বঙ্কিমচন্দ্র ও রাষ্ট্রীয় জীবন দ্বিতীয় প্রস্তাব : বন্দে মাতরম ও আনন্দমঠ
রমাপ্রসাদ চন্দ
বঙ্কিমচন্দ্র ‘ভারত-কলঙ্ক’ প্রবন্ধে হিন্দুর স্বভাবে যে সকল অভাবের উল্লেখ করিয়াছেন —স্বাধীনতার আকাঙক্ষার অভাব, সমাজে ঐক্যের অভাব, সমাজমধ্যে জাতিপ্রতিষ্ঠার (national feeling-এর) অভাব,—এই সকল অভাবের মূল দেশভক্তির অভাব। দেশভক্তি অর্থ—কেবল দেশের মাটির প্রতি ভক্তি নহে, দেশের সকল অধিবাসীর প্রতি অনুরাগ। এই ভক্তি থাকিলেই দেশবাসীর মধ্যে ঐক্য আসে, জাতি প্রতিষ্ঠা বা দেশগত জাতীয়তা উৎপন্ন হয়। সূক্ষ্মদর্শী বঙ্কিমচন্দ্র বুঝিতে পারিয়াছিলেন, কেবল হিতবুদ্ধি এই ভক্তি উৎপাদন এবং পোষণ করিতে পারে না, বুদ্ধির সহিত হৃদয়ের যোগ চাই ; ঈশ্বরভক্তির মতো এই ভক্তিরও সাধন চাই। সাধনের উপায় ধ্যানধারণা। জননী জন্মভূমিকে কী রূপে ধ্যান করিতে হইবে? বঙ্কিমচন্দ্র বাঙালির জন্য বিধান করিয়া গিয়াছেন, জন্মভূমি বঙ্গভূমিকে ধ্যান করিতে হইবে আরাধ্যা দেবীরূপে। এই বিধির প্রথম আভাস তিনি দিয়াছেন কমলাকান্তের দপ্তর-এর একাদশ সংখ্যায় (১২৮১ সনে = ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দের বঙ্গদর্শন-এ প্রথম প্রকাশিত)। এই সংখ্যায় বঙ্কিমচন্দ্র কমলাকান্তের দুর্গোৎসব বর্ণনা করিয়াছেন। কমলাকান্তের দুর্গোৎসব মহিষমর্দিনীর উপাসনা নহে,—স্বদেশপ্রেমের নেশায় মত্ত স্বদেশসেবকের বঙ্গমাতার উপাসনা। শারদীয় উৎসবের সপ্তমী পূজার দিন কমলাকান্ত আফিম একটু বেশি মাত্রায় খাইয়া প্রতিমা দেখিতে গিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার ভাগ্যে প্রতিমা দেখা ঘটিল না। তিনি আফিমের নেশার ঘোরে এক অদ্ভুত স্বপ্ন দেখিলেন। তিনি দেখিলেন, অনুভব করিলেন, তিনি যেন অন্ধকারাচ্ছন্ন, বাত্যাবিক্ষুব্ধ, দিগন্তব্যাপী, অনন্ত, অকূল প্রবল কালস্রোতে একাকী ভেলায় চড়িয়া ভাসিয়া যাইতেছেন। এই কাল সমুদ্রে কমলাকান্ত তাঁহার প্রসূতি জননী বঙ্গভূমির সন্ধানে আসিয়াছিলেন—ভাসিতেছিলেন। একা বলিয়া তাঁহার বড়ো ভয় করিতে লাগিল,—তিনি, কোথা মা, কই মা, বলিয়া ডাকিতে লাগিলেন। তখন প্রাতঃসূর্যের লোহিতোজ্জ্বল আলোক বিকীর্ণ করিয়া তরঙ্গসঙ্কুল জলরাশির দূরপ্রান্তে সুবর্ণমণ্ডিতা সপ্তমীর শারদীয়া প্রতিমা আবির্ভূতা হইলেন। কমলাকান্ত মাকে চিনিতে পারিলেন।
এই আমার জননী—জন্মভূমি—এই মৃন্ময়ী—মৃত্তিকারূপিণী—অনন্তরত্নভূষিতা ; এক্ষণে কালগর্ভে নিহিতা। রত্নমণ্ডিত দশভুজ—দশদিক—দশদিকে প্রসারিত ; তাহাতে নানা আয়ুধরূপে নান শক্তি শোভিত, পদতলে শত্রু বিমর্দিত—পদাশ্রিত বীরজন-কেশরী শত্রু নিপীড়নে নিযুক্ত!…দক্ষিণে লক্ষ্মী ভাগ্যরূপিনী, বামে বাণী বিদ্যাবিজ্ঞান মূর্তিময়ী, সঙ্গে বলরূপী কার্তিকেয়, কার্যসিদ্ধিরূপী গণেশ, আমি সেই কালস্রোতো মধ্যে দেখিলাম, এই সুবর্ণময়ী ‘বঙ্গ-প্রতিমা।’ কমলাকান্ত মায়ের পদতলে পুষ্পাঞ্জলি দিলেন। মায়ের স্তুতি পাঠ করিলেন। বলিলেন, ”এই ছয় কোটি মুণ্ড ঐ পদপ্রান্তে লুণ্ঠিত করিব—এই ছয় কোটি কণ্ঠে ঐ নাম করিয়া হুঙ্কার করিব,—এই ছয় কোটি দেহ তোমার জন্য পতন করিব—না পারি, এই দ্বাদশ কোটি চক্ষে তোমার জন্য কাঁদিব। এস মা, গৃহে এসো—যাঁহার ছয় কোটি সন্তান, তাঁহার ভাবনা কী?
দেখিতে দেখিতে প্রতিমা অনন্ত কাল-সমুদ্রে ডুবিল। কমলাকান্ত ‘উঠ মা! উঠ মা!’ বলিয়া কাঁদিতে লাগিলেন। সেই প্রতিমা আর উঠিল না। তখন কমলাকান্ত স্বদেশবাসীগণকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিলেন :
এস ভাই সকল ! আমরা এই অন্ধকার কালস্রোতে ঝাঁপ দিই ! এস আমরা দ্বাদশ কোটি ভুজে ওই প্রতিমা তুলিয়া, ছয় কোটি মাথায় বহিয়া, ঘরে আনি। এস, অন্ধকারে ভয় কী? ওই যে নক্ষত্র মধ্যে মধ্যে উঠিতেছে, নিবিতেছে, উহারা পথ দেখাইবে—চল ! চল ! অসংখ্য বাহুর প্রক্ষেপে, এই কাল-সমুদ্র তাড়িত, মথিত, ব্যস্ত করিয়া আমরা সন্তরণ করি—সেই স্বর্ণপ্রতিমা মাথায় করিয়া আনি। ভয় কী? না হয় ডুবিব, মাতৃহীনের জীবনে কাজ কী?
১৯২৪ খ্রিস্টাব্দে, কাঁটালপাড়া বঙ্কিম-সাহিত্য সম্মিলনের সভাপতিরূপে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে, তাঁহার অভিভাষণের উপসংহারে, কমলাকান্তের স্বপ্ন বিবরণের এই কয় পঙক্তি আবৃত্তি করিতে শুনিয়া শিহরিয়া উঠিয়াছিলাম। সম্মিলনের পরই অল-ইন্ডিয়া-কংগ্রেস কমিটির অধিবেশনে যোগদান করিবার জন্য দেশবন্ধুর আহম্মদাবাদে যাইবার কথা ছিল এবং সেই কমিটিতে কয়েকটি প্রস্তাব লইয়া স্বয়ং মহাত্মা গান্ধির সহিত তাঁহার গুরুতর বিরোধের আশঙ্কা ছিল। * দেশবন্ধুর তখনকার মনের অবস্থার প্রভাবে তাঁহার মুখে বঙ্কিমের শব্দময়ী চিত্র শ্রোতার নিকট জাজ্জ্বল্যমান হইয়া উঠিয়াছিল।
কমলাকান্তের স্বপ্নদৃষ্ট মাতৃমূর্তি ক্রমশ বঙ্কিমচন্দ্রের হৃদয় অধিকার করিয়াছিল। জননী জন্মভূমি নানা মূর্তি ধারণ করিয়া ক্রমশ তাঁহার মানসদর্পণে প্রতিবিম্বিত হইয়াছিল। তন্মধ্যে একটি মূর্তি ‘বন্দে মাতরম’ গীতে চিত্রিত হইয়াছে।
১২৮৭ সনের চৈত্র (১৮৮১ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল) মাসের বঙ্গদর্শন-এ আনন্দমঠ উপন্যাসের প্রথম খণ্ডের দশম পরিচ্ছেদে এই গীত প্রথম প্রকাশিত হইয়াছিল। ‘বন্দে মাতরম’ গীতের সহিত আনন্দমঠ-এর আখ্যান ভাগের বিশেষ কোনো সম্বন্ধ নাই। জ্যোৎস্নাময়ী রজনীতে মহেন্দ্র এবং ভবানন্দ নীরবে প্রান্তর পার হইয়া চলিয়াছিলেন। এমন সময় ভবানন্দ কথাবার্তার জন্য বড়ো ব্যগ্র হইলেন। ভবানন্দ কথোপকথনের জন্য অনেক উদ্যম করিলেন, কিন্তু মহেন্দ্র কথা কহিল না। তখন ভবানন্দ নিরুপায় হইয়া আপন মনে গীত আরম্ভ করিলেন :
বন্দে মাতরম
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং
ইত্যাদি।
যে প্রকারে গীতটি আনন্দমঠ-এ উদ্ধৃত ইহয়াছে, তাহা হইতে অনুমান হয়, গীতটি স্বতন্ত্র রচিত হইয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্র সাধারণত গীতি কবির মতো স্বীয় অনুভূতি এবং ভাব-বিভূতি ছন্দোবদ্ধ বাক্যে প্রকাশ করিতেন না, তাঁহার ব্রত ছিল বাহিরের উপাদান সংগ্রহ করিয়া নতুন জগৎ সৃষ্টি। আনন্দমঠ-এর অনেক পূর্বে প্রকাশিত মৃণালিনী উপন্যাসে দুইটি সঙ্গীত আছে বটে। ‘বন্দেমাতরম’-এর সহিত সেই দুইটি গীতের তুলনা হয় না। এই সকল গীত সুকবির রচিত, বন্দে মাতরম যেন স্বয়ম্ভূত ; আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের বা বনের ফুলের মতো আপনা আপনি ফুটিয়া উঠিয়াছে।
বন্দে মাতরম গীতে জন্মভূমির যে চিত্র আছে, তাহা দেবীর বা মানবীর আদর্শে অঙ্কিত হয় নাই, তাহা জন্মভূমির নৈসর্গিক আকৃতির আংশিক প্রতিবিম্ব। কবির কল্পনা-দর্পণে প্রতিফলিত এই প্রতিবিম্বে সুহাসিনী জন্মভূমির সুখদ-বরদ রূপ উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। দেবী এবং মানবীয় তুলনায় জন্মভূমি সপ্তকোটি আননা, দ্বিসপ্তকোটি ভুজা। সন্তানের জননী জন্মভূমিই সর্বস্ব। সুতরাং তাঁহার এই প্রতিমা গড়িয়া মন্দিরে মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করিয়া পূজা করিতে হইবে। কিন্তু সপ্তকোটি আননা দিসপ্তকোটি-ভুজা সুজলা-সুফলা শস্যশ্যামলা জননীর প্রতিমা গড়িয়া মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা কাহারও পক্ষে সম্ভব নহে। সুতরাং এই প্রতিমা পৌত্তলিকের প্রতিমা নহে, এবং সেই মন্দির পৌত্তিলিকের মন্দির নহে। তার পর জন্মভূমির মহিমা কীর্তন করিবার জন্য কবি গাইয়াছেন, দুর্গা উপাসকের দুর্গা যেমন, লক্ষ্মী-সরস্বতীর উপাসকের লক্ষ্মী-সরস্বতী যেমন, জন্মভূমি আমার তেমনই উপাসনার বস্তু। এই উপাসনা অবশ্য পত্র-পুষ্প-ফল-জল দিয়া উপাসনা নহে।
বন্দে মাতরম গীতে জননী-জন্মভূমির সার্বজনীন প্রতিমা চিত্রিত এবং কীর্তিত করিয়া নিপুণ চিত্রকর আনন্দমঠের আনন্দ কাননের আনন্দ মন্দিরে দেবীর আদর্শে জন্মভূমির বিভিন্ন অবস্থার চিত্র অঙ্কিত করিয়াছেন। যে রাত্রে ভবানন্দ মহেন্দ্রকে বন্দে মাতরম গীত শুনাইয়াছিলেন এবং শিখাইয়াছিলেন, সেই রাত্রি প্রভাতে ভবান্দে মহেন্দ্রকে আনন্দ মন্দিরে সত্যানন্দ ঠাকুরের নিকট লইয়া গিয়াছিলেন। সত্যানন্দ মহেন্দ্রকে লইয়া দেবালয়ে প্রবেশ করিলেন। দেবালয়ে মহেন্দ্র প্রথম দেখিলেন, শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্মাধারী এক প্রকাণ্ড চতুর্ভুজ মূর্তি। সম্মুখে মধুকৈটভস্বরূপ দুইটি প্রকাণ্ড ছিন্ন-মস্তা মূর্তি চিত্রিত রহিয়াছে। বামে লক্ষ্মী, দক্ষিণে সরস্বতী। তারপর ১২৮৮ সালের বৈশাখের বঙ্গদর্শন-এর পাঠ আছে :
সর্বোপরি বিষ্ণুর মাথার উপরে উচ্চ মঞ্চে বহুলরত্নমণ্ডিত আসনোপবিষ্টা এক মোহিনী মূর্তি—লক্ষ্মী-সরস্বতীর অধিক সুন্দরী, লক্ষ্মী-সরস্বতীর অধিক ঐশ্বর্য্যান্বিত। গন্ধর্ব, কিন্নর, দেব, যক্ষ, রক্ষ তাঁহাকে পূজা করিতেছে।
মহেন্দ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কে উনি?’ সত্যানন্দ উত্তর দিলেন, ‘মা।’ আনন্দমঠ-এর বর্তমান সংস্করণে মাতৃমূর্তি আর বিষ্ণুর মাথার উপরে উচ্চ মঞ্চে নাই, ‘অঙ্কোপরি’ নামিয়া আসিয়াছেন।
সত্যানন্দ কক্ষান্তরে মহেন্দ্রকে জগদ্ধাত্রী মূর্তি দেখাইয়া বলিলেন, ‘মা—যা ছিলেন।’ ‘ইনি কুঞ্জর, কেশরী প্রভৃতি বন্য পশু সকল পদতলে দলিত করিয়া, বন্য পশুর আবাস স্থানে আপনার পদ্মাসন স্থাপিত করিয়াছিলেন। ইনি সর্ব্বালঙ্কারপরিভূষিতা হাস্যময়ী সুন্দরী ছিলেন। বালার্কবর্ণাভা, সকল ঐশ্বর্য্যশালিনী।’
সত্যানন্দ তার পরে মহেন্দ্রকে অন্ধকার সুড়ঙ্গ পথে এক ভূগর্ভস্থ অন্ধকার প্রকোষ্ঠে লইয়া গেলেন। মহেন্দ্র সেখানে এক কালী মূর্তি দেখিতে পাইলেন।
ব্রহ্মচারী (সত্যানন্দ) বলিলেন, ‘দেখ মা যা হইয়াছেন।’
মহেন্দ্র সভয়ে বলিলেন, ‘কালী!’
ব্রহ্মচারী, ‘কালী অন্ধকারসমাচ্ছন্না কালিমাময়ী! হৃতসর্বস্বা, এই জন্য নগ্নিকা। আজি দেশের সর্বত্রই শ্মশান—তাই মা কঙ্কালমালিনী। আপনার শিব আপনার পদতলে দলিতেছেন—হায় মা।’
সত্যানন্দ মহেন্দ্রকে দ্বিতীয় সুড়ঙ্গ-পথে লইয়া গেলেন। সহসা মহেন্দ্রের চক্ষে প্রাতঃসূর্যের রশ্মিরাশি প্রভাসিত হইল। মর্মর-প্রস্তরনির্মিত প্রশস্ত মন্দিরের মধ্যে সুবর্ণনির্মিত দশভুজা প্রতিমা দেখিতে পাইলেন। সত্যানন্দ বলিলেন :
এই মা যা হইবেন। দশভুজ দশদিকে প্রসারিত,—তাহাতে নানা আয়ুধরূপে শক্তি শোভিত,—পদতলে শত্রু বিমর্দিত, পদাশ্রিত বীরকেশরী শত্রু নিপীড়ন নিযুক্ত।
কমলাকান্তের স্বপ্নদৃষ্ট জন্মভূমির মূর্তি।
জন্মাভূমির মূর্তি কল্পনায় বঙ্কিমচন্দ্রের শ্রান্তি নাই।
মহেন্দ্র আনন্দমঠ-এর বিভিন্ন মন্দিরে বিভিন্ন দেবীরূপে জন্মভূমির ভূত ভবিষ্যৎ বর্তমান অবস্থা প্রত্যক্ষ করিয়া স্ত্রী কল্যাণীর সহিত মিলিত হইলেন। কল্যাণীর নিকট শুনিলেন, সেও পূর্ব রাত্রে ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখিয়াছিল। সে দেখিয়াছিল, সে এক অপূর্ব স্থানে গিয়াছে। সেখানে যেন সকলের উপরে কে বসিয়া আছেন :
যেন নীল পর্বত অগ্নিপ্রভ হইয়া ভিতরে মন্দ মন্দ জ্বলিতেছে। অগ্নিময় বৃহৎ কিরীট তাঁহার মাথায়। তাঁহার যেন চারি হাত। তাহার দুইদিকে কি, আমি চিনিতে পারিলাম না—বোধহয় স্ত্রীমূর্তি, কিন্তু এত রূপ, এত জ্যোতিঃ, এত সৌরভ…যেন সেই চতুর্ভুজের সম্মুখে দাঁড়াইয়া আর এক স্ত্রী-মূর্তি। সে-ও জ্যোতির্ময়ী কিন্তু চারিদিকে মেঘ, আভা ভাল বাহির হইতেছে না, অস্পষ্ট বুঝা যাইতেছে যে, অতি শীর্ণা কিন্তু অতি রূপবতী মর্মপীড়িতা কোন স্ত্রী-মূর্তি কাঁদিতেছে।
এই মেঘমণ্ডিতা স্ত্রী-মূর্তি কল্যাণীকে দেখাইয়া বলিল, ‘এই যে—ইহারই জন্যে মহেন্দ্র আমার কোলে আসে না।’ চতুর্ভুজ কল্যাণীকে বলিলেন, ‘তুমি স্বামীকে ছাড়িয়া আমার কাছে এস। এই তোমাদের মা, তোমার স্বামী এঁর সেবা করিবে।’
কল্যাণী চতুর্ভুজকেও চিনিলেন না, শীর্ণা স্ত্রীলোককেও চিনিলেন না। আমরা উভয় মূর্তিই চিনিতে পারি। আমরা উভয় মূর্তিই মহেন্দ্রের সঙ্গে আনন্দমঠের দেবালয়ে দেখিয়াছি।
বঙ্গদর্শন-এর যখন ‘বন্দে মাতরম’ গীত প্রকাশিত হইয়াছিল, তখন রাগিণী, তাল ইত্যাদি এইরূপে সূচিত হইয়াছিল :
০ ×১×১
মল্লার—কাওয়ালী, তাল যথা—বন্দে মাতরম ইত্যাদি।
এই গীত রাষ্ট্রীয় আন্দোলনকে এত দূর প্রভাবিত করিয়াছে, এবং এমন সকল সমস্যা উপস্থিত করিয়াছে যে, রাষ্ট্রীয় জীবনে বঙ্কিমচন্দ্রের প্রভাব হিসাব করিতে হইলে এই গীতের পরবর্তী ইতিহাস স্মরণ করা আবশ্যক।
১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে (1287 সনের চৈত্র) ‘বন্দে মাতরম’ গীত প্রকাশিত হইবার পাঁচ বৎসর পরে, ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে, কলিকাতায় ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন হইয়াছিল। এই অধিবেশনের সভাপতি ছিলেন দাদাভাই নৌরোজী, এবং অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি ছিলেন রাজা রাজেন্দ্রলাল মিত্র। অক্ষয়চন্দ্র সরকার ‘কবি হেমচন্দ্র’ পুস্তিকায় লিখিয়াছেন :
ইহার (১২৯১ সনের) এক বৎসর পরে, কলিকাতায় চতুর্থ (?) ‘কংগ্রেস’ উপলক্ষ্য করিয়া ‘রাখী বন্ধন’ প্রকাশিত হইল ; তাহাতে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গীতি, ভারতের ঐক্যতানরূপে হেমচন্দ্র ঘোষিত করিলেন” (৪৮ পৃঃ)
‘রাখীবন্ধন’ কবিতায় হেমচন্দ্র এই প্রকারে ‘বন্দে মাতরম’ গীতের মহিমা কীর্তন করিয়াছেন :
প্রণয়-বিহ্বল ধরে গলে গলে
গাহিল সকলে মধুর কাকলে
গাহিল ‘বন্দে মাতরম’
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং
শস্যশ্যামলাং মাতরং।
শুভ্র-জ্যোৎস্না পুলকিত-যামিনীং
ফুল্লকুসুমিত—দ্রুমদলশোভিনীং
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীং
সুখদাং বরদাং মাতরম।
বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীং
রিপুদলবারিণীং মাতরম’।
উঠিল সে ধবনি নগরে নগরে
তীর্থ দেবালয় পূর্ণ জয়স্বরে
ভারত জগৎ মাতিল।
কংগ্রসের এই অধিবেশনের আরম্ভে ‘বন্দে মাতরম’। গীত গাওয়া হইয়াছিল, এবং তার পর বাঙ্গালার সভা-সমিতিতে এই সঙ্গীত গীত হইতে আরম্ভ হয়। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গবিভাগ আন্দোলনে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি (slogan) এবং গীত বিশেষ প্রভাব বিস্তার করিয়াছিল। সকলেই জানেন, সরকারের বঙ্গবিভাগ রদ করিবার জন্য এই আন্দোলন প্রবর্তিত হইয়াছিল, সুতরাং সরকারের বিরুদ্ধাচরণের মূলমন্ত্র হইয়া দাঁড়াইয়াছিল ‘বন্দে মাতরম’। বাঙ্গালা বাঁটোয়ারা সম্বন্ধীয় আন্দোলনে অধিকাংশ শিক্ষিত মুসলমান সরকারি অভিমত সমর্থন করিয়াছিলেন। সুতরাং অনেক মুসলমান ‘বন্দে মাতরম’কে মুসলমানবিরোধী ধবনি মনে করিয়াছিলেন। আনন্দমঠ উপন্যাসের আখ্যান বস্তু এই প্রকার সিদ্ধান্তের অনুকূল প্রমাণ যোগাইয়াছিল।
