বন্দে মাতরম কি সাম্প্রদায়িক সংগীত – মনোরঞ্জন বিশ্বাস

বন্দে মাতরম কি সাম্প্রদায়িক সংগীত

মনোরঞ্জন বিশ্বাস

না স্বীকার করে উপায় নেই, বাংলায় Nation শব্দের কোনো প্রতিশব্দ নেই। রবীন্দ্রনাথ নিজে একটি প্রতিশব্দ উদ্ভাবন করেছিলেন, অধিপতি…. তা যে প্রচলন হয়নি সে তো রবীন্দ্রনাথ জেনেই গিয়েছিলেন…

Nation শব্দটির অন্তরাকৃতির খোঁজে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, Nation শব্দটি একটি মানস পদার্থ…জাতি, ভাষা, বিষয়, স্বার্থ, ধর্ম, ঐক্য, ভৌগোলিক অবস্থান Nation নামক পদার্থটির কোনো উপকরণই নয়…রবীন্দ্রমানস নিজের মতন একটা ব্যাখ্যাতত্ত্ব দাঁড় করিয়েছিলেন, তা এই রকম…অতীত সর্বসাধারণের স্মৃতি সম্পদ, বীরত্ব, মহত্ত্ব কীর্তির ওপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে National ভাবের গাঠনিকতা…ধ্রুপদী গৌরব ও কাল সময়ের সর্বসাধারণের একত্রিত কর্মধারা ও কর্ম সঙ্কল্প ন্যাশনাল ভাবের ভিতরের প্রকৃতি সত্তা, এই নিরীক্ষণে হয়ত বলা যায় ভারতবর্ষীয় সমাজে এই ভাব শর্ত নিয়ত রয়েছে বলেই ভারত একটি Nation…

Nation নিয়ে সব ঝুটঝামেলা মিটে যায় ইংরেজরা গায়ের জোরে ভারত দখল করার পর পশ্চিমী আলোকিকতা থেকে অনেক কিছুই নিয়েছে ভারত। এই Western Impact যে প্রধান দুটি ভাবুকতা দিলে তার একটা হল National Issue জাতি-প্রতিষ্ঠা, জাতীয়তাবোধ, অন্যটি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবোধ…আবার পরশতার বিপরীতার্থক তত্ত্ব থেকে স্বাতন্ত্র্যবোধের এই জাতীয়তাবাদের জন্ম…

Minority Ruler ইংরেজদের চিন্তা ভাণ্ডার থেকে এই Concept নেওয়া যা ইংরেজ আসার আগে সাতশো বছর মুসলমান Minority Rule না এলে এই Concept দিতে পারেনি…নীরদ চৌধুরী বলতেন ইংরেজ না এলে আমরা মানুষ হতাম না। বঙ্কিম এই দুই বোধের Icon ইংরেজদের হাত থেকে নিলেও এই স্বাতন্ত্র্য ছিল ভারতমুখী, তা ইংরেজদের ভোগমুখী, নয় ত্যাগমুখী….এর থেকেই জন্ম নেয় সংযম, সাধনা, ত্যাগ, বৈরাগ্যধর্মী জীবনাচরণ….সাধারণ জীবনযাপনের শুদ্ধতাবোধ…একে বলা যায় উনিশ শতকী স্বাতন্ত্র্যবোধ ইংরেজদের কাছ থেকে পাওয়া এই National Concept, কোনো আধারে ন্যস্ত না হলে অর্থাৎ National Conceptটি জাতীয় ভাব হয়ে উঠতে চাইলে একটা Icon-এর অনিবার্যতা এসে পড়ে…ভারতে সেই Iconটি পাওয়া যায় একমাত্র ধর্মভাবের পরিকাঠামোয়…অন্য কোনো গাঠনিকতা নিতান্ত বাড়ন্ত…

মধ্যযুগের পুরাণকল্পগুলি ধর্মভাব অভিব্যক্তির লোকায়ত সাহিত্য… এর মধ্যে আত্মগোপন করে থাকে সামাজিক অনুশাসন ও শক্তির উপকরণ… প্রতীকী বলাও বুঝি যথার্থ নয়… এগুলি না রূপক, না প্রতীকী…, না সাঙ্কেতিক কোনো কিছুই নয়। সারা মধ্য যুগ একটানা মুসলিম শাসনের অবসিত কাল অবধি যা কিছু সংস্কৃতির সঞ্চয় পদকাব্য, কৃষ্ণকাব্য, রাধাকাব্য, মঙ্গকাব্যেই নিঃশেষ হয়ে গেছে…

এই সব মঙ্গল সাহিত্যে ম্যাজিক, দেবকল্পনা, কিংবদন্তী, লোকায়াত সংস্কৃতি আধারে কল্পলোকবাসী দেবদেবীর-ই রাজ্যপাট…জাতি ভাবনা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে এই কল্পপুরাণগুলি নইলে মান্যতার সীমায় পৌঁছয় না…

বিশেষ করে ভাব জগৎটি সেই সব Romantic কবি মনের ঐশ্বর্য…ভারতে এই প্রত্ন ঐশ্বর্যের অন্ত নেই…বেদসাহিত্যমালা রামায়ণ মহাভারত পুরাণ সংহিতাগুলি এই সব কল্পলোকের প্রান্তর।

তাই Nation ধারণাটি অক্লেশে পুরাণের কল্পভূমিতে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়…জাতি নির্মাণ প্রকল্পেও তাই এই পুরাণপ্রতিমাগুলি যুক্ত হয়ে পড়ে…

দুর্গ Graphics যে সমাজে কল্পরূপ পেয়েছিল সে সমাজ কবেই ইতিহাসের প্রাচীন অধ্যায় হয়ে গেছে…সে সমাজ আর নেই, প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও শূন্য…কিন্তু রেখে গেছে এই Graphicsটা…এক সময় এই Graphics দেববংশভূতা ছিল…একালে উনিশ শতকে কবি-কল্পনার ডানায় এই Graphics বিচিত্ররূপিনী হতে থাকে…আর তার বহুমাত্রিক ব্যাখ্যা হতে থাকে দেবতা প্রিয় হতে পারে, হতে পারে প্রিয় দেবতা…কোনো বিঘ্ন নেই এই রূপ থেকে রূপান্তরে যাওয়া আসায়, দেবতা মানবে এই মিলন সাধনের পালায় তত্ত্ব গড়ে ওঠে যেমন একটা তত্ত্ব, শুভ-অশুভের সংঘাত, দেবাসুরের যুদ্ধ কল্পনা এক সময়ে সামাজিক Milieu-তে ন্যায় যুদ্ধ ও অন্যায় যুদ্ধ হয়ে দাঁড়ায়…যেমন বিনাশায়ত দুষ্কৃতার গীতায় তেমনি দুর্গা Graphics-এ সেই দুষ্কৃতি বিনাশে Motif ব্যঞ্জনা বেজে যায়…

বঙ্কিমে এসে এই দুর্গা Graphics-কে দেশানুরাগের ভরা প্লাবনের দিনে যা জাতীয়তাবাদ নয়, দেশকল্পনা মাতৃকল্পনায় স্বপ্ন জাগাতে থাকে… যে মাতৃতান্ত্রিক সমাজে নারীই প্রধান, দুর্গা-কালী, সেই মাতৃতান্ত্রিকতার প্রতিকল্প হয়ে ওঠে সহজেই…

বলার হেতুই থাকে না যে, কোনো দেশ, কোনো জাতির মধ্যে দেশকে মাতৃরূপে কল্পনা করায় নন্দনসুখ যদি থাকে, ভারতবর্ষ সেই দেশ…তাই ভারতমাতা অবন ঠাকুরের হাতে ছবি হয়ে ওঠে, অতুলপ্রসাদের ‘ওঠ গো ভারতলক্ষ্মী’, দ্বিজেন্দ্রলালের ‘বঙ্গ আমার জননী’ আর রবীন্দ্রনাথের ‘বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা…’ ইত্যাদি এমন অন্তহীন রূপময়তা দেখা যাবে…এছাড়াও মাতৃসম্বোধনের মত মধুর সম্বোধন আর কী আছে জগতে….এই সম্বোধনই তো একটা সংস্কৃতি…

বঙ্কিমে এসে দেশকে ‘মা’ নামে ডাকার যে রোমাঞ্চ…এ এক আলঙ্কারিতা…এখানে দুর্গা Graphics দেবী নয়, ঈশ্বরী নন পূরাণকল্পিতা দেববংশোদ্ভুতা কেউ নয়…বঙ্কিমে এসে এই Graphics সৌন্দর্যালঙ্কার মানবায়িত প্রতিতুলনায় পৌঁছে যায়… দেশ এবং দুর্গা ভাবব্যঞ্জনায় নিজের নিজের শব্দার্থ হারিয়ে বিমিশ্রণে এসে Third Dimension-এ ভিন্ন অর্থময়তায় যা হয়ে দাঁড়ায় তা একটা Metaphor…শক্তি সৌন্দর্য দেশশক্তি দেশমাতার এই অভিধা ডুবে যায়। দশশক্তির অভিজ্ঞানে এই দেশশক্তির অভিব্যক্তি দুর্গা Graphics-এর মধ্যে যে যুদ্ধ ছবির তীব্র ব্যঞ্জনা অনুভবোরণিত হয়…বঙ্কিমের এই দেশবর এই Milieu-তে প্রকাশ সামর্থ্য অর্জন করেছে…এর মধ্যে ঈশ্বর-ঈশ্বরীর কোনো ভাবঅস্তিত্ব তো নেই-ই, বরঞ্চ ঈশ্বরবঞ্চিত…

বাইরের দুর্গোৎসব, দেবী বন্দনার সঙ্গে এ দূরত্ব অনেক যোজন…এ তো দুর্গোৎসবের দেবী নয়, দেশালঙ্কার Metaphor যা কোনো সমাজের ঊর্ধ্বে …জাতি, ধর্ম বর্ণের ঊর্ধ্বে…….ধর্মভাবের অতীত এক প্রগাঢ় ধ্রুপদী সৌন্দর্যশক্তি…সৌন্দর্যরূপিণী দেশ আনন্দমঠে

ভবানন্দ গাইছেন :

বন্দেমাতরম

সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং

শস্যশ্যামলাং মাতরম…

মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করলেন : মাতা কে?

ভবানন্দ গাইলেন :

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত যামিনীম

ফুল্লকুসুমিত দ্রুমদল শোভিনীম

সুহাসিনীং সুমধুর ভাষিনীম

সুখদাং বরদাং মাতরম।

মহেন্দ্র বললেন :

এ ত, দেশ এ ত মা নয়…

ভবানন্দের গানও বলছে…এই দেশই সুখদাং বরদাং….ইনিই মা।

অবিনির্মিত ‘বন্দে মাতরম’, কালছায়া এক কালধবনি, দেশশক্তির উন্মোচনের সৌন্দর্যময় মহাজাগরণের গান…

ছাবিবশ চরণের এই ধ্রপদী সংগীতটির ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রাক্ষরে সংগীতটির প্রকাশের ১২৫ বছর পূর্ণ হল…বঙ্গদর্শনে এই গানটি মুদ্রিত হয়েছিল ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে… ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দে গানটি প্রথম রচিত হয়…১৮৮২ খ্রিস্টাব্দে ১৫ ডিসেম্বরে ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাসে প্রকাশিত হয়…গানটি আনন্দমঠে Theme song হিসেবে স্থাপিত হয়।

এ সংগীতটির মর্মস্বর, রাজশক্তির বিপ্রতীপে দেশশক্তির উত্থান, পরিশেষে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল…

ভবানন্দ ও মহেন্দ্রর সংলাপে লক্ষিত আছে : মহেন্দ্র বলছে…রাষ্ট্রশক্তি দখল করবে কী করে?

ভবানন্দ বলল, মেরে…

মহেন্দ্র বলল,…একা…

ভবানন্দ : সপ্তকোটি কণ্ঠ কল কল নিনাদ করালে

দ্বিসপ্তকোটি ভুজে ধৃতঙ্করকরবালে

এরপরেই যা বললেন, ভবানন্দ, যেখানে বঙ্কিমের দেশ ও মা, মা ও দেশ সমার্থক হয়ে ওঠে… অবলা কেন মা এত বলে…

ভবানন্দ যে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের কথা বলে, যা পরবশতার থেকে মুক্তির কথা বলে…জাতীয়তাবাদের রণধবনি বলি আমরা…

জাতীয়তাবাদ যদি সত্যি হয় অথবা সত্য বলে গ্রহণ করি, সত্য যদি হয় স্বাধীনতা কামনা, সত্য যদি হয় দেশমুক্তি তাহলে যে রণধবনি দিয়ে সর্বাপেক্ষা অধিজাতিকে পরাধীনতার শেকল ভাঙার পণে ভাব ঐক্যে আনা সম্ভব, সেই ধবনি বা গীত বা Slogan-কে গ্রহণ করব না কেন? যদি এই গীতধবনি প্রেরণার গভীর বাণী হয়, তাহলে গ্রহণ করতে বাধা কোথায়? যদি এই বাণী জাতীয়তাবাদের ব্যঞ্জনাকে দেশমনে ঝঙ্কৃত প্রকাশসমর্থ ধবনি হয়ে উঠতে পারে…এবং দেশ যদি তা চায়, তবে সে তো আপনিই দেশধবনি হয়ে উঠবেই…

এখানেই সেই প্রশ্নটি তোলা যেতে পারে…জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণের প্রশ্নে তার অভিমত জানতে চাওয়া হয়েছিল… রবীন্দ্রনাথ যেটুকুতে দেশ প্রকৃতি সৌন্দর্য ও মাধুর্যে প্রকাশমান, সেইটুকুই গ্রহণ করতে মতামত দিয়েছিলেন… প্রয়োজনের জন্যে খণ্ডাংশটি যথার্থ…কিন্তু বন্দেমাতরমের সত্যার্থটি এই খণ্ডাংশে নেই…ভবানন্দের দেশভাবনা মাতৃভাবনা সমার্থক হয়ে যখন জাতীয়তাবাদের রণধবনি হয়ে ওঠে…অধিজাতিক মুক্তিগীতি হয়ে ওঠে এই মর্মধবনি অনুপস্থিত থাকলে…বন্দেমাতরমের সার্থকতাই ফুরিয়ে যায়…জাতির গান হয়ে উঠতেও ব্যর্থই হয়…

সম্ভবতঃ ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত সমগ্রটি যে আলঙ্কারিকতার বাঁধনে প্রগাঢ় ঐশ্বর্যময় সেইখানেই বাঁধা…আর সেইখানেই বঙ্কিমমানসের এবং বন্দেমাতরমের সত্য…

প্রশ্ন : ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটি কী Secular ? একশো পঁচিশ বছরেরও এই প্রশ্ন চিরঅমীমাংসিত রয়েই গেছে…কেন না ভারতবর্ষ শুধু হিন্দুর নয়…বহু ধর্ম, জাত ও বর্ণের দেশ ভারতবর্ষ…সমগ্র সংগীতটিকে গ্রহণের পক্ষে বাধা এখানেই… ‘বন্দে মাতরম’ হিন্দু গীতি ‘বন্দে মাতরম’ সাম্প্রদায়িক গীতি

এখানেই প্রশ্ন তোলা যায় : ‘বন্দে মাতরম’-এর Motif কী?

১ ‘বন্দে মাতরম’ সাম্প্রদায়িকতা প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত কী?

২ সাম্প্রদায়িকতার বিদ্বেষ নিয়ে রচিত কী…?

৩ জাতি বিদ্বেষ, জাতিগত ঘৃণা, বৈরিতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে রচিত কী?

৪ কোনো সম্প্রদায় বিশেষকে পরোক্ষে ব্যঙ্গ বিদ্রূপ কিংবা তাচ্ছিল্যভরে লেখা কী?

৫ জাতিসংঘর্ষ সৃষ্টির লক্ষ্যে রচিত কী?

৬ হিন্দুত্ব প্রচারের উদ্দেশ্যে রচিত কী?

বঙ্কিম নিজে ‘বাঙলার নব্য লেখকদিগের প্রতি নিবেদন’-এ লিখেছেন

‘যাহা অসত্য, ধর্ম বিরুদ্ধ, পরনিন্দা বা পরপীড়ন ও স্বার্থসাধন যাহার উদ্দেশ্য, সে সকল প্রবন্ধ কখনো হিতকর হইতে পারে না সুতরাং তাহা একেবারে পরিহার্য।’

রাজসিংহ উপন্যাসের উপসংহার-এ লিখেছেন বঙ্কিম, ‘কোনো পাঠক না মনে করেন হিন্দু মুসলমানের কোনোপ্রকার তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য।’ এই বঙ্কিমই বাংলা ভাষায় প্রথম উপন্যাস দুর্গেশনন্দিনী-তে আয়েষার মুখে বলিয়েছেন ‘এই বন্দীই আমার প্রাণেশ্বর।’

সুতরাং প্রশ্নই ওঠে না বঙ্কিমের উদ্দেশ্য নিয়ে। এ প্রসঙ্গে বহু উদাহরণ বঙ্কিম সাহিত্য থেকেই দেওয়া যায়…তার অভাব হবে না…

তবে কেন আনলেন বঙ্কিম, দেশের জাতিবিন্যাস, বর্ণবিন্যাস, ধর্মবিন্যাস, আচার-সংস্কারবিন্যাস জানা সত্ত্বেও দুর্গা Graphics-কে।

বঙ্কিমের হিন্দু উৎস…বঙ্কিম বাঙালি বাংলা ও বাংলা ভাষা বঙ্কিমের দ্বিতীয় উৎস বঙ্কিমের ছিল আপন ধর্মবিশ্বাস… সেই সঙ্গে ছিল জাতীয়তাবাদের এই সঙ্গে অনিবার্যভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল ইংরেজের সোনার শেকলে বাঁধা বঙ্কিমের ডেপুটি অলঙ্কার, বরাবর যার প্রতি বঙ্কিমের ছিল তীব্র ধিক্কার যা ছিল দেশানূরাগের আঁতুড় ঘর… সংঘাত প্রবৃত্তি…এই সংঘাত-ভাব রূপ পেতে চাইছিল…এই যুদ্ধ প্রবৃত্তি শেষে হয়ে ওঠে সপ্তকোটি কণ্ঠ কলকল নিনাদ করালে দ্বিসপ্তকোটি ভূজৈর্ধৃত খর করবাল…হয়ে ওঠে বহু বল ধারিণীম, ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী… মেলানো মেশানো দেশশক্তি মাতৃশক্তির আধারে রবীন্দ্রনাথের ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি’ এই অপরূপরূপে বাহির হলে ‘জননী দেখে দেখে আঁখি না ফেরে’ কিংবা ‘ডান হাতে তোর খড়গ ঝলে…ললাট নেত্র আগুন বরণ’ ইত্যাদি এ সকলের হৃদয় উৎস তো একটাই…পুরাণ-প্রতিমার শক্তি সৌন্দর্য রূপিনী এই Icon ছাড়া এই যুদ্ধ ধবনি এর চেয়ে আর কোনো অপরূপে প্রকাশ সম্ভব ছিল…?

এই সর্বভাব পূর্ণকরা শব্দবদ্ধ ‘বন্দে মাতরম’ আর কী কোনো আধারে প্রকাশ সম্ভব ছিল…এই যে সাহিত্যিক স্বপ্নময় ভাবময় রূপময় প্রত্নপ্রতীক-এর বিকল্প আর তো কোথাও দেখিনি…বহুজাতি বহুবর্ণ ধর্মধারিণী এই ভারতে আছে কী কোথাও এমন দেশশক্তি সৌন্দর্যের উন্মোচন।

তাই বাঙলার পটে বিধৃত এই সমরঋন্ধ ছবি সপ্তকোটির মধ্যেই মিলিয়ে নিয়েছেন বঙ্কিম। হিন্দু, মুসলিম, পারসিক বৌদ্ধ, জৈন ক্রীশ্চান ও সর্বজাতিবর্ণধর্মের মানুষ বাঙালীকে…

বঙ্কিমের দুর্গা structurality-র মধ্যে চিরজাগরুক সমরস্মৃতি জেগে থাকে যা শক্তির আহ্বান….এমন অনন্তমুখী কল্পকলা আর কী কবে পেরেছে দিতে এই আর্যাবর্তে দক্ষিণাবর্তে।

দেশ শাসনের রুদ্রতারা পাশে নিঃস্বরিক্ত দলিত দুর্গতদেশ দেশভালোবাসায় উদ্দীপনী ভাবকেই তীক্ষ্ণ জাতীয়বাদী তীব্র চেতনা প্রকাশ করতে গিয়েই এই পৌরাণিক অভিকর্ষ থেকে কোনো কবিসাহিত্যিক কেউ-ই দূরে যেতে পারেননি…গ্রীসেও পুরাণ প্রকল্প দিয়ে সমাজ দেশ ধর্ম নীতি নির্ধারণ করতে দেখি….তাদের ইলিয়ড ওডিসি-তে যেমন দিয়েছিল ভারতে রামায়ণ, মহাভারত ও প্রত্নপুরাণগুলি।

‘বন্দে মাতরম’ বঙ্কিমের কোনো এক প্রগাঢ় মুহূর্তের রচনা…প্রগাঢ় অনুভব ও Imagery গানটিতে ধবনিত হয়েছে…মহাভারতের খিল হরিবংশের বিষ্ণুপর্ব ২য় অধ্যায়ে আর্যস্তরের ছায়া আছে তবু ‘বন্দে মাতরম’ গীতটি কখনোই নয় কোনো ঈশ্বরস্তব …. নয় কোনো সম্প্রদায়ের দেবদেবীর ধ্যানের মন্ত্র…নয় কোনো জাতি-সংকীর্ণতার শীর্ণ দেশাত্মগীতি…এ গান কোনো শাস্ত্রীয় সংগীতও নয়, এ গান সময়হারানো কোনো এক কালের পানে ছুটে চলা সৌন্দর্যরূপিণী শক্তিময়ী দেশবন্দনবাণী, এ গান হিন্দু মনের উচ্ছ্বাস নয়, চিরকালের শক্তিসৌন্দর্যের কাব্য…সার্বভৌম শক্তিগীতি…এ গান শুধু বাঙালির নয়, সর্বমানবজাতির গান…বিশ্বায়ত গান…এই সুন্দরময় গীতিময়তার মধ্যে জেগে আছে সত্যবোধ, মূল্যচেতনা, এক অনন্যপূর্ব সত্তায় পুনর্রণন…

এই গান জাগিয়ে রাখে ধ্রপদী প্রশান্তি, যখন ধবনিত হয়…’অমলাং অতুলাং’…কিংবা ‘সরলাং, সুস্মিতাং ধরণীম ভরণীম…তখন তো বিশ্বলোকের সাড়া পাই প্রচ্ছন্ন বৈভব, শক্তি, ঐশ্বর্য, সৌন্দর্য নান্দনিক স্বাচ্ছন্দ্যে দীপ্ত ধরনীম ভরণীম, বিশ্বদার্শনিকতা প্রসারিত এই গান যে থেমে নিয়ে যেতে চায়, সেখানে কোনো ঈশ্বর-ঈশ্বরী পৌঁছতে পারেন না…মানবের অন্তর্লীন সত্তার সৌন্দর্যের অভিব্যক্তির ঘনঘন বিচ্ছুরণ ঘটতে থাকে…সৌন্দর্যের রহস্যে উন্মোচিত হতে থাকে অপরূপা অরূপ…শেষ পর্যন্ত এই দুর্গা ‘মিথ’, মিথকেই অতিক্রম করে যায়…

এই গীতি-প্রতর্ক আজও শেষ হয়নি…তখনি অনুভব করা যায়…এই গানের আলঙ্কারিক সৌন্দর্যের শক্তি কত।

এই গীতিবন্দনা তার নিজের কাল পেরিয়ে এমন একটি অনন্তবিধৃত নির্মিত যা নির্মাণকারী বঙ্কিমচন্দ্রকেও বহুদূর পিছনে ফেলে, অলখকালের দিকে ছুটে চলেছে…

নমামি ত্বাং…

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *