ম্যাও – ২৪

২৪

ত্রিদিবের মুখের সামনে একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিল বউটা। ‘এইটা একটু বিল করুন না।’ হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিল ত্রিদিব। ‘পেমেন্ট কীসে করবেন? ক্যাশে না কার্ডে?”

-ক্যাশে।

-ওকে।

প্যাকেট থেকে শাড়িটা বের করে দেখল ত্রিদিব। ‘একটাই নিলেন ম্যাডাম? আরও ভালো ভালো স্টক এসেছিল তো।’ পিঠের বিনুনিটা হাত দিয়ে টেনে বুকের ওপর ফেলে বলল, ‘হ্যাঁ দেখলাম। পরে আসব হাজবেন্ডকে নিয়ে 1 এখন এই ফুলকারিটাই থাক।’ ত্রিদিব হাসল। ‘বাইশ শো পঞ্চাশ ম্যাম ।’ মহিলাটি টাকা বের করছে তখনই ত্রিদিবের পাশে যে বসে সে এসে বলল,

‘এই ত্রিদিব, আবার তো খুন হয়েছে।’ ত্রিদিব চমকে তাকাল। ‘কোথায়?”

-গড়িয়াহাটে। বুটিক আছে মহিলাটির। ওই গোয়েন্দা স্বয়ম্ভু সেন, সে গেছে দেখলাম। রিপোর্টাররা তো যাচ্ছেতাই করে বলছে।

টাকা বের করতে করতেই ক্রেতা মহিলার হাত থেমে যায়। তিনি বলেন, কী নাম বলছে?’

-কার? দোকানের?

-না না যে খুন হয়েছে।

ত্রিদিব চুপ করে কী যেন ভাবে। দূর থেকে দু-তিনজন টিভির সামনে এসে দাঁড়ায়। চারপাশ থেকে উড়ে আসতে থাকে নানান মন্তব্য । -বলবেই তো। পুলিশগুলো একেকটা অপদার্থ ।

-সুস্মিতা।

-কী শুরু হল বলো তো।

-আরে সিরিয়াল কিলিং গো।

-সে তো বুঝেছি। কিন্তু করছেটা কে?

ক্রেতা মহিলাটির মুখ শুকিয়ে আসে। মুখটা যেন সে লুকোতে চাইছে। ত্রিদিব হাঁ করে খবর গিলছে। ডেডবডির ছবি একজনই তুলতে পেরেছে। তাও ব্লার করে দেখানো হচ্ছে। স্বয়ম্ভূ পুলিশবাহিনী নিয়ে ঢুকেই সবাইকে দোকান থেকে বের করে দিচ্ছে। কারা যেন স্লোগান দিচ্ছে, অপদার্থ কোলকাতা পুলিশ দূর হটো ।

-শুনছেন, আমার বিলটা একটু দিয়ে দিন না ।

ত্রিদিব সম্বিত ফিরে পায়। প্যাকেটটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে, ‘বিলটা ভেতরে আছে।’

-আচ্ছা।

প্যাকেটটা নিয়ে কোনওরকমে দোকান থেকে বেরিয়ে যায় মহিলাটি। ত্রিদিব আবার টিভির দিকে চায়।

ক্ষতবিক্ষত হয়ে লাশটা এখনও পরে আছে মাটিতে। ফ্ল্যাশের ঝলক থেকে থেকেই বুটিকের ছোট্ট ঘরটাকে উজ্জ্বল করে তুলছে। সুস্মিতার বিস্ফারিত চোখের ওপর ক্যামেরার আলো ঝলসে উঠলে মনে হচ্ছে কোনও প্রলয় রাতের বাজে পিশাচিনী গিলতে আসছে কাউকে। স্বয়ম্ভূ আর শিবাঙ্গী বুটিকে ঢুকতেই দেখল প্রিয়াংশু বসে আছে মাথায় হাত দিয়ে। ভাষাহীন পাথরমূর্তি। কিছুটা দূরত্বে বসে মীনাক্ষী কাঁদছে। দুজনের দিকে এক ঝলক দেখে নিয়েই ছোট ঘরটায় ঢুকে গেল। স্বয়ম্ভু আর শিবাঙ্গী। তবে ঘরে ঢোকার আগে স্বয়ম্ভূ দরজার কাছে একবার থমকে গেল। বুটিকের ছোট ঘরের দরজার পাশেই আরেকটা দরজা। সেখানে জল পড়ে আছে। সঙ্গে কয়েক ফোঁটা রক্ত। স্বয়ম্ভু সবার আগে হাতে গ্লাভস পরে নেয়। তারপর পাশের দরজাটা খুলতেই বুঝল এটা বাথরুম। ভিতরটা ভালো করে দেখে নিল। দরজা বন্ধ করে ছোট ঘরটায় ঢুকে গেল। তুহিনশুভ্র আগেই এসে গেছেন। সঙ্গে দুই শাগরেদ রোহিত ও সাত্যকি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছেন মৃতদেহ ও তার আশেপাশের জিনিসগুলো। স্বয়ম্ভুকে দেখেই তুহিন এগিয়ে এলেন। মুখে অবাক করা অভিব্যক্তি, ‘কী হল বলো তো স্বয়ম্ভু? খুনি দুম করে প্যাটার্ন চেঞ্জ করে ফেলল!”

-খুব সহজ। যেভাবে এতদিন খুনগুলো করছিল সেগুলো যথেষ্ট সময় সাপেক্ষ এবং তাতে ভিক্টিমের জায়গায় এসে করা সম্ভব নয়। তাকে তুলে নিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে সেটা করেনি ।

-কেন?

-ভয় পেয়ে গেছে।

তুহিনের চোখে চোখ রেখে বলল স্বয়ম্ভু। ‘ওই জন্যে এখানে এসে কোনওরকমে মেরে দিয়ে চলে গেছে। আসল উদ্দেশ্য ছিল সুস্মিতাকে মারা। তাছাড়া তমালের খুনটাও তো অন্যভাবে হয়েছে।’ তুহিন বললেন, ‘কিন্তু পায়ের চিহ্নটা আঁকতে ভোলেনি। তমালের ক্ষেত্রে সেটা করেনি।’ স্বয়ম্ভু হাঁটু মুড়ে বসে পায়ের তলাটা দেখতে থাকল। বিড়বড় করে বলল, ‘দুটো গোল! শিবাঙ্গী বলল, ‘দুটো গোলেরই মাঝে একটা করে গর্ত।

-এর মানে কী? কী বোঝাতে চাইছে?

তুহিন বললেন। স্বয়ম্ভু বলল, ‘কিছু একটা আঁকতে বা লিখতে চাইছে।’ -তা সেটা একবারে লিখলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। যত সব চ্যাংড়ামো দাঁড়িয়ে পড়ল স্বয়ম্ভু। বলল, ‘খেলা। চোর পুলিশ খেলা চলছে। খুনি বলছে এই যে আমি এখানে। দেখি তো ধরো কী করে!

-খুনির সাহস আছে। দিনদুপুরে দোকানে ঢুকে কুপিয়ে দিয়ে গেল?

তুহিনকে কিছু বলার আগেই কে যেন স্বয়ম্ভুর নাম ধরে ডেকে উঠল। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল প্রিয়াংশু। চোখ লাল। দুঃখ যখন আগুন হয়ে বেরোয় তখন এইরকম চোখ হয়। গালের ওপর শুকিয়ে যাওয়া জলের দাগ। ‘আপনারা নাকি চব্বিশ ঘণ্টা সুস্মিতার ওপর নজর রেখেছিলেন! কী সিকিউরিটি দিয়েছিলেন আপনারা? দিনের বেলা দোকানে লোক থাকা সত্ত্বেও খুনি এসে কুপিয়ে খুন করে ঝেড়ে মুছে চলে গেল। আপনাদের লোক কোথায়? বলুন। কোনও সিকিউরিটি দেননি। শুধু মিথ্যে বলে গেছেন। জাস্ট ঢপ। প্রচণ্ড রাগ আর তীব্র অসন্তোষ ঝরে পড়ে প্রিয়াংশুর গলা দিয়ে। স্বয়ম্ভু পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘তার আগে আপনি বলুন তো প্রিয়াংশুবাবু, আপনি একটু আগে কীসের ভরসায় আমাদের বলে এলেন যে সুস্মিতার কিচ্ছু হবে না? যে রাগত চক্ষু স্বয়ম্ভুর দিকে হেনে দাঁড়িয়েছিল প্রিয়াংশু, সেটা নিমেষের মধ্যে নেমে গেল। ‘এখনও চোখ নামিয়ে নেবেন? এক এক করে সবাই শেষ হয়ে যাচ্ছে আর আপনি মুখে কুলুপ এঁটে আছেন।

-আপনারা কী করবেন না করবেন জানি না, আমি ভেবেছিলাম সুসকে আমি প্রাণ দিয়ে আগলে রাখব। তাই ও কথা বলেছিলাম ।

-আপনার বান্ধবীর লাশের সামনে দাঁড়িয়েও মিথ্যে বলছেন প্রিয়াংশুবাবু।

প্রিয়াংশু মুখ ফিরিয়ে ঘরের বাইরে চলে গেল। স্বয়ম্ভুও বাইরে এল। পুলিশের যে লোকটি সুস্মিতার ওপর নজর রেখেছিল সে মুখ ছোট করে দাঁড়িয়েছিল। স্বয়ম্ভূ এসে মীনাক্ষীর সামনে দাঁড়াল। মীনাক্ষী ভয়ে ভয়ে জল ভরা চোখ তুলে তাকাল। স্বয়স্তু জিজ্ঞেস করল, ‘কী নাম?’ -মীনাক্ষী সাহা।

-আপনি এই দোকানে কাজ করেন?

-হুম ।

-কতদিন?

প্রশ্নটা করা মাত্র ঘর থেকে একজন বেরিয়ে এসে জানাল সুস্মিতার মোবাইল পাওয়া গেছে। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীকে ইশারা করে ফোনটার ব্যবস্থা করতে বলে। ‘হ্যাঁ মীনাক্ষী বলুন, কতদিন কাজ করছেন?” -আড়াই বছর।

-খুনটা যখন হয় তখন আপনি ছিলেন?

মুখটা আরও কাঁদো কাঁদো হয়ে ওপর নীচে নড়ে মীনাক্ষীর। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করে, ‘তার মানে আপনি খুনিকে দেখেছেন।’

গ্রাস করে। উত্তর দেবে কি দেবে না ভাবতে ভাবতেই স্বয়ম্ভু বলে, ‘চুপ করে থাকবেন না। আপনি খুনিকে দেখেছেন?” -দেখেছি।

একটা চোরা ভয় মীনাক্ষীকে

-দেখলে চিনতে পারবেন?

একটু ভাবল মীনাক্ষী। তারপর বলল, ‘না।’ নড়ে বসল স্বয়ম্ভু, ‘কেন? মুখ ঢাকা ছিল?’

-মাস্ক পরা ছিল।

আবার সেই মাস্ক। স্বয়ম্ভু চোখটা বুজে ফুলে ওঠা রাগটাকে সংবরণ করে নেয়। মীনাক্ষী বলে, ‘তবে মনে হল গালভর্তি ঠাসা দাড়ি। বেশ অনেকটা।” -কাঁচা না পাকা?

-কাঁচা বোধহয়। পাকাও থাকতে পারে।

-মানে কাঁচাপাকা মেশানো।

-আসলে রেনকোটে মাথা থেকে ঢাকা ছিল। তার নীচে পুলিশের টুপি চোখে সানগ্লাস।

-কী রঙের রেনকোট?

-ডিপ সবুজ। না না, পার্পেল মনে হল। আসলে আমি তো ওইভাবে দেখিনি তাই সঠিক করে বলাটা …

স্বয়ম্ভু মনে মনে পার্পেল রংটাকেই সঠিক হিসেবে ধরে নিল। ‘সিসিটিভি আছে না?’

-হ্যাঁ। তবে শুধু এই ঘরেই আছে।

-আজ সকাল থেকে সব ফুটেজ চেক করব।

-দেখাব?

-হুম। তবে তার আগে এই শুভায়ূ…

যে লোকটিকে স্বয়ম্ভু ফিট করেছিল সুস্মিতার ওপর নজর রাখতে সে দু-পা স্বয়ম্ভুর দিকে এগিয়ে এল। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল সে কাউকে দেখেছে কিনা ।

-সকাল থেকে তিন-চারজনই এসেছিল। তার মধ্যে একজন তৰ্পণা ।

-তৰ্পণা!

মীনাক্ষীর দিকে তাকাল স্বয়ম্ভু, ‘তর্পণা কখন এসেছিল?’ মীনাক্ষী বলল, ‘এগারোটা-সাড়ে এগারোটা হবে।’ স্বয়ম্ভু কী যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘সুস্মিতা দোকানে ছিল?’

-হ্যাঁ ।

-কী কথা হয়েছে ওদের মধ্যে জানেন কিছু?

-অন্যান্যবার তর্পণা ম্যাম এলে ওই ঘরটায় ঢুকে যান। দিদিও যেতেন। তখন আমাদের ওই ঘরে যাওয়া বারণ ছিল।

-আমাদের মানে? এখানে কী আরও কেউ আছেন? -হ্যাঁ। এই দোকানে কর্মচারী বলতে আমি আর পিয়ালী । -তিনি কোথায়?

-ওর শরীর খারাপ। দুদিন ধরে আসছে না।

-থাকেন কোথায়?

-কবরডাঙ্গার দিকে ।

-কবরডাঙ্গা!

আরও দুবার জায়গায় নামটা চোখ বুজে আওড়ে নিয়ে শিবাঙ্গীকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই শিবাঙ্গী, এই কেসে কবরডাঙ্গায় কে থাকত বলো তো?’ শিবাঙ্গীর সপাট জবাব, ‘অরুণার ক্যাব ড্রাইভারের গাড়ি কবরডাঙ্গা থেকেই পাওয়া গেছিল ।’

-রাইট রাইট।

ঝট করে মীনাক্ষীর দিকে ঘুরে স্বয়ম্ভূ বলল, ‘পিয়ালীর ডিটেলস আমার চাই। অ্যাড্রেস, ফোন নম্বর সব।’ মীনাক্ষী সম্মতি জানাল। স্বয়ম্ভু প্রশ্ন করল, ‘সুস্মিতার সঙ্গে তর্পণার সম্পর্ক কেমন ছিল?’

-তর্পণা ম্যাম তো সব সময় হাসিমুখেই আসতেন। কিন্তু দিদি খুব একটা খুশি হত বলে মনে হয় না। মাঝেমধ্যে বেশ বিরক্তও প্রকাশ করতেন। -কতদিন অন্তর অন্তর আসেন তর্পণা ম্যাম?

-কোনও ঠিক নেই। কোনও মাসে দুবার এলেন। আবার দু-তিন মাস এলেনই না। তবে এর মধ্যে উনি দু-তিনবার এসেছেন।

-এর মধ্যে মানে কতদিনের মধ্যে?

-এই সাত-আটদিনে।

-হুম। উনি যখনই আসেন তখনই শাড়ি কেনেন?

-না না। কখনও নতুন কিছু এলে দেখে যান। ইচ্ছে হলে কেনেনও।

-আজ কি উনি শাড়ি কিনেছেন?

-না। উনি এলেন। বললেন, গতদিন নাকি ওই ঘরে একটা রানি কালারের শাড়ি দেখেছিলেন। সেটা আরেকবার দেখবেন। বলে নিজেই পাশের ঘরে চলে গেলেন। শাড়ি ঘেঁটেঘুটে দেখলেন। তারপর বললেন, উনি যেটা খুঁজছেন সেটা দেখতে পাচ্ছেন না। তারপর চলে গেলেন।

-উনি যখন ও ঘরে ছিলেন তখন কী আপনারা কেউ গিয়েছিলেন ওঁর সঙ্গে?

-না স্যার। দিদিও জাননি। ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল দিদি।

-তাহলে -তর্পণা ম্যাম বেরিয়ে যাবার পর দিদি ও ঘরে গিয়েছিল। নিল তো নাই । সব ঘেঁটে দিয়ে চলে গেল বলে গজগজ করতে করতে বেরিয়ে এসেছিল। তাই ভাবলাম ।

শাড়ি ঘেঁটেছেন না কী করেছেন জানলেন কী করে?

-শুভায়ূ, বলো এবার তুমি আর কী দেখেছ?

-স্যার, আমি উল্টোফুটেই দাঁড়িয়েছিলাম। তখন বৃষ্টি পড়ছে। সাড়ে

তিনটে বেজে গেছে। একটা লোক রেনকোট পরে দোকানে ঢুকল । -কীসে এসেছিল?

-হাঁটতে হাঁটতে।

স্বয়ম্ভুর চোখ ছোট হয়ে এল। শুভায়ু বলল, ‘তারপরেই দেখলাম উনি (মীনাক্ষী) বেরিয়ে এসে কাকে যেন ফোন করলেন। তারপর যথেষ্ট রিল্যাক্স মুডে বেশ অনেকক্ষণ ধরে গল্প করছিলেন। আমার অস্বাভাবিক কিছু লাগেনি। প্রায় পনেরো মিনিট বাদে লোকটা একটা প্যাকেট হাতে নিয়ে বেরিয়ে এল। এনার সঙ্গে কী যেন কথা বলল। তখনই আমার একটু খটকা লাগল। রেনকোটের বুকের বোতাম খোলা। ভিতরে খাঁকি জামাকাপড় দেখা যাচ্ছে। পুলিশের মত। তারপর লোকটা এই ফুটে আসতেই আমি তাকে ধরি। আমার সন্দেহ হয়, জিজ্ঞেস করি, কোন থানা? লোকটা হেসে ফেলে। -মুখে মাস্ক ছিল?

-হ্যাঁ স্যার। তবে চশমা, মাস্ক সব খুলে দেখেছি। নাকে কাছে একটা বড় আঁচিল। সেটা নকল। লোকটাই বলল। মধূসূদন মঞ্চে আজ নাকি নাটকের শো আছে। সেখানে ও দারোগা। তাই গায়ের পোশাকটাও খাঁকি। বলল নকশাল আন্দোলনের নাটক।

-খোঁজ নিয়েছিলে সত্যি কিনা?

-না স্যার।

স্বয়ম্ভু চুপ করে শুভায়ুর মুখের দিকে চেয়ে রইল। শুভায়ু চোখ নামিয়ে নিল। শিবাঙ্গীর দিকে একবার তাকাতেই সে বুঝল স্যার এবার ঠিক কী করতে বলছেন। শিবাঙ্গীও চোখের ইশারায় সম্মতি জানিয়ে একটু কোণের দিকে চলে গেল। স্বয়ম্ভু আবার শুভায়ুকে জিজ্ঞেস করল, ‘হাতের প্যাকেটে কী ছিল?’

-নতুন শাড়ি। ওদের নাটকে লাগবে। এখান থেকেই নাকি নাটকের সব ড্রেস যায়।

সঙ্গে সঙ্গে মীনাক্ষী বলে উঠল, ‘সেকি! আমাদের এখান থেকে কোনওদিন কোনও নাটকের ড্রেস যায়নি তো।’

উত্তরটা স্বয়ম্ভু দিল ‘সেটাই স্বাভাবিক। বুটিকে কাপড়ের দাম এমনিতেই হাই। তার ওপর কোলকাতায় নাটকের দল বুটিক থেকে নতুন শাড়ি নেবে ড্রেসের জন্য এমন বড়লোক নাটকের দল কমই আছে। যেগুলো আছে সেখানে অভিনেতাকে তার ড্রেস বুটিকে এসে নিয়ে যেতে হয় না। ড্রেসার আসে।’

মীনাক্ষী আরও বলল, ‘আমিও প্যাকেটটা দেখেছি। ভাবলাম ম্যাডাম দিয়েছেন বা উনি কিনেছেন বোধহয়।’

-আপনি বেরিয়ে গিয়েছিলেন কেন?

যা হয়েছিল সেটাই বলল মীনাক্ষী।

-লোকটা চলে যাবার কতক্ষণ পর আপনি দেখলেন?

মীনাক্ষী বলল, ‘প্রায় পনেরো-কুড়ি মিনিট তো হবেই। পুলিশটা বলে গ্লে লালবাজারের সঙ্গে দিদির কল চলছে। দিদিই বারণ করেছে ডিস্টার্ব করতে। কিন্তু অনেকক্ষণ হয়ে যাবার পরেও দিদির কোনও গলার আওয়াজ পাচ্ছিলাম না। কল চললে একটু কিছু তো আওয়াজ পাওয়া যাবে। আমি প্রায় দু-তিনবার দরজার পাশ থেকে গিয়ে ঘুরে এসেছি। একদম চুপচাপ সব। তারপর বাধ্য হয়েই দরজায় নক করি। দেখলাম তাতেও সাড়া নেই। আমার কেমন যেন ভয় করতে শুরু করল। আমি বাইরে থেকে লকটা টানতেই দরজা খুলে গেল। আর তারপরেই…।’ বীভৎস দৃশ্যটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই চোখ বন্ধ করে ফেলল মীনাক্ষী। এতক্ষণে ঘর থেকে তুহিনশুভ্র আর দুই শাগরেদ বেরিয়ে এসেছে।

-সিসিটিভিটা দেখব একবার।

স্বয়ম্ভূ বলল। মীনাক্ষী মাটিতে পাতা গদি থেকে উঠে কম্পিউটারের কাছে গেল। ইতোমধ্যে তুহিন এসে বললেন, ‘পায়ের ছাপ পাওয়া গেছে। আই মিন জুতোর।’ দোকানটার চারপাশ ভালো করে নিরীক্ষণ করতে করতে স্বয়ম্ভু বলে, ‘আট নম্বর জুতো তো?’

-একদমই তাই।

-বাথরুমের সামনে দু-ফোঁটা রক্তও পড়েছিল।

-আততায়ী বাথরুমে গিয়ে ছুরি থেকে রক্ত ধুয়েছে এটা নিশ্চিত। তবে গায়ে কী ওর রক্ত লাগেনি! রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরল কী করে?

-ওই ঘরে এক্সট্রা একটা শাড়ি পড়ে আছে। রক্তমাখা। সেটাকে মুখে, গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নেয়। তার ওপর গায়ে রেনকোট। সেখানে যা রক্ত সেটা বাথরুমে গিয়ে ধুয়ে নেয়। এই শুভায়ু, তুমি যখন দেখেছ তখন প্রচুর জল ঝরছিল তো রেনকোট থেকে?

-হ্যাঁ স্যার।

-কিন্তু বৃষ্টি নিশ্চয়ই হচ্ছিল না।

-না। তখন থেমে গিয়েছিল।

-তাহলে পনেরো মিনিট আগে যে লোকটা দোকানে ঢোকে। এসির হাওয়াও খায়। পনেরো মিনিট পরেও সেই লোকটার রেনকোট দিয়ে ঝরার মতো জল থাকে কী করে? তার থেকেও বড় কথা যে ঘরে খুন হল সে ঘরে অত জল ঝরেনি যতটা বাথরুম থেকে বাইরের দরজার দিকের অংশটায় পড়ে আছে।

মীনাক্ষী ডাকে। সকলেই সিসিটিভি দেখতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু তখনই স্বয়স্তুর ফোনটা বেজে ওঠে। হাতে নিয়েই একটু থমকে সরে যায় স্বয়ম্ভু। ‘ইয়েস স্যার।… ইয়েস স্যার… আমি ওখানেই আছি।’ এরপর খানিকক্ষণ একদম নীরব। স্বয়ম্ভুর মুখের ভাবগতিক খুব একটা ভালো ঠেকে না তুহিনশুভ্রর। অত্যন্ত নরম স্বরে ‘শিওর স্যার’ বলে মোবাইলটা পকেটে পুরে রাখে স্বয়ম্ভু। তুহিনের চোখে চোখ পড়তেই স্বয়ম্ভু বোঝে তুহিন কিছু একটা আঁচ করেছেন। দু-পা এগিয়ে এসে নিজেই বলে স্বয়ম্ভু, ‘জয়েন্ট সিপি। কাল সকাল দশটায় দেখা করতে বলেছেন ।

-মেঘ না রৌদ্র?

-আম্ফানের পূর্বাভাস।

বলেই মীনাক্ষীকে বলে, ‘কই দেখি। চালান ।

‘রবীন্দ্রনাথের শিবাঙ্গী ফোন রেখে এগিয়ে এসে বলে, ‘স্যার মধুসূদন মঞ্চে আজ কোনও নাটক হচ্ছে না। ডান্স ড্রামা হচ্ছে, চণ্ডালিকা।’ স্বয়ম্ভু বলে, লেখা চণ্ডালিকাই হচ্ছে তো নাকি এখনকার কারও লেখা?’ -বাইশে শ্রাবণ উপলক্ষে হচ্ছে যখন রবীন্দ্রনাথেরই হবে।

-না ভাবলাম এখনকার কারও লেখা হলে হয়তো সেখানে দারোগার কোনও চরিত্র আছে! তাই ৷

শিবাঙ্গী আড়চোখে শুভায়ুর দিকে তাকাল। মুখটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে।

সকাল দশটা আটত্রিশে এক মহিলা দোকানে ঢোকেন। প্রায় পঁচিশ মিনিট ধরে শাড়িগুলো উল্টেপাল্টে দেখেন। তারপর একটা কেনেন। এগারোটা বারোতে বেরিয়ে যান। এর পরের জনই তর্পণা মিত্ৰ। সময় এগারোটা সাতাশ। ঢোকেন, মীনাক্ষীর সঙ্গে হেসে কথা বলেন। সুস্মিতার দিকে তাকিয়ে কী যেন বললেন। সুস্মিতা ছোট করে একটা উত্তর দেয়। তারপর তর্পণা একাই পাশের ঘরে ঢুকে যান। এগারোটা বত্রিশ। ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন তর্পণা। তারপর আরও দু-তিনটে কথা। বেরিয়ে যান। দুপুর একটা ষোলো নাগাদ একজন অনলাইন ডেলিভারি পার্টনার আসে। খাবার ডেলিভারি করে চলে যায়। তার পরেরজনই সেই পুলিশ। এতক্ষণ মীনাক্ষী আর শুভায়ু যা যা বলেছে সেই অনুযায়ী ভিডিয়োটা চলতে থাকে। পনেরো মিনিট বাদে লোকটিকে স্মার্টলি দরজার দিকে যেতে দেখে স্বয়ম্ভু বলে ওঠে, ‘পজ পজ।’ মীনাক্ষী থামায় ভিডিয়ো।

-জুম করো হাতের দিকে।

মীনাক্ষী সেটাই করে। ক্যামেরায় ডানদিকটা আসছিল আততায়ীর। ডানহাতটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কবজি পর্যন্ত বেগুনি রেনকোটের হাতা। তারপর হাতের পাতাটা উন্মুক্ত। স্বয়ম্ভূ ভিডিয়োটাকে পিছিয়ে লোকটির দোকানে ঢোকার সময়ে নিয়ে যায়। হাতের ওপর জুম করে শুভায়ুকে ডাকে । পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে তুহিন, শিবাঙ্গী, প্রিয়াংশু। স্বয়ম্ভু বলে, ‘হাতের রংটা খেয়াল কর শুভায়ু। তোমার বলা অনুযায়ী বেশ কালো। এবার লোকটার বেরিয়ে যাবার সময়ে হাতের রংটা খেয়াল করো। মীনাক্ষী ফরোয়ার্ড করুন তো একবার।’ সবাই দেখে বেরিয়ে যাবার সময় হাতের রংটা আগের চেয়ে অনেকটাই পরিষ্কার। মুখের রঙের তুলনায় হাতের রংটা বেশ ফর্সা লাগছে।

-বুঝতে পারলে শুভায়ু?

শুভায়ু মিউ মিউ করে বলল, ‘ওটা রং ছিল!’

-লোকটা তো বলেইছিল, সে মেক আপ করে আছে। অভিনেতা। তার শো আছে। তবু তোমার স্ট্রাইক করল না একবারও?

শুভায়ুর মাথা নিচু। প্রিয়াংশুর চোয়াল শক্ত। পারলে শুভায়ুকে কেটেই ফেলে। কোমরের পাশে হাত দুটোকে শক্ত মুঠো করে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ এই লোকটার অপদার্থতার জন্য সুস্মিতা অকালে চলে গেল। নৃশংসভাবে।

-এক মিনিট, আমায় একটা জরুরি ফোন করতে হবে। স্বয়ম্ভু চেয়ার ছেড়ে উঠে গেল। বাইরে যেতে গিয়েও থমকালো। রিপোর্টার উপচে পড়েছে। বাইরে স্লোগান হচ্ছে পুলিশের বিরুদ্ধে। এদিকে একটা ফোন করা ভীষণ প্রয়োজন। বাধ্য হয়েই লাশ পড়ে থাকা ঘরে আবার ঢুকতে হল। মোবাইলের স্ক্রিন আনলক করে একটা নম্বর ডায়াল করে। ওপার থেকে কেউ একজন ফোন তোলে। স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করে, ‘কোথায় আছ?’

ফোন সেরে বাইরে বেরিয়ে এসেই স্বয়ম্ভু বলে, ‘আচ্ছা এই ঘরে কোনও সিসিটিভি নেই না?’ মীনাক্ষী বলে, ‘না স্যার।’

-হুম। এদিকে তৰ্পণা এসেছিল কিন্তু শাড়ি কেনেনি। তাই তো? -হ্যাঁ স্যার।

-সুন্দর। চলুন এবার যাওয়া যাক।

-স্যার একটা কথা ছিল।

মীনাক্ষী বলে উঠল। স্বয়স্তু ঘুরে তাকাল, ‘বলুন ।

-যে এসেছিল তার বাঁ হাতের চেটোতে একটা সেলাইয়ের দাগ আছে।

বুটিকের বাইরে বেরোতেই কান জ্বালিয়ে দেওয়া প্রশ্নের সুনামি থেকে বাঁচিয়ে পুলিশি প্রহরায় কোনওরকমে স্বয়ম্ভূ, শিবাঙ্গী, তুহিনশুভ্র একটা গাড়িতে উঠে গেল। আরেকটা গাড়িতে তুহিনের দুই জুনিয়র রোহিত আর সাত্যকির সঙ্গে শুভায়ু উঠে পড়ল। জনপ্লাবন কাটিয়ে দুটো গাড়ি বেরিয়ে গেল। সুস্মিতার ক্ষতবিক্ষত লাশটাও চাদরে ঢেকে বের করা হল। স্বয়ম্ভুর গাড়ি ছুটল লালবাজারের দিকে। তুহিনশুভ্র জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার খাস চালকটি কোথায়?’ স্বয়ম্ভুর মাথায় হাজারও প্রশ্নের ভিড় ঠেলে কথাটা খুব ক্ষীণ হয়ে প্রবেশ করল। তাই সম্বিত ফিরতেই ‘অ্যাঁ’ বলে তুহিনশুভ্রের দিকে তাকাল। তুহিন প্রশ্নটা রিপিট করার আগেই শিবাঙ্গী উত্তরটা দিল, ‘তপনের খুব শরীর খারাপ। চারপাশে যা জ্বরজারি হচ্ছে সেরকমই কিছু একটা।’

-ভাইরাল!

-হ্যাঁ ।

স্বয়ম্ভু জিজ্ঞেস করল, ‘তুহিনদা কী বুঝছেন বলুন তো? এ তো দেখছি আমরা যেই একটা প্ল্যান করছি খুনি তার আগেই বাজিমাত করে দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। গোটা পুলিশ ডিপার্টমেন্টকে নাকের ওপর নাচাচ্ছে। সময়ই দিচ্ছে না।’

-সাহসটা ভাবো। খুনি খুব ভালো করেই জানে পুলিশের নজর আছে সুস্মিতার ওপর। তা সত্ত্বেও দিনেরবেলা গটগট করে হেঁটে এসে কুপিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল! পুলিশের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে একটুও ঘাবড়াল না। উপরন্তু হেসে পটাপট ঢপ দিয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল।

-এবার বাকি রইল মৃত্তিকা ।

শিবাঙ্গী বলল। স্বয়ম্ভু শিবাঙ্গীর দিকে তাকাল। ভাষাহীন চোখে প্রশ্ন করল, ‘অন্নপ্রাশনটা যেন কবে?”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *