ম্যাও – ৮

কোন সুদূরে ঘন কালো মেঘ ঘনিয়েছে। চোখের মণিদুটো সেইদিকেই স্থির হয়ে আটকে আছে। মেঘের কুণ্ডলীটা কি এর মধ্যেই ধেয়ে আসছে সুস্মিতার দিকে?

-সুস হল?

প্রিয়াংশুর গলাতে চটক ভাঙল সুস্মিতার। পাঁউরুটিতে মাখন মাখাতে মাখাতে বারবার অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে সুস্মিতা। এখন প্রেমিকের ডাকে যে বিপত্তিটা ঘটার ছিল সেটাই ঘটে গেল। ধারালো ছুরিটা পাঁউরুটির গায়ে না ঘষে বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলের ওপর ঘষে দিল। ‘আহ’ করে উঠল সুস্মিতা। ‘কী হল?’ বলে প্রিয়াংশু তাকাল। বুড়ো আঙুল দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। ‘উফফফ, আজকাল কী যে হয়েছে তোর! কতবার বলেছি তোকে একটা বাটার নাইফ অর্ডার দে।’ প্রিয়াংশু রক্তাক্ত আঙুলটা দেখেই ওয়াল ক্যাবিনেটের দিকে ছুটল ওষুধের বাক্সটা আনতে। ‘কাজের সময় মন কোথায় থাকে?’ কথার ওপর দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দে ড্রয়ারটা খুলে গেল। সুস্মিতা বুড়ো আঙুল চুষে চলেছে। প্রিয়াংশু সবে ওষুধের বাক্সটা নিয়ে এসে টেবিলে রেখেছে অমনি কলিং বেলটা বেজে উঠল। ‘ধুত্তেরি, এই তাড়াহুড়োর সময় কে আবার এল?” ঠকাস করে টেবিলে মেডিসিন বক্সটা রেখেই দরজা খুলতে ছুটল প্রিয়াংশু।

পাঁউরুটির ওপর কয়েক ফোঁটা রক্ত পড়েছে দেখে সুস্মিতার মুখটা একটু ব্যাজার হয়ে গেল। সরিয়ে রাখল সেটা। পায়ের কাছে মোটাসোটা বেড়ালটা বসে দুবার মিউ মিউ করে ডেকে উঠল। সকরুণ দৃষ্টিতে বেড়ালটার দিকে চাইল সুস্মিতা। খিদে পেয়েছে বোধহয়। তারপর নিজেই ওষুধের বাক্স খোলার চেষ্টা করল। ওদিকে দরজা খুলতেই একটি ছেলের গলা, ‘সুস্মিতা মুখার্জি?’

-হ্যাঁ।

-পার্সেল আছে।

প্রিয়াংশু দ্রুততার সঙ্গে সই করে নিয়ে নিল। দরজা বন্ধ করে টেবিলে পার্সেলটা রাখতে রাখতে প্রিয়াংশু দৌড়ে এল, ‘আরে দাঁড়া আমি করে দিচ্ছি।’

-তোর লেট হয়ে যাবে খেয়ে নে। আমি করতে পারব।

-হ্যাঁ তার নমুনা তো দেখতেই পাচ্ছি। তোর একটা পার্সেল এসেছে? –কে পাঠাল?

-নিশ্চয়ই কিছু অর্ডার করেছিলি।

আবার মিউ মিউ ডাক। প্রিয়াংশু জিজ্ঞেস করল, ‘ওকে খেতে দিসনি? ডাকছে খালি।’ কথাগুলো কানে গেল কি সুস্মিতার? না বোধহয়। আপন মনে বলে উঠল, ‘অর্ডার!’ মগজের ভিতরে তল্লাশি শুরু করল সুস্মিতা। প্রিয়াংশু বলল, ‘আসলে এত অর্ডার করিস মনে থাকে না। এমনি এমনি আমার অ্যাকাউন্ট খালি হয়?’

-শাট আপ। আমি যা করি নিজের রোজগারে। আমার বুটিক খুব একটা খারাপ চলে না প্রিয়াংশু!

-তাহলে আমার পয়সাগুলো যাচ্ছে কোথায় বল তো?

সুস্মিতার আঙুলে ব্যান্ডেড লাগাতে লাগাতে কথার পিঠে কথা বলেই চলেছে প্রিয়াংশু। তবে সুস্মিতার গলা এবারে একটু অন্যরকম শোনাল, ‘কোথায় যাচ্ছে সেটা কি আমায় বলে দিতে হবে?’

চুপ করে গেল প্রিয়াংশু। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল৷ চাপাস্বরে বলল, ‘দায়টা কি তোদেরও নয়?’ চোখ পাকিয়ে ‘আচ্ছাআআআআ!’ বলে বিস্ময় প্রকাশ করল সুস্মিতা। ‘এটা আমাদের দায়? আমরা কেউ তোকে বলেছিলাম এই ঘটনাটা ঘটাতে? কথায় বলে পাপ বাপকেও ছাড়ে না।’

-থাক না। সাত সকালে আমার এসব ভাল্লাগছে না।

ওষুধের বাক্সটা বন্ধ করে ড্রয়ারের দিকে এগিয়ে যায় প্রিয়াংশু। সুস্মিতার চোখে আবারও ঘন মেঘের ধূর্জটি। প্রিয়াংশুর থেকে বেশি কালিবৰ্ণ হল সুস্মিতার মুখ

-কী ভাবছিস আবার?

-অরুণাকে কে মারল প্রিয়াংশু?

প্রিয়াংশু স্তম্ভিত। ‘কেনই বা মারল? কে ফোন করে বেড়ালের ডাক শোনাল?” আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে সুস্মিতার চোখে চোখ পড়তেই প্রিয়াংশু থমকে গেল। এ কী! সুস্মিতা এইভাবে প্রিয়াংশুর দিকে কেন তাকিয়ে আছে?

ম্যাওওওও…!

গড়িয়াহাটের নাগরিক কোলাহলের বাইরে হেভেন অফ ফ্লাওয়ারস। মেন রোড থেকে একটু ঢুকে ফুলের সম্ভার সাজিয়ে বসেছে তর্পণা মিত্র। স্বয়ম্ভুর গাড়িটা দোকানের সামনে এসে থামল। ক্রেতা নেই। কেবল একজন সাজগোজ করা মহিলা কিছু নতুন ফুল সাজাচ্ছেন। সঙ্গে একটি অল্প বয়সী মেয়ে মহিলাটিকে হেল্প করছে। শিবাঙ্গীকে নিয়ে এগিয়ে এল স্বয়ম্ভু। মহিলাটি কাজ করতে করতে বাইরের দিকে তাকাতেই একটু থমকে গেলেন। ছোট মেয়েটিকে কী যেন বললেন। তারপর নিজেই হাসিমুখে এগিয়ে এলেন । স্বয়ম্ভু সবে তার আই কার্ড বের করতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মহিলাটি বলে উঠলেন, ‘কার্ড দেখাবার প্রয়োজন নেই।’ শুরুতেই চমকে দিলেন মহিলাটি। ছোট মেয়েটি দোকানের বাইরে বেরিয়ে গেল। মহিলা বললেন, ‘স্বয়ম্ভু সেন, গোয়েন্দা লালবাজার।’ স্বয়ম্ভু অবাক হয়ে একবার দৃষ্টি বিনিময় করল শিবাঙ্গীর সঙ্গে। শিবাঙ্গীও আড়চোখে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। তবে ম্যাডামের নামটা আমার জানা নেই।’ মহিলাটি বললেন।

-শিবাঙ্গী বসু। অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব ইন্সপেক্টর। লালবাজার ।

শিবাঙ্গী আত্মপরিচয় দিল।

মহিলাটি হাত জোড় করে বললেন, ‘নমস্কার। প্লিজ আসুন।’ দোকানে ঢুকতে ঢুকতেই চারপাশে চোখ চালিয়ে বলে উঠল, ‘আপনি নিশ্চয়ই মিস তৰ্পণা মিত্র?”

-হ্যাঁ ।

-তমাল তাহলে সবই বলেছে?

একটু থমকে গেলেন তর্পণা। উত্তর দিলেন না। বললেন, ‘বসুন আপনারা।’ মহিলাটি বেশ এলিগেন্ট দেখতে। পরিপাটি করে শাড়ি পরেছেন। কাঁধ ছাপানো সটান চুল। পিঠের কাছে ইউ শেপ। যাকে বলে চাবুক ফিগার, তর্পণা সেরকমই। ঠোঁটের নীচে বাঁদিকের থুতনিতে একটা তিল। গালদুটো ঢলঢলে। চোখদুটো বড় বড়। ভুরুর মাঝে কালো টিপ, মাঝারি মাপের গলার সরু চেনটা ছোট্ট লকেট সমেত বুকের বিভাজিকা পর্যন্ত নেমেছে নদীর ঢেউয়ের মতো নকশা করে আঁচল উঠে গেছে তারই একটু নীচ দিয়ে । স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীর সামনে পায়ের ওপর পা তুলে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে তর্পণা। শিবাঙ্গী এক ঝলক ঝাঁ চকচকে তর্পণার পায়ের দিকে দেখে নেয়। একটু হতাশই হয়। স্টিলেটো নয়। সামান্য হিল আছে। তর্পণার উচ্চতা খুব বেশি হলে পাঁচ সাড়ে পাঁচ মতো।

—ঘটনাটা ঘটার পর থেকে তমাল আমার ফোনই তুলছে না।

প্রশ্ন করার কিছুক্ষণ পরে উত্তর আসায় স্বয়ম্ভু একটু মুচকি হাসল। বলল, ‘তাহলে কী করে জানলেন যে আমরা এখানে আসব?”

-বলতে পারেন আমার সিক্সথ সেন্স।

-কেন?

-শুরু থেকেই আমার আর তমালের ফ্রেন্ডশিপ নিয়ে প্রবলেম ছিল অরুণার।

-তা সত্ত্বেও এগিয়ে গেলেন?

তর্পণা স্বয়ম্ভুর চোখের দিকে একবার চাইল। তারপর বলল, ‘আমি এগোইনি। তমালই তার লাইফ নিয়ে ডিস্টার্বড ছিল। ক্রমশ ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিল। আমার এখানে আসা শুরু করল। আমি বুঝতে পারতাম ও ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে। আমি গল্প করে, হাসি-ঠাট্টা করে ওকে ভুলিয়ে রাখার চেষ্টা করতাম। ওর খুব ভালো লাগত। তমাল একটা খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চেয়েছিল তখন ।

-আর অমনি আপনি সেই খড়কুটোটা হয়ে গেলেন।

কিছুক্ষণ চুপ রইলেন তর্পণা। এই সময়েই স্বয়ম্ভুর ফোনে কিছু একটা আসে। চোখ নামিয়ে বুড়ো আঙুল দিয়ে স্ক্রোল করে দেখে নেয় কয়েক ঝলক। তারপর বলে, ‘চুপ করে গেলেন যে।’

-আমার কিছু বলার নেই স্বয়ম্ভুবাবু। হ্যাঁ, আমি সেই খড়কুটো হলাম । কারণ মানুষটাকে দেখে আমার খুব খারাপ লাগত। একটা সময়ে ওর বাঁচার ইচ্ছেটাই চলে গেছিল। আমি তমালকে বাঁচিয়ে রেখেছি।

-তমালকে বাঁচাতে গিয়ে অরুণাকে মেরে ফেললেন তো!

ধাক্কা লাগে তর্পণার। পরক্ষণেই আলগা চালে একটা হাসি ছুড়ে বলেন, ‘আমি অরুণাকে মেরেছি? তাও আবার ওইভাবে?”

-কীভাবে?

-সারা কোলকাতা শহর জানে অরুণাকে কীভাবে ব্রুটালি মার্ডার করা হয়েছে।

কথাটা ঠিক। স্বয়ম্ভু মনে মনে বেশ কয়েকটা কাঁচা খিস্তি মিডিয়াগুলোর উদ্দেশে । ছুড়ে দিল

-কে খুন করল বলুন তো?

স্বয়ম্ভু এমনভাবে প্রশ্ন করল যেন তর্পণা কোনও একটা উত্তর কোলকাতাইয়া রকে বসে তার সঙ্গে তাস খেলতে খেলতে খোশগল্প করছে। তর্পণা অবাক হয়ে বলল, ‘সেটা আমি কী করে জানব? আপনার কী মনে হয়, আমি খুন করেছি?”

-জানি না। জিজ্ঞেস করছি।

-আপনি গোয়েন্দা হয়ে যেটা জানেন না, সেটা আমি সামান্য ফ্লোরিস্ট হয়ে জানব?

-আসলে ফুলেই তো কাঁটা থাকে তৰ্পণা ম্যাডাম ।

-বেশ। তাহলে আমায় অ্যারেস্ট করুন। আর কী বলব বলুন ।

-হুমম। আচ্ছা আপনার এই ফুলের দোকান কদ্দিনের?

দুম করে প্রসঙ্গ পালটে যাওয়ায় হকচকিয়ে গেলেন তর্পণা। আমতা- আমতা করে ভেবে বললেন, ‘এই তো বছর আড়াই হল।’

-বাড়িতে কে কে আছে আপনার?

-কেউ নেই ।

-একা থাকেন?

-হুম। ছোটবেলাতেই বাবা মারা গিয়েছিল। আর এই কোভিডে মা চলে গেল। তারপরেই দোকানটা খুললাম।

-বিয়ে করবেন না?

এবার থমকে গেলেন তর্পণা। একটু ভেবে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘বোধহয় না।’

-কেন?

-থাক না স্বয়ম্ভুবাবু, আমি বিয়ে করব কিনা সেটা নিশ্চয়ই এই কেসের সঙ্গে জড়িত নয়।

-তাই কী?

ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে একটু গরম বিরক্তি সুরেই বললেন তর্পণা, ‘বললাম তো, তাহলে আমায় অ্যারেস্ট করুন।’

স্বয়স্তু আবারও একটা পিত্তি জ্বলানো হাসি হাসল। টুং করে মোবাইলে শব্দ হল। স্বয়ম্ভু মোবাইলটা বের করতে করতে খুব গাছাড়া ভাব নিয়েই বলল, ‘বাই দ্য ওয়ে, আপনার পাঠানো উপহারটা খুব ভালো ছিল তৰ্পণা

ভুরুজোড়ার মাঝে কালো টিপটার নীচের চামড়া কুঁচকে গেল। তৰ্পণা বিস্মিত হয়ে বললেন, ‘আমার পাঠানো উপহার মানে?’ মোবাইল থেকে মুখ তুলল স্বয়ম্ভু। সন্দিগ্ধ চোখে বিস্ময় নিয়ে সেও পালটা প্রশ্ন করল, ‘সেকি আজ সকালে আপনি আমায় উপহার পাঠালেন ভুলে গেলেন?”

-সরি, আমি কোনও উপহার পাঠাইনি। তাছাড়া আপনার বাড়ির ঠিকানা তো আমি জানিই না। আমি কী করে…?

-আমি তো একবারও বলিনি যে আমার বাড়িতে উপহারটা এসেছে। আপনি জানলেন কী করে?

মুহূর্তের মধ্যে তর্পণার মুখে মেঘ জমল যেন। উত্তর দিতে গিয়ে হোঁচট খেলেন, ‘না মানে, লোকে তো বাড়িতেই সাধারণত এসব গিফটটিফট পাঠায় তাই…।’ কথার খেই ধরে বলে উঠল স্বয়ম্ভু, ‘বিশেষ করে আপনার প্রোমোশনাল প্ল্যানগুলো এরকমই হয়। একজনের বাড়ির অ্যাড্রেস আরেকজনের থেকে জেনে সারপ্রাইজ গিফট পাঠিয়ে দেন। তাই না মিস তর্পণা?’ ফ্লোরিস্ট ম্যাডামের নামটা একটু রহস্য করেই বলল স্বয়ম্ভু। এবার তর্পণার গলায় মেঘ ডাকল, ‘দেখুন স্বয়ম্ভুবাবু, আমি সত্যিই আপনাকে কোনওরকম গিফট পাঠাইনি।’ পকেট থেকে ফুলের সঙ্গে পাওয়া কার্ডটা স্বয়ম্ভূ বাড়িয়ে দিল, ‘দেখুন তো, এটা আপনার দোকানেরই তো।’ তৰ্পণা দেখে সম্মতি জানাতে এক মিনিটও সময় নিল না। বলল, ‘আমার দোকান থেকে অনেকেই ফুল কেনেন। এটা কে কিনে আপনাকে দিয়েছে সে আমি কেমন করে জানব?’

-কাস্টমারদের লিস্ট থাকে তো?

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করল। তর্পণা বললেন, ‘লিস্ট বলতে ক্যাশ মেমো। আপনারা চাইলে দেখতে পারেন।’

-তাতেই বা কী লাভ? কার্ডে সেন্ডারের নাম তো আর লেখা নেই।

স্বয়ম্ভু বলল। অমনি তর্পণা বললেন, ‘ট্রু। তাছাড়া আমাদের কাছে তাদেরই ঠিকানা থাকে যারা অনলাইনে কিছু বুক করেন। এসে কিনে নিয়ে গেলে সেটাও থাকে না।’ মেঘ কেটে তর্পণার গলার এবার বেশ স্বাভাবিক স্বর ফিরে এসেছে। দুম করে শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার, আমার মনে হয় লাস্ট তিনদিনে কে কে কীভাবে অনলাইনে এবং অফলাইনে ফুল কিনেছেন তাদের ক্যাশ মেমো, ঠিকানা সবকিছু আমাদের কাছে থাকা দরকার।’ স্বয়ম্ভু আবার কিছু চেক করছিল মোবাইলে। চেক করতে করতেই বলল, ‘বেশ তো। নিয়ে নাও।’ তর্পণার ভুরুতে আবার ভাঁজ পড়ে। নজর এড়ায় না শিবাঙ্গীর।

এই সময় দোকানের কম বয়সী মেয়েটি ঢুকে আসে। দুহাতে ধরা একটা প্লেট। তাতে দুটো প্যাটিস, দুটো কেক আর দুটো কোল্ডড্রিংস। মেয়েটির গায়ে ফুল ফুল ছাপের লং স্কার্ট। গায়ের রংটা হালকা চাপা। ঢেউ খেলানো মোটা গোছের চুল। ডানদিকে সিঁথি। বিনুনি বাঁধা। পা-টা খেয়াল করল শিবাঙ্গী। তার পায়েও নরমাল ফ্ল্যাট জুতো। আকারেও ছোট। কারণ মেয়েটির উচ্চতা বেশি নয়। তর্পণা খাবার অফার করায় স্বয়ম্ভু বলল, ‘মাফ করবেন। আমরা কেউ কিচ্ছু খেতে পারব নত্র

-জানি। ডিউটিতে থাকলে কিছু অফার করা যায় না। কিন্তু তমালের শ্যালক আর তার বন্ধুকে তো অফার করতেই পারি, তাই না

তর্পণার কথার প্যাঁচে মনে মনে হাসে স্বয়ম্ভু। অজান্তেই শিবাঙ্গীর একটা ভুরু কিঞ্চিৎ ওপরের দিকে উঠে যায়। ‘সরি তর্পণা, আপাতত আপনার আতিথেয়তা গ্রহণ করতে পারলাম না। আপনি যদি আমাদের ডকুমেন্টসগুলো হ্যান্ডওভার করেন বেটার হয়।’

-শিওর।

তর্পণা নিজেই কম্পিউটারে বসে। স্বয়স্তু ভিতরে কাজ করতে থাকা মেয়েটির দিকে তাকায়। শ্যেনদৃষ্টিতে ভালো করে দোকানটা ছানবিন করতে থাকে। এর মধ্যে কম বয়সী মেয়েটি দু-তিনবার আড়চোখে স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গীকে দেখে নিয়েছে। কিন্তু স্বয়ম্ভু দেখেছে কিনা বোঝা গেল না। ‘কী নাম তোমার?’ কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে স্বয়ম্ভু হঠাৎই প্রশ্ন ছুড়ে দিল মেয়েটির উদ্দেশে। তর্পণার আঙুলগুলো থেমে গেলে। কম বয়সী মেয়েটি ঘাবড়ে গিয়ে বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। শিবাঙ্গী বলল, ‘হ্যাঁ তোমাকেই জিজ্ঞেস করছেন, কী নাম?’ মেয়েটি অসহায়ের মতো তর্পণার দিকে তাকায়। উত্তরটা তর্পণা দেন, ‘ও কথা বলতে পারে না।’ স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী দুজনেই একটু থমকে যায়। ‘ওহ সরি’ স্বয়ম্ভু বলে।

-ওর নাম নন্দিনী ।

-পুরো নাম?

-নন্দিনী মণ্ডল।

শিবাঙ্গী প্রশ্ন করে, ‘স্কুলে যায় না?’ তৰ্পণা দুপাশে ঘাড় নেড়ে না বলেন । ‘তবে অক্ষরজ্ঞান আছে। কাস্টমারদের দেওয়া টাকা-পয়সা একদম পাই টু পাই হিসেব করে রাখে।’

-দেখে তো তেরো-চোদ্দ বছরের মনে হচ্ছে। অ্যাডাল্ট হয়নি। তাকে দিয়ে খাটাচ্ছেন? শিশুশ্রম দণ্ডণীয় অপরাধ কিন্তু।

তর্পণা তার রিভলবিং চেয়ার ঘুরিয়ে স্বয়ম্ভুর চোখে চোখ রেখে বলেন, ‘তার থেকেও বড় অপরাধ মানুষের না খেতে পাওয়াটা। সক্ষম মানুষের কাজ না পাওয়াটা। ভালোমানুষি আর সরলতার সুযোগ নিয়ে অসহায় মানুষগুলোর সঙ্গে জোচ্চুরি করাটা। সে জায়গায় আমি তো একটা মেয়েকে কাজ দিয়েছি। চারবেলা খেতে দিচ্ছি। থাকতে দিচ্ছি। এটা যদি অপরাধ হয় তাহলে এমন অপরাধ আমি শতবার করব।’

এতগুলো কথার মধ্যে থেকে স্বয়ম্ভুর একটা জায়গায় কানে বাজল ৷ পালটা প্রশ্ন করল স্বয়ম্ভু, ‘থাকতে দিয়েছি মানে? ও কী এই দোকানেই থাকে?”

-দোকানে থাকবে কেন? আমার ফ্ল্যাটেই থাকে। আমার সঙ্গে।

-একটু আগে যে বললেন আপনি একাই থাকেন ৷

তর্পণা কম্পিউটারের দিকে চেয়েই বলেন, ‘একা মানে আমার নিজের বলতে কেউ নেই সেটাই বোঝাতে চেয়েছি।’

শিবাঙ্গী জানতে চায়, ‘কিন্তু একে পেলেন কোথা থেকে?’

-আমি একটা কাজে মেদিনীপুর গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই পেয়েছি। ওর মা, বাবা কেউ নেই। মামার কাছে মানুষ। মামিটা অত্যাচারী। ঠিক মত খেতেও দিত না। ওই যা হয় আর কী! মেয়েটার মুখটা দেখে এত খারাপ লেগেছিল আমি ওর মামার কাছ থেকে ওকে নিয়ে আসি। সেই থেকে আমার কাছে। মামার বাড়ি যাবার নামটাও করে না ।

শেষ কথাগুলো বলতে গিয়ে তর্পণার ঠোঁটে বেশ একটা গর্বের হাসি চলকে উঠল। স্বয়ম্ভুরও মনটা ভিজে উঠল মেয়েটির জন্য। হাজারটা রঙিন ফুলের ভিড়ে কেমন চুপটি করে বসে আছে নন্দিনী। ফুলের মতোই নীরব।

সব ডকুমেন্টস নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় স্বয়ম্ভু হাসিমুখে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, ‘থ্যাংক ইউ মিস তর্পণা। আবার হয়তো দেখা হবে। এক গাল হাসি নিয়ে তর্পণা বললেন, ‘যখনই দরকার লাগবে নির্দ্বিধায় বলবেন। আমার সামর্থ্য মতো নিশ্চয়ই হেল্প করব। শুধু দেখবেন, অরুণা যেন সঠিক বিচার পায়। আমার সঙ্গে তার যাই থাকুক না কেন, এমন নৃশংস যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু সে ডিসার্ভ করে না ।

-কে যে কী ডিসার্ভ করে সেটা তো সময়ই বলবে। আর হ্যাঁ, গোয়েন্দাদের মিথ্যে কথাটা বলবেন না।

মুখের হাসিটা মেলাতে শুরু করল তর্পণার। শিবাঙ্গীও অবাক হয়ে স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল। রহস্যে ঘেরা হাসি মুখে ফুটে উঠলেই স্বয়ম্ভুর চোখদুটো ছোট হয়ে যায়। এখনও তাই হল। সে বলল, ‘গতকালই তমালের সঙ্গে আপনার কথা হয়েছে। তবে ফোন নম্বরটা আলাদা। ওটা বোধহয় আপনাদের স্পেশ্যাল নম্বর তাই না? মাঝখান থেকে হল কি জানেন? আপনাকে শুধু সন্দেহের তালিকায় আর রাখা গেল না। হাইলি সাসপিশিয়াস লিস্টে নিজে থেকেই ঢুকে পড়লেন। আসি কেমন। আবার দেখা হবে।’

কথাগুলো ঘোর বর্ষার বাজের মতোই কড়কড় করে হেভেন অফ ফ্লাওয়ার্স-এর ভিতর বাজিয়ে দিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। চোখ তুলে তাকাবে না নামিয়ে নেবে সেটা ঠিক বুঝতে পারলেন না তর্পণা। দোকানের বাইরে নতুন কাপড় পরানো মডেলের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *