বন্দে মাতরম – জ্যোতিভূষণ চাকী

বন্দে মাতরম

জ্যোতিভূষণ চাকী

আমাদের জাতীয় জীবনে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি মন্ত্র-গানের মতোই। দেশকে মা বলে কল্পনার উৎস কী?—এই প্রশ্নের উত্তরে আমাদের অথর্ব বেদ-এ যেতে হবে যেখানে একটি মন্ত্রে আছে। মাতা ভূমিঃ পুত্রোঽহং পৃথিব্যাঃ।

অবশ্য বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর মাতৃমন্ত্রের জন্যে অথর্ব বেদ-এর এই সুক্তের কাছে ঋণী নাও হতে পারেন। এটা তাঁর অন্তর থেকে স্বতউৎসারিতও হতে পারে। ‘বন্দে মাতরম’ গানটি সংস্কৃত বাংলা মিশিয়ে লেখা। প্রথম যখন বঙ্কিমচন্দ্র এ-গানটি লেখেন তখন অনেকেই এই মিশ্রণ পছন্দ করেননি। তার মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্রের এক কন্যাও ছিলেন। পরে ঠিক কখন এই গানটি আনন্দমঠ উপন্যাসে স্থান পেয়েছিল তা নিয়েও মতান্তর আছে। তবে অধিকাংশ গবেষকেরই মত, ১৮৭২ থেকে ‘৭৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি তিনি রচনা করেন। প্রথমে বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। এ সম্বন্ধে যে কাহিনিটি প্রচলিত তা হল এই—বঙ্গদর্শন-এর এক পৃষ্ঠা ম্যাটার কম পড়ে যাওয়ায় তার তত্ত্বাবধায়ক বঙ্কিমের কাছে স্থানপূরণের জন্যে একটি লেখা চান। বঙ্কিমচন্দ্র তার কিছুক্ষণ আগেই এই গানটি টেবিলের ওপর রেখেছিলেন। তত্ত্বাবধায়ক মহাশয় লেখাটির দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করেই তা পড়ে ফেলেন এবং মন্তব্য করেন—এ লেখাটি দিব্যি চলবে। বঙ্কিমচন্দ্র লেখাটি নিয়ে ড্রয়ারে রাখেন এবং তাঁকে বলেন, এ লেখার মূল এখন বুঝবে না, একদিন এই গানটিই দেশকে মাতিয়ে তুলবে। বঙ্কিমচন্দ্র ঠিক এই ভাষাতেই কথাটি বলেছিলেন এমন নয়, তবে তার তাৎপর্য এই। এই কাহিনি আমাদের শুনিয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্রের অনুজ পূর্ণচন্দ্র। বঙ্কিম-গবেষক অমিত্রসূদন ভট্টাচার্য তাঁর একটি রচনায় বলেন, এক পৃষ্ঠা ম্যাটার কম পড়ে যাওয়ার কাহিনি ভিত্তিহীন। প্রতিটি সংখ্যা বিশ্লেষণে তিনি এই সিদ্ধান্ত করেন। অমিত্রসূদন আনন্দবাজার পত্রিকায় পরবর্তী লেখায় গুরুতর একটি প্রশ্ন তোলেন। ‘বন্দে মাতরম’ কী বঙ্কিমচন্দ্রেরই লেখা? (আ. বা. পত্রিকা ৭-১১-০৬)। ‘বন্দে মাতরম’ গানটির সংস্কৃতে লেখা প্রথম বারোটি চরণ উদ্ধৃতিচিহ্নবদ্ধ, বাকি ষোলোটি চরণ বাংলা-সংস্কৃত মিশ্রিত ভাষায় রচিত। অমিত্রসূদন এই উদ্ধৃতিচিহ্নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেই প্রশ্ন তুলেছিলেন, গানটি আদৌ বঙ্কিমচন্দ্রের স্বরচিত কী না। আনন্দবাজারে লেখা একটি চিঠিতে (অগ্রহায়ণ ৭, ১৪১৩) দীনেশচন্দ্র সিংহ উদ্ধৃতিচিহ্ন দেখেই যে স্বরচিত বলা যাবে না, এ মতের সমর্থনে বলেন, ‘উদ্ধৃতিচিহ্ন যদি স্বকীয় বা পরকীয় রচনা চেনার একমাত্র মাপকাঠি হয়, তা হলে অপরের রচিত আরও অনেক গান-কবিতা বঙ্কিম নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন বলা যায়। দুর্গেশনন্দিনী-তে গজপতি বিদ্যাদিগগজের গান, কপালকুণ্ডলায় শ্যামাসুন্দরীর কবিতা, মৃণালিনীতে গিরিজায়ার গান, বিষবৃক্ষে লম্পট দেবেন্দ্রের গান, সবই উদ্ধৃতিচিহ্নবদ্ধ। পত্রকার কৃষ্ণজীবন ভট্টাচার্য তাঁর চিঠিতে (৬ অগ্রহায়ণ) অধ্যাপক সব্যসাচী ভট্টাচার্যের মত উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে গানটির প্রথম অংশ যা আনন্দমঠ উপন্যাস-নিরপেক্ষ, স্বতন্ত্রভাবে রচিত। এবং তা ১৮৭২ থেকে ‘৭৫-এর মধ্যে কোনো একসময়ে রচিত হয়েছে, পরে উপন্যাসে পরবর্তী অংশ যুক্ত হয়েছে। আদি অংশটিতে উদ্ধৃতিচিহ্ন ব্যবহৃত। ৭ অগ্রহায়ণ, অর্থাৎ পরের দিনই নির্মলকুমার দাস প্রশ্ন তুলেছেন যে এটি ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের লেখা কী না ; ‘ভূদেবভবন’-এর গঙ্গার ঘাটের প্রশস্ত চাতালে সে সময় সান্ধ্য আসর বসত, সেখানে নদীর ওপারের নৈহাটি-ভাটপাড়া এলাকার অনেকে নৌকো করে আসতেন। বঙ্কিমও আসতেন। সম্ভবত ওই সময়েই বঙ্কিম ভূদেবের কাছ থেকে গানের একটি প্রতিলিপি পান, পরে আরও কয়েকটি চরণ যোগ করে প্রকাশ করেন। এই তথ্যের ওপর নির্ভর করলে বোঝা যায় ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম বারো চরণ ভূদেবের লেখা।” দেখা যাচ্ছে, জাতীয় জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই গানটির রচয়িতা সম্বন্ধে আমরা মত ও মতান্তরের গোলকধাঁধায় পড়েছি। তবে, ৬ অগ্রহায়ণে লেখা পার্থসারথি রায়ের মতটিকে আমরা আপাতত সমর্থনযোগ্য বলে মনে করছি :

‘বন্দে মাতরম’ গানে বঙ্কিমচন্দ্র যে দেশপ্রেমের বাণী শুনিয়েছেন তার বীজ নিহিত ছিল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ ‘কমলাকান্তের দপ্তর’-এর মধ্যে।

আনন্দমঠ প্রথম ছাপা হয়েছিল জনসন প্রেস থেকে, মুদ্রক হিসেবে ছিলেন রাধাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়।

একটি গুরুতর প্রশ্ন এই প্রসঙ্গে উঠে পড়ে : ২০০৬ খ্রিস্টাব্দটি কোন হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর শতবর্ষ হিসেবে বিঘোষিত হল এবং সর্বত্র উৎসব হিসেবে পালিতও হল? রচনাকালের সঙ্গে বা আনন্দমঠ-এ প্রকাশিত কালের সঙ্গে ২০০৬-এর কোনো সম্পর্কই নেই। এই ঐতিহাসিক বিভ্রমটি কী করে ঘটল তা চিন্তার বিষয়।

‘বন্দে মাতরম’ গানটির আলোচনা আমরা এখানেই শেষ করছি। আর একটি প্রসঙ্গে যাচ্ছি : ‘বন্দে মাতরম’ এই ধবনিটি গানটি থেকে পৃথক হয়ে প্রথম কবে উচ্চারিত হয়েছিল? এ সম্পর্কেও মত ও মতান্তরের মধ্যেই আমাদের যেতে হয়। স্বদেশি যুগে সরলা দেবী পরিচালিত একটি শোভাযাত্রায় কলেজ স্ট্রিট অঞ্চলে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিটি প্রথম উচ্চারিত হয়—কেউ কেউ এই মত পোষণ করেন। আবার কেউ কেউ বলেন, টাউন হলে বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র কর যে গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়েছিল সেই সভা শেষ হতেই কে একজন ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিটি উচ্চারণ করেন। তাঁকে অনুসরণ করে সমস্বরে এই ধবনিটি আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে। আমরা চাই ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি নিয়ে নূতন করে গবেষণা যেমন শুরু হয়েছে, এই ধবনিটিকে নিয়েও তাই হোক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *