লেগে। কিন্তু এটা কীসের পাতা?

-ভিজে যা অবস্থা তাতে একটা বইয়ের পাতা বলেই মনে হচ্ছে।

-বই?

-ঠিক বই নয়। এ ফোর সাইজের একটা পেপার যাতে টাইপ করা কোনও উপন্যাস কিম্বা গল্পের একটা অংশ।

এইটুকু সময়ের মধ্যেই স্বয়ম্ভু সেনের তীক্ষ্ণ নজর বেশ কিছুটা পড়ে নিয়েছে লেখার।

-অ। এটা বোধহয় আমাদের এভিডেন্স নয়। এমনিই কত কাগজ পড়ে আছে দেখো না।

তুহিনশুভ্র বললেন। কথাটা শুনেই টপাটপ আরও বেশ কিছু কাগজ কুড়িয়ে ভালো করে দেখতে লাগল স্বয়ম্ভু। আশেপাশে বাতিল প্যাকেট, আধখাওয়া খাবার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, কন্ডোম, ভাঙা বাক্স কী পড়ে নেই! এরই মধ্যে যে কটা কাগজ পাচ্ছে সব তুলে দেখছে আর ফেলে দিচ্ছে। তুহিনশুভ্র এবার বেশ অবাক হলেন। ‘কিছু বুঝতে পারছ নাকি?’ স্বয়ম্ভু বলল, ‘কিছুই বুঝছি না ।

-তাহলে নোংরা পাতাটা ধরে রেখেছ কেন? ফেলে দাও। -ফেলেই দিতাম। যদি না পাতার নীচে এক বিন্দু লাল রং লেগে থাকত । ফরেন্সিক এক্সপার্ট তুহিনশুভ্র এবার বেশ চোখ পাকিয়ে কাগজটা দেখলেন। ‘লাশের সঙ্গেই ছিল না নিশ্চয়ই। থাকলে তো রক্তে মাখামাখি থাকত।’

-কাটাপুকুর চলুন তুহিনদা। একটু ভালো করে দেখতে হবে বডি … অরুণাকে ।

কথার মাঝে থেমে যাওয়ার মানেটা বুঝলেন ডক্টর তুহিনশুভ্র।

অন্ধকার হিমশীতল ঘরে একটা চড়া আলোর নীচে বিবস্ত্র ক্ষতবিক্ষত অরুণাকে শোয়ানো আছে। চোখে দেখা যাচ্ছে না। কোমরের ওপর থেকে বুক পর্যন্ত থেঁতলে গেছে। রক্ত মাংসে মাখামাখি। উরু থেকে বড় বড় কালশিটে। চামড়ার আড়ালে বেশ অনেক কটা হাড় যে গুঁড়িয়ে এধার ওধার হয়ে রয়েছে তা ওপর থেকেই বোঝা যাচ্ছে।

-সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় ভিক্টিমের পা।

তুহিন বললেন। দুজনেই অরুণার পায়ের কাছে গিয়ে দেখলেন, দুটো পায়ের পাতা থেকেই চারটে করে আঙুল যত্ন করে কেটে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ডান পায়ের পাতার নীচে চোখ থমকে গেল। স্বয়ম্ভু নৃশংসতায় স্তম্ভিত হয়ে বলে, ‘পায়ের আঙুল কেটেছে কেন? তাও আবার চারটে!’

-প্রথম চারটে।

তুহিনশুভ্র বললেন। ‘কারণ ভিক্টিমের পায়ের আঙুলের শেপটা ভি শেপের ছিল। বেশিরভাগ মানুষেরই যেরকম থাকে। এমন কোনও কিছু দিয়ে কাটা হয়েছে যাতে একবার ঘা দিতেই প্রথম চারটে আঙুল কেটে যায়। পায়ের কড়ে আঙুল সবচেয়ে ছোট। সেটাকে কাটতে হলে আরও একবার কোপ বসাতে হত একটু কোণাকুণি করে। কিন্তু খুনি সেটা করেনি। আর ভিক্টিমের পায়েও একাধিকবার আঘাতের চিহ্ন পাচ্ছি না।’

-ছুরি নয়!

-সেটা অসম্ভব।

-তাহলে কী? এত ধারালো কোন অস্ত্র যে এক কোপে প্রথম চারটে আঙুল সুনিপুনভাবে উপড়ে গেল?

তুহিন মাথা চুলকে নিলেন। দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে একটু ভেবে বললেন, ‘পরীক্ষা সাপেক্ষ। ভাবতে হবে।’

তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রক্তমাখা পায়ের দিকে তাকিয়ে ভাবতে ভাবতে নতুন করে ভুরুটা কুঁচকে গেল স্বয়ম্ভুর। ‘ডান পায়ে এটা কীসের চিহ্ন?” উত্তেজিত হয়ে বলে উঠল সে। এতক্ষণ ঘন রক্তের আড়ালে ঢাকা ছিল বলে চট করে চোখে পড়েনি।

-তাই তো। আঙুলের দিকে তাকাতে গিয়ে এটা ওভার লুক করেছি। বললেন তুহিনশুভ্র। স্বয়ম্ভু বলল, ‘ঠিক যেন দুটো পাতার মতো আঁকা । তাই না?’

-হুম ।

-কিন্তু সেটাও কমপ্লিট নয়। দুটো পাতারই নীচের অংশটুকু নেই।

-দুটো পাতার মুখও দুদিকে কোণাকুণি নির্দেশ করছে।

-এটা ছুরি জাতীয় কিছু দিয়ে আঁকাই মনে হচ্ছে।

-এটা তো কোনও সংকেত। খুনি সংকেত দিচ্ছে! কাকে?

শিবাঙ্গী এতক্ষণ চুপ করে অবজার্ভ করছিল। এবার সে বলল, ‘স্যার আমার একটা জিনিস মনে হচ্ছে।’ স্বয়ম্ভু জানতে চাইল, ‘কী মনে হচ্ছে?”

-এসব ক্ষেত্রে খুনি পুলিশকে চালাকি করে পরের খুন সম্পর্কে সংকেত দেয়।

– সিরিয়াল কিলিং?

-মে বি। পাতার ছবি এঁকেছে খুনি। তার মানে পরে ও যাকে খুন করবে তার সাথে নিশ্চয়ই গাছের কোনও সম্পর্ক আছে।

স্বয়ম্ভু মাথাটা ঝাঁকিয়ে নিল। বলল, ‘যা খুশি থাকুক। অরুণাকে কেন মারল? তাও আবার এইভাবে?’ তুহিনশুভ্র বললেন, ‘তোমার বোন কি কারও পথের কাঁটা ছিল?’ স্বয়ম্ভুর মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। তালেগোলে তমালের কথাটা তো ভুলেই গিয়েছিল। ঘর থেকে বেরোতে গিয়েও থমকে গেল স্বয়ম্ভু। তড়িৎ গতিতে পিছনে ফিরে প্রশ্ন করল, ‘পায়ের আঙুলগুলো কোথায় গেল?’

-স্পটে তো কিছুই পাওয়া যায়নি। ওই কাগজ ছাড়া।

তুহিন বললেন।

-ওই কাগজটা আর অরুণার ফরেন্সিক রিপোর্ট যত তাড়াতাড়ি পারেন রেডি করুন তুহিনদা ৷

-আমি কালকের মধ্যেই ট্রাই করছি স্বয়ম্ভু।

বেরোতে গিয়ে আবারও আটকে গেল। শিবাঙ্গীর দিকে ফিরে স্বয়ম্ভু বলল, ‘ও হো, শিবাঙ্গী, সারাদিন মাকে কিছুই জানানো হয়নি। যদি অসুবিধে না হয় তুমি প্লিজ একবার চলে যাবে? আমি এদিকটা দেখে নিচ্ছি।’

-স্যার স্পটে গিয়ে সবকিছু জানার পর আমি তখনই জেঠিমার জন্য গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। এই সময় আপনার মাসির সঙ্গে থাকাটা খুব জরুরি তাই জেঠিমাকে আপনার মাসির বাড়িতেই পাঠিয়ে দিয়েছি। চিন্তা করবেন না ।

এত ঝামেলার মধ্যেও স্যারের মায়ের কথা ভোলেনি মেয়েটা। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এক চিলতে হাসি শিবাঙ্গীকে না ফিরিয়ে দিলে বড্ড অপরাধ হবে স্বয়ম্ভুর। অপরাধটা করল না সে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *