বিতর্কিত জাতীয় সংগীত বন্দে মাতরম
অভ্র ঘোষ
সাহিত্য অকাদেমি আয়োজিত এই আলোচনাচক্রে যোগ দেবার জন্য যে-আমন্ত্রণপত্রটি পেয়েছি তাতে লেখা হয়েছে, …..a national seminar on the centenary of the adoption of Vande Mataram as the national song ইত্যাদি। শতবর্ষের তারিখটি অবশ্য উল্লেখ করেননি কর্তৃপক্ষ, তবে ধরে নেওয়া যায়, ২০০৬-এর কোনো এক তারিখ হয়তো কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে। মাস-দুয়েক আগে কেন্দ্রীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের মাননীয় মন্ত্রী ৭ সেপ্টেম্বর ২০০৬ তারিখটিকে ‘বন্দে মাতরম’-এর জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার শতবার্ষিক দিন বলে চিহ্নিত করে রাষ্ট্রীয় অনুদানপুষ্ট বিদ্যায়তনগুলির ছাত্রছাত্রীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, ওই দিনটিতে ‘বন্দে মাতরম’ গেয়ে যেন যথাযথভাবে উদযাপন করা হয়। ইউপিএ সরকারের মন্ত্রীর নির্দেশটি তৎক্ষণাৎ লুফে নেয় বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টি এবং এই দলের সভাপতি রাজনাথ সিং বিভিন্ন বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলিকে নির্দেশ দেন ‘বন্দে মাতরম’ শতবার্ষিক অনুষ্ঠান পালন করা যেন ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক করা হয়। সরকারি বিজ্ঞপ্তি ও বিজেপি-র সোৎসাহ সমর্থন ইত্যাদির বিরুদ্ধে গোটা দেশে দুরকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।
এক, প্রত্যাশিতভাবেই মুসলিম ল বোর্ড-সহ বিভিন্ন ধরনের ইসলামিক সংগঠন এই সরকারি বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে আপত্তি জানায় এবং মাদ্রাসাগুলি-সহ মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলিতে ধর্মীয় কারণে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গাওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন। শিখ সংগঠন শিরোমণি গুরুদ্বার প্রবন্ধক কমিটিও জানিয়ে দিয়েছিলেন যে ‘বন্দে মাতরম’ গানে এক বিশেষ ধর্মের মানুষের ভক্তি ও বিশ্বাসের কথা বলা হয়েছে, ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষের বিশ্বাসের সঙ্গে তার সংগতি নেই, তাই এই জাতীয় সংগীত বাধ্যতামূলকভাবে গাওয়ানো যাবে না। এসজিপিসি-এর প্রধান অবশ্য এ কথা বলার কয়েক ঘন্টা বাদেই সুর বদল করে বলেছেন যে, ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া তাঁর পক্ষে পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয় কারণ সমগ্র শিখসমাজের মানুষের প্রতি এই নির্দেশ জারি করার সামর্থ্য বা ক্ষমতা তাঁর নেই (সূত্র : 7 Sept 2006, The Statesman)। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি যেমন ছত্রিশগড়, মধ্যপ্রদেশ, ঝাড়খণ্ডে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া বাধ্যতামূলক হয়েছিল, কর্ণাটক ও উড়িষ্যায় বিজেপি সরকারের এক প্রধান শরিক দল, অতএব সেখানেও ‘বন্দে মাতরম’ উৎসব পালন করা বাধ্যতামূলক বলে ঘোষিত হয়েছিল এবং মহাসমারোহে সেসব রাজ্যগুলিতে এই উৎসব পালিত হয়েছে। অন্যদিকে মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, আসাম, পাঞ্জাব, হরিয়ানাতে রাজ্য সরকারগুলি এই উৎসব-পালন ঐচ্ছিক বলে ঘোষণা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাতে সরকার বিদ্যালয়গুলির কর্তৃপক্ষের হাতে ব্যাপারটা ছেড়ে দিয়েছেন এ কথা জানিয়ে যে তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে বাধ্যতামূলক করতে হবে এমন কোনো বিজ্ঞপ্তি পাননি। সব মিলিয়ে স্বাধীনতার ষাট বছর বাদে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটিকে ঘিরে আরও একবার রাজনৈতিক বিবাদ দানা বেঁধে উঠেছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই নির্দেশের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় প্রতিক্রিয়াটি এসেছে ইতিহাসবিদদের তরফ থেকে। ঐতিহাসিকেরা জানিয়েছেন, ২০০৬-এর ৭ সেপ্টেম্বর তারিখটি কীভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গানটির জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার শতবার্ষিক দিবস হয়ে উঠল তার কারণ বোধগম্য হচ্ছে না। অধ্যাপক সুমিত সরকার বলেছেন, ‘কেন ওই তারিখটি বেছে নেওয়া হল, তা রহস্যজনক। বিষয়টি নিয়ে রাজ্যে রাজ্যে নির্দেশ পাঠানোর আগে কেন কোনো বিশেষজ্ঞের মত নেওয়া হল না, তাও জানি না। মোটরে ওপরে এটা যে ভুল, তা জোরের সঙ্গেই বলতে পারি। এবং এ ধরনের ভুল হওয়া উচিত নয়।’ (সূত্র : আনন্দবাজার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০০৬)। সরকারের তরফ থেকে অবশ্য এখনও ভুল স্বীকার করা হয়নি, তবে সরকারের প্রধান শরিক কংগ্রেসের সম্পাদক জানিয়েছেন যে এই তথ্যে কিছু গোলমাল থাকতে পারে।
ভ্রান্তিটি আসলে কোথায়—সে-কথা জানতে হলে এই গানটির ইতিহাস ঈষৎ বিশ্লেষণ করতে হবে। তথ্যগতভাবে দু-ধরনের ভুল আমাদের চোখে পড়ছে। ২০০৬-এর ৭ সেপ্টেম্বরকে যদি ‘বন্দে মাতরম’-এর জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার শতবার্ষিক দিন বলে স্বীকার করতে হয়, তাহলে ১৯০৬-এর ৭ সেপ্টেম্বর-এ কী ঘটেছিল তা যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়ে। বস্তুত ওই তারিখটির তাৎপর্য, ইতিহাসকারেরা শনাক্ত করতে পারেননি, তেমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি ওই দিন। দ্বিতীয় গোলমাল, ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীতের মর্যাদা পেল কবে? এই প্রশ্নের সম্ভাব্য তিনটি উত্তর হতে পারে। প্রথমত, জাতীয় সংগীতের ধারণাটিকে যদি রাষ্ট্র-স্বীকৃত জাতীয় সংগীত হিসেবে বিবেচনা করি, তাহলে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে ১৯৫০-এর ২৪ জানুয়ারি। গণপরিষদের সভাপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ পরিষদের সভায় স্বাধীন ভারতের জাতীয় সংগীত-বিষয়ে এক বিবৃতিতে বলেছিলেন :
There is one matter which has been pending for discussion, namely the question of National Anthem. At one time it was thought that the matter might be brought up before the House and a decision taken by the House by way of a resolution. But it has been felt that, instead of taking a formal discussion by means of a resolution, it is better if I make a statement with regard to the National Anthem. Accordingly I make this statement.
The composition consisting of the words and music known as Jana Gana Mana is the National Anthem of India, subject to such alterations in the words as the Government may authorise as occasion arises ; and the song Vande Mataram which has played a historic part in the struggle for Indian freedom, shall be honoured equally with Jana Gana Mana and shall have equal status with it. (জগদীশ ভট্টাচার্য : বন্দেমাতরম, জুন ১৯৭৮, পৃঃ ১০৭-১০৮)।
প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, যেহেতু ১৯৪৯-এর ২৬ নভেম্বর গণপরিষদ স্বাধীন ভারতের সংবিধান গ্রহণ করেছিল এবং তার প্রায় দু-মাস বাদে আমাদের জাতীয় সংগীত গণপরিষদে সভাপতির বিবৃতির পর গৃহীত হয়, তাই আইনগতভাবে আমাদের জাতীয় সংগীত সংবিধানের অংশ নয়। ১৯৭৬ সালে ৪২-তম সংবিধান সংশোধনের পর যখন ভারতীয় নাগরিকের কর্তব্যের তালিকা সংবিধানে সন্নিবেশিত হল (Art 51A) তাতে জাতীয় সংগীতকে যথাযোগ্য সম্মান দিতে হবে (clause-a)—এ কথা বলা হল। কিন্তু আইনের বিচারে তা নির্দেশাত্মক নীতিগুলির মতো, প্রয়োগ করতে হলে সরকারকে নির্দিষ্ট স্ট্যাটুইটারি আইন তৈরি করতে হবে। নচেৎ এ এক সাধারণ নির্দেশমাত্র।
‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত হয়ে ওঠার বিষয়ে আমাদের দ্বিতীয় উত্তর হতে পারে, এই গানকে যখন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস resolution করে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। সে তারিখটি হল ২৮ অক্টোবর ১৯৩৭। ব্যাপারটা এমন নয় যে এর আগে জাতীয় কংগ্রেস এই গান ব্যবহার করেনি। বস্তুত ১৯০৩-০৮-এর আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ গান ও ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি জাতিকে উদবেলিত করেছে এবং তারও আগে এই গান কংগ্রেসের মঞ্চে গাওয়া হয়েছে। এবং উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে শুধু বাংলা দেশেই নয়, সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র। সে-কথায় আমরা পরে আসছি। কিন্তু আইনগতভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মতন্ত্রের মাধ্যমে কংগ্রেস ১৯৩৭-এর আগে ‘বন্দে মাতরম’-কে গ্রহণ করেনি। কেন হঠাৎ ২৮ অক্টোবর ১৯৩৭-এ এই resolution করতে হল তার পটভূমি ব্যাখ্যা করার অবকাশ এখানে আছে। অধ্যাপক সব্যসাচী ভট্টাচার্য তাঁর সুলিখিত একটি বইতে Vande Mataram : The Biography of a song (Penguin, 2003) এ-বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তার বিশদ পুনরুল্লেখ এখানে নিষ্প্রয়োজন। আপাতত মূল ঘটনাগুলি স্মরণ করিয়ে দেওয়া যাক। একটু আগেই উল্লেখ করেছি ১৯০৫-এর আন্দোলনের সময় থেকেই ‘বন্দে মাতরম’ জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল। সব্যসাচী ভট্টাচার্য লিখেছেন, ‘The song that united also divided… .’ (পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃঃ ২১)। ‘বন্দে মাতরম’-এর ইতিহাসে এই কথাটি বারেবারেই ঘুরে ঘুরে এসেছে। বঙ্গচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনের পর্বে তা যেমন দেখা গেছে অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান বিরোধের এক সূত্র হিসেবে কাজ করেছে এই গান, তেমনই তা এক জোরদার বিতর্ক তৈরি করেছে ১৯৩০-এর যুগে। ১৯৩৫-এর ভারত শাসন আইন চালু হবার পর ১৯৩৭-এ প্রাদেশিক আইনসভার নির্বাচন নিষ্পন্ন হল। বেশ অনেকগুলি প্রদেশে জাতীয় কংগ্রেস সরকার গঠন করেছিল, মুসলিম লিগের প্রাধান্য তৈরি হল কিছু কিছু রাজ্যে। এই নির্বাচনের পর্বে কংগ্রেস-লিগের রাজনৈতিক বিরোধ এক নতুন মাত্রা পেয়েছিল। সেই সময়ে কংগ্রেস প্রভাবিত রাজ্যগুলিতে এক রেওয়াজ ছিল প্রাদেশিক আইনসভার অধিবেশনের শুরুতে ‘বন্দে মাতরম’ গান গাওয়ার, স্বায়ত্তশাসনমূলক স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতেও ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার রীতি ছিল। মুসলিম লিগ এই রীতির বিরোধিতায় উচ্চকিত হল। ওই সময়ে করাচি কংগ্রেসের প্রস্তাবানুযায়ী কোনো সংখ্যালঘু সম্প্রদায় কংগ্রেস অবলম্বিত কোনো বিধির প্রতিবাদ করলে কংগ্রেস তার যথাবিহিত সংশোধন করতে বাধ্য ছিল। ‘বন্দে মাতরম’ প্রশ্নে এই বিতর্ক নিরসন করার দায় বর্তেছিল কংগ্রেসের ওপর।
দ্বিতীয়ত, ১৯৩৬-এ নেহরু দ্বিতীয় বার কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হলেন। তাঁর মনে হয়েছিল জাতীয় কংগ্রেসে মুসলমান নেতৃবর্গ আছেন ঠিকই, কিন্তু সাধারণ মুসলমান সমাজের সঙ্গে কংগ্রেসের যথেষ্ট ব্যবধান তৈরি হয়েছে, ফলে কংগ্রেসের তরফ থেকে এমনকিছু ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন যাতে এই ব্যবধান কমানো যায়। নেহরু গ্রহণ করলেন Muslim Mass Contact Programme ; এক প্রেস-বিবৃতিকে তিনি বললেন :
We talk of approaching the Muslim masses. That is no new programme for us although the stress may be new….It must be remembered that the Congress has always had large number of Muslims in its fold….Some of our most eminent national leaders have been and are Muslims. But it is true that the Muslim masses have been largely neglected by us in recent years. We want to correct that omission and carry the message of the congress to them.
(সব্যসাচী ভট্টাচার্য : পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃঃ ২৯-৩০)।
এরই প্রেক্ষিতে ১৯৩৭-এর অক্টোবর মাসে কলকাতায় কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির অধিবেশনে মুসলমানদের কাছে আপত্তিজনক ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে আলোচনা শুরুর আগে সুভাষচন্দ্র এবং জওহরলাল ‘বন্দে মাতরম’-বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মত জানতে উৎসুক হয়ে ওঠেন। বাস্তবিকপক্ষে নেহরু কলকাতায় পৌঁছোবার আগেই সুভাষ আশঙ্কিত হয়ে উঠেছিলেন যে ওয়ার্কিং কমিটি হয়তো ‘বন্দে মাতরম’ গানটিতে পৌত্তলিকতা আছে এই সন্দেহে ভিন্ন কোনো নীতি অবলম্বন করতে পারে। উপরন্তু এই সময়েই Viswa-Bharati News-এ কৃষ্ণ কৃপালনী ‘বন্দে মাতরম’-এর সাম্প্রদায়িক চরিত্র নিয়ে লিখেছিলেন এক প্রবন্ধ। সুভাষ এই লেখা পড়ে শঙ্কিত হয়ে কার্শিয়াং থেকে রবীন্দ্রনাথকে এক চিঠি লেখেন ১৬ অক্টোবর ১৯৩৭-এ—’…কংগ্রেস মহলে ‘বন্দে মাতরম’ গানের বিষয়ে আলোচনা চলিতেছে। ২৬ তারিখে Congress Working Committee-র যে সভা কলিকাতায় বসিবে, সেখানে এ বিষয়ে আলোচনা হইবে। হয়তো উক্ত কমিটি এই গান বর্জনের প্রস্তাব গ্রহণ করিবে। এ বিষয়ে আপনার মতামত আমি জানি না এবং জানিবার জন্য এই পত্র লিখিতেছি। বাঙলাদেশে, এবং বাঙলার বাহিরে হিন্দু সমাজে, খুব চাঞ্চল্য উপস্থিত হইয়াছে এবং বহু বন্ধুর অনুরোধে আপনার উপদেশ পাইবার জন্য এই পত্র লিখিতেছি।
৯ অক্টোবরের ‘comrade’ পত্রিকায় বিশ্বভারতীর শ্রীযুক্ত কৃপালনী বিশ্বভারতী পত্রিকার সম্পাদক বলিয়া নিজের পরিচয় দিয়োছেন। তিনি ‘বন্দে মাতরম’ গানের বিরুদ্ধেই লিখিয়াছেন। তাঁহার মত বিশ্বভারতীর মত কি না তাহা বুঝিতে পারিতেছি না।
‘আপনার যদি এই শর্ত হয় যে ‘বন্দে মাতরম’ গানের বর্তমান মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা উচিত তাহা হইলে আপনি যদি পণ্ডিত জওহরলাল ও মহাত্মা গান্ধিকে এ বিষয়ে লেখেন তাহা হইলে খুব ভাল হয়।..’
একটি তথ্য এখানে জানিয়ে রাখা দরকার যে কৃষ্ণ কৃপালনীর প্রবন্ধ ‘Bande Mataram and Indian Nationalism’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল Viswa-Bharati News-এ (অক্টোবর ১৯৩৭), comrade পত্রিকায় তা পুনর্মুদ্রিত হয়েছে প্রায় একই সঙ্গে। প্রবন্ধটি বিতর্কের সূত্রপাত করাতে হিন্দুস্থান স্ট্যান্ডার্ড পত্রিকায় (২৪ অক্টোবর ১৯৩৭) রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানিয়েছিলেন :
…The views on ‘Bande Mataram’ that had found expression in Prof. Krishna Kripalani’s article in the Viswa, Bharati magazine represent the official view of Viswa-Bharati or of the poet.
(রবীন্দ্রজীবনী, চতুর্থ খণ্ড : প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়)।
শুধু রবীন্দ্রনাথকে নয় সুভাষচন্দ্র একই সঙ্গে এই আশঙ্কার কথা জানিয়ে চিঠি লিখেছিলেন প্রবাসী সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে। ইতিমধ্যে নেহরুও কবির মত জানতে ব্যাকুল হয়ে ওঠেন এবং তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক শুরুর মাত্র ছ-দিন আগে বিশে অক্টোবর নেহরু সুভাষকেও লিখেছিলেন :
I have managed to get an English translation of Anandamath and I am reading it at present to get the background of the song. It does seem that this background is likely to irritate the Muslims.
(সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৩২)
এই চিঠিতে নেহরু সুভাষকে আরও জানিয়েছিলেন যে ‘বন্দে মাতরম’ গানের ভাষা বোঝার জন্য তাঁকে বারবার অভিধানের সাহায্য নিতে হচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ এই সময়ে গুরুতর অসুস্থ ছিলেন। তারই মধ্যে কবি এই বিতর্কের অবসানের জন্য নেহরুকে যে ঐতিহাসিক চিঠিটি লিখেছিলেন তাতে তাঁর তিনটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। রবীন্দ্রনাথের এই চিঠি এখন সহজপ্রাপ্য, তার সম্পূর্ণ পুনরুদ্ধার নিষ্প্রয়োজন। চিঠিতে তাঁর মূল তিনটি বক্তব্য ছিল এরকম : (ক) বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানের প্রথম স্তবকে তিনিই প্রথম সুর দিয়েছিলেন এবং বঙ্কিমচন্দ্র তখন জীবিত। তিনিই কংগ্রেসের জাতীয় সভায় প্রথম এই গান গেয়েছেন। পরবর্তী সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ যখন জাতীয় শ্লোগানে পরিণত হয় তার পর থেকে বহু বিশিষ্ট মানুষের স্বার্থত্যাগের ঘটনাবলি এই গানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। (খ) এই গানের প্রথম স্তবকে যে ভক্তি ও কোমলতার ভাব আছে, তাতে ভারতমাতার যে সুন্দর রূপ বর্ণিত হয়েছে তা কবির হৃদয়কে বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। তাই এ-গানের প্রথম স্তবককে পুরো গানটি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখতে তাঁর অসুবিধে হয় না। অবশ্য তিনি আবাল্য একব্রহ্মবাদের আবহাওয়ায় প্রতিপালিত বলে সমগ্র গানটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা নেই। চিঠির সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অংশটুকু কবির ভাষাতেই উল্লেখ করি :
(গ) I freely concede that the whole of Bankim’s ‘Vande Mataram’ poem, read together with its context, is liable to be interpreted in ways that might wound Moslem susceptibilities, but a national song, though derived from it, which has spontaneously come to consist only of the first two stanzas of the original poem, need not remind us everytime of the whole of it, much less of the story with which it was accidentally associated. It has acquired a separate individuality and an inspiring significance of its own in which I see nothing to offend any sect or community.
(সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃঃ ৩৪)
স্পষ্টতই রবীন্দ্রনাথ জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-কে গ্রাহ্য করার আগে ‘বন্দে মাতরম’-এর ব্যবচ্ছেদ চেয়েছেন। কবিতার শেষ দুই স্তবকে পৌত্তলিকতার চিহ্ন আছে বলে তা তিনি সংখ্যালঘুর ওপর চাপিয়ে দিতে চাননি। সুভাষচন্দ্রের চিঠির উত্তরে কবি লিখেছিলেন, আনন্দমঠ উপন্যাসটি সাহিত্যের বই, তার মধ্যে এই গানের সুসংগতি আছে। কিন্তু যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র সেখানে এ গান সর্বজনীনভাবে সংগত হতেই পারে না। বাংলাদেশের একদল মুসলমানের মধ্যে যখন অযথা গোঁড়ামির জেদ দেখতে পাই তখন সেটা আমাদের পক্ষে অসহ্য হয়। তাদের অনুকরণ করে আমরাও যখন অন্যায় আব্দার নিয়ে জেদ ধরি তখন সেটা আমাদের পক্ষে লজ্জার বিষয় হয়ে ওঠে। বস্তুত এতে আমাদের পরাভব।…’
‘বন্দে মাতরম’ ব্যবচ্ছেদের এই অভিমত তদানীন্তন হিন্দুসমাজকে খুশি করতে পারেনি। প্রবল ঝড় উঠেছিল কবির বিরুদ্ধে। এমনকি কবিবন্ধু ব্রাহ্মসম্প্রদায়ভুক্ত রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কেও কবির এই সিদ্ধান্ত সমালোচনামুখর করে তুলেছিল।১কবির মত জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস ও হিন্দুমহাসভার সদস্য কাউকেই খুশি করেনি বরং তীব্র উত্তাপের সঞ্চার হয়েছিল সর্বত্র। কংগ্রেস সভাপতি নেহরু অবশ্য পছন্দ করেছিলেন কবির অভিমত। তা কেবল মুসলিম লিগের বিভেদাত্মক রাজনীতিকে ঠ্যাকাবার কৌশল হিসেবে নয়, ‘বন্দে মাতরম’-এর Text তাঁর কাছে পৌত্তলিকতার দোষে দুষ্ট বলেই মনে হয়েছিল। তাই জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের মনোভাবের কথাও তাঁকে ভাবিয়ে তুলেছিল। এ কথা মনে রাখা জরুরি যে, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও রাজেন্দ্রপ্রসাদ যথাক্রমে ১৯৩১ ও ১৯৩৪-এ ‘বন্দে মাতরম’ দিয়ে তাঁদের সভাপতির ভাষণ শেষ করতেন। নেহরু ১৯২৯ বা ১৯৩৬-এ কখনোই সভাপতি-ভাষণের শেষে ‘বন্দে মাতরম ধবনি ব্যবহার করেননি। (সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৪৩)। জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের মনোভাবের ইঙ্গিত দিতে গিয়ে অধ্যাপক সব্যসাচী ভট্টাচার্য AICC-র দলিল উদ্ধার করে যে খবরটি দিয়েছেন সেটিও খুব তাৎপর্যপূর্ণ। তরুণ জাতীয়তাবাদী মুসলিম ইতিহাসবিদ এবং কংগ্রেসকর্মীকে এম. আশরফ যুক্তপ্রদেশের কংগ্রেস কমিটির সেক্রেটারি মহাবীর ত্যাগীকে জানিয়েছিলেন, We should appoint a committee to select a number of National songs and Flag songs acceptable and intelligable to both Hindus and Muslims. (পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৩০)। বাস্তবিকপক্ষে আশরফের এই মত তখনকার বেশির ভাগ জাতীয়তাবাদী মুসলমানের মনোভাবের সাক্ষ্য বহন করে। অবশ্য সমসাময়িককালে রেজাউল করিমের চিন্তাকে উপেক্ষা করা চলে না, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মতো যিনি মনে করতেন, বন্দেমাতরম-এ দেশমাতৃকার বন্দনাই মুখ্য, পৌত্তলিকতার আবাহন হিসেবে তার বিচার যুক্তিহীন।২এক শ্রেণির মুসলমান সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে কলকাতার রাস্তায় আনন্দমঠ বই পোড়ানোর উৎসবে মত্ত, এটা মুসলিম সমাজের কলঙ্ক বলে গণ্য করতে হবে। উল্লেখ্য আরও এই যে কাজি আবদুল ওদুদ, মোহম্মদ শহিদুল্লাহ কিংবা সাম্প্রতিককালে আহমদ শরিফ, আনিসুজ্জামান, হাসান আজিজুল হক এবং এরকম আরও অনেকের বঙ্কিম-সাহিত্য-বিষয়ে যে-দৃষ্টিভঙ্গি তার গুরুত্ব কম নয়, কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ বা বঙ্কিমচন্দ্র-বিষয়ে সাধারণ মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি তা ছিল না। বস্তুত ‘বন্দে মাতরম’ প্রসঙ্গে সাম্প্রতিক এই বিতর্কেও আমরা সে-পরিচয় পাচ্ছি।
রবীন্দ্রনাথের মত পাবার পর ২৮ অক্টোবর ১৯৩৭-এ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল তার চেহারাটি ছিল এরকম :
Working Committee feel that past associations, with their long record of suffering for the cause, as well as popular usage, have made the first two stanzas of this song a living and inseparable part of our national movement and as such they must command our affection and respect. There is nothing in these stanzas to which anyone can take exception. The other stanzas of the song are little known and hardly ever sung. They contain certain allusions and a religious ideology which may not be in keeping with the ideology of other religious groups in India.
The committee recognise the validity of the objection raised by Muslim friends to certain parts of the song. While the committee have taken note of such objection in so far as it has intrinsic value, the committee wish to point out that the modern evolution of the use of the song as part of national life is of infinitely greater importance than its setting in a historical novel before the national movement had taken shape. Taking all things into consideration therefore the committee recommend that wherever the Bande Mataram is sung at national gatherings only the first two stanzas should be sung, with perfect freedom to the organisers to sing any other song of an unobjectionable character, in addition to, or in the place of, the Bande Mataram song. (সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃঃ ৩৫-৩৬)
ওয়ার্কিং কমিটি আর-এক সিদ্ধান্ত করল যে আবুল কালাম আজাদ, জওহরলাল নেহরু, সুভাষচন্দ্র বসু এবং নরেন্দ্র দেবকে নিয়ে একটি উপসমিতি গঠন করা হবে যাঁরা ‘any other song of an unobjectionable character’-এর কথা বিবেচনা করতে পারবেন। এবং এই উপসমিতি রবীন্দ্রনাথের পরামর্শ বা উপদেশ গ্রহণ করবেন। দেশবাসীর কাছে নতুন গান রচনার আহ্বানও জানানো হল। সব্যসাচী ভট্টাচার্য সঠিক উল্লেখ করেছেন যে resolution-এর এই দ্বিতীয়াংশে এক ধরনের আমলাতান্ত্রিকতার মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। জাতীয় সংগীত ফরমায়েশ দিয়ে লেখানোর বিষয় নয়। অধ্যাপক ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে এই আমলাতান্ত্রিকতা যে নেহরুর পছন্দসই ছিল না সে-কথা জানিয়ে তিনি উর্দু কবি আলি সর্দার জাফরিকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন :
…great songs and anthems cannot be made to order. It requires a genius for the purpose… (সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃঃ ৩৭)
যাই হোক ১৯৩৭-এর অক্টোবরে কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক গ্রহণ করার পর দেশময় তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। হিন্দু নেতারা অনেকেই এর প্রতিবাদ করেছিলেন এবং মুসলিম লিগও আদৌ সন্তুষ্টি প্রকাশ করেনি। কারণ জিন্না ১৯৩৮-এর মার্চে নেহরুকে লিখেছিলেন যে এই সিদ্ধান্ত নিতান্ত এক concession-মাত্র যা মুসলমানদের কাছে গ্রাহ্য নয়। এবং স্পষ্ট ভাষায় তাঁর পুরোনো অবস্থান জানিয়ে লিখলেন :
Pandit Jawaharlal Nehru cannot be unaware that Muslims all over have refused to accept the Vande Mataram or any expurgated edition of the anti-Muslim song as a binding National Anthem.
(সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ৩৯)
মুসলিম লিগ বারবার দাবি উত্থাপন করতে শুরু করল যে ‘বন্দে মাতরম’-কে পুরোপুরি বাতিল করতে হবে। ১৯৩৯-এর জানুয়ারিতে গান্ধি এক গোপন বার্তায় কংগ্রেস-নেতাদের জানালেন :
As to the singing of the long established national song, Vande Mataram, the Congress, anticipating objections, has retained as national song only those stanzas to which no possible objection could be taken on religious or other grounds. But except at purely Congress gatherings it should be left open to individuals whether they will stand up when the stanzas are sung. In the present state of things, in local Board and Assembly meetings which their members (are) obliged to attend the singing of Vande Mataram should be discontinued.
(সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃঃ ৪০)
গান্ধি চাননি ‘বন্দে মাতরম’-এর মতো মহান সংগীতটিকে কর্দমাক্ত রাজনীতির সংকীর্ণ বিষয় করে তুলতে।
এতক্ষণ যে ইতিহাসটির কথা বললাম তার প্রেক্ষিতে বলা চলে যে, তাহলে জাতির সর্বাপেক্ষা বৃহৎ মঞ্চ জাতীয় কংগ্রেস আইনসম্মতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গ্রহণ করল ১৯৩৭-এর ২৮ অক্টোবর, তীব্র বাদবিতণ্ডা সত্ত্বেও।
কিন্তু এর পরেও কথা থেকে যায়। ‘বন্দে মাতরম-‘কে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করার কি অন্য কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া যায়? আমি তৃতীয়-যে সম্ভাব্য উত্তর খোঁজার কথা বলেছি এই নিবন্ধের শুরুতে সেটি এবার দেখা যাক। জননেতা, সাহিত্যিকগোষ্ঠী, ইতিহাসকার সকলেই একমত যে ‘বন্দে মাতরম’ জনমানসে জাতীয় সংগীত হয়ে উঠেছিল বঙ্গভঙ্গের পর্বে। ওই আন্দোলনের ইতিবৃত্ত বিশ্লেষণ করলে ছত্রেছত্রে তার পরিচয় পাওয়া যাবে। তবে সে-কথায় যাবার আগে এটাও খেয়ালে রাখা জরুরি যে, এই আন্দোলন শুরু হবার বেশ আগে থেকেই জাতীয় কংগ্রেসের মঞ্চে রবীন্দ্রনাথ এ-গান গেয়েছেন। প্রধানত সরলা দেবী ও রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষ্য মেনেই ইতিহাসকারেরা জানাচ্ছেন যে ১৮৯৬-এর কলকাতা কংগ্রেসে কবি প্রথম এই গানটিকে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়েছেন। কিন্তু কেউ কেউ অন্য কথাও বলেছেন। ১৯৪১-এ প্রকাশিত অমল হোম সম্পাদিত Calcutta Municipal Gazette : Tagore Memorial Special Supplement-এপ্রকাশিত কবির জীবনালেখ্যতে বলা হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ attends the sixth sessionof the Indian National Congress in Calcutta (December 1890) underthe presidentship of Pherozshah Mehta, when he sings the BandeMataram on the opening day. (পৃঃ ৬৭)। এই সিদ্ধান্তের শরিক সংগীতবিশেষজ্ঞ অনন্তকুমার চক্রবর্তীও, তাঁর গানের ভেলায় বেলা অবেলায় গ্রন্থে। রবিজীবনী-কার প্রশান্তকুমার পাল লিখেছেন, ‘কিন্তু রথীন্দ্রনাথের ও অন্যদের স্মৃতিকথায় রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ গান দিয়ে কংগ্রেসের অধিবেশনের সূচনা হলেও সমকালীন সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অন্য কথা বলে।’ (রবিজীবনী-৪, পৃ. ১২৫)। প্রশান্তকুমার অমৃতবাজার পত্রিকা (২৯ ডিসেম্বর ১৮৯৬) থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন : Before the proceeding commenced, a party of gentlemen headed by Babu Rabindranath Tagore sang a number of songs composed to suit the occasions। সেই গানগুলি কী? জ্যোতিরিন্দ্রনাথ রচিত ‘চল রে চল সবে ভারতসন্তান’, সত্যেন্দ্রনাথের ‘মিলে সবে ভারত সন্তান’ ইত্যাদি। পত্রিকার প্রতিবেদনে বন্দে মাতরম-এর উল্লেখ না থাকলেও অবশ্য প্রমাণ করা শক্ত যে সে-গান গাওয়া হয়নি। কেন-না রথীন্দ্রনাথ পরিষ্কার লিখেছেন যে সরলা দেবী অর্গান বাজিয়েছিলেন এবং কবি উদাত্তকণ্ঠে মাইক ছাড়া বন্দেমাতরম গেয়েছিলেন। On the Edges of Time-এ আমরা এ কথা পাচ্ছি।৩১৮৯০ বা ১৮৯৬ যাই হোক না কেন এ বিষয়ে মতান্তর বোধহয় নেই যে রবীন্দ্রনাথ সর্বপ্রথম কংগ্রেস-মঞ্চে এ গান গেয়েছেন। কিন্তু আরও এক খটকা রয়ে গেল শ্রীযুক্ত চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি লেখা পড়ে। তিনি লিখেছেন, ‘ঐ অধিবেশনের (১৮৯৬) এক প্রস্তাবে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে স্বীকৃতি লাভ করে।’ (‘বন্দে মাতরম ও স্বদেশী আন্দোলন’ : দেশ, সাহিত্য সংখ্যা ১৩৯৫)। এই তথ্যের ভিত্তি কী, তা অবশ্য জানাননি লেখক। সত্যিই কি এমন কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল কংগ্রেসের সভায়? ইতিহাসে তেমন কোনো তথ্যের হদিস পাচ্ছি না।
১৯০৫-এর আন্দোলন-পর্বে ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় মন্ত্রে পরিণত করার প্রধান উদযোগী পুরুষ ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ। ১৯০৭-এ প্রকাশিত ‘Rishi Bankimchandra’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি লিখেছিলেন :
Among the Rishis of the later age we have at least realised that we must include the name of the man who gave us the reviving Mantra which is creating a new India, the Mantra Bande Mataram. অরবিন্দ এই প্রবন্ধে আরও লিখেছেন, The religion of patriotism—This is the master idea of Bankim’s writings.
(‘বন্দে মাতরম’ : জগদীশ ভট্টাচার্য থেকে উদ্ধৃত, পৃ. ৩)
আনন্দমঠ-এর অনুপ্রেরণায় অরবিন্দ ভবানী মন্দিরও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং বিপ্লবী গুপ্তসমিতিগুলির ধ্যানধারণায় আনন্দমঠ-এ বর্ণিত সন্তানদলের কাজকর্মের ছায়াও দেখতে পাওয়া যেত। সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে বঙ্গভঙ্গের সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র আন্দোলনকারীদের icon হয়ে উঠেছিলেন এবং ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের প্রচার বিদ্যুদগতিতে ছড়িয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার প্রতিষ্ঠিত সিডিশন কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছিল যে ১৮৮২ সালে আনন্দমঠ প্রকাশিত হবার পর ‘বন্দে মাতরম’ তেমন প্রচারের আলোয় আসেনি। মানুষের কাছে বিপুলভাবে আদৃত হতে শুরু করেছে এই মন্ত্র ১৯০৫-এর আন্দোলনে।
১৯০৫-এ এইচ. বোসের উদযোগে রবীন্দ্রনাথের গলায় ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম রেকর্ড তৈরি হয়। পুরো গানটি নয়, প্রথম কটি পঙক্তি। ভাগনি সরলা দেবীকে তিনি বলেছিলেন বাকি কবিতাংশে সুর বসাতে, সেটা অবশ্য আগেই। সরলা দেবী দিয়েছিলেন সেই সুর এবং বিভিন্ন সভাসমিতিতে গাইতেন এই গান। অন্যদিকে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি বিভিন্ন সভাসমিতি-মিছিলে ধবনিত হতে থাকে, বিশেষত ছাত্র-যুবমহলে। ১৯০৫-এর উনিশে জুলাই সরকারিভাবে বঙ্গচ্ছেদের প্রস্তাব ঘোষিত হবার পর কলকাতার টাউন হলে পরপর পাঁচটি জনসবা হয়। প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৭ আগস্ট রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর সভাপতিত্বে—ছাত্র ও যুবকদের অংশগ্রহণ এই সভায় ছিল চোখে পড়ার মতো এক ঘটনা। ঐতিহাসিকেরা লিখেছেন, সমস্ত স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্ররা মিলিত হয়েছিলেন কলেজ স্কোয়ারে এবং তাঁদের মাথায় ছিল গেরুয়া উষ্ণীষ, বুকে ‘বঙ্গভঙ্গ রহিত করিতে হইবে’ লেখা ব্যাজ, খালি পা এবং হাতে কালো পতাকা যেগুলিতে প্রধানতম স্লোগান ছিল ‘বন্দে মাতরম’। রবীন্দ্রনাথের ঘরে-বাইরে উপন্যাসে আমরা যে ছবির বর্ণনা পড়েছি। তবে এখানে স্মরণ করিয়ে দেওয়া কর্তব্য যে ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগান ব্যবহারের ঘটনা এটাই প্রথম ছিল না। সরলা দেবী তাঁর জীবনের ঝরাপাতা-য় লিখেছেন, ‘বন্দে মাতরম’ শব্দটি মন্ত্র হল সর্বপ্রথম যখন মৈমনসিংহের সুহৃদ সমিতি আমাকে স্টেশন থেকে তাদের সভায় প্রোসেশন করে নিয়ে যাবার সময় ওই শব্দদুটি হুংকার করে করে যেতে থাকল। সেই থেকে সারা বাঙলায় এবং ক্রমে ক্রমে সারা ভারতবর্ষে ওই মন্ত্রটি ছড়িয়ে পড়ল—বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যখন গভর্নর সাহেবের অত্যাচার আরম্ভ হল আহিমালয়-কুমারিকা পর্যন্ত ওই বোলটি ধরে নিলে।’ (পৃ. ৪৮)। এই ঘটনা ঘটেছিল ১৯০৪-এ।
১৯০৫-এর ১৬ অক্টোবর বঙ্গবিভাগ কার্যকর হল। ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছেদ ঘটলেও বাঙালি যে এক অখণ্ড জাতি ধর্ম বা জাতপাত নির্বিশেষে—সে-কথা প্রতিষ্ঠার জন্য রবীন্দ্রনাথ আহ্বান করলেন এই-জাতীয় শোকের দিনে পরস্পর পরস্পরকে রাখিবন্ধনে জড়িয়ে রাখতে। ১৬ অক্টোবর সকালে খালিপায়ে ‘বন্দে মাতরম’ গান ও স্লোগানসহ কলকাতার রাস্তায় ঐতিহাসিক মিছিল বেরোল—গঙ্গাস্নানের পর সেই মিছিল রাখি-সংগীতে ভরিয়ে দিয়েছিল আকাশ-বাতাস। কুষ্ণকুমার মিত্র, অবনীন্দ্রনাথের রচনায় এই দিনটির ঘটনাবলি বিধৃত রয়েছে।৪ রামেন্দ্রসুন্দরের প্রস্তাবক্রমে ঘরে ঘরে অরন্ধন পালিত হল, অন্তঃপুরের মেয়েরা পড়লেন বঙ্গলক্ষ্মীর ব্রতকথা, আগে-পরে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিয়ে। দোকান-বাজার-যানবাহন সবই ছিল বন্ধ। বিকেলে পারসিবাগানের বিরাট জনসভায় প্রায় পঞ্চাশ হাজার বাঙালির ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্য দিয়ে জাতীয় নেতারা জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ভেডারেশন হলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন। এরপর শ্যামবাজারের পশুপতিনাথ বসুর বাড়ির প্রাঙ্গণে বাঙালি স্বয়ম্ভর হয়ে ওঠার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করল। কৃষ্ণকুমার মিত্র লিখেছেন, প্রায় ৭০ হাজার লোকের ‘…উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিতে আকাশ নিনাদিত ও চতুর্দিকের বাটী হইতে তাহার প্রতিধবনি হইতে লাগিল। সকলের মন যেভাবে বিভোর হইয়াছিল তাহা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না’ (আত্মস্মৃতি)। রবীন্দ্রনাথ ওই অনুষ্ঠানে তাঁর ভাষণের এক অংশে বলেছিলেন, ‘…তোমাদের সম্মিলিত হৃদয়ের ‘বন্দে মাতরম’ গীতধবনি এক প্রান্ত হইতে অপর এক প্রান্তে পরিব্যাপ্ত হইয়া যাক।’ ওই একই দিনে কালীঘাটের মন্দিরেও উদযাপিত হয়েছিল। বঙ্গচ্ছেদবিরোধী আন্দোলনের অনুষ্ঠান। মন্দিরের পুরোহিতের গলায় ঝোলানো হয়েছিল এরকম কথা ‘অন্য দেবদেবীর পূজার পূর্বে, জন্মভূমির পূজাই প্রশস্ত’। মুহুর্মুহু ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্য দিয়ে মন্দিরেও বিলেতি দ্রব্য বর্জনের প্রতিজ্ঞা নেওয়া হয়।
বয়কট আন্দোলন ক্রমেই পরিব্যাপ্ত হচ্ছিল। কলকাতায় তো বটেই গ্রামে-গঞ্জে-মহকুমা-জেলাশহরগুলিতে আন্দোলন আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। সর্বাপেক্ষা বেশি তৎপর ছিল সে-আন্দোলনে স্কুল-কলেজের ছাত্র-যুবারা। সরকার ভয় পেয়ে কুখ্যাত কার্লাইল সার্কুলার জারি করলেন ১৯০৫-এর ১০ অক্টোবর। ছাত্রসমাজকে রাজনৈতিক সভাসমিতি-বত্তৃ�তা-পিকেটিং ইত্যাদি থেকে বিরত করার জন্য এই সার্কুলার। ‘বন্দে মাতরম’ গান ও স্লোগান এই নিষেধের তালিকায় এল। ১৯০৫-এর ডিসেম্বরে গোখলের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হল বারাণসী কংগ্রেস। ইতিমধ্যে কার্লাইল সার্কুলারের প্রতিক্রিয়ায় তৈরি হয়ে গেছে অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি, জাতীয় শিক্ষার আন্দোলনও ধাপে ধাপে তৈরি হতে শুরু করেছে। বয়কট তো চলছিলই। বাংলায় নেতারা কংগ্রেসে বয়কট প্রস্তাব জাতীয় স্তরে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তাব নিয়ে এলেন, কিন্তু গোখলে-মালব্য প্রমুখের বাধায় সে-প্রস্তাব গ্রাহ্য হল না। তাঁরা বললেন বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বয়কট রণকৌশল হিসেবে গ্রাহ্য হলেও সমগ্র ভারতে এ প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। বস্তুত সাবধানপন্থী কংগ্রেসি নেতারা বয়কটকে আদৌ সমর্থন করতেপারছিলেন না। যাই হোক, এই অধিবেশনের শেষেই সভার ডেলিগেটদের তরফ থেকে দাবি এল যে সরলা দেবী সভায় উপস্থিত আছেন, তাঁর কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ গান শোনাতে হবে। সভাপতি গোখলে স্পষ্টতই দ্বিধাগ্রস্ত, মানতে চাইলেন না এই দাবি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হলেন তাঁকে ডাকতে এবং এক টুকরো কাগজে লিখে জানালেন যে গানটি যেন তিনি ছোটো করে গান, কারণ সময়সংক্ষেপ। সরলা দেবী গাইলেন ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘সপ্তকেটি কণ্ঠ’র জায়গায় ‘ত্রিংশকোটি’ শব্দটি ব্যবহার করলেন। কারণ এ গান যখন লিখেছিলেন বঙ্কিম ১৮৭৫ বা ‘৭৬-এ, তখন বাংলা দেশে হিন্দু-মুসলমানের মিলিত জনসংখ্যা ছিল সাত কোটির কাছাকাছি, ১৯০৫-এ সমগ্র ভারতবর্ষে তা তিরিশ কোটিতে পৌঁছেছিল। লক্ষণীয় যে সরলা দেবী সাত থেকে তিরিশ—এই আঙ্কিক পরিবর্তনটুকুই শুধু করেননি, বাংলার জাতীয়তাবাদী মন্ত্রটিকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদে রূপান্তরিত করেছিলেন।
‘বন্দে মাতরম’ গান এবং বঙ্কিমের সাহিত্যকৃতি কেবল বাংলা দেশে নয়, ইতিমধ্যে তার প্রসার ঘটেছে সমগ্র ভারতবর্ষে। তার প্রমাণ হিসেবে আমরা উল্লেখ করতে পারি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় বঙ্কিমের রচনার অনুবাদ প্রকাশের তালিকা দাখিল করে। ‘বন্দে মাতরম’ গানটির অনুবাদ হয়েছিল মারাঠি ও কানাড়ি ভাষায় ১৮৯৭-তে, ১৯০১-এ গুজরাটি, ১৯০৫-এ তামিল কবি সুব্রহ্মণ্য ভারতীয় অনুবাদ, ১৯০৬-এ হিন্দি, ১৯০৭-এ তেলুগু, ১৯০৯-এ মালয়ালাম ইত্যাদি। কোনো কোনো ভাষায় একাধিক অনুবাদ। শ্রদ্ধেয় বিষু�পদ ভট্টাচার্যের রচনায় (‘ভারতীয় সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব’ : দেশ, সাহিত্য সংখ্যা ১৩৯৫) এই অনুবাদ-সাহিত্যের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র পৌঁছে দিয়েছিলেন বিপিনচন্দ্র পালও। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের পর্বে তিনি তাঁর তেজোদৃপ্ত ভাষণ পৌঁছে দিয়েছিলেন ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্যে। এরই পাশাপাশি উল্লেখ করতে হবে ১৯০৫-এর ২ ডিসেম্বরে Indian Opinion কাগজে দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্দোলনরত গান্ধিজির এই উক্তি :
The song, it is said, has proved so popular that it has come to be our National Anthem….Just as we worship our mother, so is this song a passionate prayer of India…
(সব্যসাচী ভট্টাচার্য, পূর্বোক্ত গ্রন্থ, পৃ. ২৪)
‘বন্দে মাতরম’ ধবনি বিস্ফোরক চেহারা নিয়েছিল ১৯০৬-এর এপ্রিলে বরিশালে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কংগ্রেস সম্মিলনির যুগে। সমগ্র জেলা উদবেলিত হয়ে উঠেছিল এই ধবনিতে। এবং সেটা এতটাই যে ছোটোলাট ব্যামফিল্ড ফুলারের আদেশে সভা-সমিতি-মিছিলে নিষিদ্ধ হল ‘বন্দে মাতরম’। এই মন্ত্র-উচ্চারণের জন্য আহত হলেন ছাত্র-যুবকেরা, গ্রেফতার হলেন এবং জরিমানা দিতে হল সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এবং ‘বন্দে মাতরম’ স্লোগানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা না মানার জন্য শেষ পর্যন্ত পণ্ড হয়েছিল বরিশাল প্রাদেশিক কংগ্রেস। সেসব ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় হীরালাল দাশগুপ্তের দু-খণ্ডের বই স্বাধীনতা সংগ্রামে বরিশাল-এ। ‘বন্দে মাতরম’-কে কেন্দ্র করে এই পীড়ন-কাহিনি দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র ভারতে, বম্বের টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৮ এপ্রিল ১৯০৬-এ মন্তব্য করেছিল যে বরিশালের ঘটনা ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দালনের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করেছে। ১৯০৬-এর মার্চে সাভারকার বম্বের এক সাময়িকপত্রে ‘বন্দে মাতরম’ বিষয়ে প্রবন্ধ লেখার অপরাধে এবং অন্যান্য বিপ্লবাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য আন্দামানে নির্বাসিত হয়েছিলেন। এপ্রিলে তিলককে জেলে পাঠানো হল ‘বন্দে মাতরম’-এর সমর্থনে রচনা লেখার জন্য। কলকাতা, দিল্লি, গুজরাট, মহারাষ্ট্রে বন্দেমাতরম নামে পত্রিকা বেরোতে শুরু করল। অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি ১৯০৬-এর ৭ আগস্ট ‘বন্দে মাতরম’ পতাকা তৈরি করে তুলে দিলেন সুরেন্দ্রনাথের হাতে। পতাকাটি লাল হলুদ ও সবুজ রঙে রঞ্জিত ছিল। ওপরে ছিল আটটি অর্ধস্ফুট পদ্ম, নীচে বাঁদিকে সূর্য, ডানদিকে বাঁকা চাঁদ। মাঝে দেবনাগরীতে লেখা ‘বন্দে মাতরম’। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই পতাকাই মাদাম কামা ১৯০৮-এ আন্তর্জাতিক সমাজবাদী সম্মেলনে উপস্থিত করেছিলেন।
১৯০৬-এর ডিসেম্বরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত হল জাতীয় কংগ্রেসের দ্বাবিংশ অধিবেশন। সভাপতি ছিলেন দাদাভাই নৌরজি। সে-সভার শুরুতেও গাওয়া হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ । চিত্তরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের পূর্বোক্ত লেখায় পাচ্ছি ‘এ গান পরিবেশন করেছিল সম্ভবত নিবেদিতা স্কুলের ছাত্রীরা’। সতেরো দফা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এই কংগ্রেস কিন্তু তাতে ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল বলে জানা যাচ্ছে না।
এত-কিছু সত্ত্বেও ১৯০৩-০৮-এর আন্দোলন এড়াতে পারেনি সাম্প্রদায়িকতার বিষ। ‘বন্দে মাতরম’ ও আনন্দমঠ ছিল সেই বিদ্বেষচিন্তার এক বিশেষ সূত্র। সরকারি নথি উদ্ধার করে সব্যসাচী ভট্টাচার্য জানিয়েছেন যে, ১৯০৬-এর নভেম্বরে প্রবল উদ্দীপনার যুগে বরিশালে সাম্প্রদায়িক গোলমালের সূত্রপাত হয়েছিল কোনো-এক মসজিদের পাশ দিয়ে যাবার সময়ে হিন্দুদের মিছিলে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেবার কারণে। তা ছাড়া সকলেরই জানা যে পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে বয়কটকে ঘিরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও বিরোধের ঘটনা খুব দ্রুত ছড়াচ্ছিল ১৯০৭ থেকে। ময়মনসিংহ থেকে বেরিয়েছিল লাল ইস্তাহার নামে এক পুস্তিকা যাতে লেখা হল, মুসলমানেরা যেন যোগ না দেন হিন্দুদের বিকৃত স্বদেশি কার্যকলাপে, আর কেউ যেন ‘বন্দে মাতরম’ গান না করেন, ইত্যাদি।৫ সাম্প্রদায়িক ভেদবুদ্ধি স্বদেশি আন্দোলনকে সংহার করেছিল অনেকটাই আর এ কথাও ঠিক যে বয়কট আন্দোলনকে ঘিরেই সাম্প্রদায়িকতার প্রকোপ বাড়ছিল বেশ ভালোরকম। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার যে আন্দোলন তেজি হবার বছরখানেক আগেই বঙ্কিমের আনন্দমঠ হিন্দ-মুসলমানের রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণ হয়ে উঠেছিল। ১৯০৪-এ ময়মনসিংহে সুহৃদ সমিতির এক অনুষ্ঠানে সরলা দেবীর অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ। সে-বছর প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্লেলন ছিল ময়মনসিংহে, বীরাষ্টমীব্রতী যুবকেরা স্থির করেছিলেন যে এইসঙ্গে সরলা দেবীকে সংবর্ধনা দেবেন এবং সে-সভায় অভিনীত হবে আনন্দমঠ। কিন্তু কংগ্রেসের নেতারা জানান যে অধিবেশনে যোগ দেবার জন্য সুরেন্দ্রনাথ নিয়ে এসেছেন জনকয়েক মুসলমান বন্ধু, তাঁরা কেউ সম্মেলনে যোগ দেবেন না যদি আনন্দমঠ অভিনীত হয়। নেতারা সরলা দেবীকে অনুরোধ করেন অভিনয় বন্ধের জন্য ব্যবস্থা করতে, তিনি রাজি না হওয়ায় নেতারা পুলিশের সাহায্য নিয়ে নাটক বন্ধ করেছিলেন (দ্রষ্টব্য জীবনের ঝরাপাতা, পৃ. ১৭১-৭৪)। ঘটনাটা সামান্য নয়, আনন্দমঠ বা ‘বন্দে মাতরম’-বিষয়ে মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি লিগের জন্মের আগেও যে আদৌ অনুকূল ছিল না, এটা সে-কথাই প্রমাণ করে। ইতিহাসবিদদের মতে, ‘বন্দে মাতরম’ বা আনন্দমঠ-এর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বিরোধের ঘটনা বঙ্গভঙ্গের পর্বে ছিল ইতস্তত বিক্ষিপ্ত ব্যাপার, বঙ্কিম রচনার বিরুদ্ধে শিক্ষিত মুসলমানসমাজের তাত্ত্বিক বিরোধ জমাট বাঁধতে শুরু করেছিল বিশের দশকে। আর তারই পরিপূর্ণ প্রকাশ ঘটেছে তিরিশের যুগে।
এই বৃত্তান্ত থেকে তাহলে বুঝতে পারছি যে, ফরাসি দেশে ফরাসি জাতীয় সংগীত মার্সাই যেমন রণক্ষেত্র থেকে উঠে এসেছিল জনগণের কাছে, ঠিক তেমনই ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সংগীত হিসেবে মানুষের কাছে গৃহীত হয়েছিল বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলনের পর্বে। Nationalist War-cry হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি সংখ্যালঘুর প্রবল বিরোধিতা সত্ত্বেও হিন্দু জনসমাজের কাছে আদৃত হয়েছে খুব। কিন্তু জাতীয় সংগীত হিসেবে এর আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এসেছে অনেক পরে ১৯৩৭-এ। আর এ কথাও মনে রাখা জরুরি যে, সে-আমলে জাতীয় কংগ্রেসের বাৎসরিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হত ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে ; ১৯০৬-এও ২৬, ২৭, ২৮ তারিখে সে-সম্মেলন হয়েছিল, তাহলে ৭ সেপ্টেম্বর তারিখটি এল কোথা থেকে—এ এক বিরাট রহস্য।
