বন্দে মাতরম
বিপিনচন্দ্র পাল
‘বন্দে মাতরম’ গান নহে, মন্ত্র। প্রত্যেক মন্ত্রের একজন ঋষি ও এক বা ততোধিক দেবতা থাকেন। ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের ঋষি সন্তান সম্প্রদায় প্রবর্তক মহাপুরুষ, পুরোহিত বঙ্কিমচন্দ্র, দেবতা জন্মভূমি। মন্ত্র অনেক সময়েই স্বল্পবর্ণাত্মক হয়। বিশেষ করে যে মন্ত্র সাধনা করিতে হয়, সে মন্ত্র সাধকের জপমন্ত্র হইবে, সাধক যাহা নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে, শয়নে স্বপনে জপিবেন,—জপিতে জপিতে তন্ময় হইয়া, আপনাকে সেই মন্ত্রের অগাধ রসে একেবারে ডুবাইয়া রাখিবেন, এমন স্নিগ্ধ মন্ত্র প্রায়ই অতি সংক্ষিপ্ত, অতি গল্প পরিসর হওয়া আবশ্যক। ‘বন্দে মাতরম’ এই শব্দ দুইটিই এজন্য প্রকৃত মন্ত্র। ‘বন্দে মাতরম’—মন্ত্র, কারণ এই মন্ত্র ভক্তিভরে জপ করিলে, মায়ের স্বরূপ চিত্তে উদ্ভাসিত হইয়া উঠে। এই মন্ত্র জপিতে জপিতে যে মাতৃরূপ সাধকের মানসচক্ষে মন্ত্রশক্তি প্রভাবে, গুরুকৃপায়, আপনি স্ফুরিত হইয়াছিল,—বঙ্কিমচন্দ্র এই সঞ্জীবনী সঙ্গীতে তারই বর্ণনা করিয়াছেন। ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত মায়ের সাধক মন্ত্র নহে, মায়ের স্তব। ‘বন্দে মাতরম’ মায়ের সাধন মন্ত্র, সুজলাং সুফলাং ইত্যাদি মায়ের স্তব।…’বন্দে মাতরম’ জপিতে জপিতে জপিতে, সাধকের চক্ষে ‘মা’ প্রকট হইলেন, তখনই তাঁহার বন্দনা আরম্ভ হইল। তখনই সাধক মায়ের অরূপ রূপ প্রত্যক্ষ করিয়া, ভক্তিগদগদ কণ্ঠে গাহিতে লাগিলেন ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্যশ্যামলাং মাতরম।’
‘বন্দে মাতরম’—মন্ত্র। ইহার প্রকৃত অর্থ, রূঢ়। যৌগিক নহে। কিন্তু ইহার প্রকৃত অর্থ মা। এই মন্ত্র জপিতে জপিতে মায়ের স্বরূপ প্রকাশিত হয়। স্বরূপ অদ্বৈত বস্তু। …দেবতাকে বিগ্রহ হইতে পৃথক করা যায় না, দেবতা শূন্য বিগ্রহ নহে, পুত্তলিকা। সুজলা সুফলা মলয়জ শীতলা শস্যশ্যামলা এই যে বসুন্ধরা দেখিতেছ, এই যে শুভ্র জ্যোৎস্না পুলকিত যামিনী, ফুল্ল কুসুমিত দ্রুমদল শোভিনী প্রকৃতিকে দেখিতেছ—এ মায়ের বিগ্রহ। মাকে পৃথক করিয়া দাও, ইহার বিগ্রহত্ব অমনি লুপ্ত হইবে, ইহা প্রাকৃত জল, প্রাকৃত ফল, প্রাকৃত শস্য, প্রাকৃত বায়ু, প্রাকৃত জ্যোৎস্না, প্রাকৃত বৃক্ষরাজিতে পরিণত হইবে। দেবতার অন্তর্ধানে বিগ্রহ যেমন পুত্তলিকা হয়, মাকে পৃথক করিলে এ সকল যেমনি পঞ্চভূতাত্মক জগৎ-প্রপঞ্চে পরিণত হইবে। ইহার প্রাণতা, ইহার শক্তি, ইহার উদ্দীপনা, ইহার পবিত্রতা কিছুই আর থাকিবে না। তখন গঙ্গায় ও গোষ্পদে কোনও প্রভেদ থাকিবে না।—মানসপটে এই অপূর্ব চিত্র সম্যক ফুটিয়া উঠিলে, ভক্ত তখন চক্ষু খুলিয়া, এই বাহিরের জল স্থলে, বন উপবনে, এই শস্যভরা মাঠে, এই গ্রাম্য বধূগণের বলয়কিঙ্কিনী মুখরিত ঘাটে, এই লোক কোলাহলপূর্ণ হাটে—এই সকলের ভিতরে অন্তরস্থ মায়ের অপূর্ব রূপ প্রত্যক্ষ করিয়া তাহারই বন্দনা করেন—কিন্তু মায়ের যে রূপের বর্ণনা ‘বন্দে মাতরমে’ দেখিতে পাই, তাহা তো এরূপ মিথ্যা নহে। এ রূপ তে সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণে, আকাশ কুসুমবৎ রচিত হয় নাই। মায়ের এই ধ্যানে যে রূপের বর্ণনা আছে, তাহা মায়ের স্বরূপ, মায়েতে অধ্যাসিত বা কল্পিত রূপ নহে। (১৩১৬)
