১২
-এত কেন ভাবছিস? পুলিশ তো দেখছে ব্যাপারটা।
দিয়া ভরসা দিল সুস্মিতাকে। সক্কাল সক্কাল দিয়ার ফ্ল্যাটে ছুটে এসেছে সুস্মিতা।
-একটা মানুষের পা থেকে চারটে আঙুল কেটে পাঠিয়ে দিল। তার পরেও ভাবব না? খুনি কী বলতে চাইছে? এরপর আমার পালা?
দিয়ার চোখ ছোট হয়ে গেল। পায়ের ওপর পা তুলে বসে বলল, ‘আমারও হতে পারে।’ সুস্মিতা অবাক। বলল, ‘কেন?’ হাসল দিয়া। বলল, ‘না এমনি। মনে হল।’ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল কিয়ারা। ফ্রিজ খুলে কিছু একটা বের করল। এক ঝলক দুজনের দিকে নজর দিয়ে চলে গেল। দিয়ার কথা সুস্মিতার বিশ্বাস হল না। ও জোর দিল, ‘না দিয়া তুই নিশ্চয়ই কিছু লুকোচ্ছিস।’
-আরে কী লুকোবো? সত্যি বলছি, এমনিই মনে হল।
-তোকে আমি চিনি দিয়া। তোর মনের জোর সাংঘাতিক। নইলে নিজের মরার কথা কেউ এইভাবে বলতে পারে?
-তুই মরতে ভয় পাস সুস?
-এই, মরতে কে না ভয় পায় রে?
-আর মারতে?
সুস্মিতা যেন কারেন্টের শক খেল। ‘মা… মানে ?
-কিছু না। এমনি বললাম। আচ্ছা, আমাদের সেই নর্থ বেঙ্গলের ট্যুরের কথা মনে আছে তোর?
সুস্মিতার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ‘আছে। কেন?” দিয়া কী বলতে চাইছে? হঠাৎ নর্থ বেঙ্গল ট্যুরের কথা এতদিন বাদে তুলছে কেন?
-ওখানে তো আমরা চারজন গিয়েছিলাম। তুই, আমি, মৃত্তিকা আর অরুণা।
-হ্যাঁ।
-আর কী কেউ গিয়েছিল?
-কী পাগলের মতো বকছিস? আর কেউ গেলে আমরা জানতে পারব না?
-না, হয়তো আমি জানি না। তুই জানতে পারিস।
-না দিয়া। আর কেউ যায়নি বলেই আমি জানি। তাছাড়া তুই কার যাওয়ার কথা বলছিস?
-জানি না। তবে কেন যেন মনে হচ্ছে আরও কেউ ছিল। আড়ালে।
দিয়ার মুখেও এবার চিন্তার মেঘ। সুস্মিতার মেরুদণ্ড দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যাচ্ছে। চাপা স্বরে বলল সুস্মিতা, ‘জানিস দিয়া, আমি যখন আসছিলাম তোর বাড়ি তখন কেউ যেন আমায় ফলো করছিল।’
-হোয়াট?
-হ্যাঁ রে। ফ্ল্যাট থেকে বেরোতেই মনে হল। কিন্তু কাউকে সেরকম দেখতে পেলাম না। অটোতে উঠলাম। তখনও মনে হচ্ছে আমার ওপর কেউ কন্সট্যান্ট নজর রেখেছে। তারপর নামলাম। তখনও…
-মনের ভুল। এই দিনের বেলা এত লোকের মাঝে এরকম হতে পারে না। এ কি থ্রিলার না হরর মুভি? যে কেউ আছে কিন্তু তাকে দেখতে পাচ্ছিস না ।
সুস্মিতা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল দিয়াকে, ‘তাহলে তুই কেন জিজ্ঞেস করছিস যে নর্থ বেঙ্গলে আরও কেউ গিয়েছিল কিনা। ওটা কী হরর ছিল? কেউ আছে অথচ দেখতে পাচ্ছি না?’ দুজনেই তলাতে তলাতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে বুঝতে পারছে না। সুস্মিতা বলল, ‘এবার মৃত্তিকাকে জানানো উচিত। ওর ছোট একটা মেয়ে আছে। ওর যদি কোনও বিপদ হয়?’
-অনেক কথা হয়েছে গাইজ। আর না। এবার শুধু আমার তৈরি মেক্সিকান স্যান্ডউইচ।
পরিবেশটাকে হালকা করতে দুহাতে দুটো প্লেট নিয়ে হাজির হল কিয়ারা। সুস্মিতা নাক কুঁচকে বলল, ‘না না, আমি এসব খাব না রে।’ দিয়া বলল, ‘খা খা। নইলে বিশাল মিস করবি। কিয়ারা অওসম বানায় এটা।’ আদুরে ভঙ্গিতে ঘাড় দুলিয়ে ভুরু নাচাল কিয়ারা। সুস্মিতার গলা দিয়ে কোনও খাবারই নামবে না। তবু মন রাখা হাসি হেসে স্যান্ডউইচটা হাতে তুলে নিল। ‘বাই দ্য ওয়ে, আমি তো তোকে বলতেই ভুলে গেছি। আজ তোকে ফোন করতামই।’ স্যান্ডউইচে কামড় বসিয়ে দিয়ার দিকে তাকাল সুস্মিতা। দিয়া বলল, ‘পরশু আমার জন্মদিন। কিয়ারার শখ হয়েছে এবার বড় করে করবে।’ সুস্মিতা খুশির হাসি আনার চেষ্টা করল। দিয়া বলল, ‘পাজিটা ভেনু বুক করে এসেছে জানিস। অবশ্যই আসবি। আমি প্রিয়াংশুকে ফোন করে দেব।’ সুস্মিতা পাংশুটে মুখে বলল, ‘নিশ্চয়ই আসব। যদি বেঁচে থাকি।
–একদম ফালতু বকবি না। অরুণাটা গাধা ছিল। সব কিছুতেই আগেভাগে হামলে পড়ার অভ্যেস। নিশ্চয়ই সেরকম কিছু করতে গিয়েই নিজের সর্বনাশ ডেকে এনেছে। পাপ কখনও বাপকে ছাড়ে না। তোর থেকে আর সেটা কে বেশি জানবে বল? তোর ঘরেই তো ও থাবা বসিয়েছিল তাই না?
সুস্মিতা ঢোঁক গিলল। স্যান্ডউইচটা গলা দিয়ে কিছুতেই নামছে না। দিয়া ফোনটা তুলে বলল, ‘মৃত্তিকা কি ফোন ধরবে এখন! দেখি একবার ট্রাই করে।’ নম্বর খুঁজতে থাকে। সুস্মিতা বলে, ‘আচ্ছা, অরুণার মৃত্যুর খবরটা কি মৃত্তিকা পায়নি? একবারও তো আমাদের কল করল না!’
সানগ্লাসটা চোখে দিয়েই ক্যাফের টেবিলে এসে বসল তৰ্পণা। উল্টোদিকের চেয়ারে তমাল। রোদে লাল হয়ে গেছে তর্পণার মুখ নাকি প্রচণ্ড বিরক্তি আর রাগে?
-কী নেবে?
-কিচ্ছু না।
দাঁতে দাঁত পিষে তমালের প্রশ্নের উত্তর দিল তর্পণা । ‘দয়া করে তাড়াতাড়ি বল কী বলবে?’ কথাটা শেষ করতে করতেই চারপাশে চোখ চালিয়ে দিল।
-দোকানে নন্দিনী নেই?
-ও বোবা। কথা বলতে পারে না ।
-এর আগেও তো ও দোকান সামলেছে। তখনও তো ও বোবাই ছিল।
-তমাল প্লিজ, ফর গড সেক, যা বলার তাড়াতাড়ি বলো। আমি এক্ষুনি উঠব ।
তমাল খপ করে তর্পণার হাতটা ধরে বলে ওঠে, ‘আমি আর পারছি না তর্পণা। আমার কিচ্ছু ভাল্লাগছে না! তুমিও ফোন ধরছ না।’ ঝট করে হাতটা নিজের দিকে টেনে তমালের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ তমাল। পুলিশ, গোয়েন্দা সবাই তোমায় নজরে রেখেছে। আই থিংক তোমার ফোনটাও ট্যাপ করা। আমি যে তোমার গোপন ফোনে কল করেছিলাম সেটাও জেনে গেছে স্বয়ম্ভু সেন। আর তুমি এখন আমায় ক্যাফেতে ডেকে ন্যাকা কান্না কাঁদছ?’
-অফিস থেকে বলেছে কেস না মিটলে তুমি আসবে না। পাড়ায় বেরোলে প্রতিটা লোক এমন করে তাকাচ্ছে যেন আমি সত্যিই আসামি। দোকানে জিনিস কিনতে গেলে এমন ব্যবহার করছে যেন কুকুর-বেড়ালকে খেতে দিচ্ছে। কিন্তু তুমি তো আমায় ভালোবাসো। তুমি তো বিশ্বাস কর তৰ্পণা আমি খুন করিনি? এই সময় তুমি আমার পাশে থাকবে না?
তর্পণা কিছু বলতে গিয়েও থমকে গেল। ফোঁস করে একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, ‘আমি একটু ওয়াশরুম যাব। তার মধ্যে ঠিক কী বলতে ডেকেছ সেটা সেন্টেন্স কনস্ট্রাক্ট করে রাখো। আমি জাস্ট আসব, শুনব, বেরিয়ে যাব। এইসব ভালোবাসো-টাসো ন্যাকামোগুলো পরে কোরো।’ তর্পণা ব্যাগটা টেবিলে রেখেই উঠে চলে গেল দ্রুত পায়ে। তমাল সত্যিই বিভ্রান্ত। চোখের নীচে দুদিনেই কালি পড়ে গেছে। ঘুম হয়নি। মাথার চুলে তেল পড়েনি। উশকোখুশকো। গায়ের শার্টে অজস্র উল্টোপাল্টা ভাঁজ। কোনও স্তূপের মধ্যে থেকে বের করে এনেছে। যতটা পারে লোকের থেকে মুখ লুকিয়ে বেড়াচ্ছে।
কারও একটা মোবাইল গুমরে উঠছে। ভোঁ ভোঁ করে শব্দ হচ্ছে। কম্পনটা তমালের হাতে অনুভূত হতেই বুঝল মোবাইলটা তর্পণার ব্যাগ থেকেই আসছে। প্রথমে ভাবল বাজুক। কিন্তু তারপরেই খেয়াল হল, ও তো মোবাইল নিয়েই গেল। তাহলে আরও একটা মোবাইল! বলেনি তো তর্পণা। এদিকে ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। নাহ, থামাতে হবে। ব্যাগের চেন খুলে ফোনটা বের করতেই চমকে ওঠে তমাল। আঙুলগুলো আটকে যায় তার। স্ক্রিনের ওপর ফুটে উঠেছে নন্দিনীর নাম। নন্দিনী কল করছে! সে তো বোবা! কথাই বলতে পারে না। তাহলে কী কোনও বিপদে পড়ল বাচ্চা মেয়েটা? তাই কল করে কিছু বলবার চেষ্টা করছে বেচারা? তমাল শুনেছে তর্পণার দোকানেও পুলিশ গিয়েছিল। হয়তো আবার এসেছে! দূরে তাকিয়ে দেখল তৰ্পণা আসছে কিনা। নাহ! ও এখন ওয়াশরুমে। টক করে ফোনটা ধরেই কানে ঠ্যাকাল তমাল। হ্যালো বলবার জন্য মুখটা হাঁ হলেও কোনও শব্দ বেরোলো না। শুধু চোখদুটো কড়কড় করে উঠল তমালের। কপালের দুপাশের রগ ফুলে উঠল। চোয়াল শক্ত হল। মুহূর্তে চোখের ওপর চেনা পৃথিবীটা ভীষণ অচেনা মনে হতে থাকল। ভয় করল খুব। তর্পণাকে ওয়াশরুম থেকে বেরোতে দেখে কান থেকে ফোনটা নামিয়েই কলটা কেটে দিল। আবার ব্যাগের মধ্যে রেখে দিল। ওদিকে তর্পণা বাইরের বেসিনে হাত ধুয়ে, মুছে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল।
-বসব না। কী বলার আছে বলো।
তর্পণা সত্যিই বসল না। তমালও সময় নষ্ট না করে দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর তর্পণার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমার অভিশপ্ত জীবন থেকে তোমায় মুক্তি দিলাম। গুড বাই।’ মুখে রুমাল চাপা দিয়ে মাথা নিচু করে প্রায় দৌড়ে ক্যাফের বাইরে বেরিয়ে গেল তমাল। তৰ্পণা খানিকক্ষণের জন্য স্থির হয়ে রইল। তমাল এই কথা বলার জন্য এখানে ডেকে আনল? অদ্ভুত! একটু আগেই তো অসহায়ের মতো তর্পণাকে পাশে চাইছিল। আর এইটুকু সময়ে কী এমন হল যে… কিচ্ছু বুঝতে পারল না তর্পণা। অন্যমনষ্ক হয়ে কাঁধে ব্যাগটাকে তুলতে গিয়ে খেয়াল হল ব্যাগের চেনটা খোলা। ভিতরে রাখা ফোনে আলো জ্বলছে। ফোন এসেছে। চট করে ফোনটাকে বের করল। ‘হুম… কী? আমি?’ আর কোনও কথা বেরোলো না মুখ দিয়ে। স্তম্ভিত হয়ে ঈষৎ বিস্ফারিত চোখে বাইরের রাস্তাটার দিকে চেয়ে রইল তর্পণা।
লালবাজারের সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্টে সটান ঢুকে গেল স্বয়ম্ভু। ছড়ানো ছেটানো কম্পিউটারে কাজ চলছে সারাদিন। ফোনের রিং, লোকের কথা, কিছু সময় নীরব হয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে চেয়ে কোনও সাইবার দুষ্কৃতিকে ধরার চেষ্টা, এমনই হাজারও কাজের স্রোতে ভেসে ব্যস্তসমস্ত সাইবার এক্সপার্টরা। কারও দিকে তাকাবার ফুরসৎ নেই। এরকমই এক সময়ে স্বয়ম্ভু ঘরের ভিতর ঢুকে একটা টেবিলে কোমর ঠেকিয়ে দাঁড়াল। দু-তিনটে ছেলে বলে উঠল, ‘গুড আফটার নুন স্যার’। স্বয়ম্ভু সৌজন্যের হাসি ছুড়ে দিল। পাশে শিবাঙ্গীও হাজির। স্বয়ম্ভুর সামনে কিছু হাত দূরত্বে একটি লোক নির্বিকার। কম্পিউটারে চোখ গুঁজে বসেই আছে। ঘাড় বেঁকিয়ে লোকটাকে পিছন থেকে নিরীক্ষণ করে স্বয়ম্ভু বলে উঠল, ‘জানো শিবাঙ্গী, আজ একটা ভয়ানক খবর শুনলাম।’ শিবাঙ্গী ঘাবড়ে গেল। এই ঘরে এসেছিল একটা জরুরি কাজে। কিন্তু এমন করে তো শুরু হওয়ার কথা ছিল না! ভদ্রতার খাতিরে শিবাঙ্গীও উত্তর দিল, ‘কী শুনলেন স্যার?’
-লালবাজার থেকে একটা ডিপার্টমেন্টকে তুলে দেওয়া হবে।’ শিবাঙ্গীর মতই অবাক চোখে আরও দু-তিনটে ছেলের চোখ স্বয়ম্ভুর দিকে ঘুরে গেল। কেবল এর মধ্যে একজন বয়স্ক মানুষ ফিক করে হাসলেন চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে। পিছন ফিরে যিনি বসেছিলেন তিনি এক মনে নিজের কাজ করে চলেছেন। এইসব কথায় কোনও হেলদোল নেই তার।
-কী বলছেন স্যার! কোন ডিপার্টমেন্ট?
-সাইবার ক্রাইম ডিপার্টমেন্ট।
উত্তরটা স্বয়ম্ভু নয়, ওই পিছন ফিরে বসে থাকা লোকটি বললেন। যথারীতি সকলের চোখ লোকটির দিকে। লোকটিও রিভলবিং চেয়ার ঘুরিয়ে সরাসরি শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে বললেন, ‘তোমার কিসু হবে না শিবাঙ্গী।’ শিবাঙ্গীর মুখটা বাংলার পাঁচের মতো হয়ে গেল। লোকটি সিনিয়ার। বয়সে স্বয়ম্ভুর থেকে দু’বছরের বড় বৈ ছোট নয়। তার মুখ থেকে সক্কাল সক্কাল এমন কড়া কথা! ‘এ কথা কেন বলছেন প্রদ্যুৎদা? কী করলাম আমি?’ প্রদ্যুৎ বললেন, ‘খালি গোয়েন্দার পেছু পেছু ঘুরলেই হয় না। তাদের কথার ব্লুগুলোও ধরতে হয়।’ উফফ! আজ যে কার মুখ দেখে উঠেছিল শিবাঙ্গী! ‘এটাও বুঝলে না তো?’ নিতান্ত অসহায় মুখে শিবাঙ্গী দুপাশে ঘাড় নাড়ল । সত্যিই বুঝছে না সে। কাঁধ ঝাঁকালেন প্রদ্যুৎ, ‘স্বয়ম্ভু, সাইবার ক্রাইম নয়, ডিটেকটিভ ডিপার্টমেন্টটাকেই তুলে দিতে হবে। এই তো ভবিষ্যতের হাল!” খোঁচাটা যে শিবাঙ্গীর উদ্দেশ্যে বর্ষিত হল সেটুকু বোঝার মত বুদ্ধি ওর আছে। প্রায় কাঁদো কাঁদো অবস্থায় স্বয়ম্ভুর দিকে তাকাল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি এনে বলল, ‘হচ্ছিল তো তোমার আমার। খামোকা বাচ্চা মেয়েটাকে কাঁদানো কেন প্রদ্যুৎ? দেখো মুখের কী অবস্থা!’ কথা শুনে অল্প বয়সী দুটো ছেলেও এবার হেসে ফেলল। প্রদ্যুৎ বললেন, ‘শিবাঙ্গী, মা আমার, সাইবার ক্রাইম কেন উঠে যাবে তোমায় বুঝিয়ে বলি, শোনো। গতকাল যে তুমি গুচ্ছের আবোল তাবোল নম্বর আমায় দিয়ে বলে গেলে তাদের ঠিকুজিকুষ্ঠি উদ্ধার করে দিতে সেটার রিপোর্ট এখনও তোমার বসকে দিয়ে উঠতে পারিনি। তাই সক্কাল সক্কাল স্বয়ম্ভু সেনের এত হম্বিতম্বি । বুঝলে?’ শিবাঙ্গীও হেসে ফেলল। কী নাকি ভেবে মরছিল এতক্ষণ। আর ফাজলামি নয়। স্বয়ম্ভু এবার সরাসরি প্রশ্নে প্রবেশ করল, ‘আবোল তাবোল নম্বর কেন?’ যেন কী ছেলেখেলার প্রশ্ন করে ফেলেছে স্বয়ম্ভু, উত্তরটা এমন করেই দিতে শুরু করলেন প্রদ্যুৎ। ‘তুসসস! তিনটে নম্বর রাশিয়ার, দুটো চিনের, বাকি তিনটে ইউ এস এ-র। অপরাধী প্রত্যেকবার নতুন নতুন ভিপিএন নম্বর ইউজ করেছে। প্রতিবার ডিভাইজের আই পি অ্যাড্রেস পালটে পালটে গেছে।’
-হাইটেক আসামি?
উচ্চকিত স্বরে বলে উঠল স্বয়ম্ভু। প্রদ্যুৎ বললেন, ‘দ্যাখ স্বয়ম্ভু, হাইটেক তো বটেই । তবে এই দুহাজার বাইশে এসে, যখন কিনা অচেনা কেউ অচেনা কোনও নম্বর থেকে তোর মোবাইলের সব ডেটা চুরি করে নিচ্ছে, আদ্যপান্ত ক্লোন করে সাফ করে দিচ্ছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়ে এটা বিরাআআআআট বড় কোনও ব্যাপার নয় কিন্তু।’
-তাই যদি হবে ধরে ফেলো।
-মামার বাড়ির আবদার নাকি?
-বোঝো! তুমিই তো বলছ এমন কিছু ব্যাপার নয়।
-ব্যাপার নয় তাদের কাছে যারা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ করবে বলে ঘুঁটি সাজিয়েছে। নিখুঁত প্ল্যান করেছে। এই যে প্রতিবার ভিপিএন পাল্টেছে, তাতে নতুন নতুন আই পি কানেক্ট করেছে সেটা আম জনতার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। এর কিছুটা জানবে যারা আই টিতে কাজ করেন। মানে ডিকোডিং, এনকোডিং বা এই জাতীয় আর যা যা আছে সেগুলো যারা শিখে কাজ করে তারা। সবথেকে বড় কথা, এগুলো একটা সাধারণ মানুষ জানলেই হল না । এগুলোকে যথাযথ ব্যবহার করতে জানতে হবে। সেটা জানে ক’জন? যারা জানে অপরাধী তাদের মধ্যেই একজন।
-এগুলো হয় কীভাবে? মোবাইল থেকে সম্ভব?
-সব সম্ভব। দ্যাখ, এখন প্রচুর কলিং সাইট আছে। কলিং অ্যাপ আছে। উইথ আউট সিমে কাউকে কল করতে চাইলেও করতে পারিস। অপরাধী সেরকমই কোনও সাইটে গিয়ে অ্যাগ ডাউনলোড করেছে। তারপর মোবাইলের অ্যাপ স্টোর থেকে ভিপিএন ডাউনলোড করেছে। সেই ভিপিএন নিয়ে ওই সাইটে পুট করে কল করেছে। এইসব ক্ষেত্রে র্যান্ডাম আই পি অ্যাড্রেস চেঞ্জ হয়। এক্ষেত্রে তুই যেকোনও দেশের আই পি অ্যাড্রেস চুজ করতে পারিস। তোর ধর ইচ্ছে হল কোলকাতায় বসে চিন থেকে কল করবি। সেই দেশের আই পি নিয়ে কল কর। এরপর তুই যখন কল করছিস তখন সেই দেশের আই পি থেকে কল যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনালি এরকম কত ক্রাইম হচ্ছে! সেক্ষেত্রে অসুবিধে হচ্ছে অপরাধীর ডিভাইজ ট্রেস করা যাচ্ছে না। র্যান্ডামলি চেঞ্জ হচ্ছে তো। রাশিয়া থেকেই তিনটে আলাদা আলাদা আই পিতে তিনটে কল। ফোন হয়ে গেলেই অ্যাপ সমেত সব কিছু ডিলিট করে দিচ্ছে। ফোন নম্বর ডাজ নট এগজিস্ট। এবার দ্যাখ, এটা আমি তোকে মোটের ওপর বললাম। এই যে ভিপিএন পুট করা, আই পি সিলেক্ট করা এটা কিন্তু আমজনতা পারে না। হ্যাকিং জানতে হয়। আর সেরকম লোকও কম নেই। দেখছিসই তো আকছার এরকম হচ্ছে। কটা কেস ধরা পড়ছে বল তো?
-তার মানে হাল ছেড়ে দিচ্ছ?
-একদম না। কন্টিনিউয়াসলি ট্রেস করতে থাকব। কোনও ক্লু পেলেই ইনফর্ম করব।
স্বয়ম্ভু কোনও কথা না বলে ভূতে পাওয়া মানুষের মতো বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। শিবাঙ্গীও অনুসরণ করল। সরাসরি নিজের ঘরে এসে দুহাত মাথার মধ্যে চালিয়ে দিল। চুলগুলোকে টেনে ধরল। চেয়ারে বসে টেবিলে মাথা রাখল। কিন্তু ডান হাতটা টেবিলের ওপর রাখা একটা পেপার ওয়েট ঘোরাতে থাকল। এই সময় কিছু বলা ঠিক হবে কিনা বুঝতে পারছে না শিবাঙ্গী। স্পষ্ট বুঝতে পারছে স্বয়ম্ভুর মাথায় ঝড় উঠেছে। কিছু বলবে ভেবে দুবার মুখ খুলেও চুপ করে রইল। হঠাৎ তড়াক করে লাফিয়ে উঠল স্বয়ম্ভু। কিছু বুঝতে না দিয়েই শিবাঙ্গীর দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ‘আচ্ছা, তমালকে কেন আমার অপরাধী বলে মনে হচ্ছে না বলো তো শিবাঙ্গী? কেন? তমালের প্রতিবেশী, যার বাড়ি তুমি গিয়েছিলে সেখানকার রিপোর্ট তমালের বিপক্ষে। আমার মাসি, মেসো তারাও মনে প্রাণে বিশ্বাস করে তমালই অরুণাকে খুন করেছে। এই মুহুর্তে প্রদ্যুৎ যা বলল তার সঙ্গেও তমাল জড়িয়ে। তার পরেও কেন মনে হচ্ছে না আমার…’।
-বুঝলাম না স্যার। তমাল জড়িয়ে কীভাবে?
স্বয়ম্ভুর কথার ওপর দিয়েই বলে উঠল শিবাঙ্গী ।
-তমাল আইটিতে কাজ করে। কীসব ওই ডিকোডিং এনকোডিং বলল না, সেগুলোও করে। এমনকি এথিক্যাল হ্যাকিং ব্যাপারটাও ও শিখেছে।
-সেকি!
-এখন আমার মনে পড়ছে, বিয়ের পর পর আমার মা জামাইষষ্ঠীতে ওদের বলেছিল। তখন তমালের নিজের শ্বশুরবাড়িতে এন্ট্রি ছিল না। তাই আমার মা-ই ডেকে ভালোমন্দ রেঁধে খাইয়েছিল। সেদিনই তমাল ওর কাজের গল্প করছিল আমার সঙ্গে। যারা আইটির কাজ শেখে তারা এথিক্যাল হ্যাকিং করতে পারে। ওটা ওদের শেখানোই হয়। আরও কী কী সব যেন বলেছিল ও যে আরও কিছু জানে না সেটা কে বলতে পারে?
-স্যার, তমালবাবুকে আরেকবার ডেকে পাঠান। আর নয় তো সবচেয়ে ভালো হয় কিচ্ছু না জানিয়ে একবার ওর বাড়িতে ঢুঁ মারি আমরা। আবার চেপে ধরি। বলা তো যায় না, যদি কিছু বেরোয়।
-একদম ঠিক। তবে তার আগে কিছু খেতে হবে। চলো, আজ আমরা বাইরে খাব। কোনও ভালো হোটেলে খেয়ে তারপর….
বলতে বলতে থেমে গেল স্বয়ম্ভু। শিবাঙ্গীর মুখে একটা আলো জ্বলে উঠেই নিভে গেল। ‘কী হল স্যার?’ চোখগুলো ছোট ছোট করে শিবাঙ্গীর দিকে চেয়ে স্বয়ম্ভু বলল, ‘আজ যখন মাসির বাড়ি গেলাম, দেখলাম মেজ মেসো চোখে চশমা এঁটে খুব মন দিয়ে নিজের মেয়ের শ্রাদ্ধের ফর্দ লিখছে। অপঘাতে মৃত্যু তো, তাই কালই কাজ করবে।’ স্বয়ম্ভুর ভেজা চোখের বাষ্প শিবাঙ্গীর চোখে লাগে। তাও মুখে হাসি ফুটিয়ে বলে, ‘আজ বরং ক্যান্টিনেই খেয়ে নিই স্যার।’ শিবাঙ্গী বুঝেছে, এই কথা মনে পড়ার পর স্বয়ম্ভুর গলা দিয়ে আর রেস্টুরেন্টের খাবার নামবে না ।
ক্যান্টিনে খেতে খেতে শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার, কাল থেকে সিসিটিভির ফুটেজগুলো তো চেক করা হচ্ছে না। আমরা যখন শিয়ালদার দিকেই যাচ্ছি তখন একবার চেক করে সরেজমিনে দেখে এলে হত না? তমালবাবুর বাড়ি না হয় সন্ধেবেলাতেই…
-এই জন্যেই তোমায় এত পছন্দ করি।
বেশ একটা প্রফেশনাল মুডে কথাগুলো বলছিল শিবাঙ্গী। কিন্তু স্বয়ম্ভু সেন যে মাঝখান থেকে এক্কেবারে পার্সোনাল এরিয়ায় ঢুকে পড়বে কে জানত? নাকি স্বয়ম্ভুও একেবারে প্রফেশনাল মুডেই বলল কথাটা? শিবাঙ্গী ই ভুলভাল ভাবছে! লাল হয়ে উঠল শিবাঙ্গী। খাওয়ার গতি কমে গেল নিমেষে। হাতের পাঁচটা আঙুল ডালমাখা ভাতের মধ্যেই ঘুরে চলেছে। কিন্তু স্বয়ম্ভু যেমন হাপুস হুপুস করে খাচ্ছিল সেরকমই খেয়ে চলেছে। এরই মাঝে বেরসিক ফোনটা গোঁ গোঁ করে ডেকে উঠল শিবাঙ্গীকে।
-হ্যাঁ বলো।… এই তো খাচ্ছি।….আবার আইটেম বলতে হবে এখন? উফফফ, ভাত, ডাল, আলু পটল আর মাছ।… আচ্ছা মা, মাছটা টাটকা না বাসি এত খবর কী করে নেব?
স্বয়ম্ভু খেতে খেতেই চোখ তুলে শিবাঙ্গীর দিকে তাকাল। শিবাঙ্গী ও লজ্জায় পড়ল। অপরাধী ধরতে মাথার ঘাম পায়ে পড়ছে, আর শিবাঙ্গী কিনা এখন মাছটা টাটকা না বাসি সেটা তদন্ত করে দেখবে!
-হ্যাঁ হ্যাঁ। ঠিকাছে। রাখো এখন।
ফোনটা রেখে দিয়েই গজগজ করল শিবাঙ্গী, ‘মা না। প্রশ্ন খুঁজে পায় না । মাছটা টাটকা তো?’
-কাকিমা খেয়েছেন?
-অ্যাঁ?
আচমকা প্রশ্নটা ধেয়ে আসাতে একটু হকচকিয়ে গেল শিবাঙ্গী। স্বয়ম্ভু আবার বলল, ‘কাকিমা লাঞ্চ করেছেন?’ তোতলাল শিবাঙ্গী। ‘কী জানি, বোধহয় খেয়েছে।
-কাকিমার প্রেশার আছে না?
-হ্যাঁ।
-প্রেশারের ওষুধ খেয়েছেন?
-হ্যাঁ, মা তো এই সময়েই খায়। খেয়েছে বোধহয়। জিজ্ঞেস করিনি ৷
-অথচ কাকিমা তোমায় জিজ্ঞেস করলেন যে তুমি যে মাছটা খাচ্ছ সেটা টাটকা না বাসি।
-হ্যাঁ, মানে….
স্বয়ম্ভু ঠোঁট চওড়া করে হেসে বলল, ‘খাও। সিসিটিভিটা একসাথে দেখব।’ মিষ্টি করে অল্প কথায় রগড়ে দিলেন স্যার। বাইরে লজ্জা পেলেও অন্তরটা ভালো লাগায় ভরে উঠল শিবাঙ্গীর। ক’জন বস এমন আপন করে জীবনের পাঠ শেখায়?
