1 of 2

ব্রোঞ্জের গণেশ

ব্রোঞ্জের গণেশ

প্রথম দৃশ্য

(বসবার ঘর। ছন্দা বসে আছে। মনীশ নাগরাজনকে টানতে-টানতে ঢুকছে।)

মনীশ–চন্দা, ছন্দা–দ্যাখো, কে এসেছেন। আসুন, আসুন স্যার, বসুন। ভাগ্যিস দেখা হয়ে গেল। ধরে না আনলে তো আর আসতেন না।

ছন্দা–কী ব্যাপার, কাকে ধরে আনলে। ও, মিঃ নাগরাজন–নমস্কার।

নাগরাজন–নমস্কার।

মনীশ–দারোগাসাহেবকে ধরে আনলাম–উনি দারোগা, সবাইকে ধরেন-টরেন। আজ আমাকেই ধরে আনতে হল ওঁকে।

ছন্দা–খুব খুশি হলাম, মিঃ নাগরাজন। ভাবতেই পারিনি গরিবের ঘরে আপনার পায়ের ধুলো পড়বে।

নাগরাজন–Please, অমন করে বলবেন না, ম্যাডাম। জানেনই তো আমাদের যা কাজ। তবে একথা বিশ্বাস করতে পারেন যে, আজ আপনাদের এখানেই আসছিলাম।

মনীশ–আপনি তো তাহলে অনেকদিন জ্বালাবেন।

নাগরাজন–জ্বালাব? মানে?

মনীশ–জ্বালাবেন বইকি। একটু আগেই আমাদের মধ্যে কথা হচ্ছিল আপনাকে নিয়ে। ভাগ্যিস সেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হয়েছিল–নইলে ওর হারানো হাত ঘড়িটা তো আর ফিরে পেতাম না। নতুন জায়গায় এসেছি। সঙ্গে-সঙ্গে একটা অমঙ্গল ঘটলে মন খারাপ হয়ে যেত না? উঃ, চিমটি কাটছ কেন?

নাগরাজন–সাজপোশাক দেখে মনে হচ্ছে আপনারা কোথাও বেরুচ্ছিলেন। আমি এসে শুভযাত্রায় বাদ সাধলাম নিশ্চয়ই। আমি বরং–

মনীশ–আরে না মশাই। রাখুন আপনার ওঠা। আপনি এলেন আর আমরা বেড়াতে বেরুব? না, না। তার চেয়ে বরং Let us celebrate your presence today. কী বল?

ছন্দা–আপনারা বসুন–আমি আসছি।

নাগরাজন–না, না, আপনি আবার কেন ব্যস্ত—

ছন্দা–আঃ, আপনি বসুন তো চুপচাপ। এ বাড়িতে আমি গিন্নি তা জানেন?

(ছন্দার প্রস্থান)

নাগরাজন–সপ্রশংসভাবে) Really she is a gem. সত্যি মশাই স্ত্রীভাগ্য আছে বটে আপনার।

মনীশ–ওকে নিয়েই তো আছি মশাই। ওর জন্যেই সব ছেড়েছি, বাপ মায়ের স্নেহ হারিয়েছি। আবার ওর মধ্যেই পেয়েছি ঘরের সমস্ত উত্তাপ উষ্ণতা। যা হারিয়েছিলাম সব পেয়েছি। জানেন ইন্সপেক্টর, ও ছাড়া আমার আর কেউ নেই এ সংসারে।

নাগরাজন–শুনে খুশি হলাম। যাক, মাইশোর কেমন লাগছে বলুন?

মনীশ–প্রথম-প্রথম তো সব জায়গাই ভালো লাগে। বিশেষ করে মহীশূরের মতো সুন্দর জায়গা কার না ভালো লাগে। খুব বেড়াচ্ছি-টেড়াচ্ছি তা তো দেখতেই পাচ্ছেন। তবে কতদিন এ চার্ম বজায় থাকবে তা জানি না।

নাগরাজন–থাকবে থাকবে মশাই। আমি তো প্রায় তিন বছর কাটিয়ে দিলাম। এখনও তো বেশ ভালো লাগছে। আপনাদের কলকাতার সেই কর্মমুখর প্রাণচাঞ্চল্য এখানে নেই বটে কিন্তু এখানকার এই নৈঃশব্দ্যই এর প্রাণ। থাকুন, ভালোবাসুন–তখন ছাড়তেই চাইবেন না।

মনীশ—(মুগ্ধভাবে) বাঃ! পুলিশে চাকরি করেও ভারি চমৎকার কবি-প্রকৃতি তো আপনার। বাংলা vocabulary তো বেশ strong করেছেন দেখছি। কী স্যার, লেখার অভ্যাস- টভ্যেস আছে নাকি?

(ট্রে হাতে ছন্দার প্রবেশ)

ছন্দা–খুব তো জমিয়ে গল্প হচ্ছে। নিন এবার কিছু খেয়ে নিন।

নাগরাজন–Very good, দিন মিসেস সরকার। Mr. Sarkar জিগ্যেস করছিলেন, আমি সাহিত্যচর্চা করি কিনা। বলছিলাম আমার তো বই পড়াই হয়ে ওঠে না, লেখা দূরে থাক।

ছন্দা–-ও হো, আপনি তো আসল ব্যাপারটাই জানেন না। আসুন পরিচয় করিয়ে দিই। Mr. Nagrajan আপনি যেমন পুলিশের কাজে গোয়েন্দাগিরি করেন, ইনি মনীশ সরকার তেমনি বাংলা পাঠক সমাজে গোয়েন্দা কাহিনি লিখে বিলক্ষণ দুর্নাম কিনেছেন সেই সাথে আমাকেও ডুবিয়েছেন। আঃ চুল টানছ কেন?

নাগরাজন–By jove, আপনি ডিটেকটিভ গল্প লেখেন নাকি?

ছন্দা–আপনি মশাই, ওর কাছে খুনের গল্পটগ্ধ করবেন না যেন। ঘুমিয়ে জেগে সবসময়ে তো খুন করে চলেছে। কোনওদিন না আমাকেই

নাগরাজন–হেসে) নাঃ আপনাদের দেখছি কস্মিনকালেও বনিবনা হবে না।

মনীশ–নতুন কী অ্যাডভেঞ্চার করলেন মশাই?

নাগরাজন–অ্যাডভেঞ্চার বলতে যা বোঝায় ঠিক তা নয়, তবে সম্প্রতি একটা অদ্ভুত খুনের ঘটনা আমাকে বড়ই ভাবিয়ে তুলেছে।

মনীশ–তাই নাকি! কী ব্যাপারটা বলুন তো?

নাগরাজন–অবশ্য অত্যন্ত গোপনীয় ব্যাপারটা। মহীশূর রাজপরিবারের সমস্ত সম্মান নির্ভর করছে এই ব্যাপারটা সমাধানের ওপর। তবে আপনাদের বলতে বাধা নেই, কারণ আপনাদের আমি Family friend বলেই মনে করি। (একটু থেমে) ললিতা মহল দেখেছেন আপনারা?

মনীশ–কোন ললিতা মহল? গেস্ট হাউসের কথা বলছেন?

নাগরাজন–হ্যাঁ।

মনীশ–বাড়িটার কথা শুনেছি বটে। দেখা হয়ে ওঠেনি এখনও।

নাগরাজন–দেখে আসবেন একদিন। এখান থেকে মাইল চারেক দুরে মহারাজ কৃষ্ণরাজা ওয়াদিয়ার রাজবাড়ি। প্রাসাদ তোরণের সামনেই দেখবেন একটি Circle. ঠিক কেন্দ্র থেকে পরস্পর সমকোণে চলে গেছে দুটি রাস্তা। একটি রানি মহলের দিকে–নাম শুনেই বুঝতে পারছেন রানি মহল কী। আর একটা গিয়ে পৌঁছেছে এই ললিতা মহলে। মহীশুর রাজন্যবর্গের সম্মানিত অতিথিদের জন্য সংরক্ষিত গেস্ট হাউস। এই ললিতা মহলেই কয়েকদিন আগে পাওয়া গেছে একটি মৃতদেহ। হৃৎপিণ্ডের মাঝখান দিয়ে কেউ ধারালো সরু একটা শলাকা চালিয়ে দেওয়ার ফলে তৎক্ষণাৎ মৃত্যু ঘটে।

মনীশ–মৃত ব্যক্তি কে?

গরাজন–তার কথা বলতে গেলে রাজপরিবারের একটা ছোট্ট ইতিহাস বলতে হয়।

মনীশ–বলতে বাধা থাকলে বরং থাক।

নাগরাজন–না, আপনাদের বলতে কোনও বাধা নেই। প্রথমেই বলে রাখি বর্তমান মহারাজা কৃষ্ণরাজা নিঃসন্তান। এই সন্তান না হওয়ার পেছনে আছে এক করুণ অথচ Interesting কিংবদন্তী। বহু বছর আগে এ বংশের এক রাজকন্যা কুলদেবীর আরাধনায় উন্মাদিনী হয়েছিলেন। নিজেকে দেবীর চরণে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়ে দিবানিশি বিভোর হয়ে থাকতেন তাঁর পূজায়। একদিন তিনি মনস্থ করলেন তার যাবতীয় রত্নালঙ্কার দেবীকে উৎসর্গ করবেন নদীগর্ভে বিসর্জন দিয়ে। সমস্ত রত্নালঙ্কার তিনি সেই উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। তখনকার মহারাজা ছিলেন তাঁর ভাই। তিনি বোনের এই সঙ্কল্পের কথা জানতে পেরে তাকে জানালেন রাজপরিবারের সমস্ত অলঙ্কার আর রত্নরাজি দেশবাসীর। তাদের অমতে এবং অজ্ঞাতসারে কোষাগারের একরতি স্বর্ণও তিনি অপব্যয় করতে পারেন না। রাজভগ্নী বোঝাবার চেষ্টা করলেন–এ অপব্যয় নয়, দেবীর কাছে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কিন্তু মহারাজ তার সিদ্ধান্তে অটল। বোনের খেয়াল চরিতার্থ করতে দেশবাসীকে তিনি বঞ্চিত করতে পারেন না।

ছন্দা–Interesting গল্প তো–

নাগরাজন–সেই রাতেই নদীতীরে আবির্ভূত হল অভিমানী রাজকন্যার তপঃক্লিষ্ট দেহ। বসনাঞ্চলে তার যাবতীয় স্বর্ণালঙ্কার। সেই বিপুল ঐশ্বর্য হাতে নিয়ে তিনি নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে রাতের অন্ধকারে উচ্চারণ করলেন এক অভিশাপ বাণী–দেবীর চরণে অঞ্জলি সমর্পণে বাধা দেয় যে রাজবংশের মহারাজা, আজ থেকে সে রাজন্যবর্গ হবেন নিঃসন্তান। এই বলে তিনি অলঙ্কার সমেত নদীগর্ভে তলিয়ে গেলেন।

মনীশ–কী ভয়ানক! তারপর?

নাগরাজন–তারপর উত্তাল উদ্দাম হাওয়া হাহাকার রবে আছড়ে পড়ল তার ওপর নিঃশব্দ ক্রন্দন যেন। ফিরিয়ে আনতে চাইল তাঁকে। কিন্তু নদীগর্ভের আবর্ত আরও দুর্নিবার বেগে আবিল হয়ে আহ্বান জানালেন রাজকুমারীকে। মুহূর্তের মধ্যে পুঞ্জ-পুঞ্জ ফেনার মাঝে হারিয়ে গেল রাজকন্যার শুভ্র বরতনু–সেই সাথে যাবতীয় রত্নরাজি। এরপর থেকেই দেখা গেছে সিংহাসনে সমাসীন এক মহারাজার সন্তান হয়েছে–কিন্তু পরবর্তী মহারাজা থেকেছেন নিঃসন্তান। তার পরবর্তী রাজার আবার সন্তান হয়েছে। জানি না এর মধ্যে অলৌকিক ব্যাপার আছে কিনা। কিন্তু বংশানুক্রমিক ভাবে এই ব্যাপারেই পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গেছে। বর্তমান মহারাজা নিঃসন্তান। প্রচলিত প্রথানুযায়ী তিনি পোয্য নিয়েছেন যুবরাজ চন্দ্রকেতুকে।

ছন্দা–বাবা! দেবী তাহলে খুব জাগ্রত বলুন?

নাগরাজন–আজ্ঞে হ্যাঁ। সে বিষয়ে কোনও সন্দেহই নেই। তার প্রসাদেই এ রাজ্যের আজ এত উন্নতি। কৈশোরেই এই চন্দ্রকেতুকে মহারাজ ইংলন্ডে পাঠিয়েছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। Physics এ ডক্টরেট নিয়ে আট বছর পর যুবরাজ যখন স্বদেশে ফিরলেন তখন তিনি আর একা নন সঙ্গে তার স্ত্রী পেট্রিসিয়া। পেট্রিসিয়া স্পেনের মেয়ে। পড়াশুনো করতে এসেছিলেন লন্ডনে। সেখানেই তাদের পরিচয়, প্রণয় এবং পরিণয়। মহারাজা যুবরাজকে স্নেহ করতেন প্রাণের চেয়েও বেশি। তাই অন্তরে শেল হানলেও ক্ষমা করলেন তাকে। কিন্তু যুবরানির থাকার ব্যবস্থা হল মূল প্রাসাদের বাইরে– রানি মহলে। যুবরাজ আপত্তি করলেন না। এসব ঘটনা ঘটে বছর তিনেক আগে। যুবরানির প্রথম আগমনে কিছুটা চাঞ্চল্যের সূত্রপাত হয়েছিল কিন্তু কালের প্রবাহে ধীরে-ধীরে সবই স্বাভাবিক হয়ে আসে। মাসখানেক আগে যুবরানির এক বাল্যবন্ধু এলেন এখানে ভারতবর্ষ বেড়াতে। নাম এ্যান্টনি মার্সডেন।

ছন্দা–রানির লাভার নিশ্চয়।

নাগরাজন–হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন। এই ললিতা মহলেই উঠেছিলেন। ললিতা মহলের বিরাট লাইব্রেরিতে আছে নানারকম সংগ্রহ। সেইসব নিয়েই মেতেছিলেন। প্রায় দিন সাতেক আগে মার্সডেনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় এই লাইব্রেরির মধ্যে গণেশ মূর্তির পায়ের কাছে।

মনীশ–গণেশ মূর্তি?

নাগরাজন–হ্যাঁ। যুবরাজের সংগ্রহ বাতিক আছে। নানারকম মুদ্রা থেকে শুরু করে মূর্তি ইত্যাদি সংগ্রহ করে এক ছোট আর্ট মিউজিয়ামও করেছেন ললিতা মহলে। ব্রোঞ্জের তৈরি এই বিরাট গণেশ মূর্তিটি লাইব্রেরি রুমেই রাখা হয়েছে একটি সিংহাসনের ওপর। তারই পায়ের তলায় মার্সডেনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। একটা সরু ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেউ তার হৃৎপিণ্ডটা এফেঁড়-ওফেঁড় করে দিয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় মৃতদেহের মুখে কোনও ভয় বা যন্ত্রণার চিহ্নমাত্র ছিল না। ছিল অপার বিস্ময়।

মনীশ–ঘরটা আপনি হত্যার পর দেখেছেন নিশ্চয়। কিছু ক্ল পাননি?

নাগরাজন–কি না। মার্সডেন মারা গেছে আগের রাত্রে পোস্টমর্টেমে এর বেশি কিছু পাওয়া যায়নি।

মনীশ–সে রাত্রে গেস্ট হাউসে কে-কে ছিল?

নাগরাজন–মার্সডেন আর নিয়মিত দারোয়ান, বয়, বাবুর্চি–এরা ছাড়া আর কেউ না।

মনীশ-যুবরাজ?

নাগরাজন–যুবরাজ সে রাত্রে রাজধানী থেকে প্রায় মাইল দশেক দূরে রিজার্ভ ফরেস্টে শিকার করতে গিয়েছিলেন। সকালে খবর পাঠানো মাত্র ফিরে আসেন।

মনীশ–তাহলে মোটের ওপর কোনও দরকারি সূত্রই আপনি পাননি–তাই না?

নাগরাজন–একেবারে না।

মনীশ–আচ্ছা, ব্যক্তিগতভাবে কারও ওপরে সন্দেহ হয় না আপনার?

নাগরাজন–সন্দেহ আর কাকে করব? যতদূর জানা গেছে, মার্সডেনের সঙ্গে এ রাজ্যে পরিচয় ছিল শুধু দুজনের–যুবরাজ ও যুবরানির। এই কদিনের মধ্যে তাদের সঙ্গে শত্রুতা গড়ে ওঠাও অস্বাভাবিক। তাছাড়া ললিতা মহল থেকে উনি বাইরে বেরুতেন কদাচিৎ–বেরোলেও গন্তব্যস্থান ছিল রানিমহল। কিন্তু যুবরাজ ও যুবরানির alibi অকাট্য। একজন ছিলেন রানিমহলে। আর একজন রিজার্ভ ফরেস্টে। এ বিষয়ে সাক্ষ্য প্রমাণও পেয়েছি যথেষ্ট।

মনীশ–আশ্চর্য!

নাগরাজন–আরও আশ্চর্য হবেন যে, লাইব্রেরি ঘরের সমস্ত দরজা জানলা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। প্রত্যেকটি স্ন্যাস উইন্ডো আর দরজা শক্তভাবে আঁটা ছিল ভেতর থেকে। সকালে দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার পর তাই দেখা গেছে।

মনীশ–বন্ধ ঘরের মধ্যে মৃতদেহ পাওয়া গেলে দুটো পথে এ রহস্যের সমাধান পাওয়া যেতে পারে। এক নম্বর–মৃতব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে কিনা। দু-নম্বর–ঘরের মধ্যে কোনও গুপ্ত দরজা আছে কিনা। বিশেষ করে রাজা-মহারাজার বাড়ি যখন।

নাগরাজন–মিঃ সরকার, আমারও সেকথা মনে হয়েছিল। কিন্তু Postmortem report বলছে তীক্ষ্ণ শলাকাটা যেভাবে হৃৎপিণ্ডে বিঁধেছে, আত্মহত্যায় সেটা সম্ভব নয়। তাছাড়া অস্ত্রটাই বা যাবে কোথায়? সেটাও তো অনেক খোঁজা হয়েছে। কাজেই আত্মহত্যায় প্রশ্নটা ধোপে টেকে না।

মনীশ–গুপ্ত দরজার খোঁজ করেছিলেন?

নাগরাজন–মহারাজকে আমার সন্দেহের কথা খোলাখুলি বলেছিলাম। উনি আমায় গেস্ট হাউসের পুরোনো নক্সা দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন যে ললিতা মহলের কোথাও নেংটি ইঁদুরের জন্যেও গুপ্তপথ রাখা হয়নি।

ছন্দা–আচ্ছা, আপনি যুবরাজ বা যুবরানির সঙ্গে এ প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা করেননি? তাদের কী মত?

নাগরাজন–এটা অবশ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সন্দেহ নেই। দেখুন, আপনাদের আমার ভালো লেগেছে। এসব ব্যাপার অত্যন্ত Secret, তবু এতটা যখন আপনাদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করেছি, তখন সঙ্কোচের বাধা আর রাখব না। যুবরাজের সঙ্গে আমার যে আলোচনা হয়েছিল তা খুব প্রীতিকর নয়।

মনীশ–যেমন।

নাগরাজন–শুনুন তবে।

.

দ্বিতীয় দৃশ্য

(রাজঘর। যুবরাজ চন্দ্রকেতু বসে আছেন দামি চেয়ারে।
নাগরাজন দাঁড়িয়ে সামনে, পুলিশি বেশে।)

চন্দ্রকেতু–এ কেস হাতে নিয়েছেন আপনি?

নাগরাজন–Yes, your হাইনেস।

চন্দ্রকেতু–সবাইকে জেরা করেছেন?

নাগরাজন–Yes, your—

চন্দ্রকেতু–কী বলে তারা?

নাগরাজন–রাত্রে ইনি ছাড়া এখানে কেউ ছিলেন না। দরজা জানলা ভিতর থেকেই বন্ধ ছিল। কোনও চিৎকারও শোনা যায়নি।

চন্দ্রকেতু–কী মনে হয় আপনার? Suicide?

নাগরাজন–কোনও অস্ত্র তো পাওয়া যাচ্ছে না।

চন্দ্রকেতু–মার্ডার?

নাগরাজন–দরজা-জানলা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল, হাইনেস। খুনি এল কোথা দিয়ে গেলই বা কী করে?

চন্দ্রকেতু–খুনও নয়–আত্মহত্যাও নয়। Well, then?

নাগরাজন–এ রহস্যের কিনারা করতে সময়ের প্রয়োজন।

চন্দ্রকেতু–বটে। সময় পেলে কিনারা করতে পারবেন? বেশ, দিলাম সময়। করুন কিনারা। You want my statement?

নাগরাজন–If you please.

চন্দ্রকেতু–মার্সডেনের সঙ্গে আমার আলাপ মাত্র একমাসের আর গতরাত্রে আমি Forest এ ছিলাম আমার অনুচরদের সঙ্গে–এই আমার জবানবন্দি। আর খুনি কে তা যদি জানতে চান তাহলে শুনুন–খুনি আমি নিজে।

নাগরাজন–Your হাইনেস, আমি একজন নগণ্য কর্মচারী। আপনার পরিহাসের যোগ্য নই।

চন্দ্রকেতু–পরিহাসের সময় এটা নয় Inspector। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, এটা আত্মহত্যা না খুন–আমি বলব খুন। যদি জিগ্যেস করেন, খুনি কে? বলব আমি স্বয়ং। তারপরের কাজটা–প্রমাণ করার দায়িত্বটা আপনার আমার নয়। প্রমাণ করুন, আমি খুনি। সময় চাইছিলেন– সময় দিলাম।

(শিস দিয়ে প্রস্থান)

.

তৃতীয় দৃশ্য

(বসবার ঘর। নাগরাজন, ছন্দা আর মনীশ বসে রয়েছে।)

নাগরাজন–(চিন্তিতভাবে) যুবরাজ সময় দিয়েছিলেন বটে, কিন্তু প্রায় একমাস হয়ে গেল। Mr. Sarkar, এক পা-ও এগুতে পারলাম না।

মনীশ–যুবরাজের কথা শুনে আপনার কী মনে হল? সত্যিই কি তিনি

নাগরাজন–ভগবান জানেন। যে সুরে তিনি কথা বললেন–তা থেকে সত্যি মিথ্যে ধরা অসম্ভব।

মনীশ–মার্সডেনের সঙ্গে কি যুবরাজের কোনওরূপ শত্রুতা থাকা সম্ভব? মানে যদি কোনও ত্রিভুজ প্রেমের ব্যাপার–

নাগরাজন–কী করে বলি বলুন? যদি সেরকম কিছু থেকে থাকেও, যুবরানির confession ছাড়া তো সেকথা জানা যাবে না কোনওদিন।

মনীশর–Statement নেননি এখনও?

নাগরাজন–রাজাদের ঘরের বউয়ের নাগাল কি আর অত সহজে পাওয়া যায় মনীশবাবু। দরখাস্ত করেছি মহারাজের কাছে। এখনও অনুমতি মেলেনি। তবে গতকাল একটা চিরকুট পেয়েছি যুবরানির কাছ থেকে। এই দেখুন–

(নাগরাজন চিরকুট দিল মনীশের হাতে। মনীশ সামনে ধরে রয়েছে)

মনীশ–নারীকণ্ঠে শোনা যায় চিরকুটের কথাগুলি) মার্সডেনের মৃত্যু রহস্য নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করলে উপকৃত হবেন। কোনও Signature নেই দেখছি। কবে যাচ্ছেন?

নাগরাজন–কাল যাওয়ার ইচ্ছে আছে। আপনিও চলুন না আমার সঙ্গে।

মনীশ–আমি মানে কিন্তু তিনি ডেকেছেন আপনাকে আমাকে allow করবেন কেন?

নাগরাজন–সে দায়িত্ব আমার। দেখুন crime detection-এর দিক দিয়ে কলকাতা যে আজ ভারতবর্ষকে পিছনে ফেলে দিয়েছে তা আমার অজানা নয়। এদিক দিয়ে বাঙালিদের আমি শ্রদ্ধা করি। তা ছাড়া আপনি ডিটেকটিভ গল্প লেখেন–জেরা করার একটা সহজাত প্রবণতা থাকা আপনার স্বাভাবিক। কী বলেন, মিসেস সরকার?

ছন্দা–তা আর বলতে। আমি তো একেবারে জেরবার হয়ে যাচ্ছি দিনেরাতে।

(সকলে হেসে ওঠে)

মনীশ–কিন্তু।

নাগরাজন–আর কোনও কিন্তু নয়, তাহলে ওই কথাই রইল।

.

চতুর্থ দৃশ্য
(রানির ঘর। যুবরানি প্যাট্রিসিয়া, নাগরাজন আর মনীশ।)

প্যাট্রিসিয়া–Your name please?

নাগরাজন–আলেক নাগরাজন–C.I.D. Inspector, যাকে আপনি আসতে বলেছিলেন। আর ইনি হচ্ছেন আমার বন্ধু মনীশ সরকার বাঙালি। ইনি একজন অ্যামেচার প্রাইভেট ডিটেকটিভ।

প্যাট্রিসিয়া–বিশ্বাস করতে পারি নিশ্চয়ই?

নাগরাজন–আমাকে যদি পারেন–তাহলে ওঁকেও পারবেন।

প্যাট্রিসিয়া–বেশ, বলুন কী জানতে চান।

নাগরাজন–Your highness আমাকে আজ ডেকে পাঠিয়েছিলেন to discuss Mr. Marsdens death.

প্যাট্রিসিয়া–Right. But do you think it an ordinary death?

নাগরাজন–Postmortem একে আত্মহত্যা নয় বলেই Report দিয়েছে।

প্যাট্রিসিয়া–Alright. আপনি কি জানেন It is a case of murder?

নাগরাজন–Yes, your highness

প্যাট্রিসিয়া–হত্যাকারী কে, জেনেছেন?

নাগরাজন–আমি যদি বলি, বিশ্বাস করবেন না, Your highness।

প্যাট্রিসিয়া–হত্যাকারীকে উচিত শাস্তি দিতে পারবেন? ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলুন।

নাগরাজন–শপথ করছি।

প্যাট্রিসিয়া–মার্সডেনের সঙ্গে এ দেশে কার কার আলাপ আছে জেনেছেন?

নাগরাজন–যতদূর জেনেছি, শুধু আপনার সঙ্গে আর যুবরাজের সঙ্গে।

প্যাট্রিসিয়া–এদের মধ্যেই একজন খুনি।

মনীশমাপ–করবেন। কিন্তু এক্ষেত্রে স্পষ্ট প্রশ্ন করা ছাড়া উপায় নেই।

প্যাট্রিসিয়া–Dont hesitate।

মনীশ–আপনি নিশ্চয় খুন করেননি?

প্যাট্রিসিয়া—(মৃদু হেসে) আপনার অনুমান সত্য। আমি তাকে ভালোবাসতাম।

মনীশ–একথা যুবরাজ জানতেন?

প্যাট্রিসিয়া–Yes, জানতেন।

মনীশ–কতদিন থেকে।

প্যাট্রিসিয়া–স্পষ্টভাবে জানতে পারেন বিয়ের ছমাস পর থেকে।

মনীশ–Excuse me, এরপর থেকে কি আপনাদের মধ্যে অশান্তির সূত্রপাত হয়?

প্যাট্রিসিয়া–Thats right।

মনীশ–কিন্তু Mr. Marsden হঠাৎ এ দেশে এলেন কেন?

প্যাট্রিসিয়া–আমায় নিয়মিত চিঠি লিখত Marsden। আমিও লিখতাম। আমার এ দেশে আসার পর প্রায় ছমাস ঠিকমতো তার চিঠি পেয়েছিলাম। তারপর হঠাৎ একদিন বন্ধ হয়ে গেল চিঠি আসা। অধীর হয়ে চিঠির পর চিঠি লিখতে লাগলাম। কিন্তু কোনও উত্তর পেলাম না। তারপর হঠাৎ একদিন মার্সডেন এসে হাজির হল এখানে।

মনীশ–আমার ঔদ্ধত্য মার্জনা করবেন, কিন্তু Mr. Marsden-এর চিঠিগুলো যুবরাজের হস্তগত হয়েছে, একথাই কি আপনি বলতে চাইছেন?

প্যাট্রিসিয়া–আপনার অনুমান সত্য এবং সেই ব্যাপারেই বোঝাঁপড়া করতে চেয়েছিল। মার্সডেন।

মনীশ–তারপর?

প্যাট্রিসিয়া–এখানে এসে মার্সডেন প্রথমেই আমার সঙ্গে দেখা করে সব ব্যাপারটা আমায় জানায়। তারই নির্দেশমতো আমি যুবরাজের সঙ্গে দেখা করি। ভালোভাবেই শুরু করি কথাবার্তা– একথা-সেকথার পর আসল প্রসঙ্গে এলাম।

.

পঞ্চম দৃশ্য
(রাজঘর। যুবরাজ আর যুবরানি বসে আছেন)

চন্দ্রকেতু–কিছু বলবে?

প্যাট্রিসিয়া–হ্যাঁ ডার্লিং, একটা কথা তোমায় বলার ছিল–If you dont mind–

চন্দ্রকেতু–Oh yes, বলবে বইকী। বলার যখন আছে তখন নিশ্চয় বলবে। বলো–আমি শুনছি।

প্যাট্রিসিয়া–বেশ কিছুদিন ধরে আমার চিঠিপত্র নিয়মিত পাচ্ছি না।

চন্দ্রকেতু–তাই নাকি? বেশ, আমি খোঁজ নিচ্ছি।

প্যাট্রিসিয়া–খোঁজ আমি নিজেই নিয়েছি। অন্য সব চিঠি আমি ঠিক পেয়েছি। শুধু একজনের চিঠিরই গোলমাল হচ্ছে।

চন্দ্রকেতু–কে সেই ভাগ্যবান?

প্যাট্রিসিয়া–তার নাম তোমার অজানা নয়, চন্দ্র। মার্সডেনের একটা চিঠিও আমি গত কমাস ধরে পাইনি। What happened to those letters?

চন্দ্রকেতু–(তীব্রস্বরে) আমার সঙ্গে নরম সুরে কথা বলো, প্যা। মনে রেখো এটা তোমার মাদ্রিদ নয়।

প্যাট্রিসিয়া–জানি এটা মাদ্রিদ নয়–এটা Mysore, তোমার স্বদেশ–তোমার স্বেচ্ছাচারিতার, তোমার উজ্জ্বলতার লীলাক্ষেত্র। কিন্তু তাই বলে আমার ব্যক্তিগত চিঠি চুরি করার মতো মনোবৃত্তি আমি তোমার কাছে আশা করিনি।

চন্দ্রকেতু–চুরি।

প্যাট্রিসিয়া–Yes চুরি। না বলে পরের জিনিস নেওয়াকে চুরি বলে–তা কি তুমি জানো না।

চন্দ্রকেতু–মূর্খ! তুমি পুরুষ হলে চাবুক দিয়ে তোমায় শিখিয়ে দিতাম কী করে যুবরাজ চন্দ্রকেতুর সঙ্গে কথা বলতে হয়। Yes, তোমার সব চিঠি আমিই নিয়েছি নিয়েছি এ রাজ্যের মঙ্গলের জন্য। তোমার মতো পরপুরুষ আসক্ত নারীর যাতে এ রাজ্যের রানি হওয়ার কোনও দাবি না থাকতে পারে–তার ব্যবস্থাই করতে হবে আমায়।

প্যাট্রিসিয়া–Well, তুমি যদি ভেবে থাকো, তোমার রানি হওয়ার জন্য আমি আকুল– তবে, তুমি খুব ভুল করেছ। তুমি জানতে মার্সডেনের সঙ্গে আমার একটা সম্পর্ক আছে। তা সত্ত্বেও রূপের মোহে তুমি আমায় বিয়ে করেছিলে। আমার দরিদ্র বাবা-মাকে পয়সার লোভ দেখিয়ে মত আদায় করতে তোমার বাধেনি। বাবা-মার মনে কষ্ট দিতে চাইনি তাই মার্সডেনের সঙ্গে সকল সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়ে, এসেছিলাম তোমার সঙ্গে।

চন্দ্রকেতু–কিন্তু এখন আবার সে সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হল কেন? আমাকে দোহন করার জন্যে?

প্যাট্রিসিয়া–নিজে ব্যভিচারের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিশ্চয় আশা করো না তোমার স্ত্রী তোমার কীর্তিকলাপ শুনে পরম সুখে দিন যাপন করবে রানিমহলের নিঃসঙ্গ বিলাসকক্ষে? তোমার দ্বিতীয় প্রশ্নের শ্লেষটুকু আমি গায়ে মাখলাম না। মাদ্রিদে আমাদের বংশের ঐতিহ্য যে কত সুপ্রাচীন তা তোমার অজানা নয়।

চন্দ্রকেতু–নিশ্চয়ই অজানা নয়। আর তাই প্রমাণ করে দেব সে বংশে জন্মগ্রহণ করেও কত নিচে তুমি নেমেছ। একটা রাজ্যের যুবরানির পদে অভিষিক্ত থেকেও সামান্য একটা পর পুরুষের সঙ্গে প্রেম পত্রালাপ করতে তোমার ঐতিহ্যে বাধে না।

প্যাট্রিসিয়া–তার জন্যে তুমিই Responsible। আমি তো সব ছেড়েই চলে এসেছিলাম। কিন্তু তুমি…।

চন্দ্রকেতু–Yes, আর সেইসঙ্গে ঘুচিয়ে দেব এ রাজ্যের সঙ্গে তোমার সব সম্পর্ক। এই মার্সডেনের সঙ্গে তোমাকে ফেরত যেতে হবে তোমার বাবা-মার কাছে–মাদ্রিদে।

প্যাট্রিসিয়া–না, কেতু। তা তুমি কখনও করতে পারো না। আমার বৃদ্ধা মা, বাবা, আমার আত্মীয়স্বজন আমার বংশ–

চন্দ্রকেতু–অনেক-অনেক আগে তোমার ভাবা উচিত ছিল, তোমার মা-বাবা, আত্মীয়স্বজনের কথা। এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। মজার কথা কি জানো, আমাদের হিন্দু বিবাহে Divorce পাওয়া খুব সোজা নয়। তাই তোমায় যদি আমি ত্যাগ করি, তাহলে স্বামী পরিত্যক্তার কলঙ্কিত জীবন নিয়ে তোমাকে হয়তো একা জীবন কাটাতে হবে।

প্যাট্রিসিয়া–না, না, চন্দ্র। এত নিষ্ঠুর তুমি হয়ো না। একদিন তো তুমি আমায় ভালোবেসেছিলে?

চন্দ্রকেতু–হ্যাঁ বেসেছিলাম। সে ভালোবাসার ফল তুমি পেয়েছ। এখন আমি তোমায় ঘৃণা করি। সে ঘৃণার বিষফলও তোমায় পেতে হবে। Good night, My Queen, Good night.

.

ষষ্ঠ দৃশ্য
(রানির ঘর। মনীশ, যুবানি, নাগরাজন বসে আছে।)

মনীশ–এ ঘটনাটা ঘটেছে কতদিন আগে?

প্যাট্রিসিয়া–মার্সডেনের মৃত্যুর পনেরো দিন আগে।

মনীশ–এ বিষয়ে মার্সডেনের সঙ্গে যুবরাজের কথা হয়েছিল?

প্যাট্রিসিয়া–হয়েছিল।

নাগরাজন–কবে?

প্যাট্রিসিয়া–তার মৃত্যুর রাত্রেই।

মনীশ–আপনি জানেন সেসব কথা?

প্যাট্রিসিয়া–জানি। (গলা ধরে আসে) সে রাতে লতিতা মহলের লাইব্রেরি রুমে ওদের সাক্ষাতের ব্যবস্থা হয়েছিল।

মনীশ–যদি আপত্তি না থাকে…

প্যাট্রিসিয়া–বেশ শুনুন…

.

সপ্তম দৃশ্য
(লাইব্রেরি ঘর। একটা ব্রোঞ্জের গণেশ মূর্তি সিংহাসনে। সামনে পাদানী
মুকুট থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। চন্দ্রকেতু আর মার্সডেন তার সামনে দাঁড়িয়ে। পাশে একটা ডায়াল টেলিফোন। ব্রোঞ্জের মূর্তি, সদ্য ব্রোঞ্জপেন্ট করা। মূর্তির মুকুট থেকে আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।)

মার্সডেন–যুবরাজ, এত রাত্রে আমরা কেন এখানে মিলিত হয়েছি তা নিশ্চয়ই আপনার অজানা নয়।

চন্দ্রকেতু–নিশ্চয়ই। অজানা কেন হবে?

মার্সডেন–Whats your decision in the matter জানতে পারি কি?

চন্দ্রকেতু–চিঠিগুলো সম্বন্ধে–তাই না?

মার্সডেন–Yes।

চন্দ্রকেতু–সে কথা তো আপনার বান্ধবীকেই জানিয়েছি।

মার্সডেন–তা আমি জানি। But is that all?

চন্দ্রকেতু–Do you expect anything more?

মার্সডেন–ভেবে দেখুন তার মান-সম্মান, তার ভবিষ্যৎ জীবন, মাদ্রিদে তার বংশের সুনাম।

চন্দ্রকেতু-জানি, জানি। তার মান-মর্যাদার কথা ভাববার দায়িত্ব শুধু আমার একার নয়। তারও ভাবা উচিত ছিল।

মার্সডেন–তার সেই ভুলের সুযোগ নিয়েই কি তার সমস্ত জীবনটা নষ্ট করে দিতে চান আপনি?

চন্দ্রকেতু–Shut up। আমার সিদ্ধান্তের ওপর একজন বিদেশির সমালোচনা শুনতে চাই আমি। যাকে স্পেনের এক সামান্য পরিবার থেকে তুলে এনে বসিয়েছিলাম রানির সিংহাসনে– একদিন যার পুত্রসন্তান হত এ রাজ্যের রাজা–এই তার প্রতিদান? ভুল আমারই হয়েছে–মানুষ তার প্রকৃতির ঊর্ধ্বে কখনওই উঠতে পারে না। আপনার স্পর্ধা দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। জানেন, প্যাট্রিসিয়ার এই অবনতির জন্যে তার এই চরম দুর্ভাগ্যের জন্যে দায়ী কে?

মার্সডেন–আপনার মতে আমি?

চন্দ্রকেতু–হ্যাঁ আপনি। আপনি সেই লোক যার জন্যে আজ তাকে পেতে হবে সারাটা জীবন ধরে অশেষ যন্ত্রণা।

মার্সডেন–ভুলে যাচ্ছেন, যৌবনের শুরু থেকেই আমাদের মধ্যে ভালোবাসা ছিল। সে ভালোবাসা আজও অক্ষয়, অম্লান।

চন্দ্রকেতু–থামুন! ভালোবাসা! ভালো তাকে আমি বাসিনি? যে সিংহাসনের জন্যে এ রাজ্যের বহু সন্ত্রান্ত বংশ প্রতীক্ষা করছে বহুদিন–সে সিংহাসনে তাকে বসবার অধিকার দিয়েছে কে?

মার্সডেন–আপনি কি মনে করেন সেইটেই আপনার ভালোবাসার যথেষ্ট প্রমাণ? আসলে ভালো তাকে আপনি কোনওদিন বাসেননি। বেসেছিলেন তার রূপকে! সত্যিই যদি ভালোবাসতেন, তাহলে সে আমার প্রণয়াকাঙ্ক্ষী জেনেও শুধু রূপের মোহে তাকে জোর করে বিয়ে করতেন না। আপনার লজ্জা হওয়া উচিত যে আজ আপনি আপনার ভুলের সমস্ত দায়িত্ব আমার ঘাড়ে চাপাতে চাইছেন।

চন্দ্রকেতু-Language! Language! Mr. Marsden। এই ধরনের মন্তব্য করার পরেও আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সাহস আজ অবধি কারুর হয়নি। However, আপনার সঙ্গে বেশি সময় নষ্ট করার মতো সময় আমার নেই। বলুন, কী চান আপনি?

মার্সডেন–আমার চিঠিগুলো ফেরত চাই।

চন্দ্রকেতু–পাবেন না।

মার্সডেন–পাবই। এবং আপনি হাতে করে দেবেন।

চন্দ্রকেতু-তাই নাকি?

মার্সডেন–Exactly। মনে রাখবেন যুবরাজ। আগুন নিয়ে খেলা করছেন আপনি। আমাদের দুজনকে যদি আপনি কলঙ্কের পাঁকে ডোবাতে চান, মনে রাখবেন, আপনিও রেহাই পাবেন না। আপনাকে নিয়েই আমরা ডুবব।

চন্দ্রকেতু–অর্থাৎ?

মার্সডেন–অর্থাৎ চিঠি শুধু আমিই প্যাট্রিসিয়াকে লিখিনি, সেও আমায় লিখেছে। আর সে আপনার বিবাহিতা স্ত্রী।

চন্দ্রকেতু–Blackmail!!

মার্সডেন–অনেকটা। তবে আমার শর্ত ব্ল্যাকমেলারদের মতো অতটা কঠিন নয়। শুধু চিঠির প্যাকেটটা আমাকে দিলেই আপনি মুক্ত হতে পারেন। প্যাট্রিসিয়ার চিঠিগুলো আপনার সামনেই পুড়িয়ে ফেলব আমি।

চন্দ্রকেতু–ব্ল্যাকমেলারদের বিশ্বাস…

মার্সডেন–করা না করা আপনার মর্জি। তবে করলে আপনি উপকৃতই হবেন।

চন্দ্রকেতু–Mr. Marsden।

মার্সডেন–বলুন।

চন্দ্রকেতু–এ বিষয় নিয়ে আমার একটু চিন্তার দরকার। কয়েক মিনিট একলা থাকতে দেবেন?

মার্সডেন–Of course। আমি আমার ঘরে যাচ্ছি। আপনি ডেকে পাঠাবেন।

.

অষ্টম দৃশ্য

(রানির ঘর। যুবরানি, মনীশ আর নাগরাজন।)

মনীশ–এসব কথা আপনি জানলেন কী করে?

প্যাট্রিসিয়া–যুবরাজের সঙ্গে অদ্ভুত এক চুক্তিতে রফা হওয়ার পর মার্সডেন সেখান থেকেই টেলিফোন করে আমায় সব জানিয়েছিল। তার মনে তখন ছিল জয়ের উল্লাস।

মনীশ–কী অদ্ভুত চুক্তি? আপনি জানেন নাকি?

প্যাট্রিসিয়া–হ্যাঁ, শুনুন তবে।

.

বম দৃশ্য
(লাইব্রেরি ঘর। গণেশ মূর্তি। যুবরাজ আর মার্সডেন।)

চন্দ্রকেতু–Mr. Marsden। চিঠিগুলো আপনাকে আমি দেব, কিন্তু একটি শর্তে।

মার্সডেন–বলুন?

চন্দ্রকেতু–চিঠিগুলো আপনাকে খুঁজে নিতে হবে।

মার্সডেন–আমাকে?

চন্দ্রকেতু–হ্যাঁ। আমি এখন ফরেস্টে যাচ্ছি শিকার করতে। চিঠিগুলো এই লাইব্রেরি ঘরেই আছে। খুঁজে নিন।

মার্সডেন–এই ঘরেই?

চন্দ্রকেতু–হ্যাঁ, এই ঘরে। খুঁজে নেওয়ার ভার আপনার। যদি পান ভালো না পেলেও ভয় নেই চিঠিগুলো আপনি পাবেন তবে আপনাকে এবং প্যাটকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

মার্সডেন–বেশ, আমি রাজি।

চন্দ্রকেতু–ঠিক আছে। আমি চললাম। (চন্দ্রকেতু বেরিয়ে যেতেই টেলিফোনের রিসিভার তুলল মার্সডেন।)

মার্সডেন–হ্যালো, প্যাট্রি, মার্সডেন Speaking….

(মঞ্চ অন্ধকার হয়ে এল..মার্সডেনের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ হতে ক্ষীণতর হয়ে এল।)

.

দশম দৃশ্য
(রানির ঘর। যুবরানি, মনীশ আর নাগরাজন বসে রয়েছে।)

প্যাট্রিসিয়া–তারপর সারাটা রাত কাটিয়েছি অস্থিরভাবে। ভোর হয়ে গেল কিন্তু মার্সডেন ফিরল না। বারবার ফোন করেছি। প্রতিবারই ফোনে Ring হয়েছে শুধু, কেউ ধরেনি। তখনই দারুণ সন্দেহ আর আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়ি। তারপর কী হয়েছে–আপনারা তো জানেন।

মনীশ–হত্যাকারী কে, তা তো পরোক্ষভাবে বলেই দিলেন আপনি। কিন্তু প্রমাণ কোথায়? ঘটনার সময় তো তিনি ফরেস্টে রাইফেল চালাচ্ছেন। নিখুঁত alibi। ঘরের দরজা জানলা ভেতর থেকে বন্ধ থাকায় যুবরাজের নিয়োজিত অন্য কারুর পক্ষেও ঘরের মধ্যে ঢুকে খুন করা Practically impossible

প্যাট্রিসিয়া–Inspector। প্রমাণ খুঁজে বার করার ভার আমার নয়, আপনার। আপনাদের আর কিছু জিজ্ঞাস্য আছে কি? I am so tired।

নাগরাজন–না, Your highness। ভবিষ্যতে যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে হয়তো আপনাকে বিরক্ত করতে হতে পারে। আজ আমরা চলি।

প্যাট্রিসিয়া–Just a minute. আজ সকালে যুবরাজ টেলিফোনে আমাকে Contact করেছিলেন। আমাকে আজ রাত্রে Guest House-এর লাইব্রেরি রুমে দেখা করতে বলেছেন।

নাগরাজন–রাত্রে কখন?

প্যাট্রিসিয়া–রাত আটটায়।

নাগরাজন–ব্যাপারটা অদ্ভুত! যুবরাজ আপনার সঙ্গে তো এখানেই দেখা করতে পারেন। উদ্দেশ্য কিছু জানিয়েছেন?

প্যাট্রিসিয়া–উদ্দেশ্য একই। চিঠির প্যাকেট নিয়ে আমার সঙ্গে একটা Final বোঝাঁপড়া করতে চান।

নাগরাজন–আপনি কি যাচ্ছেন?

প্যাট্রিসিয়া–না। একলা অত রাত্রে নিজের মহল ছেড়ে অতদূরে যাওয়ার কোনও বাসনাই নেই। I suggest আমার বদলে যাবেন আপনারা। আমার মনে হয় এমন কিছু আপনারা আজ দেখতে পাবেন সেখানে, যাতে আপনাদের তদন্তের অনেক সুবিধা হতে পারে।

নাগরাজন–মিঃ সরকার কী বলেন?

মনীশ–যুবরানির Plan-এর প্রশংসা করছি। রহস্যময় ঘরখানি দেখতে পারলে ভালোই হয়।

নাগরাজন–বেশ তাহলে আমার অফিসে চলুন। রাত আটটা বাজতে তত বেশি দেরি নেই। ওখান থেকে আমরা আমাদের নিরাপত্তার কিছু সরঞ্জাম নিয়ে নিতে পারব। Good night your Highness।

.

একাদশ দৃশ্য

(লাইব্রেরি ঘর। গণেশ মূর্তি। সামনে দাঁড়িয়ে নাগরাজন আর মনীশ।)

নাগরাজন–দেখুন Mr. Sarkar, এই সেই অভিশপ্ত কক্ষ যেখানে মৃত মার্সডেনকে পাওয়া গিয়েছিল। ওই সেই গণেশ মূর্তি–ওই সিংহাসনের তলায় পড়েছিল লাশ।

মনীশ–মূর্তিটি অপূর্ব। মাথার মুকুট থেকে বিচ্ছুরিত ওই আলোয় কেমন যেন একটা Hypnotic spell রয়েছে। কিন্তু সময় তো উত্তীর্ণ হয়ে গেল। কই, যুবরাজ তো এলেন না।

নাগরাজন–সেই কথাই তো ভাবছি। তবে কি যুবরাজ সব টের পেয়ে গেলেন? তা হলে তো বিপদের কথা।

মনীশ–(ভীতস্বরে) তাহলে আমাদেরই বা থেকে কী লাভ। অনর্থক সমস্ত রাত এখানে বসে থাকার কোনও মানে হয় না। চলুন ফিরে যাই।

নাগরাজন–আর একটু বসুন। নটা বাজলেই ফিরব।

.

দ্বাদশ দৃশ্য
(বসবার ঘর। মনীশ আর ছন্দা বসে আছে।)

মনীশ–শুনলে তো আমাদের আজকের Adventure-এর Report।

ছন্দা–তা তো শুনলাম। কিন্তু যুবরাজ যে সব জানতে পেরে গেছে। কী হবে তাহলে?

মনীশ–কী আবার হবে? অত ভাববার কী আছে?

ছন্দা–দ্যাখো, অমন করে সব উড়িয়ে দিও না। এদেশের লোক আমরা নই, বলতে গেলে বিদেশি–শুধু-শুধু ভবিষ্যৎ মহারাজের বিরাগভাজন হওয়া কি ভালো?

মনীশ–খারাপটাই বা কি?

ছন্দা–(রেগে) খুব বীরত্বপনা দেখানো হয়েছে। কিছুই যেন হয়নি। আমি বলে দিলাম তোমায়–এ ব্যাপারে তোমার আর মাথা গলাবার দরকার নেই। খুনের গল্প লেখো যত খুশি আপত্তি নেই। কিন্তু এ ব্যাপারে যদি আবার মাথা গলাও তবে–তবে দেখবে মজাটা।

মনীশ–আহা, রাগ করো কেন, ছন্দা। কাল নাগরাজন আসবে। তখন অনেক আলোচনা করা যাবে। অত চট করে চটলে কি চলে?

ছন্দা–না, চটবে না। এই বিদেশে সত্যিকার আপনজন বলতে কেই বা আছে বলো তো? বিপদে পড়লে কে দেখবে? দুজনের মধ্যে একজনের যদি কিছু হয় তখন আমার কী হবে? তুমি কি তা ভাবো না?

.

ত্রয়োদশ দৃশ্য
(অন্ধকার মঞ্চে শুধু স্পটলাইটের ফোকাসে দেখা যাচ্ছে মনীশের প্রায়-উন্মাদ আকৃতি। কান্নাজড়ানো গলায় সে বলে যাচ্ছে..)

সেদিনের স্মৃতি আজও আমার মনের মধ্যে দগদগে হয়ে রয়েছে–আজও মনে হয় এ বুঝি মাত্র সেদিনের ঘটনা। স্বামীর অমঙ্গল কামনায় উদগত অঞ কম্পিত কণ্ঠ ছন্দার সেই মিনতি যদি রাখত, মহীশুরের রাজপরিবারের রহস্য থেকে যদি নিজেকে সরিয়ে আনতাম, তবে জীবন আমার এমন অভিশপ্ত হত না। ভগবান, আর যে আমি পারি না।

.

চতুর্দশ দৃশ্য
(বসবার ঘর। মনীশ আর ছন্দা।)

ছন্দা–কী গো, দেখছ কী অমন করে? নিজের বউকে চিনতে পারছ না?

মনীশ হঠাৎ একি বেশ, দেবী। সোনার গয়না ফেলে সর্বাঙ্গে ফুলের সাজ, কবরীতে করবী– গলায় মালা–আমি তো বাপু মুনি ঋষি নয়। আমাকে ভোলাবার জন্যে এত সাজ কেন প্রিয়ে। আমি তো প্রাকটিকালি ভুলেই রয়েছি।

ছন্দা–বাঃ বাঃ! বেশ মানুষ যা হোক। আমি কি তোমায় ভোলাতে এসেছি? কেন আজকের তারিখটা মনে নেই?

মনীশ–আজকের তারিখ…১৭ই ফেব্রুয়ারি। ওঃ হোঃ, একদম ভুলে গেছি। আর তোমারই বা আক্কেলটা কী? মনে করিয়ে দেবে তো। কিছু কেনাকাটা হল না।

ছন্দা–কেন? আমি কেন মনে করাব? দেখছিলাম পুরুষের মন। কিছুই মনে থাকে না। আমি মরলেই তো—

মনীশ–এই সেরেছে। হে সম্রাজ্ঞী, ক্রোধ সংবরণ করুন। আমি আপনার দাস বই আর কিছু না। দাসের সঙ্গে এ মতো ব্যবহার আপনার সাজে না, মহিষী। আমি আপনাকে Gentlemans word দিচ্ছি, যে কানন থেকে এই পুষ্পসম্ভার সঞ্চয় করেছেন আপনি, আমি হবো সেই মালঞ্চের মালাকার।

ছন্দা–বাবাঃ, পেটে পেটে এত! নাও ছাড়ো, অনেক কাজ আছে।

(নেপথ্যে নাগরাজনের গলা–আসতে পারি?)

ছন্দা–এই…নাগরাজন…ছাড়ো না।

মনীশ–আরে আসুন আসুন Inspector। এত সকালে কি ব্যাপার?

নাগরাজন–কী ব্যাপার? ম্যাডাম যে একেবারে বনলক্ষ্মী সেজেছেন! Splendid! কোনও Occassion আছে নাকি?

মনীশ–না, না, occassion মানে আজ আমাদের বিবাহবার্ষিকী কিনা।

ছন্দা–আপনার যদি আপত্তি না থাকে আজ আমাদের এখানে lunch খেয়ে যাবেন।

নাগরাজন–My goodness! নিশ্চয়ই খাব। কিন্তু কোনও special arrangement করতে পারবেন না। আপনার যা রান্নাবান্না হবে তাই এক মুঠো দেবেন। যাক মিসেস সরকার, কালকের ঘটনা সব শুনেছেন তো?

মনীশ–হ্যাঁ। ও তো একেবারে ভয়ে সারা। বলছে রাজারাজড়ার সঙ্গে বিবাদ করা–

নাগরাজন–না, মিসেস সরকার–আপনি ভয় পাবেন না। Mr. Sarkar-এর সব দায়িত্ব আমার। আমি Government-এর একজন গেজেটেড অফিসার। আমার কথার একটু মূল্য তো আছে?

(ঘোড়ার পদশব্দ)

নাগরাজন–ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ। ঘোড়ার চড়ে এখানে আবার কে এল? যুবরাজ নাকি?

(চন্দ্রকেতুর প্রবেশ)

চন্দ্রকেতু–ব্যঙ্গচ্ছলে অভিবাদন) Yes Inspector। যুবরাজই বটে। আপনাকে এ বাড়িতে ঢুকতে দেখেই নামলাম।

নাগরাজন–স্যালুট করে) Yes, Your honour।

চন্দ্রকেতু–এখানে কি আপনার C.I.D. ডিপার্টমেন্টের Branch Office খুলেছেন নাকি?

নাগরাজন–আমার বন্ধু Mr. Manish Sarkar, Mrs. Sarkar–যুবরাজ চন্দ্রকেতু।

চন্দ্রকেতু–ও, Mr. Detective, তাই না?

মনীশ–আজ্ঞে না। আমি সামান্য গৃহস্থ ঘরের ছেলে। কাজের ধান্দায় এখানে এসেছি।

চন্দ্রকেতু–তাই নাকি। কিন্তু Mr. Sarkar, জানেন তো আগুন নিয়ে খেলতে গেলে সে আগুন মধ্যে-মধ্যে নিজের দেহেও ছড়িয়ে পড়ে।

মনীশ–জানি Your Highness। এও জানি যে যারা আগুন নিয়ে খেলতে জানে, তারা নিজের শরীর বাঁচিয়ে খেলা দেখায়।

চন্দ্রকেতু–বটে! আচ্ছা আশা করি আবার দেখা হবে। তবে মাইন্ড ইউ মিঃ সরকার, তখনও যেন যুবরাজ চন্দ্রকেতুর সঙ্গে এইভাবে মাথা তুলে কথা বলতে পারেন। চিয়ারিও Inspector, কতদূর এগোলেন? সময় তো যথেষ্ট নিয়েছেন।

নাগরাজন–কাজ, এগুচ্ছে, স্যার।

চন্দ্রকেতু–এগোচ্ছে নাকি? Very good Very good. I wish your every success Inspector। হাঃহাঃহাঃ।

(চন্দ্রকেতুর প্রস্থান। অশ্বখুর ধ্বনি দূরে মিলিয়ে গেল)

ছন্দা–সর্বনাশ! উনি কি করে জানলেন যে তুমি এর মধ্যে গোয়েন্দাগিরি করছ?

মনীশ—(কঠিনভাবে) জেনেছেন যে করেই হোক। মনে হচ্ছে ওঁর আর কিছুই অজানা নেই। তাই সাবধান করতে এসেছিলেন আমাকে।

নাগরাজন–Mrs. Sarkar, যুবরাজের কোপদৃষ্টিতে শুধু আমি নয়–আপনারাও পড়লেন শেষে।

মনীশ–সে জন্যে চিন্তা করবেন না Inspector। সত্যের অন্বেষণ করা আপনার পেশা– আর আমার নেশা। দেখাই যাক না শেষ পর্যন্ত কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।

.

পঞ্চদশ দৃশ্য
(অন্ধকার মঞ্চে শুধু স্পটলাইটের ফোকাসে দেখা যাচ্ছে মনীশের প্রায়-উন্মাদ আকৃতি। কান্নাজড়ানো গলায় সে বলে যাচ্ছে…)

সমস্ত দিন হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর গৃহলক্ষ্মীর মধু সঙ্গলাভের সুখচিন্তাই ছিল আমার কাজের প্রেরণা। প্রতিদিন পথের মোড় থেকে জানলায় প্রতীক্ষার ছন্দাকে দেখা ছিল আমার দৈনন্দিন কার্যসূচির একটা অঙ্গ। কপালে ছোট্ট কুমকুমের টিপ সিঁথিতে জ্বলজ্বলে সিঁদুর রেখা বাঁকানো ভূ আর মিষ্টি হাসি দিয়ে সে প্রতিদিন অভ্যর্থনা জানাত তার এই দীন স্বামীকে। বিয়ের পর থেকে একটি দিনের জন্যেও ব্যতিক্রম দেখিনি এ নিয়মের। অসুস্থ শরীর নিয়েও উঠে এসেছে জানলায়। কিন্তু হঠাৎ সেদিন দেখলাম চিরন্তন এ নিয়মের ব্যতিক্রম। সেই প্রথম, সেই শেষ। যুবরাজের সঙ্গে আলাপের ঠিক পরের দিন বাড়ি ফেরার পথে দূর থেকে দেখলাম জানলা শূন্যধড়াস করে উঠল বুকটা। নাম-না-জানা এক ভয় সাপের মতো পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে ধরতে লাগল হৃৎপিণ্ডটাকে। দুরুদুরু বুকে প্রবেশ করলাম গৃহে। সারা বাড়ি খুঁজে কোথাও দেখতে পেলাম না ওকে। রান্নাঘর বাথরুম খুঁজি নাম ধরে ডাকি, অপেক্ষা করি, কিন্তু কোনও সাড়া নেই। দু-একজন প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে খোঁজ নিলাম–সেখানেও নেই। এই করে কাটল দুটি অসহ্য ঘণ্টা। সে কী রুদ্ধশ্বাস উৎকণ্ঠা! কোথায় গেল? কোথায় যেতে পারে? আমার ফেরার সময় সে তো কোথাও যায় না। তবে কি কোনও accident হল রাস্তায়! আর পারলাম না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছুটতে লাগলাম নাগরাজন এর অফিসের দিকে।

ষষ্ঠদশ দৃশ্য
(পুলিশ অফিসারের ঘর। যুবরাজ বসে, নাগরাজন দাঁড়িয়ে। যুবরাজের জামার আস্তিনে আর কাঁধে লেগে ব্রোঞ্জ পাউডার। ঝড়ের বেগে মনীশের প্রবেশ)

মনীশ–মিঃ নাগরাজন…

নাগরাজন কী হয়েছে, মিঃ সরকার? আপনার চোখমুখ এরকম কেন? কী হয়েছে?

মনীশ–(ঠোঁট কেঁপে ওঠে) ছন্দা নেই, নাগরাজন–ছন্দা নেই—

নাগরাজন–কেন? কোথায় গেছেন তিনি।

মনীশ–জানি না। বাড়ি ফিরে তাকে দেখতে পেলাম না–দু-ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি। মিঃ নাগরাজন, এই সময় সে কোথাও যায় না। নিশ্চয় তার কিছু হয়েছে। আপনি আপনি আমায় help করুন।

(চন্দ্রকেতু উঠে দাঁড়াল। মুখে ক্রুর ব্যঙ্গ-হাসি)

চন্দ্রকেতু–All right, Inspector/ আমি তাহলে এখন চলি। আপনার Progress কেমন হচ্ছে সে বিষয়ে আমার খুবই কৌতূহল। তাই আমি আসি মাঝে-মাঝে। আশা করি কয়েকদিনের মধ্যেই আপনার তদন্তের report পাব। এতদিন সময় লাগানো অবশ্য আপনাদের মতো দক্ষ অফিসারের উচিত নয়। বিশেষ করে মিঃ সরকারের মতো প্রাইভেট ডিটেকটিভের সাহায্য যখন নিচ্ছেন–চলি–

(চন্দ্রকেতুর প্রস্থান। ঘোড়ার পায়ের শব্দ দূরে মিলিয়ে যাচ্ছে…ফ্যালফ্যাল করে নাগরাজন– দাঁড়ান মিঃ সরকার, ছুটবেন না–আমি আসছি।)

.

সপ্তদশ দৃশ্য
(মঞ্চ অন্ধকার। মোটরের শব্দ। মোটর থামার শব্দ। ধাবমান দরজায় দুমদাম ধাক্কা দেওয়ার শব্দ।)

মনীশ-নেপথ্যে) দরজা খোলো শিগগির দরজা খোলো। কে আছ ভেতরে। যেও না গণেশের কাছে। যেও না, তুমি যেই হও। গণেশের দিকে যেও না। দোহাই তোমার! Inspector, দরজা ভেঙে ফেলুন সর্বনাশ হয়ে যাবে এখুনি।

(দরজা ভেঙে ফেলার শব্দ ছন্দার অস্ফুট আর্তনাদ…মনীশের চিৎকার ছন্দা-)।

(মঞ্চ আলোকিত হল। গণেশ মূর্তির সামনে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ছন্দা লুটিয়ে পড়েছে মেঝেতে। নিষ্প্রাণ। বুক রক্তরঞ্জিত। বেগে মঞ্চে ঢুকছে মনীশ আর নাগরাজন। দেওয়ালে ঠেস দিয়ে রাখা রয়েছে একটা লম্বা লাঠি।)।

নাগরাজন–এ কি মিসেস সরকার–ওঃ হে My God_may her soul rest in peace।

(একটু চুপচাপ)

নাগরাজন–মিঃ সরকার, আপনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করব না। দেওয়া যায় না– তা বিশ্বাস করি। কিন্তু একটু শক্ত হোন আপনি। হত্যাকারীকে ধরার এমন সুযোগ আর পাব না। এখানেই কোথাও লুকিয়েছে সে। দেখি তো গণেশ মূর্তির পিছনে কেউ লুকিয়ে আছে কিনা।

মনীশ–চিৎকার করে) For Gods Sake. Dont go there. ওই লম্বা লাঠিটা হাতে নিন Inspector। ওটাকে মূর্তির মাথার মুকুটের বিচ্ছুরিত আলোয় ওপর নাড়ুন। (দেওয়ালে ঠেস দেওয়ানো লম্বা লাঠিটা তুলে নিয়ে নাগরাজন গণেশ মূর্তির মুকুটের বিচ্ছুরিত আলোয় সামনে ধরল। ঘটাং করে শব্দ হল লাঠিটা আলোয় ওপর ধরতেই, মূর্তির বুক থেকে একটা তীক্ষ্ণ ফলা বেরিয়ে এসেই আবার ঢুকে গেল। ব্লেডটার গায়ে রক্ত।)।

নাগরাজন–একি! ব্লেডের গায়ে রক্ত!

মনীশ–হ্যাঁ। আমার ছন্দার রক্ত। এইবার আপনি যুবরাজকে arrest করতে পারেন। তীক্ষ্ণধী যুবরাজের মস্তিষ্ক বিজ্ঞানের নবতম আবিষ্কারকে কাজে লাগিয়েছে এইভাবে। আজ আর নয় Inspector। আমি আর পারছি না।

.

অষ্টাদশ দৃশ্য
(অন্ধকার মঞ্চে শুধু স্পটলাইট ফোকাসে দেখা যাচ্ছে মনীশের প্রায়-উন্মাদ আকৃতি। কান্নাজড়ানো গলায় সে বলে যাচ্ছে…)

তার পরেও নিঃসঙ্গ একাকী জীবন বয়ে নিয়ে চলেছি আজ ২০ বছর ধরে। জানি না কবে তার সঙ্গে আবার মিলতে পারব। ছন্দা…ছন্দা…ছন্দা…জন্ম-জন্মান্তরের সঙ্গিনী আমার। আর কতদিন– আর কতদিন বইতে হবে আমার এ জীবন-যন্ত্রণা!

(মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। তারপরেই মঞ্চ আলোকিত হল। বসবার ঘর। মনীশ শুষ্ক উদভ্রান্ত মুখে বসে রয়েছে। নাগরাজন ঘরে ঢুকছে।)

মনীশ–আসুন Inspector, বসুন। আজ আর আপনাকে চা খাওয়াতে পারব না। কারণ, চা আমি ছেড়ে দিয়েছি। ছন্দা চা ভীষণ ভালোবাসত, ও চলে যাওয়ার পর…

নাগরাজন–এ জন্যে আমিই দায়ী মিঃ সরকার।

মনীশ–যাক গে। যুবরাজ ধরা পড়েছেন?

নাগরাজন–না।

মনীশ–কেন?

নাগরাজন–সাধারণ অপরাধীর মতো বিনা পরোয়ানায় রাজবংশের কাউকে গ্রেপ্তার করার অধিকার আমাদের নেই। পরোয়ানা নিয়ে পৌঁছতে দেরি হয়ে গিয়েছিল আমার। যুবরাজ মহলে পৌঁছে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে পরপর দুটি ফায়ারিং-এর শব্দ শুনলাম। ঘরে ঢুকে আমরা দেখলাম দুটি প্রাণহীন দেহযুবরাজ ও যুবরানির পাশেই যুবরাজের সিক্সচেম্বার কোপ্টখানা পড়েছিল। কিন্তু মিঃ সরকার, আসল রহস্যটা তো এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেল আমাদের কাছে। মার্সডেন ও ছন্দাদেবী কী করে মারা গেলেন–তা তো বুঝলাম। কিন্তু মূর্তির মেকানিজমটা লাঠি নাড়ানোর সঙ্গে ওই লোহার ফলাটার কী যোগাযোগ–এ ব্যাপারটা তো ঠিক বুঝতে পারলাম না?

মনীশ–ফটো ইলেকট্রিক সেলের নাম শুনেছেন?

নাগরাজন–Electric eye যাকে বলে?

মনীশ–হ্যাঁ। মূর্তির মুকুটে ওইরকম একটা ইলেকট্রিক আই লাগানো আছে। সেল বিচ্ছুরিত রশ্মি কোনও কিছুতে বাধা পেলেই ভেতরের দুটি পয়েন্টে বৈদ্যুতিক প্রবাহের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। automatic machine। বুকের খুপরি খুলে বেরিয়ে আসে মৃত্যুদূত। সামনে দাঁড়ানো মানুষের হৃৎপিণ্ডের স্বাদ গ্রহণ করে। আলোকরশ্মির সামনে বাধাটুকু সরে গেলেই আবার circuit বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কৃপাণটিও ভিতরে ঢুকে যায় সঙ্গে-সঙ্গে।

নাগরাজন–আশ্চর্য! কী অপূর্ব মেধা যুবরাজের! কিন্তু কী নৃশংস জঘন্য তার প্রয়োগ।

মনীশ–প্রতিভার পদস্খলন!!

নাগরাজন–কিন্তু আপনি জানলেন কি করে এসব? আমাকে তো কিছুই বলেননি?

মনীশ–বলবার আর সময় পেলাম কোথায় বলুন? বলবার সময় পেলে কি আর এভাবে ছন্দাকে হারাতে হতো আমায়? পাঁচ মিনিট–শুধু পাঁচ মিনিট আগে যদি জানতে পারতাম সব কথা!! যে মুহূর্তে যুবরাজ আমার সামনে দিয়ে আপনার অফিস থেকে চলে গেলেন–সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে খুলে গেল সমস্ত রহস্যের দ্বার।

নাগরাজন–ঠিক বুঝলাম না।

মনীশ–যুবরাজ আমার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আচমকা লক্ষ করলাম, তার জামার আস্তিনে আর কাঁধে লেগে রয়েছে তামাটে ব্রোঞ্জ পাউডার। সঙ্গে-সঙ্গে বিদ্যুৎ চমকের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠল ব্রোঞ্জের গণেশ মূর্তিটা। আর সঙ্গে-সঙ্গে মুকুটের রশ্মি আর স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে পুলিশ জার্নালে প্রকাশিত হল Photo electric cell-এর ওপর একটি প্রবন্ধ। কী করে যে সেই মুহূর্তে আমার সে কথা মনে এল আমি নিজেই জানি না। হয়তো ছন্দার বিপদাশঙ্কাই আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিতে সাহায্য করেছিল। যুবরাজের কাঁধে ব্রোঞ্জ-পাউডার দেখেই মনে হল যুবরাজ নিশ্চয়ই মূর্তির গা-ঘেঁষে দাঁড়িয়ে কিছু করছিলেন। মার্সডেনের মৃতদেহও পাওয়া গিয়েছিল মূর্তির পায়ের কাছে। লক্ষ করেননি, সদ্য ব্রোঞ্জ পেন্ট করা হয়েছে গণেশকে চকচকে রাখার জন্যে? যাতে চট করে চোখ টানে সেদিকে।

নাগরাজন–কিন্তু মার্সডেন বা মিসেস সরকার মূর্তির কাছে গেলেন কেন?

মনীশ–মার্সডেন চিঠির তাড়াটা খুঁজতে মূর্তিটার কাছে গিয়েছিল। মুকুটের পেছনে ফঁকটা তো লক্ষ করেছেন? অনায়াসেই লুকিয়ে রাখা যায় সেখানে। মার্সডেন সিংহাসনের ওপর উঠে হাত বাড়াল মুকুটের ওপর। রশ্মি বাধা পেতেই ফলাটা বেরিয়ে এসেই আবার ঢুকে গেল। মার্সডেনের মৃতদেহ পড়ল লুটিয়ে সবার অগোচরে। তার মুখে যে বিস্ময়ের চিহ্ন দেখেছেন–তার কারণ এখন নিশ্চয় বুঝছেন। আপনিও তো কম অবাক হননি ব্যাপারটা দেখে। অথচ যুবরাজ তখন ফরেস্টে শিকার করছেন। নিখুঁত alibi, কী বলেন?

নাগরাজন–কিন্তু অন্য নির্দোষ লোকেরও তো প্রাণ যেতে পারে এভাবে?

মনীশ–সেখানেই যুবরাজের বাহাদুরি। ইলেকট্রিক সেল সবসময় চালু থাকত না। কোনও নির্দোষ লোকের যাতে ক্ষতি না হয় সেজন্যেই যুবরাজ মূর্তির গায়ে গুপ্ত সুইচ লাগিয়ে রেখেছিলেন। মার্সডেনের মৃত্যুর সময় তিনি মার্সডেনের কাছে কয়েক মিনিট সময় নিয়েছিলেন মনে আছে?

নাগরাজন–হ্যাঁ। সেই সময়েই বোধহয় তিনি সুইচ অন্ করে দিয়েছিলেন?

মনীশ–হ্যাঁ। কিন্তু crime never pays। তাই ছন্দার বেলায় সুইচ অন্ করতে গিয়ে তার পোশাকে ব্রোঞ্জ পাউডার লেগে গেল। আর তাতেই ধর্মের কল বাতাসে নড়ে উঠল। নিজের alibi establish করতে যদি না তিনি আপনার অফিসে এসে বসে থাকতেন, তাহলে আমার সঙ্গে ওঁর দেখা হত না–তিনি ধরাও পড়তেন না। এমনকি যদি না আমি সেদিন ওঁকে খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ করতাম তা হলেও হয়তো এ রহস্যের যবনিকা কোনওদিন উঠত না। সবই বিধাতার খেলা Inspector, দেখুন না রহস্যের সমাধান হল, অপরাধী নিজের হাতেই শাস্তি গ্রহণ করল। কিন্তু বড় বেশি মূল্য দিতে হল আমাকে। এত আমি চাইনি। এ মূল্য দিয়ে গোয়েন্দাগিরি করতে আমি চাইনি।

(সহানুভূতিপূর্ণ কাঁধ চাপড়ায় নাগরাজন। মনীশ একটু সামলে ওঠে।)

নাগরাজন–কিন্তু একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, মিঃ সরকার–ছন্দা দেবী কেন ওখানে গেলেন আপনাকে না জানিয়ে? কেনই-বা আপনার ডাকে সাড়া না দিয়ে উঠতে গেলেন সিংহাসনের ওপরে?

(ফের মঞ্চ অন্ধকার হয়ে গেল। শুধু স্পটলাইটের ফোকাস রইল মনীশের মুখের ওপর। সে বলছে…)

মনীশ–কী জবাব দেব? কী জবাব দেব এ প্রশ্নের? জানি এই রহস্যের সমাধান হয়তো কেউ খুঁজে পাবে না। এই প্রহেলিকার উত্তর আমাকে সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। কেন গেল সে ওখানে? কেমন করে গেল? কী করে ঢুকল লাইব্রেরি রুমে? কেন সাড়া দিল না আমার নিষেধে? কেন এগিয়ে গেল সে কালান্তক গণেশ মূর্তির সামনে? অপহরণ? সম্মোহন? নাকি কোনও ওষুধের প্রভাব? জানি–জানি আমি জানি এর উত্তর।

আর ভাবতে পারি না…একই বিষয়ে চিন্তা করে করে আমার স্নায়ুমণ্ডলীও হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। আবোল-তাবোল অসংলগ্ন চিন্তা যেন মাথার ভেতর কুরে কুরে খায় আজকাল। জানি মরণের ওপারে গিয়ে যতদিন না তার সাক্ষাৎ পাচ্ছি ততদিন আমার এ যন্ত্রণার শেষ নেই। কিন্তু কবে আসবে সে পরম লগ্ন? কবে আমি আবার তার দেখা পাব? কবে? কবে? কবে? কবে সে নিজের মুখে আমাকে বলবে অভিমানে ঠোঁট ফুলিয়ে–

(মঞ্চ একদম অন্ধকার। স্পটলাইট নিভে গেল। নেপথ্যে ছন্দার কান্নাজড়ানো প্রতিধ্বনিময় স্বর শোনা যাচ্ছে…ওগো, কেন তুমি আমার কথা শুনলে না..কেন তুমি যুবরাজের হুশিয়ারি শুনলে না…তাই সে আমাকে ধরে নিয়ে গিয়ে গণেশ মূর্তির সামনেই আমাকে….তারপর, গণেশ মূর্তি দেখিয়ে বলেছিল–এ মুখ আর স্বামীকে দেখিও না…ওই সিংহাসনের ওপর গিয়ে দাঁড়াও…আত্মহত্যা করো…আমি তাই করেছি…নোংরা শরীরটা নিয়ে তোমার কাছে যেতে চাইনি..তুমি তা জানতে…তাই আমার পোস্টমর্টেম করতে দাওনি..)

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *