বন্দে মাতরম-এর উৎস সন্ধানে – দীনেশচন্দ্র সিংহ

‘বন্দে মাতরম’-এর উৎস সন্ধানে

দীনেশচন্দ্র সিংহ

‘বন্দে মাতরম’ গানের রচয়িতা এবং আনন্দমঠ উপন্যাসের লেখক বলেই অনেকে বঙ্কিমচন্দ্রকে জাতীয়তাবাদ ও স্বদেশপ্রেমের উদগাতা বলে মনে করেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের অধিকাংশ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট, ঘটনা সংস্থাপন, চরিত্র সমাবেশ এবং তাদের কথোপকথন সূক্ষ্মদৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করলে একটা জিনিস ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠবে যে প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের অন্তরে যে স্বজাতি ও স্বধর্মপ্রীতি অন্তঃসলীলা ফল্গুধারার মতো নিরন্তর প্রবহমান ছিল তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমিকায় লিখিত উপন্যাসগুলিতে বহিরাগত মুসলমান শাসকদের শাসনকালে অসহায় মাতৃভূমি ও মাতৃজাতির করুণচিত্র বারে বারে ঘুরেফিরে এসেছে। যবনে যবনে অর্থাৎ পাঠানে পাঠানে, মোগলে পাঠানে অনবরত যুদ্ধবিগ্রহে হিন্দু উলুখাগড়ার যে প্রাণান্ত ঘটছিল তা বলার অপেক্ষ রাখে না। তাদের জাতধর্ম যে শুধু বিপন্ন হচ্ছিল তা নয়, হিন্দু নারীজাতির মানসম্ভ্রম কুলমর্যাদাও পরদেশী মুসলমান আক্রমণকারী ও লুঠেরাদের লুণ্ঠন ও উপভোগের সামগ্রী হয়ে পড়েছিল। দুর্গেশনন্দিনীতে ক্ষুদ্রভূস্বামী বীরেন্দ্র সিং-এর গড় মান্দারণ দলনের পরবর্তী অবস্থা থেকেই মুসলমান শাসনে হিন্দুদের বাস্তব অবস্থার পরিচয় মেলে। উক্ত উপন্যাসের নবম পরিচ্ছেদে পাঠান সেনাপতি ওসমান, রাজপুত সেনাপতি জগৎসিংহ ও ধর্মান্তরিত ব্রাহ্মণ গজপতির কথোপকথনে তার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। প্রাসঙ্গিক অংশটুকু উদ্ধৃত করছি :

জগৎসিংহ…কহিলেন, ‘আপনার হাতে ও কি পুঁতি?’

গজপতি, ‘আজ্ঞা মাণিকপীরের পুতি।’

‘সে কি? ব্রাহ্মণের হাতে মাণিকপীরের পুঁতি।’

‘…আমি ব্রাহ্মণ ছিলাম, এখন তো আর ব্রাহ্মণ নই। …আমি মোছলমান হইয়াছি।’

রাজপুত্র কহিলেন, ‘সে কী?’

গজপতি কহিলেন, ‘যখন মোছলমান বাবুরা গড়ে এলেন, তখন আমাকে কহিলেন যে, আয় বামন তোর জাতি মারিব। এই বলিয়া তাঁহারা আমাকে ধরিয়া লইয়া মুরগীর পালো রাঁধিয়া খাওয়াইলেন।…তারপর আমাকে বলিলেন, তুই মুসলমান হইয়াছিস ; সেই অবধি আমি মোছলমান।’

রাজপুত্র, ‘আর সকলের কী হইয়াছে?’

‘আর আর ব্রাহ্মণ অনেকেই ঐরূপ মোছলমান হইয়াছে।’ রাজপুত্র ওসমানের মুখপানে দৃষ্টি করিলেন। ওসমান রাজপুত্রকৃত নির্বাক তিরস্কার বুঝিতে পারিয়া কহিলেন, ‘রাজপুত্র, ইহাতে দোষ কী? মোছলমানের বিবেচনায় মহম্মদীয় ধর্মই সত্য ধর্ম, বলে হউক, ছলে হউক, সত্যধর্মপ্রসারে আমাদের মতে অধর্ম নাই, ধর্ম আছে।’

একেবারে খাঁটি কথা। চারশত বৎসর পরে অনুষ্ঠিত নোয়াখালীর হিন্দুবিরোধী দাঙ্গাতেও এই একই মনোভাব কাজ করেছিল। বলাই বাহুল্য, এই সময় বীরেন্দ্র সিং-এর পত্নী বিমলা এবং কন্যা তিলোত্তমাকে যে নবাব কতলু খাঁ বিলাসসঙ্গিনী করবার মানসে অন্তঃপুরে আবদ্ধ করে রেখেছে তার সবিস্তার উল্লেখ রয়েছে। প্রথম মুসলমান আক্রমণকাল থেকেই হিন্দু নারীজাতির এই ধরনের লাঞ্ছনা সর্বযুগে, সর্বকালে।

বঙ্কিমচন্দ্রের দ্বিতীয় উপন্যাস কপালকুণ্ডলা। বাংলার শুধু বাংলার, কেন, সারা ভারতের, বিশেষত উত্তর ভারতের হিন্দু নারীকুল সে সময় যেমন মোগল-পাঠানদের সহজভোগ্যের উপকরণে পর্যবসিত হয়েছিল, তেমনি নিম্লবঙ্গের খ্রিস্টিয়ান হারমাদদের অত্যাচারেও তাদের মানসম্ভ্রম ভূলুন্ঠিত হচ্ছিল। স্বয়ং কপালকুণ্ডলা যে এরকমই এক অপহৃতা ব্রাহ্মণ কন্যা তা তার পালকপিতা সদৃশ অধিকারী মহাশয়ের বক্তব্যে প্রকাশ। নবকুমারের নিকট কপালকুণ্ডলার পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন :

শুনুন। ইনি ব্রাহ্মণকন্যা। ইঁহার বৃত্তান্ত আমি সবিশেষ অবগত আছি। ইনি বাল্যকালে দুরন্ত খ্রিস্টিয়ান তস্কর কর্তৃক অপহৃত হইয়া যানভঙ্গ-প্রযুক্ত তাহাদিগের দ্বারা কালে এ সমুদ্রতীরে ত্যক্ত হয়েন।…কাপালিক ইঁহাকে প্রাপ্ত হইয়া আপন যোগসিদ্ধি মানসে প্রতিপালন করিয়াছিলেন।

নবকুমারের প্রথমাপত্নী পদ্মাবতী কীভাবে মতিবিবি তথা লুৎফ-উন্নিসায় রূপান্তরিত হলেন সে বৃত্তান্ত নিম্লরূপ :

তিনি (নবকুমার) রামগোবিন্দ ঘোষালের কন্যা পদ্মাবতীকে বিবাহ করিয়াছিলেন। বিবাহের পর পদ্মাবতী কিছুদিন পিত্রালয়ে রহিলেন। মধ্যে মধ্যে শ্বশুরালয়ে যাতায়াত করিতেন। যখন তাঁহার বয়স ত্রয়োদশ বৎসর, তখন তাঁহার পিতা সপরিবারে পুরুষোত্তম দর্শনে গিয়াছিলেন।…যখন রামগোবিন্দ ঘোষাল উড়িষ্যা হইতে প্রত্যাগমন করেন, তখন মোগল-পাঠানের যুদ্ধ আরম্ভ হইয়াছে। আগমনকালে তিনি পথিমধ্যে পাঠান সেনার হস্তে পতিত হয়েন। পাঠানেরা তৎকালে ভদ্রাভদ্র বিচারশূন্য, তাহারা নিরপরাধী পথিকের প্রতি (অবশ্যই হিন্দু, কারণ তখনও বাংলায় পথেঘাটে মুসলমান বিরলদৃষ্ট ছিল ; আর মুসলমান পাঠান সৈন্য নিশ্চয় স্থানীয় ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ওপর জুলুম করত না) অর্থের জন্য বলপ্রকাশের চেষ্টা করিতে লাগিল। রামগোবিন্দ কিছু উগ্রস্বভাব ; পাঠানদিগকে কটু কহিতে লাগিলেন। ইহার ফল এই হইল যে, সপরিবারে অবরুদ্ধ হইলেন ; পরিশেষে জাতীয় ধর্ম বিসর্জনপূর্বক সপরিবারে মুসলমান হইয়া নিষ্কৃতি পাইলেন।

বঙ্গদেশে মুসলমান ধর্মপ্রচারের এই তো নমুনা। অবশ্য ইদানীং পশ্চিমবঙ্গে বুদ্ধিজীবী নামধারী পেশাকারের দল প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে হিন্দুরা নাকি গো-গোস্ত খাবার এবং চাচাত বোনকে সাদি করার লোভে ইসলামী প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে নেচে নেচে দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। পেট্রোডলারখোরদের বিচারবুদ্ধিই আলাদা।

এবারে বঙ্কিমচন্দ্রের তৃতীয় উপন্যাস, মৃণালিনী। এটি ১৮৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত এবং বখতিয়ার খিলজীর বাংলা জয়ের পটভূমিতে রচিত। বঙ্গাধীপ পরাজয় এবং গৌড়ে যবনাধিকারের প্রেক্ষাপটে রচিত এই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে একদিকে ছল বল বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্কময় কাহিনি, অপরদিকে বিধর্মীর হাতে স্বদেশ ও স্বজাতির নিদারুণ নিগ্রহ নির্যাতনে মর্মান্তিক ব্যথাতুর বঙ্কিমচন্দ্রের রক্তের অক্ষরে লেখা কাহিনিতে পরিপূর্ণ। বাংলার তৎকালীন রাজধানী নবদ্বীপ অধিকারের পর নবদ্বীপের কী শোচনীয় অবস্থা ঘটেছিল তা দেখা যাক।

যবনেরা নিষেধ না শুনিয়া মুক্তদ্বারপথে প্রবেশ করিতে উদ্যত হইল। সর্বাগ্রে একজন খর্বকায়, দীর্ঘকায়, কুরূপ যবন। দুর্ভাগ্যবশত দৌবারিক তাহার গতিরোধ জন্য শূলহস্তে তাহার সম্মুখে দাঁড়াইল। কহিল, ‘ফের—নচেৎ এখনই মারিব।’

‘আপনিই তবে মর!’ এই বলিয়া ক্ষুদ্রকায় যবন দৌবারিককে নিজকরস্থিত তরবারে ছিন্ন করিল। দৌবারিক প্রাণত্যাগ করিল। তখন আপন সঙ্গীদিগের মুখাবলোকন করিয়া ক্ষুদ্রকায় যবন কহিল, ‘এক্ষণে আপন আপন কার্য কর।…যেখানে যাহাকে পাও বধ করো। পূরী অরক্ষিতা—বৃদ্ধ রাজাকে বধ করো।’

তখন যবনেরা পুরমধ্যে তাড়িতের ন্যায় প্রবেশ করিয়া বালবৃদ্ধ বনিতা পৌরজন যেখানে যাহাকে দেখিল, তাহাকে অসিদ্বারা ছিন্নমস্তক অথবা শূলাগ্রে বিদ্ধ করিল।

* * * *

সেই নিশীথে নবদ্বীপ নগর বিজয়োন্মত্ত যবনসেনার নিষ্পীড়নে বাত্যাসন্তারিত তরঙ্গোৎক্ষেপী সাগরসদৃশ চঞ্চল হইয়া উঠিল। রাজপথ ভুরি ভুরি অশ্বারোহীগণে, ভুরি ভুরি পদাতিদলে, ভুরি ভুরি খড়গী, ধানুকী, শূলীসমূহসমারোহে আচ্ছন্ন হইয়া গেল। সেনাবলহীন রাজধানীর নাগরিকেরা ভীত হইয়া গৃহমধ্যে প্রবেশ করিল, দ্বার রুদ্ধ করিয়া সভয়ে ইষ্টনাম জপ করিতে লাগিল।

যবনেরা রাজপথে যে দুই একজন হতভাগ্য আশ্রয়হীন ব্যক্তিকে প্রাপ্ত হইল, তাহাদিগকে শূলবিদ্ধ করিয়া রুদ্ধদ্বার ভবন সকল আক্রমণ করিতে লাগিল। কোথাও বা দ্বারভগ্ন করিয়া কোথাও বা প্রাচীন উল্লঙঘন করিয়া, কোথাও বা শঠতাপূর্বক গৃহস্থকে জীবনাশা দিয়া গৃহপ্রবেশ করিতে লাগিল। গৃহমধ্যে প্রবেশ করিয়া, গৃহস্থের সর্বস্বাপহরণ পশ্চাৎ স্ত্রী-পুরুষ, বৃদ্ধ, বনিতা, বালক সকলেরই শিরচ্ছেদ, ইহাই নিয়মপূর্বক করিতে লাগিল।

শোণিতে গৃহস্থের গৃহ সকল প্লাবিত হইতে লাগিল। শোণিতে রাজপথ পঙ্কিল হইল। শোণিতে যবনসেনা রক্তচিত্রময় হইল। অপহৃত দ্রব্যজাতের ভারে অশ্বের পৃষ্ঠ ও মনুষ্যের স্কন্ধ পীড়িত হইতে লাগিল। শূলাগ্রে বিদ্ধ হইয়া ব্রাহ্মণের মুণ্ডসকল ভীষণভাব ব্যক্ত করিতে লাগিল। ব্রাহ্মণের যজ্ঞোপবীত অশ্বের গলদেশে দুলিতে লাগিল। সিংহাসনস্থ শালগ্রামশিলাসকল যবন-পদাঘাতে গড়াইতে লাগিল।

ভয়ানক শব্দে নৈশাকাশ পরিপূর্ণ হইতে লাগিল। অশ্বের পদধবনি, সৈনিকের কোলাহল, হস্তীর বৃংহিত, যবনের জয়শব্দ, তদুপরি পীড়িতের আর্তনাদ। মাতার রোদন, শিশুর রোদন, বৃদ্ধের করুণাকাঙক্ষা, যুবতীর কণ্ঠবিদার।’

বিশ্বাসঘাতক পশুপতি যখন যবন কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে নিজ গৃহাভিমুখে ধাবিত হচ্ছিলেন, তখন, ‘…প্রতিপদে মৃত নাগরিকের দেহ চরণে বাজিতে লাগিল ; প্রতিপদে শোণিতসিক্ত কর্দমে চরণ আর্দ্র হইতে লাগিল। পথের দুই পার্শ্বে—গৃহাবলী জনশূন্য—বহু গৃহ ভস্মীভূত ; কোথাও বা তপ্ত অঙ্গার এখনও জ্বলিতেছিল। গৃহান্তরে দ্বার ভগ্ন—গবাক্ষ ভগ্ন—প্রকোষ্ঠ ভগ্ন—তদুপরি মৃতদেহ ! এখনও কোনো হতভাগ্য মরণ-যন্ত্রণায় অমানুষিক কাতরস্বরে শব্দ করিতেছিল’

বঙ্কিমচন্দ্র সত্যিই সত্যদ্রষ্টা ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষি ছিলেন। তাঁর এই লোমহর্ষক বর্ণনার হুবহু প্রতিফলন দেখতে পাওয়া গেল পঁচাত্তর বছর পরে কলকাতা, ঢাকা, নোয়াখালী বরিশাল ও পূর্ব বাংলার অসংখ্য শহর বন্দর গ্রাম-গ্রামান্তরে—1946/47, 1949/50, 1954 খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে এবং 1992 খ্রিস্টাব্দে অধুনা বাংলাদেশে। তফাৎ শুধু একটি—উপন্যাসোক্ত কাহিনিগুলি সংঘটিত হয়েছিল পাঁচ সাতশ’ বছর পূর্বে বিদেশি মুসলমানের দ্বারা, আর নিকট অতীতে সংঘটিত ঘটনাগুলি আমাদের জীবদ্দশায় অনেকের চোখের সামনে স্বদেশি মুসলমানের হাতে। সর্বক্ষেত্রেই অত্যাচারিত বাংলাভাষী হিন্দুরা। অথচ বঙ্কিচন্দ্র একই সঙ্গে হাসিম সেখ ও রামা কৈবর্তের দুর্দশায় অশ্রুপাত করেছেন।

এরপরে বঙ্কিমচন্দ্র পরপর কয়খানা সামাজিক উপন্যাস ও বড়ো গল্প রচনা করেন। বেশির ভাগ সামাজিক ও পারিবারিক কাহিনিভিত্তিক এবং ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠা-পরবর্তীকালের পটভূমিকায় রচিত। চন্দ্রশেখর-এর উপন্যাসের পটভূমিরূপে তিনি আবার রাজনীতি আশ্রয় করলেন। তাঁর পূর্বেকার ইতিহাসাশ্রিত উপন্যাসে ছিল পাঠান বা মোগল আমলে বাংলার হিন্দুদের গ্লানিময় জীবনযাত্রার ছাপ, চন্দ্রশেখর উপন্যাসের মুসলমান ও ইংরেজের ক্ষমতা কাড়াকাড়ির প্রতিচ্ছবি। চন্দ্রশেখর বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য জীবনের সন্ধিক্ষণের চিত্র, বাংলার রাজনীতির সন্ধিক্ষণের চিত্র, মুসলমানের হাত থেকে ইংরেজের হাতে শাসনভার হস্তান্তরের সন্ধিক্ষণের চিত্র, আবার বঙ্কিমচন্দ্রের চাকুরী জীবনের সন্ধিক্ষণের চিত্রও বটে। এ সম্পর্কে একটু পূর্বানুবৃত্তি অপ্রাসঙ্গিক হবে না আশা করি।

বঙ্কিমচন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট। 1858 খ্রিস্টাব্দে বি.এ. পাস করেন। এবং সাড়ে তিন মাসের মধ্যে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট পদে নিযুক্ত হন। তিনিই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গ্র্যাজুয়েট ডেপুটি।

বঙ্কিচন্দ্রের, শুধু বঙ্কিমচন্দ্রেরই বলি কেন, বাংলার সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশিত হয়, 1865 খ্রিস্টাব্দে। দ্বিতীয় উপন্যাস কপালকুণ্ডলা-র প্রকাশ 1866 খ্রিস্টাব্দে। তৃতীয় উপন্যাস মৃণালিনী-র আত্মপ্রকাশ 1869 খ্রিস্টাব্দে। এগুলি রোমান্সধর্মী উপন্যাস, কোনো কোনোটা ঐতিহাসিক ছায়াশ্রিত। তারপরের উপন্যাস বিষবৃক্ষ—পারিবারিক লক্ষণাক্রান্ত, সামাজিক পটভূমিকায় অঙ্কিত। প্রকাশিত হয় 1872 খ্রিস্টাব্দে বৈশাখ-ফাল্গুন সংখ্যা থেকে বঙ্গদর্শন-এ (এপ্রিল 1872/ বৈশাখ 1279) ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। চন্দ্রশেখর উপন্যাসখানা শ্রাবণ 1280—ভাদ্র 1281 অর্থাৎ জুলাই 1873 থেকে আগস্ট 1874 খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বঙ্গদর্শন-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় 1875 খ্রিস্টাব্দে। এই উপন্যাসখানা প্রকাশকালে পরপর এমন কতগুলি ঘটনা ঘটে যা বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তিজীবনে, সাহিত্যজীবনে ও চাকুরিজীবনে স্থায়ী ছাপ রেখে যায় ; এমনকী প্রকারান্তরে উপন্যাসেও ছায়াপাত ঘটায় বলা চলে। সে সময় তিনি ছিলেন মুরশিদাবাদ জেলার বহরমপুরে সরকারি কর্মে নিয়োজিত। তখন তিনি ‘most obedient and faithful servant of the Government।’ তিনি ব্রিটিশ শাসনের গুণমুগ্ধ আমলা। সার্ভিস রেকর্ডে তাঁর কার্য পরিচালনা পদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা নথিভুক্ত হতে থাকে বছরের পর বছর। তিনিও বিদেশীয় শাসন ও বিচার বিভাগ সম্পর্কীয় যে-কোনো সরকারি সিদ্ধান্তেরই সোৎসাহ সমর্থন জানান। ‘এই সময়ে দেশীয় সংবাদ-পত্রের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করিয়া বঙ্কিমচন্দ্র নিন্দিত হইয়াছিলেন। যে স্যার জর্জ ক্যাম্পবেলকে তিনি পরে নিন্দা করিয়াছিলেন, তাঁহাকেই যে কেন সমর্থন করিয়াছিলেন, তাহা আজও অজ্ঞাত রহিয়া গিয়াছে। তখনকার অমৃতবাজার পত্রিকার মন্তব্য নিম্লে উদ্ধৃত হইল :

…According to his [Bunkim Chunder Chatterjee the Dy. Collector of Berhampoor] opinion, “much of the general feeling of distrust towards the Government which has often been the comment, is due to the action of the native press. “…We are taken by surprise at the ramarks of an educated native like Bunkim Babu, who holds no inconsiderabe position in our society. Certainly in a free country such remarks from a person of Bunkim Babu’s position would have brought down upon him universal condemnation, but under the pressure of a foreign government even the truest patriot turns a traitor to his country,—16 October, 1873.

…This mischievous remark of the Babu, as may be easily supposed, has met with the approval of his Honor…What Bunkim Babu said was simply silly in the extreme. He might have as well said that the native press seeks the interests of the people…. If Babu Bunkim and Sir George following mean to insinuate that the native press sows sadition, we can only say that there is a vague and indefinite law on the subject, which might be easily enforced if necessary.

….Babu Bunkim Chandra draws but only Rupees 600 per mensem and already his zeal has met with the approbation of his Honor, and it is to be expected that a promotion would increase his zeal tenfold…Before concluding this we would make the remark regarding Bunkim Baboo which the late Mr. Anstey made of Mr. Paul when eulogising Lord Mayo. “I hope my learned colleague will meet his reward in after life as surely as he is to received the reward here.—23 Oct. 1873.

(সাহিত্য-সাধক চরিতমালা—বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)

দেখা যাচ্ছে অল্প ব্যবধানে পরপর দুই দিন বঙ্কিমচন্দ্রের রাজভক্তির বিরুদ্ধে অমৃতবাজার তিক্ত মন্তব্য করে। বঙ্কিমচন্দ্র অবশ্য এই রাজানুগত্যের উপযুক্ত পুরস্কার দু’মাসের মধ্যেই হাতে হাতে পেলেন—আক্ষরিক অর্থেই। বহরমপুর ক্যান্টনমেন্টের কম্যান্ডিং অফিসার কর্নেল ডাফিনের হাতে 1873 খ্রিস্টাব্দে 15 ডিসেম্বর বঙ্কিমচন্দ্র বিনাপরাধে নিগৃহীত হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই সময়ে বহরমপুরে বিশেষ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হইয়াছিল; এই বিবাদ আদালত পর্যন্ত গড়াইয়াছিল। 8 জানুয়ারি ও 15 জানুয়ারি তারিখের অমৃতবাজার পত্রিকা-য় এই ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ প্রকাশিত হইয়াছিল। নিম্লে তাহা উদ্ধৃত হইল :

We are grieved to learn from the Moorshidabad Patrika that Babu Bunkim Chunder Chatterjee, the Dy. Magt. while returning home from office on the 15th December last, was assaulted by one Lt. Colonel Duffin of the Berhampore Cantonment, and received several violent pushes at his hands. It appears that the Babu was passing in a palkee across a cricket ground where Mr. Duffin and some Europeans were playing. This was deemed a great beadubee on the part of the Babu and Mr. Duffin felt himself fully justified in chastising him with blows. The Patrica says that the Babu has brought a criminal case against his aggressor and it has caused as it ought great sensation in Berhampore…—8 Jany. 1874.

…It appears that the Colonel and the Babu were perfect strangers to each other, and he did not know who he was when he affronted him. On being informed afterwards of the position of the Babu, Col. Duffin expressed deep contrition and a desire to apologise. The apology was made in due form in open Court where about a thousand spectators, native and European, were assembled— 15th Jany. 1874 (সাহিত্য সাধক চরিতমালা)

এই দুটি ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় তিন মাস। কিন্তু তিন মাসেই বঙ্কিমের জীবনে যেন যুগান্তর ঘটে গেল। ইতিপূর্বেই বহিরাগত মুসলমানের শাসনাধীনে হিন্দুদের অসহায় জীবন-যাপনের ছবি তিনি উপন্যাসে কিছু কিছু তুলে ধরেছিলেন। বহরমপুরের ঘটনা তাঁর দৃষ্টি ফিরিয়ে দিল বহিরাগত ইংরেজশাসনাধীন দেশের দিকে। এই ঘটনায় যেন বঙ্কিমচন্দ্রের বোধোদয় হল। ডাফিন প্রকাশ্য আদালতে দাঁড়িয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন ঠিকই, কিন্তু তাতে বঙ্কিম যে শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন, সে অপমানের জ্বালা তো নির্বাপিত হয় না। তিনি বুঝলেন যে পদাঘাত পদাঘাতই, সে মুসলমান নবাব বাদশার পয়জার পরা পায়েই হোক, কিংবা সাহেবদের সবুট লাথিই হোক। পরাধীন জাতির কাছে দুটোই সমান। তাঁর সমকালীন ইংরেজদের কথা ছেড়ে দিলেও এদেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠাকালীন ইংরেজ কর্মচারীদের নারী-লোলুপতা এবং তাদের হাতে বাংলার নারীদের লাঞ্ছনার চিত্র অঙ্কিত হয়েছে চন্দ্রশেখর উপন্যাসে। হিন্দু নারী-লোলুপতায় তারা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের মতো পশুসুলভ প্রবৃত্তির দাস না হলেও প্রথম দিকে যে একেবারে ধোয়া তুলসী ছিলেন তাও নয়। চন্দ্রশেখর উপন্যাসের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদেই পরস্ত্রী অপহরণকারী লরেন্স পস্টরের আবির্ভাব। বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসে প্রথম ইংরেজ চরিত্রের প্রবেশ। কিন্তু প্রথম সৃষ্ট চরিত্রটি আদৌ শিষ্ট নয় ; তাঁর প্রথম উপন্যাসের ঘৃণ্য চরিত্র কতলু খাঁরই শ্বেতচর্মাকৃত কোট-প্যান্টালুন পরিহিত সংস্করণ বিশেষ। ফস্টরের প্রথম আবির্ভাবে ‘শৈবলিনীর কাছে কতগুলি দেশি গালি খাইয়া স্বস্থানে’ প্রস্থান। তার দ্বিতীয় আবির্ভাব তৃতীয় পরিচ্ছেদেই। রাত্রিবেলা চন্দ্রশেখরের অনুপস্থিতিতেই সে শৈবলিনীকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। কাল্পনিক ফস্টর চরিত্রের কুক্রিয়াসক্তির মাধ্যমেই শুধু নয়, উপন্যাসের অভ্যন্তরে স্বয়ং লেখক বঙ্কিমচন্দ্র সেকালীন ইংরেজ চরিত্রের যে সার্টিফিকেট দিয়েছেন, তা বিশেষ প্রণিধানযোগ্য। তিনি লিখেছেন:

এই সময়ে যে সকল ইংরেজ বাঙলায় বাস করিতেন, তাহারা দুইটি মাত্র কার্যে অক্ষম ছিলেন। তাঁহারা লোভ সম্বরণে অক্ষম এবং পরাভব স্বীকারে অক্ষম। তাঁহারা কখনোই স্বীকার করিতেন না যে, এ কার্য পারিলাম না—নিরস্ত হওয়াই ভালো। এবং তাঁহারা কখনই স্বীকার করিতেন না যে, এ কার্যে অধর্ম আছে, অতএব অকর্তব্য। যাঁহারা ভারতবর্ষে প্রথম ব্রিটেনীয় রাজ্য সংস্থাপন করেন, তাঁহাদিগের ন্যায় ক্ষমতাশালী এবং স্বেচ্ছাচারী মনুষ্য সম্প্রদায় ভূমণ্ডলে কখন দেখা দেয় নাই।

লরেন্স ফস্টর সেই প্রকৃতির লোক। তিনি লোভ সম্বরণ করিলেন না—বঙ্গীয় ইংরেজদিগের মধ্যে তখন ধর্ম শব্দ লুপ্ত হইয়াছিল।

এই উপন্যাসে ঘটনা পরম্পরায় দেখা গেল ফস্টর আহত ; আমিয়ট গলস্টন, জনসন প্রমুখ ইংরেজ পুরুষ এতদ্দেশীয় লোকের হাতে নিহত হয়েছে। চন্দ্রশেখর বাংলায় নবাবী আমলের এন্তেকালের পটভূমিতে রচিত। আগেই বলেছি এই উপন্যাসেই বঙ্কিমচন্দ্র সর্বপ্রথম ইংরেজ চরিত্রের অবতারণা করেন—তাও কোনো উন্নত চরিত্র নয় ; দুশ্চরিত্র ইংরেজ লরেন্স ফস্টর রূপে। বাঙালি বীর প্রতাপ ও তার ভৃত্য বা সাকরেদ রামচন্দ্র প্রভৃতির হাত দিয়ে ফস্টর প্রমুখদের ঠ্যাঙানি খাইয়ে বঙ্কিমচন্দ্র কলমের জোরে হাতের সুখ মিটিয়েছেন মনে হয়। ফস্টর প্রমুখদের ডাফিনের প্রতিভূ বলেই অনুমান করা যায়। ‘বাহুতে তুমি মা শক্তি, হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি’—আত্ম শক্তির ওপর আস্থা এবং মাতৃভূমির প্রতি ভক্তি তথা দেশপ্রেমের স্ফুরণ চন্দ্রশেখর উপন্যাসেই প্রতিফলিত হল বলা চলে।

কিন্তু পূর্বোক্ত সব কয়টি উপন্যাসই নবাবী ও বাদশাহী শাসনের প্রেক্ষাপটে বাংলা ও বাঙালি জীবনের আলেখ্যরূপে লিখিত। বৃহত্তর ভারতের প্রেক্ষাপটে বঙ্কিমচন্দ্র যে উপন্যাসখানি রচনা করেছেন, তা হল রাজসিংহ। এই উপন্যাসের সময়কালীন ভারতীয় হিন্দুদের অবস্থা বর্ণনা প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র দুঃখ করে বলেছেন :

কিন্তু ঔরঙ্গজেব কাহারও ওপর রাগ সহ্য করিবার লোক নহেন। হিন্দুর অনিষ্ট করিতে তাঁহার জন্ম, হিন্দুর অপরাধ বিশেষ অসহ্য। একে হিন্দু মারহাট্টা পুনঃ পুনঃ অপমান করিয়াছে, আবার রাজপুত অপমান করিল। মারহাট্টার বড়ো কিছু করিতে পারেন নাই, রাজপুতের হঠাৎ কিছু করিতে পারিতেছেন না। অথচ বিষ উদগীরণ করিতে হইবে। অতএব রাজসিংহের অপরাধে সমস্ত হিন্দুজাতির পীড়নই অভিপ্রেত করিলেন।

আমরা এখন ইনকম টেকশকে অসহ্য মনে করি, তাহার অধিক অসহ্য একটা ‘টেকশ’ মুসলমানি আমলে ছিল। তাহার অধিক অসহ্য—কেন না, এই ‘টেকশ’ মুসলমানকে দিতে হইত না ; কেবল হিন্দুকেই দিতে হইত। ইহার নাম জেজেয়া। পরম রাজনীতিজ্ঞ আকবর বাদশাহ ; ইহার অনিষ্টকারিতা বুঝিয়া, ইহা উঠাইয়া দিয়াছিলেন। সেই অবধি উহা বন্ধ ছিল। এক্ষণে হিন্দূদ্বেষী ঔরঙ্গজেব তাহা পূনর্বার স্থাপন করিয়া হিন্দুর যন্ত্রণা বাড়াইতে প্রবৃত্ত হইলেন।

ইতিপূর্বেই বাদশাহ, জেজেয়ার পুনরাবির্ভাবের আজ্ঞা প্রচারিত করিয়াছিলেন, কিন্তু এক্ষণে বড়ো বাড়াবাড়ি আরম্ভ হইল। হিন্দুরা ভীত, অত্যাচারগ্রস্ত, মর্মপীড়িত হইল। যুক্তকরে সহস্র সহস্র হিন্দু বাদশাহের নিকট ক্ষমা ভিক্ষা করিল, কিন্তু ঔরঙ্গজেবের ক্ষমা ছিল না। শুক্রবারে যখন বাদশাহ মসজিদে ঈশ্বরকে ডাকিতে যান, তখন লক্ষ লক্ষ হিন্দু সমবেত হইয়া তাঁহার নিকট রোদন করিতে লাগিল। দুনিয়ার বাদশাহ দ্বিতীয় হিরণ্যকশিপুর মতো আজ্ঞা দিলেন, ‘হস্তিগুলা পদতলে ইহাদিগকে দলিত করুক।’ সেই বিষম জনমর্দ্দ হস্তিপদতলে দলিত হইয়া নিবারিত হইল।

ঔরঙ্গজেবের অধীন ভারতবর্ষ জেজেয়া দিল। ব্রহ্মপুত্র হইতে সিন্ধুতীর পর্যন্ত হিন্দুর দেবপ্রতিমা চূর্ণীকৃত, বহুকালের গগনস্পর্শী দেবমন্দির সকল ভগ্ন ও বিলুপ্ত হইতে লাগিল, তাহার স্থানে মুসলমানের মসজিদ প্রস্তুত হইতে লাগিল। কাশীতে বিশ্বেশ্বরের মন্দির গেল ; মথুরায় কেশবের মন্দির গেল ; বাংলায় বাঙালির যাহা কিছু স্থাপত্যকীর্তি ছিল, চিরকালের জন্য তাহা অন্তর্হিত হইল।

ঔরঙ্গজেব এক্ষণে আজ্ঞা দিলেন যে, রাজপুতানার রাজপুতেরাও জেজেয়া দিবে। রাজপুতানার প্রজা তাঁহার প্রজা নহে, তথাপি হিন্দু বলিয়া তাহাদের ওপর এ দণ্ডাজ্ঞা প্রচারিত হইল। রাজপুতেরা প্রথমে অস্বীকৃত হইল ; কিন্তু উদয়পুর ভিন্ন আর সর্বত্র রাজপুতানা কর্ণধারবিহীন নৌকার ন্যায় অচল। জয়পুরেব জয়সিংহ—যাঁহার বাহুবল মোগল সাম্রাজ্যের একটি প্রধান অবলম্বন ছিল, তিনি এক্ষণে গতাসু ;—বিশ্বাসঘাতক বন্ধুহন্তা ঔরঙ্গজেবের কৌশলে বিষপ্রয়োগ দ্বারা তাঁহার মৃত্যু সাধিত হইয়াছিল। তাঁহার বয়ঃপ্রাপ্ত পুত্র দিল্লীতে আবদ্ধ। সুতরাং জয়পুর জেজেয়া দিল।

যোধপুরের যশোবন্ত সিংহও লোকান্তরগত। তাঁহার রাণী এখন রাজপ্রতিনিধি। স্ত্রীলোক হইয়াও তিনি বাদশাহের কর্মচারীদিগকে হাঁকাইয়া দিলেন। ঔরঙ্গজেব তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতে উদ্যত হইলেন। স্ত্রীলোক যুদ্ধের ধমকে ভয় পাইলেন। রাণী জেজেয়া দিলেন না, কিন্তু তৎপরিবর্তে রাজ্যের কিয়দংশ ছাড়িয়া দিলেন।

রাজসিংহ জেজেয়া দিলেন না। কিছুতেই দিবেন না ; সর্বস্ব পণ, করিলেন। জেজেয়া সম্বন্ধে ঔরঙ্গজেবকে একখানি পত্র লিখিলেন। রাজপুতানার ইতিহাসবেত্তা সেই পত্রসম্বন্ধে লিখিয়াছেন :

The Rana remontrated by letter, in the name of the nation of which he was the head, in a style of such uncompromising dignity, such lofty yet temperate resolve, so much of soul-stirring rebuke mingled with a boundless and tolerating benevolence, such elevating excess of the Divinity with such pure philanthropy, that it may challenge competition with any epistolary production of any age, clime or condition.

পত্রখানি বাদশাহের ক্রোধানলে ঘৃতাহুতি দিল।

বাদশাহ রাজসিংহের উপর আজ্ঞা প্রচার করিলেন, জেজেয়া ত দিতে হইবেই, তাহা ছাড়া রাজ্যে গোহত্যা করিতে দিতে হইবে, এবং দেবালয় সকল ভাঙিতে হইবে। রাজসিংহ যুদ্ধের উদ্যোগে করিতে লাগিলেন।’

চন্দ্রশেখর-এর পর বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরাণী-তেও যে সব সাহেব চরিত্র অঙ্কন করেছেন তার কোনোটিই-আদর্শ ও অনুকরণীয় নয়। আনন্দমঠ-এ-ই বঙ্কিম নবাবী ও বাদশাহী হারেম থেকে স্বপ্ন ও কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তব জগতে নেমে এলেন। চন্দ্রশেখর রচনার প্রাক্কালে রচিত এবং আনন্দমঠ-এ গ্রথিত ও সন্ন্যাসীদের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিই ইংরেজ শাসনের মৃত্যুঘন্টা সূচিত করে। এই উপন্যাসের প্রথম খণ্ড অষ্টম পরিচ্ছেদ এবং তৃতীয় খণ্ড দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ থেকে নিম্লোদ্ধৃত অংশের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, লাঠি সড়কি বর্শাধারী সন্তানসেনার হাতে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত গোরা সৈনিকগণ কেমন অপদস্থ হয়েছিল :

ক. এমন সময় হঠাৎ সাহেবের কোমর হইতে তাহার অসি কে কাড়িয়া লইল। লইয়াই একাঘাতে তাহার মস্তকচ্ছেদন করিল। সাহেব ছিন্নশির হইয়া অশ্ব হইতে পড়িয়া গেলেন।

খ. কাপ্তেন (টমাস) একটু মনে সন্দেহ করিতেছিলেন যে, গুলি মারিবেন কিনা, এমন সময় বিদ্যুদ্বেগে সেই নবীন সন্ন্যাসী তাঁহার ওপর পড়িয়া হাত হইতে বন্দুক কাড়িয়া লইল।

এই উপন্যাসে প্রথমেই গোরা সৈন্যের মুণ্ডচ্ছেদ। তারপর ক্রমান্বয়ে কাপ্তেন টমাসের পরাজয় ও বন্ধন এবং লেফটেনান্ট ওয়াটসন, কাপ্তেন হে, মেজর এডওয়ার্ডস, লিণ্ডলে প্রভৃতি সৈনিক প্রবরের সন্তানদলের হাতে নাস্তানাবুদদের নাশ কাহিনিতে পরিপূর্ণ। সে সঙ্গে মুহুর্মূহু ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি। বিশ পঁচিশ বছর না পেরোতেই বাংলার বিপ্লবীরা যে এ গ্রন্থকে স্বদেশপ্রেমের গীতারূপে গ্রহণ করবে তাতে অবাক হবার কী আছে। বাঙালি যুবকদের সাহেব ঠ্যাঙানোর সাহস বঙ্কিমচন্দ্রই জুগিয়েছেন।

বহরমপুরের ঘটনায় ডাফিন সাহেবের হাতে নিজের নির্যাতন, আর চন্দ্রশেখর উপন্যাসে কাল্পনিক চরিত্র প্রতাপের হাতে লরেন্স ফস্টরের নির্যাতন বাস্তব ও কল্পনার কাকতালীয় ঘটনাসন্নিবেশ বলা চলে। 1874-এর জানুয়ারি মাসে বহরমপুরের ঘটনাটি ঘটে। আগস্ট মাস নাগাদ বঙ্গদর্শন-এ ধারাবাহিকভাবে চন্দ্রশেখর-এর প্রকাশ শুরু। সেটি পুস্তকাকারে প্রকাশিত হয় 1875-এর জুন মাসে। ওই 1875 খ্রিস্টাব্দেই ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত রচিত হয়। 1875-এর জুন মাসে। ওই 1875 খ্রিস্টাব্দেই ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত রচিত হয়। সাত বৎসর পর 1882 খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতকে বক্ষে ধারণ করে আত্মপ্রকাশ করে আনন্দমঠ।

একটু গভীর ভাবে অনুধাবন করলে বিষয়টি স্পষ্টরূপেই ধরা পড়বে যে বঙ্কিমচন্দ্র হঠাৎই খেয়ালের বশে ‘বন্দে মাতরম’ রচনা করেননি। তাঁর অন্তরে স্বদেশপ্রেমের আগুন জীবনের প্রারম্ভকাল থেকেই ধিকি ধিকি জ্বলছিল। গড় মান্দারনের পথেই হোক, আর গঙ্গাসাগরের বক্ষেই হোক, কিংবা আরাবল্লী পর্বতমালার সানুদেশেই হোক এদেশের সভ্যতা সংস্কৃতি, আকাশ মাটি, দেবদেবী, মানবমানবী তাঁর হৃদয়ে স্থায়ী আসন দখল করেছিল। জাতীয় অবমাননা ও লাঞ্ছনার জ্বালা তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করতেন। হাজার বছরের বিদেশি শাসনে জাতির অন্তরাত্মা শুষ্ক মরুভূমি সদৃশ খাঁ খাঁ হাহাকারে পরিপূর্ণ। তার ধর্ম আক্রান্ত, সংস্কৃতি বিপন্ন, সাহিত্য বিলুপ্ত, মর্যাদা লুণ্ঠিত। তাই প্রথম উপন্যাস থেকেই বঙ্কিমচন্দ্রের কলমের মুখে ঝরে পড়েছে বিদেশি শাসকগোষ্ঠীর হাতে স্বদেশবাসীর লাঞ্ছনা নির্যাতনের কাহিনি। তাঁর অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো দেশপ্রেমের ধারা প্রবাহিত রয়েছে প্রত্যেকটি রচনায়। ‘বন্দে মাতরম’-এর বীজ নিহিত রয়েছে। সব রচনারই পাতায়। ডাফিন ঘটনায় তা আগ্নেয়গিরির অগ্নি উদিগরণের মতো স্বতোৎসারিত লাভাকারে বেরিয়ে আসে, সমগ্র জাতিকে অনন্ত নিদ্রালসতা থেকে জাগিয়ে তোলে।

এই একটি গান রচনা কাল থেকেই জাতিকে ‘উত্তিষ্ঠত জাগ্রত প্রাপ্য বরান নিবোধত’ বলে প্ররোচনা দিতে থাকে। শত সহস্র স্বাধীনতা সৈনিক এই গান এই রণধবনি মুখে নিয়ে অম্লানবদনে পুলিশি নির্যাতন সহ্য করেছে। জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য মনে করে ফাঁসিকাষ্ঠে-জীবনের জয়গান গেয়েছে। নিষিদ্ধ ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি উচ্চারণের অপরাধে বেত্রাঘাতে জর্জরিত বরিশালের ছাত্র ও যুব সম্প্রদায় ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি ছাড়েনি। সেই ঐতিহাসিক ঘটনা উপলক্ষ করে চারণকবি মুকুন্দদাস গাইলেন :

ফুলার তুমি কি দেখাও ভয়!

বেত মেরে ভুলাবে মাকে—

আমরা মায়ের তেমন ছেলেই নয় ৷৷

রচনাকাল থেকে জাতীয় সঙ্গীতরূপে গৃহীত হওয়া পর্যন্ত ‘বন্দে মাতরম’কে কেন্দ্র করে যে সব স্মরণীয় ঘটনা ঘটে তা নিম্লোক্তরূপে সাজানো যায় :

‘বন্দে মাতরম’-এর রচনাকাল : 1875 খ্রিস্টাব্দ

আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রকাশ : 1882 খ্রিস্টাব্দ

জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে পরিবেশন : 1886 খ্রিস্টাব্দ

প্রথম ‘বন্দে মাতরম’ পতাকা (বরিশাল) : মে, 1905 খ্রিস্টাব্দ

বরিশালে ‘বন্দে মাতরম’ মিছিল : 20 মে, 1905 খ্রিস্টাব্দ

কলকাতায় ‘বন্দে মাতরম’ মিছিল : 7 আগস্ট, 1905 খ্রিস্টাব্দ

বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা : 16 অক্টোবর, 1905 খ্রিস্টাব্দ

‘বন্দে মাতরম’ নিষিদ্ধ সার্কুলার : 8 নভেম্বর, 1905 খ্রিস্টাব্দ

‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকা প্রকাশ (অরবিন্দ) : 8 জুন, 1906 খ্রিস্টাব্দ।

জার্মানিতে ‘বন্দে মাতরম’ পতাকা উত্তোলন (মাদাম কামা) : 8 আগস্ট, 1907 খ্রিস্টাব্দ

প্যারিসে ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকা প্রকাশ : 1907/08 খ্রিস্টাব্দ

‘বন্দে মাতরম’ রেকর্ড নিষিদ্ধ : ডিসেম্বর, 1908 খ্রিস্টাব্দ

‘বন্দে মাতরম’-এর ইংরেজি অনুবাদ (অরবিন্দ) : 1909 খ্রিস্টাব্দ (কর্মযোগীন)

কলকাতা কংগ্রেসে ‘জাতীয় সংগীত’ হিসাবে স্বীকৃতিদান : 28 অক্টোবর, 1937 খ্রিস্টাব্দ

ভারতের জাতীয় ‘গান’ হিসাবে ঘোষণা : 24 জানুয়ারি, 1950 খ্রিস্টাব্দ।

‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সঙ্গীত রূপে গ্রহণের ইতিহাস কিন্তু অত্যন্ত ন্যক্কারজনক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের এক কলঙ্কময় অধ্যায়। 1937 খ্রিস্টাব্দ থেকেই বাংলার আকাশ বাতাস মুসলিম লিগের উদগারিত সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে দূষিত হতে থাকে। জাতীয় জীবনের মূলস্রোতে মিলিত হবার তাদের কোনোই আগ্রহ ছিল না। স্বাধীনতা আন্দোলনের কোনো পর্যায়েই অংশগ্রহণে তাদের সামিল করা যাচ্ছে না। হঠাৎ তারা ‘বন্দে মাতরম’-এ পৌত্তলিকতার গন্ধ পেয়ে মহাসোরগোল তুলল। বঙ্গীয় আইন সভায় অর্থমন্ত্রী নলিনীরঞ্জন সরকার ‘বন্দে মাতরম’ বলে তার বাজেট বত্তৃ�তা শেষ করলে, তাকে তারা গোনাহগার মনে করে চেঁচাতে লাগল। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতীক চিহ্নে ‘শ্রী’ ও ‘পদ্ম’ নিয়ে তাদের লম্পঝম্পে সারা বাংলা টালমাটাল হয়ে ওঠে। বেকুব ও বেসামাল কংগ্রেসী নেতারা ভাবলেন ‘বন্দে মাতরম’ সংশোধন করলেই মুসলমান নেতা ও জনতা মহরমের মিছিলের মতো দলে দলে এসে কংগ্রেস মণ্ডপ ভরে তুলবে। তাদের সন্তুষ্টির জন্য কংগ্রেস নেতারা ‘বন্দে মাতরম’-এর অঙ্গচ্ছেদ করতে মনস্থ করেন। একাজে তারা রবীন্দ্রনাথকে শিখণ্ডী খাড়া করালেন এবং খোদার ওপর খোদকারি করে তিনি সঙ্গীতের শেষ দুই প্যারা বাদ দিলেন। সংখ্যালঘু তোষণের এর চেয়ে জঘন্য দৃষ্টান্ত তখন পর্যন্ত আর একটিও ছিল না।

কিন্তু ভবি ভুলবার নয়। মুসলমান নেতারা ‘বন্দে মাতরম’-এর অঙ্গচ্ছেদ করিয়েও জাতীয় আন্দোলন থেকে দূরেই সরে রইল। বরং দশ বছর পরে 1947 খ্রিস্টাব্দে গান ভাগের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশ ভাগও করে ছাড়ল। কংগ্রেসী নেতারা নাকের বদলে নরুণ পেয়ে তাক ডুমাডুম বাজালেন। কিন্তু ভারতে বিজাতীয় সংস্কৃতির ধারকবাহক জওহরলাল নেহরু তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে কর্তিত ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সংগীতের আসনচ্যুত করে রবীন্দ্রনাথের জন-গণ-মন’কে তার স্থলাভিষিক্ত করে তাঁর ব্রিটিশ প্রভুদের এবং সে সঙ্গে মুসলিম ভোটারদেরও মনোরঞ্জন করলেন। কারণ, ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি কর্ণে প্রবেশ করলেই ব্রিটিশের গায়ে বিছুটি ফুটতো যেন। সেই গান তাদের সাম্রাজ্য হারা করেছে, তাই স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত হিসাবে বিলাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হবে, রাজারাণীর কর্ণে তা নিশ্চয়ই মধু বর্ষণ করবে না। অনুমান করা অসঙ্গত হবে না যে ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের আপত্তিতেই নেহরু নানা মিথ্যা ওজর আপত্তি তুলে ‘বন্দে মাতরম’কে স্থানচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেন। এবং রবীন্দ্রনাথের জন-গণ-মন’কে তার স্থলে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দেন। আজীবন ব্রিটিশের ধামাধরা নেহরুর এই চাপল্যে ও হটকারী সিদ্ধান্তে মর্মাহত শ্রীঅরবিন্দ ‘Mother India’য় লেখেন :

The revolutionary vision and the mantric vibration distinguishing Vande Mataram thow Gana Mana entirely into the shade. And it is no wonder that not Tagore but Bankim’s song has been the motive force of the whole struggle of Bharat’s freedom.

অরবিন্দকে রবীন্দ্রনাথ নমস্কার জানালেও অরবিন্দ রবীন্দ্রনাথের এই অবিমৃষ্যকারিতা মোটেই ভালো চোখে দেখেননি তা অরবিন্দের ক্ষুদ্র মন্তব্যে অপ্রকট থাকেনি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *