জাতীয় সংগীত বনাম জাতীয় সংগীত – সুজয় বাগচী

জাতীয় সংগীত বনাম জাতীয় সংগীত

সুজয় বাগচী

প্রবন্ধটির নাম অনেকের কাছেই বিভ্রান্তিকর বলে মনে হবে। যদি ইংরেজিতে রূপান্তরিত করে বলা হয় National Anthem vs National Song কিংবা National Song VS National Anthem তাহলে নামটি অনেকের কাছে সহজবোধ্য হত। আমাদের জাতীয় সংগীত কোনটি এ প্রশ্নের উত্তরে ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘জনগণমন’ দুটির নামই শোনা যাবে। পরে সূত্রের ভাষ্যের মত যোগ করা হবে ‘জনগণমন’ National Anthem এবং ‘বন্দে মাতরম’ National Song। তাহলে দুটির মধ্যে পার্থক্য কোথায় এবং কেন?

Anthem শব্দটির অভিধানগত অর্থ ‘Choral Composition for church use, Song of Praise esp. for nation’ আর Song এর অর্থ ‘Words set to music for vocal singing’। শব্দের খোলস ছাড়িয়ে যদি অর্থটাকে বিস্তৃত করা যায়, তবে অর্থটা দাঁড়ায় Anthem কোন বিশেষ অনুষ্ঠানে, বিশেষত পবিত্র বা সম্মানীয় অনুষ্ঠানে গেয়, আর Song শুধুই সুর সংযোজিত শব্দ সমষ্টি। দুটি সংগীতই দেশের প্রশস্তিমূলক। তবুও এদের কেন্দ্র করে এক সময়ে বিতর্কের যে ঝড় উঠেছিল তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন দেশের একাধিক নেতা এবং বুদ্ধিজীবী। স্বাধীনতার অর্ধশত বার্ষিকীতে এবং নেতাজির জন্ম শতবার্ষিকীতে এই বিতর্কের কথা স্মরণ করা যেতে পারে এই জন্যই যে এই বিতর্কে সুভাষচন্দ্রের একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল। কারণ বিতর্ক যখন তুঙ্গে তখন সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি (তখন বলা হত রাষ্ট্রপতি)। স্মরণ করা যেতে পারে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকাও। যদিও রবীন্দ্রনাথ তখন জীবন-সায়াহ্নে, তবুও রবীন্দ্রনাথ তখন ভারতের সাংস্কৃতিক গগনের উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। বিশেষত প্রথম যে অবস্থান নিয়েছিলেন, আমৃত্যু তা থেকে তিনি সরে আসেন নি। সন্ধেবেলার প্রদীপ জ্বালানোর আগে যেমন সকালবেলায় সলতে পাকানোর কাহিনি থাকে, তেমনি ‘বন্দে মাতরম’-জনগণমনের বিতর্কের ইতিহাস আলোচনা করার আগে এই দুটি সংগীতের সংগীত রচনার ইতিহাস বলা প্রয়োজন।

অনেকেরই ধারণা ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠ উপন্যাসের জন্য রচনা করেছিলেন। বাস্তব ঘটনা তা নয়। আনন্দ মঠ রচনার বেশ কয়েক বছর আগে বঙ্কিমচন্দ্র সংগীতটি রচনা করেন। আনন্দমঠ বঙ্গদর্শন-এ ১৮৮০ সালের মার্চ-এপ্রিল থেকে ১৮৮২ সালের মে-জুন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। ‘বন্দে মাতরম’ রচিত হয় ১৮৭৫ সালে। মূলত বঙ্গদর্শন-এর পৃষ্ঠা-পূরণের জন্য সংগীতটি রচিত হয়েছিল, যদিও শেষ পর্যন্ত সেভাবে এটি ছাপা হয়নি। সংগীতটি যে বাঙালির জাতীয়তাবোধের উম্মেষকালে এবং পরবর্তীকালে জনমানসে বিরাটপ্রভাব বিস্তার করবে এমন একটি আশা এবং বিশ্বাস বঙ্কিমচন্দ্রের ছিল। এ তথ্য জানা যায়, তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিকথা থেকে। কার্যত সেটিই ঘটেছিল। সে ইতিহাস আজ সকলেরই জানা আছে। সংগীতটিতে দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করে দুর্গার সঙ্গে তাকে অভিন্নরূপে কল্পনা করা হয়েছে। সমসাময়িককালে রচিত কমলাকান্তের দপ্তর -এর ‘আমার দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধটির কথা স্মরণ করা যেতে পারে, দুটির ভাবগত সাদৃশ্যের জন্য। আনন্দমঠ-এ সংগীতটি পরে সংযোজিত।

পরবর্তীকালে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। স্বাধীনতাকামী এবং স্বাধীনতাযোদ্ধাদের মূলমন্ত্রই হয়ে ওঠে ‘বন্দে মাতরম’। কংগ্রেস তখন সকল স্বাধীনতাকামী এবং যোদ্ধাদের সাধারণ প্ল্যাটফর্ম। কংগ্রেসের বিভিন্ন সভা-সমিতিতে গানটি গাওয়া হত। কিন্তু রচয়িতার ভাবকল্পনার মধ্যেই ছিল সম্প্রদায় বিশেষের আপত্তি এবং বিতর্কের অঙ্কুর, যা পরে মহীরুহের রূপ ধারণ করেছিল। সংগীতটির মধ্যে পৌত্তলিকতার প্রভাব রয়েছে, এবং আনন্দমঠ-এ মুসলমান বিদ্বেষ প্রচার করা হয়েছে, এই অভিযোগে বাংলার মুসলিম সমাজের এক অংশ সংগীতটির বিরোধিতা করতে থাকেন। এই বিরোধিতাই পরে বিতর্কের রূপ ধারণ করে।

‘বন্দে মাতরম’ রচিত হওয়ার ছত্রিশ বৎসর পরে ১৯১১ সালে রবীন্দ্রনাথ রচনা করেন ‘জনগণমন’। বহুকাল পরে সুসংগঠিত ভাবে একটি প্রচার চালানো হয় যে ১৯১১ সালে সম্রাট পঞ্চমজর্জ যখন দিল্লির দরবার (১২ ডিসেম্বর, ১৯১১) উপলক্ষ্যে ভারতে আসেন তখন সম্রাটের স্তুতি করে রবীন্দ্রনাথ সংগীতটি রচনা করেন। বস্তুত দুটি ঘটনা সমাপতন মাত্র এবং এ দুটির মধ্যে কার্য-কারণ সম্পর্কও রয়েছে। একথা ঠিক সিমলার একজন উচ্চপদস্থ রাজ কর্মচারী সম্রাটের ভারতে আগমন উপলক্ষ্যে সম্রাটের স্তুতিবাচক একটি সঙ্গীত রচনার জন্য রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ যে রাজকর্মচারীটির অনুরোধ রক্ষা করেননি তা স্পষ্ট বোঝা যায় ১২/১১/৩৭ তারিখে পুলিনবিহারী সেনকে লেখা তাঁর চিঠি থেকে :

সিমলার সেই রাজকর্মচারীর অনুরোধ শুনে আশ্চর্য হয়েছিলুম। এই বিষয়ের সঙ্গে মনে উত্তাপের সঞ্চার হয়েছিল। তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারত-ভাগ্য বিধাতার জয় ঘোষণা করেছি। পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থার যুগযুগধাবিত যাত্রীদের যিনি চির-সারথি, যিনি অন্তর্যামী পথ পরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্য-রথচালক যে পঞ্চম জর্জ বা ষষ্ঠজর্জ হতে পারেন না, সেকথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন। কেন না তার ভক্তি প্রবল থাক, বুদ্ধির অভাব ছিল না। এ গান কংগ্রেসের জন্য লেখা হয়নি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে ১৯১৯ সালে রবীন্দ্রনাথ গানটির ‘মর্ণি সঙ্গ অফ ইন্ডিয়া’ নাম দিয়ে ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। গানটি কংগ্রেসের জন্য লেখা না হলেও, ১৯১১ সালে কংগ্রেসের অধিবেশনে গানটি গাওয়া হয়েছিল। নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সরলা দেবী চৌধুরাণী (রবীন্দ্রনাথের ভাগিনেয়ী) এবং অমলা দাশ (চিত্তরঞ্জন দাশের ভগ্নী)। পরেও কংগ্রেস অধিবেশনে গানটি গাওয়া হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘জনগণমন’ এ দুটির মধ্যে কোনটি গ্রহণীয় এ নিয়ে অল্প-বিস্তর বিতর্কের সূত্রপাত তখন থেকেই। আবেগাপ্লুত স্বাধীনতাকামী এবং বুদ্ধিজীবীদের এক অংশ সমগ্র ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটিকে গ্রহণীয় বলে মনে করেন (সাধারণত বন্দে মাতরমের প্রথম দুটি স্তবকই গাওয়া হত)। তার সঙ্গে মুসলিম সমাজের এক অংশের বিরোধিতা মিলিত হয়ে অবস্থা আরও জটিল করে তোলে।

‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি সর্বপ্রথমে গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। গানটির প্রথম দুটি স্তবকে সুর সংযোগ করে ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে তিনি সংগীতটি পরিবেশন করেন। বঙ্কিমচন্দ্র নির্দেশিত সুরে এবং তালে (‘মল্লার’ রাগ, ‘কাওয়ালী’ তাল) তিনি গানটি গেয়েছিলেন কি না তা জানা নেই। প্রথম গাইলেও সমগ্র সংগীতটির অন্তর্নিহিত ভাব রবীন্দ্রনাথকে কোনোদিনই খুব আকর্ষণ করেনি। তার অন্যতম কারণ নিঃসন্দেহে ব্রাহ্মপরিবেশের প্রভাব। বঙ্গভঙ্গের যুগে রবীন্দ্রনাথ যে সব দেশাত্মবোধক গান রচনা করেছেন তার কিছু গানের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’-এর ভাবগত সাদৃশ্য লক্ষ্যণীয়। পরবর্তী কালে রবীন্দ্রনাথ আর এ জাতীয় দেশাত্মবোধক গান রচনা করেননি। কারণ কবিমানসে বিশ্বমানবিকতা এবং আন্তর্জাতিকতা বোধের ক্রম-উম্মেষ। ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা যত বাড়তে থাকে মুসলিম সমাজের এক অংশের উষ্মাও তত বাড়তে থাকে। অবশ্য রেজাউল করিম প্রমুখ কিছু মুসলিম বুদ্ধিজীবী এ বিষয়ে মুক্তমনা ছিলেন। কিন্তু সেটি সে যুগে ব্যতিক্রম মাত্র। অসহযোগ আন্দোলনও রবীন্দ্রনাথের সমর্থন পায়নি। এ সম্পর্কে প্রমথ চৌধুরীকে লিখিত চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব খুব স্পষ্ট। চিঠিটির তারিখ ১৮ কার্তিক, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ :

দেশের কর্তা ব্যক্তিদের কাছ থেকে হুকুম আসছে বাঁশি ছেড়ে লাঠি ধর। যদি তা করি কর্তারা খুশি হবেন। কিন্তু আমার এক বাঁশিওয়ালা মিতা আছেন, কর্তাদের অনেক উপরে। তিনি আমাকে একেবারে বরখাস্ত করে দেবেন। কর্তারা বলবেন, তিনি আবার কে? আছে তো এক বন্দে মাতরম। তাঁদের গড় করে আমায় বলতে হচ্ছে আমায় বন্দে মাতরম ভুলিয়েছেন ঐ তিনি।

এ চিঠি লেখার দশ বৎসর পরে সত্তর বৎসর পূর্তি উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ বন্দে মাতরমের পরিবর্তে ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানের আবেদন জানান। সংবাদটি প্রকাশিত হয় ১৩৩৮ সালে ২৬ বৈশাখের আনন্দবাজারে। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ বির্তক তখন দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ফলে রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাবিত স্লোগান জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি। কিন্তু এই বির্তক থেকেও রবীন্দ্রনাথ দূরে থাকতে পারেননি।

বন্দে মাতরম বির্তক তীব্রতর হয়ে উঠে ১৯৩৭ সাল নাগাদ। ১৯৩৫ সালের ভারতশাসন আইনে মুসলমানদের জন্য (এবং তার সাথে তপশিলি হিন্দুদের জন্যও) পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। পরিণতিতে হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক বিরোধিতা আরও বেড়ে যায়। বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত হবে, না জনগণমন হবে, সে প্রশ্নটি বড়ো ছিল তা নয়। তার চেয়েও বড়ো প্রশ্ন ছিল সমগ্র ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া হবে, না আংশিক গাওয়া হবে—যা সকল ধর্মাবলম্বীদের কাছে গ্রহণীয় অর্থাৎ প্রথম দুটি স্তবক। ১৯৩৭-৩৯ সালে এই বিতর্ক তুঙ্গে উঠে। মনে রাখা দরকার এই সময়ে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেসের সভাপতি (১৯৩৮ সাল), রবীন্দ্রনাথও এই সময়ে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন। এ দিকে বাংলার বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, ড: দীনেশ সেন, রায়বাহাদুর খগেন্দ্র নাথ মিত্র, যতীন্দ্র মোহন বাগচী এবং জাতীয়তাবাদী পত্রিকা সমূহ সমগ্র বন্দে মাতরম সংগীতটি গ্রহণীয় বলে বিতর্কে নেমে পড়েন। এঁদের নেতা ছিলেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। গোঁড়া ব্রাহ্ম হয়েও তিনি জনসাধারণের আবেগের অংশীদার হলেন। রবীন্দ্রনাথ নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবিচলিত রইলেন। ১৯৩৭ সালের অক্টোবর সংখ্যার বিশ্বভারতী পত্রিকায় কৃষ্ণ কৃপালনী মতপ্রকাশ করেন ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শের সঙ্গতি নেই। রবীন্দ্রনাথেরও এই মনোভাব ছিল এটা স্পষ্ট। তবুও এই বিতর্কে যাতে বিশ্বভারতী জড়িয়ে না পড়ে সেই জন্য তিনি মত প্রকাশ করেন যে, প্রবন্ধটি কৃষ্ণ কৃপালনীর ব্যক্তিগত মত মাত্র। নান্দনিক দিক থেকে বিচার করে রবীন্দ্রনাথ বলেন যে, যেহেতু আনন্দ মঠ একটি উপন্যাস, সেই হেতু সমগ্র ‘বন্দে মাতরম’ গানটি তাঁর কাহিনির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। সুভাষচন্দ্রকে ১৯/১০/৩৭ তারিখে রবীন্দ্রনাথ লেখেন :

বালাদেশের একদল মুসলমানের মধ্যে যখন অযথা গোঁড়ামির জেদ দেখতে পাই তখন সেটা অসহ্য বোধ হয়। তাদের অনুকরণ করে আমরা যখন অন্যায় আবদার নিয়ে জেদ করি তখন সেটা লজ্জার বিষয় হয়ে উঠে। উভয় পক্ষের ক্ষোভ যেখানে প্রবল, সেখানে অপক্ষপাত বিচারের প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রীয় সাধানায় আমাদের শান্তি চাই, ঐক্য চাই, শুভবুদ্ধি চাই। কোন পক্ষের জেদকে দুর্দম করে হার জিতের অন্তহীন প্রতিযোগিতা চাই নে।

সারা দেশ জুড়ে যখন বিতর্কের ঝড় চলছে, কংগ্রেস ওয়াকিং কমিটি তখন নীরব থাকতে পারে না। বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য ওয়ার্কিং কমিটি সুভাষচন্দ্র, জহরলাল, মৌলানা আজাদ, আচার্য নরেন্দ্রদেব প্রমুখকে নিয়ে একটি সাবকমিটি গঠন করে। সাবকমিটিকে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ নিতে অনুরোধ করা হয়। অক্টোবরের শেষের দিকে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবক কংগ্রেসের সভাসমিতিতে গাওয়া হবে। কারণ এই অংশ সকলেরই গ্রহণ-যোগ্য। দেশব্যাপী বিক্ষোভের পরোয়া না করে রবীন্দ্রনাথ ৩০/১০/৩৭ তারিখে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। আনন্দ বাজার পত্রিকায় ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলা হয় এটি ‘না গ্রহণ, না বর্জন’ নীতির এবং এর একমাত্র উদ্দেশ্য একটি সম্প্রদায় বিশেষের তুষ্টি সাধন। সমগ্র ‘বন্দে মাতরম’ পক্ষীয়রা বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিকৃতি নিয়ে কলকাতায় মিছিল বের করেন। জহরলাল এবং সুভাষচন্দ্র, দুজনেই তখন কলকাতায়, কিন্তু দুজনেই ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তে অটল।

এই সময়ে মাদ্রাজ থেকে ডঃ জে. এইচ কুইজিন (Dr. J. H. Couisine) ৩/১১/৩৭ তারিখের মাদ্রাজ মেলে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটির বক্তব্যে বোঝা যায় ‘জনগণমন’ও এই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত সমর্থন করেও তিনি ‘জনগণমন’ সম্পর্কে মতপ্রকাশ করেন ‘জনগণমনের বৈশিষ্ট্য হল যে সুর ও ছন্দের মিশ্রনে এ গানটিকে দৃঢ় কন্ঠে এক হয়ে গাওয়া যায়। অথচ ‘বন্দে মাতরম’ কখনোই বহু কণ্ঠে এক সঙ্গে গাওয়া যায় না। এঁর ওঠানামা একক কন্ঠেই সম্ভব।’ চিঠিটি প্রায় ভীমরুলের চাকে ঘা দেওয়ার মতোই হয়ে দাঁড়াল। সুভাষ চন্দ্রের সমর্থন লাভের আশায় ১৬/১১/৩৭ তারিখে সমগ্র ‘বন্দে মাতরম’ সমর্থক সাহিত্যিকদের এক সভায় সুভাষ বসুকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ করে আনা হয়। সাহিত্যিকদের সমস্ত আশাকে ধূলিসাৎ করে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করলেন। ১৯৩৮ সালের জানুয়ারিতে সুভাষচন্দ্র হরিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। ১৯৩৮ সালের ২৯ থেকে ৩১ জানুয়ারি বিষ্ণুপুরে যে প্রাদেশিক সম্মেলন হয় সেখানে সুভাষচন্দ্র ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে কোনো প্রস্তাবই তুলতে দিলেন না। যাঁরা আশা করেছিলেন হরিপুরা কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্ত পালটে দেবেন তাঁদের নিরাশ হতে হল। ওয়ার্কিং কমিটির যৌথ সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে সকলকে বুঝিয়ে দিলেন তিনি। বছর দুয়েক পরে যতীন্দ্র মোহন বাগচীর বাড়িতে অনুষ্ঠিত সাহিত্যিকদের এক মজলিশে (১১/৮/৩৯) প্রশ্নোত্তরে সুভাষচন্দ্র জানান যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সিদ্ধান্তে তাঁর পূর্ণ সমর্থন ছিল। তিনি স্পষ্টভাবে মত প্রকাশ করেন যে বাংলার দিক থেকে বা কোনো ধর্মের দিক থেকে কোনো বিষয়ে বিচার কংগ্রেস করতে পারে না, সর্বভারতীয় দৃষ্টিকোন থেকেই যে কোনো সমস্যাকে বিচার করতে হবে। ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের প্রথম দুটি স্তবককে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করায় সংগীতটির মর্যাদা এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এর পরই শুরু হয় ভারতবর্ষের রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইতিহাসে এক ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ সময়। যুদ্ধ, ভারত ছাড়ো আন্দোলন, স্বাধীনতার জন্য রাজনৈতিক দর কষাকষি, মন্বন্তর। উত্তাল স্বাধীনতা আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশবিভাগ, ইত্যাদির মধ্যে জাতীয় সংগীত বিতর্কে স্তিমিত ভাব এল। ইতিমধ্যে জানা গেল আজাদহিন্দ সরকার জাতীয় সংগীত হিসেবে যেটি গ্রহণ করেছে তার সুর এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে কথাও জনগণমনেরই। তবে আজাদ হিন্দ এটিকে Anthem ঘোষণা করেনি। নাম দেওয়া হয়েছিল Azad Hind Fauj Anthem। আজাদ হিন্দ সরকার ছিল একটি অস্থায়ী সরকার যার লক্ষ্য ছিল ভারতবর্ষকে বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত করা। যে-কোনো বিষয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে, ভারতবর্ষ বিদেশি শাসনমুক্ত হলে যে স্থায়ী সরকার হবে তারা। সে দিক দিয়ে বিচার করলে Azad Hind Fauj anthem নাম দেওয়া নিঃসন্দেহ সুভাষচন্দ্রের রাজনৈতিক বিচক্ষণতার পরিচায়ক। তার সঙ্গে প্রমাণ করে আজাদ হিন্দ ফৌজের মধ্যে যাতে সাম্প্রদয়িক অনৈক্য ঢোকবার সামান্যতম সুযোগও না পায় এ বিষয়ে তাঁর প্রচেষ্টা ও দূরদৃষ্টি।

ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয় সংগীত (National Anthem) নির্বাচন করার প্রশ্নটি জরুরি হয়ে দাঁড়াল। এরপর বন্দে মাতরম এবং জনগণমন মুখোমুখি। সরকার সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের প্রতিনিধিদের সুপারিশ অনুযায়ী স্বাধীনতা লাভের পরই জনগণমনকেই সাময়িক ভাবে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করে। কিন্তু বিতর্ক চলতেই থাকে। ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে জহরলাল জনগণমনের গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে যে বিবৃতি দেন তাতে ডঃ জে. এইচ কুইজিনের বক্তব্যেরই প্রতিধবনি শোনা যায়। ‘দেখা গেছে যে জনগণমন’র অর্কেস্ট্রেশন অনেক সাবলীল’ অবশ্য এর সঙ্গে তিনি এ-ও ঘোষণা করেন যে ‘জনগণমন ও বন্দে মাতরম কে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক চলছে তা দুর্ভাগ্যজনক। নিঃসন্দেহে, ‘বন্দে মাতরম’-এর অবদান অস্বীকার করা যায় না। ইতিহাসে যে স্থান ‘বন্দে মাতরম’ গানটির সেখান থেকে কেউ তাকে সরাতে পারবে না।’ গণপরিষদে বিতর্ক চলে। কিন্তু সিদ্ধান্ত কী হবে সেটা জহরলালের বক্তব্যেই প্রতিফলিত। ১৯৫০ সালের জানুয়ারি মাসে শেষপর্যন্ত জনগণমনকেই National anthem বলে ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতা আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’-এর অবদান এবং দেশের ‘সেন্টিমেন্ট’ এর কথা মনে রেখে তাকে একই সম্মান বা মর্যাদা দেওয়া হয়। প্রথমে বলা হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’-এর হবে ‘Same honoured place’ কিন্তু পরে সংশোধন করে বলা হয় ‘Same Status’। অবশ্য জনগণমনকে জাতীয় সংগীত বলে গ্রহণ করার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রস্তাব পাস করানো হয়নি। প্রতিনিধিদের আলোচনা এবং বিতর্ককে একীভূত (Sum up) করে সভাপতি ড: রাজেন্দ্র প্রসাদ ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি পরিষদে ঘোষণা করেন :

জনগণমন নামে যে সেটা আমাদের ন্যাশনাল অ্যান্থেম বলে স্বীকৃত হবে। কোনো সময় যদি সরকারের মনে হয় যে এর কথার কিছু পরিবর্তন প্রয়োজন তাহলে সেটা স্বীকৃত হবে। বন্দে মাতরম গানটির, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি বিশেষ ভূমিকা আছে তাই জনগণমন যে স্বীকৃতি পাচ্ছে তা এই গানটিকেও দেওয়া হবে। আশাকরি সকলেই এই প্রস্তাবে খুশি হবেন।

ড. রাজেন্দ্র প্রসাদের ঘোষণা যবনিকা টেনে দিয়ে একটি দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটাল। সংবিধানে নির্দেশ দেওয়া হল ‘National Anthem’-কে সম্মান করা প্রত্যেক নাগরিকের অবশ্য-কর্তব্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *