1 of 2

কুরুক্ষেত্র। প্রতুল লাহিড়ী

মৃত্যুঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
কুরুক্ষেত্র। প্রতুল লাহিড়ী

স্থান–নির্জন কক্ষ । কাল–রাত্রি

(বিছানার ওপর তাকিয়া ঠেস দিয়ে বসে বৃদ্ধ পিতামহ ভীষ্ম; মুখখানা চিন্তাচ্ছন্ন। কৃষ বসে অদুরে একখানা চেয়ারে। সেক্রেটারিয়েট টেবিলে ছড়ানো কাগজপত্র।)

কৃষ্ণ : বেশ, তাহলে ধ্বংসই চলুক।

ভীষ্ম : পাঁচখানা তরবারির বিরুদ্ধে একশোটা তরবারি ঝলসে উঠবে…

কৃষ্ণ : এটা তরবারির যুদ্ধ হবে না, ঠাকুরদা।

ভীষ্ম? তবে কীসের যুদ্ধ হবে?

কৃষ্ণ : এটা বিজ্ঞানের যুগ…

ভীষ্ম : (অসহ্য বিস্ময়ে) বিজ্ঞানের যুগ আবার কী হে? চার যুগের নামই তো জানি, সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি, এটা আবার কীসের ফ্যাকড়া?

কৃষ্ণ : (হাসলেন) বিজ্ঞানের যুগের সঙ্গে কারুর চালাকি খাটবে না। খাপের তরবারি খাপেই থাকবে, হাতের লাঠি থাকবে হাতে, তির-ধনুক পিঠেই ঝুলবে, মাঝ থেকে যোদ্ধার অকস্মাৎ পঞ্চত্ব প্রাপ্তি ঘটবে, অর্থাৎ হাত দুটো উড়ে যাবে দক্ষিণে, পা দুটো উড়ে যাবে উত্তরে, ধড়টার কোনও অস্তিত্বই থাকবে না।

ভীষ্ম : কিন্তু তা কী করে সম্ভব?

কৃষ্ণ : (দৃঢ়কণ্ঠে) বুদ্ধি, ঠাকুরদা, বুদ্ধি, স্রেফ কৃষ্ণের ক্ষুরধার বুদ্ধি…

ভীষ্ম : বুদ্ধিটা কি তোমার বৈজ্ঞানিক যুগেরই স্বধর্ম?

কৃষ্ণ ও আমার বুদ্ধি আমারই স্বধর্ম, বৈজ্ঞানিক যুগের নয়। যুদ্ধের নামে লোকধ্বংসের জন্য বৈজ্ঞানিকরা সৃষ্টি করবে এরোপ্লেন, মাস্টার্ড গ্যাস, বিমান বিধ্বংসী কামান, হাউইজার, শ্ল্যাপনেল, ইউবোট আর আমি…

.

নাটকটা অজয়ের লেখা।

ধনঞ্জয় মিত্রের প্রথম পক্ষের ছেলে অজয়। বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্টের বাতিক আছে। এক্সপেরিমেন্ট করতে গিয়ে প্রাণীহত্যা করে জেল পর্যন্ত খেটেছে। দীর্ঘদিন স্বদেশ ছাড়া। বোম্বাইবাসী। রহস্যময় চরিত্র।

বৃদ্ধ ধনঞ্জয় মিত্র প্রথমে তার দেড় কোটি টাকার সম্পত্তি এই অজয়ের নামেই উইল করেছিলেন। তারপর অজয়ের কীর্তিকাহিনি যৎকিঞ্চিৎ শুনেই উইল পালটানোর মনস্থ করলেন। অমনি তাঁর এটর্নি মাধবচরণ মারা গেলেন বিষপ্রয়োগে। কিন্তু কেউ ধরতে পারল না, বিষটা কী ধরনের, শরীরেই বা ঢুকল কী করে। অজয় তখন বোম্বাইতে।

মুলতুবি রইল উইল পালটানো। দিন কয়েক পরে এটর্নি সারদাচরণকে ডেকে পাঠালেন বৃদ্ধ ধনঞ্জয় মিত্র। সারদাচরণ মাধবচরণের ছেলে। বাপ-বেটা দুজনেই এটর্নি।

দ্বিতীয় পক্ষের দুই ছেলে বিজয় আর সুজয়কেও ডাকলেন ধনঞ্জয় মিত্র।

বিজয়কে ধমক দিয়ে বললেন ধনঞ্জয় মিত্র, তুমি যদি সেই অভিনেত্রীটিকে বিয়ে করার সঙ্কল্প ত্যাগ করো, তবেই সম্পত্তি পাবে। নইলে–

আপনার সম্পত্তি চাই না। বিজয় বললে সোজা গলায়।

ঠিক এমনি সময়ে একটা চিঠি এল ভৃত্যের হাতে। খাম ছিঁড়ে পড়লেন ধনঞ্জয় মিত্র। জবাব লিখে তক্ষুনি দিলেন ভৃত্যকে–ডাকবাক্সে ফেলে দেওয়ার জন্যে।

বিজয়কে বললেন, গলাটা শুকিয়ে গেছে। সোডা আর গ্লাস দাও।

গেলাসে সোজা ঢেলে দিল বিজয়। তার কয়েক মিনিট পরেই অপমৃত্যু ঘটল ধনঞ্জয় মিত্রের। শরীরে দেখা দিল বিষক্রিয়া।

গ্রেপ্তার হল বিজয়।

কিছুদিন পরেই বোম্বাই থেকে ফিরে এল অজয়।

কোর্টে দাঁড়িয়ে সে বললে, বিজয় খুনি নয়। ওঁকে ছেড়ে দিন।

ছাড়া পেল বিজয়। কিন্তু অজয় সুনজরে দেখল না তাকে। বরং চেষ্টা করল তার প্রেয়সী অরূপা দেবীকে ফুসলে আনার। এই সেই অভিনেত্রী যার জন্যে সম্পত্তিও ত্যাগ করতে চেয়েছিল বিজয়।

টাকার লোভে মেয়েরা সব পারে। অরূপা দেবীকেও একদিন দেখা গেল অজয়ের বাড়িতে। অজয়ের নিমন্ত্রণ সে রেখেছে। অজয় নাটক লেখে। সেই নাটকের গান্ধারী রোলটা তাকেই করতে হবে। বাড়ির মধ্যেই একখানা ঘরে বসবাস শুরু করে দিল অরূপা দেবী। মনোমালিন্য হয়ে গেল বিজয়ের সঙ্গে।

অজয় কিন্তু কল্পনাও করতে পারল না, নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়ছে প্রতুল লাহিড়ী। সে-ই পাঠিয়েছে অরূপা দেবীকে, সরিয়েছে বিজয়কে মনে আঘাত দিয়ে।

এমন সময়ে একখানা চিঠি এল অজয়ের নামে। প্রতুল লাহিড়ী হস্তগত করল চিঠিখানা। লিখেছেন সারদাচরণ। শুধু দুটি শব্দ–পঞ্চাশ হাজারেও নয়।

পরদিন সকালে দেশসুদ্ধ লোক জেনে গেল আর একটা অপমৃত্যুর চাঞ্চল্যকর সংবাদ। সারদাচরণও মারা গেছেন রহস্যজনকভাবে বিষপ্রয়োগে।

পুলিশ দপ্তরে খবর এল। অজয় টেলিফোন করে জানিয়েছে সারদাচরণের মৃত্যুর আগে নাকি বিজয়কে সেখানেও দেখা গিয়েছে।

পুলিশ হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল বিজয়কে।

প্রতুল লাহিড়ী অরূপা দেবীকে পরামর্শ দিলে বিজয়কে নিয়ে গা-ঢাকা দিতে। কেঁদুটির এক কুঁড়ে ঘরে পালিয়ে গেল দুজনে। অজয়ের নাটকটা পড়বার জন্যে সঙ্গে করে নিয়ে গেল অরূপা দেবী।

নাট্যকার হওয়ার শখ তখন মাথায় উঠেছে অজয়ের। জেল পালানো একটি মেয়ে এসে উঠেছে তার বাড়িতে। নাম তার উজালী। বোম্বাইতে বিয়ে করেছিল। মারাত্মক একটা বিযের সন্ধান এই উজালীর কাছেই সে জেনেছিল। বিষটা আসে একটা ফুল থেকে। ফুলটার নাম টামুই..

অরূপা দেবীকে অজয় বিয়ে করতে চায় জানতে পেরে বাঘিনী মূর্তি ধারণ করল উজালী। অজয়ের কুকীর্তি সে ফঁস করে দেবেই। মাধবচরণ, ধনঞ্জয় মিত্র এবং সারদাচরণকে দূর থেকেও খুন করার গুপ্ত রহস্য আর কেউ না জানলেও সে জানে…

কেঁদুটি থেকে ট্যাক্সি নিয়ে ফিরে এল অরূপা দেবী। হাতে নাটকের পাণ্ডুলিপি। চোখ বড়-বড়।

প্রতুলবাবু, প্রতুলবাবু, খুনগুলো হচ্ছে কী করে ধরে ফেলেছিল। বিষ…বিষ…ফুলের বিষ।

জানি। বলল প্রতুল। টামুই ফুলের বিষ। কিন্তু প্রয়োগ হচ্ছে কী করে? চিঠির মধ্যে দিয়ে বললে বিশু। অজয়ের বাড়িতে ছদ্মবেশে হেঁসেল সামলেছে অ্যাদ্দিন। আড়ি পেতে সাংঘাতিক চক্রান্তটা শুনেছে সে। এক্ষুনি কেঁদুটিতে লোক পাঠাতে হবে। বিজয়কে চিঠি লিখেছে অজয়। সে চিঠির জবাব দিলেই মারা পড়বে বিজয়।

কিন্তু কীভাবে?

উজালীকে বলল অজয়, চল আমরা পালাই বোম্বাইতে। খতম করে যাই বিজয়কে। পুলিশ তাকে খুঁজেছে খুনের অপরাধে। হঠাৎ মারা গেলে বুঝবে আত্মহত্যা করে জ্বালা জুড়িয়েছে।

বলে, মারাত্মক চিঠিখানা লিখে ফেলে দিয়ে এল ডাক বাক্সে।

ফিরে এসে গুলি করল উজালীকে।

পুলিশ এসে দেখল বিষ খেয়েছে অজয়। টামুই ফুলের বিষ। মারা গেল বিশ মিনিট পরে।

অরূপা দেবীর হাত থেকে নাটকের পাণ্ডুলিপিটা টেনে নিয়ে পড়ল প্রতুল লাহিড়ী।

.

কৃষ্ণ। আর আমি আর আমি ধ্বংস করব বিপুল কৌরব কুল–সামান্য একখানা চিঠির সাহায্যে।

ভীষ্ম–চিঠির সাহায্যে।

কৃষ্ণ। হ্যাঁ। আমি লিখব যাকে সে জবাব দেবে–ব্যস। আয়োজনের কোনও ঘটা নেই আধ ঘণ্টার ভেতর মৃত্যু এসে ধীরে ধীরে গ্রাস করবে। কেউ জানবে না কেউ বুঝবে না ডাক্তারের বিশ্লেষণ শক্তি হবে পরাহত। বৈজ্ঞানিকের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি পরাজয়ের কালিমায় কালো হয়ে উঠবে।

ভীষ্ম। ব্যাপারটা বুঝিয়ে না বললে তোমার কথার একটা বর্ণও যে আমার মাথায় ঢুকছে, কৃষ্ণ!

কৃষ্ণ! মাথায় ঢুকবে না, ঠাকুরদা। ফুলে কীট আছে শুনেছেন তো? এ সেই ফুল আর এ-সেই কীট..

লাফিয়ে উঠে বললেন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর আনন্দমোহন, ব্যস ব্যস আর পড়তে হবে, বুঝেছি।

খাতা বন্ধ করে বলল প্রতুল লাহিড়ী, হ্যাঁ, শুধু একখানা ডাক টিকিট!

কী বুঝলেন?

.

গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান

চিঠি লিখে খামে মুড়ে ডাক টিকিট লাগানোর সময়ে শতকরা নিরানব্বই জন মানুষ জিভের ডগায় ডাকটিকিট বুলিয়ে নেন হাতের কাছে জল বা জলশোষক স্পঞ্জ থাকে না বলে।

অজয় ডাকটিকিটের পেছনে টামুই ফুলের বিষ মাখিয়ে রাখত। যাকে খুন করতে হবে তাকে চিঠি লিখে জবাব চাইত এবং ঝটিতি জবাব পাওয়ার আশায় নিজের ঠিকানা লেখা আর একটা খাম আর বিষ মাখানো ডাকটিকিট সঙ্গে দিত।

ধনঞ্জয় মিত্র উইল পালটাবেন শুনেই মাধবচরণকে সরিয়ে দিয়েছিল এইভাবেই হাতে খানিকটা সময় নেওয়ার মতলবে। তারপরে একই কায়দায় চিঠি লিখল ধনঞ্জয় মিত্রকে। উইল পালটাবার জন্যে তিনি সবাইকে ডাকলেন এবং সবার সামনেই সেই চিঠির জবাব দিয়ে বিদায় নিলেন ধরাধাম থেকে।

মারা গেলেন সারদাচরণ একই পন্থায়। তিনি বোধহয় কিছুটা আঁচ করেছিলেন। অজয় তাঁকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল। ওটা অছিলা। উদ্দেশ্য জবাব নেওয়া। পঞ্চাশ হাজারেও নয় লিখে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়লেন ভদ্রলোক।

এই হল কৃষ্ণের বৈজ্ঞানিক কুরুক্ষেত্র।

* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ২৯শে ফাল্গুন, ১৩৮১।

Post a comment

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *