বন্দে মাতরম ও বঙ্কিমচন্দ্র
পুষ্পেন্দু লাহিড়ী
‘সাহিত্য সম্রাট’ বিশেষণটির মধ্যে অনেকে প্রাচীন এবং গ্রামীণ গন্ধ খুঁজে পান। কিন্তু ১লা জানুয়ারী, ১৯৬৯ সালে বেমক্কা বঙ্কিমচন্দ্রের ডাকটিকিটটি প্রকাশ হতে, আনন্দের আবেগে সেদিন আমার ওই বিশেষণটিই মনে উদয় হয়েছিল। স্মরণে ছিল রবীন্দ্রনাথের উক্তি :
বঙ্কিম সাহিত্যে কর্মযোগী ছিলেন। তাঁহার প্রতিভা আপনাতে আপনি স্থিরভাবে পর্যাপ্ত ছিল না। সাহিত্যে যেখানে যাহা কিছু, অভাব ছিল সর্বত্রই তিনি আপনার বিপুল বল এবং আনন্দ লইয়া ধাবমান হইতেন। কী কাব্য, কী বিজ্ঞান, কী ইতিহাস, কী ধর্মতত্ত্ব, যেখানে যখনই তাঁহাকে আবশ্যক হইত সেখানে তখনই তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত হইয়া দেখা দিতেন। নবীন বঙ্গসাহিত্যের মধ্যে সকল বিষয়েই আদর্শ স্থাপন করিয়া যাওয়া তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল। বিপন্ন বঙ্গভাষা আর্তস্বরে যেখানেই তাঁহাকে আহ্বান করিয়াছে সেখানেই তিনি প্রসন্ন চতুর্ভুজ মূর্তিতে দর্শন দিয়াছেন।
উল্লাসের সঙ্গে একটু বেদনাবোধও সেদিন আমাকে স্পর্শ করেছিল। জন্মতিরোভাবের তারিখ সম্পর্কশূন্য একটি দিন বঙ্কিমচন্দ্রের ডাকটিকিট প্রকাশের জন্যে কেন বেছে নিল ভারতীয় ডাকবিভাগ? অন্যতম জাতীয়-সঙ্গীত রচয়িতার একটি মাত্র ডাকটিকিটই বা মুদ্রিত হল কেন?
‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের শতবর্ষ স্মরণ করে আর একটি ডাকটিকিট হাতে পেলাম ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দের, ডিসেম্বরের ৩০ তারিখে। বহুবর্ণ এই ডাকটিকিটে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম স্তবক মুদ্রিত হয়েছে।
ডাকটিকিট দুটি হাতে নিয়ে ভাবছিলাম। বঙ্কিমচন্দ্র দূর-প্রসারী দৃষ্টি নিয়ে বুঝেছিলেন যে, ভারতবর্ষের রাজনৈতিক আশা-আকাঙক্ষার নদীতে একদিন জোয়ার বইবে। তাই তিনি জাতিকে জাগাবার মতো মন্ত্রের সন্ধানে ছিলেন। সেই মন্ত্র স্বদেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করার মধ্যে রূপ পরিগ্রহ করল। কমলাকান্তের দপ্তর রচনাকালে (১৮৭৩) এই মন্ত্র বঙ্কিমচন্দ্রের কল্পনায় বীজাকারে ছিল। কমলাকান্তও দেখেছিলেন ‘চিনিলাম, এই আমার জননী জন্মভূমি—এই মৃন্ময়ী—মৃত্তিকারূপিনী অনন্ত রত্নভূষিতা—এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। রত্নমণ্ডিত দশভুজ—দশ দিক—দশ দিকে প্রসারিত, তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নানা শক্তি শোভিত ; পদতলে শত্রু-বিমর্দিত বীরজন কেশরী শত্রু নিস্পীড়নে নিযুক্ত! এ মূর্তি এখন দেখিব না—কিন্তু একদিন দেখিব—দিগভুজা, নানা প্রহরণ প্রহারিণী, শত্রু মর্দিনী, বীরেন্দ্রপৃষ্ঠবিহারিণী—দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিনী, বামে বিদ্যাবিজ্ঞান মূর্তিময়ী, সঙ্গে বলরূপী কার্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ, আমি সেই কালস্রোতোমধ্যে দেখিলাম, এই সুবর্ণময়ী বঙ্গপ্রতিমা।’
কমলাকান্ত দশভুজা দশপ্রহরণধারিণীকে দেখেছেন অতীতের মহিমময়ী রূপে। এতদ সত্ত্বেও ‘একদিন দেখিব’ বলে কমলাকান্ত যে আশা প্রকাশ করেছেন, বঙ্কিমও সেইরকম অতীতের উজ্জ্বল স্মৃতি নিয়ে স্থির থাকতে পারেননি। আগামী দিনের স্বাধীনতা লাভের প্রশ্নই তাঁকে বারবার উত্তেজিত করেছে। আজ থেকে একশ বছরেরও আগে কোনো এক মাহেন্দ্রক্ষণে (সম্ভবত ১৮৭৫ খ্রীঃ) সৃষ্টি হল ভারতের জাতীয় মন্ত্র ‘বন্দে মাতরম’। যদিও এই মন্ত্রের সঙ্গে জাতির সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটেছিল আরও কয়েকবছর বাদে আনন্দমঠ উপন্যাসটির মাধ্যমে (১৮৮০ খ্রীঃ)। পরাধীন অবস্থার জন্যে বঙ্কিমকে জাতীয় মন্ত্রপ্রচারে সন্ন্যাসী বিদ্রোহের কাহিনীর অন্তরাল নিতে হয়েছিল। কিন্তু সত্যদ্রষ্টার কল্পনায় তিনি নিজের কন্যাকে একদিন বলেছিলেন যে, ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত নিয়ে বিশ ত্রিশ বছর বাদে বাঙলাদেশ উন্মত্ত হয়ে মেতে উঠবে। সেই ঋষিবাক্য সফল হয়েছে। পরবর্তীকালে পরিত্যক্ত প্রথম সংস্করণ আনন্দমঠ-এর শেষে ছিল :
…সহসা সেই বিষু�মণ্ডপের দীপ, উজ্জ্বলতর হইয়া জ্বলিয়া উঠিল ; নিবিল না। সত্যানন্দ যে আগুন জ্বালিয়া গিয়াছিলেন তাহা সহজে নিবিল না। পারি ত সেকথা পরে বলিব।
এই অংশ পরবর্তী সংস্করণে সেকালীন রাষ্ট্রনৈতিক অবস্থা বুঝে পরিহার করা হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র যে কথা বলেননি, ইতিহাস সে কথা বলেছে। উত্তাল বিদ্রোহ বহ্নির মধ্যে দিয়ে ভারতের স্বাধীনতা এসেছে।
অবশ্য স্বদেশকে মাতৃরূপে কল্পনা আমরা বঙ্কিমের আগেও পেয়েছি। ১৮৪৭ সালে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত লিখেছিলেন :
জান নাকি জীব তুমি জননী জনম ভূমি
যে তোমারে হৃদয়ে রেখেছে।
এই কবিতা রচিত হবার একশ বছর বাদে ভারতমাতা শৃঙ্খলমুক্ত হল। রঙ্গলালের পদ্মিনী উপাখ্যান পাচ্ছি :
যেদিন ভারতভূমি ছিলেন স্বাধীন,
অসংখ্য বীরের যিনি জন্মপ্রদায়িনী।
মধুসূদনও কাতর আর্তি জানিয়েছিলেন, ‘রেখো মা দাসেরে মনে।’ বোঝাই যায় যে এইসব উদ্ধৃত অংশে উদ্দিষ্ট ‘মা’ হল স্বদেশভূমি। ১৮৬৭ সালে অনুষ্ঠিত হিন্দুমেলায় সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা গানে, সমস্ত ভারতসন্তান মিলে মায়ের মুখ উজ্জ্বল করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রই দেশমাতৃকার রূপ প্রথম ফুটিয়ে তুললেন ‘বন্দে-মাতরম’ সঙ্গীতে।
দিব্যদৃষ্টির বলে কমলাকান্ত বুঝেছিলেন ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশমাতাকে উদ্ধার করতে হবে। বলেছিলেন :
উঠ মা এবার সুসন্তান হইব, সৎপথে চলিব—তোমার মুখ রাখিব। উঠ মা, দেবী দেবানুগৃহীতে—এবার আপনা ভুলিব—ভ্রাতৃবৎসল হইব, পরের মঙ্গল সাধিব—অধর্ম, আলস্য, ইন্দ্রিয়ভক্তি ত্যাগ করিব—উঠ মা।
কমলাকান্তের জননীকেই আনন্দমঠ-এর সত্যানন্দ দেখেছেন অনাগত যুগের দেশমাতৃকার মধ্যে। তাই মহেন্দ্র ‘বন্দে-মাতরম’ সঙ্গীত শুনে ভবানন্দকে ‘মাতা কে?’ প্রশ্ন করলে, ভবানন্দ বলেছিলেন, ‘আমরা অন্য মা মানি না, জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরিয়সী। আমরা বলি জন্মভূমিই জননী।’
কমলাকান্তের প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করল আনন্দমঠের সন্তানদল। নবাবী আমলের ছিয়াত্তরের (বাঙলা ১১৭৬ সন) মন্বন্তরের পটভূমিকায় বঙ্গের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের ঘটনা নিয়ে আনন্দমঠ রচিত হয়েছে। কিন্তু সেটি উপলক্ষ্য মাত্র। গত শতাব্দীর সপ্তম দশকের শেষার্ধে ও অষ্টম দশকের গোড়ায় কয়েকটি গ্লানিকর রাজকীয় বিধিব্যবস্থার বিরুদ্ধে সেকালীন শিক্ষিত বাঙালী সমাজ আন্দোলন শুরু করে। যেমন, সিভিল সার্ভিস, দেশীয় মুদ্রাযন্ত্র আইন, অস্ত্র আইন প্রভৃতি। ভারতবর্ষের শাসনকেন্দ্র কোলকাতা থেকে স্বাভাবিক গতিতেই এই আলোড়ন বিভিন্ন প্রদেশে তরঙ্গায়িত হয়ে ওঠে। এই রকম সন্ধিক্ষণে আনন্দমঠ-এর জন্ম। ইংরেজের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের বিক্ষোভ, রূপকচ্ছলে নবাবের অত্যাচারের বিপক্ষে বাঙালী সন্তানদলের বিদ্রোহে পরিণত হল। তাই সপ্তকোটি বাঙালী কণ্ঠ, পরবর্তীকালে ত্রিশকোটি ভারতীয় কণ্ঠের ভেতর বিলীন হয়ে গেল। দেশবাসীকে মাতৃমন্ত্রে জাগিয়ে তুললেন বঙ্কিমচন্দ্র। পরের যুগে অগ্নিমন্ত্রে দীক্ষিত বিপ্লবীদের হাতে হাতে ঘুরে বেড়াত আনন্দমঠ। পুলিশ আনন্দমঠ দেখলেই কেড়ে নিয়ে যেত সেদিন।
স্বদেশী যুগে মুকুন্দরামের কণ্ঠে বেজে উঠেছিল,
”জাগো গো জাগো গো জননী,
তুই না জাগিলে শ্যামা আর কেহ জাগিবে না ;
তুই না নাচিলে মাগো,
নাচিবে না ধমনী।
কিংবা উল্লেখ করা যেতে পারে স্বামী বিবেকানন্দের সেই উদাত্ত কণ্ঠস্বর :
ভুলিও না—তুমি জন্ম হইতেই ‘মায়ের’ জন্য বলিপ্রদত্ত ; ভুলিও না—তোমার সমাজ সে বিরাট মহামায়ার ছায়ামাত্র ; ভুলিও না নীচজাতি, মূর্খ, দরিদ্র, অজ্ঞ, মুচি, মেথর তোমার রক্ত, তোমার ভাই! ….বল ভাই—ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বর্গ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ……মা, আমার দুর্বলতা, কাপুরুষতা দূর কর, আমায় মানুষ কর।
এই প্রসঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের ‘দ্বীপান্তরের বন্দিনী’ কবিতার পঙক্তি মনে পড়ে:
আসে নাই ফিরে ভারত-ভারতী?
মা’র কতদিন দ্বীপান্তর
পুণ্য বেদীর শূন্যে ধবনিল
ক্রন্দন—দেড়শত বছর!
কিংবা ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কবিতা-সঙ্গীতের সেই উদ্দীপনাময় স্তবক :
অসহায় জাতি মরিছে ডুবিয়া জানে না সন্তরণ,
কাণ্ডারী! আজ দেখিব তোমার মাতৃমুক্তিপণ!
‘হিন্দু না ওরা মুসলিম’ : ওই জিজ্ঞাসে কোন জন?
কাণ্ডারী! বল ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মা’র!
বঙ্কিমচন্দ্রের মাতৃমন্ত্র এইভাবেই ছড়িয়ে পড়ল সমগ্র দেশে।
১৯২৯ সালে শরৎচন্দ্র ‘তরুণের বিদ্রোহ’ শীর্ষক বত্তৃ�তায় স্বাধীনতা সম্পর্কে বাঙালির দান সম্পর্কে উল্লেখ করে প্রসঙ্গত বলেছিলেন, তাই ‘বন্দে মাতরম’-মন্ত্র সৃষ্টি এই বাঙলায়।’ ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বিদ্রোহ-নায়ক সূর্য সেন পরিচালিত সাময়িক বিপ্লবী গণতন্ত্রী সরকারের ঘোষণা কালে বলা হয়েছিল, ‘বৃটিশ দস্যুর প্রতি বিন্দুমাত্র করুণা নয়। বিশ্বাসঘাতক ও লুণ্ঠনকারী দল সমূলে নিশ্চিহ্ন হউক। সাময়িক বিপ্লবী সরকার দীর্ঘজীবী হউক। বন্দে মাতরম।’
আচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর বঙ্কিমচন্দ্র প্রবন্ধে (১৯৩৮) বললেন :
দেশের প্রাণকে, দেশের আশা-আশঙ্কা শক্তি সাধনা সমস্তকে তিনি দেশমাতা-রূপে কল্পনা করেন—ভারতমাতা এই শব্দের মধ্যে যে ভাবজগৎ, যে চিন্তাধারা, চিত্রসম্পুট, যে আত্মাহুতির স্পৃহা বিদ্যমান, তাহার আবাহনকারী বঙ্কিমচন্দ্র ; ‘বন্দে মাতরম’ গান এই হিসাবে কেবল vers d’ occasion অর্থাৎ সাময়িক উচ্ছাসের প্রকাশক কবিতা নহে—ইহা ভারতের শাশ্বত মহিমার সামগান, ভারতের বাহ্য-প্রকৃতির, ভারতের সভ্যতার, ভারতের আত্মার উদ্বোধক রাষ্ট্রসঙ্গীত।
‘বন্দে মাতরম’ বিষয়ে মহাত্মা গান্ধীর রচনাও (১৯৩৯ খ্রীঃ) আত্মশ্লাঘার সঙ্গে স্মরণীয় :
লক্ষ লক্ষ মানুষের হৃদয়ে এর সিংহাসন প্রতিষ্ঠিত। বাঙলার ভেতরে এবং বাইরে সহস্র লোকের মধ্যে এই সঙ্গীত জাগিয়ে তুলেছে দেশপ্রেম। সমগ্র জাতির কাছে বাঙলার অনেক দানের মধ্যে এই গানের কয়েকটি নির্বাচিত স্তবক অন্যতম।
ভারত স্বাধীন হবার পর ১৯৪৮ সালে লোকসভায় জওহরলাল বলেছিলেন :
স্পষ্টত এবং অবিসম্বাদিতভাবে ‘বন্দে মাতরম’ বিরাট ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সমেত ভারতের প্রধান জাতীয় সঙ্গীত ; আমাদের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে এটি অন্তরঙ্গ রূপে জড়িত।
ফরাসী বিদ্রোহের সময়ে (১৭৯২ খ্রীঃ) ‘লা মার্সেলেস’ সঙ্গীতটি যেমন বিপ্লবী ফরাসীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে উন্মাদনার সৃষ্টি করেছিল ; ‘বন্দে মাতরম’ মাতৃমন্ত্র তেমনি ভারতীয়দের উদ্দীপনা এনে দিয়েছিল। যার ফলে আমাদের বিলিতি বিধাতা পুরুষদের বিচলিত করে তোলে। তারা আজও ‘বন্দে মাতরম’ কে ভীতিমিশ্রিত ঘৃণার চোখে দেখে। সেইজন্যই ‘এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকার’ ১৯৭২ সালের সংস্করণে দেখতে পাচ্ছি:
তাঁর (বঙ্কিম) মধ্যে জাতীয়তাবাদ ও হিন্দুত্ব একাকারে মিশে গিয়েছিল এবং তাঁর ধর্ম তাঁর ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের মধ্যেই সংক্ষিপ্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। পরবর্তীকালে যা হিন্দু-ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মন্ত্র এবং স্লোগান রূপে ব্যবহৃত হয়েছে।
বঙ্কিমচন্দ্রের জাতীয়তাবাদ বুঝতে না পেরে, তারা তাঁর মধ্যে সঙ্কীর্ণতার ছায়া দেখে। কিন্তু আমরা জানি ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতে যে ঐক্যের সন্ধান রয়েছে, তা ভারতবাসীর পক্ষে এক অদ্ভুত গণশক্তির উদ্বোধন করেছে।
বৈষ্ণব কবিতায় যেমন বাঙলা-সংস্কৃত মিশিয়ে লেখার রীতি আছে ; বঙ্কিমচন্দ্রও ভবিষ্যতের কথা স্মরণ রেখে তেমনি ‘বন্দে মাতরম’ গানে প্রচুর সংস্কৃত শব্দের সমাবেশ ঘটিয়েছেন, যাতে ভাবীকালের ভারতীয়দের পক্ষে সে মন্ত্র গ্রহণযোগ্য হয়। ভাবতে গর্ব বোধ হয়, ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র এবং সুরকার রবীন্দ্রনাথ। এই মণিকাঞ্চন যোগে ‘বন্দে মাতরম’ ভারতের অন্যতম জাতীয় সঙ্গীত।
বঙ্কিমচন্দ্রের স্বদেশমাতা একদিকে ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং শস্যশ্যামলাম’, অন্যদিকে ‘বহুবল ধারিণীং’ ‘রিপুদল বারিণীম’। এই দেশমাতৃকাকে আবাহন করে বঙ্কিম দেশবাসীকে বলতে শিখিয়েছেন—বন্দে মাতরম। অবশ্য রচয়িতার জীবদ্দশায় এই সঙ্গীতটির বিশেষ প্রয়োগ হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্রের আমলেই ঠাকুর পরিবারে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত প্রচলিত হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর দু বছর পর কোলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে (১৮৯৬ খ্রীঃ) স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ গানটি গেয়েছিলেন। কিন্তু মাতৃমন্ত্রে দীক্ষিত হতে ভারতীয়দের সময় লেগেছে বেশ কিছুদিন। বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫ খ্রীঃ) বিরুদ্ধে দেশব্যাপী যে আলোড়ন ঘটে, সেই সময় প্রথম দেশবাসী দেশ মাতৃকাকে ‘বন্দে মাতরম’ বলে সহস্রকণ্ঠে প্রণাম করে। ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের প্রথম উচ্চারণেই সাফল্য এসে গেল। বঙ্গভঙ্গ রদ হল। তারপরই শুরু হলো ‘বন্দে মাতরমের’ গৌরবময় ইতিহাস। জালিয়ানওয়ালবাগের বীভৎস গণহত্যার (১৯১৯) পর, সারা দেশে যে দাবানল জ্বলে উঠেছিল, সেই সময় ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র আবৃত্তি করতে করতে অসংখ্য নরনারী হাসিমুখে অদৃষ্টকে পরিহাস করেছিল। বিজয় অভিযান চলল ‘বন্দে মাতর’ মন্ত্রের। ভারতের বিপ্লবী দলের হৃদয়ের বাণী ছিল ‘বন্দে মাতরম’। ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র মুখে নিয়ে শত শহীদের বুকের রক্তে ত্বরান্বিত হয়ে উঠল ভারতের স্বাধীনতা।
সেই স্বাধীনতা মন্ত্রের অন্যতম উদগাতা বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর মাতৃমন্ত্র ‘বন্দে মাতরম’-এর ডাকটিকিট দুটি তাই গভীর শ্রদ্ধায় অ্যালবামে সাজিয়ে রেখেছি।
