১৬
-তোমার কী মনে হচ্ছে শিবাঙ্গী? এই সব কিছুর পিছনে কে আছে? ওই ছেলেটি?
এক গ্রাস ভাত তুলল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী ততক্ষণে প্রথম গ্রাসটা গিলে পরের গ্রাস মুখে তুলতে যাচ্ছিল। স্বয়ম্ভুর প্রশ্ন শুনে হাতটা ভাত সমেত মুখের কাছে এনেও থেমে গেল। বলল, ‘সম্ভাবনা তো তার দিকেই যাচ্ছে।’ গ্রাস মুখে উঠল শিবাঙ্গীর। চিবোতে চিবোতেই বলল, ‘ছেলেটা অভিযোগ করতে এল, নামটাও বলল। অথচ যে ভিক্টিম সে একটা নামও বলল না! কিন্তু সে নিশ্চয়ই ছেলেটিকে নামটা বলেছিল! নইলে কলেজে এতগুলো ছেলের মধ্যে সে খামোকা কেন প্রিয়াংশুর নাম করবে?
আরেকটু তরকারির অর্ডার করে স্বয়ম্ভু বলল, ‘কে বলতে পারে, প্রিয়াংশু হয়তো এর মধ্যেই মেয়েটিকে কোনওভাবে ভয় দেখিয়ে দেয়। তাই সে একটা কথাও বলে না সবার সামনে ‘
-এতে তো মেয়েটির ভাইয়েরই অপমান হল ।
-প্রিয়াংশুর খবরাখবর নাও। এদের দলটা একেবারে যন্তর দল ছিল।
একটি লোক এসে আরও খানিকটা আলু-পোস্ত স্বয়ম্ভুকে দিয়ে গেল। ‘আপনাকে কিছু দেব ম্যাডাম?’ শিবাঙ্গী হাত নেড়ে না বলল। লোকটি চলে যেতেই শিবাঙ্গী জানাল, ‘মৃত্তিকা বলল, ওই মেয়েটা একটু ন্যালাক্যাবলা মত ছিল। তাই সবাই ওকে বুলি করত।`
-ওটা ভালো ভাষায় বলেছে। আসল কথা হল র্যাগিং।
-আমারও সেটা সন্দেহ। তবে যারা মেয়েটির পিছনে লাগল তারা যেই বলল প্রিয়াংশু তোকে ভালোবাসে অমনি সে চলে গেল? নাকি এই চারবন্ধুই কোনও ফাঁদ পেতেছিল মেয়েটির জন্য?
-যদি পাতেও। সেদিনই কি সে রেপড হয়েছিল? যদি সেটাই হয় তাহলে নিশ্চয়ই মেয়েটি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত ছিল। একটা রেপড মেয়ে তো হেসেখেলে ঘুরে বেড়াবে না। এদিকে দিয়া বলল মেয়েটি একাই থাকত একটা বাড়িতে। চালচলন ভালো ছিল না। তার মানে ধরে নেওয়া যায় প্রিয়াংশু সেই সুযোগই নিয়েছিল। আর মেয়েটাও সেই সুযোগ দিয়েছিল। তাহলে আর শেষে এসে এই নাটক কেন? সত্যিই কি পয়সা খ্যাঁচার ধান্দা? যদি এটাই উদ্দেশ্য হবে তাহলে আবারও সেই একই প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসছে, মেয়েটা সকলের সামনে প্রিয়াংশুর নাম স্বীকার করল না কেন?
মুহূর্তে চোখের সামনে একটা দৃশ্য চলকে ওঠে স্বয়ম্ভুর। সুস্মিতাকে যখন জেরা করছিল তখন উত্তেজিত হয়ে প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে উঠছিল, ‘আমি তর্পণাকে লেলিয়ে দিইনি৷ বিলিভ মি। ওকে আমি সহ্যও করতে পারি না।’ স্বয়ম্ভূ জানতে চেয়েছিল, ‘কাস্টমারকে সহ্য করতে পারেন না? অমনি প্রিয়াংশু ব্যাপারটা হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে দেখে সুস্মিতাকে শান্ত করতে চেষ্টা করেছিল, ‘কী পাগলের মতো বলছিস? স্যার, ওর মাথার ঠিক নেই। কী বলতে কী বলছে ও নিজেই জানে না। আমি বলছি ও খুন করেনি। করতে পারে না।’
-পাগলের মতো উনি কী বলছেন? তর্পণাকে যদি উনি লেলিয়ে নাই থাকেন তাহলে কেন সুস্মিতা তাকে সহ্য করতে পারেন না? বলুন বলুন।
সেদিন স্বয়ম্ভু তার প্রশ্নের উত্তর পায়নি। ‘কিছু ভাবছেন স্যার?’ শিবাঙ্গীর প্রশ্নে বাস্তবে ফেরে স্বয়ম্ভু। সম্বিত ফিরে বলে ওঠে, ‘সুস্মিতা সবকিছু জানে । শিবাঙ্গী অবাক হয়ে বলল, ‘সে তো হবেই। সুস্মিতা ওদের মধ্যেই একজন।’
-আহ! ও কথা বলছি না শিবাঙ্গী। ব্যাপারটা বোঝো।
এই রে, হঠাৎ ক্ষেপে উঠল কেন? খুব সহজ কোনও ব্যাপার কী শিবাঙ্গী মিস করে গেল? স্বয়ম্ভু নিজেই বলল, ‘এরপরেও আরও অনেক কিছু আছে। হয়তো এখনও চলছে। আর সেইসব কিছু সুস্মিতা জানে। ও সেদিন আমাদের মুখ ফসকে বলে ফেলছিল। প্রিয়াংশু চালাকি করে আটকে দিল।’
-কী স্যার?
-সেটাই তো জানতে হবে শিবাঙ্গী। সুস্মিতা কেন তর্পণাকে সহ্য করতে পারে না? আর সেটা বলাতে প্রিয়াংশু কেন চেপে দিতে চাইল? সুস্মিতা কি এর বাইরেও আরও কিছু বলতে চাইছিল, এই মেয়েটির কথা?
শিবাঙ্গীর মনে হঠাৎই একটা আলো ঝলসে উঠল। গলাটা বেশ উত্তেজিত শোনাল শিবাঙ্গীর, ‘স্যার, অরুণার খুনের যা প্যাটার্ন তাতে ফরেন্সিক এক্সপার্ট ডক্টর তুহিনশুভ্র দাশগুপ্ত তো বলেইছেন এটা কোনও মেয়ের কাজ।’
-সেই ন্যালাক্যাবলা মেয়েটাই এত বছর ধরে নিজেকে তৈরি করে আজ এসেছে প্রতিশোধ নিতে, সেটাই বলতে চাইছ তো?
-হতে কী পারে না?
-অনেক কিছুই হতে পারে। কিন্তু তাতেও একটা প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। শ্রীদেবী যদি ফিরেই আসবে তাহলে প্রিয়াংশুকে আগে না মেরে অরুণাকে মারল কেন? সুস্মিতাকে ভয় দেখাল কেন? আমার বাড়িতে ওইসব পাঠাল কেন? দিয়া তো বলল এখনও কিছু পায়নি সে। মৃত্তিকাও তাই। এদিকে তমাল খুন হয়ে গেল। তাহলে কী এর মধ্যে…
বলতে বলতে সাংঘাতিক কিছুর সম্ভাবনায় নিজেই চুপ করে গেল স্বয়ম্ভু। বাকিটা শিবাঙ্গীই বলল, ‘স্যার তমাল! এই জন্যে হয়তো সে সবার সামনে প্রিয়াংশুর নাম বলেনি। আসল কালপ্রিট তমাল ছিল।’
-সেটাই বা বলবে না কেন? শ্রীদেবীর ভাই, কী যেন নাম, শ্রীকুমার না রামকুমার, সেই বা প্রিয়াংশুর নাম বলবে কেন? রহস্যের জট ক্রমশ পাকিয়েই চলেছে শিবাঙ্গী। কীভাবে ছাড়াব জানি না। এদিকে আমি নিজেই এই কাজটা নিয়েছি। শ্রীদেবীর যদি একটা ভালো ছবি পাওয়া যেত!
-কলেজ থেকে দিতে পারল না?
-দিয়েছে। একটা জেরক্স করা পেজে সাদা-কালো ছবি। তাতেই মনে হল মেয়েটিকে কোথায় যেন দেখেছিলাম। যদি আরেকটু ভালো কোনও ছবি পাওয়া যেত…
শিবাঙ্গী চুপ করে খেতে খেতে ভাবল। তারপর বলল, ‘এত কিছুর পরেও একটা জিনিস কিছুতেই বুঝতে পারছি না স্যার।’
-কী?
-এসবের মধ্যে বেড়াল আসছে কোথা থেকে?
ঝনঝন করে শিবাঙ্গীর ফোনটা বেজে উঠল। ‘ব্যস, প্রতিদিন এই সময় মাকে ফোন করতেই হবে।’ কলটা রিসিভ করেই শিবাঙ্গী বলতে শুরু করল, ‘আমি খাচ্ছি। রান্না রিচ নয়। ভাত, ডাল, আলু পোস্ত আর চাটনি। মাছ নিইনি। তাই টাটকা না বাসি জানি না।’ স্বয়ম্ভু চোখ তুলে তাকিয়ে হাসল মুচকি। আগের দিনের কথা মনে হতেই শিবাঙ্গীর সুরটা যেন একটু বেশিই নরম হয়ে গেল। ‘বলছি মা, তুমি খেয়েছ?… আচ্ছা, আর প্রেশারের ওষুধটা?… মানে কেন?… শরীর খারাপ কেন হবে?… জিজ্ঞেস করতে পারি না?… আশ্চর্য তো। হ্যাঁ ঠিকাছে রাখো এখন। বাই।’ ফোনটা রাখতেই স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘কাকিমার আর দোষ কী? সাত জন্মে যে মেয়ে খোঁজ নেয় না হঠাৎ করে খোঁজ করলে তো মায়ের মনেই হবে মেয়ের নির্ঘাত শরীর খারাপ হয়েছে।’
-হ্যাঁ সেই। কাজের সময়ে ফোনটা আমি একদম সহ্য করতে পারি না।
-এখন খাবার সময় শিবাঙ্গী ।
কিছু বলতে গিয়েও কথা হারিয়ে ফেলল শিবাঙ্গী। মনে মনে গজরাল, মা যে কাকে পেটে ধরেছে বোঝা ভার!
-মনে মনে আমায় গাল পরে দেবে। এখন খাও।
এ কী রে বাবা! এ কী মনের কথাও শুনতে পায় নাকি? এই কথাগুলোও মনে মনে আওড়াল শিবাঙ্গী। কিন্তু উত্তরটা স্বয়ম্ভু মুখেই দিল, ‘হ্যাঁ পাই পাই সব শুনতে পাই।’ শিবাঙ্গীর চক্ষু ছানাবড়া। এবার মনে মনেও কিছু বলতে গেলে খাবি খাচ্ছে সে। স্বয়ম্ভু বলল, ‘কাল দিয়ার জন্মদিন। সাউথ সিটিতে যে বার কাম রেস্টুরেন্ট আছে ওটা ভাড়া নিয়েছে ওর পার্টনার।’
-ইসস, গতকাল কিংবা আজকে করতে পারত ।
এবার স্বয়ম্ভু ভেবলে গেল, ‘মানে? কাল জন্মদিন আর পার্টি করবে আজ? কেন?’
-কাল নাকি তেড়ে বৃষ্টি হবে ।
চট করে মস্তিষ্কের মধ্যে কোনও চিন্তা যেন কামড় বসাল স্বয়ম্ভুর। সঙ্গে সঙ্গে মোবাইলটা নিয়ে কাকে যেন কল করল। ‘হ্যাঁ শোনো, কাল সুস্মিতার সিকিউরিটি বাড়িয়ে দিয়ো। এক চুলও যেন তোমাদের চোখের বাইরে না যায় সে। রাখছি।’
-কাল কী কিছু হতে পারে?
-যদি বৃষ্টি হয় ।
শিবাঙ্গী একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপরেই বলে বসল, ‘স্যার, আমাদের বলেছে?’
-কী?
-দিয়ার বার্থ ডে পার্টিতে?
স্বয়ম্ভূ কঠিন মুখে তাকাতেই চোখ নামিয়ে নিল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু বলল, “খালি খাই খাই খাই। কাল অনেক কাজ। সন্ধেবেলা কলেজস্ট্রিট যেতে হবে।’
-বই কিনবেন?
স্বয়ম্ভু চোখ উল্টে বলল, ‘তোমার খিদে এখনও মেটেনি। এই কে আছিস আরও এক থালা ভাত দিয়ে যা তো শিবাঙ্গীকে।’ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর এল, ‘যাচ্ছি স্যার।’
-আরে! এটা কী হল?
শিবাঙ্গী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চেয়ে রইল স্বয়ম্ভুর দিকে।
কথা ছিল সকাল থেকে ঝেঁপে নামবে। কিন্তু নামেনি। দিয়া ভেবেছিল, যাক বাবা এ যাত্রায় জন্মদিনটা বাঁচিয়ে দিল। কিন্তু না, দুপুর গড়াতে না গড়াতেই আকাশ ঘোর কালো করে এল। হাওয়া বইল এলোপাথারি । দিয়া আর কিয়ারার মনে মেঘ। ক্রমে বৃষ্টি। সন্ধের মধ্যেই চারপাশ ঝাপসা। তাতে সাউথ সিটির বার কাম রেস্টুরেন্টের পার্টির জেল্লা কমেনি এতটুকু। বরং সময় যত এগিয়েছে ততই বেড়েছে রঙিন নেশার উল্লাস। আজ ব্লু হ্যায় পানি ব্লু পানির সঙ্গে নীল রঙে মিশে গেছে লাল জমেছে দারুণ। দিয়া গিটার বাজিয়ে একের পর এক শিলাজিৎ, নচিকেতা, মোহিনের ঘোড়াগুলি ছুটিয়ে আবারও ফিরেছে ডিজে নাইটের ফর্মে। নাচের তালে টপাটপ খালি হচ্ছে গ্লাস। ভরে উঠছে আরও পেয়ালা। সঙ্গে কাবাব, ফ্রাই, তন্দুরির বন্যা। সুস্মিতা আসেনি বিকেলে জানিয়েছে এই সময় ওর আসাটা সম্ভব নয়। পুলিশের নজর থাকলেও অদৃশ্য সেই ব্যক্তিটির নজর এখনও ওর ওপরেই আছে নাকি৷ মৃত্তিকা সেদিনই বলে দিয়েছে ও আসবে না। দিয়ার স্পেশাল রিকোয়েস্টে ডিজে বাজাচ্ছে বাংলা লোকসংগীত কিন্তু রিমিক্স ভার্সান। তাতেই উল্লাস জমে উঠেছে। রাতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাইরে বেড়েছে বৃষ্টির দাপট। যদিও তার কণামাত্র বার কাম রেস্টুরেন্টে পৌঁছচ্ছে না। হইহই যখন তুঙ্গে ঠিক তখনই লোকসংগীত বদলে শুরু হল ‘আজ না ছোডুঙ্গা তুঝে দম দমা দম।’ তাও কোনও প্রপার রেকর্ডিং নয়। একদল মেয়ে গাইছে। মাঝেমাঝে একজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। লাল-নীল-হ -হলুদ আলোয় সাপের মতো হিলহিলে শরীর নিয়ে নেচে চলা ছেলেমেয়েগুলো আচমকাই ভড়কে গিয়ে থেমে গেল। এ আবার কী! বাজনা নেই, কিছু নেই। কারা গাইছে। শুরুতে সবাই ভেবেছিল প্ল্যাটফর্মটায় উঠে কারা বোধহয় গাইছে। কিন্তু সেখানেও ফাঁকা। নেশাতুর দিয়া হেঁচকি তুলে চমকে ওঠে। কিয়ারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। ঢুলুঢুলু চোখে দিয়ার ঘন ঘন নিশ্বাস পড়তে থাকে। কে একজন বলে উঠল, ‘ইয়ে বিল্লি কাঁহা সে আ গয়ে?’ সবাই তখন নিজেদের মধ্যে জল্পনা শুরু করে দিয়েছে। মেয়েগুলোর গানের সঙ্গে একটা বেড়ালের মিহি গলার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। শব্দ নয়, আর্তনাদ। কেউ যেন অডিওতে রিভার্ব লাগিয়ে আরও জোরে বাজিয়ে দিয়েছে গান আর বেড়ালের ডাকটাকে। দিয়া চিৎকার করে ওঠে ডিজের দিকে তাকিয়ে। ‘হোয়াট দ্য ফাক? এসব কী বাজাচ্ছ?’ কিয়ারা বলে উঠল, “কাকে বলছিস? ডিজে যে বাজাচ্ছিল সে কই?’ অন্য আরেক দিশি মোরগের বিদেশি মুরগি বলে ওঠে, ‘হোয়্যার ইজ দ্য গাই?’ মুহূর্তের মধ্যে দেখা গেল ডিজে ছেলেটিকে। হন্তদন্ত হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিয়ারা জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় ছিলে তুমি? এসব কী বাজছে? যতসব রাবিশ!’ ব্রাউন চুলে স্পাইক করা ছেলেটি ঘাবড়ে গিয়ে ক্ষমা চায়। বলে জানি না এসব কীভাবে হল। এই গান তো ওর কালেকশনেই ছিল না। কে দিল? টলতে টলতে তেড়ে এল দিয়া। ‘কে চালাল সে কী আমরা জানব? তুমি কোথায় ছিলে? তুমি ছাড়া আর কে চালাবে?’ কিয়ারা দিয়াকে সামলায়। দিয়া এত টলছে ঠিক মত কথাও বেরোচ্ছে না। ডিজে ছেলেটি বলল, ‘আসলে ম্যাম, আপনাদের মধ্যেই কোনও গেস্ট এসে গান বাজাবে বললো। আমি সব দেখিয়ে দিলাম। এখানে সবাই এরকম এসে নিজের মত গান বাজায়। ওনাকে দিয়ে আমি একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম। সরি ম্যাম, আমি এক্ষুনি অন্য গান…. ।
-ওয়েট ওয়েট ওয়েট। গেস্ট? কে? কী নাম?
হাঁফাতে হাঁফাতে প্রশ্ন করল দিয়া। কিয়ারা বুঝতে পারছে না দিয়া কেন এত টেনশন করছে! বেড়ালের আওয়াজ আছে বলেই কী দিয়া এত ক্ষেপে গেল? আর সত্যিই তো, এই গানের রেকর্ড কার? ছেলেটি বলল, ‘আমি চিনি না ম্যাম। এখানে তো সব আপনাদেরই গেস্ট। তাই ভাবলাম…!’
নাহ, গেস্টদের মধ্যে কেউ নেই যে এই গানটি বাজিয়েছে। আবার গান বেজে উঠল। দিয়া ড্রিংক্সের গ্লাস হাতে কাউন্টারে ফিরে এল। চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মাথা কাজ করছে না। সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। পাশ থেকে কিয়ারা বলছে কিছু। অনেকক্ষণ ধরে কিয়ারার মুখের কাছে মুখ নিয়ে, কান এগিয়ে দিয়ে শুনতে ও বুঝতে চেষ্টা করল দিয়া। কিন্তু কিয়ারার একটা কথাও বুঝতে পারল না। মিউজিকটা বেশ জোরে লাগছে। গা-টা শিরশির করে উঠছে। ভিতর থেকে ভীষণ ভয় করছে দিয়ার। প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়ার অবস্থা। এর মধ্যেও দিয়া বুঝতে পারছে ওর চারপাশে কেউ একজন আছে যে ওর সব গতিবিধি লক্ষ্য করছে। টকটকে লাল চোখে ভিড়ের মাঝেই কতবার দেখার চেষ্টা করল, খোঁজার চেষ্টা করল লোকটাকে। মাঝে মাঝে কারও একটা ঝাপসা অবয়ব দেখতে পাচ্ছে। সে একভাবে দিয়ার দিকে চেয়ে রয়েছে। হাতে মদের গ্লাস নিয়েই টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে সেই অদৃশ্য মানুষটার দিকে। কিন্তু কোথায় কে? অচেনা তো কেউ নেই । সবাই ওর পরিচিত। চেনা। কিয়ারা কী করবে বুঝতে পারছে না। দিয়াকে সামলাবার জন্য তার পিছু পিছু ঘুরছে। এত মদ দিয়া কোনওদিন খায়নি। আজই বা কখন খেল? হঠাৎ কী হল তার?
-এই শালা বৃষ্টিটা পুরো তছনছ করে দিল সব। কলেজস্ট্রিট একদম ভাসছে।
গাড়িতে আসতে আসতে নিজের মনেই বিড়বিড় করে উঠল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গী অমনি বলল, ‘কালকেই তো বলেছিলাম স্যার, আজ হেব্বি বৃষ্টি হবে।’
-হুম। আসলে আবহাওয়া দপ্তরের ভবিষ্যতবাণী যে এইভাবে মিলে যাবে ভাবতে পারিনি।
মুখ টিপে হাসল শিবাঙ্গী। ড্রাইভার তপন জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, ডানদিকে গলির মধ্যে নিয়ে নেব? নইলে সামনে প্রচুর জ্যাম পাব।’
-রাত এগারোটার সময়েও জ্যাম থাকবে বলছ?
-হ্যাঁ স্যার। এদিকেই তো থাকি। এইসব রাস্তার যা অবস্থা হয় কী বলব আপনাকে। তার ওপর বৃষ্টি পড়েছে।
একটানা কথাগুলো বলে গেল ড্রাইভার তপন। স্বয়ম্ভূ জিজ্ঞেস করল, ‘উঠবে কোথা দিয়ে?’
-সুরিলেন দিয়ে উঠে মৌলালি ধরে নেব।
-তাই করো ৷
স্বয়ম্ভুর মুখ থেকে কথা খসতেই গাড়িটা ডানদিকে বেঁকে সরু গলিতে সেঁধিয়ে গেল।
-কাল বৃষ্টি থামলে আবার কী আসবেন?
শিবাঙ্গী জিজ্ঞেস করল।
-আসতে তো হবেই। এখনও অনেক প্রকাশনা বাকি আছে। খুঁজে বের করতেই হবে ওই পাতাটা কোন বইয়ের। দরকার পড়লে প্রেসগুলোতে ঢু মারব ।
-আচ্ছা স্যার, তমালের বাড়িতে আর কোনও ক্লু পাওয়া যায়নি?
-নাহ! সেরকম কিছু নেই। অপরাধী হাতে গ্লাভস পরে কাজ সেরেছে। এমনকি জুতোটা খুলে ঘরে ঢুকেছে। ঘরে জুতোর ছাপ পর্যন্ত নেই।
গাড়িটা ঝপাস করে একটা বড়সড় গর্তের মধ্যে কাত হয়ে পড়েই সোজা হয়ে গেল। মুড়ির টিনের মতো গাড়ির মধ্যের লোকগুলো এধার ওধার হয়ে গেল। স্বয়ম্ভু মজার ছলেই প্রশ্ন করল, ‘বাবা তপন, অদ্যই কি আমাদের শেষ রজনি?’ তপন হাসল । লাজুক স্বরে বলল, ‘ভেরি সরি স্যার, বুঝতে পারিনি।’
-ঠিকাছে ঠিকাছে চলো।
গাড়িটা খানিকটা এগোতেই ড্রাইভার গাড়িটা স্লো করে দিল। তপন গজরাল, ‘ধ্যাত, এত রাতে এই গলিতেও গাড়ি!’ স্বয়ম্ভু সামনে তাকিয়ে দেখল একটি সাদা গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ির দরজাটা খোলা। একটি বিশাল নীল রঙের মোটা প্লাস্টিক সেই খোলা দরজার ভিতর থেকে ঢাকা দেওয়া। তার ভিতরে মানুষ আছে। নড়াচড়া করছে। কিছু নামাচ্ছে গাড়ি থেকে শিবাঙ্গী বলে উঠল, ‘বাবা! এত রাতে কী করছে এখানে?’ সাদা গাড়িটার পিছনে গিয়ে হর্ন দিল তপন। প্লাস্টিকের ভিতর নড়াচড়া বন্ধ হয়ে গেল খানিকক্ষণের জন্য। তারপর প্লাস্টিকের আড়াল থেকে যে মুখটা বেরিয়ে এল সেটা দেখে গাড়ির কাচটা আরেকটু বেশি করে নামিয়ে দিল স্বয়ম্ভু। ‘ঠাকুরমশাই আপনি? এত রাতে?’ মাথায় ছাওয়া প্লাস্টিকটা একটা সরু গলির ভিতর ঢোকানো। সরু মানে খুবই সরু। একটা মানুষই যেতে পারে। আগেকার দিনের পাশাপাশি বাড়ি। নিয়ম মেপে জায়গা ছাড়ার ধারধারেনি। উত্তর কোলকাতার বাড়িগুলোর একটা ছাদ থেকে আরেকজনের বাড়ির ছাদে অনায়াসেই লাফিয়ে যে কেউ চলে যেতে পারে এতটাই গায়ে গায়ে বানানো । খুব সন্তর্পণে কিছু একটা বাঁচিয়ে প্লাস্টিকের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন মিশ্রঠাকুর। অন্য কেউ প্লাস্টিকটা আড়াল থেকে ধরে রইল। কালো ছাতার নীচ থেকে মুখ বাড়িয়ে মিশ্রঠাকুর বললেন, ‘আমি সেদিনই বুঝেছিলাম স্যার যে আপনারা পুলিশ। খামোকা মিথ্যে বললেন ব্রাহ্মণকে।’ এসেই ঠুকে দিল। স্বয়ম্ভু কান এঁটো করা হাসি হেসে বলল, ‘সে তো বুঝলাম, কিন্তু আপনি এত রাতে এখানে গাড়ি থেকে কী নামাচ্ছেন?’
-কাপড়ের গাঁঠরি।
-আপনি কী কাপড়ের ব্যবসাও করেন নাকি?
-না স্যার। এই বয়সে আর অত ধকল সয় না। আমার ভাগ্নেটি করে। কলেজস্ট্রিটের একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করে। বলেছিলাম বোধহয়। রাতে গোডাউন থেকে গাঁঠরি তুলে আনতে হয় ওকে। আবার সকালে নিয়ে যায়। কখনও বেশ কিছু মাল দোকান থেকে এখানে এনে রাখে। গোডাউনের লোক এসে নিয়ে যায়।
-অ।
-দোকানের লোকগুলো এত চামার কী বলব স্যার, একটা এক্সট্রা লোক পাঠায় না জানেন। ওই একা আমার ভাগ্নের ঘাড়ে সব ফেলে দেয়। তাই আমি গাড়ি থেকে নামাতে হাত লাগাই। মাল ভিজে গেলে তো আবার ভাগ্নেকেই খেসারত দিতে হবে। তাই আমি এই প্লাস্টিক ধরে থাকি আর তিরু মাল নামায়।
-তিরু! ও আপনার ভাগ্নে?
-হ্যাঁ স্যার।
-আমরা হেল্প করি?
-এ মা! না না স্যার। আমাদের অভ্যেস আছে। আপনারা যদি একটু গাড়িটা নিয়ে এগিয়ে যান সুবিধে হয়। আসলে গাড়ি থেকে গাঁঠরি নামানোর সময় যদি জলের ছিটে লাগে তাহলে বেশ সমস্যায় পড়তে হবে। যা জল জমেছে। আপনারা বেরিয়ে গেলে আমরা এটা নামাব তাহলে ।
-আচ্ছা, আচ্ছা। তপন চলো।
-থ্যাংক ইউ স্যার।
স্বয়ম্ভু একটু হেসে জানলার কাচটা তুলতে লাগল। তপন গাড়িটাকে সাবধানে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। শিবাঙ্গীর হঠাৎ মনে পড়ে গেল একটা কথা। ‘ও হো, আপনাকে তো বলতেই ভুলে গেছি।’ স্বয়ম্ভূ তাকাল। শিবাঙ্গী বলল, ‘গতকাল যখন মৃত্তিকার বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি তখন দেখি এই পুরোহিত ঢুকছে।’ স্বয়ম্ভুর চোখে প্ৰশ্ন ।
-মৃত্তিকা বললেন ওনাদের মেয়ের অন্নপ্রাশন এই মিশ্রঠাকুরই নাকি করবে।
-বাবা! এই ঠাকুরের খ্যাতি তো দেখছি সুদূরপ্রসারী।
শিবাঙ্গী হাসতে হাসতে বলল, ‘আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো তাকালেন।’
-সেটাই তো স্বাভাবিক। পুলিশকে নিয়ে বেশ ভীতি আছে ভদ্রলোকের। উলটোদিক থেকে ফুল স্পিডে একটা বাইক ছুটে এল হঠাৎ। সাঁআআআ করে ঝড়ের গতিতে স্বয়ম্ভুদের গাড়িকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। জমা জল ছ্যারররর করে ছিটিয়ে দিয়ে গেল গাড়ির গায়ে। গাড়িতে নয়, ওই নোংরা জল এসে যেন তপনের গায়ে লাগল। একেবারে খ্যাঁকখ্যাঁক করে তেড়ে উঠল। জানলার কাচ নামিয়ে তৈরি হচ্ছিল আচ্ছা করে দেবে বলে। স্বয়ম্ভু নিষেধ করল, ‘আহ তপন ছাড়। রাত এগারোটার সময় আর কোঁদল করে কাজ নেই ।’
-গাড়িটার কী অবস্থা করল বলেন তো স্যার।
-ঠিকাছে। কী আর করবে! উড়নচণ্ডীদের নিয়েই তো আমাদের সংসার। শান্ত মাথায় চলো।
এক হাত দূরের বস্তুকেও অদৃশ্য লাগছে এমন বৃষ্টি। অঝোর বৃষ্টির গা ছুঁয়ে ছড়িয়ে পড়া রাস্তার আলোগুলো তিলোত্তমার বুকে যেন এক গভীর রহস্যের জাল বিছিয়ে রেখেছে।
