ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র
হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ
‘বৎসরে কী কালের মাপ ! ভাবে ও অভাবে কালের মাপ।’ আজ ‘ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র’ প্রবন্ধ লিখিতে বসিয়া বঙ্কিমচন্দ্রের এই কথাই আমার মনে পড়িতেছে। বৎসরের হিসাবে সে ত সেদিনের কথা—এখনও দশ বৎসর হয় নাই—কাল-সমুদ্রের একটি তরঙ্গও উঠিয়া মিলায় নাই। কিন্তু তাহার পর যেন ‘লাখ লাখ যুগ’ চলিয়া গিয়াছে। যেদিন বাঙলার ঘাটে, বাটে, তটে, মাঠে ‘বন্দে মাতরম’ গীত শুনা যাইত। পঞ্চবিংশ বর্ষ পূর্বে রচিত বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের একটি গীতে বাঙালি, কেবল বাঙালি নহে, সমগ্র ভারতের অধিবাসীরা, মা’র স্বরূপ দেখিয়াছিল। সেই, অবজ্ঞাত না হউক, অল্পপরিচিত গান পবন-সহায় দাবানলের মত দেশময় ব্যাপ্ত হইয়াছিল, সেদিন আর আজ—ইহার মধ্যে কত যুগ বহিয়া গিয়াছে ! সেদিন জড়ত্বশাপমুক্ত বাঙালির জাতীয় জীবনে যে উৎসাহ, যে উদ্যম, যে আত্মশক্তির প্রতিষ্ঠা-প্রয়াস , যে জাতীয়-জীবন গঠন চেষ্টা লক্ষ্য করিয়াছিলাম, সেসব কী কেবল বিদ্যুতেরই মতো বাঙালির অদৃষ্টাকাশে দেখা দিয়া অন্ধকার ঘনীভূত করিয়া গিয়াছে? সে ভাব কী উচ্ছৃঙ্খলতার পরিণতি লাভ করিয়া উৎপীড়নে নিঃশেষ হইয়াছে? আজ আমার সেইদিনের কথাই মনে পড়িতেছে। তখন সমগ্র বঙ্গ ‘বন্দেমাতরম’ গানে মুখরিত। ‘বন্দে মাতরম সম্প্রদায়ে’র উদাত্তসুর হইতে আরম্ভ করিয়া বৈষ্ণবের কীর্তনের সুর পর্যন্ত কত সুরে কত জন এই গান গাহিতেছে ! তখন ভাব-তরঙ্গে ভাসিয়া স্বধর্মত্যাগী কর্মযোগী ব্রহ্মবান্ধব স্বজাতিকে সরল ভাবে তাঁহার জাতীয় ধর্মের ব্যাখ্যা শুনাইতেছেন—’সন্ধ্যা’ তাঁহার প্রচারবেদী ; আর বিদেশি শিক্ষার মুকুটময়ূখে স্বদেশি ভাবের স্বরূপ নির্ণীত করিয়া ধ্যানযোগী অরবিন্দ ইংরেজি-শিক্ষিত স্বদেশবাসীকে সে ভাব বুঝাইতেছেন—’বন্দে মাতরম’ তাঁহার বত্তৃ�তামণ্ডপ। ব্রহ্মবান্ধব বঙ্কিম-উৎসবের অনুষ্ঠান করিয়াছিলেন। সেই উপলক্ষে ‘বন্দে মাতরম’ পাত্রে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্বন্ধে প্রবন্ধ লিখিবার কথা হইল। স্থির হইল, একটি প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনকথা বিবৃত হইবে—সে প্রবন্ধ আমি লিখিব ; আর একটি প্রবন্ধ লিখিবেন—অরবিন্দ। ইহার কিছুদিন পূর্বে সার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় কোনো সভায় বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বন্দেমাতরম’ মন্ত্রের ঋষি বলিয়াছিলেন। সে কথা আমি অরবিন্দকে বলিয়াছিলাম। অরবিন্দ যে প্রবন্ধ লিখিয়াছিলেন তাহার নাম—ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র। সংবাদপত্রে অনেক সময় সংরক্ষণযোগ্য প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়—কিন্তু সংবাদপত্র প্রায় কেহ রাখে না—রাখিতে পারে না। আবার ‘বন্দে মাতরম’ যাঁহারা রাখিয়াছিলেন, তাঁহারাও অনেকে সকারণ বা অকারণ ভয় হেতু তাহা নষ্ট করিয়া ফেলিয়াছেন। তাই আজ এতদিন পরে আবার স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয়ের কথা বুঝাইতে লেখনী ধরিয়াছি—বঙ্কিমচন্দ্র ঋষি। তাঁহার ঋষিত্ব কীসে?
অনেকে এই প্রাচীন জাতির প্রনষ্ট গৌরবের জন্য দুঃখপ্রকাশ করিয়া বলেন, বর্তমানকালে এই অধঃপতিত জাতির মধ্যে আর অমানুষ শক্তিশালী চিন্তার ও সভ্যতার নিয়ন্তা, ঋষির আবির্ভাব সম্ভব নহে। তাঁহাদের এই বিশ্বাস ভ্রান্ত—এ আক্ষেপ ভিত্তিহীন। যে দেশ সনাতন, সে দেশের, সে জাতি সনাতন সে জাতির, আর যে ধর্ম সনাতন সে ধর্মের শক্তি, জ্যোতিঃ ও পুতপ্রভাব কিছুকালের জন্য মেঘাচ্ছন্ন হইতে পারে, কিন্তু চিরতরে অন্তর্হিত, অস্তমিত, অদৃশ্য হইতে পারে না। ভারতবর্ষ বহু বীরের, বহু ঋষির ও বহু সাধু পুরুষের আবির্ভাবে পবিত্র হইয়াছে ; ভারতবর্ষ তাঁহাদের কর্মক্ষেত্র—লীলাভূমি। এই দেশেই তাঁহাদের আবির্ভাব স্বাভাবিক, যুগে যুগে তাঁহারা আবির্ভূত হইয়াছেন। বর্তমান যুগে যাঁহারা আবির্ভূত হইয়াছেন তাঁহাদের মধ্যে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ঋষিত্বে কে সন্দেহ করিতে পারে?
ঋষিতে ও সাধুতে প্রভেদ স্বপ্রকাশ। ঋষির জীবনে অসাধারণ পূতাচার বা চরিত্রে অদর্শ-সৌন্দর্য্য না-ও লক্ষিত হইতে পারে। তাঁহার গৌরব তাঁহার জীবনে নহে ; পরন্তু তিনি যে ভাবে অভিব্যক্ত করেন তাহার সেই অভিব্যক্তিতে। কোনো জাতিকে বা সমগ্র মানবসমাজকে যে কথা জানাইতে হয়—ভগবান তাহা ঋষিমুখে ব্যক্ত করান। মানবকে যদি কোনো অতিপ্রাকৃত দৃশ্য দেখাইতে হয়, তবে ঈশ্বরানুগৃহীত ঋষির নয়নে সে দৃশ্য প্রতিভাত হয়। তিনি তাহা দেখিয়া জগতে সে সংবাদ প্রকাশ করেন। তাঁহার কথার অবিশ্বাসী বিশ্বাস না করিয়া পারে না, সংশয়ান্দোলিত হৃদয় স্থির হয়, সন্দেহের অন্ধকার দূর হয়। তাই জগতে অঘটন সংঘটিত হয়। যে কথা ব্যক্ত করাই তাঁহার বিধিনির্দ্দিষ্ট কার্য্য, সেই কথাই তাঁহার মন্ত্র,—তিনি সেই মন্ত্রের ঋষি।
আজ বঙ্কিমচন্দ্রের নাম সমগ্রদেশে সম্পূজিত কেন? তিনি আমাদিগকে কোন মন্ত্র দিয়াছেন—কোনরূপ দেখাইয়াছেন? তিনি কবি, তিনি সাহিত্যিক, কল্পনালোকে কমনীয় মূর্তির রচনায় সিদ্ধহস্ত। কিন্তু কবি, ঔপন্যাসিক, সাহিত্যিক বলিয়া তাঁহার গৌরব যত অধিকই হউক না কেন, তাহা তাঁহারই ঋষিত্ব-গৌরবের নিকট ম্লান, ‘শুষ্ক বদরীর মত তুচ্ছ’। সাহিত্য-সমালোচক শিল্পের মানদণ্ডে মাপিয়া তাঁহার কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল প্রভৃতির স্থান, দেবীচৌধুরাণী, আনন্দমঠ, কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব প্রভৃতির স্থান অপেক্ষা উচ্চে নির্দিষ্ট করিবেন। কিন্তু কপালকুণ্ডলা-দির বঙ্কিমচন্দ্র ঔপন্যাসিক ও কবি, আর দেবীচৌধুরাণী প্রভৃতির বঙ্কিমচন্দ্র ঋষি ও জাতিসংগঠক। কবিকীর্ত্তি—ঋষিকীর্ত্তি কল্পান্তস্থায়িনী।
কবি ও সাহিত্যিকরূপে বঙ্কিমচন্দ্র যে কার্য্য করিয়াছিলেন, তাহাতেও জাতীয় কল্যাণ সংসাধিত হইআছিল। সত্য বটে তাঁহার সাহিত্যিক কার্য্যের ফল মুখ্যভাবে বাঙালিই সম্ভোগ করিয়াছিল ; কিন্তু গৌণভাবে জগতের অন্যান্য প্রদেশেও তাহাতে বঞ্চিত হয় না। কারণ, জাতীয় জীবন গঠনে বাংলাই ভারতের পথপ্রদর্শক। কোনো জাতি যখন তাহার স্বতন্ত্র জাতীয় স্বত্বা অনুভব করে, তখন তাহার হৃদয় সে নূতন ভাবে, নূতন চিন্তায়, নূতন কল্পনায় উদ্বেলিত হইয়া উঠে, সে সকলের প্রকাশোপযোগী ভাষা না পাইলে সে জাতির উন্নতির গতি প্রহত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালিকে সেইরূপ ভাষা দিয়াছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের এই প্রথম দানের মূল্য সামান্য নহে। বাংলা ভাষার বিশুদ্ধি নষ্ট করিয়াছেন বলিয়া বঙ্কিমচন্দ্রের সমসাময়িক সাহিত্যিকগণ তাঁহার নিন্দা করিয়াছেন। কিন্তু তাঁহার পূর্ববর্তী কবিগণের ভাষা রক্ষণশীল, গতিহীন বাংলার ভাবপ্রকাশেরই উপযোগী ছিল। পরিবর্তিত ও উন্নতির পথারূঢ় জাতির ভাবপ্রকাশের জন্য পরিবর্তিত উন্নততর ভাষার প্রয়োজন। বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালিকে তাহার অভাব অনুভব করিতে দেন নাই ; প্রয়োজনের পূর্বে তিনি বাঙালিকে সে ভাষা যোগাইয়াছেন। তিনি পণ্ডিতদিগের ব্যবহৃত ভাষার সহিত জনসাধারণের চলিত ভাষা মিশ্রিত করিয়াছেন বলিয়া নিন্দিত হইয়াছিলেন। কিন্তু পণ্ডিতদিগের ব্যবহৃত বিস্তারবিহীন নিয়ম-নিগড়বদ্ধ ভাষায় নূতন বাংলার বিচিত্র, সুন্দর, সরস ও সতেজ ভাব বিকশিত হইতে পারিত না। আধুনিক বাঙালির ভাব প্রকাশের জন্য যে ভাষার প্রয়োজন হইয়াছিল, সে ভাষার সংগতের শক্তি, গাম্ভীর্য ও সৌন্দর্যের সঙ্গে সহজবোধ্য সাধারণ ভাষার তেজ ও বৈচিত্র্য মিশ্রিত হইবে। বঙ্কিমচন্দ্র এই অভাব পূর্বেই বুঝিয়া বাঙালিকে তাহার নবভাব প্রকাশোপযোগী ভাষা দিয়াছিলেন। আজ যে বাংলা ভাষা হর্ষে উদ্বেলিত, উৎসাহে উচ্ছ্বসিত, বিষাদে বিকুণ্ঠিত, দ্বিধায় বিচলিত, ক্রোধে বিকম্পিত, ঘৃণায় সঙ্কুচিত, করুণায় বিগলিত হয়, সে বঙ্গভাষা বঙ্কিমচন্দ্রের কীর্তি।
বঙ্কিমচন্দ্র যেমন সর্বাগ্রে দেশের সাহিত্যিক অভাব বুঝিতে পারিয়াছিলেন, তেমনই সর্বাগ্রে দেশের রাজনীতিক অভাবও বুঝিতে পারিয়াছিলেন। তখন দেশে রাজনীতিক আন্দোলন যে প্রণালীতে পরিচালিত হইত তাহার অনুপযোগিতা এদেশের সাহিত্যিকদিগের মধ্যে তিনিই প্রথমে বুঝিতে ও বুঝাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। লোকরহস্যে ও কমলাকান্তের দপ্তর-এ তিনি বিদ্রূপের কশাঘাতে লোককে ইহা বুঝাইয়াছিলেন। বিদ্রূপ প্রতিভাবান লোকদিগের অস্ত্র হইলে প্রতিপক্ষ পরাজয়ে বিশেষ সহায়তা করে। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের গৌরব সংহারে নহে—সৃষ্টিতে, বিসর্জনে নহে—প্রতিষ্ঠায়। সব্যসাচী বঙ্কিমচন্দ্র সাহিত্যক্ষেত্রে যেমন অযোগ্যকে নির্দয়ভাবে উন্মুলিত করিয়া যোগ্যকে সাদরে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলেন, রাজনীতিক্ষেত্রেও তেমনই অযোগ্যকে বিদ্রূপে বিচ্ছিন্ন করিয়া যোগ্যকে সাহিত্যের ক্ষেত্রে সাহায্যে সুপ্রতিষ্ঠ করিয়েছিলেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন ও বুঝাইয়াছিলেন স্বদেশভক্তি ও স্বজাতিপ্রেম স্বার্থসংস্পর্শ সহ্য করিতে পারে না ; ত্যাগে তাহার প্রতিষ্ঠা—সাধনায় তাহার বিকাশ। তিনি রাজনীতিক আন্দোলনে ভয়-ভীত শ্ববৃত্তি, ত্যাগ করিয়া গাম্ভীর্য-গৌরবান্বিত সিংহবৃত্তি অবলম্বন করিতে শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাঁহার মার হস্তে ভণ্ডের ভিক্ষাভাণ্ডও নাই, আর বিদ্রোহীর আত্মবিস্মৃত তরিবারি নাই। তিনি আনন্দমঠ-এ ও দেবীচৌধুরাণীতে বুঝাইয়াছেন শারীরিক বলের সাধনা করিতে হইবে ; কিন্তু নৈতিক বল—সংযম ব্যতীত শারীরিক বল স্থায়ীকার্য করিতে পারে না। সীতারাম-এ তিনি দেখাইয়াছেন, অনাচারের স্পর্শে শারীরিক বলের দুর্গচূড়া বজ্রাহত গিরিশিখরের মতো ধূলিবিলুণ্ঠিত হয় ; উচ্ছৃঙ্খলতা সাধনার অন্তরায়, সিদ্ধির বৈরী। তিনি বুঝাইয়াছেন, নৈতিক শক্তিসাধনার প্রথম সোপান ত্যাগ, কর্মে আত্মসমর্পণ। তাই তাঁহার ”সন্তানগণ” সন্ন্যাসী, মাতা-পিতা-ভ্রাতা-ভগ্নী-দারা-সুত সর্বত্যাগী। তাহারা সংসারত্যাগী ও ইন্দ্রিয়জয়ী। তাহাদের ব্রতভঙ্গের, প্রতিজ্ঞাভঙ্গের প্রায়শ্চিত্ত, ‘জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করিয়া অথবা বিষপান করিয়া প্রাণত্যাগ।’ যে ধনজন, দ্বারা-সুত, এইসকলকে ভালোবাসে, যে আপনাকে ভালোবাসে, তাহার স্বদেশভক্তি অসম্পূর্ণ। এই সাধনায় ”জীবন তুচ্ছ” ; সাধককে দিতে হইবে—’ভক্তি।’ তাঁহার ‘সন্তানগন’ দুর্দান্ত দস্যু নহে ; নিষ্ঠুর নরহন্তা নহে ; তাঁহারা সন্ন্যাসী ও সাধক। বঙ্কিমচন্দ্র বুঝিয়াছিলেন যে, নৈতিক শক্তিসাধনার দ্বিতীয় সোপান সংযম ও পদ্ধতিবদ্ধতা। দেবীর কঠোর শিক্ষায়, সন্তানগণের পুরুষ প্রতিজ্ঞায় এবং দেবীচৌধুরাণী ও আনন্দমঠ পুস্তকদ্বয়ে বর্ণিত পদ্ধতিবদ্ধ কার্যে তিনি ইহাই বুঝাইয়াছেন। নৈতিক শক্তি সাধনার তৃতীয় সোপান স্বদেশপ্রেমে, ধর্মভাবে সমাজ-সংস্কার। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁহার স্বদেশবাসিগণকে স্বদেশপ্রেমধর্ম শিক্ষা দিয়াছেন। দেবীচৌধুরাণীতে ইহার আভাস—আনন্দমঠ-এ ইহার বিকাশ। ধর্মতত্ত্বে কর্মযোগের বিচিত্র ভাব বিবৃত। কৃষ্ণচরিত্র-এ মূর্ত কর্মযোগের চিত্র চিত্রিত। স্বদেশপ্রেমে এই কর্ম্মযোগের পূর্ণ বিকাশ। ‘বন্দেমাতরম’ গীতে এই ভাব অভিব্যক্ত হইয়াছে। বঙ্কিমচন্দ্র নব্য-ভারতের রাজনীতিক গুরু। তিনি তাঁহার স্বদেশবাসীকে স্বদেশপ্রেমধর্মে দীক্ষিত করিয়াছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের সর্বশ্রেষ্ঠ কার্য তাঁহার স্বদেশবাসীকে ‘নবীন-কিরণে জ্যোতির্ময়ী’ মাতৃমূর্তি প্রদর্শন। স্বদেশপ্রেম যত দিন কেবল বুদ্ধিগ্রাহ্য, তত দিন তাহা শক্তিহীন ; যখন হৃদয়ে তাহার স্বরূপ প্রতিভাত হয়, তখনই তাহা মানুষকে চালিত করে, তখনই মানুষ তাহার জন্য জগতে আর সব তুচ্ছজ্ঞান করিতে শিখে। যতদিন মাতৃভূমি পর্বত-কিরীটিনী, সাগর সুশোভিতা ভূমিখণ্ড মাত্র, যতদিন দেশবাসী কেবল মনুষ্যমণ্ডলী মাত্র, ততদিন স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ উপলব্ধ হয় না। যখন মৃণ্ময়ী মা চিণ্ময়ীরূপে দেখা দেন, তখন সেই মাতৃমূর্তির দর্শনপুণ্যে মানবের জাড়-দ্বিধা-সঙ্কীর্ণতা-স্বার্থান্ধতা অরুণোদয়ে রজনীর অন্ধকারের মতো দূর হয়। বঙ্কিম বাঙালিকে ও ভারতবাসীকে সেই মাতৃমূর্তি দেখাইয়াছিলেন। তাই যেদিন বাঙালি জাগিল, সেদিন একজনের মুখে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র উচ্চারিত হইতে না হইতে সমগ্র ভারতবর্ষ সেই মন্ত্রে মুখরিত হইয়া উঠিল। এই মন্ত্রে ভারতবাসীর ভাব প্রকাশর ভাষা পাইল।
ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র এই জাগরণের বহু পূর্বে মাতৃমূর্তি দেখিয়াছিলেন। ‘কমলাকান্ত’ রূপে তিনি মার এই মূর্তি দেখিয়াছেন। ‘এই সপ্তমীর শারদীয়া প্রতিমা’ দেখিয়া, কাঁদিয়া বাঙালিকে বলিয়াছিলেন :
এস, ভাই সকল ! আমরা এই অন্ধকার কাল-স্রোতে ঝাঁপ দিই। এস, আমরা দ্বাদশ কোটি ভূজে এই প্রতিমা তুলিয়া, ছয় কোটি মাথায় বহিয়া, ঘরে আনি। এস, অন্ধকারে ভয় কী? ওই যে নক্ষত্রসকল মধ্যে মধ্যে উঠিতেছে, নিবিতেছে, উহারা পথ দেখাইবে—চল ! চল! অসংখ্য বাহুর প্রক্ষেপে, এই কালসমুদ্র তাড়িত, মথিত, ব্যস্ত করিয়া, আমরা সন্তরণ করি—এই স্বর্ণপ্রতিমা মাথায় করিয়া আনি। ভয় কী? না হয় ডুবিব ; মাতৃহীনের জীবনে কাজ কী?
সেই মূর্তিই ‘সন্তানগণে’র মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। ‘দশভূজ দশদিকে প্রসারিত—তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত ; পদতলে শত্রু-বিমর্দিত, পদাশ্রিত বীরকেশরী শত্রু-নিষ্পীড়নে নিযুক্ত. দিগভুজা—নানা-প্রহরণধারিণী, শত্রু-বিমর্দিনী, বীরেন্দ্র-পৃষ্ঠবিহারিণী ; দক্ষিণে লক্ষ্মী, ভাগ্যরূপিণী ; বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞানদায়িনী ; সঙ্গে বলরূপী কার্তিকেয় ; কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ।’
এই মূর্তি দেখিয়াই তিনি যুক্ত করে ঊর্ধ্বমুখে ডাকিয়াছিলেন :
সর্বমঙ্গলমাঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থকসাধিকে।
শরণ্যে ত্র্যাম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোস্তুতে।।
আর এই মূর্তি দেখিয়া পঞ্চবিংশ বর্ষ পরে ভারতবাসী গাহিয়াছে, ‘বন্দে মাতরম।’
এই নবজাগরণ কীরূপে আসিবে তাহাও বঙ্কিমচন্দ্র বুঝাইয়াছিলেন। সনাতন ধর্ম জ্ঞানাত্মক—কর্মাত্মক নহে।
সেই জ্ঞান দুই প্রকার—বহির্বিষয়ক ও অন্তর্বিষয়ক। অন্তর্বিষয়ক যে জ্ঞান, সেই সনাতন ধর্মের প্রধান ভাগ। কিন্তু বহির্বিষয়ক জ্ঞান আগে না জন্মিলে অন্তবির্ষয়ক জ্ঞান জন্মিবার সম্ভাবনা নাই। স্থূল কী, তাহা না জানিলে, সূক্ষ্ম কী তাহা জানা যায় না। এখন এদেশে অনেক দিন হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে, কাজেই প্রকৃত সনাতন ধর্মও লোপ পাইয়াছে। সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধার করিতে গেলে, আগে বহির্বিষয়ক জ্ঞানের প্রচার করা আবশ্যক। এখন এদেশে বহির্বিষয়ক জ্ঞান নাই, শিখায় এমন লোক নাই ; আমরা লোকশিক্ষায় পটু নহি। অতএব ভিন্ন দেশ হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান আনিতে হইবে। ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড়ো সুপটু। ইংরাজি শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম প্রচারে আর বিঘ্ন থাকিবে না। তখন প্রকৃত ধর্ম আপনা-আপনি পুনরুদ্দীপ্ত হইবে।
বঙ্কিমচন্দ্র যাহা বলিয়াছিলেন, তাহাই হইয়াছে। প্রতীচ্য শিক্ষার বহির্বিষয়ক জ্ঞানের তড়িৎসঞ্চারে প্রাচীর জড়ত্ব দূর হইয়াছে। ভগীরথানীত গঙ্গার স্পর্শে যেমন সগরসন্তানগণের উদ্ধার সাধিত হইয়াছিল, ইংরেজের আনীত বহির্বিষয়ক জ্ঞানে তেমনই ভারতের উদ্ধার সাধিত হইয়াছে। দেশ নবজীবনে জাগ্রত হইয়াছিল—নবারুণ কিরণে চক্ষু মেলিয়াছিল। লর্ড মিন্টোর মতো যাঁহারা ইহার স্বরূপ নির্ণয় করিতে পারিয়াছিলেন, তাঁহারাই স্বীকার করিয়াছিলেন, সমগ্র প্রাচ্য নব্যভাবচূড় জাগরণ-তরঙ্গে প্লাবিত হইতেছে; তাঁহাতে প্রাচীর প্রাচীন সংস্কার বিধৌত হইয়া যাইতেছে। জাপানে, চীনে, ভারতে—সমগ্র প্রাচীতে এই জাগরণের লক্ষণ লক্ষিত হইয়াছে। এ জাগরণ প্রতীচীর সভ্যতার সহিত পরিচয়-প্রসূত, প্রতীচ্য শিক্ষার ফল, বহির্বিষয়ক জ্ঞানলাভের অবশ্যসম্ভাবী পরিণাম।
দেশে এই নবভাবের আবির্ভাব যে অবশ্যম্ভাবী, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র তাহা বুঝিয়াছিলেন। মা যে মূর্তিতে তাঁহাকে দেখা দিয়াছিলেন, একদিন যে মার সেই মূর্তি তাঁহার স্বদেশবাসী সকলেই প্রত্যক্ষ করিবে তাহা তিনি জানিতে পারিয়াছিলেন। সমগ্র দেশের জাগরণের পূর্বেও কেহ কেহ তিমিরাবৃত প্রাচীর তোরণে অরুণকিরণ বিকাশ-সূচনা লক্ষ্য করিতেন। কাহারও কাহারও শ্রবেণ বিহঙ্গের প্রভাতী সঙ্গীতে দিবসের আহ্বান শ্রুত হইত। মনে আছে, কলিকাতায় শ্রীযূত ওয়াচার সভাপতিত্বে বিডন উদ্যানে কংগ্রেসের যে অধিবেশন হয় তাহাতে সুকণ্ঠ রবীন্দ্রনাথের গীত এই ‘বন্দেমাতরম’ গান শুনিয়া একজন মদ্রদেশাগত প্রতিনিধির নয়ন হইতে অশ্রু করিতে দেখিয়াছিলাম।
কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র এই মন্ত্ররচনাকালেই দেশের জাগরণের অবশ্যম্ভাবিতা উপলব্ধি করিয়াছিলেন। এই গান উপন্যাসখানির পূর্বে রচিত হয়। তিনি যখন এই গান রচনা করিয়া তাহাতে সুরসংযোগ করিতেছিলেন তখন বঙ্গদর্শন-এর কার্যাধ্যক্ষ তাঁহাকে গান রচনা না করিয়া উপন্যাস রচনা করিতে বলেন—গানে বঙ্গদর্শন-এর ক্ষুধা মিটিবে না। শুনিয়া বঙ্কিমচন্দ্র ভবিষ্যদ্বাণী করিয়াছিলেন,—যদি পঁচিশ বৎসর বাঁচিয়া থাক তবে তখন এ গানের মর্ম বুঝিবে। পঞ্চবিংশ বর্ষের ব্যবধানে কার্যাধ্যক্ষ মহাশয় ভারতের নব-জাগরণ প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। তিনি দেখিয়াছেন, সেই ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রে ভারতবর্ষ মুখরিত। সুদূর মহারাষ্ট্রে ছত্রপতি শিবাজীর সমাধি-তোরণে বাঙালী কবি, বাঙালি ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের সেই মন্ত্রে উৎকীর্ণ হইয়াছে, ‘বন্দেমাতরম।’
