ম্যাও – ১৫

১৫

শরীর আর দিচ্ছে না নন্দিনীর। বড় বড় হাই উঠছে। তবু ফোনের কল রেকর্ডিং শুনে ঠিকঠাক ঠিকানাগুলো নোট করে রাখছে। পাশের ঘরে তর্পণা ফোনের মধ্যে কাকে যেন কী বোঝাবার চেষ্টা করছে অনেকক্ষণ ধরে। কিন্তু সে বোধহয় শুনছে না। সত্যি বলতে, পাশের ঘর থেকে কথাগুলো এ ঘর পর্যন্ত এসে একটার ওপর আরেকটা উঠে কীরকম যেন হাউ মাউ খাউএর মতো শব্দ হয়ে নন্দিনীর কানে ঢুকছে। আবারও একটা হাই উঠল মেয়েটার। ফোনের রেকর্ডিংয়ে তখন এক মহিলার ভয়েজ তার বাড়ির অ্যাড্রেস বলে চলেছে। আসলে সব ফুলের অর্ডার ওয়েবসাইটের মাধ্যমে হয় না। অনেকে ফোন করে অর্ডার দেয়। বলা ভালো, বেশিরভাগই তাই করে। তর্পণা সব রেকর্ড করে রাখে। দোকান থেকে রাতে ফিরে নন্দিনীর কাজ হল ফোনের রেকর্ডিং শুনে সব ঠিকানা নোট করা। নন্দিনী টেবিলের ওপর ঢুলে পড়তেই ডানদিকের কানে সজোরে টান পড়ল। এক ঝটকায় তন্দ্ৰা কেটে গেল। দেখল তার বস তর্পণা রুদ্রমূর্তি ধরে তাকে চেয়ার থেকে নামিয়ে দাঁড় করাল। ‘এইবার বুঝেছি কীভাবে আমার সর্বনাশ হচ্ছে। হারামজাদি। আমারই খাবি, আমারই পড়বি আবার আমারই সর্বনাশ করবি?” তন্দ্ৰাভাঙা চোখে চূড়ান্ত বিস্ময় নন্দিনীর। কী করল সে? দাঁতে দাঁত পিষে তৰ্পণা বলে উঠল, ‘ঘুমোতে ঘুমোতে অ্যাড্রেস লিখিস তুই? তারপর বেহালার মাল গড়িয়া আর গড়িয়ার মাল টালিগঞ্জে ডেলিভারি করিস? সন্ধে থেকে দুজন ফোন করে উদোম গালাগাল দিল আমায়। তারা যে যেটা অর্ডার দিয়েছিল কেউ সেটা পায়নি।’ ঠাস করে তেরো বছরে মেয়ের গালে চড় কষাল তৰ্পণা ।

-আমার কি শালা হুন্ডি আছে নাকি রে? খাইয়ে দাইয়ে তোর মত একটা বোবা মেয়েকে পুষব! লেখাপড়াও তো আমি শেখাই। কোন কাজে লাগিস তুই আমার? অকম্মার ঢেঁকি একটা!

কোঁকড়ানো চুলে বিনুনি করা ছিল নন্দিনীর। সেটা খামচে ধরতেই নন্দিনীর মাথাটা একপাশে হেলে গেল। যন্ত্রণায় ভুরু কুঁচকে এল। বিস্মিত নিষ্পাপ চোখ দুটোতে টলটল করে উঠল অশ্রু। তৰ্পণা বলল, ‘এই শোন এখানে থাকতে গেলে মন দিয়ে কাজ করে খেতে হবে।’ চুলটা ছেড়ে দিল তর্পণা। ‘নইলে তোর মামাকে বলব এসে নিয়ে যেতে। আমার পক্ষে তোকে রাখা সম্ভব নয়। যে ভাগাড়ের মাল সেই ভাগাড়েই গিয়ে মর।’

-খবরটা দেখেছি। খুব খারাপ খবর। যেমনই হোক, ছাত্র-ছাত্রীরা তো ছেলেমেয়ের মতই হয়৷

-যেমনই হোক! মানে?

কলেজের করিডোর দিয়ে ক্লাস থেকে স্টাফ রুমের দিকে আসতে আসতে স্বয়ম্ভুর সঙ্গে কথা বলছেন প্রফেসর উদয়ন পাণ্ডে। এক মাথা কাঁচাপাকা চুল, নাকের নীচে মোটা কালো গোঁফ। চিবুকের কাছে কাটা দাগটা আর পাঁচজনের থেকে ওনাকে আলাদা করে রাখে। লম্বা চওড়া চেহারা। ইন করে শার্ট পরেন। পায়ে চকচকে ব্রাউন রঙের জুতো। দেখলেই বেশ একটা ডাকসাইটে শিক্ষক বলেই মনে হয়। গলার স্বরে ভারিক্কি ব্যাপারটাও মাত্রাছাড়া নয়। সবমিলিয়ে শ্রদ্ধা করার মতই। শান্ত কণ্ঠেই বললেন, ‘কী বলি বলুন তো স্বয়ম্ভুবাবু। এত বছর হয়ে গেল ওরা যে যার মতো জীবন বেছে নিয়েছে। এখন এই বয়সে এসে ওদের সম্পর্কে বলতে খুব খারাপ লাগে।’ স্বয়ম্ভুও বেশ বিনয় নিয়েই বলল, ‘বুঝতে পারছি উদয়নবাবু। কিন্তু আমাদের কাছে বড় থেকে ছোট, যেকোনও ইনফরমেশনই ভীষণ ইম্পর্টেন্ট । তাছাড়া আপনি হয়তো জানেন না, খুনি আরও একজন যে কিনা অরুণারই বন্ধু তাকেও হুমকি দিয়েছে।’

-তাই নাকি?

-হ্যাঁ। অরুণার বাঁ পায়ের চারটে আঙুল কেটে সুস্মিতাকে পাঠিয়েছে।

-হোয়াট!

উদয়নবাবু আঁতকে উঠলেন। ‘কী বলছেন কী? ‘

-এটা আনঅফিশিয়ালি জানালাম আপনাকে। আশা করব এই কথাটা আমার আর আপনার মধ্যেই রাখবেন।

-ও শিওর শিওর। চলুন আমরা একটা ঘরে বসে কথা বলি।

-প্লিজ।

কয়েকটা পুরোনো ফাইল পাড়লেন উদয়নবাবু। স্বয়ম্ভু চেয়ারে বসে। কাজ করতে করতেই কথা বলে চলেছেন উদয়নবাবু, ‘ওরা যখন পড়ত তখন আমি প্রফেসর ছিলাম। এখন এই দু-বছর হল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রিন্সিপাল হয়েছি। আমি ওদের ক্লাসও নিয়েছি। সত্যি কথা বলতে কী, অরুণা, সুস্মিতা, মৃত্তিকা আর দিয়া এই ফোর মাস্কেটিয়ার্সের পড়াশুনোয় বিন্দুমাত্র মনোযোগ ছিল না। একবার তো দিয়া আর সুস্মিতাকে কলেজে গাঁজা আনার জন্য সাতদিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়।

-নেশাভাঙও করত?

-হ্যাঁ হ্যাঁ। সবরকম। এদের সঙ্গে একটা ছেলে ছিল।

-কী নাম?

-প্রিয়াংশু। তবে তমাল বলে আরেকটি ছেলের সঙ্গে সুস্মিতার বেশ মেলামেশা ছিল। সে এই কলেজের নয়। এই কলেজেরই একজন প্রফেসরের কোচিংয়ে পড়ত। সেখান থেকেই শুনেছি। দেখেওছি রাস্তাঘাটে। জানি না, ওদের এখন বিয়ে থা হয়েছে কিনা I

-না স্যার। তমালের সঙ্গে সুস্মিতার মেলামেশা থাকলেও বিয়েটা অরুণার সঙ্গে হয়। আর সুস্মিতা এখন প্রিয়াংশুর সঙ্গে থাকে ।

-ওরেব্বাবা। এরা এখনও খেলে যাচ্ছে।

চিলতে হাসির গমকে স্বয়স্তুর ঠোঁটটা অল্প বেঁকে গেল। ‘খেলা আরও ভয়ানক হয়ে গেছে উদয়নবাবু।’

-কীরকম?

-গতকাল অরুণার স্বামী তমাল ব্যানার্জিও খুন হয়েছে।

-সে কী! আমি যে তমালের কথা বলছি সে?

-ইয়েস। এতক্ষণে হয়তো তার ক্রিমেশন হয়েও গেছে। কপাল ভালো মিডিয়া এই মৃত্যুটার খবর এখনও পায়নি। আসলে বডিটা তো রেললাইনের ধারে পাওয়া যায়নি। বাড়িতেই ঘটেছে।

উদয়নবাবুর মুখটা বেশ গম্ভীর হয়ে গেল। স্বয়ম্ভূ বলল, ‘ঠিক সেই কারণেই আপনার কাছে আসা। ওরা স্কুল লাইফের বন্ধু নয়। চারজনেই কলেজ থেকে বন্ধু এবং যেহেতু অরুণার পরে সুস্মিতাকেও ভয় দেখানো হয়েছে তাই মনে করা হচ্ছে কলেজে এমন কেউ কী শত্রু ছিল ওদের যে এগুলো করতে পারে? ও, আরেকটা কথা। আপনি জানেন কিনা জানি না, অরুণা মৃত্যুর আগে বেশ কয়েকদিন ধরে একটা ফোন পাচ্ছিল। যে ফোনটা একেকবার একেকটা দেশ থেকে এসেছে। কখনও রাশিয়া তো কখনও চিন। তবে এটা যে ফেক সেটা বলাই বাহুল্য।`

-কে করছিল ফোনটা ?

-একটা বেড়াল।

-মানে?

-সেটাই তো রহস্য। ফোন যদি করবেই তাহলে গলা পালটে হুমকি দেবে, টাকা চাইবে। বেড়ালের ডাক শোনাবে কেন?

-এটা কোনও সংকেত?

-এক্সাক্টলি স্যার। আমাদেরও এটাই ধারণা। কিন্তু কেউ তো করছে। ম্যাও ডাকের পিছনে লুকিয়ে থাকা মানুষটা কে সেটাই জানতে হবে।

উদয়নবাবু যে ফাইলগুলো পাড়লেন সেখান থেকে দুটো ফাইল সরিয়ে রেখে দুহাজার নয় সালের ফাইলটি বেছে নিলেন। কয়েকটা পাতা উল্টোলেন । বললেন, ‘ইন দ্য ইয়ার টু থাউসেন্ড নাইন একটা কেস হয়। হঠাৎ একদিন একটি বাইরের ছেলে এসে কলেজে নালিশ করে এই ফোর মাস্কেটিয়ার্সের নামে ৷’

-কী অভিযোগ?

-রেপ কেস। প্রতারণা।

-বাজে কথা। জাস্ট বাজে কথা। দেশে আইন নেই? আমাদের ছেড়ে কথা বলত?

-দেশে আইন ছিল, আছে আর থাকবেও। কিন্তু আপনারা সেইবছর কলেজ ছেড়ে বেরিয়ে যান। তাই আর কলেজের পক্ষ থেকে কোনও স্টেপ নেওয়া হয়নি ৷

দিয়ার ক্যাফেতে বসেই কথা বলছে স্বয়ম্ভু। কলেজ থেকে সোজা দিয়ার ক্যাফেতে। পায়ের ওপর পা তুলে স্মার্টলি জবাব দিয়ে যাচ্ছে দিয়া।

-তাতে কী? কোনও কিছুই তো প্রমাণ হয়নি।

-হবে কী করে? মেয়েটা তো মুখই খুলতে পারেনি। কারণ সে ততদিনে প্রায় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।

-তাহলেই ভাবুন, একজন পাগল কি বলল না বলল সেইটাকে ধরে নির্দোষ চারটে মেয়েকে কে শাস্তি দেবে? আর আপনি একজন গোয়েন্দা হ…

কথাটা বেশ জোরেই বলে ফেলেছে। কাস্টমার আছে কয়েকজন। তাই আবারও গলা চেপে দিয়া বলে, ‘একজন গোয়েন্দা হয়ে এত বছর পর পুরনো বাজে মিথ্যে একটা কেস নিয়ে ডিস্টার্ব করতে এসেছেন। এর কোনও লজিক হয় মিস্টার সেন? তাছাড়া মেয়েটা স্পষ্ট বলেছিল যে আমাদের কোনও দোষ নেই। সব দোষ ওর নিজের।`

স্বয়ম্ভু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘শমন যখন সামনে এসে হ্যালো বলে যাবে তখন বুঝবেন স্বয়ম্ভু সেনের লজিক কী!’ দিয়ার মুখে একটা পরিবর্তন এল। নকল হাসি হেসে বলল, ‘শমন এসে ভয় দেখাবার আগেই আপনি চলে এলেন ভয় দেখাতে! আশ্চর্য!”

-এখনও কোনও ফোন পাননি?

দিয়া চমকে উঠল। চমকটা চোখ এড়াল না স্বয়ম্ভুর। দিয়া বলল, ‘কা… কার ফোন?’

-কার ফোন না জেনেই যা চমকে উঠলেন দিয়া ম্যাডাম তাতে সন্দেহ তো আরও বেড়ে গেল।

-কীসব বাজে বকছেন? কীসের চমক? কীসেরই বা ফোন?

স্বয়ম্ভূ তার মুখটাকে দিয়ার দিকে এগিয়ে নিয়ে বলে ওঠে, ‘মিয়াওওওও’। দিয়ার চোখের পাতায় আবার কেঁপে উঠল। ‘দেখেছেন তো, আবারও চমকে উঠলেন।`

-আমি কোনও ফোন পাইনি স্বয়ম্ভুবাবু।

জোর দিয়ে বলল দিয়া। স্বয়ম্ভূও তার শক্তিশেল ছুড়ে দিল, ‘স্বাভাবিক। কারণ ফোনটা আপনিই করেছেন। ‘

-ফাক… সরি। দেখুন, আপনার মন গড়া কথা শোনার সময় আমার নেই। অনেক কাজ আছে। কফি নেবেন?

-আজ আমি আপনার কাছে এসেছি। এরপরে লালবাজারে ডেকে পাঠাব। সব প্রমাণ জোগাড় করে। তখন আমি আপনাকে কফি খাওয়াব। আজ চলি?

দিয়া কিছু বোঝার আগেই স্বয়ম্ভু এগিয়ে গেল কয়েক পা। তারপরেই ফিরে তাকাল। আবার কী বলতে চায় গোয়েন্দা? এই ভেবে দিয়া উঠে দাঁড়াল। স্বয়ম্ভু কাছে এসে বলল, ‘সব খোলসা করে বললেই ভালো করতেন ম্যাডাম। তাহলে হয়তো এ যাত্রা রক্ষে পেতেন। কিংবা শাস্তিটা একটু কম হত!

-কিন্তু আমি তো…

দিয়া বলতে গেল। স্বয়ম্ভু কানেও তুলল না কথাটা। গটগট করে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে গেল। দিয়ার মাথায় এখন অজস্র প্রশ্ন। কী বলে গেল এসব? এ যাত্রা রক্ষে পেতেন? আবার শাস্তিটা একটু কম হত? মানে? একটু আগেই বললেন আমি নাকি ফোন করে ভয় দেখাচ্ছি। তাহলে আমাকেই…! সব কিছু তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে।

-কেন লুকোচ্ছিস?

পাশে এসে দাঁড়িয়েছে কিয়ারা। দিয়া অবাক। ‘তুই কখন এলি?’

-যখনই আসি। তুই ফোনের ব্যাপারটা লুকিয়ে ভালো করছিস না দিয়া ।

-ছাড় তো। শোন, অপরাধ যারা করে তারা সবথেকে বেশি ভীতু হয়। তাই ভাবে অন্যকেও বুঝি ভয় দেখিয়ে কাজ হাসিল করবে।

-অরুণা কি ভীতু ছিল?

-তা নয় তো কী? একদিনের জন্যেও সুস্মিতার মুখের ওপর বলতে পেরেছিল যে ও তমালকে ভালোবাসে? সবার আড়ালে প্রেম করত আর সামনে দেখাত সুস্মিতাকে কত ভালোবাসে। এটা ভীতু নয় তো কী?

কাচের গ্লাসে আলতো করে চুমুক দিল শিবাঙ্গী। সামনের টেবিলে রাখল। উল্টোদিকের সোফাতে বসে হাত কচলাচ্ছে মৃত্তিকা। পাখার তলায় বসেও ঘামছে। ‘আপনার কী হাই প্রেশার?’ শিবাঙ্গীর প্রশ্ন শুনে ‘অ্যাঁ’ বলে তাকাল মৃত্তিকা। যেন অন্য কোনও জগতে ছিল সে। ‘না না, কই, সেরকম তো কিছু… ।

-তাহলে এত ঘামছেন কেন?

কান এঁটো করা হাসি মৃত্তিকার ঠোঁটে। ‘না, আসলে এত ভ্যাপসা গরম। ঘরের ভিতর থেকে বাচ্চাটা কেঁদে ওঠে। মৃত্তিকার চোখ স্বভাবতই ঘরের দিকে চলে যায়। ‘আপনি দেখে আসতে পারেন। আমি বসছি।’ শিবাঙ্গী বলল।

-না, দীপা আছে।

-আয়া?

-হ্যাঁ।

-বেশ। তাহলে আর সময় নষ্ট না করে বলে ফেলুন।

-কী?

-কলেজে থাকতে আপনাদের কোনও শত্রু ছিল?

-কলেজে? না তো। *

-ঠিক?

-হ্যাঁ। আমাদের সকলেই ভালোবাসত। স্পেশ্যালি প্রফেসররা।

-পড়াশুনোয় ভালো ছিলেন?

-হ্যাঁ।

বলেই থমকে যায় মৃত্তিকা। ‘মানে ওই মোটামুটি। তবে ফেল করিনি কোনওদিন ।

-হুম ।

-তাহলে আপনার জীবনে শত্রু কে?

-কেউ না ।

-ভেবে বলুন মৃত্তিকা।

-সত্যি বলছি। শত্রু কেউ নেই। আমরা আমাদের মতো থাকতাম। পড়াশুনো করতাম। ঘুরতে যেতাম।

-ঘুরতে যেতেন? কাদের সঙ্গে? বাবা-মা?

-হ্যাঁ বাবা-মার সঙ্গেও গেছি। তবে কলেজে থাকতে আমরা চার বন্ধু ছিলাম। আমরাই ঘুরতে যেতাম।

-ছিলাম কেন বলছেন? এখন আর নেই?

-হ্যাঁ হ্যাঁ। তা থাকব না কেন?

-আপনার কী হাত চুলকনো বাতিক আছে?

ঝট করে কচলে চলা হাতদুটোকে থামিয়ে দেয়। ‘না না। এ…এমনি।’ -এমনি এমনি কেউ কিছুই করে না মৃত্তিকা ম্যাডাম। যা কিছু হয় তার পিছনে কোনও না কোনও কারণ তো থাকেই। এই যে অরুণা খুন হল। সুস্মিতা হুমকি পেল সেগুলো কী এমনি এমনি বলছেন?

-দেখুন ওদের ব্যাপারে আমি কী করে জানব?

-সে কী! আপনারা এতদিনের বন্ধু।

পাশের ঘর থেকে বাচ্চার কান্না থেমে গেছে। আয়ার গলা পাওয়া যাচ্ছে। বাচ্চাটার সঙ্গে খেলছে। মৃত্তিকা বলল, ‘হ্যাঁ বন্ধু তো নিশ্চয়ই। কিন্তু এখন আর তেমন দেখা সাক্ষাত হয় না। সংসার করে বাচ্চা সামলে আর সময় পাই না ।’

-বুঝলাম। কিন্তু আমাদের কাছে খবর আছে আপনার সঙ্গে অরুণার সম্পর্ক নাকি ভাল ছিল না!

-কে বলল?

-যেই বলুক। কথাটা সত্যি তো?

একটু ভাবল মৃত্তিকা। বলল, ‘হ্যাঁ। লাস্ট চার বছর আমাদের কোনও যোগাযোগ নেই।’

-কেন?

-ও সুস্মিতাকে ডিচ করে।

-তমালকে কেড়ে নেয়?

-হ্যাঁ।

-তার সঙ্গে আপনাদের সম্পর্ক কেন খারাপ হবে?

-আমিই সুস্মিতাকে বলেছিলাম। একবার নয়, অনেকবার। এমনকি, অরুণাকেও। অরুণা বলেছিল, ওদের ব্যাপারে নাক না গলাতে। যেদিন ধরা পড়ল সেদিন….

-কীভাবে ধরা পড়ল?

-দিয়ার জন্মদিনের দিন আমাদের একসঙ্গে খেতে যাবার কথা ছিল। লাস্ট মোমেন্টে অরুণা বলল ওর নাকি খুব শরীর খারাপ। আমরা বললাম, তাহলে আমরা ক্যান্সেল করি। অন্যদিন করব সেলিব্রেশনটা। ও বারণ করল। বলল, না না, তোরা ক্যান্সেল করিস না। ঠিক তখনই আমি শুনতে পেলাম, আরেকটা ফোন বাজার আওয়াজ। ভীষণ চেনা। তমালের ফোনে ওই রিংটোনটা বাজে। এদিকে চারপাশ চুপচাপ। ফোনের আওয়াজটা থেমে যেতেই আমিও ফোনটা কেটে দিই। তারপর একটা প্ল্যান করি। সুস্মিতাকে বলি, এই তমালকে আজ একটা সারপ্রাইজ দিই চল। আজ আমরা ওকে নিয়েই লাঞ্চে যাব। দিয়ার বরাবরই অনেক পয়সা। কোনও কিছুর পরোয়া করে না।

-তার মানে আপনার সন্দেহ হয়েছিল যে অরুণা তমালের বাড়িতেই আছে?

-হ্যাঁ ।

-কেন? তমালও তো অরুণার বাড়িতে আসতে পারত।

-তমাল কোলকাতায় একা থাকে। অরুণার বাড়িতে ওর বাবা-মা আছে ৷

-বেশ। তারপর?

-তারপর আর কী? গেলাম। বেল বাজালাম। তমাল বেরিয়ে এল আলুথালু বেশে। তাড়াহুড়োতে জামার বোতামটাও উল্টোপাল্টা। আমাদের দেখে তো থ ৷

তমাল চুল ঠিক করতে করতে বলল, ‘কী রে তোরা, এই সময়?’ সুস্মিতা কড়া গলায় বলল, ‘ঘরে যে আছে তাকে বেরিয়ে আসতে বল।’ তমাল তুতলিয়ে আমতা আমতা করে বলল, ‘ঘরে আবার কে থাকবে? কেউ নেই । তোরা খেতে যাসনি?’ আবার সুস্মিতা বলল, ‘সত্যি ঘরে কেউ নেই?’

-না রে বাবা! কে থাকবে? আমি একা মানুষ ।

-তাহলে ঘরে ঢুকতে দে। সর সর

মৃত্তিকা বলল। তমাল বাধা দিল প্রাণপনে। ‘এই না না শোন। দ্যাখ, এটা ভদ্রলোকের পাড়া। আমি একা একটা ছেলে থাকি। ভর দুপুরে এতগুলো মেয়ে একসঙ্গে আমার বাড়িতে দেখলে লোকে কী বলবে বল। আমার হেব্বি বদনাম হয়ে যাবে রে।’ দিয়া খিস্তি দিয়ে উঠল, ‘বোকাচোদার মতো কথা বলিস না তমাল। আমরা তোর বন্ধু। এই টু থাউসেন্ড সেভেন্টিনে এসে তিনটে মেয়ে তোর বাড়িতে এসেছে দেখলে পাড়ায় বদনাম হবে তোর? কলঙ্কিনী রাধা?’

-আঃ দিয়া। তমাল তো ঠিকই বলেছে।

সুস্মিতার মুখে হঠাৎ এই কথা শুনে ভড়কে গেল মৃত্তিকা আর দিয়া। তমালও হাসবে কি হাসবে না বুঝতে পারছে না। ‘এই কী বলছিস তুই?” দিয়া বলল।

-একটা ছেলের বাড়িতে তিনটে মেয়ে এলে পাড়ায় বদনাম তো হবেই। লোকে ভাববে দেখেছ, ছেলেটা এক সাথে তিনটে মেয়ের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করছে। কী খারাপ ছেলে। কিন্তু, যদি একটি মেয়ে আসে তাহলে পাড়ার লোকে ভাববে, আহারে, ছেলেটা প্রেম করছে। তাই না তমাল?

-হ্যাঁ, মানে বুঝিসই তো লোকের স্বভাব…

-তোর বাড়িতে তুই একা?

প্রশ্নটা আবার করল সুস্মিতা। তমাল হ্যাঁ এবং না-এর মাঝামাঝি একটা উত্তর দিতে না দিতেই সুস্মিতা বারান্দার মাটি থেকে একটা হিল দেওয়া লেডিস জুতো হাতে তুলে ধরল। ‘তুই কি আজকাল লেডিস জুতো পরছিস নাকি রে?’ ভেবলে গেল তমাল। মুখে পরবর্তী অভিব্যক্তি ফুটে ওঠার আগেই সপাটে একটা জুতোর বাড়ি পড়ল তমালের গালে। পরে আরও একটা। তাতে হল কী, সুস্মিতার মারের চোটে ঘরের ভেজানো দরজার ওপর গিয়ে পড়ল তমাল। হাট করে খুলে গেল দরজাটা। ঘর খালি। দিয়া আর মৃত্তিকা সোজা ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। নীচের ঘরে কেউ নেই। সুস্মিতার সঙ্গে তিনজনেই সোজা ওপরে উঠে এল। তমাল চিৎকার করে বাধা দিতে দিতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকল। ওপরের বেডরুমে ঢুকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল তিনবন্ধু। বিছানার ওপর গুটিসুটি মেরে বসে অরুণা। চোরের মত তাকিয়ে আছে। সুস্মিতা বলল, ‘তোর শরীর খারাপ না রে অরুণা? কী হয়েছে তোর? আমাদের বল। কীরকম শরীর খারাপ যে নিজের বাড়ি ছেড়ে একেবারে তমালের বিছানায় এসে উঠেছিস।’ এরপরেও গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল সুস্মিতা, ‘কী রে বল কীরকম শরীর খারাপ। শালা, বেশ্যা মাগী।’

-সুস্মিতা প্লিজ।

তড়পে উঠল তমাল। পাল্টা দিল সুস্মিতা। বুকে ফেলা ওড়নাটা ঝাঁকিয়ে তেড়ে গেল, ‘ওই শালা হারামি, একদম চুপ করবি তুই। তুই এত বড় বেইমান তমাল? তোর কার সাথে আলাপ আগে? অরুণা? না আমি? বল।’ কাঁদতে কাঁদতে কলার চেপে ধরল তমালের। দিয়া এগিয়ে এল। ‘সুস গায়ে হাত দিস না।’

-আরে ছাড় আমায়। ওকে খুন করে আমি জেলে যাব তাও ভালো। আর এই অরুণা?

এবার অরুণার দিকে তেড়ে গেল। ‘আমাদের চার বন্ধুকে লোকে ফোর মাস্কেটিয়ার্স বলত রে। ভুলে গেলি? সেই বন্ধুত্বে এইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করলি? আমার ভালোবাসা কেড়ে নিলি?’

এতক্ষণ অরুণা একটা কথাও বলেনি। শুধু ফুঁসছিল। এইবার চাপাস্বরে গর্জে উঠল, ‘তোর ভালোবাসায় জোর ছিল না সুস্মিতা। থাকলে আমি কেন, পৃথিবীর কেউ তমালকে তোর কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারত না।’ থমকে গেল সুস্মিতা। জল ভরা চোখে চেয়ে তমালকে বলল, ‘অরুণা কী বলছে তমাল? আমি তো তোকে প্রোপোজ করেছিলাম। জোর না থাকলে, মন প্রাণ দিয়ে তোকে না চাইলে বলতাম বল? বল অরুণাকে।’ তমাল বলল, ‘দ্যাখ সুস, তোর দিক থেকে হয়তো ওটা সত্যিই ভালোবাসা ছিল। কিন্তু আমার দিক থেকে ওটা শুধু ইনফ্যাচুয়েশন।’ দিয়া, সুস্মিতা আর মৃত্তিকা তিনজনেই তমালের দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তমাল বলছে, ‘জীবনে প্রথম একটা মেয়ে আমায় প্রোপোজ করেছে। যে দেখতে শুনতে ভালো। জলি। খিলখিল করে হাসতে পারে, মস্তি করতে পারে। তাকে ফেরাবার প্রশ্নই নেই। কিন্তু অরুণা আমার জীবনে আসার পর বুঝেছি অ্যাকচুয়াল ভালোবাসা কী!’ ঘরের মধ্যে থমথমে নিস্তব্ধতা। তমালের উত্তরটা সুস্মিতার শরীর থেকে যেন সবটুকু জীবনীশক্তি শুষে নিয়ে খাটের ওপর বসিয়ে দিল। দিয়া এগিয়ে গেল তমালের মুখের সামনে। বলল, ‘অরুণা তোকে ঠিক কীভাবে বোঝাল বল তো আসল ভালোবাসার মানে? বেড শেয়ার করে?’ তমালের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। বলল, ‘তুই বুঝবি না দিয়া। কারণ নারী-পুরুষের ভালোবাসার অনুভূতিটাই তোর নেই।’ হাতটা মুঠো করে ফেলল দিয়া। কিন্তু তুলল না । নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, ‘আগে ভালোবাসার মানেটা বোঝ। তারপর মেল-ফিমেল ডিফারনশিয়েটটা করিস। উদগাণ্ডু শালা।

সুস্মিতার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল দিয়া। ‘অনেক তো হল। এবার চ। আমার জন্মদিনে কোনওদিন এত ভালো সেলিব্রেশন হয়নি রে।’ মৃত্তিকা বলল, ‘অরুণা, তোকে অনেক ধন্যবাদ। তুই আর তমাল আমাদের চোখ খুলে দিলি। আমরা কী জানতাম? একসাথে মজা করতে পারি, ক্লাস বাংক করে সিনেমা দেখতে পারি, রাতে বারে মদ খেয়ে চূড়ান্ত বাওয়াল করতে পারি, ঝগড়া করতে পারি এমনকি মারপিটও করতে পারি। কিন্তু আমরা যে কেউ কাউকে এইভাবে ডিচ করতে পারি সেটা জানতাম না। সুস তুই কি এখনও এখানে বসে থাকবি? এই দিয়া ওকে তুলে নিয়ে আয়। ওদের ফুলশয্যাটা পুরো করতে দে।’

কথাগুলো বলতে আজও মৃত্তিকার গালদুটো রাগে লাল হয়ে গেছে।

-সেই থেকে আমাদের সঙ্গে, বিশেষ করে আমার সঙ্গে অরুণার কোনও সম্পর্কই নেই। দিয়ার সঙ্গে ছিল। তবে দিয়ার সঙ্গে তমালের কথা হত না।

-হুম। তার মানে অরুণা আর তমালের ওপর সুস্মিতা প্রতিশোধ নিতেই পারে। তাই তো?

মৃত্তিকা একটু ভেবে বলল, ‘নিতে পারে। তবে সুস্মিতা তো এখন প্রিয়াংশুর সঙ্গে থাকে। ও আর নতুন কোনও ঝামেলায় জড়াবে না ।

-নতুন কোনও মানে?

অজান্তে মুখ ফসকে কথাটা বলেই অস্বস্তিতে পড়ল মৃত্তিকা। শিবাঙ্গী প্রশ্নটা আবার করল। ‘না না, নতুন মানে ওই যে ওদের ঝামেলা হয়েছিল তার পর আর কিছুতে জড়াবে না তাই বলছিলাম।’

-আমাদের কাছ থেকে কিছু লুকোলে আপনারই ক্ষতি মৃত্তিকা। ভুলে যাবেন না আপনার একটা বাচ্চা মেয়ে আছে।

মৃত্তিকা আবার চমকে উঠল। গলার ঘাম মুছে বলল, ‘বললাম তো কিছু না ম্যাডাম।’

-আচ্ছা বেশ। বাদ দিন। আমায় একটা কথা বলুন, কলেজে থাকতে আপনাদের বিরুদ্ধে একটি ছেলে রেপ কেস আনে।’ মৃত্তিকার এবারের চমকানোটা বেশ নজরে পড়ার মতো। ‘মিথ্যে কথা। কিচ্ছু প্রমাণ হয়নি। আর প্লিজ শিবাঙ্গী ম্যাডাম, এটা আমার শ্বশুরবাড়ি এখানে এই কথাগুলো বলবেন না।’ শিবাঙ্গীর খটকা লাগল। ‘কেন বলুন তো? এখানে তো আপনি, আমি ছাড়া কেউ নেই। আপনার হাজব্যান্ডও নেই।’

-তবু।

-তার মানে আপনারও দোষ ছিল?

-না না তা কেন?

-নিশ্চয়ই তাই। নইলে লুকোতে চাইবেন কেন? আপনার স্বামী কিছু জানবেন না। নির্দ্বিধায় বলুন।

-কিচ্ছু বলার নেই ম্যাডাম, বিশ্বাস করুন।

-বিশ্বাস করার মত তো বলছেন না ম্যাডাম। আমাদের কাছে আপনাদের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের প্রমাণ আছে। সাক্ষীও আছে।

-সাক্ষী! কে?

-আপনাদের কলেজের প্রফেসররা। আর দিয়া।

-দিয়া!

-হুম। দিয়ার জবানবন্দি অনুযায়ী একটি ছেলে আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে যে আপনারা জোর করে ছেলেটির সর্বনাশ করেছিলেন।

-মিথ্যে কথা। ছেলেটাকে তো আমরা চিনতামই না। ও তো…

এ কী বলে ফেলছে মৃত্তিকা! কথাগুলো গলার কাছে এসে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। শিবাঙ্গীও এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চেপে ধরল, ‘ও তো? ও তো কী? ছেলেটাকে যদি নাই চেনেন তাহলে কাকে চিনতেন? আপনি যদি না বলেন তাহলে কিন্তু আমরা আপনার স্বামীর সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলতে বাধ্য হব।’

-না। প্লিজ না।

হাত নেড়ে আতঙ্কিত মুখে বলে উঠল মৃত্তিকা।

‘হেভেন অফ ফ্লাওয়ারস’-এর সামনে পুলিশ লেখা গাড়িটা এসে থামে। নন্দিনী খুব যত্ন করে এক ক্রেতাকে ফুলের বোকে তৈরি করে দিচ্ছিল। স্বয়ম্ভুকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে সে একটু থমকেই গেল। দোকানের ভিতরে বসে মোবাইল ঘাঁটছিল তর্পণা। স্বয়ম্ভুকে এগিয়ে আসতে দেখে তর্পণা তড়িঘড়ি এগিয়ে এল। স্বভাবতই ভুরুটা তার কুঁচকে আছে। একটা দোকানের সামনে যদি থেকে থেকেই পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়ায় তাহলে সেই দোকানের রেপুটেশন নিয়ে ক্রেতাদের মনে প্রশ্ন জাগে বৈকি। তৰ্পণা এগিয়ে এসে নন্দিনীর উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোর আর কতক্ষণ মা? এই তো কী সুন্দর হয়েছে!’ বলে নন্দিনীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। নন্দিনী একবার তাকালও না। চুপচাপ নিজের কাজ করে গেল। লক্ষ্য করল স্বয়ম্ভু।

-আবার বিরক্ত করতে এলাম তর্পণা ম্যাডাম ।

-না না, বিরক্ত কেন বলছেন? প্রয়োজন হলে একশোবার আসবেন। শুধু একটু অপেক্ষা করতে হবে। কাস্টমারকে আগে ছেড়ে দিই তারপর আপনার সঙ্গে কথা বলছি।

-প্লিজ।

-আপনি ভেতরে আসুন, প্লিজ।

-থ্যাংক ইউ ।

স্বয়স্তু দোকানের ভিতর ঢুকে এল। তর্পণা বিল করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। দোকানের ভিতর ঢুকলেই চোখ ধাঁধিয়ে যায়। আগেরদিনও মুগ্ধ হয়ে দোকানটাকে ভালো করে নিরীক্ষণ করেছে স্বয়ম্ভু। গ্ল্যাডিওলাস, কার্নেশন, নানা রকমের অর্কিড, পিটুনিয়া, ক্যান্ডিটাফট, ক্রিসান্থেমাম সঙ্গে হরেকরকমের দেশি ফুলও রয়েছে। এরই মাঝে একটা প্যাকেট রাখা। প্যাকেটের গায়ে লোগো ‘সুস্মিতা’স বুটিক’। আর তার মধ্যে একটা আলো জ্বলছে আর নিভছে। প্যাকেটের ওপর দিয়ে আলোর আভাটুকু দেখা যাচ্ছে। স্বয়ম্ভু বিলিং কাউন্টারের দিকে তাকাল। সেখানেও আরও একটি মোবাইল রাখা। যেটা হাতে নিয়ে তর্পণা একটু আগেই এগিয়ে এল। স্বয়ম্ভুর সামনে এক গ্লাস জল নিয়ে এসে দাঁড়াল নন্দিনী। বোবা মেয়েটার ভদ্রতায় যতটা মুগ্ধ হল স্বয়ম্ভু ঠিক ততটাই আশ্চর্য হল নন্দিনীর মুখের দিকে চেয়ে। এর আগেও নন্দিনীকে দেখেছে সে। একটু আগেও দেখেছে। কিন্তু এত কাছ থেকে দেখেনি।

কাস্টমারের বিল মিটিয়ে এগিয়ে এল তর্পণা। ‘বলুন স্বয়ম্ভুবাবু, এবার কী একেবারে প্রমাণ সমেত এসেছেন যে আমিই অরুণার খুনি?’ শেষ ঢোঁকটা গিলে জলের গ্লাসটা নন্দিনীর হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর তর্পণার দিকে সরাসরি ঘুরে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, ‘আপনার সঙ্গে তমালের শেষ কবে দেখা হয়েছে তর্পণা?’ মুখের হাসিটা অক্ষুন্ন রেখেই উত্তর দিল, ‘আবার সেই একই লোককে নিয়ে প্রশ্ন!

-দরকার আছে। সরাসরি উত্তর দিন।

-গতকাল।

স্বয়ম্ভূ হোঁচট খেল। ‘কোথায়?’

-ধর্মতলার সিটি লাইট ক্যাফেতে।

-কেন?

-ওই আমায় আসতে বলেছিল। বলতে পারেন, ঘ্যানঘ্যান করছিল। আমি দেখা করতে চাইনি। ও আমায় আগের দিন থেকে অজস্রবার ফোন করে। আমি ধরিওনি। কিন্তু বাধ্য হই এক সময় ধরতে। তখনই রিকোয়েস্ট করে প্লিজ একবারটি এসো। আর কখনও ডাকব না, দেখাও করতে বলব না৷ একটিবার তোমাকে দেখতে চাই।

-এত কথা বলে?

-হ্যাঁ। যত বলি পুলিশ আমাদের সম্পর্কটাকে ভালো চোখে দেখছে না। অরুণার খুনের জন্য ঠারেঠোরে সবাই আমায় দায়ী করছে। প্লিজ তুমি সরে যাও আমার জীবন থেকে। সে কে শোনে কার কথা। খারাপও লাগে মানুষটার জন্য। ওর কালকের কথাগুলো কীরকম যেন লেগেছিল আমার।

-কীরকম?

-ওই মানুষ যখন সব ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে চায় তখন যেরকমভাবে বলে সেরকমই। তখন আমিই বলি আমার সকালে ধর্মতলায় কাজ আছে। ওখানেই এসো।

-কী কথা হল?

-সেরকম কিছুই না স্বয়ম্ভুবাবু। ফোনে যা যা বলেছে সামনে দেখা হওয়াতে তাই তাই বলল। আমি উলটে বললাম, এর জন্য তুমি আমায় দেখা করতে বললে? তখন ও একটা কথা বলল জানেন, কথাটা খট করে বুকে এসে লাগল আমার ।

-খুব শক্ত কোনও কথা?

-মানে?

-না মানে খট করে বুকে এসে লাগল বলছেন তাই বলছি।

খোঁচাটা হজম করেই উত্তর দিল তর্পণা, ‘হ্যাঁ। শক্ত কথাই। আমায় বলল, ভালো থেকো। নিজের খেয়াল রেখো। আর হয়তো আমাদের কখনও দেখা হবে না। আমি জিজ্ঞেস করলাম কেন? ও বলল, চাকরিটা আমার আর থাকবে না আমি জানি। তাই সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাব। আমি বললাম, কোথায়? ও বলল, ঠিক করিনি। আমি বুঝলাম, ও জানাতে চায় না। ব্যস এটুকুই।

-তারপর?

-ও চলে গেল। আমিও দোকানে চলে এলাম।

-আপনাদের মধ্যে কতক্ষণ কথা হয়?

-ম্যাক্সিমাম পনেরো মিনিট।

-প নে রো মিনিট? সে তো অনেকক্ষণ।

-হ্যাঁ, ও খুব মুষড়ে ছিল। একটু কোল্ড কফি অর্ডার করেছিলাম। সেটা খেতেই যতটুকু সময়। কিন্তু কেন বলুন তো?

-মাফ করবেন, আমাকে আপনার ফোনটা একটু নিয়ে যেতে হবে ।

-সর্বনাশ। এ কী বলছেন? এটা অসম্ভব। আমার ব্যবসা চলবে কী করে? কারও সঙ্গে কন্ট্যাক্টই করতে পারব না তো ।

-কেন?

-কেন মানে, আমার ওই একটাই ফোন। ওটা দিয়েই সব। আমি পারব না স্বয়ম্ভুবাবু। আপনি এক কাজ করুন না, আমি ফোনটা এখনই দিচ্ছি। যা চেক করার করে নিন। কোনও অসুবিধে নেই।

ডানহাতের তর্জনি দিয়ে ঠোঁটের পাশটা চুলকে নিল স্বয়ম্ভু। ‘থাক লাগবে না। চলি। আর হ্যাঁ, গতকাল দুপুরে তমাল মারা গেছে।

-হোয়াট?

-ও আপনি জানতেন না?

-না। কীভাবে জানব?

মুখে হাত চাপা দিয়ে বসে পড়ল তর্পণা। ‘জানতাম, তমাল এই মানসিক যন্ত্রণা নিতে পারবে না। তাই আমি অনিচ্ছাসত্ত্বেও ওর সঙ্গে দেখা করি।

যাতে একটু হলেও ও শান্তি পায়। কিন্তু ও সেই সুইসাইড করল! কেন তমাল কেন?’

দুচোখের কোল বেয়ে অনায়াসেই নেমে এল জলের ধারা। দোকানের এক কোণে চুপটি করে দাঁড়িয়ে নন্দিনী। মুখে তার অসীম ভয়। স্বয়ম্ভুর চোখ এড়াল না সেটাও। গলা ঝেড়ে বলল, ‘না তৰ্পণা, আত্মহত্যা নয়। খুন। জলে পটাশিয়াম সায়ানাইড।’ তর্পণার সারা শরীর কেঁপে উঠল। আরও যেন ভয় পেয়ে বলে উঠল, ‘না না না, এ হতে পারে না। তমালকে কে খুন করবে?’

-সেটা তদন্ত সাপেক্ষ। তবে আপাতত যেটুকু জানা গেছে সেটা হল, অজস্রবার ফোন করার পর যখন আপনি তমালের ফোনটা রিসিভ করেন তখন মিনিট দশেক নয়, মাত্র এক মিনিট চার সেকেন্ড কথা হয়। আর এখনকার সব ক্যাফেতেই সিসিটিভি বলে একটা বস্তু আছে। চলি। খুব শিগগিরি আবার দেখা হবে।’ তর্পণা বসেই রইল। বোবা হয়ে। নন্দিনী ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল স্বয়ম্ভুর চলে যাওয়ার দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *