স্বদেশমন্ত্রের গান : বন্দে মাতরম
মণীন্দ্রনাথ আশ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত দুর্গেশনন্দিনী ১৮৬৫ সালে ও ১৮৮২, ১৫ আগস্ট আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রকাশ কাল। তখনও জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়নি, অর্থাৎ আনন্দমঠ-এর প্রকাশের ৩ বছর পর ১৮৮৫-তে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা হয়।
১৮৭৫ সালে হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় অবস্থানকালে বঙ্কিমচন্দ্র সুমধুর সরল বাংলা-সংস্কৃত ভাষায় ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি রচনা করেন। ১৮৯৬-এ কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অভিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ গানের প্রথম ৭ পঙক্তি গেয়ে শোনান। আবার আনন্দমঠ-এর মূলমন্ত্র ছিল এই ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি। উপন্যাসের নারী চরিত্রটি সেখানে অসহায় অবলা নয়—শক্তিময়ী। আবার আনন্দমঠ-কে নিয়ে বিতর্কের ঝড় বয়ে যায় একসময়। এর বিষয়বস্তুতে হিন্দুত্ববাদের প্রচার ও ব্যবহৃত কয়েকটি শব্দকে নিয়েও আপত্তি। তাদের প্রশ্ন—একেশ্বরবাদী অন্য সম্প্রদায়ের যুবকরা কি করে এই মাতৃমন্ত্র উচ্চারণ করবে? সেজন্য অনেক পণ্ডিত গবেষক বঙ্কিমচন্দ্রকে সাম্প্রদায়িক হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। তবে একথা ঠিক যে আপামর জনসাধারণকে অনুপ্রাণিত না করতে পারলেও, দেশের বৃহৎ অংশকে এই ধবনিটি যে উদ্বেলিত করেছিল সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। এবং বিরুদ্ধবাদীদের চেয়ে সমর্থনকারীদের সংখ্যাই বেশি। এবং সম্প্রতি দুর্গাদাস চট্টোপাধ্যায় ”বঙ্কিম বিরোধিতার প্রেক্ষাপট’ নামে যে পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন, উৎসাহী পাঠক তা থেকে অনেক তথ্য জানতে পারবেন।
আসলে এখানে জগদ্ধাত্রী বা দুর্গামূর্তি একটি প্রতীকমাত্র-জন্মভূমি-দেশমাতৃকার বন্দনাই এর প্রাণস্বরূপ। সাহিত্যরত্ন হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বলছেন :
যে মানুষ জননী ও জন্মভূমিকে প্রণাম না করে, ভক্তি না করে অথবা প্রণতি ও ভক্তির পথে বিঘ্ন উপস্থিত করে, সে অকৃতজ্ঞ, অমানুষ—সে নরাধম। বুদ্ধিনাশ না হইলে কাহারও এহেন দুর্মতি ঘটে না। সে নরাধম। বুদ্ধিনাশ না হইলে কাহারও এহেন দুর্মতি ঘটে না।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে যে যুগমানব বাঙালিকে আত্মবোধে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, মৃত্যুপথযাত্রীকে অমৃতের সন্ধান দিয়েছিলেন, যিনি জননীকে বিশ্বজননী মূর্তিতে এবং বিশ্বজননীকে জন্মভূমির বিগ্রহে প্রত্যক্ষ করে তার সহিত বাঙালির প্রত্যক্ষ পরিচয়ের হেতু হয়েছিলেন, তিনি ‘বন্দে মাতরম’ মহামন্ত্রের উদগাতা আচার্য বঙ্কিমচন্দ্র। ‘বঙ্কিমের স্বদেশ প্রীতিই সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম। আনন্দমঠ-এর সন্তানদের একমাত্র উপাস্য দেবতা হলেন জননী জন্মভূমি। আনন্দমঠ-এর মহেন্দ্র যে দেবীমূর্তি ত্রয় দর্শন করেছেন তা জন্মভূমির ভূত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের কল্পিত বাকপ্রতিমা। ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের মা এই দেশমাতা ভিন্ন আর কিছু নয়। তাই বিস্মিত মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করেছেন—’মাতা কে?’ ভবানন্দ ‘বন্দে মাতরম’-এর অংশ বিশেষ গেয়ে উঠেছেন। মহেন্দ্র বললেন,—’এত দেশ এত মা নয়’ ভবানন্দ বুঝিয়ে বললেন, ‘-আমরা অন্য মা জানি না…। আমরা বলি, জন্মভূমিই জননী…।’ ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিটি মন্ত্রের মতো কাজ করেছে। আমাদের উদ্দীপ্ত করেছে, উৎসাহিত করেছে। দিয়েছে নিষ্ঠা, করেছে নির্ভীক। সমস্ত দেশবাসীকে নিয়ে মানবসমাজের যে ঐক্যবোধ তাই হল জাতীয় বোধ। ‘বন্দে মাতরম’-এর আগে আমাদের স্বদেশ প্রীতি ছিল। স্বাধীনতার আকাঙক্ষাও ছিল, কিন্তু প্রতিটি দেশবাসীর সঙ্গে মিলেমিশে, রাষ্ট্র ধর্ম, ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতির সুদৃঢ় বন্ধনের একটি ‘একক’ যেন ঠিক সেইভাবে গড়ে ওঠেনি। ঋষি অরবিন্দও দেশকে মা বলেছেন—’Mother Inida is not a piece of earth, she is power, a god head.’ বহু ভাষাবিদ অরবিন্দ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটিকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিয়েছিলেন। ঋষি অরবিন্দকৃত ‘বন্দে মাতরম’-এর ইংরেজি অনুবাদের অংশবিশেষ :
BANDE MATARAM—I bow to thee, Mother,/Richly watered, richly fruted/cool with winds of the south/Dark with the crops of the her vests/the Mother
‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতটি আজও প্রাসঙ্গিক। এবং স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত। একটি সংবাদে [আলিপুর বার্তা ২৬ পৌষ-৩ মাঘ ১৪০৯] জানা যায় যে, ‘বন্দে মাতরম’ বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় সঙ্গীত। ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং সার্ভিসেসের ৭০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ই-মেল গৃহীত ভোটে এই তথ্য জানা যায়। যদিও বর্তমানে এটি স্লোগান হিসাবে আকছার ব্যবহার করে এর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমরা যেন এই ধবনিটির যথাযোগ্য মর্যাদা দিতে পারি।
