কীর্তনখোলা তীরে ‘বন্দে মাতরম’ সংকীর্তন
ড.পবিত্রকুমার গুপ্ত
বাংলার সমাজ বিপ্লবের প্রথম মহানায়ক শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু। আজ থেকে প্রায় পাঁচশ বছর আগে ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে শ্রীচৈতন্য দ্বিতীয়বার পুরীধামে যান। সঙ্গী তাঁর নিত্যানন্দ। চৈতন্য আন্দোলনের প্রধান সেনাপতি ছিলেন নিত্যানন্দ। নীলাচল থেকে শ্রীচৈতন্য নিত্যানন্দকে তাঁর প্রেমধর্ম ও সাম্যের বাণী প্রচারের জন্য নবদ্বীপ পাঠান। বৃন্দাবনদাসের বর্ণনা থেকে জানা যায় শ্রীচেতন্যের নির্দেশ :
এতেকে আমার বাক্য যদি সত্য চাও।
তবে অবিলম্বে তুমি গৌড় দেশে যাও।।
মূর্খ নীচ পতিত দুঃখিত যত জন।
ভক্তি দিয়া কর গিয়া সবার মোচন।
দেশবাসীকে শ্রীচৈতন্য একটি মহামন্ত্র প্রদান করেন। মহামন্ত্রটি হল হরিনাম :
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে।
আড়াইশ’ বছর যেতে না যেতে বাঙালির জীবনপ্রবাহে অনিবার্যরূপে ভাঁটার টান দেখা গেল। তখন অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ। বাংলার সিংহাসনে এক তরুণ। আলিবর্দির নীতি। রাজনীতি এবং প্রশাসনে একেবারে অনভিজ্ঞ। দেশের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে। রাজনীতি অস্থির। প্রশাসন অভিজ্ঞ শাসকের অভাবে পঙ্গু।
ধূর্ত ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার মসনদের দিকে তাকিয়ে। লন্ডনের চেয়ে অনেক উন্নত, সমৃদ্ধ, জাঁকজমকপূর্ণ মুরশিদাবাদ যেনতেন প্রকারেণ দখল করে নিতে হবে। সিরাজের মন্ত্রী, সেনাপতি সহ দেশের অভিজাতবর্গ অর্থের বিনিময়ে বিদেশি বণিকদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। উদ্দেশ্য সিরাজকে অপসারণ করা। এর চেয়ে অন্ধকার জাতির জীবনে আর কী হতে পারে? জীবনের কোনো লক্ষণই নেই জাতির মধ্যে। পলাশির আম্রকাননে স্বাধীনতার সূর্য অস্ত গেল।
জাতীয় জীবনের সেই চরম দুর্দিনে এক মাতৃসাধক জাতির গ্লানি ও বেদনায় কেঁদে উঠলেন। জীবন-নিঙড়ানো যন্ত্রণায় গাইলেন :
মন রে কৃষিকাজ জান না।
এমন মানব জমিন রইল পড়ে,
আবাদ করলে ফলত সোনা।।
কালী নামে দেও রে বেড়া,
ফসলে তছরূপ হবে না।
(মন রে আমার কৃষিকাজ জান না।)
সে মুক্ত কেশীর শক্ত বেড়া,
তার কাছেতে যম ঘেঁষে না।
অদ্য শত-শতান্তে বা বাজেয়াপ্ত হবে না।
(মন রে আমার কৃষিকাজ জান না।)
আছে একতারে মন এই বেলা,
তুই চুটিয়ে ফসল কেটে নে না।
গুরু বীজ রোপণ করে, বীজ
ভক্তি বারি তায় সেঁচ না।।
(মন রে আমার কৃষিকাজ জান না।)
ভারতের পতিত মানব জমিনে আবাদ করতে আবির্ভুত হলেন ভারত পথিক রামমোহন রায়। অখণ্ড ভারত চেতনা, জাতীয়তাবোধ ও স্বাধীনতার বার্তা তিনিই প্রথম বহন করে আনেন। বহু মনীষীর দীর্ঘকালের নিরলস তপস্যার ফলে ভারতবাসী হিসেবে আমরা জেগে উঠলাম। রামমোহনের ব্রাহ্মসমাজ আন্দোলন থেকে শুরু করে শ্রীরামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ আন্দোলন ভারতবাসীকে স্বাজাত্যবোধ ও স্বাধিকারে দীক্ষা দেয়। পতিত মানব জমিন সোনার ফসলে ভরে গেল।
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের শেখালেন, ‘আমরা অন্য মা মানি না—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। আমরা বলি জন্মভূমিই মা।’
অরবিন্দ যথার্থই বলেছেন যে জাতিকে বঙ্কিমচন্দ্র মাতৃমূর্তি দান করেছেন। বঙ্কিম প্রতিভার সর্বশ্রেষ্ঠ দানই হল দেশমাতৃকার মূর্তি।
ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের একটি বাক্যই যথেষ্ট :
‘রাজমোহনস ওয়াইফ-এর সৃষ্টিকর্তা অন্তিমে একেবারে স্বদেশি হইয়া গিয়াছেন।’
বঙ্কিম মাতৃভূমি স্বদেশজননীকে এমনভাবে দেশবাসীর মানস নেত্রে স্বর্গীয় মাতৃত্বে, শক্তিতে, বাৎসল্যে, সৌন্দর্যে প্রতিষ্ঠিত করলেন যে পরাধীন জাতি শৃঙ্খলিতা জননীকে উদ্ধারের জন্য প্রাণ বিসর্জনের তাগিদ অনুভব করে।
তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।
‘সকল ধর্মের ওপর স্বদেশপ্রীতি, ইহা বিস্মৃত হইও না।’
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠ-এর মধ্য দিয়ে জাতিকে মাতৃভক্তিতে দীক্ষা দিয়েছেন।
‘আমার মনস্কাম কী সিদ্ধ হইবে না?’
‘এইরূপ তিনবার সেই অন্ধকার সমুদ্র আলোড়িত হইল।
তখন উত্তর হইল, ‘তোমার পণ কী?’
প্রত্যুত্তরে বলিল, ‘পণ আমার জীবনসর্বস্ব।’
প্রতিশব্দ হইল, ‘জীবন তুচ্ছ সকলেই ত্যাগ করিতে পারে।
‘আর কী আছে? আর কী দিব?’
তখন উত্তর হইল, ‘ভক্তি’।
ভক্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত না হলে শক্তির বিকাশ ও বৃদ্ধি ঘটে না।
বঙ্কিমচন্দ্রের মাতৃবন্দনা জাতির মন্ত্র। ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের সঙ্গে কেবলমাত্র ফরাসি জাতীয় সংগীত ‘মার্সেলজ’ তুলনীয়। মৃন্ময়ী দেশজননীকে চিন্ময়ী জননীরূপে পূজা করার মন্ত্র ‘বন্দে মাতরম।’
আদ্যাশক্তিকে স্বদেশের আধারে প্রতিষ্ঠিত করে উপাসনা করাই ‘বন্দে মাতরম’ এর মূল বীজ।
বঙ্কিমচন্দ্রের কল্পনায় যা ছিল প্রতিভাত, স্বামী বিবেকানন্দ সেই দেশজননীকে আরাধ্য দেবীতে পরিণত করলেন। দেশবাসীকে বললেন ঃ ‘ভুলি না, তুমি জন্ম হইতে মায়ের জন্য বলি প্রদত্ত’ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ঐতিহাসিক আহ্বান ঃ আগামী পঞ্চাশ বৎসর স্বদেশ জননীই তোমাদের একমাত্র উপাস্য দেবীতে পরিণত হোন।
শোনা যায়, বঙ্কিমচন্দ্র ভবিষ্যদবাণী করেছিলেন যে ‘আমার মৃত্যুর পর এই গানে (বন্দে মাতরম) দেশ মেতে উঠবে।’ জাতীয়তা ও দেশপ্রেমের ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ভবিষ্যদবাণী এবং ‘Patriot-Prophet’ স্বামী বিবেকানন্দের আহ্বানে জাতি নব জন্মলাভ করল।
জাতীয় মুক্তি আন্দোলন ‘বন্দে মাতরম’ এবং স্বদেশজননীকে একসূত্রে বেঁধে দেয়।
‘বন্দে মাতরম’ নতুন নামধবনিতে পরিণত হল।
জাতির জীবনে নতুন গতি সঞ্চার হল। মাতৃ উদ্ধারে ব্রতী সন্তান দলের কণ্ঠে উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম’ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামে রণধবনিতে পরিণত হল।
রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ (নিজ সুরে) অন্য গায়কদের সঙ্গে সমবেতভাবে প্রথম গীত হয় ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা কংগ্রেসে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সার্বজনীনতা লাভ করে।
স্বাধীনতা সংগ্রামী, ঐতিহাসিক, সমাজবিজ্ঞানী প্রভৃতি সকলেই স্বীকার করেন যে ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪-১৫ এপ্রিল একদা ‘Oxford of Bengal’ নামে খ্যাত বরিশাল শহরে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রটি দেশপ্রেমিকদের, মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।
বরিশাল শহর পদ্মার পূর্বতন খাত আড়িয়াল খাঁর শাখা কীর্তনখোলা নদীর তীরে অবস্থিত।
বরিশালের মুকুটহীন রাজা মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তের নেতৃত্বে বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের সময় স্বাদেশিকতার যে অগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছিল, লন্ডনের টাইমস পত্রিকা তাঁর মৃত্যুর পর ২৭ নভেম্বর, ১৯২৩ লিখেছিল :
No where in the new provincial area did the flames of anger rise higher than at Barisal under his leadership. Lord Morley then at the India office found it most distasteful to sanction in December, 1908, the application to this scholarly man of the Regulation of 1818, authorising deportation without trial, for reasons of state.
অশ্বিনীকুমারের প্রভাব প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক ড. সুরেন্দ্রনাথ সেনের মন্তব্যটি তাৎপর্যমণ্ডিত :
তখন সমগ্র বরিশাল এক নেতার অঙ্গুলি হেলনে পরিচালিত হইত। একটি কল টিপিয়া দিলে যেমন হাজার হাজার বিজলি বাতি জ্বলিয়া উঠে, তেমন লক্ষ লক্ষ লোকের ইচ্ছা নিয়ন্ত্রিত হইত অশ্বিনীকুমারের ইচ্ছা দ্বারা।
১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে মৈমনসিংহ শহরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সমিতির অধিবেশনে বাখরগঞ্জ জিলার, অধিবাসীদের পক্ষ থেকে বাগ্মী সুরেন্দ্রনাথ সেন পরবর্তী অধিবেশনের জন্য আমন্ত্রণ জানান। আমন্ত্রণ সাদরে গৃহীত হয়।
অশ্বিনীকুমার কংগ্রেস অধিবেশনকে ‘তিনদিনের তামাশা’ বলতেন। বরিশাল সম্মেলনকে তিনি কোনো মতেই ‘দাদনের তামাশা’য় পরিণত হতে দিবেন না।
বরিশালের গ্রামে, গঞ্জে, হাটে, বাজারে, মেলায়, ধর্মীয় উৎসবে—কর্মীরা ছড়িয়ে পড়ে। ‘বন্দে মাতরম তলা’ স্থাপিত হল গ্রামে গ্রামে। স্বাদেশিকতার বার্তা, বঙ্গভঙ্গের বিপদ, বাঙালির ঐক্য ও সংহতি বিধান প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা সভা পরিচালিত হয়।
সরকার ছাত্রসমাজকে নিবৃত্ত করার জন্য নানাবিধ সার্কুলার জারি করলে অশ্বিনীকুমার দৃঢ়ভাবে জানান :
কলেজের ছাত্রগণ স্বেচ্ছাসেবকের কার্য করিলে আমার কলেজের যদি কোনো অনিষ্ট হয়, এমন কী কলেজ যদি উঠিয়াও যায়, আমি তাহাতে বিন্দুমাত্র দুঃখিত হইব না।
১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের ১৪-১৫ এপ্রিল বাংলা ১৩১৩, ১লা ও ২রা বৈশাখ কীর্তনখোলা নদীর তীরে বরিশাল শহরে বঙ্গীয় প্রাদেশিক সমিতির অধিবেশন হয়। বাংলার বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিধিগণ বরিশালে উপস্থিত হন।
পূর্ববঙ্গ ও আসামের শাসনকর্তা ফুলার সাহেব নির্দেশ জারি করলেন যে প্রকাশ্যে কেউ ‘বন্দে- মাতরম’ ধবনি দিতে পারবে না।
জেলাশাসক ইমারসন সাহেব অভ্যর্থনা সমিতির কাছ থেকে প্রতিশ্রুতি আদায় করেন যে নদীর তীর থেকে প্রতিনিধিদের নিয়ে যাবার সময় রাজপথে শোভাযাত্রা ও ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করা যাবে না। একান্ত ক্ষোভে ও দুঃখে এই শর্ত মানা হয়। মূল সম্মেলনে, যাতে বিঘ্ন না হয়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা।
১৩ এপ্রিল রাতে নারায়ণগঞ্জ ও খুলনা মেলে ব্যারিস্টার রসুল (সস্ত্রীক), সুরেন্দ্রনাথ মতিলাল, ভূপেন্দ্রনাথ, কৃষ্ণকুমার মিত্র নেতা ও Anti-circular সমিতির সদস্যগণ ও বহু শত প্রতিনিধি উপস্থিত হন। স্টিমারের মধ্যে প্রতিনিধিগণ’ ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিতে কীর্তনখোলার তরঙ্গকে আলোড়িত করেন।
তীরে অবতরণ করেও তাঁরা মাতৃমন্ত্র উচ্চারণ করতে চান। অশ্বিনীকুমার ও সুরেন্দ্রনাথের অনুরোধে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি উচ্চারণ থেকে প্রতিনিধিগণ বিরত হন।
কৃষ্ণকুমার মিত্র এবং Anti-circular সমিতির সদস্যগণ বেদনার্ত হৃদয়ে বি. এম. কলেজের রজনীকান্ত গুহ মহাশয়ের গৃহে গমন করেন। অভ্যর্থনা সমিতির আতিথেয়তা গ্রহণ করেননি। ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিতে না পারায় অনেকেই ক্রন্দন করে রাত কাটান।
রাজা সাহেবের হাবেলিতে বিরাট সভা হয়। সেখানে সভাপতি রসুল সাহেব এবং উপস্থিত প্রতিনিধিদের অভিনন্দিত করা হয়। প্রায় দশ মিনিট ধরে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র ধবনিত ও প্রতিধবনিত হয়।
কৃষ্ণকুমার মিত্র এবং Anti-circular সমিতির সদস্যগণের মত হল :
রাজপথে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি নিষেধমূলক আদেশ বেআইনি। অন্যায় আদেশ প্রতিপালন করা অন্যায়। রাজপথে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিতেই হবে।
অশ্বিনীকুমার জানালেন :
আমরা স্টিমারঘাটে ও শোভাযাত্রার অঙ্গীকার মতো ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিইনি। প্রতিনিধিগণ যদি রাজপথে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেন বরিশালবাসী সানন্দে তাতে অংশগ্রহণ করবে।
পুলিশ যুদ্ধ ঘোষণা করল। প্রস্তাব পাঠালেন—শোভাযাত্রা করুন। কিন্তু রাজপথে যেন ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করা না হয়। নেতৃবর্গ রাজি হলেন না।
আবার সংশোধিত প্রস্তাব এল : রাজা বাহাদুরের হাবেলি থেকে বি. এম. কলেজ পর্যন্ত নীরবে গমন করুন। তারপর ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিন।
বেলা তখন দুটো Anti-circular সমিতির ১৫/১৬জন সদস্য রাজা বাহাদুরের হাবেলিতে প্রবেশ করেছিলেন। পুলিশ সাহেব মি. কেম্প তাদের গতিরোধ করেন এবং লাঠি দিয়ে সমিতির সহকারী সম্পাদক ফণীভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে আঘাত করেন। ফণীবাবুর আঙুল আঘাতে রক্তাক্ত হয়।
শোভাযাত্রা করে সভাপতির রসুল, শ্রীমতী রসুল, আবদুল হালিম গজনভি, সুরেন্দ্রনাথ, বিপিনচন্দ্র, মতিলাল, ব্রহ্মবান্ধব, কাব্যবিশারদ, ভূপেন্দ্রনাথ, হীরেন্দ্রনাথ, অশ্বিনীকুমার সহ বঙ্গমাতার কৃতী সন্তানগণ সভামণ্ডপের দিকে অগ্রসর হলেন।
Anti-circular সমিতির সদস্যগণ রাজপথে আসার সাথে সাথে অশ্বারোহী সহকারী পুলিশ সুপার হেইনস তাদের ওপর অশ্ব চালিয়ে দেন। পুলিশ সুপার কেম্প তাদের বাধা দেন। শচীন্দ্র প্রসাদ বসুর বুক থেকে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রাঙ্কিত উত্তরীয় কেড়ে নেন। শচীন্দ্রকে ঘুষি মারেন। সুবেদার বাবুরাম সিং এর নেতৃত্বে বিশাল পুলিশ বাহিনী দেশভক্ত যুবকদের ওপর নির্মমভাবে লাঠি চালনা করেন। যুবকদের রক্তে বরিশালের রাজপথ সিক্ত হল।
যুবকগণ কেউই পালিয়ে যান নি। মার খেতে খেতে তাঁদের কণ্ঠে ভীমনাদে ধবনিত হল—’বন্দে মাতরম’। বরিশালের রাজপথে তখন ‘বন্দেমাতরম’ নামের সংকীর্তন। আহত, রক্তাপ্লুত, তবুও কণ্ঠে মাতৃনাম—’বন্দে মাতরম’। মনোরঞ্জন গুহ ঠাকুরতার পুত্র চিত্ররঞ্জনকে পুলিশ নির্মমভাবে প্রহার করতে করতে রাস্তার ধারে পুকুরের মধ্যে ফেলে দেয়। চিত্তরঞ্জন পুকুরের জলে দণ্ডায়মান। নিস্তার নেই। সেখানেও পুলিশের লাঠি অবিরাম তাকে আঘাত করে চলেছে। চিত্তরঞ্জন প্রতিটি আঘাতের উত্তরে উচ্চকণ্ঠে ধবনি দিলেন—’বন্দে মাতরম’।
পরে চিত্তরঞ্জন তাঁর পিতাকে বলেছিলেন, ‘বাবা পুলিশ যতবার আমাকে প্রহার করেছে, আমি ততবারই ‘বন্দে মাতরম’ বলেছি।’
চিত্তরঞ্জনের প্রহারে আতঙ্কিত প্রতিনিধিগণ হাবেলির বাইরে আসার চেষ্টা করার সাথে সাথে হেইনস সাহেবের অশ্ব প্রতিনিধিদের ওপর দিয়ে চলতে থাকে। পুলিশের লাঠিতে নহবতের লণ্ঠন চূর্ণ হয়।
কৃষ্ণকুমার মিত্র, রজনী গুহ, বেচারাম লাহিড়ী—সকলকেই পুলিশ প্রহার করে। প্রহারে বেচারাম বাবু অজ্ঞান হয়ে যান।
পুলিশ প্রহারের প্রতিবাদ করায় কেম্প সাহেব সুরেন্দ্রনাথকে গ্রেপ্তার করেন।
ভূপেন্দ্রনাথ, মতিলাল ও অশ্বিনীকুমার প্রতিবাদ জানালেন। তাঁদেরও গ্রেপ্তার করতে বললেন। কেম্প সাহেব সুরেন্দ্রনাথকে ম্যাজিস্ট্রেটের বাড়ি নিয়ে গেলেন।
সভ্য ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট ইমারসনের ঘরে অশ্মিনীকুমার ও বিহারীলাল রায়কে ত্রু�দ্ধ স্বরে বললেন, ‘বেড়িয়ে যাও। তোমাদের মাথায় টুপি নেই।’ অশ্বিনীকুমার জানালেন—তিনি জাতীয় পোশাক পরিধান করেন। গৈরিক উত্তরীয়ে আবৃত কাব্যবিশারদকেও লাঞ্ছনা করা হয়।
বিচারে সুরেন্দ্রনাথের দুশ টাকা জরিমানা হল। ম্যাজিস্ট্রেট সুরেন্দ্রনাথকে বললেন: This is disgraceful’. সুরেন্দ্রনাথ বললেন—, ‘I protest against such a remark, a remark of this ought not to come from the Court.’ ইমারসন গর্জন করে বললেন, ‘Keep quiet, this is contempt of Court, I draw up contempt proceedings against you’.
সুরেন্দ্রনাথ বললেন : ‘I have done nothing. Do just as you please’.
আবার দু’শ টাকা জরিমানা।
হঠাৎ চতুর ইমারসন বললেন, ‘I give you an opportunity to apologise.’
সুরেন্দ্রনাথ দৃঢ়ভাবে জানালেন, ‘I respectfully decline to apologise. I have done nothing wrong.’
বিচার প্রহসন শেষ। সুরেন্দ্রনাথ জরিমানা দিলেন। তবে তিনি ছাড়বার পাত্র নন। অন্যায় বিচারের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেন। আপিলে সুরেন্দ্রনাথের জয় হয়। জরিমানার টাকা ফেরত দেওয়া হয়।
এদিকে পুলিশের হাতে নির্মমভাবে প্রহৃত প্রতিনিধিগণ বীরদর্পে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিতে দিতে সভা মণ্ডপে উপস্থিত হন।
১৩১৩ খ্রিস্টাব্দে শুভ নববর্ষে কীর্তনখোলার তীরে অবস্থিত বরিশাল শহর ‘বন্দে মাতরম’ সংকীর্তনে ভারতের মুক্তিতীর্থে পরিণত হল। বরিশাল ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের ‘পুণ্যে সুবিশাল’ হল।
দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে গৈরিক বস্ত্র পরিহিত নগ্নপদ ব্রহ্মবান্ধবকে বরিশাল ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র দিয়ে স্বাগত জানাল।
সভার শুরুতে ‘বন্দে মাতরম’ গীত হল। কাব্য বিশারদের সময়োচিত রচিত সংগীত প্রতিনিধিদের উজ্জীবিত করে :
মাগো যায় যেন জীবন চলে
শুধু জগৎ মাঝে তোমার কাজে
বন্দেমাতরম বলে।
আমার যায় যেন জীবন চলে।
……………………………………….
আমায় বেত মেরে কি মা ভুলাবে
আমি কি মার সেই ছেলে?
দেখে রক্তারক্তি বাড়বে শক্তি,
কে পালাবে মা ফেলে?
আমার যায় যাবে জীবন চলে।
আমি ধন্য হব মায়ের জন্য
লাঞ্ছনাদি সহিলে।
ওদের বেত্রাঘাতে কারাগারে
ফাঁসিকাঠে ঝুলিলে।
আমার যায় যাবে জীবন চলে।
……………………….. ।
অশ্বিনীকুমার প্রস্তাব করেন—যেখানে পুলিশের লাঠির আঘাতে দেশভক্ত যুবকদের রক্তপাত ঘটেছে, এবং নেতা সুরেন্দ্রনাথ গ্রেপ্তার বরণ করেছেন, সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হোক। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। সভাস্থলেই নানা রকম দান আসতে থাকে। নরোত্তমপুর নিবাসী তারাপ্রসন্ন বসুর সহধর্মিণী তাঁর হাতের সোনার বালা অশ্বিনীকুমারের হাতে পাঠিয়ে জানান যে যতদিন না রাজপথে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি অবাধে দেওয়া যাবে, ততদিন তিনি সোনার বালা পরবেন না।
কেম্প সাহেব হঠাৎ অধিবেশন মণ্ডপে এসে জানান যে সভাভঙ্গের পর রাজপথে কেউ ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিতে পারবেন না।
সভায় উত্তেজনার মধ্যে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেওয়া হয়। কৃষ্ণকুমার মিত্র এবং বি. সি. চ্যাটার্জী জানালেন যে পুলিশ গুলি করে সভা ভণ্ডুল না করলে তাঁরা সভা ত্যাগ করবেন না।
বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ নেতারা একে একে সভা ত্যাগ করলেন। মাতৃমন্ত্রের বিনিময়ে অধিবেশন নয়।
বরিশাল সম্মেলন যেন যজ্ঞ। যজ্ঞ ভঙ্গ হল। কিন্তু আগুন নিবল কী? প্রবল বেগে কীর্তনখোলা তীরের ‘বন্দে মাতরম’ সংকীর্তন থেকে স্বদেশপ্রেমের আগুন জ্বলে উঠল। সে আগুন ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র বাংলায় এবং বাংলা থেকে সমগ্র ভারতে।
বিপ্লবের অগ্নি প্রজ্বলিত হল। দিকে দিকে মৃত্যুপাগল ভারত সন্তানগণ ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র কণ্ঠে নিয়ে উল্কার বেগে ছুটতে লাগলেন। হৃদয়ে ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র ও স্বামী বিবেকানন্দের স্বপ্নের স্বদেশজননীর চিন্ময়ী মূর্তি। ভারত বিপ্লবের আধ্যাত্মিক নেতা সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের পথ ধরে, ঋষি বঙ্কিমের বাণী নিয়ে, মাতৃভূমি উদ্ধারের জন্য ভক্তিসহযোগে আত্মবলিদানের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে যুবক বাংলা কীর্তনখোলার তীরে ‘বন্দে মাতরম’ সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে।
অরবিন্দ ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ১৬ এপ্রিল Bandemataram পত্রিকায় লিখলেন :
It was thirty two years ago that Bankim wrote his great song and few listened. But in a sudden moment of awakening from long delusions the people of Bengal………sang Bandemataram. The mantra had been given and in a single day a whole people had been converted to the religion of patriotism. Once that vision has come to a people, there can be no rest, no peace, no further slumber till the temple has been ready, the image installed, and the sacricfice offered. A great nation which has had that vision can never again bend its neck in subjection to the yoke of conqueror.
