ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস – ক্ষীরোদকুমার দত্ত

ভারতের জাতীয় পতাকার ইতিহাস

ক্ষীরোদকুমার দত্ত

প্রত্যেক রাষ্ট্রের পক্ষেই পতাকার প্রয়োজন। পতাকার জন্য লক্ষ লক্ষ নরনারী মৃত্যুবরণ করেছেন। এ-যে একপ্রকার মূর্তিপূজা তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এ মূর্তিপূজা লোপ করা মহাপাপ। পতাকা এক আদর্শের প্রতিমূর্তি। ব্রিটিশ পতাকা উত্তোলনে ইংরেজের হৃদয়ে যে ভাবের উদয় হয় তা অবর্ণনীয়। তারা এবং ধারাযুক্ত মার্কিন পতাকা মার্কিন দেশবাসীর নিকট অমূল্য নিধি। তারা এবং অর্ধচন্দ্রযুক্ত ইসলামের পতাকা তার বীরত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

আমাদের ভারতবাসী—হিন্দু, মুসলমান, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং পার্সি প্রভৃতি সকল অধিবাসী, ভারত যাদের মাতৃভূমি তাদের একটি পতাকা স্বীকার করে নেওয়া প্রয়োজন—’যে পতাকা নিয়ে তারা বেঁচে থাকবে এবং যে পতাকার জন্য তারা মরবে।’ মহাত্মা গান্ধি।

আমাদের জাতীয় পতাকা ত্রিবর্ণ রঞ্জিত অশোকচক্র লাঞ্ছিত পতাকার উদ্ভবের পশ্চাতে একটা চিত্তাকর্ষক ইতিহাস রয়েছে। এই ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা আজ কোটি কোটি ভারতবাসীর আশা, আকাঙক্ষা এবং জাতীয় চেতনার প্রতীক এবং অতীতে পরাধীন ভারতে এ পতাকা আমাদের জাতীয় জাগরণে উদবুদ্ধ করত, আমাদের আত্মবলি দানে উদবুদ্ধ করত। এ পতাকা আমাদের সেদিনের জাতীয় সংগ্রামের আত্মবলিদানের স্মারক। এই পতাকা লক্ষ লক্ষ ভারতবাসীর স্বাধীনতা সংগ্রামের সাধনার প্রতীক, জহরলালজির কথায় যাঁরা সেদিন ছিলেন জাতীয় সাধনায় সিদ্ধিলাভ করবার জন্য কৃতসংকল্প, এই পতাকাই তাঁদের মৃত্যুর পথে অগ্রসর হবার পথ প্রদর্শন করেছে।

আমাদের গর্ব ও আনন্দের বিষয় এই জাতীয় পতাকার স্মৃতি আমরা মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের সময় থেকে বহন করে আসছি। শত শত শতাব্দীর কুসংস্কারের অন্ধকার ভেদ করে পাশ্চাত্য সভ্যতার উদয়ালোকে তিনিই প্রথমে দেশকে উদ্ভাসিত করেছিলেন। তিনিই প্রথমে জাতীয় জীবনকে মুক্তির পথে অগ্রসর হবার পথ দেখিয়েছিলেন।

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে ভারত পরাধীনতার বেড়িতে শৃঙ্খলিত হবার সূচনা হয়। পাশ্চাত্য জগতের সঙ্গে এবং পাশ্চাত্য সভ্যতার সঙ্গে আমাদের মিলনের সূত্রপাত এখানেই। পলাশির যুদ্ধের মাত্র ১৭ বৎসর পরে ১৭৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহনের জন্ম আর এর মাত্র ১৫ বৎসর পরে পশ্চিম জগতে ফরাসি বিপ্লব জগতের চিন্তার দ্বার উদঘাটিত করে দিল। মানুষ এই প্রথম দিন শুনল—’জগতে রাজা-প্রজার পার্থক্য নাই, মানুষে মানুষে পার্থক্য নাই। জগতে সব মানুষই সমান, সব মানুষই ভাই-ভাই, সব মানুষই স্বাধীন।’ পাশ্চাত্য জগতের সে স্বাধীনতার বাতাস প্রাচ্য জগতকেও আন্দোলিত করতে লাগল। সামন্ততন্ত্র ভেঙ্গে পড়তে লাগল সর্বত্র। সমগ্র জগতে বইতে লাগল মুক্তির বাতাস। পরাধীনতার বিরুদ্ধে অসন্তোষের আগুন জ্বলে উঠল সবার অন্তরে। ওই আগুন কোথাও ছিল প্রকাশ্য বিদ্রোহরূপে, কোথাও ছিল জাতির অবচেতনায়। সাম্য, মৈত্রী, এবং স্বাধীনতার ধবনি নিয়ে ফরাসি বিপ্লবের বিদ্রোহের আগুন ক্রমে পরিব্যপ্ত হল সমগ্র জগতে। সমগ্র চিন্তা জগতকে অধিকার করে ফেলল এ-বাণী। ফরাসি প্রজাতন্ত্র গভর্নমেন্ট সমগ্র জগতের জনগণের সরকার বলে পরিগণিত হল। সমগ্র জগতের নিপীড়িত লাঞ্ছিত জনতা একে আপনাদের মুক্তিদাতা বলে গ্রহণ করল।

এই মুক্তি আন্দোলনের ঢেউ ভারতের তটভূমি অতিক্রম করে আন্দোলন তুলল ভারতের বুকেও। এ আন্দোলনে সাড়া দিতে রামমোহন রায়ের অন্তর দ্বিধা করল না। কিশোর রামমোহন ক্রমে এই ভাবধারার মধ্য দিয়ে যৌবনে পদার্পণ করলেন। ফরাসি প্রজাতন্ত্রের তেরঙ্গ ঝান্ডা ক্রমে সমগ্র জগতের মতো রামমোহন এবং তার বন্ধুদের নিকটও সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার পতাকা বলে বরণীয় হয়ে উঠল। ফরাসি বিপ্লবের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা এইভাবে প্রবর্তিত হল ভারতের বুকে। রামমোহনের পদাঙ্ক অনুসরণ করে বাংলার এক শ্রেণির যুবক বহুদিন পর্যন্ত এই পতাকাকে অগ্রগামী জগতের পতাকা বলে স্মরণ করে আসছিলেন। কলকাতার মনুমেন্টের পাদদেশে প্রতি বৎসর ‘বাস্তিল’ দিবস বা ‘ফরাসি বিপ্লব দিবস’ উদযাপিত হত। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজা রামমোহনের মৃত্যুর পরেও তার বন্ধুরা নিয়মিতভাবে এই দিবস উদযাপন করতেন। আমাদের জাতীয় আন্দোলনের প্রথম যুগ থেকেই এর ওপর ফরাসি পতাকার প্রভাব রয়েছে। বাংলাদেশের জাতীয় সংগ্রাম যতই প্রবল আকার ধারণ করতে লাগল, পতাকার অভাব ততই অনুভূত হতে লাগল। সংগ্রামের নেতৃবৃন্দ কিছু পরিবর্তিত আকারে ফরাসি পতাকাকে এর জন্য গ্রহণ করার প্রয়োজন প্রথমেই অনুভব করলেন।

১৯০২ সালের মার্চ মাসের দোলপূর্ণিমার দিনে কলকাতায় বিপ্লবী অনুশীলন সমিতি প্রতিষ্ঠিত হল। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে সমিতি ঢাকাতে সম্প্রসারিত হল এবং বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সুযোগে ঢাকাতে সম্প্রসারিত হল এবং বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সুযোগে অল্পদিনের মধ্যেই সমিতি সমগ্র পূর্ব, উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গে ছড়িয়ে পড়ল। বিপ্লবী সমিতিরও একটা পতাকার প্রয়োজন দেখা দিল। ভারতীয় জাতীয় পতাকার কী নমূনা হবে এ নিয়ে বিপ্লবীদের মধ্যেও নানা আলোচনা চলতে লাগল। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে মেদিনীপুরের হেমচন্দ্র কানুনগো বোমা তৈরি শেখবার জন্য ফরাসি দেশে মাডাম কামার কাছে যান। ওই সময় বাংলার বিপ্লবীদের পতাকার এক নমুনা তিনি সঙ্গে করে নিয়ে যান।

হেমচন্দ্রের ফরাসি দেশে অবস্থানকালে ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দের ১৮ আগস্ট জার্মানির স্টাটগার্ট শহরে আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জনৈক রুশ বৈপ্লবিকের মাধ্যমে ইউরোপের ভারতীয় বিপ্লবীরাও সম্মেলনে আমন্ত্রিত হলেন। স্থির হয় যে, মাডাম কামা এবং এবং সর্দার সিং রাণা ভারতের পক্ষে সম্মেলনের প্রতিনিধিত্ব করবেন এবং ভারতীয় পতাকা সম্মেলনে উত্তোলন করা হবে। ফ্রান্সে ভারতীয় বিপ্লবী মহলে এজন্য বক্তৃতা তৈরি এবং পতাকা প্রস্তুতের হিড়িক পড়ে গেল। বিশেষ করে হেমচন্দ্র, সাভারকার এবং মাডাম কামা এই পতাকা প্রস্তুতের ব্যাপারে অংশ গ্রহণ করেন।

সম্মেলনের কয়েকদিন আগে মাডাম কামা, সর্দার সিং রানা এবং তাদের সহকর্মীরূপে বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় স্টাটগার্ট শহরে উপস্থিত হলেন। সম্মেলনে ব্রিটিশ সমাজতন্ত্রীদলের পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন রামজে ম্যাকড়োানাল্ড। ভারতীয় বিপ্লবীগণ যাতে সম্মেলনে প্রতিনিধিরূপে গৃহীত না হন তিনি সেজন্য চেষ্টা করতে লাগলেন। কিন্তু এ সত্ত্বেও ফরাসি সমাজতন্ত্রী নায়ক অধ্যাপক জয় রে, জার্মানির কার্ল লিবনেক্ট এবং মাডাম কামার বন্ধু রোজা লুক্সেমবার্গ এবং ব্রিটিশ মনীষী হাইন্ডম্যান প্রভৃতির চেষ্টায় ভারতীয় বিপ্লবীগণ সম্মেলনে পূর্ণ প্রতিনিধিরূপে গৃহীত হলেন। পতাকা অভিবাদন করে মাডাম কামা কংগ্রেসে নিম্ললিখিত প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন :

That the continuance of British rule in India is positively disastrous and extremely injurious to the best interest of India, and lovers of freedom of all over the world ought to co-operate in freeing from slavery the fifth of the whole human race inhabiting that oppressed country, since the perfect social state demands that no people should be subject to any despotic ot tyrannical form of Government.

প্রস্তাবের সমর্থনে মাডাম কামা এক উচ্ছ্বাসময়ী বক্তৃতায় সভামণ্ডপকে মুগ্ধ করলেন। ঘন-ঘন করতালির ধবনিতে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হল। প্রস্তাবটি যথাসময়ে কংগ্রেসের নথিভুক্ত হয়নি, এজন্য এ প্রস্তাব ভোটে দেওয়া হল না। কিন্তু উপস্থিত সদস্যগণ প্রায় সকলেই জয়ধবনি দিয়ে প্রস্তাবটি সমর্থন করলেন। এই দেখে সভাপতি বললেন, প্রস্তাবের অন্তর্নিহিত ভাব কংগ্রেস ও তার কমিটি অনুমোদন করেছেন। ফলে ভারতের স্বাধীনতার প্রস্তাবটি আন্তর্জাতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল।

এ দিকে লর্ড কার্জনের জনমত উপেক্ষায় বাঙালি জাতিকে সজাগ করে তুলেছিল এবং বাংলার নব জগরণ সমগ্র ভারতকে জাগিয়ে তুলল। নব অনুরাগের এক অভিনব দ্যোতনা আশা ও আনন্দে বাঙালি জাতি মেতে উঠল। নব-চেতনায় উদবুদ্ধ জাতি সেদিন নতুন করে অনুভব করল, সংগ্রামে তার পতাকা নেই।

স্বদেশি আন্দোলনের অধিনায়ক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম সহকর্মী ছিলেন তরুণ নেতা শচীন্দ্রনাথ বসু। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে একদিন তিনি এবং তার এক বন্ধু গিয়ে সুরেন্দ্রনাথকে ধরলেন—আমাদের একটি জাতীয় পতাকা চাই। সুরেন্দ্রনাথ বললেন, ‘আচ্ছা, তোমরা একটি পতাকা তৈরি করে এনে আমাকে দেখাও।’ বাংলার জাতীয় জীবনে তখন জোয়ার এসেছে। তাই তরুণ কর্মীদল কালবিলম্ব না করে পতাকা তৈরির কাজে গেলে গেল। ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা নির্মিত হল—রং ওপর থেকে নীচে সবুজ, পীত এবং লাল। পতাকা দেখে সুরেন্দ্রনাথ এক পরামর্শ সভা ডাকলেন। আশুতোষ চৌধুরী, আবদুল হালিম গজনভী এবং আরও কয়েকজনকে নিয়ে কমিটি গঠিত হল। কমিটির পরামর্শক্রমে স্থির হল মূল পতাকা তিন রং-এরই থাকবে। কিন্তু পতাকার তিন রং-এর ওপর ভারতের সাতটি প্রদেশের প্রতীক সাতটি পদ্ম থাকবে। সর্বসম্মতিক্রমে পতাকা গৃহীত হল। স্থির হল পরবর্তী ৭ আগস্ট গ্রিয়ার পার্কে পতাকা উত্তোলন করা হবে। পতাকা উত্তোলনের দিনে নরেন্দ্রনাথ সেন প্রথমে পতাকার জন্য প্রার্থনা করেন। ভূপেন্দ্রনাথ বসু পতাকাটি সুরেন্দ্রনাথের হাতে দেন এবং তিনি ১০১টি তোপধবনির মধ্যে তা উড্ডীন করেন। পরবর্তী ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। সভাপতি ছিলেন দাদা ভাই নৌরজি। সেখানে এই পতাকা উত্তোলন করা হয়। অধিবেশনে কংগ্রেস প্রতিনিধিদের ব্যাজেও এই তিন রং ছিল। সুতরাং দেখা যায়, ফরাসি প্রজাতন্ত্রের ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকাই ক্রমবিবর্তনের মধ্য দিয়ে ভারতের জাতীয় পতাকার রূপ পেয়েছে।

গ্রীয়ার পার্কে এই পতাকা উত্তোলনের সংবাদ ১৩১৩ বঙ্গাব্দে ২১ শ্রাবণ সঞ্জীবনী পত্রিকায় চিত্রাঙ্কিত রূপ প্রকাশিত হয়েছে :

স্কোয়ারের চতুপার্শ্বস্থ গৃহোপরি সম্ভ্রান্ত মহিলাগণ দণ্ডায়মান হইয়া এই জাতীয় উৎসব দেখিতেছিলেন। মধ্যে মধ্যে শঙ্খধবনি শোনা যাইতেছিল এবং বোমার আওয়াজ হইতেছিল। সকলের জয়ধবনির মধ্যে নরেন্দ্রবাবু সভাপতির আসন গ্রহণ করিলেন। নরেন্দ্রবাবু সর্বাগ্রে দণ্ডায়মান হইয়া গম্ভীর স্বরে আকুল কণ্ঠে একটি প্রার্থনা করিলেন। জলদগম্ভীর কণ্ঠের সেই প্রার্থনা শুনিয়া সমস্ত শরীর রোমাঞ্চিত হইয়া উঠিল। নরেন্দ্রবাবু আসন গ্রহণ করিলে হিন্দু ও মুসলমানের পক্ষ হতে শ্রীযুক্ত ভূপেন্দ্রনাথ বসু ও মি. আবদুল হালিম গজনভি সুরেন্দ্রবাবুর হস্তে নবনির্মিত জাতীয় পতাকাটি প্রদান করিলেন। সবুজ, পীত ও লাল রং-এর জমির ওপর প্রথম লাইনে আধ ইঞ্চি পদ্ম, দ্বিতীয় লাইনে সংস্কৃত অক্ষরে ‘বন্দে মাতরম’ এবং শেষ লাইনে সূর্য ও অর্ধচন্দ্রাকৃতিই জাতীয় পতাকার চিহ্ন হইয়াছিল। সুরেন্দ্রবাবু ওজস্বিনী বক্তৃতা করিয়া সকলকে এই জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধা অর্পণ করিতে বলিলেন এবং গগনবিদারী ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্যে জাতীয় পতাকা উড্ডীন করিলেন। অপরাহ্ণে কলেজ স্কোয়ারেও এই পতাকা উড্ডীন করা হল। এই পতাকা উত্তোলন সম্পর্কে যুগান্তর পত্রিকা লিখলেন—জাতীয় বৈপ্লবিক পতাকারূপে আমরা ইহাকে অভিনন্দন করিতেছি।

ফরাসি দেশে ভারতীয় বিপ্লবীদের উদ্যোগে এবং মাডাম কামার সম্পাদনায় তলোয়ার পত্রিকা প্রকাশিত হত। এই পত্রিকার বহিঃপটে ত্রিবর্ণ রঞ্জিত একটি জাতীয় পতাকা ছিল। তার ওপর ছিল সাদা পদ্ম, সূর্য, চন্দ্র ও তারা। দেবনাগরী অক্ষরে বন্দেমাতরমও অঙ্কিত থাকত। লন্ডনে শ্যামজি কৃষ্ণবর্মার ইন্ডিয়া হাউসে এবং অন্যান্য বিভিন্ন স্থানে মাডাম কামা এই পতাকা উত্তোলন করে বক্তৃতা করলেন—‘This is the Flag for which Khudiram and Prafulla Chaki died.’ ড. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত তার ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম’ পুস্তকে লিখেছেন, ‘ইহার পর এই পতাকা বার্লিনে ভারতীয় বিপ্লবীদের মধ্যে আবির্ভুত হয়। বার্লিন বৈপ্লবিক কমিটি এই পতাকা জাতীয় পতাকারূপে ব্যবহার করে।’ তিনি বলেন যে, ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে বার্লিনে গিয়ে তিনি কমিটির বাড়িতে এই পতাকা উত্তোলিত দেখেন। কিন্তু তখন তা ত্রিবর্ণ রঞ্জিত পতাকা মাত্র ছিল। বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ভূপেন্দ্রনাথকে বলেন যে, সূর্য, চন্দ্র প্রভৃতি তাঁরাই অপসারিত করেছেন। ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে অ্যানি বেসান্ত তাঁর Home Rule League-এর প্রতীকরূপে একটি জাতীয় পতাকা গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং, দেখা যাচ্ছে বাঙালি জাতিই ভারতকে প্রথম জাতীয় পতাকা উপহার দিয়েছিলেন এবং এর পশ্চাতে রয়েছে রামমোহন রায় এবং ফরাসি বিপ্লবের সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার ভাবধারার প্রভাব।

অসহযোগ আন্দোলনের সময় জাতীয় পতাকার প্রয়োজন নতুন করে অনুভূত হয়। মছলি পট্টনম ন্যাশানাল ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টার শ্রী পি. বেঙ্কটায়া এই সম্পর্কে একখানি পুস্তিকা লেখেন। তিনি ওই পুস্তকে ভারতীয় জাতীয় পতাকার এক নক্সার প্রস্তাব দেন। এর পরে পাঞ্জাবের লালা হংসরাজ আর একটি নমুনা প্রকাশ করেন। হংসরাজের কথাটায় চক্র অঙ্কিত ছিল। এজন্য এই পতাকাটি গান্ধিজির নিকট গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জাতীয় কংগ্রেসের বেজওয়াদন অধিবেশনে গান্ধিজি ও শ্রীবেঙ্কটায়ার উপরই জাতীয় পতাকা প্রস্তুতের ভার অর্পিত হয়। তাঁদের বলা হয়, এই পতাকার লাল রং থাকবে হিন্দুদের জন্য, সবুজ রং থাকবে মুসলমানদের জন্য এবং এর সঙ্গে থাকবে চরকা। কিন্তু সময় অভাবে এই পতাকার নমুনা কংগ্রেসের প্রকাশ্য অধিবেশনে উপস্থাপিত করা সম্ভব হয়নি। পরে গান্ধিজি ভাবলেন যে, জাতীয় পতাকায় ভারতের অন্যান্য সম্প্রদায়েরও প্রতীক ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। এজন্য তিনি জাতীয় পতাকার নিম্ললিখিত নক্সার প্রস্তাব করেন—সর্বোপরি শ্বেত রং থাকবে সকল সম্প্রদায়ের জন্য তার সঙ্গে থাকবে সবুজ রং মুসলমানদের জন্য এবং সকলের নীচে থাকবে লাল রং হিন্দুদের জন্য। এর পশ্চাতে এই মনোভাব ছিল যে, দুর্বল জাতিই প্রথম স্থান পাবে এবং শক্তিমান হবে দুর্বলের সহায়। দুর্বল যেন শক্তিবানের ওপর অনায়াসে নির্ভর করতে পারে। কিন্তু পরবর্তী কালে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের পরস্পর বিরোধী দাবি সকল ক্ষেত্রে মেনে নেওয়া সম্ভব হয়নি। এজন্য জাতীয় পতাকা সম্পর্কে এক সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি এক সাব-কমিটি নিয়োগ করে। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে নিখিল ভারত রাষ্ট্রীয় সমিতির বোম্বাই অধিবেশনে এই সাব-কমিটির প্রস্তাব আলোচিত হয় এবং ভারতের জাতীয় পতাকা সম্পর্কে নিম্ললিখিত প্রস্তাবটি গৃহীত হয় :

ভারতের জাতীয় পতাকা ত্রিবর্ণরঞ্জিত হবে। ওপর থেকে নীচে রং হবে গৈরিক, শ্বেত এবং সবুজ। শ্বেত অংশের মধ্যভাগে থাকবে ঘন সবুজ বর্ণে অঙ্কিত চরকা। বিভিন্ন রং কোনোরূপ সাম্প্রদায়িক তাৎপর্যমূলক হবে না। গৈরিক হবে সাহস ও আত্মত্যাগের প্রতীক, শ্বেত হবে শান্তি ও সত্যের প্রতীক এবং সবুজ হবে বিশ্বাস ও বীরত্বের প্রতীক। চরকা থাকবে জনতার আশা ও আকাঙক্ষার প্রতীক।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে ভারতের জাতীয় পতাকার সুদীর্ঘ দিনের ইতিহাস মহত্ত্বপূর্ণ। এই পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে ভারতবাসী বড়ো বড়ো আত্মবলির কার্য করেছে। ভারতীয় জনসাধারণ এবং ভারতীয় তরুণ সমাজ মহত্ত্বপূর্ণ বীরত্বের পরিচয় দিয়েছে। এই পতাকার নীচে দাঁড়িয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। হয়তো ভবিষ্যতেও এর নীচে দাঁড়িয়ে আমাদের বহু সংগ্রাম করতে হবে এবং বহু আত্মজ্ঞান করতে হবে। এই পতাকা আমাদের বিজয়ের পথ দেখাবে এই আশা আমরা রাখি। স্বাধীনতোত্তর ভারতে এই চরকার আরও কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। ভারতের জাতীয় পতাকায় চরকার স্থান পেয়েছে ঐতিহাসিক অশোকচক্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *