১৩
সবে ছয় মাসে পড়ল দেবোত্তমা। এখন বিছানার ওপর বসে নিজের শরীরটাকে টুকটুক করে সামনের দিকে ঠেলতে চেষ্টা করে। তুলতুলে পাগুলো বেশ কয়েকবারের চেষ্টায় হাঁটুর ওপর ভর দিতে পারে। পায়ে বাঁধা বালার মতো গোল নূপুরে শব্দ হয় ছুনছুন। ফোকলা মাড়ি ছড়িয়ে হিয়্যাক ক’রে খুশির শব্দ করে। দুপাশের ফর্সা গালদুটো টোপলা করে ফুলে ওঠে। আজ মা-বাবা দুজনেই চোখের সামনে আছে। এমনিতে উইক ডেজে এতক্ষণে দেবোত্তমার বাবা দীপায়ন বেরিয়ে যায়। আজকেও বেরোচ্ছিল। ঠিক সেই সময়েই ভয়ংকর খবরটা এল। দিয়া ফোন করে অরুণার খবর শোনানো মাত্রই সেই যে আতঙ্কে জড়সড় হয়ে চেয়ারে বসল। তারপর অনেক কষ্টে তুলে তাকে ওপরের ঘরের বিছানায় আনা গেছে ৷
-এগুলোর কোনও মানে হয় মৃত্তিকা? আমাকে তো কলেজে যেতে দিলেই না। নিজেও ব্রেকফাস্ট করলে না। ঠায় একভাবে বসে আছ। দুপুর হয়ে গেল।
দীপায়নের কথা শুনে বিস্ফারিত চোখে মৃত্তিকা তাকাল। ‘আশ্চর্য দীপায়ন! তোমার বউয়ের এমন একটা বিপদ আর তুমি বলছ এটা কোনও ব্যাপার না?
-এটাই তো। এটাই তো বুঝতে পারছি না।
জানলার ধার থেকে খাটে স্ত্রীয়ের পাশে এসে বসল দীপায়ন। ‘তোমার বন্ধু খুন হয়েছে বলে তোমার দুঃখ হতেই পারে। কিন্তু ভয় কেন পাচ্ছ? খুনি কি তোমাকে এসে মেরে ফেলবে? কেন?
-শুধু অরুণাই খুন হয়নি দীপায়ন। তুমি তো জানো।
এবার একটু নীরব রইল দীপায়ন। কথাটা সত্যি। মৃত্তিকা বলল, খুনি আমাদের চারবন্ধুকেই টার্গেট করেছে। সেটা বুঝছ?” -কেন?
দীপায়নের দিকে ঝুঁকে থাকা মুখটা পিছিয়ে নেয় মৃত্তিকা। চোখদুটো ঘুরে যায় উল্টোদিকে। ‘কী হল মৃত্তিকা? খুনি কেন তোমাদেরই টার্গেট করেছে বলে মনে হচ্ছে?’
-আ…আমি কী করে জানব?
-কারণটা যখন জানই না তখন অযথা ভয় পাওয়ারও কারণ নেই। অরুণা আর সুস্মিতা নিশ্চয়ই খুনির শত্রু। নইলে ওদের সঙ্গে তোমাকে আর দিয়াকেও তো ভয় দেখাত। সেসব তো কিছু…
ভীষণ ভয়ে মৃত্তিকা দীপায়নের মুখে হাত চেপে ধরল। ‘এসব অলক্ষুণে কথা বোলো না প্লিজ।’ মুখের ওপর থেকে মৃত্তিকার হাতটা সরিয়ে দিয়ে দীপায়ন বলল, ‘তাহলে পুলিশের কাছে চলো। প্রোটেকশন…’। ঝংকার দিয়ে উঠল মৃত্তিকা, ‘না না একদম না।’
-কেন?
উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ল দীপায়ন
-না বলেছি না।
-তার মানে তুমিও ভয় পেয়ে গুটিসুটি মেরে বসে থাকবে আর আমিও কলেজ-ফলেজ ছেড়ে দেব তাই তো? এটাই সলিউশন।
কাঁদো কাঁদো মুখে অনেক কিছু বলতে চাইল মৃত্তিকা। কিন্তু পারল না। কপালে হাত দিয়ে বসে পড়ল। মুখে হাত চাপা দিয়ে কাঁদতে থাকে। খারাপ লাগল দীপায়নের। মৃত্তিকার কাঁধে হাত রেখে পাশে এসে বসল দীপায়ন। খুব নরম সুরে বলল, ‘দেখো, দুদিন বাদে আমাদের একমাত্র মেয়ের অন্নপ্রাশন। কত কেনাকাটা করেছ বলো তো। এখনও তো বাকি আছে। সেসব নিয়ে ভাবো। উল্টোপাল্টা কথা নিয়ে একদম ভেবো না। আমি আছি তো নাকি? তাছাড়া খবরে দেখলাম তো কেসটা গোয়েন্দা বিভাগের হাতে আছে। তারপরেও এত টেনশন কেন?”
অরুণাকে বেড়ালের ডাক শুনিয়েছে, সুস্মিতাকে অরুণার পায়ের কাটা আঙুল পাঠিয়েছে। কেন? কে করতে পারে এসব? মনের মধ্যে তোলপাড় চলছে মৃত্তিকার। ‘কী গো শুনছ আমার কথা?’ মৃত্তিকাকে ধরে ঝাঁকিয়ে দিল দীপায়ন। ব্যাপারটাকে হালকা করতে দীপায়ন আরও বলল, ‘তাছাড়া আমার মনে হয় এটা কোনও পাগলের কাজ। নইলে যাকে মারবে তাকে ফোন করে বেড়ালের ডাক শোনায়?’ দীপায়নের হাসি মৃত্তিকার মনে শুকনো লঙ্কার মতো চিরচিরে ভয়টাকে আরও বাড়িয়ে দিল।
-একদিকে ভালো হল জানো। আজ পুরুত মশাইকে ডেকে সব ফাইনাল করে ফেলব।
-কাকে ডাকবে?
-তুমি বলো। ওই কার্ডের দোকানের লোকটা যার কথা বললেন তাকে ডাকি? শিয়ালদায় নাকি ওনার নাম-ডাক প্রচুর। মিশ্রঠাকুর বলতে সব অজ্ঞান। তাছাড়া শিয়ালদা থেকে ফুলবাগান এমন কিছু পথ নয়। দুপুরে ডাকি? কী বলো?
-ডাকো।
মিনমিন করে জবাব দিল মৃত্তিকা।
বৃষ্টিতে পথ-ঘাট অনেকটাই ঝাপসা। তবু স্পষ্ট বোঝা গেল সাদা রঙের গাড়িটা বেরিয়ে এল গলি থেকে। ডিভাইডার দিয়ে রাস্তা ক্রস করে উল্টোফুটে চলে এল। খানিকটা যেতেই সিসিটিভি ক্যামেরার নজরের বাইরে। পাশের স্ক্রিনে উলটোফুটের সিসিটিভিটা গাড়িটাকে ধরে রেখেছে। কিন্তু সেটা খানিক গিয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। ওদিকের স্ট্রিট লাইটটা জ্বলে না। আরও বেশ কিছু গাড়ি এসে ঢেকে দিল সেই গাড়িটাকে।
-দুটো ক্যামেরাই একটু করে রিওয়াইন্ড করে পিছনে যাও তো।
কম্পিউটারে বসা ছেলেটি সেটাই করল যেটা স্বয়ম্ভু বলল।
-এবার একটু জুম কর ।
ফুটেজ জুম হল। ভালো করে দেখল স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। নম্বর প্লেট আগেই বোঝা গিয়েছিল। এখন গাড়ির মধ্যে বসে থাকা ড্রাইভার আর আরোহিণীর পোশাকের রং বোঝা না গেলেও মোটামুটি একটা ঝাপসা অবয়ব পাওয়া যাচ্ছে। ড্রাইভারের গায়ে চেক কাটা শার্ট। যাত্রী মহিলা যেটা পরে আছে সেটা আলাদা করে শনাক্ত করার বা খুঁটিয়ে দেখার প্রয়োজন নেই। পার্ক সার্কাসের রেল লাইনের ধারে, মর্গে ভালো করেই দেখেছে স্বয়ম্ভূ আর শিবাঙ্গী ।
-দেখি চালাও এবার।
স্বয়ম্ভু বলল। ছেলেটির আঙুলের চাপে থমকে থাকা স্ক্রিন চলতে শুরু করল।
-এ কী এটা তো মৌলালির ট্র্যাফিক মনে হচ্ছে ।
স্বয়ম্ভুর কথায় সম্মতি দিল শিবাঙ্গী ও ছেলেটি।
-মাঝে আর কোনও সিসিটিভি নেই। পাড়িয়া সেটাই বললেন।
শিবাঙ্গী জানাল।
-দেখি একটু জুম করো তো।
দুটো স্ক্রিনেই গাড়িটাকে সেন্টারে রেখে ছবি বড় করা হল। একটা ক্যামেরায় গাড়ির সামনে থেকে এবং আরেকটি ক্যামেরা রাস্তার উল্টোফুটে থাকার দরুণ গাড়িটাকে ডানদিক থেকে দেখা যাচ্ছে। স্বয়ম্ভু যেন স্ক্রিনের মধ্যে ঢুকে যাবে এবার। ‘শিবাঙ্গীইইই…’ স্বয়ম্ভু সুর টেনে হাঁকল।
-ইয়েস স্যার।
-পার্থক্যটা বুঝতে পারছ?
শিবাঙ্গী স্ক্রিনের কাছে মুখ নিয়ে এল। নম্বর প্লেট তো একই আছে। গাড়ির রংও সাদা। এরপর যেই ভিতরের দিকে চোখ পড়ল শিবাঙ্গীও থমকে গেল। বলে উঠল, ‘ড্রাইভারের ড্রেস পালটে গেছে!’
-রাইট। ছিল চেক শার্ট। হয়ে গেল কালো জোব্বা। যতদূর মনে হচ্ছে ওটা বোরখা জাতীয় কিছু। মুখ দেখার উপায় নেই কারণ মাস্কে ঢাকা
-এই কোভিডটা এসে অনেক অপরাধীরই সুবিধে হয়েছে স্যার। আগে মাস্ক পরে বেরোলে লোকে তাকে সন্দেহ করত। কিন্তু এখন এটাই নরমাল।
স্বয়ম্ভুর ঠোঁটে অল্প হাসি। অপরাধীর চালাকির কিছু সূত্র তো পেল অবশেষে! শিবাঙ্গী বলল, ‘তার মানে অপরাধী মেয়েই?’
-সেটা তো পরের প্রশ্ন। ঘোমটার আড়ালে কে যে খ্যামটা নাচছে সেটা এই মুহূর্তে বোঝার উপায় নেই। শুধু খটকা লাগছে ড্রাইভার পাল্টে গেল অথচ অরুণা কিছু বুঝল না? দিব্যি তো বসে আছে।
-নাকি বুঝেও কিছু বলার সুযোগ পায়নি!
-মানে?
স্বয়ম্ভুর ভুরু কুঁচকে গেল ।
-খেয়াল করুন স্যার, পিছনের সিটে মাথা হেলিয়ে বসে আছে অরুণা।
শিয়ালদা থেকে মৌলালি পাঁচ মিনিটও লাগে না। এইটুকু সময়ে কোনও মানুষ কী ঘুমিয়ে পড়তে পারে?
-কারেক্ট শিবাঙ্গী। আগে থেকেই গাড়িতে ক্লোরোফর্ম স্প্রে করা ছিল বা অরুণা ওঠার পর লুকিয়ে স্প্রে করা হয়েছে। ড্রাইভার তাই মুখে মাস্ক পরে আছে। যাতে তার ওপর কোনও প্রভাব না পড়ে। এক মিনিট, আবার পেছোও তো ক্যামেরাটা ।
-শিওর স্যার।
ছেলেটি রিওয়াইন্ড করল। স্ক্রিন থামিয়ে আবারও ভালো করে অবজার্ভ করল স্বয়ম্ভু। তারপর মৌলালির ফুটেজ ভেসে উঠল। সেটা দেখেই ভুরু দুটোর সঙ্গে ফর্সা কপালটাতে আরও কয়েকটা অতিরিক্ত ভাঁজ পড়ল স্বয়ম্ভুর। বলল, ‘শিয়ালদার গলি থেকে গাড়ি বেরোল সন্ধে সাতটা পঁয়ত্রিশ মিনিটে। মৌলালি এসে পৌঁছল প্রায় আটটা। যেখানে ডিস্টেন্স মাত্র পাঁচ মিনিটের বাকিটা শিবাঙ্গী নিজের মনে অঙ্ক মেলাবার মতো করে আওড়াল। ‘তার মানে যেখানে সিসিটিভি নেই সেই অন্ধকার জায়গাটেই যা হবার হয়েছে। ধরে নেওয়া হচ্ছে গাড়িটা দাঁড়িয়েছে। নইলে ড্রাইভার চেঞ্জ হবে কী করে?”
-অপরাধীও নিশ্চয়ই অরুণার সামনেই আসল ড্রাইভারকে ক্লোরোফর্ম স্প্রে করে সেন্সলেস করবে না! কাজটা যদি অরুণার আড়ালেই হয়ে থাকে তাহলে অরুণা তখন কোথায় ছিল?
-তমাল একটা কথা বলেছিল স্যার।
-কী বলো তো?
-অরুণা প্রতি শনিবার সুরিলেনের কাছে একটা মন্দিরে যেত। সম্ভবত সেটা শনি ঠাকুরের মন্দির।
-রাইট।
স্বয়ম্ভু লাফিয়ে উঠে বলল, ‘সেদিন তো শনিবারই ছিল। তাহলে কী ও মন্দিরেই…!’
-আর ঠিক সেই সুযোগে অপরাধী যা করার করেছে। অরুণা এমনিতেই রেগেছিল। কষ্টও পাচ্ছিল খুব। তাই ফারদার গাড়িতে ওঠার সময় আর ড্রাইভারকে খেয়াল করেনি। আমরাই বা কত ড্রাইভারের মুখ মনে রাখি বা দেখি ।
-ওফফফ শিবাঙ্গী, প্রদ্যুৎকে যদি তোমার এই পারফর্মেন্সটা দেখাতে পারতাম!
এমন পরিস্থিতিতেও ইয়ার্কি মারা এ একমাত্র স্বয়ম্ভু সেনের পক্ষেই সম্ভব। এই মানুষটা তাৎক্ষণিক আবেগে ভাসে না। কোনও বিষয় নিয়ে ডুবে থাকলেও চতুর্দিকে চোখ, কান ও সঙ্গে চেতনাচক্ষুটিও খোলা থাকে। শিবাঙ্গী লজ্জা পেয়ে আড়চোখে কম্পিউটারে বসা ছেলেটির দিকে তাকাল। সেও ফিক ফিক হাসছে। ফাজলামি সেরে আবার সিরিয়াস মুডে স্বয়ম্ভু। বলল, ‘তবে অবাক করা ব্যাপার ড্রাইভারকে যখন ক্লোরোফর্ম স্প্রে করল সে কোনও চিৎকার করল না?’
-হয়তো রুমালে করে মুখে চেপে ধরেছিল ।
-সেটা ওই রাস্তায় হওয়া বেশ শক্ত। কারণ রুমালে ক্লোরোফর্ম নিয়ে মুখে চাপলে অন্ততপক্ষে অপরাধীকে চার থেকে পাঁচ মিনিট চেপে ধরে থাকতে হবে। নইলে সে অজ্ঞানই হবে না। ওই যে সিনেমা, সিরিয়ালে দেখায় মুখে চেপে ধরল আর ধপাস করে সেন্সলেস ওটা জাস্ট গাঁজা। ওরকম হয় না।
-তাহলে ড্রাইভার?
-ড্রাইভারের চেনা কেউ নয় তো? দেখো তো পারফিউমের গন্ধটা কেমন বলে শোঁকাল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সে চেতনাশূন্য!
-অপরাধী খুব ভালো করে জানে কোথায় কোথায় সিসিটিভি আছে।
-একদমই শিবাঙ্গী। শুধু তাই নয়, অরুণার প্রতিটা মোমেন্টকে সে ফলো করেছে অনেক আগে থেকেই। নইলে এমন কঠিন পরিস্থিতিতে ঝোপ বুঝে কোপ মারা সম্ভব নয়। অরুণা তো রাস্তায় বেরোতে নাও পারত। বাপের বাড়ি নাও যেতে পারত ।
শিবাঙ্গী বলল, ‘স্যার, আমার কিন্তু তর্পণাকেই বেশি সন্দেহ হচ্ছে। এর সঙ্গে তমালও জড়িত বা জড়িত নয়। অজান্তেই অরুণার অনেক ইনফরমেশন তর্পণাকে সাপ্লাই করেছে। ভাবতেও পারেনি তার স্ত্রী খুন হয়ে যাবে!’
স্বয়ম্ভু চোখ বুজে খানিক ভেবে ছেলেটিকে বলল, ‘এরপরের ফুটেজগুলো চালাও তো।’
সকালে দিয়ার বাড়ি থেকে ঘুরে সুস্মিতাকে একটু কালীঘাটে যেতে হয়েছিল। শাড়ির গোডাউনে। কয়েকজনের শাড়ির অর্ডার আছে। সেগুলো কতটা এগোল সেটা দেখার জন্য। গোডাউন থেকে বেরোতেই শ্রাবণ মাসের চড়া রোদ এসে চিড়চিড়ে জ্বালা ধরিয়ে দিল। কালীঘাট থেকে গড়িয়াহাট যাবে সুস্মিতা। এই রোদে ক্যাব না ধরলেই নয়। মোবাইলে ক্যাবের অ্যাপটা খুলতে গিয়েও আঙুলটা আটকে গেল। উল্টোফুটে ছাই রঙের জামা পড়া একটা ছেলে একভাবে চেয়ে আছে সুস্মিতার দিকে। ভালো করে তাকাতেই ছেলেটি সিগারেট ধরাবার ভান করল। সকাল থেকেই সুস্মিতার বুকের ভিতরটা ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করছে। সব সময়েই মনে হচ্ছে কে যেন ওকে ফলো করছে। এদিকে ছেলেটা তো একভাবে দাঁড়িয়েই আছে। ক্লিন শেভ মুখ। অনর্গল ধোঁয়া ছাড়ছে। ক্যাব বুক করতে গিয়েই অরুণার কথা মনে পড়ল। অরুণাও তো ক্যাবে উঠে বাড়ি ফিরছিল। সেই ক্যাবেই যা সর্বনাশ হবার হয়েছে। নাহ! অটোতে যাওয়া অনেক সেফ। কিন্তু কালীঘাটের মন্দিরের পিছনের রাস্তায় এই গোডাউন। সেখানে অটো ধরতে গেলে অনেকটা রাস্তা পায়ে হেঁটে মেন রোডে আসতে হবে। তাই সই। তবু একা একা ক্যাবে উঠবে না। সুস্মিতা হাঁটতে শুরু করল। কালীঘাট মন্দিরের পাশের সরু ঘিঞ্জি রাস্তাটা ধরল সুস্মিতা। দুপাশে পুজোর সামগ্রীর দোকান। এক পা করে এগোচ্ছে আর একজন করে হাঁক পাড়ছে, ‘দিদি এদিকে আসুন। এখানে চটি রাখতে পারবেন। মায়ের ডালা নিয়ে যান।’ কোনও কথাই সুস্মিতার কানে ঢুকছে না। সোজা তাকিয়ে হেঁটে চলেছে। ছেলেটা কী এখনও ফলো করছে? যেতে যেতে পিছন ফিরে একবার দেখে নিল। যে কয়েকজন লোক হাঁটাচলা করছে তাদের মধ্যে সেই ছেলেটি নেই। তাহলে কী সুস্মিতার মনের ভুল? গতরাতের ঘটনাই কী এমন হাবিজাবি ভাবাচ্ছে তাকে!
গলি থেকে বেরোতেই ডানহাতের দোকানগুলোয় যেন গোটা স্বৰ্গলোক নেমে এসেছে। কৃষ্ণ, কালী, মহেশ্বর, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, দুর্গা, তারা, যিশু, মাতা মেরি কে নেই! প্রায় সবাইকেই ডাকতে ডাকতে দ্রুত পায়ে হাঁটছে সুস্মিতা। হঠাৎ খেয়াল হল, উল্টোফুটে ডাবভর্তি ঠ্যালাগাড়ি, নানারকমের ফলের দোকানের আড়ালে কারও একটা চোখ খেয়াল রাখছে ওর ওপর। আরেকটু দু-পা এগোতেই বুকের মধ্যে প্রবল চাপ অনুভব করে সুস্মিতা। ওই তো সেই ছেলেটা। ছাই রঙের জামা। চড়া রোদে মাথাটা টলে গেল। এ কিছুতেই সুস্মিতার মনের ভুল নয়। দূর থেকে যেটুকু বুঝছে তাতে লোকটাকে কস্মিনকালেও দেখেনি সুস্মিতা। তাহলে লোকটা ফলো কেন করছে? নাকি খুনির পাঠানো কোনও লোক? উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষায় ওর ওপর নজর রাখছে। সুযোগ পেলেই অরুণার মতো সরিয়ে দেবে! ভাবতেই সারা শরীর কেঁপে উঠল। দরদর করে ঘাম নামছে মাথা থেকে পা পর্যন্ত। কী করবে ও এখন? প্রিয়াংশুকে ফোন করবে! ও তো এখন অফিসে। কিছু হলে ওই বা কী করবে? তখনই খেয়াল হল আগের দিন স্বয়ম্ভু সেনের কার্ড নিয়ে রেখেছিল। সেটা কী কাঁধের ব্যাগে আছে নাকি বাড়িতেই ফেলে এসেছে? রাস্তা থেকে ফুটপাথে উঠে একটু ছায়া দেখে দাঁড়িয়ে পড়ল সুস্মিতা। উল্টোফুটের লোকটার ভুরুতে ভাঁজ। সেও উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে চেষ্টা করছে সুস্মিতাকে
কার্ডটা পেয়েছে। সুস্মিতা তৎক্ষণাৎ স্বয়ম্ভুর নম্বরটা টাইপ করল। তিনবার রিং হতেই ওপার থেকে গলা ভেসে এল, ‘হ্যালো’।
-স্বয়ম্ভূ সেন বলছেন?
-বলছি।
-আমি সুস্মিতা বলছি। গতরাতে আমার ফ্ল্যাটে…
-হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। বলুন।
-খুব বিপদে পড়েছি স্যার। আমাকে বাঁচান ।
-কী বিপদ? কোথায় আপনি?
-একটা লোক সবসময় আমায় ফলো করছে।
-কীরকম দেখতে?
-গায়ে ছাই রঙের শার্ট। চাপা গায়ের রং।
-দাড়ি আছে না ক্লিন শেভ?
-ক্লিন শেভ ।
-আপনি কোথায়?
-কালীঘাটে ।
-কালীঘাটের কোথায়?
-ওই মন্দিরের দিক থেকে যে রাস্তাটা মেন রোডের দিকে গেছে ।
-বুঝেছি। আপনার ডানপাশে ঠাকুরের মূর্তি বিক্রি হচ্ছে তো?
-হ্যাঁ স্যার। আমি সেইদিকেই।
-আপনি ফোন রাখুন আর যেখানে দাঁড়িয়ে আছেন ওখানেই থাকুন । আমি কল ব্যাক না করা পর্যন্ত নড়বেন না ।
-ওকে স্যার।
সুস্মিতা ফোনটা কেটেই পাশের ফুটে দেখল। কাউকে দেখতে পেল না । ছেলেটা গেল কোথায়?
মিনিটখানেকের মধ্যেই স্বয়ম্ভু সেন রিং ব্যাক করল। প্রচণ্ড উত্তেজনায় দুহাতে মোবাইল ধরে কানে চেপে সুস্মিতা বলে উঠল, ‘হ্যাঁ স্যার!’
-চিন্তা নেই। ও আমাদেরই লোক। আপনার ওপর নজর রাখছে যাতে কোনও বিপদে না পড়েন।
সুস্মিতা যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে পেল। স্বয়ম্ভূ ‘রাখলাম’ বলতেই তড়িঘড়ি সুস্মিতা জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার স্যার স্যার, একটা কথা ৷’
-বলুন ।
-স্যার, বলছিলাম, খুনির নেক্সট টার্গেট কি আমিই?
-হতেই পারেন। তবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এসব কথা না বলাই ভালো। রাখলাম।
যেটুকু প্রাণ সে ফিরে পেয়েছিল সেটুকু মুহূর্তে কর্পূরের মতো উবে গেল। স্বয়ম্ভুকে যে একটা ধন্যবাদ জানাবে সে অবস্থা আর নেই। যতই পুলিশ নজর রাখুক, সময়ের কোন ছিদ্র দিয়ে যে শমন এসে হাজির হবে কেউ জানে না। তবু, আগের চেয়ে খানিকটা নিশ্চিন্ত হয়ে সুস্মিতা মেন রোডের দিকে হাঁটতে থাকল ।
