২৭
বৃদ্ধার পক্ককেশে জানলা দিয়ে ঠিকরে পড়েছে সকালের আলো। পাখি ডাকছে। শ্রাবণের মেঘ এখানে ছাড়পত্র পায়নি বোধহয়। বেশ গরম। মাথার ওপর পাখা ঘুরছে। দুধ-চিঁড়ে খাচ্ছেন বৃদ্ধা।
–অ মা, ইনি একটু তমার সাতে কথা বলবেন ।
ছেলের গলা শুনে তাকালেন বৃদ্ধা। মুখের মধ্যে দু-চারটি দাঁতই অবশিষ্ট আছে। গলার শির ফুলে চামড়ার ওপর দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ‘ক্যাআআ 1?’ শুধোলেন বৃদ্ধা। মাঝবয়সী ছেলে বলল, ‘শহর থেকে এসচেন। সেই কলকাতা!’ বৃদ্ধা এবার চোখ তুলে শহরের বাবুকে দেখার চেষ্টা করলেন । সব ঝাপসা। চিঁড়ের বাটিটা সামনের টেবিলে রেখে বিছানায় বালিশের পাশে শিরাফোলা হাত দিয়ে হাতড়াতে থাকেন। ছেলেই চশমাটা খুঁজে মায়ের চোখে পরিয়ে দেয়। এবার পষ্ট দেখতে পাচ্ছে শহরের বাবুকে।
-কী চাই?
-একটু কথা বলব মাসিমা ।
-কী ব্যাপারে?
বৃদ্ধার বয়স হলেও কানে খাটো নন। স্বয়ম্ভুর বলা কথাগুলো একবারেই কানে গেছে। ‘শ্রীদেবীর ব্যাপারে।’ নিমেষে পালটে গেল বৃদ্ধার মুখ। কুঞ্চিত চামড়ার ওপর অজস্র বলিরেখার মতো আরও কুঞ্চন ফুটে উঠল। বৃদ্ধার ছেলে স্বয়ম্ভুকে বেতের মোড়া এগিয়ে বসতে বলল।
-মাসিমা, আপনি যা যা জানেন সব বলুন। শ্রীদেবী কেমন ছিল? কী করত?
-এতকাল পরে আবার কেনে খুঁচাতে এলে বাছা?
-খুব দরকার মাসিমা। এটা না জানলে অনেক মানুষের প্রাণ চলে যাবে। বৃদ্ধার চোখদুটো যেন চকচক করে উঠল। স্বয়ম্ভুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে জানলার বাইরে তাকালেন বৃদ্ধা। অনেকরকমের গাছের ছায়ায় ঢাকা জায়গাটায় ধুপ ধাপ শব্দ হচ্ছে। সামনের টেবিলের ওপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন, ‘অ্যাই, ক্যা র্যা? ক্যা?’ চিৎকার করে উঠলেন বৃদ্ধ মহিলাটি। নড়বড়ে শরীর নিয়ে এগিয়ে গেলেন জানলার দিকে। স্বয়ম্ভু অবাক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধাকে ধরবার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। বৃদ্ধা তার আগেই জানলার লম্বা লম্বা লোহার গ্রিল ধরে চ্যাঁচ্যাঁতে লাগলেন, ‘তুই আবার এসচু মুকপুড়ি? নাম বলচি। নাম ।’
আমবাগানটা খিলখিলে হাসিতে ভরে উঠেছে। বুড়ি যত চিৎকার করতে করতে এগিয়ে আসে, ডালের ওপর ঠ্যাং ঝুলিয়ে সেই মেয়ে তত হেসে কুটোপাটি যায়। বৃদ্ধা একসময় আমগাছটার তলায় এসে হাতের লাঠি মাথার ওপর তুলে দেখিয়ে চ্যাঁচ্যাঁতে থাকে। ‘দাঁড়া তোর মাকে বলচি। আদ্দামড়া ধ্যাতালা মেইছানা। ল্যাখাপড়া চুলায় দিয়ে গাছে উঠেচু? আমার সাদের আমগুলার পিণ্ডি চটকাচ্চু?” কোঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে গাছের ডাল ধরে সেই মেয়ের কী হাসি। বুড়িকে আরও রাগিয়ে দিতে গান ধরল, ‘কে বলে ঠাকমা তোমার বয়স পেরিয়ে গেছে আশি! মনে তো হয় না দেখে তোমায় দুটি দাঁত বাঁধানো হাসি।’
– তুই একবার মাটিয়ে পা দে ছেমড়ি। তাপর দেকবি বাঁধানা দাঁতের জোরটা কত। গাচের ডাল দিয়ে মেরে তোর দাঁতকপাটি যদি না ফেলেচি 5…
কথা শেষ হতে না হতেই এক লাফে মাটিতে ল্যান্ড করল মেয়েটি। ঝাঁকড়া চুলগুলো মুখের সামনে থেকে সরিয়েই টপাটপ আম কুড়িয়ে নিল। কিন্তু সে বুড়ি লাঠি তুলে তাড়া করেই চলল। এক সময় বাগান ছেড়ে ছুট্টে পালিয়ে গেল ঝাঁকড়াচুলো দামড়া মেয়ে। বুড়ি হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
তুডুক তুডুক লাফাতে লাফাতে বাড়িতে ঢুকেই থমকে গেল মেয়েটা। ছিপছিপে চেহারায় গালে হালকা দাড়ি ওঠা ছেলেটা চোখ পাকিয়ে ভুরু কুঁচকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘সরযু ঠাকমা কেন চ্যাঁচাচ্ছিল রে?’ মেয়েটি আবার তুডুক তুড়ক লাফিয়ে উঠে ঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলল, ‘মাথার ব্যামো হয়েছে।’
-ব্যামো সরযু ঠাকমার নয়। তোর আছে। জন্ম থেকে ৷
মেয়ে এমন পাজি, টুক করে গলা তুলে রান্নাঘরের দিকে আড়চোখে চেয়ে বলে উঠল, ‘ও মাআআআ, দ্যাকো আমার জম্ম তুলে কথা বলছে তপাদাআআআ।’
-ভুলটা কী বলেচে শুনি? পাগলিকে পাগলি বলেচে বেশ করেচে।
মা নয়, তিন বছরের ছোট গ্যাঁড়া ভাইটা ধুপধাপ করে বেরিয়ে এল ঘর থেকে। ‘এই তোকে কে কথা বলতে বলেচে রে? একে রামে রক্ষে নাই তায় আমার সুগ্রীব দোসর।’ তপার দিকে তাকিয়ে খ্যাঁকখ্যাঁক করে বলল মেয়েটা, ‘ভালোই তো দলে টেনেছ দেখছি। বলি ভাইটা কার? আমার না তোমার?’ গুহা থেকে যেমন গরিলা বেরিয়ে এসে তাড়া করে, তেমনি করে মেয়েটির মা হুড়মুড় করে মুড়ো ঝ্যাঁটা হাতে বেরিয়ে এলো। লক্ষ্য তার এই বাচাল দামড়া মেয়ের ভূত ছাড়ানো। ‘হারামজাদি, শয়তান মেয়ে। -ও মা গো…
বলেই ছিপছিপে তপাকে ঘিরে গোল গোল করে ঘুরতে লাগল। মা তার চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করছে। ‘আজ বাদে কাল উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট বেরাবে আর এখনও তুই গাছে উঠে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ধ্যাতালাপনা করে বেড়াচ্চু?’ এবার ছোট ভাইটাকে ঘিরে গোল করে দৌড়তে শুরু করল মেয়েটা। ভাইও আরেক কাঠি, ‘সর, সরে যা। আমায় ধরেচিস কেন? দিদি ছাড়’ বলে সারা শরীর ঝাঁকিয়ে নাচিয়ে দিদিকে মায়ের হাতে তুলে দিতে চাইছে। ওদিকে তপা ‘ও কাকিমা, ছাড়ো ছাড়ো। আমি দেখছি। এত বড় মেয়েকে মেরো না। ছাড়ো।’ মহিলা হাঁফিয়ে ফুঁপিয়ে চোখ পাকিয়ে বলে উঠল, ‘অ্যাত বড়! কে বড় তপা? শ্রীদেবী? উ কুনুদিন বড় হবে নি। আমার হাড় মাস করে দিবে তাও শান্তি পাবেনি উ। আমাকে একবারে চিতায় তুলে তবে যদি শান্ত হয়।’ কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে জিভ বার করে পাড়ার লালুর মতো হাঁফাচ্ছে। তপা মশকরা করার একটা সুযোগ পেয়ে গেল। চোখের কোলে চলকে ওঠা হাসি নিয়ে বলল, ‘কী সব বলছ কাকিমা! শ্রীদেবীকে জন্ম দিয়েছ তুমি। তোমার মেয়ের কত্ত নাম বলো তো চারদিকে। সেলিব্রেটি।’
-হ্যাঁঅ্যাঅ্যাঅ্যা… ওই নামেই শ্রীদেবী। না আছে শ্রী, না আছে কিছু হাসলে তো মনে হয় শাঁকচুন্নিতে ঠাট্টা করছে। মাথার চুলগুলো দেখ, কাকের বাসা। পাখিতে কম্ম কত্তেও ঘেন্না পাবে। ছ্যাঃ!
মুড়ো ঝ্যাঁটাটা উঠোনের মধ্যে ঝপাস করে আছাড় মেরে ফেলে রান্নাঘরে ঢুকে গেল শ্রীদেবীর মা। শ্রীদেবীর দামালপনা, বাচালতা সব কিছু ঠাণ্ডা হয়ে যায় ওর রূপ নিয়ে কেউ কিছু বললে। ছোট থেকেই জেনে এসেছে ওকে দেখতে নাকি ভালো না। না, ঠিক ভালো নয় কথাটা বলা ঠিক হবে না। দাঁতগুলো বেশ সুন্দর সাজানো। কিন্তু হাসলে দুপাশের গালদুখানা ফুলে কেমন কুমড়োর মতো হয়ে যায়। লোকের মাথায় চুল থাকে না বলে কত কাণ্ড করে। সোজা চুল হলে পার্লারে গিয়ে কোঁকড়া করে সুন্দর হয়। শ্রীদেবীকে এসব কিছুই করতে হয় না। ভগবানই ওকে সব কিছু দিয়ে পাঠিয়েছে। অথচ এগুলোর জন্যেই ওকে কথা শুনতে হয়। কেউ কেউ ওকে ঝাঁকড়া পাগলি বলে। শ্রীদেবী এসব যত শোনে তত ওর হাসি পায়। কারণে অকারণে হেসে লুটিয়ে পড়ে। এমন কপাল, এটা নিয়েও মুখঝামটা খেতে হয় বেচারিকে। কত লোকে হাসতে পারে না বলে মরেই যায়। আর একে দেখো। ও নিজেও জানে না কেন ওর এত হাসি পায়। আপন মনে হাসে। ওর নাম কিন্তু অনায়াসেই হাসি কিংবা খুশি হতে পারত। কিন্তু হয়নি। বাপ সাধ করে নাম রেখেছিল শ্রীদেবী। দেবী তো দূর, শ্রী-এর কণামাত্ৰ নেই নাকি তার শরীরে। মুখটা অনেকক্ষণ ভিজে ন্যাতার মত হয়ে গেছে শ্রীদেবীর। তপা এগিয়ে যায়। শ্রীদেবীর চেয়ে কিছুটা লম্বা। তাই সামনের দিকে ঝুঁকে মেয়েটার মুখের দিকে চাইল তপা। শান্ত গলায় বলল, ‘কেন এমন করিস বল তো? আজ বাদে কাল তুই উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে যাবি। এখনও যদি…’ বলতে বলতে থেমে কপট ভীতি মুখে এনে বলে, ‘হ্যাঁ রে, সত্যিই পাশ করবি তো? নাকি আমার মুখ পোড়াবি?’
-তোমার কীসের চিন্তা? মুখ পুড়লেও তোমায় কেউ বলতে যাবে না তোমার কোনও শ্রী নেই। তুমি বিচ্ছিরি। ডানা কাটা পরির মত বউ হবে তোমার ।
কথাটা শোনামাত্রই হো হো করে হেসে উঠল তপা।
-হাসো হাসো। সবাই হাসে। তুমিই বা বাদ যাবে কেন?
তারে গামছা ঝুলছিল। সেটাকে টেনে গটগট করে হাঁটতে শুরু করল বাইরেমুখো হয়ে। আবার কোথা থেকে মা এসে হাজির। ‘কার পুখুরে ডুবতে যাওয়া হচ্চে শুনি?’
-আমি যে পুখুরে যাই, সেখেনেই ।
দরজার দিকে তাকিয়েই ঝাঁঝ দেখাল শ্রীদেবী।
– ইসসস! লাটের বেটি এলেন রে। যে পুখুরে যাই! কটা পুখুরে নাম আছে এখেনে? অ্যার পুখুরে তার পুখুরে যাবি আর লোকে ঘর বয়ে এসে কথা শুনি যাবে। কুথাও যাবি নি। কুয়ার জল তুলা আছে, তায়েই চান করবি যা ।
তপা এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করে, ‘হ্যাঁ রে শ্রী, তুই নাকি এইচ এস পাশ করে কোলকাতায় গিয়ে সেখেনকার কলেজে পড়বি! তা কোলকাতায় কোথায় পুকুর পাবি শুনি?’
-ও ঠিক জোগাড় করে নেব।
-মুখে নুড়া জ্বেলে শহর থেকে দূর করে দিবে এই বলে দিচ্চিI
ব্যস, ঝাঁকড়া পাগলি আবার হেসে গড়িয়ে পড়ল। হাসতে হাসতে তপার গায়ে লুটিয়ে পড়ে বলল, ‘মা কী বলে দেখো তপাদা। যেন রাজামশাই গুপীকে গাধার পিঠে চাপিয়ে গ্রাম ছাড়া করে দিচ্ছে।’ আরও কিছু আবোল তাবোল হাসির পরে বলল, ‘ওফফফ মা, ওটা শহর। ছোট্ট গ্রাম নয় । এই শ্রীদেবীকে শহর ছাড়া করা অত্ত সোজা না।’ হেহেহেহে হিহিহিহিহি করতে করতে গামছা কাঁধে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেল। শ্রীদেবীর মা পিছু পিছু ধেয়ে গেল দরজা অব্দি, ‘শ্রী যাবিনি বলচি। দাঁড়া। কথা শোন শ্রী। তপা দ্যাখ তো…. আমি আর পারবুনি। কোনদিন একটা অঘটন ঘটবে দেখে লিবি।’
তপাও ফিক করে হেসে বেরিয়ে গেল।
সন্ধে হলে সরযু রামায়ন খুলে বসেন। সাপ খেলানো সুরটা সারা বাড়িময় ছড়িয়ে পড়ে। সরযুর ছেলের বউ রাতের ভাত চাপিয়েছে তখন। উঠোনের দরজা খুলে ঢুকে এল শ্রীদেবী। হাতে একটা কাচের শিশি ভর্তি আমতেল। ‘কই গো কুচুটে বুড়ি। বাড়ি আছ নাকি?’ রামায়ন পড়তে পড়তেই ঘরের বাইরে তাকালেন সরযু। ঘোড়ার মতো ডিঙি মেরে উঠোনে ঘুরে বেড়াচ্ছে শ্রীদেবী আর ইতিউতি চাইছে। রান্নাঘর থেকে ছেলের বউ গলা তুলে বলল, ‘অ্যাই দেবী। কতবার বলেছি না মাকে ওইভাবে ডাকবি না?’
-ও মা! কুচুটেকে কুচুটে বলা যাবে না?
-না। উনি গুরুজন ।
-তা সে কই?
-স্বগগে চলে গেছি রে ছেমড়ি ।
ঘর থেকে সরযু গলা তুললেন। গালের ওপর চপাট করে হাত রেখে শ্রীদেবী বলল, ‘মা গো মা! যমের কী আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই নাকি যে তোমায় তুলতে আসবে!’ লাফিয়ে লাফিয়ে সোজা সরযুর ঘরে ঢুকে এল শ্রীদেবী। সরযু বললেন, ‘কী ধান্দায় এসচু?’ শ্রীদেবী মুখের সামনে ঠকাস করে শিশি ভর্তি আমতেলটা রাখল। চশমার গোল গোল কাচের আড়ালে চোখদুটো চিকচিক করে উঠল। ফোকলা দাঁতে বাল্বের আলো ঝিকমিক করে উঠল। গদগদ হয়ে বুড়ি বলল, ‘আমতেল এনেচু? আয় বোস বোস।’
-সেদিন গাছে উঠে যে আমগুলো পাড়লুম সেগুলো দিয়েই….
বুড়ি গলার শির ফুলিয়ে ডাক দিল, ‘অ বউমাআআআআ।’ রান্নাঘর থেকে উত্তর এল, ‘যাই মা।’
-চুলগুলার কী হাল করেচু বল দেকি! একটু তো যত্ন কত্তে পাত্তিস। অয় ওখেন থেকে চিরুনিটা এনে দে দেকি।
ঘরের দেয়ালে একটা ছোট আয়না ঝুলছিল। তারই সামনে রাখা ছিল চিরুণি। শ্রীদেবী নিয়ে এল। ততক্ষণে বউমা ঘরে এসে গেছে। বুড়ি বলল, ‘শ্রী এসচে। আমার আর অর জন্যে একটু মুড়ি মাখো না বউমা। আমতেল আর চ্যানাচুর দিয়ে।
-দিচ্চি মা।
বউমা আমতেলের শিশিটা নিয়ে গেল। সরযু শ্রীদেবীর চুলে চিরুণি দিয়ে চুল আঁচড়ে দিতে লাগল। জট পড়ে থাকা জায়গাগুলোতে টান পড়লেই শ্রীদেবীর মুখখানা প্যাঁচার মতো হয়ে যাচ্ছে। সরযু জিজ্ঞেস করল, ‘হ্যাঁরে তোর কবে রেজাল্ট রে?”
-কী জানি? ডেট বলেনি গো ঠাকমা। সামনের মাসে বেরোবে বোধহয় ।
-পাশ করবি তো?
-কবে আমি ফেল করেছি শুনি?
-না সেটা করুনু। তা বাদে তপা তোকে খুব যত্ন করে পড়ায়।
-পড়ায় কম ধমক দেয় বেশি। যেন ওই আমার গুরুঠাকুর।
সরযু হাসে। বলে, ‘ঠাকুর না হোক। গুরু তো। শিক্ষে দেয় বলে কথা।’
-মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে। বাড়িতে মায়ের খ্যাচখ্যাচ। পড়তে গিয়ে তপাদার। এখন আবার শ্রীকুমারও ধমকাচ্ছে আমায় জানো। কী সাহস ভাবো । আমার থেকে তিইইইন বছরের ছোট ভাই সে নাকি আমায় ধমকাচ্ছে।
-হ্যাঁ রে, তুই কলকাতা চলে যাবি না রে?
-কে বলল তোমায়?
-তোর মা। দুক্কু কচ্চিল।
– দুঃখ করছিল? কী যে বলো। এই তো দিনরাত বলে আমি বিদেয় হলে নাকি হাড়মাস জুড়োয়
-ছেমড়ি একটা। ওইটা কী রাগ নাকি । অভিমান করে বলে । তুই সারাদিন যা দৌরাত্ম্য করে বেড়াউ
“দ্যাখ গার্ডার দিয়ে চুলটা গুছিয়ে বেঁধে দিল সরযু। ‘এদিকে ফের দেখি।’ শ্রীদেবীও সরযুর দিকে ফিরে তাকাল। সরযু মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, দেখি, মুখখানা কী পরিষ্কার লাগছে। এমন সুন্দর চোখ দুখানা চুলের ঠ্যালায় দেখাই যায় নি।’
পাগলি আবার হেসে খুন। ‘উফ এত হাসির কী বললম রে ছেমড়ি?’ -তোর চোখে ছানি পড়েছে বুড়ি। নইলে আমার চোখ সুন্দর দেখিস? -আমরণ। তোর মুখে পোকা পড়েছে। কথার ছিরি দ্যাখো। -আমতেল দিয়েছি বলে তেল দিচ্ছ না ঠাকমা?
-এক চড় দুব। এই তিন কুড়ি বয়সে এসে তোকে তেল দুব কেনে রে দু-দিনের ছুড়ি?
বউটি দুবাটি মুড়িমাখা দিয়ে যায়। খসখসাখস শব্দ করে ঠাকমা আর নাতনি পরমানন্দে মুড়ি চিবোতে থাকে।
–আআআআহ! আমতেলটা কী ভালো হইচে রে।
বুড়ির প্রশংসায় ছুঁড়ি আনন্দে দুলে ওঠে। এইভাবেই প্রায়দিনই সন্ধেবেলা সরযুর সঙ্গে আড্ডা চলত শ্রীদেবীর।
-মেইছ্যানাটা যা লিত তার দুগুণ ফ্যারত দিয়ে যেত। খালি হাসত । কারণে অকারণে হেসে চলেচে।
শ্রীদেবীর কথা বলতে বলতে বৃদ্ধা সরযুর চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল স্বয়ম্ভু এক দৃষ্টে চেয়েছিল। সরযুর ছেলে বলল, ‘আপনি চা খান তো?’ স্বয়ম্ভূ হেসে বলল, ‘হ্যাঁ। অল্প চিনি।’
-আচ্চা। আপনারা কথা বলুন। আমি আসচি।
-আচ্ছা।
বৃদ্ধার ছেলে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে স্বয়ম্ভূ প্রশ্ন করল, ‘তারপর? শ্রীদেবী পাশ করল?
-হ্যাঁ হ্যাঁ। পাশ করবে না কেনে? ওর ইচ্ছে ছিল শহরের কলেজে গিয়ে লেখাপড়া করবে।
-কেন? এখানে কী ওর সাবজেক্ট ছিল না? মানে যে বিষয় নিয়ে পড়েছে সেটা কী….
-আমি নয় ক্লাস অব্দি পড়েচি বাবা। সাবজেক্ট মানে জানি।
স্বয়ম্ভুর মুখটা মুহূর্তে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সরযু বলতে শুরু করল, ‘সব ছিল। কিন্তু উ চায়নি। আসলে ছোটর থেকেই ওই মেইছ্যানাটাকে সবাই বুইতে পারত নি। লোকে কত কী বলত, বাচাল, ধ্যাতেলা, অসব্য আরও কত! তোকে কেউ অর ভিতরটা দেকত নি বাবা। আমিও কম মুক করেচি নাকি? ওই ছেমড়ি সবার কথায় রাগ করলেও আমার কথায় রাগ করত নি। উ জানত, উসব আমার মনের কথা লয়। আমিও জানতম, ওই মেয়ে আমায় যখন তুই-তকারি করে তখনই উ আমাকে সবথেকে বেশি ভালোবাসে। কিন্তু লোকে বুইত নি। খালি বলত অর দ্বারা কিসসু হবে নি। নীলিমাও বলত । আমি বারণ…।’
-নীলিমা কে?
-অর মা। আসলে অল্প বয়সে বাপ চলে যাওয়ার পর বাধ্য হয়ে নীলিমা টাউনের একটা কারখানায় কাজ লেয়। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটনি, রাতে এসে ব্যাগ সেলাই, লোকের শাড়িতে ফলস পাড় বসানা সব করত। খিটখিটা হয়ে গেইল ৷
কাঁধের ব্যাগটা দাওয়ায় রেখেই এক ঘটি জল গলায় ঢালল নীলিমা । ঢুকবি তো ঢোক মায়ের সামনে দিয়েই নাচতে নাচতে সন্ধে করে বাড়ি ফিরল মেয়ে। শ্রীকুমারের পড়ার আওয়াজ ঘর থেকে পাওয়া যাচ্ছে। ও বরাবরই সিরিয়াস। নিজের পড়াশুনো নিজেই করে। তবে মাথাটা অতটা উর্বর নয় বলে ক্লাসে স্ট্যান্ড করতে পারে না। কিন্তু ভালোভাবেই পাশটা করে যায়। ব্যস, নীলিমাও লেগে পড়ল। ‘সন্ধ্যা তো সেই কখন হইচে। এতক্ষণ কুথায় চড়ে বেড়াচ্ছিলি?’
-চড়ে বেড়াব কেনে? সকাল থেকে যে পড়াগুলা করেচি সেগুলাই তো ক্ষেন্তিদের পুখুর পাড়ে বসে ঝালাচ্ছিলম।
নীলিমার চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসে প্রায়। ‘পুখুরপাড়ে বসে পড়া ঝালাচ্ছিলি? কেনে ঘরে জায়গা নাই?’
-তা হবে নি কেনে?
দাওয়ায় উঠে বসে তুরতুরিয়ে পা দুটো নাচাতে নাচাতে বলল, “ঘরে গুমসানি গরম। মাথা খুলে নি। পুখুর পাড়ে সুন্দর হাওয়া। সব পড়া মনে পড়ে যায়।’
-কতবার বলেচি এইরকম ঠ্যাং লাচাবি নি ৷
মায়ের ধমকের চোটে পা দুটো আপনা থেকেই থেমে যায়। ‘ব্যানার্জিদের মেইছ্যানাটাকে দ্যাখ, কলকাতা চলে গেল পড়তে। আর তুই? এখেনে থেকেই লোকের বাগানের ফল আর পুখুরের মাছ চুরি করবি। উঠতে বসতে যে মিথ্যা কথা বলে তার কিচ্ছু হবে নি। আমি একটাবার চোখটা বুজি, কত ধানে কত চাল বুজবি ।’
-আহ নীলিমা বউ!
মা-মেয়ের মাঝে কে যেন কথা বলে উঠল। দুজনের চোখই সদরের দিকে। মাথায় ঘোমটা দিয়ে সরযু ঢুকে এসেছে। নীলিমা উদ্বিগ্ন হয়ে বলে উঠল, ‘এ কী কাকিমা, আপনি এই সন্ধেবেলা এলেন কেনে?”
-তা করবটা কী? তমরা ঘরে টিকতে দিলে তবে না ঘরে থাকব। সেই তখন থেকে শুনচি মেইছ্যানাটাকে দাঁতে পিষচ। ভর সন্ধ্যাবেলা আবোল তাবোল কথা বলচ।
নীলিমা আকাশ থেকে পড়ল। ‘এখান থেকে আপনার বাড়ি অব্দি কথা শুনা যাচ্চে?’ বুড়িও তেড়ে বলে উঠল, ‘তা যাবে নি? সন্ধেবেলা সব চুপচাপ তো ।’
-এই মেয়েকে লিয়ে আমি আর পেরে উঠচি নি কাকিমা। সেই কখন সন্ধ্যা হইচে এখন বাড়ি ফিরল দেখুন। সামনে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা, পড়ার নামগন্ধ লাই৷
-ওমা! ছেমড়ি তো আমার ঘরেই ছিল। বলল ঠাকমা আমি তোমার সঙ্গে বসে পড়ব।
ছ্যাঁক করে কালী ঠাকুরের মতো জিভ কাটল শ্রীদেবী। চোখ পাকাল। কিন্তু সে বুড়ির চোখে পড়লে তবে না! বুড়ি বলেই চলেছে, ‘মিছিমিছি মেয়েটাকে দুষচ। এ তোমার ভারি বাজে স্বভাব হইচে নীলিমা বউ।’
-আপনার ঘরে ছিল? এই যে বলল পুখুরপাড়ে বসে পড়া ঝালাচ্ছিল নাকি?
চোখ পাকিয়ে মেয়ের দিকে তাকাল নীলিমা। টুক করে বেরিয়ে আসা জিভটা ঢুকে গেল শ্রীদেবীর। সরযুও পড়ল ফাঁপরে। গোল গোল চশমার ওপর দিয়ে চোখের মণি উল্টিয়ে শ্রীদেবীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অ, তুই এ কথা বলেচিলি বুজি? তাই হবে। আসলে বয়স হচ্চে তো আমার সব ঠিকঠাক মনে থাকে নি।’ নীলিমা আর একটাও কথা বলল না। ধপধপ করে মাটির বুকে গোড়ালি ফেলে উঠে ঘরে চলে গেল। টুকটুক করে আদরের ছেমড়ির কাছে এগিয়ে এল সরযু। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘ছিলিস কই?’
-পুখুরপাড়েই ছিলম।
-রাম রাম রাম রাম, এই ভর সন্ধেবেলা একা পুখুরপাড়ে কেনে গেইলি? তাও আবার এরকম খুলা চুলে!
খিলখিল করে হেসে দুলে উঠল শ্রীদেবী। ‘কেনে? আমায় ভূতে ধরবে? এত সাহস আছে?’ কাঁধের কাছে একটা আদুরে চড় কষিয়ে সরযু বলেন, ‘চুপ কর মুখপুড়ি! বেশি সাহস হয়েচে তোর! আর কুনুদিন সন্ধ্যাবেলা একা পুখুরধারে যাবি নি।’
-একা লয় গো ।
-তবে?
-তপাদা ছিল তো।
সঙ্গে সঙ্গে সরযুর চোখ মুখ বদলে গেল। ‘তপা!’ চোখের কোণে চটুল সন্দেহ। ‘কী এত কথা কইছিল তপা?’
-সে ওই জানে। ওর আদ্দেক কথার মানে বুইতে পারিনি।
সরযু বুড়ির চশমাটা আরও কিছুটা নাকের ওপর নেমে এল।
নিঝঝুম পুকুর ঘাটে হাতের ওপর মুখ রেখে বসে আছে শ্রীদেবী। এক ঘাট উঁচুতে তপা বসে। কয়েক হাত দূরত্বে জামরুল গাছটা ঝাঁকড়া হয়ে ঝুঁকে আছে পুকুরের ওপর। তার নীচের জমাট অন্ধকারটা আলো করে রেখেছে দু-তিন ডজন জোনাকি। স্বপ্নের মত ওরা জ্বলছে নিভছে। একভাবে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শ্রীদেবী বলে উঠল, ‘কী ভালো আছে ওরা!’
-কারা?
তপা জিজ্ঞেস করল।
-ওই জোনাকিরা। ওদের কেউ বলছে না, সন্ধে হয়েছে ঘরে যা। তপা হাসল। ‘সাধে কী লোকে তোকে পাগলি বলে?”
-কেন? এতে পাগলামির কী হল?
-অন্ধকার হলে ওরা যদি ঘরের ভেতর বসে থাকে তাহলে আলো দেবে কে?
-না দিলেই বা কী? ওদের ওইটুকু আলোতে কতটুকুই বা অন্ধকার দূর হয়?
-সেটা আমরা ভাবছি। ওরা ভাবে ওদের আলোতেই অন্ধকার সরে যায়। অন্ধকারও ওদের আদর করে বুকে জড়িয়ে রাখে। ওরা যে অন্ধকারের বন্ধু।
-তুমি যে মাঝে মাঝে কী বলো তপাদা মাথামুণ্ডু বুইতে পারি নি।
-অ্যাই, বুইতে পারি নি কী কথা? তুই না শিক্ষিত মেয়ে। ওসব ঠাকমারা
বলে বলুক। তুই বলবি না। তাছাড়া তোর মুণ্ডু থাকলে তো বুঝবি। অমনি কুরকুর করে হেসে ঝাঁকড়া খোলা চুলগুলো ঝাঁকিয়ে নিল। ‘আমি কী স্কন্দকাটা নাকি?’
-তোর সাহস তো ভারি। এই অন্ধকারে পুকুরের ধারে বসে তেনাদের নাম কচ্ছিস।
-এহ বাবা! তুমি তো সরযু ঠাকমার মতো কথা বলছ। তেনাদের আবার কী? ভূত আমার পুত পেত্নি আমার ঝি….
-হয়েছে হয়েছে। থাম দিকি।
তপার গা-টা শিরশির করে উঠল। কিন্তু শ্রীদেবী একেবারে মারকাটারি । ভয়ডর নেই মোটে।
-তোর ভূতে ভয় করে না?
-না। মানুষকে ভয় করে৷
-মানুষকে! কেন?
-তুমি নিজে দেখেছ না শুনেছ যে অমুক ভূতে এসে তমুক মানুষের ঘাড় মটকেছে? বলো শুনেছ?
-উমম না তা শুনিনি।
-অথচ দেখো প্রতিদিন টিভি খুললে, খবরের কাগজ পড়লে কত মানুষের খুন হয়ে যাবার খবর পাই। সেগুলো তো মানুষই করে। তাই মানুষের চেয়ে ভয়ংকর আর কিচ্ছু নেই ।
কিছুক্ষণের জন্য থমকে যায় তপা। শ্রীদেবীকে দেখতে পুকুরের মতো । কিন্তু আদতে ও একটা গভীর নদী। মনে মনে ভাবল। মুখে প্রকাশ করল না। কারণ এই কথা বোঝার মতো মানসিক স্থিতি শ্রীদেবীর নেই। উলটে এমন হেসে গড়িয়ে পড়বে যে সামলানো দায় হবে। তপা এক ধাপ নেমে শ্রীদেবীর পাশে বসল। শ্রীদেবীও খপ করে তপার হাতখানা জাপটে ধরে বলল, ‘এই নাও। আমি তোমায় ধরে আছি। আর ভয়ের কিছু নেই।’
-ও। শুধু আমার ভয়টাই দেখলি?
-এই অন্ধকারে আর কিচ্ছু দেখতে পাচ্চি নি। ও, সরি। পাচ্ছি না। এবারে তপা রাগ করল না। ভুল বলে ফেলাটা শুনতেও পেল না বোধহয় । ভাবের ঘোরেই বলতে থাকল তপা, ‘আচ্ছা শ্ৰী ।’
-হুম?
-আমাকে কেমন লাগে তোর?
-মন্দের ভালো।
-মারব কানচাপাটি। সত্যি করে বল না।
-এই যে আমার সঙ্গে বসে বসে গল্প করছ এখন তোমায় খুব ভালো লাগছে। কিন্তু যখন পড়াও তখন বিরক্ত লাগে ।
-কেন?
-এত বকো।
-বাহ পড়া না করলে বকব না?
-না। পৃথিবীতে এমন একজনও তো থাকুক যে আমায় বকবে না। মুখঝামটা দেবে না।
কথাগুলো অন্য কোনও মেয়ে বলল যেন। তপার চেনা শ্রীদেবী নয়। অজান্তেই তপার হাতটা শ্রীদেবীর হাতের ওপর চলে গেল। তপার বুকের ভেতর তোলপাড় করে উঠল। নরম সুরে বলল, ‘আচ্ছা বেশ। আর বকব না তোকে।’
-সে তুমি এখন বলচ। যেই বই বগলে চেপে সামনে গিয়ে বসব অমনি তুমি গুরুঠাকুর হয়ে যাবে।
-বলছি তো, হব না।
অন্ধকারের মধ্যেই তপার দিকে প্যাটপেটিয়ে চায় শ্রীদেবী। ‘সত্যি?’
-সত্যি।
ঝপাৎ করে তপাকে জড়িয়ে ধরে শ্রীদেবী। চমকে ওঠে তপা। শিরাগুলোর মধ্যে রক্তের চলাচল অতি দ্রুত হতে থাকে। শ্রীদেবীকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করে তপার। হাত দুটো মেলেও দেয় শ্রীদেবীর দিকে। ঠিক তখনই শ্রীদেবী ঝটকা দিয়ে বলে ওঠে, ‘ওমা! জলের ওপর ওটা কে?’ সব আবেশ ভেঙেচুরে তছনছ। আচমকা ভয়ে তপা অন্ধকারেই যতটা সম্ভব চোখদুটোকে ঠেলে বের করে চারপাশ খুঁজতে থাকে, ‘কে কে? কই?’ ততক্ষণে পুকুরের জল তোলপাড় করে, জোনাকিগুলোর বুকে কাঁপন ধরিয়ে হো হো করে হেসে উঠেছে শ্রীদেবী। ‘কী ভীতু রে বাবা! তুমি না পুরুষ মানুষ?’ তপার সম্বিত ফিরতে ক্ষেপেই গেল, ‘তুই কি কখনও সিরিয়াস হবি না শ্রী? পাজি মেয়ে একটা! মেরে তোর দাঁতকপাটি ভেঙে দেব!’
-দেখেছ তো? এক্ষুনি বললে তুমি আমায় বকবে না।
উদগ্রীব হয়ে গলা বাড়িয়ে বলে ওঠে, ‘আমি তোকে কিছু বলতে চাইছিলাম শ্রী। সেটা কী বুঝেছিস?’
-হ্যাঁ। বুঝেছি তো। ঘেঁচু আর কচুউউউউ!
এক দৌড়ে সন্ধের অন্ধকার পেরিয়ে বাড়ির উঠোনে এসে থেমেছিল মেয়েটা। আর তার পরেই মায়ের দাঁত খিঁচুনি ।
চায়ের কাপে চুমুক দিল স্বয়ম্ভু। বলল, ‘রেজাল্ট বেরোবার পরে শহরে একাই গেল শ্রীদেবী?’ বৃদ্ধা সরযু দুপাশে ঘাড় নেড়ে বলল, ‘না না। সঙ্গে উর ভাই আর তপা গেল। নীলিমা বউ ছুটি পেল নি।’
নীলিমা সকাল থেকে কেঁদে কেঁদে আঁচল ভিজিয়ে ফেলল। সর্দি লেগে গেল তার। ছেলেমেয়েগুলোর খাবার বাঁধতে বাঁধতে শেষ মুহূর্তেও গজগজ করে চলেছে। ‘মেয়ে আমার দ্বিগগজ হবে। এত লোকে মিদনাপুরের কলেজে পড়ছে তারা কেউ মানুষ হচ্চে নি। ওনাকে কলকাতা যেতিই হবে।’ অনেকক্ষণ ধরে মায়ের গজগজানি শুনছিল শ্রীদেবী। এবার ঘাড়সমেত ঝাঁকড়া চুল ঝাঁকিয়ে বলে উঠল, ‘ভূতের মুখে রাম নাম! এই তো এদ্দিন ধরে মাথা খেয়ে এলে আমার। অমুকের ছেলে শহরে গেল। তোর কিছু হল না। ব্যানার্জিদের মেইছ্যানা কোলকাতা গেল তোর কিসসু হবে না। তুই খালি চড়েই বেড়াবি। এখন বুক চাপড়ে কেঁদে মরছ কেন?’
-তুই কী বুজবি হতচ্ছাড়ি। যেদিন মা হবি সেদিন বুজবি ।
ব্যস, সুযোগ পেয়েই দাওয়ার পিলারটা ধরে হেসে গড়িয়ে নিল খানিক আমার ছেলে আমার চেয়েও বিষ হবে মা। তোমার যেকটা দাঁত আছে সব কটা ও একাই ফেলে দেবে। দেখব তখন কেমন করে গজগজ কর।’
-চুপ কর তুই। সব সময় কথা। অ্যাই শ্রীকুমার, দিদিকে ভালো করে সব দেখিয়ে দিস 1
ভাইটা সকালের খাবার খাচ্ছিল। একটু পরেই টাউন থেকে বাসে চাপবে। ঘাড় নাড়ল শ্রীকুমার। ওদিকে বাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে নীলিমার কথা শুনতে পেল তপা। ‘এত চিন্তা কেন করছ কাকিমা? আমরা সব ঠিক করে দিয়ে তবে আসব। বাড়িও পেয়ে গেছি।’
-ও মা! তাই নাকি?
নীলিমার বুকে যেন একটু স্বস্তির হাওয়া লাগল। ‘কার বাড়ি রে তপা? তোর চেনা কেউ?’
-চেনা লোকের বাড়ি না। তবে আমার এক বন্ধুর বাবা ওই বাড়িটা ঠিক করে দিয়েছে। কিন্তু মুশকিল হল, শ্রীদেবীর সঙ্গে আমাদের থাকতে দেবে না একদিনের বেশি ।
-সে কি কথা?
-হ্যাঁ। আসলে ছেলে-মেয়েরা একসঙ্গে ওখানে থাকতে পারে না। বাড়িওয়ালার আপত্তি আছে। আজ গিয়ে সব দেখিয়ে বড় জোর কাল পর্যন্ত অ্যালাও করবে আমাদের।
যাও বা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল নীলিমা তাও ঘুচে গেল। শ্রীকুমার টিপ্পনি কাটল, ‘চিন্তা কোরো না মা। তোমার শ্রীদেবী চাবুক মেয়ে। একাই সব সাল্টে নেবে।’ তপা ফ্যাক করে হেসে ফেলল। শ্রীদেবী চড় তুলে তেড়ে গেল। নীলিমার মুখ থেকে তবু ভয় গেল না ।
মাকে প্রণাম করে চোখের জলে বিদায় নিচ্ছিল শ্রীদেবী। না না, ঝাঁকড়া পাগলির চোখে জল নেই। যত আষাঢ় শ্রাবণ নীলিমার চোখে। সবে বেরোতে যাবে, ঠিক তক্ষুনি আরেকজন এসে হাজির হলেন বড় একটা হলুদ রঙের ডালডার কৌটো নিয়ে। হলুদের ওপর সবুজ রং দিয়ে নারকেল গাছের ছবি। সরযু ঠাকমা। ‘এইটে লিয়ে যা ছেমড়ি। কটা নারকেল লাড়ু আছে। খাস।’ শ্রীদেবী তো বেজায় খুশি। দুবার লাফিয়ে নিয়ে কৌটোটা একপ্রকার ছিনিয়েই নিল। তারপর দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল সরযুকে। বুড়ির ভাঙা গালে চুকুত করে একটা চুমু খেল। নীলিমা পিছন থেকে বলল, ‘প্রণাম কর । বুড়ি অমনি প্রতিবাদ করে উঠলেন, ‘তুই থাম দিকি বউ। অনেক শিক্ষে দিয়েছিস মেয়েটাকে।’ শিরায় জড়ানো হাত দুটো শ্রীদেবীর মাথায় রাখলেন সরযু। ‘খুব ভালো হোক তোর। সাবধানে থাকিস মুখপুড়ি। শহরে গে অত ধ্যাতালপানা করিসনি মা।’
-ধুস! আমার মতো লক্ষ্মী মেয়ে কটা আছে বল তো বুড়ি?
নীলিমা অমনি পিঠের ওপর চপাট করে একটা চড় কষাল। সরযুর চশমা ঝাপসা হয়ে এল। শাড়ির আঁচলটা চশমার ভিতর ঢুকিয়ে দুচোখের জল ঝরার আগেই সেটাকে মুছে নিলেন।
স্বয়স্তু একভাবে তাকিয়ে ছিল সরযুর দিকে। চোখের জল মুছে বৃদ্ধা নিজেই বিড়বিড় করতে লাগলেন, ‘চলে গেল। মেয়েটা চলে গেল।’ বাইরে থেকে ভেসে আসা কয়েকটা পাখির ডাক ঘরের নীরবতাকে যেন আরও বেশি থমথমে করে তুলল। স্বয়ম্ভু বলল, ‘তারপর?’
