বন্দে মাতরমে আপত্তি কেন? – রেজাউল করীম

‘বন্দে মাতরমে’ আপত্তি কেন?

রেজাউল করীম

নানাবিধ ফতোয়ার দ্বারা বিব্রত মুসলমান সমাজের জন্য আর একটা অভিনব ফতোয়া জারী হইয়া গেল—সমগ্র মুসলমান সমাজকে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত পরিত্যাগ করিতে হইবে। মুসলমানের ধর্ম, সভ্যতা ও সংস্কৃতি সব কিছুই বিপন্ন হইবে, বিধবস্ত ও নির্মুল হইবে, যদি না তাহারা ‘বন্দে মাতরম’ পরিত্যাগ করে। অনুমান সাত শত বৎসর ধরিয়া ভারতে মুসলমান বসবাস করিয়া আসিতেছেন। এই সুদীর্ঘ যুগের মধ্যে মুসলমানের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার পক্ষে সর্বাপেক্ষা মারাত্মক কথা হইতেছে ‘বন্দে মাতরম ;’—সুতরাং ইহা পরিত্যাগ না করিলে মসুলমান একদণ্ড টিকিতে পারিবে না। যে ইসলামকে আমরা উদার সর্বজনীন ও সর্বকালোপযোগী ধর্ম বলিয়া গর্ব করিয়া থাকি, তাহা কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ একটিমাত্র অক্ষর দ্বারা বিপর্যস্ত, বিধবস্ত ও নির্মূল হইয়া যাইবে। সেইজন্য ইসলামের কল্যাণকামী নেতাগণ পূর্বাহ্নেই মুসলমানকে সাবধান করিয়া দিয়াছেন—’বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত পরিত্যাগ করিতে হইবে। আমাদের তথাকথিত নেতাগণ দেশের দিকে দিকে ‘বন্দে মাতরম-এর’ বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করিয়া দিয়াছেন। ইসলাম আজ বিপন্ন, ইসলামের তরী আজ নিমজ্জমান, সমগ্র মুসলমান আজ শুদ্ধিওয়ালাদের মুখের গ্রাস হইয়া পড়িয়াছে। সুতরাং কে আছ সমাজহিতৈষী, ইসলামকে যদি বাঁচাইতে চাও, তবে অবিলম্বে ‘বন্দে মাতরম’ পরিত্যাগ করো।

‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে এই যে নূতন ফতোয়া জারী হইল, ইহা কিন্তু ইসলাম ধর্মে অভিজ্ঞ ও কোরআন বিশেষজ্ঞ আলেম-ফাজেলদের ফতোয়া নহে। এই ফতোয়া জারী হইল কতকগুলি রাজনৈতিক ভাগ্যান্বেষী কোট-প্যান্ট পরিহিত সাহেবিয়ানা ঢঙের ব্যারিস্টার ও সেই শ্রেণির লোকের দ্বারা। যাঁহারা জীবনে কোনো দিন মসজিদের প্রাঙ্গণেও চরণধূলি দিবার অবসর পান নাই, ইসলামের সহিত সাক্ষাৎ ও পরোক্ষভাবে যাঁহাদের কোনোই সম্বন্ধ নাই, সেইসব ব্যক্তিগণ আজ ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন আরম্ভ করিয়াছেন। ইসলাম কীসে নষ্ট হয়, আর কীসে রক্ষা হয়, এসব বিষয়ে আলোচনা করিবার একচেটিয়া অধিকার মিষ্টার জিন্না, অথবা স্যর নাজিমুদ্দিনের নাই। এমনকি যে মৌলানা অকরম খাঁ সাহেব নিজেকে ইসলামের একমাত্র বিশেষজ্ঞ বলিয়া দাবি করেন, তাঁহারও সে অধিকার নাই। ইসলামকে যাঁহারা কামধেনুরূপে ব্যবহার করিয়া আসিতেছেন, তাঁহাদের কোনও মতকেই অকাট্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। খিলাফতের যুগে মৌলানা আকরম খাঁ যখন মুসলমানকে কংগ্রেসে যোগ দিতে বলিয়াছিলেন, তখন তিনি কোরআন-হদীসকে ভিত্তি করিয়া সেইরূপ কথা বলিয়াছিলেন। সে যুগে যখন ‘বন্দে মাতরম’ গীত হইত এবং ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিতে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ হইত, তখন তিনি কোরআন-হদীসে তাহার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ পান নাই (১৯০৬-১৯৯১ সালের স্বদেশি যুগেও তিনি ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন।) আর আজ সেই কোরআন-হদীসকে সামনে রাখিয়া তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে বিষোদগার করিতেছেন, ‘বন্দে মাতরম’ বিরুদ্ধে আন্দোলন করিতেছেন। খোদায় বাণী কোরআন, আর খোদার নবীর বাণী হদীস—ইহাতে কি কখনও পরস্পরবিরোধী কথা থাকিতে পারে? যাঁহারা এই মহান গ্রহদ্বয়ের নজীরে পরস্পরবিরোধী কথা প্রচার করেন প্রকৃতপক্ষে তাঁহারাই ইসলামের শত্রু তাঁহাদের কোরআন-হদীসের ব্যাখ্যা সর্বদাই উদ্দেশ্যমূলক, সুতরাং তাহা সর্ব্বদাই দাই পরিত্যজ্য। যখন যাহা প্রয়োজন হইবে—তাহা পরস্পরবিরোধী হউক, অথবা পরস্পর সম্বন্ধযুক্ত হউক, তাঁহার অম্লান বদনে সত্যের মস্তকে পদাঘাত করিয়া তাহাই কোরআন-হদীস হইতে প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিবেন। ইসলামের দোহাই দিয়া ‘বন্দে মাতরম’ বিরুদ্ধে যে ফতোয়া দেওয়া হইয়াছে, তাহা এই ধরনের ফতোয়া। দরকার হইলে ইঁহারা এই কোরআন-হদীস দ্বারাই উহাকে সমর্থন করিবেন। অতীতে এইরূপই করিয়াছেন এবং ভবিষ্যতে এইরূপই করিবেন।

সুতরাং ‘বন্দে মাতরম’ বিরুদ্ধে যে আপত্তি উঠিয়াছে, তাহা ইসলামের দিক হইতে যুক্তিসঙ্গত কি না লীগ-পন্থীদের তথাকথিত ফতোয়া তাহার একমাত্র বিচারক হইতে পারে না। প্রতিকথায় যাঁহারা ইসলামের নামে ব্যবসায় করিয়া থাকেন, ইসলাম ভাঙাইয়া খাওয়াই যাঁহাদের একমাত্র জীবিকা, নির্দিষ্ট কোনো লোককে ভোট না দিলে যাঁহাদের দৃষ্টিতে ভোটারগণ কাফের হইয়া যায়, তাঁহাদের প্রচারিত নূতন কোনো ফতোয়া যে সেই ধরনেরই হইবে, তাহাদে কোনো সন্দেহ নাই। ‘বন্দে মাতরম’ বিরুদ্ধে যে আন্দোলন আরম্ভ হইয়াছে, তাহা অতি অল্পদিনের। ইহার পূর্বে ভারতের প্রতি সভায় এই গান গীত হইত, আর ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিও সর্বত্র ব্যবহৃত হইত। সুতরাং আমাদের প্রশ্ন—এই গান ইসলামের বিরোধী হইলে খিলাফতের যুগে মৌঃ আজাদ মৌলানা মহম্মদ আলি, শৌকত আলি, জাফর আলি, হসরত মোহানী প্রমুখ নেতাগণ তখন কেন ইহার বিরুদ্ধে আপত্তি তোলেন নাই? যে সব সভায় এই গান গীত হইত, অথবা ‘বন্দে মাতরম’ শব্দ ধবনিত হইত, সে সব সভায় তাঁহারা উপস্থিত হইতেন, বত্তৃ�তা দিতেন, এবং বিনা প্রতিবাদে উক্ত সঙ্গীতের সম্মানে দণ্ডায়মান হইতেন। তারপর বহু যুগ পর্যন্ত এই গান দেশের বিভিন্ন সভায় গীত হইয়া আসিতেছে। কৈ কেহই ত ইহার কোনো প্রতিবাদ করেন নাই। জিন্না সাহেব যখন আইন সভার আসন ও চাকরি সমস্যা লইয়া দেশময় আন্দোলন করিতেছিলেন, এবং বহু কংগ্রেসী মুসলমানকেও তাঁহার দলে ভিড়াইতে লাগিলেন, তখনও ‘বন্দে মাতরম’ সম্বন্ধে কেহই কোনো আপত্তি করেন নাই, আপত্তি করা দূরের কথা, এ সম্বন্ধে কেহই কোনো কথা পর্যন্ত তোলেন নাই। তারপর দেশের বুকের ওপর দিয়া কত ঝড়-বাতাস বহিয়া গেল, কত লোকের মাথায় পুলিশের লাঠি ভাঙিয়া গেল, কারাগারে ও বন্দিশালায় কত দেশপ্রেমিকের জীবন-প্রদীপ নির্বাপিত হইয়া গেল। আর দেশবাসী এই ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখিয়া দৃপ্ত আননে সকল অত্যাচার ও অনাচার সহ্য করিয়া গেল। জাতির এই মহাপরীক্ষার সময় কোনো নেতাই ‘বন্দে মাতরম’ মধ্যে ইসলাম বিরোধী ভাবধারা লক্ষ্য করেন নাই। ১৯৩৭ সালে হঠাৎ কী এমন ঘটনা ঘটিল যাহার জন্য ‘বন্দে মাতরম’ ইসলাম বিরোধী হইয়া উঠিল—’বন্দে মাতরম’-এর নামে ইসলামের কৃষ্টি ও কলা সব নষ্ট হইতে বসিল?

আমাদের তথাকথিত নেতারা সাম্রাজ্যবাদের গুপ্তচর স্বরূপ আজ কয়েক বৎসর হইতে মুসলমানের মধ্যে কংগ্রেস-বিরোধী ভাবধারা প্রচার করিবার জন্য যে ব্রত পালন করিয়া আসিতেছেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনটা সেই ব্রতেরই অন্য রূপ মাত্র। চৌদ্দ দফার ধুয়া নিতান্ত পুরাতন হইয়া গিয়াছে, তাছাড়া বাঁটোয়ারার পর চৌদ্দ দফার গুরুত্বও কতকটা কমিয়াছে। বাঁটোয়ারা সম্বন্ধে কংগ্রেসের ‘না গ্রহণ, না বর্জন নীতি’ যদি মুসলমানকে বশীভূত করিয়া ফেলে, তবে ত এতদিনের পরিশ্রম পণ্ড হইয়া যাইবে ! এদিকে বাঙালায় ও পাঞ্জাবে প্রতিক্রিয়াশীল মন্ত্রিত্ব ঘটিত হইয়াছে। যদি সাধারণ মুসলমান কংগ্রেসের সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হইয়া কংগ্রেস-পন্থী হইয়া পড়ে, তাহা হইলে ত লীগের মৃত্যু অনিবার্য। এই সব সঙ্গীন অবস্থা হইতে উদ্ধার পাইবার উপায় আবিষ্কৃত হল ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন সৃষ্টি করা। আর তাহাতে হাতে হাতে ফলও পাওয়া গেল। মুসলমান সমাজ লীগ-পন্থীদের প্রচারণায় পড়িয়া, রাজনৈতিক সমস্যা, অর্থনৈতিক সমস্যা, সবই ভুলিয়া গেল—মনে রহিল কেবল ‘বন্দে মাতরম’ সমস্যা। যেন কংগ্রেস ‘বন্দে মাতরম’ বিসর্জন দিলেই ইসলাম উদ্ধার হইয়া যাইবে।

‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের মূল কারণ কী, আর তাহা কী উদ্দেশ্যে হইতেছে তাহা আলোচনা করিলাম ; এবং দেখাইলাম যে, সত্যিকার কোনো অভিযোগ দূর করিবার জন্য এই আন্দোলন হয় নাই—ইহা হইয়াছে কোনো এক গুপ্ত মন্ত্রণাগারে একটা হীন ষড়যন্ত্রের ফলে। এত সব আলোচনার পরও কথা উঠিতে পারে, ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন যে কারণেই ও যে উদ্দেশ্যেই হউক না কেন, যে সঙ্গীতে হিন্দুদের দেবদেবীর নাম উল্লেখ আছে এবং যে সঙ্গীত আনন্দমঠ-এর অঙ্গীভূত, তাহা কী কোনো মুসলমান সমর্থন করিতে পারে? ইহার উত্তরে আমরা স্পষ্টভাবে বলিব, দেবদেবীর নামোল্লেখ থাকিলে অথবা আনন্দমঠ-এর অঙ্গীভূত হইলেই যে, কোনো সঙ্গীত একেশ্বরবাদীর বর্জনীর হইবে এরূপ যুক্তির সারবত্তা আমরা স্বীকার করি না। ইহা আমরা জানি ও মানি যে, কোনো একেশ্বরবাদী ও পৌত্তলিকতার বিরোধী সম্প্রদায় দেবদেবীর পূজাও করিতে পারে না, অথবা স্তব-স্তুতিও করিতে পারে না। সেরূপ করিলে তাহার ধর্মদ্রোহিতা করা হইবে ; কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’-এ কোনো দেবদেবীর পূজাও করা হয় নাই, অথবা তাহাদের স্তব-স্তুতিও করা হয় নাই। উহাতে দেশমাতৃকার বন্দনা করা হইয়াছে এবং দেশমাতৃকাকে হিন্দুদের দেবীর সহিত তুলনা করা হইয়াছে মাত্র। অর্থাৎ আমরা যেমন বলি, ‘হারকিউলিসের’ মতো শক্তিশালী, ‘ভেনাসের’ বা ‘জোহরার’ মতো সৌন্দর্যশালী, ‘বেকাসে’র মতো কামুক ‘মিনার্ভা’র মতো জ্ঞানী,—সেইরূপভাবে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতে দেশমাতৃকাকে হিন্দুদের দেবদেবীর সহিত তুলনা করা হইয়াছে। ইহা ইসলামের দৃষ্টিতে আদৌ নিন্দনীয় নহে। আরবের ও পারস্যের কবিগণ এইরূপ উপমামূলক বহু কবিতা রচনা করিয়াছেন। ‘বন্দে মাতরম’-এ হিন্দু দেবদেবীর নিকট মুসলমানের মাথা নোয়াইবার কোনো প্রশ্ন উঠে না। কোনো মুসলমান পরিপূর্ণ ঈমান লইয়া ও আল্লাহতালার প্রগাঢ় বিশ্বাস রাখিয়া ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত গাহিতে পারে, এরূপ করিলে তাহার ঈমানের একটুও ব্যাঘাত উৎপাদন হইবে না। তারপর আনন্দমঠ-এর সহিত সংযুক্ত বলিয়া ‘বন্দে মাতরম’ বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠিয়াছে, একাধিক লেখক ইতিহাসের পারম্পর্য পেশ করিয়া দেখাইয়াছেন যে, আনন্দমঠ-এর বহু পূর্বে উক্ত সঙ্গীত রচিত হইয়াছিল। সুতরাং সে কথা পুনরায় উত্থাপন করা বাতুলতা মাত্র।

কোনো সঙ্গীত অথবা অন্য কোনো বিষয়কে গ্রহণ অথবা বর্জন করিবার মানদণ্ড ইহা নহে যে, উহা অমুক স্থান হইতে গৃহীত হইয়াছে ;—বরং তাহা গ্রহণ ও বর্জনের একমাত্র মানদণ্ড এই যে, তাহার নিজস্ব কোনো গুণ বা দোষ আছে কিনা। পারস্যের অমর কবি হাফেজ যখন তাঁহার অমর গ্রন্থের প্রথম একটি লাইন পাপাত্মা এজিদের কবিতা হইতে গ্রহণ কারিয়াছিলেন, তখন অনেকেই তাহাতে রাগান্বিত হন। তদুত্তরে কবি বলেন, মুক্তা কুড়াইয়া লইতে হইলে স্থানের বিচার করিতে হয় না। আমরা ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত সম্বন্ধেও সেই কথাই বলিতে পারি। ইহার অন্তর্নিহিত মাধুর্যের কারণে ইহা জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত হইতে চলিয়াছে। আনন্দমঠ ইহার মর্যাদা বৃদ্ধি করে নাই। ইহার মর্যাদা অপূর্ব শব্দসম্ভার ও ভাবসম্পদে। অবশ্য আমরা ‘বন্দে মাতরম’ সম্বন্ধে যতই কিছু বলি না কেন, কংগ্রেসের বিরুদ্ধে প্রচারকার্য চালাইবার জন্য অন্য কোনো উপায় আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন তুমুলভাবে চলিতে থাকিবে। কংগ্রেস-সেবী হিসাবে আমরা কয়েকটি কথা মাননীয় নেতাদের সমীপে নিবেদন করিব। দেশের ‘মাইনরিটি’ সম্প্রদায় কংগ্রেসের অবলম্বিত কোনো কার্যের প্রতিবাদ করিলে করাচী প্রস্তাব অনুসারে প্রত্যেক কংগ্রেস-কর্মী সেই প্রতিবাদ সম্বন্ধে একটা বিহিত ব্যবস্থা অবলম্বন করিতে বাধ্য। ‘মাইনরিটিদের’ অভিযোগের প্রতিকার করিতে প্রস্তুত না হইলে করাচি প্রস্তাবের কোনোই মূল্য থাকে না। মুসলমানগণ ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলিয়াছেন, তাহা কি সেই ধরনের অভিযোগ, যাহার প্রতিকার করাচি প্রস্তাবে পাওয়া যাইতে পারে? অথবা ইহা কি জিন্না সাহেবের চতুর্দশ দফার আর একটি বর্ধিত আকার, যাহার প্রতিকার কংগ্রেসের দ্বারা কোনো মতেই হইতে পারে না? ইহা বিবেচনা করিবার বিষয় বটে। তবে একটা কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য এই যে, যে সব মুসলমান কংগ্রেসের দলভুক্ত, তাঁহারা এযাবৎ কেহই ‘বন্দে মাতরম’ সম্বন্ধে উচ্চবাচ্য করেন নাই। অথচ যাঁহারা চিরকালই কংগ্রেস-বিরোধী এবং কংগ্রেসে যোগদানের যাঁহাদের কোনোই সম্ভাবনা নাই, কেবল তাঁহারাই ‘বন্দে মাতরম’-কে উপলক্ষ্য করিয়া মুসলমানের মধ্যে কংগ্রেস-বিদ্বেষ প্রচার করিয়া বেড়াইতেছেন। এখানে আর একটা কথা স্পষ্ট করিয়া বলিয়া রাখিতেছি, কংগ্রেস যদি জিন্নাপন্থীদের একটি প্রাণীও কংগ্রেসের পতাকার তলে সমবেত হইবেন না। কারণ উদ্দেশ্যে ত আর ‘বন্দে মাতরম’ বাতিল করা নয়—অন্য একটা ষড়যন্ত্র পূর্ণ করিবার জন্য উহা একটা উপলক্ষ্য মাত্র।

মুসলমানের দৃষ্টিতে ‘বন্দে মাতরম’ সম্বন্ধে আলোচনা করিতে গেলে তিনটি বিষয় উত্থাপিত হইতে পারে—(১) ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি, (২) সঙ্গীতটির প্রথম দুই কলি, (৩) সমগ্র সঙ্গীতটি। ‘বন্দে মাতরম !’ এই ধবনির সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক শ্রোতার মনে ভারতবাসীর পঞ্চাশ বৎসরের জাতীয় সংগ্রামের স্মৃতি জাগিয়া উঠে। ‘বন্দে মাতরম’!! লক্ষ লক্ষ জনতার সম্মুখে যখন স্বেচ্ছাসেবকগণ আকুলভাবে ডাকিয়া উঠে ‘বন্দে মাতরম’, তখন সমগ্র জনতা অধীর উৎসাহে পুলকিত হইয়া উঠে। কোন সুদূর অতীতে কত শত জন জাতীয় পতাকা স্বহস্তে বহন করিয়া এই ‘বন্দে মাতরম’-এর জন্য প্রাণবিসর্জন দিয়াছে, তাহারই স্মৃতি তখন জনতার মন উৎক্ষিপ্ত করিয়া তোলে ; —সে তখন সেই ভাবে আত্মবলি দানের কথাই ভাবিয়া থাকে। ভারতবাসী কোনো দিনই জাতীয়তার বীজমন্ত্র এই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি পরিত্যাগ করিতে পারিবে না। যদি তাহাকে বলা হয়, অতীতের পঞ্চাশ বৎসরের স্মৃতি মন হইতে মুছিয়া ফেল, তাহার প্রাণপণ স্বাধীনতা সংগ্রামের কথা ভুলিয়া যাও, স্বদেশি যুগ ও অসহযোগ এবং আইন-অমান্য যুগের সমস্ত গৌরবময় ইতিহাস ভুলিয়া যাও—আর যদি সে নির্বিচারে তাহা ভুলিয়া যাইতে পারে, তবেই সে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি বিস্মৃত হইবে—অথবা পরিত্যাগ করিবে। স্বদেশি যুগ, অসহযোগ ও আইন-অমান্য যুগ আজ আমাদের নিকট অতীত ইতিহাসের বস্তু ; এই সব পুণ্যময়স্মৃতিকে জাগাইয়া রাখিয়াছে, বাঁচাইয়া রাখিয়াছে, বিস্মৃতির কবল হইতে হৃদয় মধ্যে গাঁথিয়া রাখিয়াছে একটি মাত্র ধবনি—’বন্দে মাতরম।’ এই ধবনি ভারতবাসী কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারিবে না। এই ধবনির সঙ্গে সঙ্গে লীগ-পন্থিগণ লজ্জায় মরিয়া যাইবেন ; কারণ এইদীর্ঘ ৫০ বৎসরের স্বাধীনতার ইতিহাসে তাঁহাদের দিবার মত কিছুই নাই। পরাজয় ও অকর্ম্মণ্যতার গ্লানি মুছিবার জন্য আজ তাঁহারা ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে লাগিয়াছেন। তা লাগুন, যাহা ইচ্ছা করুন। আমরা স্পষ্টভাবে বলিতে চাই, ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেশবাসী কিছুতেই পরিত্যাগ করিতে পারিবে না।

‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই কলিতে কোনো একেশ্বরবাদীর আপত্তি করিবার মত একটা শব্দও নাই। ওই দুই কলিতে দেশের সৌন্দর্য বর্ণনা করা হইয়াছে মাত্র। আমাদের দেশ কী সুজলা, সুফলা, মলয়জশীতলা নয়?—ইহার যামিনী কি শুভ্র জ্যোৎস্না পুলকিত নহে? ইহার কাননে কাননে কী ফুল্ল কুসুম স্ফুটিত হইয়া হৃদয়কে মুগ্ধ করে না? আমাদের এই মধুর দেশ কী দ্রুমদল দ্বারা সুশোভিত নহে? যে দেশে কাননে-কান্তারে সৌন্দর্য, রূপ ও শোভা নিত্য বিরাজমান, সে দেশ কি সুহাসিনী নহে? সে দেশ কি মধুরভাষিণী নহে? ‘বন্দে মাতরম’-এ দেশমার্তৃকার বর্ণনা পড়ে—’মাঝখানে তুমি দাঁড়িয়ে জননী শরৎকালের প্রভাতে’। সুতরাং ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই কলির বিরুদ্ধে কাহারও একটা কথা বলিবার থাকে না। এই অপুর্ব্বা সঙ্গীত অল্প ভাষায় এরূপ নিপুণভাবে দেশের বর্ণনা করিয়াছে—যাহার তুলনা অন্য কোথাও পাওয়া যায় না। শেষ কয়েকটি কলি সম্বন্ধে ইতিপূর্র্ব্ব্যে কয়েকটি কথা বলিয়াছি, তাহার আর পুনরাবৃত্তি করিব না। আমাদের বিবেচনায় শেষ কলিগুলিতেও পৌত্তলিকতার কোনো স্তব বা গান নাই।

আমাদের পঞ্চাশ বৎসরের জাতীয় সংগ্রামের সহিত ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জাতি কিছুতেই আজ ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত পরিত্যাগ করিতে পারিবে না। কংগ্রেস মডারেটগণকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য যেমন পূর্ণ স্বাধীনতার আদর্শ পরিত্যাগ করিতে পারে না, জাতীয় পতাকার স্থানে ইউনিয়ন-জ্যাককে গ্রহণ করিতে পারে না,—সেইরূপ ‘বন্দে মাতরম’-এর স্থানে অন্য কোনো সঙ্গীতকে জাতীয় সঙ্গীতরূপে গ্রহণ করিতে পারে না। সুখে-দুঃখে, সম্পদে-বিপদে এই ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত জাতির মাথা উঁচু করিয়া তুলিয়া রাখিয়াছে। মুমূর্ষু জাতি এই সঙ্গীত গাহিয়া নব কলেবরে জাগিয়া উঠিয়াছে ; হতাশায় নিরাশায় জাতির শক্তি যখন বিখণ্ডিত হইতে বসিয়াছিল, তখন জাতি এই সঙ্গীতকে সম্বল করিয়া আবার এক হইয়াছে—আবার জাগিয়া উঠিয়াছে। চারিদিকে পুলিশের মৃদু যষ্টির ভয়, জেল-অন্তরীণে ভয়, পদে পদে ব্যক্তি-স্বাধীনতা লোপের ভয়—এই দৃশ্যের মধ্যে হাজারে হাজারে স্বেচ্ছাসেবক এই সঙ্গীত গাহিয়া জাতির সম্মান রক্ষা করিয়াছে। এতদিন পরে—এতদিনের মহা সাধনার পর জাতি যখন সিন্ধির পথে পাড়ি দিয়াছে, তখন সে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি ও সঙ্গীত কিছুতেই পরিত্যাগ করিবে না—দৃঢ়ভাবে এই সঙ্গীতকেই ধরিয়া রাখিবে। অতীতে জাতিকে এই ‘বন্দে মাতরম’-এর জন্য বহু বিপদ-ঝঞ্ঝা সহ্য করিতে হইয়াছিল—ভবিষ্যতেও সেইরূপ সহ্য করিতে হইবে ; বিপদের কাল রাত্রি সম্মুখে—সাম্প্রদায়িকগণ, সাম্রাজ্যবাদের গোয়েন্দাগণ—নূতন মূর্তিতে, নূতন ছলনা লইয়া দেশের মহাব্রতকে নষ্ট করিতে আসিতেছে—অচিরেই তাহাদের সকল উদ্যম ব্যর্থ হইবে। বলো দেশবাসী, উচ্চকণ্ঠে বলো—’বন্দে মাতরম’! সেই বরিশালে ও সিরাজগঞ্জে যেরূপ উদাত্ত কণ্ঠে বলিয়াছিলে, তেমনি জোরে মিলিতকণ্ঠে বলো—’বন্দে মাতরম’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *