বন্দে মাতরম—শতবর্ষের আলোকে – অসীম মুখোপাধ্যায়

বন্দে মাতরম—শতবর্ষের আলোকে

অসীম মুখোপাধ্যায়

১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ নভেম্বর অক্ষয় নবমীর দিন বঙ্কিমচন্দ্র রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত এই গান—’বন্দে মাতরম’। এই গানটি তাঁর আনন্দমঠ উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। এটি জাতীয় প্রেরণার পবিত্র মহাকাব্য।

তাঁর এই উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদ উল্লেখনীয়—

‘সেই জ্যোৎস্নাময়ী রজনিতে দুই জনে নীরবে প্রান্তর পার হইয়া চলিল। মহেন্দ্র নীরব, শোকাতুর, গর্বিত কিছু কৌতূহলী।

ভবানন্দ হাস্য মুখ, বাঙ্ময়, প্রিয় সম্ভাষী হইলেন। কথাবার্তার জন্য বড়ো ব্যগ্র। ভবানন্দ কথোপকথনের অনেক উদ্যাম করিলেন। কিন্তু মহেন্দ্র কথা কহিল না। তখন ভবানন্দ নিরুপায় হইয়া আপন মনে গীত আরম্ভ করিলেন :

বন্দে মাতরম

সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং

শস্য শ্যামলাং মাতরম

মহেন্দ্র গীত শুনিয়া কিছু বিস্মিত হইল, কিছু বুঝিতে পারিল না—সুজলা, সুফলা মলয়জ শীতলা, শস্যশ্যামলা মাতা কে—জিজ্ঞাসা করিল ; ‘মাতা কে?’

উত্তর না করিয়া ভবানন্দ গাহিতে লাগিলেন :

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম—

ফুল্ল কুসমিত দ্রমদল শোভিনীম

সুহাসিনীং, সুমধুর ভাষিনীম

সুখদাং বরদাং মাতরম।

মহেন্দ্র বলিল, ‘এত দেশ, এত মা নয়—’

ভবানন্দ বলিল, ‘আমরা অন্য মা মানি না—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। আমরা বলি, জন্মভূমিই জননী, আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই—স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, আমাদের আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জ সমীরণশীতলা, শস্যশ্যামল’ :

তখন বুঝিয়া মহেন্দ্র বললেন আবার গাও।

ভবানন্দ আবার গাহিলেন—’বন্দে মাতরম’…

বাংলাদেশে যে জাতীয়বাদ ও রাষ্ট্রীয় চেতনার উন্মেষ হয় তা আকস্মিক ঘটনা নয়; এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের বহু ঘাতপ্রতিঘাতের ইতিহাস।

সিপাহি বিদ্রোহের সংগ্রামী ঐতিহ্য, নীলকর চাষিদের ওপর ইংরেজ বণিকের অকথ্য অত্যাচার, হিন্দুমেলার প্রভাব, মধ্যবিত্তদের মধ্যে পাশ্চাত্য ও আধুনিক শিক্ষার প্রভাব, স্বাধীনচেতা সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নতুন-কাব্য সাহিত্য-নাটকের সৃষ্টি, ব্রাহ্ম সমাজের প্রভাবে নতুন বিচারধারা ও চিন্তার প্রসার, সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠা ও ভারতীয়দের নিয়ে সিভিল সার্ভিস তৈরি করার আন্দোলন, রামকৃষ্ণের ‘যত মত তত পথ’-কে কেন্দ্র করে ধর্ম ও সামাজিক ক্ষেত্রে অভাবনীয় বিপ্লবী ও দেশমাতৃকার সেবা, বিবেকানন্দের যুগান্তকারী শিকাগো বত্তৃ�তা, ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে সতীশচন্দ্র বসুর তত্ত্বাবধানে ‘অনুশীলন সমিতির জন্ম এবং জাতীয় কংগ্রেসের অভ্যুদয়ের মধ্যে দিয়েই দেশবাসীর মনে তীব্র ইংরেজ বিদ্বেষ ও জাতীয় চেতনার জন্ম হয়।

বালগঙ্গাধর তিলক, বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ ও লালা লাজপত যে ভারতকেন্দ্রিক চিন্তাধারার প্লাবন আনলেন, তার বীজ বপন করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, বিবেকানন্দ ও দয়ানন্দ। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ, তাঁর মাতৃমন্ত্র ও ‘বন্দে মাতরম’ সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষকে ভারতবর্ষ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার প্রথম অনুপ্রেরণা জোগালো। তারপর বিবেকানন্দ তো দেশের যুবক সমাজকে সোজাসুজি বললেন, ঠাকুর-দেবতাদের পঞ্চাশ বছর ঘুমুতে দাও। এখন তোমাদের একমাত্র আরাধ্য দেবতা হচ্ছে মাতৃভূমি। এই মাতৃভূমির মুক্তির জন্য নির্ভয়ে আত্মবলিদান দিতে হবে।

বঙ্কিমের মাতৃমন্ত্র আর বিবেকানন্দের আত্মবলিদানের উদাত্ত আহ্বানেই বাংলার যুবকরা দীক্ষিত হল বিপ্লবমন্ত্রে। এই বিপ্লবীর দলই জোয়ার আনলো স্বদেশি আন্দোলনে এবং স্বদেশি আন্দোলন থেকেও কর্মী এল বিপ্লবী দলে।

সমগ্র বাঙালি জাতির প্রতি কার্জনের অপমান, অবিচার, অত্যাচার ও উপেক্ষা ইংরেজ-বিদ্বেষের আগুন জ্বলে ওঠে এবং আগুনে প্রথম ঘৃতাহুতি দিল ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের পত্রিকা ‘সন্ধ্যা’। সন্ধ্যার প্রকাশ্যে সকলে গায় :

যায় যাবে জীবন চলে

জগৎ মাঝে তোমার কাজে

‘বন্দে মাতরম’ বলে—

শিকাগো বিশ্বধর্ম মহাসম্মেলনে যোগদান করে ফিরে এসে এক সংবর্ধনা সভায় বিবেকানন্দ বলেন—আগামী পঞ্চাশ বৎসর আমাদের গরীয়সী ভারতমাতাই আমাদের আরাধ্যা দেবতা হউন, অন্যান্য অকেজো দেবতা এই কয়েক বৎসর ভুলিলে কোনো ক্ষতি নাই। অন্যান্য দেবতারা ঘূমাইতেছেন। তোমার স্বজাতি—এই দেবতাই একমাত্র জাগ্রত—উনি বলেন, ‘পরাধীন জাতির কোনো ধর্ম থাকতে পারে না, একমাত্র ধর্ম হচ্ছে স্বাধীনতা অর্জন।’

বিবেকানন্দের প্রভাবেই লক্ষ লক্ষ যুবকের মনে দেখা দিল দেশপ্রেমের জোয়ার, স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র বাসনা। বঙ্কিমচন্দ্র দেশবাসীকে দিয়েছিলেন বন্দেমাতরম মন্ত্র, গড়েছিলেন দেশ মাতৃকার মূর্তি। বিবেকানন্দ শুধু সেই মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠাই করলেন না, দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য আসন্ন স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য মৃত্যু ভয়হীন বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তোলার পর্বও শুরু করে দিলেন। এই পটভূমিকাতে বিপ্লব যজ্ঞের হোতা অরবিন্দের আবির্ভাব।

বিবেকানন্দের জাপানি ভক্ত ওকাকুরার অনুপ্রেরণাতেই অনুশীলন সমিতির প্রতিষ্ঠা ও বিবেকানন্দের শিষ্যা নিবেদিতা হলেন অনুশীলন সমিতির অন্যতম পরিচালিকা।

১৯ জুন ১৯০২ কলিকাতায় মহাসমারোহে পালিত হল শিবাজি উৎসব। বাংলার স্বদেশি আন্দোলনের গুণগ্রাহী সমর্থক মহারাষ্ট্র কেশরী বালগঙ্গাধর তিলককে আমন্ত্রণ জানানো হল কলকাতার শিবাজি উৎসবে। তিলককে সংবর্ধনা জানানোর জন্য সেদিন হাওড়া স্টেশন জনসমুদ্র। ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢুকতেই শুরু হল সহস্র কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি আর তিলক মহারাজ কী জয়।

শিবাজি উৎসবের প্লাবনের সময়ই রবীন্দ্রনাথের অবিস্মরণীয় দীর্ঘ কবিতা রচিত হল ‘শিবাজি উৎসব’ :

কোন দূর শতাব্দের

কোনো এক অখ্যাত দিবসে

নাহি জানি আজি

মারাঠার কোন শৈলে

অরণ্যের অন্ধকারে বসে

হে রাজা শিবাজি,

তব ভাল উদ্ভাসিয়া

এ ভাবনা তড়িৎ প্রভাবৎ

এসে ছিল নামি—

এক ধর্ম রাজ্য পাশে

খণ্ড ছিন্ন বিক্ষিপ্ত ভারত

বেঁধে দিব আমি।

১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ৭ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক দিন। সেদিন কলকাতার টাউন হলের সভায় মুহুর্মূহু ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্যে বাংলার সর্বশ্রেণির সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতৃবৃন্দ সমন্বয়ে ঘোষণা করলেন, অর্বাচীন ভারতবিরোধী ইংরেজ সরকারের কাছে আর আবেদন-নিবেদন নয়; বাংলার মানুষ আর ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ওদের কাছে যাবে না।

সম্মেলনের প্রথম দিন প্রতিনিধিরা রাজাবাহাদুরের হাভেলিতে সমবেত হয়ে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিতে দিতে শোভাযাত্রা করে সভামণ্ডপে যান। সর্বাগ্রে রইলেন সম্মেলনের সভাপতি আবদুল রসুল ও তাঁর স্ত্রী, তাঁর পিছনে পদব্রজে চললেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ এবং তাঁদের পিছনে রইলেন ‘বন্দে মাতরম’ ব্যাজ পরা সোসাইটির সভ্যবৃন্দ। সোসাইটির সভ্যরা ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেবার আগেই তাদের ওপর হিংস্র পুলিশবাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নির্বিচারে লাঠি দিয়ে মারতে শুরু করল। এই পুলিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন স্বয়ং জেলার পুলিশ (বরিশাল) প্রধান মি. কেম্প এবং তিনি নিজেই লাঠি দিয়ে ফণিভূষণের চিবুকে সজোরে আঘাত করেন।

এদিকে বরিশালের শ্রদ্ধেয় নেতা মনোরঞ্জন গুহের ছেলে চিত্তরঞ্জন লাঠির আঘাত খেয়েও ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেওয়ায় পুলিশ তাকে মারতে মারতে মাথা ফাটিয়ে পুকুরের জলে ফেলে দেয়। কিন্তু চিত্তরঞ্জন তবুও জল থেকে মাথা তুলে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দেওয়ায় এক দল পুলিশ পুকুরের জলে নেমে চিত্তরঞ্জনের মাথায় বারবার লাঠির আঘাত করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত অচৈতন্য রক্তাক্ত চিত্তরঞ্জনকে জল থেকে তোলা হয়।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশ সুপারকে বললেন :

These young man had done nothing, they had not even before the assult uttarad what to the Govt. of East Bengal was no obnoxious cry that of ‘Bande Mataram.

সুরেন্দ্রনাথ শুধু ওই কথা বলেই থামলেন না। তিনি কেম্প সাহেবকে বললেন, এই নিরস্ত্র ও নিরীহ লোকেদের ওপর এভাবে অত্যাচার করা হচ্ছে কেন? কোনো অপরাধ হয়ে থাকলে আমাকে গ্রেপ্তার করুন। সবকিছুর জন্য আমি দায়ী। কেম্প সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, হ্যাঁ আমি আপনাকে গ্রেপ্তার করলাম।

চারশ টাকার জরিমানা হল।

সম্মেলনে ওঁদের উপস্থিতি দেখেই চারিদিক থেকেই মুহুর্মুহু ধবনি উঠল ‘বন্দে মাতরম’।

১০ নভেম্বর ১৯০৮। স্থান : প্রেসিডেন্সি জেল। সময় : ঠিক সূর্যোদয়ের পর আলিপুর বোমার মামলায় রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইকে জেলের মধ্যে উপর্যুপরি রিভলবারের গুলি মেরে হত্যার দায়ে ফাঁসি হতে চলেছে কানাইলাল দত্তর।

অতি প্রত্যুষে নিদ্রা ত্যাগ করে গীতার কিছু শ্লোক আর বিবেকানন্দের কর্মযোগ-এর কয়েকটি লাইন আবৃত্তি করতে করতে স্নান করার পর কানাইলাল সেল ত্যাগ করে এগিয়ে চলেছেন ফাঁসির মঞ্চের দিকে। তাঁর চারদিকে রাইফেলধারী পুলিশ আর দুচারজন গোয়েন্দা ও কারাগারের কয়েকজন অফিসার।

তারা কানাইলাল মুখের দিকে তাকিয়ে হতবাক।

কী আশ্বর্য! কানাইলাল হাসছে! সারা চোখে মুখে আনন্দের কথা। কানাইলাল হাসতে হাসতে কয়েক ধাপ সিঁড়ি ভেঙে ফাঁসির মঞ্চে উঠেই সবাইকে চমকে দিয়ে গর্জে ওঠেন—বন্দে মাতরম!

ফাঁসির রজ্জু হাতে নিয়ে জহ্লাদ এগিয়ে আসতেই নিজেই সে রজ্জু গলায় দিলেন। উপস্থিত সবাই সে দৃশ্য দেখে হতবাক।

এক ম্যাজিব্দস্ট্রট জিজ্ঞেস করেন—আপনার শেষ ইচ্ছা কী?

যে আইরিশ ওয়ার্ডার আমাকে পাহারা দিত তাঁকে একবার দেখতে চাই।

এক মিনিটের মধ্যেই সেই ওয়ার্ডার সেখানে আসেন। তাঁকে দেখেই কানাইলাল হাসতে হাসতে বললেন, ইয়েস মিস্টার, কাল সন্ধেবেলায় আমাকে হাসতে দেখে বলেছিলে, আজ সকালে মৃত্যুর পূর্বে আমার মুখে হাসি থাকবে না। তাই বলছি আমাকে কেমন দেখছ? সে কথা শুনে আইরিশ ওয়ার্ডার কোনোমতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সামনে চোখের জল সামলে সেখান থেকে বিদায় নেন। ম্যাজিস্ট্রেটের ইঙ্গিতে জল্লাদ কানাইলালের মুখ ঢেকে দিল কালো টুপিতে। বন্দে মাতরম। বন্দে মাতরম! বন্দেমাতরম! সঙ্গে সঙ্গেই ঝুলে পড়ল কানাইলালের প্রাণহীন দেহ। কানাইলালের শেষকৃত্য সম্পাদনের জন্য আগের দিন রাতেই চন্দননগর থেকে কলকাতা এসেছেন কানাইলালের অগ্রজ মতিলাল ও আরও অনেকে।

পথে বেরিয়েই সংবাদপত্রের বিক্রেতা হকারদের চিৎকার শুনে ওরা অবাক।

কলকাতা পুলিশের জাঁদরেল গোয়েন্দা নন্দলাল বাঁড়ুজ্যে খতম। রিভলবারের গুলিতে কলকাতাতেই নিহত। কানাইলালের মৃতদেহ নেবার জন্য কারাগারের এক শ্বেতাঙ্গ অফিসার অনুমতি দিলেন মাত্র পাঁচজনকে। ভিতরে ঢুকতেই তাদের দেখিয়ে দেওয়া হল একটি ঘর। সেখানে কালো কম্বলে ঢাকা ছিল কানাইলালের মৃতদেহ। কম্বল সরাতেই আশুতোষবাবু ও মতিলালবাবুরা যেমন বিস্মিত তেমনি স্তম্ভিত।

এই কী কানাইলাল? না কী কোনো তপস্বী?

ফাঁসির পরও মুখখানি এত শান্ত, স্নিগ্ধ ও উজ্জ্বল। অর্ধনিমীলিত চোখের কোণে বিদ্যুতের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত, ওষ্ঠের ধারে একটু হাসির আভা। দুটি হাত দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় মুষ্টিবদ্ধ।

ওরা সরু কাঠের পুলের ওপর উঠেই সাগর গর্জনের মতোই হাজার হাজার মানুষ আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ করে গর্জে উঠলেন—বন্দে মাতরম!

সূর্য তখন দিনের শেষে পশ্চিম দিগন্তে বিদায় নিতে চলেছে! একুশ বছরের মহা বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত তখন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের ধ্রুবতারা হয়ে বেঁচে রইলেন অনাগত কালের জন্য।

অবশেষে এল সেই সর্বনাশা দিন। ক্ষোভ ও দুঃখের দিন। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবব (৩০ আশ্বিন)।

তখনো সূর্যোদয় হয়নি। কিন্তু দিনের আলো আত্মপ্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গেই দলে দলে মানুষ চলেছে গঙ্গাস্নান করতে, সবাই নগ্নপদ, সবারই কণ্ঠে দেশমাতৃকা বন্দনার নতুন মন্ত্র ‘বন্দে মাতরম’ দলে দলে ছাত্র-যুবকরা। প্রৌঢ়রাও পিছিয়ে নেই।

গঙ্গাস্নানের পর রবীন্দ্রনাথের নেতৃত্বে বিরাট মিছিল—আশেপাশের সব মানুষের হাতে রাখি পরিয়ে দিতে।

রবীন্দ্রনাথ গেয়ে চলেছেন রাখি বন্ধনের মিলন মন্ত্র :

বাংলার মাটি বাংলার জল

বাংলার বায়ু বাংলার ফল

পুণ্য হউক পুণ্য হউক

পুণ্য হউক, হে ভগবান—

এই আন্দোলন শুরু হবার আগেই ভারতীয় ভাবধারার জাতির উপযোগী শিক্ষা দেবার জন্য ১৯০১ খ্রিস্টাব্দেই বীরভূমের বোলপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন ব্রহ্মচর্য আশ্রম। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের বিজ্ঞান সাধনা ও শিল্পগুরু অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভারতীয় ভাবধারায় যুগান্তকারী শিল্প-সৃষ্টিও বাঙালির জীবনে নতুন উৎসাহ উদ্দীপনা ও সর্বোপরি অনুপ্রেরণা যোগায়।

সব মিলিয়ে তখন বাঙালি জাতির জীবনে নবজীবনের জোয়ার। ‘বন্দে মাতরম’ ছিল ইংরেজি পত্রিকা। প্রথম দিকে সম্পাদক ছিলেন শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ ও বিপিনচন্দ্র পাল। সহ-সম্পাদক ছিলেন হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ ও শ্যামচন্দ্র ঘোষ।

‘বন্দে মাতরম’ ইংরেজি পত্রিকা-এর প্রবন্ধগুলির ভাষা যেমন সুন্দর ছিল, তেমনিই যুক্তিপূর্ণ হত।

অরবিন্দ-বিপিনচন্দ্র পত্রিকাটি শুধু দীক্ষিতের জন্য প্রকাশ করেননি। তাঁরা পত্রিকাটি প্রকাশ করেছিলেন, শাসকগোষ্ঠী ও রাজভক্ত ইংরেজি ভাষা জানা কালো সাহেবদের জন্য। ২০০২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে এক সমীক্ষায় ১৫৫টি দেশের লোকমতের ওপর নির্ভর করে জানা গেছে, এত বছর বাদেও আয়ার্ল্যান্ড-এর জাতীয় সংগীত ‘তার নেশন ওয়নস-এর নিকট প্রতিদ্বন্দ্বী ‘বন্দে মাতরম’-এর স্থান সারা বিশ্বে দ্বিতীয়। ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দের শেষে প্রকাশিত বঙ্কিমের বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠের অঙ্গীভূত হয় এটি। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দের কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গানটি গেয়ে শোনান মুগ্ধ শ্রোতাদের। বঙ্কিম নাকি বলেছিলেন ‘এ গানের মর্ম তোমরা এখন বুঝিতে পারিবে না, যদি পঁচিশ বছর জীবিত থাক তখন দেখিবে এই গানে বঙ্গদেশ মাতিয়া উঠিবে’। এই গান গেয়ে হাসতে হাসতে শতশত বঙ্গদেশের ছেলেরা শহিদ হয়েছে।

আজ ভারত সরকার ‘বন্দে মাতরম’ গানের শতবর্ষের উদযাপন করছেন লাল কেল্লায়।

সহায়ক গ্রন্থাবলি :

১. বিপ্লবী শহিদ কানাইলাল—শ্রীমতিলাল রায়।

২. নিবেদিতা লোকমাতা—শঙ্করীপ্রসাদ বসু।

৩. মুক্তির সন্ধানে ভারত—শ্রীযোগেশচন্দ্র বাগল।

৪. স্বাধীনতা সংগ্রামে—হীরালাল দাশগুপ্ত—সাহিত্য সংসদ।

৫. ভারতের মুক্তি সংগ্রামে চরমপন্থী পর্ব—অমলেশ ত্রিপাঠী।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *