‘বন্দে মাতরম’ ও ব্রজেন্দ্রকুমার দে – তরুণকুমার দে

বন্দে মাতরম ও ব্রজেন্দ্রকুমার দে (১)

তরুণকুমার দে

একশো বছরেরও বেশি আগে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আনন্দমঠ উপন্যাসে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত বা স্তোত্রটি ব্যবহার করেছিলেন। পরবর্তীকালে ওই শব্দযুগল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্লোগান হয়ে উঠেছিল—অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে কংগ্রেসের অধিবেশনে ওই গানটি জাতীয় সংগীতরূপে গীত হয়েছিল। সেই সূত্রে গানটি সম্প্রতি শতবর্ষ অতিক্রম করেছে। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ ও আনন্দমঠ প্রসঙ্গে নানা বিতর্ক উঠেছে। কেউ বলেছেন, উপন্যাসটি সংগ্রামের প্রতীক, কেউ বলেছেন তা নয়। একই সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’-কে কেউ জাতীয় গানের যোগ্য বলে মনে করেননি, কেউ বা জোর গলায় তাকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন।

এই বিতর্কের কালে দাঁড়িয়ে বর্তমান প্রবন্ধে যাত্রাপালায় ‘বন্দে মাতরম’-এর ব্যবহার নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। যতদূর জানা যায়, চারণ সম্রাট মুকুন্দ দাস তাঁর পালায় মাঝে মাঝে যে Extempore বক্তৃতা দিতেন, তাতে তিনি ‘বন্দে মাতরম’ ব্যবহার করেছিলেন, গেয়েছিলেন।

চারণ সম্রাটের স্বদেশি যাত্রার প্রভাবে পেশাদার যাত্রায় ওই যুগে মাঝে মাঝে দেশাত্মবোধক যাত্রাপালা পরিবেশিত হয়েছিল (অঘোর কাব্যতীর্থের শান্তি, কুঞ্জবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়ের মাতৃপূজা, হরিপদ চট্টোপাধ্যায়ের রণজিতের জীবনযজ্ঞ, ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদের মুক্তি, ভোলানাথ কাব্যশাস্ত্রীর জরাসন্ধ প্রভৃতি)। কিন্তু ওই পালাগুলোর কোনোটাতেই ‘বন্দে মাতরম’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল কিনা বলতে পারছি না। তবে মুকুন্দ দাসের ধারায় স্বদেশি যাত্রার অনেকগুলি পালা বিনয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় ও ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ লিখেছিলেন। বিনয়কৃষ্ণের বন্দে মাতরম নামে একটি স্বদেশি যাত্রার পালাও ছিল। সেটি প্রাক স্বাধীনতা যুগেরই প্রকাশনা ছিল।

বর্তমান প্রবন্ধে ব্রজেন্দ্রকুমার দের পালায় প্রাক ও উত্তর স্বাধীনতা যুগে ‘বন্দে মাতরম’ শব্দযুগল ও গানটির ব্যবহার প্রসঙ্গে আলোচনা করা হবে। ব্রজেন্দ্রকুমারের কাছে ‘বন্দে মাতরম’ শব্দযুগল সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবর্তিত দ্যোতনা বহন করেছে কিনা, তাও এই প্রবন্ধে আলোচিত হবে। ব্রজেন্দ্রকুমারের গুরুস্থানীয় মুকুন্দ দাসের পালায় ‘বন্দে মাতরম’-এর ব্যবহার স্বাভাবিকভাবেই প্রাককথনে তুলে ধরা হবে।

চারণ কবি

চারণ কবির একটি বিখ্যাত গান ছিল :

বন্দেমাতরম বলে নাচরে সকলে

কৃপাণ লইয়া হাতে।

দেখুক বিদেশি হাসুক উট্টাহাসি

কাঁপুক মেদিনী ভীম পদাঘাতে।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনের সময়ে চারণ কবি এই গান গেয়ে উদ্দীপ্ত করেছিলেন সাধারণ মানুষকে। মহাত্মা অশ্বিনী দত্ত বুঝেছিলেন—বিরাট এক শক্তি অবরুদ্ধ রয়েছে ওই দেহের মধ্যে। সেই শক্তিকে প্রকাশ করবার জন্য তিনি চারণ কবিকে স্বদেশি যাত্রার দল গঠন করতে বলেন। সেই জ্বলন্ত প্রদীপ থেকে লক্ষ লক্ষ প্রদীপ জ্বালিয়েছিলেন চারণ সম্রাট। ব্রজেন্দ্রকুমার দে লিখেছিলেন—’স্বদেশি যাত্রার দল গঠন করে ও নিজে সামাজিক বই অভিনয় করে স্বাদেশিকতার যে প্রাণবন্যা তিনি উভয় বঙ্গে বইয়ে দিয়ে গেছেন, দেশবাসী তা কোনোদিন ভুলবে না, আজ যারা যাত্রায় সস্তা রাজনীতি আমদানি করে মনে কচ্ছেন—বড়ো বিদ্যা করেছি জাহির, তাঁরা মুকুন্দ দাসের স্বদেশি যাত্রা শুনলে এ পথে পা মাড়াতেন না।’ (পালানাটকের পালাগান, দর্শক, ১৫-১১-১৯৮৭)।

ব্রিটিশের কারাগার (অথবা ব্রজেন্দ্র কুমারের ভাষায় ‘বিশ্রামাগার’) থেকে ফিরে এসে আবার চারণ সম্রাট স্বদেশি যাত্রা গাইতে শুরু করলেন। সেই সময়ে পল্লীসেবা পালায় তিনি একটি ৩৬ লাইনের গান বসিয়েছিলেন, যার প্রতি দুটি লাইনের পরে ‘বন্দে মাতরম’ ব্যবহৃত হয়েছিল।

হিন্দু পরিবারের ছেলে ছিলেন তিনি। বৈষ্ণব ও শাক্ত দুই সাধন পদ্ধতিই তাঁর মধ্যে মিশেছিল। ফলে তিনি দেশমাতাকে জননীরূপে দেখে যে সব গান লিখেছিলেন তার মধ্যে দেবী এসে গিয়েছিল। বিষ্ণু, হরি, কৃষ্ণ স্বাভাবিকভাবেই গানের রূপকে প্রতিফলিত হয়েছিল। যেমন—’মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে’, ‘ভারতের কর্ম রথের সারথী শ্রীভগবান’, ‘আমাদের জন্মভূমি, দেবতার লীলাভূমি,’ ‘আয় মা তারিণী করাল বদনী’, ‘মায়ের পূজার কর আয়োজন রক্তজবা বিল্ব চন্দন’, ‘তুই না জাগিলে শ্যামা’, ‘শব হয়ে শিব চরণে পড়িয়া’ ইত্যাদি। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, তিনি হিন্দু-ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর অনেক গানেই বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মিলনের কথা বলা হয়েছে:

১. ‘হিন্দু মুসলমান এক মায়ের ছেলে, তফাৎ কেন কর জী…’

২. ‘হিন্দু পার্শী জৈন সাঁই মুচী ডোম মেথর কসাই—

আমরা সকলেই এক মায়ের ছেলে এই মহামন্ত্র ভুলবো না।’

৩. ‘রাখিস রে রাখিস মনে, হিন্দু-মুসলমান ভাই দুজনে…’

তা ছাড়া আর একটি বিখ্যাত গান মনে করা যেতে পারে :

‘বান এসেছে মরা গাঙে খুলতে হবে নাও

তোমরা এখনও ঘুমাও!

কত যুগ গেছে কেটে দেখেছ কত স্বপন

এবার বদর বলে ধর বৈঠা জীবন-মরণ পণ।’

পূর্ববঙ্গে, বিশেষ করে, মুসলমান মাঝিরা নৌকা ছাড়বার সময়ে বদর পীরকে স্মরণ করত। এই প্রথা হিন্দু মাঝিদের মধ্যেও প্রচলিত ছিল। চারণ কবির জন্মস্থান ‘নদী হার মেঘলা’ পূর্ববাংলা। কাজেই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর গানে ‘বদর’ চলে এসেছিল, যেমন শ্যামা, কৃষ্ণ, শিব এসেছিল।

চারণ কবির অন্যান্য বহু গানেও ‘বন্দে মাতরম’-এর ব্যবহার লক্ষিত হয়। যেমন :

১. ‘বন্দে মাতরম বাদাম ছেড়ো না,

বিপক্ষ সম্মুখে হেরিয়া।’

২. ‘বন্দে মাতরম মন্ত্র কানে,

বর্ম এঁটে দেবে মনে।’

৩. ‘বল ভাই মেতে যাই বন্দে মাতরম…’

বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা। ‘পল্লীসেবা’ পালার চতুর্থ দৃশ্যে তিনি সেই শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন পল্লিসমিতির চালক নিত্যানন্দের বোন সুলভার সংলাপে, ‘তিনি বর্তমান ভারতের মন্ত্রগুরু।’ এই প্রসঙ্গে আনন্দমঠ ও দেবী চৌধুরানীর প্রসঙ্গও এসেছিল।

কৃষ্ণযাত্রা

ব্রজেন্দ্রকুমার দে এক সময়ে কৃষ্ণযাত্রার পালা রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন। কৃষ্ণযাত্রায় সাধারণত পৌরাণিক কাহিনির পালাই অভিনীত হত। নিমাই সন্ন্যাস জাতীয় পালাও কৃষ্ণযাত্রায় পরিবেশিত হত। কারণ নিমাইকে বিষ্ণু বা কৃষ্ণের অবতার রূপে বর্ণনা করে পৌরাণিক আবহাওয়াই সৃষ্টি করা হত। ব্রজেন্দ্রকুমার কৃষ্ণযাত্রার জন্য ঐতিহাসিক পালা লিখেছিলেন (চন্দ্রগুপ্ত, কেদার রায়, ঝাঁসির রানি ইত্যাদি)। সেই সঙ্গে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের কৃষ্ণযাত্রারূপও প্রদান করেছিলেন (আনন্দমঠ, দেবী চৌধুরাণী, চন্দ্রশেখর ইত্যাদি)। আনন্দমঠ পালাটিতে তিনি স্বরচিত কয়েকটি গানের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি সম্পূর্ণই ব্যবহার করেছিলেন। তবে তিনি এই পালায় বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস থেকেও কখনও সরে আসেননি।

আকালের দেশ

আকালের দেশ (রচনাকাল ১৯৪৩) পালাটি পঞ্চাশের মন্বন্তরের পটভূমিকায় রচিত। কিন্তু পালাটি শুধুমাত্র পঞ্চাশের মন্বন্তরের চিত্র বললে সম্পূর্ণই ভুল বলা হবে। বরং দুর্ভিক্ষজনিত সমস্যা ও দুর্ভিক্ষের কারণ উচ্ছেদের দিকেই ছিল পালাকারের ইঙ্গিত। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গেলে পালাকারের মঞ্চনাটক মহাযুদ্ধের বলি (রচনাকাল ১৯৪৩) এবং উজানীর চর (রচনাকাল ১৯৪৭)-কেও পাশাপাশি বিচার করতে হবে।

আকালের দেশ পালায় প্রথমেই দেখা গিয়েছিল চাষিরা দলে দলে অন্নাভাবে মারা যাচ্ছে। এমনকি, তাদের তৃষ্ণার জল পর্যন্ত ছিল না। অথচ রাজশক্তির গুদামে অপরিমেয় খাদ্যশস্য মজুত ছিল। এই সময়ে পরবর্তী মরসুমের ফসলে যখন মাঠ সবুজ হয়ে উঠেছিল, তখন রাজপ্রতিনিধি সুকণ্ঠ (নামটি স্মরণীয়) তার ময়ূরপঙ্খী বজরার ভাসবার পথ সুগম করবার জন্য নদীতীরে দেওয়া বাঁধ কেটে দিয়েছিল। আশার ফসল নষ্ট হয়ে যায় দেখে চাষিরা ক্ষিপ্ত হয়ে সুকণ্ঠের ওপর চড়াও হয়েছিল, সুকণ্ঠ গুরুতর আহত হয়েছিল। তবে চাষিদের নেতৃস্থানীয় জনার্দনের চেষ্টায় সুকণ্ঠ বেঁচে গিয়েছিল। আহত সুকণ্ঠকে শুশ্রুষা করেছিল জনার্দনের স্ত্রী লক্ষ্মী। সুকণ্ঠ সুস্থ হয়ে উঠে তাকেই অসম্মান করেছিল এবং নিজের অনুচর দিয়ে অপহরণ করেছিল। লক্ষ্মী ছিল জনার্দনের উপদেষ্টা এবং সহকর্মিণী। লক্ষ্মীর পরামর্শে জনার্দন চাষিদের নিয়ে রাজশক্তির বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেছিল। পাশাপাশি কিছু চাষি সশস্ত্র বিদ্রোহও করেছিল। রাজশক্তির পতন ঘটেছিল। তখন লক্ষ্মীর নির্দেশে সুকণ্ঠ প্রজাদের প্রতিনিধিরূপে কাজ করতে থাকে। কারণ নানা ঘটনার মাধ্যমে সুকণ্ঠের চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটেছিল। ওই সময়েই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি ব্যবহৃত হয়েছিল :

‘জনার্দন : বিদায় রাজপ্রতিনিধি। বন্দে মাতরম।

সুকণ্ঠ : সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্যশ্যামলাং মাতরম।

সকলে : বন্দে মাতরম।’

উজানীর চর

স্বাধীনতালাভের প্রায় একশো দিন আগে পালাকার লিখেছিলেন ক্ষুদ্র নাটিকা উজানীর চর। নিজের স্কুলের ছাত্রদের রবীন্দ্র জয়ন্তীতে অভিনয়ের উদ্দেশ্যেই লেখা হয়েছিল ওই নাটিকা। উজানীর চরের প্রথম দৃশ্যটিতে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির ব্যবহার দেখা যায়। দুর্ভিক্ষপীড়িত হিন্দু মুসলমান নরনারী দুর্ভিক্ষের কারণরূপে চিনে ফেলেছিল শাসকগোষ্ঠীকে। তারা শাসকের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলন করবার শপথ গ্রহণ করেছিল। সেই সময়ে দুটি ধবনি আন্দোলনকারীদের মুখে বসানো হয়েছিল : ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘আল্লা হো আকবর।’

মনে হয় সেই সময়ে জাতীয় কংগ্রেস দলের পাশাপাশি মুসলিম লিগও বিশেষ প্রাধান্য পেয়েছিল বলেই পালাকার ওই দুটি ধবনি ব্যবহার করে ব্রিটিশ বিতাড়নে দুটি দলেরই একত্র সংগ্রামের প্রস্তাব রেখেছিলেন। বস্তুত ছেচল্লিশের দাঙ্গার ভ্রাতৃহননের পরে এটাই সবচেয়ে বেশি কাম্য ছিল। পালাকার আলোচ্য দৃশ্যে একটু পরেই দেখিয়েছিলেন যে, হিন্দু (তথা কংগ্রেস) এবং মুসলমান (তথা মুসলিম লিগ)-দের সম্মিলিত আন্দোলন বানচাল করবার জন্য ব্রিটিশ গুলি চালাচ্ছে এবং সেই গুলিতে দুজন আন্দোলনকারী মারা যাচ্ছে—দুঃখীরাম ও হানিফ। হানিফ ‘বন্দে মাতরম’ বলতে বলতে মারা গিয়েছিল। পরে হানিফের ধরে থাকা পতাকা তুলে নিয়ে দুঃখীরাম ‘আল্লা হো আকবর’ এবং ‘বন্দে মাতরম’ বলতে বলতে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উজানীর চরের সপ্তম দৃশ্যের গোড়াতেই দাঙ্গাকারীদের ‘আল্লা হো আকবর’ এবং ‘কালী মায়িকি জয়’ ধবনি দিয়ে হত্যালীলায় মেতে উঠতে দেখা গিয়েছিল। অর্থাৎ তখন কংগ্রেস আসরে ছিল না, ছিল মুসলিম লিগ ও হিন্দু মহাসভার মত সাম্প্রদায়িক দলগুলি। উজানীর চরে দেখা গিয়েছিল ব্রিটিশ শাসকের চক্রান্তে বিভ্রান্ত হয়ে হিন্দু নেতা যোগেশ আর মুসলমান নেতা জামাল দাঙ্গায় মেতে ওঠে। কিন্তু তাদের ছেলে মহিম আর করিম দাঙ্গায় প্রাণ দিলে তাদের সম্বিৎ ফিরেছিল। মহিম আর করিমের মৃত্যুকালীন সংলাপ ছিল :

‘মহিম : আমার জীবনে লভিয়া জীবন জাগ রে সকল দেশ।

করিম : বন্দে মাতরম। আল্লা হো আকবর।’

অর্থাৎ আবার ওই দুটি ধবনি ফিরে এসে সাম্প্রদায়িক মৈত্রীকেই প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এখানে আর একটু পেছনে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। ভারতবর্ষে বিশেষ করে যে সম্প্রদায়টি সর্বাগ্রে পাশ্চাত্য শিক্ষা গ্রহণ করেছিল, সেটি হল হিন্দু। ব্রিটিশ শাসনের গোড়ার দিকে সে সময়ে ভারতের নানা দিকে মুসলমান নবাব বা নেতারা ব্রিটিশ সৈন্যের সঙ্গে লড়াই করেছিলেন, সেই সময়ে কিছু হিন্দু (তাদের মধ্যে বাঙালিরা ছিলেন অনেক) বিদেশি ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেছিল। নবাব ও দেশীয় রাজারা ব্রিটিশের উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও সৈন্যচালনা পদ্ধতির কাছে পরাভূত হবার পরে দেশবাসীর মুক্তির আকাঙক্ষা যাঁদের নেতৃত্বে স্ফূরিত হচ্ছিল, তাঁরা অধিকাংশই ছিলেন মনে-প্রাণে হিন্দু ধর্মের অনুরাগী। এঁরা বাইবেলধারী ব্রিটিশের বিপক্ষে গীতাকেই অবলম্বন করেছিলেন। ফলে প্রথম থেকেই কোরান-হাদিশের প্রেমিক মুসলমানরা এঁদের সঙ্গে মিশতে পারেননি। আবুল কালাম আজাদ, হুমায়ুন কবীর, বাদশা খাঁ, ফজলুল হক প্রভৃতি বিশিষ্ট নেতারা কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী অংশটির সঙ্গে মানিয়ে নিলেও, অনেক মুসলমানই মানসিক দিক থেকে আহত হয়ে হয় কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক শিথিল করেছিলেন অথবা কংগ্রেস ত্যাগ করেছিলেন। ‘বন্দে মাতরম’-কে গ্রহণের ক্ষেত্রে যে সমস্যাটি সবচেয়ে বেশি প্রকট হয়েছিল সেটি হচ্ছে তার দ্বিতীয়ার্ধ অর্থাৎ ‘ত্বং হি দুর্গা…’ ইত্যাদি অংশ। এই অংশে দেশমাতা আর মা দুর্গা একাকার হয়ে গেছে। মূর্তিপুজোর বিরোধী মুসলমানেরা অনেকেই এতে অভিমানাহত হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলমান বা অহিন্দু অন্য সম্প্রদায়ের অনেকেই কিন্তু তা সত্ত্বেও ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিকে জাগরণের প্রতীক বলে মনে করতেন। এখানে স্মরণীয় বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি। সেখানে ‘আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি আড়াল’ বলা হয়েছিল। ওই ক্ষেত্রে কিন্তু বিভ্রান্তির কোনো সুযোগ ছিল না। ভারতীয় হিন্দু-মুসলমান এবং ব্রিটিশ শাসক—সবাই বুঝেছিলেন কবি কী বলতে চেয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে পালাকারের বিদ্রোহী নজরুল পালার খান মইনুদ্দিনের একটি সংলাপ উদ্ধৃত করা যেতে পারে, ‘বিদ্রোহী কবিতা জাতির বন্দে মাতরম গান।’ অর্থাৎ সেকুলার বিদ্রোহী কবির অমর সৃষ্টিকে ‘বন্দে মাতরম’-এর সদৃশ বলে মনে করেছিলেন পালাকার, যদিও দুটির রচনাকালের মধ্যে ছিল বেশ কয়েক দশকের ব্যবধান এবং স্রষ্টাদের সামাজিক অবস্থানেও ছিল প্রচুর প্রভেদ। সম্ভবত পরাধীনতা ও দাসত্ব থেকে মুক্তিলাভের আকাঙক্ষা দুটি রচনাতেই নিহিত বলে পালাকার এ জাতীয় সংলাপ ব্যবহার করেছিলেন।

‘বন্দে মাতরম’ গানের শেষাংশ হিন্দুর দেবীকে নিয়ে আসবার জন্যই যত ঝামেলা। হিন্দু বঙ্কিমচন্দ্র নিজের সামাজিক অবস্থান অনুযায়ী দুর্গাকে ব্যবহার করেছিলেন দেশমাতার প্রতীকরূপে। এখানে তাঁর সাম্প্রদায়িক কোনো মনোভাব ছিল—এটা কখনোই মেনে নেওয়া যায় না। কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা সৃষ্টিকারী কিছু মুসলমান এই ত্রুটিটির পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করেছেন বা এখনও করছেন। ব্রজেন্দ্রকুমার দে সেই জন্যই বীরাঙ্গনা ভবশংকরী (পালা—বাঘিনী), লক্ষ্মীবাঈ’ (ঝাঁসির রানি), প্রীতিলতা (পালা—মৃত্যুঞ্জয় সূর্য সেন)-র পাশাপাশি নিয়ে এসেছিলেন সোফিয়া (রাজা দেবিদাস), সখিনা (ঝড়ের দোলা), চাঁদবিবি (পালা—চাঁদবিবি), রিজিয়া (পালা—সুলতানা রিজিয়া)-র মতো অনেক চরিত্র, যাঁদের একদল যেমন হিন্দু ছিলেন, অন্যদল ছিলেন মুসলমান। তাঁর পালার গানে ছিল, ‘চাঁদ-কেদারের দেশের মানুষ ঈশা খাঁর বংশধর..’ (ঝড়ের দোলা) জাতীয় লাইন। সোনাই দীঘির নিশাচর অত্যাচারে জর্জরিত হয়ে গেয়েছিল—’খোদা-ভগবান, ঘুমিয়ে নেই রাখছে হিসাব—সামাল কীর্তিমান।’ বাঙালি পালার কেন্দ্রীয় চরিত্র দায়ুদের মৃত্যুর সময়ে ফকির গেয়েছিলেন—’শিওরে তোমার দাঁড়ায়েছে ভাই খোদা যীশু পরমেশ।’

‘বন্দে মাতরম’-কে কেন্দ্র করে কিছুকাল হল দুই দল রাজনীতিবিদের মধ্যে বচসা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদল ‘বন্দে মাতরম’-এর স্রষ্টাকে সাম্প্রদায়িক বলে চিহ্নিত করে ‘বন্দে মাতরম’-কে বাতিল করার পক্ষে সওয়াল করছেন। অন্যদল তাঁদের বিরোধিতা করতে গিয়ে তাদের ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি অশ্রদ্ধার অভিযোগ তুলছেন। যাঁরা বঙ্কিমচন্দ্রকে আদ্যোপান্ত সাম্প্রদায়িক বলছেন, তাঁদের আচরণ প্রসঙ্গে অনীক পত্রিকার জুন, ১৯৭৯ সংখ্যার সম্পাদকীয় থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া যেতে পারে—’যদিও বামপন্থার ঝাণ্ডা উড়িয়ে এবার পঞ্চায়েত নির্বাচনে লড়াই করা হয়েছে তবুও প্রার্থী নির্বাচনের সময় আমাদের বামপন্থীরা কংগ্রেস বা অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল দলের মতোই হিন্দুপ্রধান অঞ্চলে হিন্দু বামপন্থী এবং মুসলিমপ্রধান অঞ্চলে মুসলমান বামপন্থী খুঁজে প্রার্থী নির্বাচিত করেছেন।… এটা তাঁরা করেছেন যে-কোনো মন্ত্রে নির্বাচনী বৈতরণী পেরোতে হবে এই সুবিধাবাদী রাজনীতি করার তাড়নায়’ (পৃষ্ঠা-৩)।

প্রতিদান

ব্রজেন্দ্রকুমার তাঁর নাটিকা প্রতিদানে (রচনাকাল ১৯৫৪) দ্বিতীয় গোষ্ঠীকে তুলে ধরে শ্লেষের আঘাতে জর্জরিত করেছিলেন। প্রতিদানের গোড়াতেই কংগ্রেসের জনসভা দেখানো হয়েছিল। নেতা নবকৃষ্ণের জ্বালাময়ী ভাষণের শেষ হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিতে। পরে সমবেত কর্মীরাও ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিয়েছিল। বত্তৃ�তায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বি সি এস-এ প্রথম স্থানাধিকারী অধীর মল্লিক নিয়োগপত্র ছিঁড়ে ফেলে কংগ্রেসের আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিল। উৎসাহিত কর্মীরা তখন আবার ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিয়েছিল। নেতা নবকৃষ্ণ ওই সভাতেই অধীরকে বলেছিল, ‘এ স্বার্থত্যাগ কখনও বৃথা যাবে না। দেশ যেদিন স্বাধীন হবে, এর প্রতিদান তুমি নিশ্চয়ই পাবে।’ এর পরে সে আবার ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণ করেছিল। সভা শেষ হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতে। অবশ্য ‘ত্বং হি দুর্গা’ অংশটি গীত হয়নি।

এর পরে অধীর কংগ্রেসের আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেছিল। নবকৃষ্ণ ও তার শিষ্য কমল এক সময়ে ট্রাম-বাস পোড়ানো এবং ব্রিটিশ মহিলাদের খুন করায় মেতে ওঠে। তারা না জানিয়ে অধীরের হাতে একটি বোমাভর্তি ব্যাগ রেখে যায়। অধীর পুলিশের কাছে ধরা পড়ে, প্রহৃত হয় এবং তার জেল হয়।

দেশ স্বাধীন হয় ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্য দিয়ে। অধীর চাকরি না নেবার ফলে তার পরিবারের কেউ অনাহারে মারা যায়, কেউ স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। দেনার দায়ে বাড়ি দখল হয়ে যায়। অধীরের ছোটো ভাই স্বাধীনতার প্রথম প্রভাতে ‘বন্দেমাতরম’ শুনে গান গায়, ‘স্বাধীনতা চাই নে শ্যামা, শুধু দুটি খেতে দে’ (তুলনীয় বিদ্রোহী কবির ‘ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত, একটু নুন…’)। অধীরের মেজভাই সুধীর পড়া ছেড়ে চানাচুর বিক্রি করে সংসার চালাত। স্বাধীনতার প্রথম দিনে ভল্টান্টিয়ার্সের শ্লোগান শুনে যে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। পরে তার জ্ঞান ফেরে কিন্তু মানসিক স্থৈর্য ফেরে না, সে পাগল হয়ে যায়।

স্বাধীনতার পরে অধীরের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয় না। সে একদিন নবকৃষ্ণের কাছে চাকরির দাবি জানালে নবকৃষ্ণের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। ক্ষিপ্ত অধীরের মুখে তখন এই সংলাপ ছিল :

অধীর : তুমি রোদের আঁচ না লাগিয়ে—সংঘের fund চুরি করে মাননীয় মন্ত্রী হয়ে বসবে কেন? কোন গুণে তুমি সরকারি অর্থে মোটর হাঁকিয়ে যাবে আর কাদা ছিটকে আসবে আমাদের গায়ে?…ইংরেজকে তাড়াবার জন্যে যারা রক্ত দিয়েছে,—তোমাদের মত দিশি শয়তানদের তারাই আজ কান ধরে নামিয়ে দেবে। দরকার হয়, তার জন্য আবার আমরা বুকের রক্ত ঢেলে দেব।

অতঃপর নবকৃষ্ণের হাতে অধীর খুন হয়ে যায়। বিচারে নবকৃষ্ণ বেকসুর খালাস পায়। ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্য দিয়ে তাকে জনতা বরণ করে নেয়।

প্রতিদান নাটকে ‘বন্দে মাতরম’-এর অপব্যবহারের দিকটিকেই ব্রজেন্দ্রকুমার তুলে ধরেছিলেন। বস্তুত ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি কংগ্রেস দলের কর্মীরা যেমন ব্যবহার করেছিলেন, তেমনি অনুশীলন, যুগান্তর প্রভৃতি বিপ্লবী দলের সদস্যরাও এটি প্রয়োগ করতেন। ১৯৪৭-এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে কংগ্রেসের হাতে শাসনভার চলে এসেছিল। সেই সুযোগে বেশ কিছু অসাধু ব্যক্তি প্রশাসনের নানা স্তরে উদ্দেশ্য সিদ্ধ করে নেওয়া শুরু করেছিল। সংবিধান রচিত হবার কালেই তেভাগা ও তেলেঙ্গানার আন্দোলন দমন, কম্যুনিস্ট দলকে নিষিদ্ধ করা, আজাদ হিন্দ ফৌজের সেনাদের প্রতি নানা নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখা প্রভৃতি নানা কাজের মাধ্যমে কংগ্রেস দল বহু মানুষের বিশ্বাস হারিয়েছিল। তখনও কংগ্রেস কর্মীরা খদ্দর পরতেন, ‘বন্দে মাতরম’ বলতেন এবং প্রকারান্তরে জানিয়ে দিতেন যে, ভারতের স্বাধীনতা তাঁরাই এনেছেন। সেই সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির অপব্যবহার লক্ষ্য করেছিলেন পালাকার। তাঁর সেই অভিজ্ঞতাই প্রতিদানে বর্ণিত হয়েছিল।

পালাকার ক্রমশই জাতীয় কংগ্রেসের প্রতি বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দের লোকসভা নির্বাচনে তাঁর বাসস্থান যে কেন্দ্রের অন্তর্গত ছিল সেই ব্যারাকপুর থেকে নির্বাচিত হয়েছিলেন অকংগ্রেসি প্রার্থী পঞ্চানন ভট্টাচার্য। তাঁর নির্বাচিত হবার পেছনে ওই অঞ্চলের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল। সেইসব বুদ্ধিজীবীদের অন্যতম ছিলেন ব্রজেন্দ্রকুমার। ব্রজেন্দ্রকুমার যে কতখানি বিরক্ত হয়েছিলেন, তার প্রমাণ অধীরের সংলাপেই পাওয়া যায়। সেখানে ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীদের ‘দিশি শয়তান’ বলেছিলেন তিনি অধীরের মুখ দিয়ে। খুনের অপরাধী আইনের ফাঁকে ছাড়া পেয়ে এসে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির দ্বারাই সংবর্ধিত হয়েছিল। পালাকার বোধহয় বলতে চেয়েছিলেন যে ব্রিটিশ রাজত্বে যে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিতে দিতে দেশপ্রেমিকেরা প্রাণ দিতেন, স্বাধীন ভারতে সেই ধবনি অসাধুদের শ্লোগানে পরিণত হয়েছিল ; ফলত স্বাধীন ভারতে যাদের জন্ম তাদের কাছে ‘বন্দে মাতরম’ কোনো মহান গুরুত্ব বহন করতে পারেনি।

স্বামীর ঘর

কিন্তু পালাকার যে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন, তার প্রমাণ রয়ে গেছে স্বাধীন ভারতে লেখা স্বামীর ঘর পালায়। পালার ভূমিকায় তিনি কংগ্রেসি শাসনকে ‘বুলেটরাজ’ আখ্যা দিয়েছিলেন। উৎসর্গপত্রে লিখেছিলেন, ‘ফাঁসীর মঞ্চে যাঁহারা জীবনের জয়গান গাহিয়া গিয়াছেন, যাঁহাদের সাধনার ফল আজ অপরে ভোগ করিয়া জনসাধারণের গায়ে খোসা ছুঁড়িয়া ফেলিতেছে, দেশের সেই শহীদগণের চরণ-স্মরণে স্বামীর ঘর উৎসর্গীকৃত হইল।’ অর্থাৎ তিনি বিশ্বাস করতেন যে, স্বাধীনতা এসেছিল বিপ্লবীদের (এঁদের মধ্যে আজাদ হিন্দ ফৌজের সৈনিকেরাও আছেন) আঘাতের জন্য। কংগ্রেস দল স্বাধীনতা ভোক্তা, কিন্তু আনয়নকারী নয়। ‘স্বামীর ঘর’ পালায় তিনি দেখিয়েছিলেন শাসকশক্তির বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে নিপীড়িত দরিদ্র শ্রমিক-কৃষকই জয়ী হয়েছিল। কিন্তু তিনি এটা মনে করেননি যে, কম্যুনিস্ট পার্টি ওই সংগ্রামের নেতৃত্ব দেবে। তখন কম্যুনিস্ট পার্টি ছিল খুবই ছোটো। তিনি সম্ভবত চেয়েছিলেন, সব দল ও মতের সৎ মানুষেরা একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করুক। তারা আবার ব্রিটিশ ভারতের মতোই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি সম্বল করেই একত্রিত হোক—এটাই ছিল তার কামনা। পালার বিপ্লবী নায়ক তার ছেলের হাতে তুলে দিয়েছিল খদ্দরের পোষাক আর কানে দিয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র। শাসকের বিরুদ্ধে সংগ্রামে এক নেত্রী বন্দনাকে দীক্ষাও সে দিয়েছিল একই ভাবে :

সত্যকাম।। প্রণাম করুন—সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং

শস্যশ্যামলাং মাতরম

বন্দনা।। বন্দে মাতরম।

এর ঠিক পরের দৃশ্যে সত্যকামের ছেলের মুখে সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ গানটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। মা-দিদিমা কারও তাড়নাতেই বিকর্ণ ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া আর খদ্দর পরা ছাড়েনি। সামান্য পরে রাজসৈন্য বিপ্লবীদের গ্রাম আক্রমণ করতে এলে তারা আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ বলতে বলতেই। যুদ্ধে বিকর্ণ এবং আর এক বিপ্লবী উদয়ন প্রাণ দিয়েছিল। দুজনেই মৃত্যুর মুহূর্তে ‘বন্দে মাতরম’ বলেছিল, যা প্রাক-স্বাধীনতা যুগে বিপ্লবীরা সবাই করতেন। পালার শেষে অত্যাচারী শাসক গোষ্ঠী পরাজিত হয়েছিল। বিপ্লবীরা বন্দনাকে শাসনভার দিয়েছিল। সে সময়েই পালার সমাপ্তি হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’-এরই মধ্য দিয়ে।

মৃত্যুঞ্জয় সূর্যসেন

‘বন্দে মাতরম’ ধবনির পাশাপাশি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধবনিও ব্রজেন্দ্রকুমার ব্যবহার করেছিলেন ‘মৃত্যুঞ্জয় সূর্যসেন’ পালায়। যে সভায় মাস্টারদার নেতৃত্বে চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা অস্ত্রাগার লুন্ঠনসহ অন্যান্য কাদের পরিকল্পনা করেছিলেন, সেখানে বিদ্রোহী কবির ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু…’ গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল। গানের শেষে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধবনি প্রযুক্ত হয়েছিল। ওই দৃশ্যে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিও পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়েছিল। অস্ত্রাগার লুন্ঠন, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ ধবংস করা, রেল লাইন অকেজো করে দেওয়া প্রভৃতি কাজের সময় বিপ্লবীরা ঘনঘন ‘বন্দে মাতরম’ বলেছিলেন, পালাতে এভাবেই দেখানো হয়েছিল। জেল-হাজতে থাকবার সময়েও বিপ্লবীরা ওই দুটি ধবনিই উচ্চারণ করেছেন—এমনই চিত্রিত হয়েছে। প্রীতিলতা ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করবার সময়েও ‘বন্দে মাতরম’ বলেছিলেন। মাস্টারদার ফাঁসির সময়ে ব্রজেন্দ্রকুমার একটি রূপকল্প এনেছিলেন। আন্দামানে বন্দী চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা সে সময়ে যেন মাস্টারদার কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ এবং ‘ইনকিলাব’ শুনছেন এবং তাঁর সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘জিন্দাবাদ’ উচ্চারণ করছেন। এ ছাড়া তাঁর মঞ্চনাটক মহাযুদ্ধের বলিতেও তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধবনি ব্যবহার করেছিলেন রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে প্রয়াসী বিপ্লবীদের কণ্ঠে।

ধরার দেবতা

গান্ধিজির জীবনের শেষ পর্ব নিয়ে ব্রজেন্দ্রকুমার লিখেছিলেন রূপক পালানাটক—ধরার দেবতা। সেই পালায় ‘বন্দে মাতরম’ বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। ব্রিটিশ আমলে বিংশ শতাব্দীতে ‘বন্দে মাতরম’ বলে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়া মানুষ কারাবরণ করত। ধরার দেবতার দ্বিতীয় দৃশ্যেই অসহযোগ আন্দোলনকারীদের ‘বন্দে মাতরম’ বলে প্রহৃত ও গ্রেফতার হতে দেখা গিয়েছিল। স্বাধীনতাও এসেছিল ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্য দিয়ে। কিন্তু পালাকার বহু ব্যবহৃত ‘বন্দে মাতরম’-র চেয়েও তীব্রতা দেখিয়েছিলেন ‘ভারত ছাড়ো’ ধবনির মধ্যে। পালার মধ্যে এটাও পালাকার দেখিয়েছিলেন যে, ভারত ছাড় আন্দোলনের তীব্রতা সহ্য করতে না পেরে ব্রিটিশ সরকার দাঙ্গার আশ্রয় নিয়েছিল। সেই দাঙ্গার সময়ে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি হারিয়ে গিয়েছিল। তার বদলে জয় মা দুর্গে, নারায়ণ জাগৃহি ইত্যাদি ধবনিত হচ্ছিল।

বাস্তবে যেটা ঘটেছিল, সেটা হচ্ছে কংগ্রেসে হিন্দুদের প্রাধান্য থাকবার জন্য কংগ্রেসের মধ্যে হিন্দুত্ব প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রতিফলিত হত। আর এর পরিণামে স্বাধীনতা সংগ্রামের একটা পর্যায়ে বহু মুসলমান স্বাধীনতা কর্মী কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করেছিলেন। ‘বন্দে মাতরম’ সে সময়ে তাঁদের কাছে আর গ্রহণযোগ্য ছিল না। সেই নিরিখে পরবর্তীকালের ‘ভারত ছাড়ো’, ‘জয় হিন্দ’ বা ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ধবনি হিন্দু-মুসলমান-শিখ-বৌদ্ধ সকলের কাছেই বেশি গ্রহণযোগ্য ছিল। ‘বন্দে মাতরম’ বলে আসফাউল্লার মতো অনেক মুসলমান বিপ্লবী প্রাণ দিলেও, অন্য শ্লোগানগুলি ছিল অনেক সেকুলার। আর এটা হয়েছিল ‘বন্দেমাতরম’ গানের শেষ দিকটির জন্য।

ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় তমলুকে কংগ্রেসের হিন্দু-মুসলমান ও কম্যুনিস্ট—সবাই একত্রে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। সাঁতারাতে ওই সময়ে যাঁরা স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তাদের মধ্যে হিন্দুত্ববাদীরাও ছিলেন। কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙক্ষাই সেখানে সবার ওপরে স্থান পেয়েছিল। ‘বন্দে মাতরম’ সেই কাজ করেনি তা নয়, যথেষ্টই করেছে। আনন্দমঠের সন্তানেরা ‘হরে মুরারে মধুকৈটভহারে’ বললেও তাদের সাংগঠনিক শক্তি, সংগ্রামে ব্রতী হওয়া এবং মৃত্যুবরণ করার কাহিনি যথেষ্ট উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। হিন্দু শুধু নয়, অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বহু সচেতন মানুষ বিদেশি শাসকের চিতারোহনে ওই ‘বন্দে মাতরম’-কেই শ্লোগানরূপে মেনে নিয়েছিলেন। ব্রজেন্দ্রকুমার এটাও যে বুঝেছিলেন, তার প্রমাণও রয়ে গেছে ধরার দেবতা পালার নন্দিনী চরিত্রে। নন্দিনী মা ছিলেন না, সেই ‘ত্বাং হি দুর্গা-র বদলে ছিলেন ‘মেয়ে’। তার মুখে গান ছিল, ‘পাগল ছেলে, যাস নে ফেলে বন্দিনী মায় অন্ধকারে।’ এই গানটির কোথাও অবশ্য তিনি দুর্গা বা লক্ষ্মীর বন্দনা করেননি। বরং লিখেছিলেন, ‘দুঃখনিশি হবে ভোর, ডাকছে পাখী উষার দ্বারে।’

মায়ের ডাক

ব্রজেন্দ্রকুমার শেষজীবনে বত্তৃ�তা জয়হিন্দ বলে শেষ করতেন। তাঁর মায়ের ডাক পালায় ‘জয়হিন্দ’-র ব্যবহার দেখা গেছে। ‘জয়হিন্দ’-এর স্রষ্টা নেতাজীকেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো সংগ্রামীরূপে চিহ্নিত করেছিলেন। কংগ্রেসের অহিংস আন্দোলনকে তিনি ‘লাঠি’ বলেছিলেন। সেই সঙ্গে আজাদ হিন্দ ফৌজের সংগ্রামকে চিহ্নিত করেছিলেন ‘গোলা’ রূপে। পালার দুটি স্থানে তিনি ‘বন্দেমাতরম’-এর পাশাপাশি ‘জয়হিন্দ’ বসিয়েছিলেন। প্রথমবার নেতাজীর মহানিষ্ক্রমণের সময়ে শরৎ বসু ও সুভাষ বসুর মুখে যথাক্রমে ‘বন্দে মাতরম’ ও জয়হিন্দ ব্যবহৃত হয়েছিল। পরে নেহেরুর মুখে এই দুটি শ্লোগানই বসিয়ে পালা শেষ করেছিলেন। মায়ের ডাক পালার শেষ দৃশ্যটি বিশেষ আলোচনার দাবি রাখে। সেখানে প্রচারিত হয়েছিল যে, নেতাজি প্রয়াত। কিন্তু তাঁর সংগ্রাম ভারতবাসীকে তীব্র আন্দোলনের পথে এগিয়ে দিয়েছে। সেই আন্দোলনের তীব্রতাই ব্রিটিশকে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করেছে—পালায় এই ছিল তাঁর বিশ্লেষণ। অর্থাৎ ব্রজেন্দ্রকুমার বিশ্বাস করতেন ‘বন্দে মাতরম’ তীব্র ব্রিটিশ বিরোধে সংপৃক্ত হলেও, ‘জয়হিন্দ’ ছিল তীব্রতর। কারণ পাকিস্তান প্রস্তাব ওঠবার সময়ে কংগ্রেসের বহু মুসলমান নেতা বিরক্ত হয়ে কংগ্রেস ছেড়ে দিয়েছিলেন। অন্যদিকে ‘জয়হিন্দ’ ধবনিকে সামনে রেখে নেতাজির নেতৃত্বে হিন্দু-মুসলমান-শিখ সায়গল-শাহনওয়াজ-ধিলোঁ স্বাধীনতা-যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন।

মায়ের ডাক পালার সূচনার দৃশ্যেই একটি গান দিয়েছিলেন পালাকার : ‘ও মা শ্যামা জননি!’ সেখানে দেশকেই ‘জননী’ বলা হয়েছিল। সেখানে এ-ও বলা হয়েছিল ‘আমার চোখে নাই ভগবান, শুধুই শ্যামা মা-টি।’ পালার শেষ দিকে আরও একটি গানের লাইন ছিল, ‘তোমার নামে হোক মা আমার এ জীবনের শেষ।’ এখানেও মা ছিল সেই দেশজননী। তাকে কোনো দেবীর সঙ্গে তুলনা করা হয়নি। ওই পালায় আজাদহিন্দ ফৌজের নারী বাহিনীর (ঝাঁসির রানি বাহিনী) সমবেত মার্চিং সঙেও ছিল ‘বন্দিনী মা-র মুক্তি লাগি মা-বোনেরা ওঠরে জাগি’। এখানেও দেবীর রূপকল্প ব্যবহৃত হয়নি। শ্যামা মা কালীর রূপকল্প বহন করেনি, ‘শষ্য শ্যামলাং মাতরম’-কে প্রকাশ করেছে।

রাজসন্ন্যাসী

‘বন্দে মাতরম’ স্তোত্রটি তাঁকে যে কতখানি প্রভাবিত করেছিল তার প্রমাণ রয়ে গেছে রাজসন্ন্যাসী পালার একটি সংলাপে। ভাওয়ালের সন্ন্যাসী রাজকুমার নিয়ে লেখা ওই পালায় স্মৃতিভ্রংশ অবস্থায় (মৃত বলে ঘোষিত) সেজকুমার দেশে ফিরে এসে বিহ্বল হয়ে পড়েছিল। দেশে এসে তার কাছে সবই চেনা মনে হচ্ছিল। একটি লিরিকপূর্ণ সংলাপের পরে একটি গান ছিল। তারপরেই আবার সে বলেছিল :

কে বা ওই কাঁদিছে করুণে?

আয় আয় আয় বলে

কে ও নারী করে আবাহন?

মনে হয়, ওই কোলে ছিল মোর

পরম আশ্রয়, ওই কোলে মাথা রাখি

অন্তিমে মুদ্রিত হবে আঁখি।

মাথা মোর নত হয়ে আসে,

প্রাণ চাহে করপুটে করিতে বন্দনা—

‘শুভ্র জ্যোৎস্ন-পুলকিত যামিনীং

ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদলশোভিনীং

সুহাসিনীং সুমধুর ভাষিণীং

সুখদাং বরদাং মাতরম।।

লক্ষণীয় ‘বন্দে মাতরম’ শব্দ দুটি ব্যবহার না করলেও পরের কয়েকটি লাইন ব্যবহার করা হয়েছে। তা ছাড়া দেশকে মায়ের রূপে ধরা হয়েছে। ‘ত্বং হি দুর্গা’ না পছন্দ হলেও দেশকে মা বলতে তো কোনো বাধা নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে সাম্যবাদী নেতাও তো ‘পিতৃভূমি’ রক্ষার জন্য দেশবাসীকে ডাক দিয়েছিলেন। Fatherland আর Mother Country শব্দ দুটি তো বহু বছর ধরেই পৃথিবীর মানুষের কাছে পরিচিত।

বাঙালি

‘বাঙালি’ ব্রজেন্দ্রকুমারের একটি অতি পরিচিত জনপ্রিয় পালা। বাঙালি পালার একটি দৃশ্যে ব্রজেন্দ্রকুমার সত্যপীর নামক চরিত্রের মধ্য দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রকাশ করেছিলেন। সত্যপীর হিন্দুমায়ের ছেলে, পরে মুসলমানের ঘরে প্রতিপালিত হয়েছিল। দুটি ধর্মের প্রতিই সে বিরক্ত হয়ে নতুন এক ধর্মমত প্রচারে উদ্যোগী হয়েছিল। নবাব দায়ূদ খাঁ তাকে সমস্ত ধর্ম ত্যাগ করে দেশসেবায় আত্মনিয়োগ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সময়ে দায়ুদ খাঁর সংলাপ অবশ্যই মনে পড়িয়ে দেয় ‘বন্দে মাতরম’ গানকে :

দায়ুদ।। তুমি হিন্দু বা মুসলমান হতে যেয়ো না। তুমি হবে মানুষ। তোমার দেবতাকে তুমি আরাধনা না করেই পেয়েছ।

সত্যপীর।। কে? কে সে দেবতা, যাকে চাওয়ার আগেই পাওয়া যায়?

দায়ুদ।। তোমার জন্মভূমি। এই সুজলা সুফলা বঙ্গজননী, তোমার সে আরাধনার ধন।

লক্ষণীয় এখানে দেশজননী বা মা রূপেই বর্ণিত হয়েছিল। কিন্তু তাকে দুর্গা বা হিন্দুর কোনো দেবীর সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়নি। এর পরে ফকিরের একটি গানও ছিল। সে গানেও ‘বাংলা মা’ বলা হয়েছিল। কিন্তু তাকে কারও সঙ্গে তুলনা করা হয়নি।

উপসংহার

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে ব্রজেন্দ্রকুমার ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন। গানটির যে প্রভাব স্বাধীনতা আন্দোলনে পড়েছিল, তাকে স্মরণ করেছিলেন, নিজের পালায় বারবার তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু গানটির শেষাংশের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও তিনি সচেতন ছিলেন। চেষ্টা করেছিলেন সেটিকে কাটিয়ে উঠতে। ধর্মকেন্দ্রিক জাতীয়তাবোধকে সরিয়ে রেখে ধর্মনিরপেক্ষ দেশাত্মরোধ প্রচার করেছিলেন তাঁর নানা পালায়। ‘বন্দে মাতরম’-এর পাশাপাশি ‘ভারত ছাড়ো,’ ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘জয়হিন্দ’ ধবনিগুলিকেও গুরুত্ব দিয়েছিলেন তাঁর নানা সৃষ্টিতে। একই সঙ্গে যুগের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বন্দে মাতরম’ গানের দ্বিতীয়াংশ বাদ দেবার প্রস্তাবও পরোক্ষে সমর্থন করেছিলেন। ‘বন্দে মাতরম’ শব্দযুগ্মের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে নিয়েছিলেন, কিন্তু এর কট্টর-বিরোধী বনে যাননি। আবার নিজের হিন্দু পটভূমি সত্ত্বেও হন এর যুক্তিহীন ভক্ত।

উল্লিখিত পালাগুলির রচনাকাল :

(পালায়িত) আনন্দমঠ—১৯৪৯, আকালের দেশ—১৯৪৩, উজানীর চর—১৯৪৭, প্রতিদান—১৯৫৫, স্বামীর ঘর—১৯৪৯, মৃত্যুঞ্জয় সূর্যসেন—১৯৬৯, ধরার দেবতা—১৯৪৮, মায়ের ডাক—১৯৪৫, রাজসন্ন্যাসী—১৯৪৭, বাঙালি—১৯৪৬।

তথ্যসূত্র ও নির্দেশিকা :

১. ব্রিটিশের রোষসিক্ত পালাগুলি কিন্তু ছাপা হয়নি, হারিয়ে গেছে। যেগুলি ছাপা হয়েছিল, তাতে কাঁচি চালানো হয়েছিল। ফলে মূল পাণ্ডুলিপিতে প্রকৃতপক্ষে কী ছিল জানা অসম্ভব।

২. সাধারণত শঠ ও অত্যাচারী শাসকেরা প্রকাশ্যে মধুরভাষী হন। সেটাই তাদের কৌশল। আকালের দেশের সুকণ্ঠ, রক্তের নেশার মধুকণ্ঠ নামের উৎস সেখানেই নিহিত ছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *