১
বুনো গন্ধ বুকে জড়িয়ে সবেমাত্র জেগে উঠছে বনজ সকালটা। কয়েকটা মোরগের ডাক আর জঙ্গুলে ঝিঁঝিঁগুলোর সমবেত কনসার্ট ছাড়া কোনও শব্দ থাকার কথা নয়। কিন্তু আজ পাওয়া গেল। এক মহিলা কণ্ঠের উচ্চকিত আহ্বান, ‘আলোওওওওক, এ আলোওওওওক। কাঁহা গয়ে রে? আজা বেটা। আলোওওওওক!’ খানিকটা বাধ্য হয়েই চোখ কচলাতে কচলাতে গ্রিন জাঙ্গল রিসর্টের ম্যানেজার বেরিয়ে এল। ভুরুর মাঝে এক রাশ বিরক্তি। গায়ের চাদরটা এক ঝাপটায় ডান কাঁধে ছুড়ে গলা তুলল, ‘আরে এ রামাইয়া! পাগল হয়ে গেলি নাকি? অভি ভি ট্যুরিস্ট লোগ সো রহে হ্যায় অউর তু…’ । কথা শেষ করতে না দিয়েই বিহারী বউটা বলে উঠল, ‘দেখো না সুখেনদা, কাল শাম সে আলোক ঘর মে নেহি আয়ে। কব সে ঢুন্ড রাহা হুঁ! কৌন জানে কিসকে ঘর মে ছুপ কর ব্যাঠে হ্যায় বদমাশ।’
-কারও ঘরে থাকলে এতক্ষণে রিসর্টে হুজ্জোত বেঁধে যেত। সেটা যখন হয়নি তখন নিশ্চিন্ত থাক আশেপাশে কোথাও আছে। এখন ঘর যা। সময় মতো চলে আসিস।
-উস দিনভি ইয়েহি বোলে থে না আপলোগ। আলোক আশপাশ আছে!
সবে শীতার্ত কুয়াশা আর জঙ্গলের অন্ধকার ভেদ করে কয়েক রেখা আলো এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়ছিল। ঠিক তখনই রামাইয়ার গলাটা গুমরে ওঠা মেঘের মতো গুমগুম করে উঠল। তামাটে মুখে কাজল ঘষা চোখ দুটো কোন আশঙ্কা নিয়ে তাকিয়ে আছে সেটা বেশ ভালোই বুঝল সুখেন। ভিতর থেকে একটু যেন গুটিয়েই নিল নিজেকে। সুখেনের কোনও জবাবের অপেক্ষা না করেই রামাইয়া ফিরসে গলা তোলে, ‘আলোওওওওক, এ আলোওওওওক, কাঁহা গয়ে রে। আজা আজা।’ এরপরেও বেশ কিছুক্ষণ রিসোর্টের চারপাশে রামাইয়ার স্বর ভেসে বেড়াতে লাগল। সুখেনের বিরক্ত লাগলেও রামাইয়াকে আর কিছু বলতে পারল না। শুধু প্রমাদ গুণল এই বোধহয় কোনও ট্যুরিস্ট বেরিয়ে এসে ম্যানেজারকে গাল পাড়তে শুরু করবে। গত পরশুই তো যা ক্যাচাল করল মেয়েগুলো! গ্যাঁটের কড়ি খসিয়ে ঘরভাড়া দিয়ে কেই বা সকাল সকাল এমন উৎপাত সহ্য করবে ঘুরতে এসে? রামাইয়ার সুর করে ডাকটা এক সময় রাস্তা পেরিয়ে পাশের জঙ্গলের ভিতর ঢুকে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সুখেন।
যত সময় পেরোচ্ছে ততই রামাইয়ার মুখের ওপর দুশ্চিন্তার ভাঁজগুলো আরও গভীর হয়ে পড়ছে। চোখটা এবার ছলছল করে উঠছে। রামাইয়ার পায়ের চাপে ঝরা পাতাগুলো কঁকিয়ে উঠতে থাকে। জঙ্গলের ঝিঁঝিঁগুলো এখন যেন রামাইয়াকে ঘিরে ধরে কোনও আসন্ন সর্বনাশের খোল করতাল বাজিয়ে চলেছে। সহ্য হচ্ছে না তার। বুঝতে পারছে না ঠিক কত দূর যাবে। লাটাগুড়ির এত বড় জঙ্গলের মধ্যে যদি সে কোনওভাবে দুষ্টুমি করতে করতে ঢুকে গিয়ে থাকে তাহলে তো সর্বনাশ। সারা রাত ঘরে ফেরেনি। আশেপাশের যে কটা বাড়ি ছিল সব খুঁজেছে। কিন্তু আলোক কোত্থাও যায়নি। জঙ্গলের বেশি ভিতরে যেতে হল না রামাইয়াকে। এপাশে ওপাশে, গাছ-আগাছার আড়ালে উঁকিঝুকি মারতে মারতে চোখ ফিরিয়ে নিতে গিয়েও এক জায়গায় আটকে গেল। রামাইয়া খুব সন্তর্পণে দুটো পা এগিয়ে গেল। তারপরেই সারা জঙ্গল কেঁপে উঠল রামাইয়ার ভয়ার্ত আর্তনাদে। আগাছার ওপরেই লুটিয়ে পড়ল সে। শরীর, মস্তিস্ক বা চেতনা তাকে কাঁদবার সুযোগটুকুও দিল না।
-আপনাদের আজকের রান্নাটা কিন্তু মোটেই আগের দুদিনের মতো হল না।
থুতু দিয়ে কড়কড়ে নোটগুলো গুণতে গুণতে থমকে গেল সুখেন। চোখ তুলে রিসেপশনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে এক পলক চাইল। তারপর মুখটা কাঁচুমাচু করে বলল, ‘আসলে ম্যাডাম যে মেয়েটি আমাদের মেন রান্নাটা করে সে আজ আসেনি। সকাল থেকে ফোনটাও তুলছে না।’
-এসব বাজে এক্সকিউজ। আপনাদের এত বড় হোটেল। এত এক্সপেনসিভ ঘর। সেখানে একজন মাত্র কুক? তার তো শরীর খারাপ হতেই পারে। আর কোনও ভালো অপশন রাখবেন না তা বলে?
তিনদিন আগে চারটে মেয়ের যে দলটা এসেছে তাদের মধ্যে এই মেয়েটা সবচেয়ে বেশি উচ্চুঙ্গা। মুখে যেন খই ফুটছে। বাকিগুলোও যে লক্ষ্মীমন্ত সেটা বলা যায় না। তবে বাচালতায় এর চেয়ে কম। ফস ফস করে আবার সিগারেটও টানে। সুখেন গলা তুলে রান্নাঘরের দিকে মুখ করে বলে উঠল, ‘এই বাপন রামাইয়াকে ফোন করেছিলি আর?’ রান্নাঘর থেকেই উত্তর এল, ‘করেছিলাম। বেজে গেল।’
-দয়াকে কল করে জিজ্ঞেস কর। ওর বউ এল না কেন? এভাবে হলে তো লোক পাল্টাতে হবে। ওদের জন্য আমায় কেন কথা শুনতে হবে?
গলায় বেশ ঝাঁঝ নিয়ে কথাগুলো বলল সুখেন। মেয়েটির কানে কানে তার আরেক বন্ধু ফিসফিস করে বলল, ‘ঝিকে মেরে বউকে শেখাল।’ ঘাড়ের কাছে ঝুলতে থাকে ঝ্যাঁটার মতো চুলগুলো ঝাঁকিয়ে অভিযোগকারিণী বলে উঠল, ‘ছেঁড়া গেছে।’
-এই নিন ম্যাডাম, চারশো টাকা কম নিলাম 1
সুখেন ব্যালেন্সটা মেয়েটির হাতে ধরাতে ধরাতে বলল। মেয়েটি অবাক, ‘কেন? ডিসকাউন্ট?’ দাঁত ছাড়িয়ে সুখেন সলজ্জ ভঙ্গিতে বলল, ‘আজকের খাবারটা আপনাদের কমপ্লিমেন্টারি। যে খাবার ভালোই লাগেনি সে খাবারের দাম কেন দিতে যাবেন।’ খাটো চুলো মেয়েটার অহং-এ আঘাত লাগল কী? মনে তো হয় না। পাশের মেয়েটার ঠোঁটে হালকা হাসি। হঠাৎ লাভ হওয়ায় চোখ দুটোতে বেশ একটা চকচকে ভাব। সুখেন বলল, ‘তবে ম্যাডাম, এরপর এলে অবশ্যই আমাদের এখানে উঠবেন। আর কথা দিচ্ছি, তখন আর কোনও অসুবিধে হবে না।’
-শিওর। থ্যাংক ইউ । চলি ।
-আসুন ম্যাডাম। আবার আসবেন।
মেয়েগুলো টেবিল থেকে ব্যাগগুলো তুলতে গেল। দূরে আরেকটা টেবিলে বসে এক মনে খেয়ে চলা ছেলেটি জ্যাকেটের হুডিটাকে মাথায় তুলে দিল। আস্তে আস্তে ঠাণ্ডা বাড়ছে জঙ্গলের রাজত্বে। রিসেপশনে সুখেনের কাছে রান্নাঘর থেকে একটা ছেলে বেরিয়ে এসে জানাল, দয়া লাটাগুড়িতে নেই। রাজাভাতখাওয়া গেছে কী একটা কাজে। মেয়েগুলো হেলতে-দুলতে, নাচতেনাচতে বেরিয়ে গেল। গাড়ি ছাড়ার শব্দ হল। সুখেন বলল, ‘একবার কাউকে রামাইয়ার বাড়ি পাঠাত। দ্যাখ গিয়ে ছেলের শোকে আবার মুচ্ছো গেল কিনা! যত জ্বালা আমার।’
ম্যাও… মিউ… ম্যাও… মিউ…
সেই কখন থেকে দরজার সামনে ঘুরঘুর করছে আর ডেকে চলেছে। একটার গায়ের রং ধবধবে সাদা। আরেকটা সাদার ওপর কালো ছোপ। দুটো চোখের চারপাশে কালো গোল ছাপ থাকায় এটাকে দেখতে অনেকটা পাণ্ডা-পাণ্ডা লাগে। তাই রামাইয়ার বর দয়া ভালোবেসে এটার নাম দিয়েছে পাণ্ডা। আর এটার সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে ধবধবে সাদা বিড়ালটার নাম গণ্ডা ৷ তা এই পাণ্ডা আর গণ্ডা মিলে অনেকক্ষণ ধরে তাদের মালকিনকে ডেকে চলেছে। বাড়ির পোষ্য বলে একটু শিক্ষা আছে এদের। খিদে পেলে ডাকে ৷ রান্নাঘরে চোরের মতো ঢুকে ভাতটা, মাছটা খেয়ে নেয় না। কিন্তু সেটাই বা কতক্ষণ? মানুষের খিদে পেলেই সে পাগল হয়ে শিক্ষাদীক্ষা ভুলতে বসে । আর এরা তো মার্জার প্রজাতি। নাহ, খিদের জ্বালা আর সহ্য করতে না পেরে গণ্ডা আর পাণ্ডা মিলে ঘরের বন্ধ দরজায় ক্যাম্বিস বলের মতো মাথা দিয়ে গুঁতোয়। কে জানে, মালকিন হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। যা যাচ্ছে তার ওপর দিয়ে। কিন্তু ব্যাপারটা যা হল তাতে বিড়াল দুটি একটু ব্যোমকেই গেল। গুঁতো মারতেই বন্ধ দরজাটা শব্দ করে কিঞ্চিৎ ফাঁক হয়ে গেল। ও মা! দরজা বন্ধ করেনি। ভেজিয়ে রেখেছে। গণ্ডা একবার পাণ্ডার দিকে চেয়ে পিটপিট করে হাসে। তারপর দুটোয় মিলে দরজা ঠেলে অন্ধকার ঘ: টায় ঢুকে পড়ে। উফফ! মালকিনের বলিহারি। ঘরের জানলাগুলো পর্যন্ত ঠেসে বন্ধ করে রেখেছে। নইলে জানলা গলে দিব্যি ভিতরে ঢোকা যেত । তুলতুলে শরীর দিয়ে পাণ্ডা একটু জোরেই দরজায় ধাক্কা দেয়। কপাট হাট হতেই বাইরের রোদ্দুর হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে। আবার ম্যাও… মিউ… ডাকে দুজনে। কারও ঘরে ঢোকার আগে একটু নক করে ঢুকতে হয়। তাই এই ম্যাও… মিউ… প্রহসন। গুটিগুটি পায়ে ঢুকে আসে গণ্ডা আর পাণ্ডা। দুজনে ভাবতেই পারেনি ঘরে ঢুকেই এমন মোক্ষম একটা চমক লাগবে তাদের। দৃশ্যটা দেখেই পাণ্ডা-গণ্ডা একেবারে থ। ম্যাও মিউ করে ডাকতেও ভুলে গেল তারা। দেখেছ কাণ্ড! এদ্দিন ধরে এই বাড়িতে চারবেলা গিলছে, ঘুমোচ্ছে, খেলে বেড়াচ্ছে। অথচ তাদের মালকিন যে এমন একখানা দুর্দান্ত জাদু জানে সেটাই জানত না! দড়িতে শুকোতে দেওয়া ভিজে জামাকাপড়ের মতো নিজেকে কেমন শূন্যে ঝুলিয়ে রেখেছে দেখো!
