বন্দে মাতরম : একটি ইঙ্গিত
রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
ঊনবিংশ শতাব্দী বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের একটি বিশিষ্ট অধ্যায়। এই যুগেই ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়, পুরুষসিংহ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের উদগাতা ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণদেব, বাঙালিকে জীবনমন্ত্রে দীক্ষাদাতা স্বামী বিবেকানন্দ, বিশ্বকবি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভবিষ্যদ্রষ্টা ঋষি অরবিন্দ, অনন্য জননায়ক দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, রাষ্ট্রগুরু সুরেন্দ্রনাথ।
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেন তাঁর অতুলনীয় মাতৃবন্দনা ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত উনবিংশ শতাব্দীর সপ্ত দশকের মধ্যভাগে। শুধু সঙ্গীত নয় ‘বন্দে মাতরম’ সারা ভারতের পুনরভ্যুত্থানের সন্দীপন মন্ত্র। রচনার প্রায় একবিংশতি বৎসরান্তে ১৮৯৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলিকাতায় দ্বাদশ অধিবেশনে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই ‘বন্দে মাতরম’ উদ্বোধন সংগীত রূপে সুললিত কণ্ঠে পরিবেশন করে উপস্থিত জননায়কদের মুগ্ধ করেন ও দেশমাতৃকার বন্দনায় উৎসাহিত করেন।
তারও আগে ১৮৮৩ সনে আগস্ট মাসে কলিকাতায় তিনদিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় সম্মেলনে ‘বন্দে মাতরম’ আহ্বান সঙ্গীত রূপে গীত হয়। মনে রাখতে হবে যে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দ মঠ’ প্রকাশিত হয় তার মাত্র এক বৎসর পূর্ব্বে ।
এই ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সংগ্রামী ভারতে চলেছিল অর্দ্ধশতাব্দীব্যাপী মুক্তিযুদ্ধ। ভারতসন্তান ‘বন্দে মাতরম’ বীজমন্ত্র উচ্চারণ করে একদিন ফাঁসীর মঞ্চে আরোহন করে দেশমাতৃকার বেদীমূলে হাসিমুখে আত্ম-বলিদান দিয়েছে। অজস্র বন্ধন মাঝে দেশকে, জাতিকে, মানুষকে পরিপূর্ণ সজ্জায় সাজিয়েছে এই মন্ত্রধবনি। আর সেই মহাধবনি ভারতের আকাশে বাতাসে তুলেছে এক অভিনব সুরের মূর্চ্ছনা। সেই মহামন্ত্র, সেই মহাধবনি যে শুনেছে কানে সেই হয়েছে সংগ্রামের সাথী—মনোমুকুরে পেয়েছে নব জীবনের স্বাদ, গন্ধ, স্পর্শ, মর্মে মর্মে অনুভব করেছে এক অদ্ভূত অনুরণন। ১৯০৮ সালে বরিশাল সহরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় সম্মিলনেই শুরু হ’ল ম্যাজিষ্ট্রেট ফুলার সাহেবের নিষেধাজ্ঞা প্রাপ্ত ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র সঙ্গীতের জয়যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ, সেই সঙ্গে সংগ্রামী বাঙালি জাতির ভারতের রণক্ষেত্রে প্রথম দর্পভরে পদচারণা, কে এ কাহিনীকে অস্বীকার করতে পারে?
নেপোলিয়ন পরবর্ত্তীকালে ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগই ইউরোপের বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্ত রাষ্ট্রগুলিতে স্বাভাবিক, ভৌগলিক, প্রাকৃতিক ও ভাষাভিত্তিক কারণে এক নূতন ধরনের জাতীয়তাবাদ জাগ্রত হয়। তারই চেতনাবোধের তরঙ্গ ভারতের সুমুদ্রসৈকতে আছড়ে পড়লো, পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত উদারমতাবলম্বী একদল ভারতীয় সেই চেতনাকে সাদরে বরণ করে নিলেন উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে। অগ্রগামীদের মধ্যে ছিলেন হিন্দুকলেজে শিক্ষাপ্রাপ্ত মনীষী রাজ নারায়ণ বসু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ ; অবশ্য এর পথিকৃৎ ছিলেন রাজা রামমোহন রায়।
এরূপ জানা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র সরকারি কাজে নিযুক্ত থাকলেও প্রায়ই কলিকাতা সহরে যাতায়াত করতেন এবং রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ মনীষী-সংস্পর্শে এসে জাতীয়তাভাবে উদ্বুদ্ধ হন। সে সময়ে এই সহরে হিন্দুমেলা বা স্বদেশি মেলা অনুষ্ঠিত হয়। ইহাই নবজাগরণ-এর সূত্রপাত। সেদিন বঙ্কিমচন্দ্রের কথায় লোকশিক্ষার খানিকটা প্রসার ঘটলেও জাতীয় শিক্ষাবোধ ছিল অনেক পিছিয়ে। জাতীয় বীজমন্ত্র উচ্চারণে দীক্ষালাভ করেনি ভারতবাসী।
তাইত ১৯০৪ সনে এই কলিকাতা সহরেই অনুষ্ঠিত হ’ল ‘শিবাজী উৎসব’ শুধু পূর্ব্ব ও পশ্চিম ভারতের অধিবাসীদের নিয়ে নয় জাতি-ধর্মনির্বিশেষে যারা ভারতকে একই জাতীয়তাবোধ মন্ত্রে দীক্ষা দেবার জন্য কবি রবীন্দ্রনাথ শিবাজীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করে এক সুদীর্ঘ কবিতা রচনা করলেন। প্রসঙ্গত :
আজি এক সভাতলে ভারতের পশ্চিম-পূরব
দক্ষিণে ও বামে
একত্রে করুক ভোগ একসাথে একটি গৌরব
এক পুণ্য নামে।।
কেননা সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগেও মারাঠীবীর শিবাজীর প্রথম ও প্রধান ভাবনা ছিল ‘এক ধর্ম্মরাজ্যপাশে খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত বেধে দিব আমি’।
বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনে বাঙাল জাতি হিসাবে তারা সর্ব্বস্ব পণ করে লড়েছিল। যে সকল মহান দেশনেতা সেই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিপিন চন্দ্র পাল, অশ্বিনীকুমার দত্ত, আনন্দ মোহন বসু এবং আরও অনেকে, আন্দোলনে একটি মাত্র বীজমন্ত্র ছিল ‘বন্দে মাতরম’। আর সেই মন্ত্র উচ্চারণের সার্থকতা ছিল একমাত্র তাঁদেরই যাঁরা এই পুণ্য স্বদেশভূমিকে মাতৃস্বরূপিনী জ্ঞান করে মাতৃপূজায় স্বীয় জীবন উৎসর্গ করতে স্বদেশজননীকে স্বর্ণ-সিংহাসনে বসিয়ে তাঁর সম্মুখে মাতৃপূজার অর্ঘ্যস্বরূপ স্বীয় মন-প্রাণ ও জীবনকে তুচ্ছ করে মনে সর্ব্বস্ব নিবেদন করেছিলেন।
‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের অলৌকিক শক্তি দর্শন করে শ্রীঅরবিন্দ বলেছিলেন, The whole people had been converted into the Religion of Patriotism. এই ত ঋষি বাক্য।
সেকালেই শ্রীঅরবিন্দ প্রকাশ করেন ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকা। সম্পাদক বিপিন চন্দ্র পাল প্রচার করেন ভারতের জাতীয়তাবাদের লক্ষ্য :
Blessed is the life of the individual. Blessed that larger and diviner life the Nation wherein the individual finds its highest fulfilment, and blessed, thrice blessed, is that universal life of Humamity wherein is the fulfilment and fruition of all national life and aspirations
Bande Mataram 16 October 1906
ভারতের মুক্তি আন্দোলনের ইতিহাস লেখক প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখেছেন বাংলার স্বদেশি আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের প্রভাব সম্বন্ধে:
The Anand Math which contained the ymn ‘Bande Mataram re-acted strongly in the minds of Bengali youths, fired with Patriotism. and awakened National sentiments and imbued with the spiritual teachings of Swami Vivekananda who had asked them to shed fear, gather strength and energy, serve the cause of the country and make supreme sacrifices for it…and no matter whether it involves suffering or even destruction of the body.
‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ শুধু একটি স্লোগান দেওয়া নয় বা সাধারণ মানুষের ভাব উচ্ছ্বাসও নয়। ইহার যে অতুলনীয় শক্তি, যে অভাবনীয় ভাবনা ও চেতনা, যে অনমনীয় দৃঢ়তা হৃদয়কে আলোড়িত করেছিল—সারা মনে যে দ্যোতনা তুলেছিল, শরীরে যে রোমাঞ্চ সৃষ্টি করেছিল—আজও কি তার পুনরাবৃত্তি ঘটে না। এ প্রশ্ন শুধু আপনার আমার নয়—এ প্রশ্ন বোধ হয় সকল স্বদেশপ্রেমিকের—সকল দেশভক্তের।
