প্রসঙ্গ ‘বন্দে মাতরম’ এবং রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র
লাডলীমোহন রায়চৌধুরী
সকলেই জানেন বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ স্তোত্রটি ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারে সে কালের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে এক সময় ঘোর বিতর্ক উপস্থিত হয়েছিল। ‘বন্দে মাতরম’-এর পক্ষে এবং বিপক্ষে উভয় তরফ থেকেই জোরাল যুক্তি অবতারণা করা হয়েছিল। যাঁরা এঁর বিপক্ষে তাঁদের যুক্তি হল এই যে ‘বন্দে মাতরম’ স্তোত্রে দেশ এবং হিন্দুর দেবী দুর্গা একাকার হয়ে গিয়েছেন। ধর্মপ্রাণ মুসলমানের পক্ষে এই পৌত্তলিক ধর্মের দেবীকে প্রণাম করার ফলে ‘দোজখ’-এর পাপ জন্মায়। তা ছাড়া মুসলমানরা ‘বোছা’ দেন, তাঁদের পক্ষে হিন্দুরীতি অনুযায়ী প্রণাম জানানোও একটা পাপের কাজ। আরও কারণ আছে। ‘বন্দে মাতরম’ স্তোত্রটি যে গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত সেই আনন্দমঠ উপন্যাসটিতেও আপাতদৃষ্টিতে মুসলমান বিদ্বেষের কথা প্রচার করা হয়েছে। অতএব এমন একটি স্তোত্রকে জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হলে মুসলমানদের ধর্মবোধ আহত হতে পারে। সুতরাং এটি বর্জন করাই শ্রেয়। কবি রবীন্দ্রনাথ এই মতের সমর্থক ছিলেন। তাঁর বিবেচনায় ‘বন্দে মাতরম’-এর বড়ো জোর প্রথম দুটি স্তবক গ্রহণ করা চলে, কিন্তু স্তোত্রের শেষাংশগুলি অবশ্যই বর্জনীয়।
‘বন্দে মাতরম’-এর পক্ষে যাঁরা ছিলেন তাঁদের যুক্তিগুলিও উপেক্ষা করার মতো নয়। তাঁদের মতে এই শতাব্দীর গোড়া থেকেই এই গানটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের ইংরেজ বিরোধী লড়াইয়ে যোগ দিতে উদবুদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ, যিনি ত্রিশের দশকে এই গানটির বিরুদ্ধ সমালোচনায় মুখর হয়েছিলেন, তিনিও বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের যুগে এই গানটির প্রশংসায় কার্পণ্য করেন নি। এমন কি তাঁর একটি গানে (”একই সূত্রে বাঁধিয়ায়াছি সহস্রটি মন”) ‘বন্দে- মাতরম’ মন্ত্রটি ধুয়ো হিসেবে বারে বারেই ব্যবহার করা হয়েছে। তা ছাড়া ‘ত্বং হি দুর্গা’ প্রভৃতি যে শব্দগুলি সম্পর্কে সবচেযেবেশি আপত্তি জানানো হয়েছে সেগুলি বস্তুত ‘আইডিয়া’ মাত্র। ওগুলির মধ্যে পৌত্তলিকতার ছোঁয়াচ আছে বলে অভিযোগ করাটা কোনো কাজের কথা নয়। ‘বন্দে মাতরম’-এর পক্ষে যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে আরও অনেকেরই সঙ্গে সুভাষচন্দ্র বসুর নাম করা যেতে পারে।
‘বন্দে মাতরম’-এর প্রশ্নে কোন পক্ষের মত ন্যায়সংগত এবং কেনই বা ন্যায়সঙ্গত সে বিষয়ে পুনরায় আলোচনা শুরু করা এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। এইসব প্রশ্ন বারে বারে আলোচিত হয়েছে, তার ফলে নানা সময় মাত্রাতিরিক্ত তিক্ততারও সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৩৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতার রাস্তায় আনন্দমঠ উপন্যাসটিকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে। আবার লিগ আমলে (সম্ভবত ১৯৪২ সালে) উপন্যাসটিকে নিষিদ্ধ করারও প্রস্তাব আনা হয় (অবশ্য নাজিমুদ্দিন ও ফজলুর রহমানের হস্তক্ষেপের ফলে এই প্রস্তাব কার্যকর হয়নি)। গত বছর এই নিয়ে আবারো বিতর্ক শুরু হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত যাই হোক না কেন, তর্কের অবসান ঘটেনি। সুতরাং এইসব নিরর্থক বিচার মীমাংসায় জড়িয়ে না পড়ে বর্তমান প্রবন্ধে বিষয়টি অন্য আর এক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যেতে পারে। আমরা জানি এককালে রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র দুজনেই ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতটির মুগ্ধ অনুরাগী ছিলেন। আবার কালক্রমে এরা দুজনেই সংগীতটিকে অংশত বা পুরোপুরি বর্জন করার পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন। সময়ের বিচারে সুভাষচন্দ্রের তুলনায় রবীন্দ্রনাথ বেশ কিছু আগেই ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে তাঁর মত পরিবর্তন করেছিলেন। মত পরিবর্তনের পর সুভাষচন্দ্র আবারো রবীন্দ্রনাথকে ‘বন্দে মাতরম’-এর সপক্ষে ফিরিয়া আনার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি সফল হননি এবং সবচেয়ে বড়ো কথা তিনি নিজেই শেষ পর্যন্ত কবির মত গ্রহণ করেছিলেন। ‘বন্দে মাতরম’-কে ঘিরে এই টানাপোড়েনের একটি আংশিক চিত্র উপস্থাপিত করাই এই প্রবন্ধের মূল উদ্দেশ্য।
প্রথমে, রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র যখন উভয়েই ‘বন্দে মাতরম’-এর অনুরাগী ছিলেন সেই সময় এই গানটি সম্পর্কে এঁদের দুজনকার দুটি অভিমত উল্লেখ করা যেতে পারে। ২৮ অক্টোবর ১৯১৬ তারিখে রথীন্দ্রনাথকে লেখা একটি চিঠিতে কবি মন্তব্য করেছেন:
আমাদের বন্দে মাতরং মন্ত্র বাংলাদেশের বন্দনা-মন্ত্র নয়—এ হচ্ছে বিশ্বমাতার বন্দনা—সেই বন্দনার গান আজ যদি আমরা প্রথম উচ্চারণ করি তবে আগামী ভাবী যুগে একে একে সমস্ত দেশে এই মন্ত্র ধবনিত হয়ে উঠবে।
চৌধুরাণী—প্রণয়নের দ্বারা নবজাগরণের বোধন করিয়াছেন।’
এবারে মত পরিবর্তনের পালা। ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের যে একটা বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে তার প্রথম ইঙ্গিত পাওয়া যায় ১৯১২ সালে। ওই বছর লন্ডন শহরে একটি ঘরোয়া বৈঠকে রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে বসে স্তোত্রটির মাত্র প্রথম দুটি স্তবক গেয়েই থেমে যান—বাকি অংশটুকু তিনি ভুলে গিয়েছেন এই অজুহাতে আর গাননি। অবশ্য ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে যথার্থ কতটা বিরূপ হয়ে উঠেছিলেন সেটা ভেবে দেখা দরকার, কেননা আমরা উপরের অনুচ্ছেদে দেখিয়েছি যে ১৯১৬ সালের অক্টোবর মাসের শেষ সপ্তাহেও রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে তাঁর অনুরাগের কথা ব্যক্ত করে রথীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। কাজেই লন্ডন শহরের যে আসরে বসে তিনি ‘বন্দে মাতরম’ পুরোটা গাইতে পারেননি সেখানে সত্যি সত্যিই হয়তো গানের সব কয়টি কলি তাঁর মনে পড়েনি। কিন্তু আশ্চর্য এই যে জাতীয় সংগীত ভুলে যাওয়ার জন্য তাঁর মনে কোনো অস্বস্তির ভাব জাগে নি। সে যাই হোক সঠিক কোন তারিখের পর থেকে কবির মনে ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে অনীহা সৃষ্টি হয়েছিল সেই আলোচনা আপাতত মুলতুবি রেখেও এ কথা বলা যায় যে এই গানটি সম্পর্কে তাঁর মনে ধীরে ধীরে বিরূপতা সৃষ্টি হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত ত্রিশের দশকে এসে তিনি এই গানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই তাঁর মতামত ব্যক্ত করতে থাকেন।
সুভাষচন্দ্রও রবীন্দ্রনাথের মতো ‘বন্দে মাতরম’ বর্জন করার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে স্থির হয় যে এই সংগীতের মাত্র প্রথম দুটি কলিই সভ্য সমিতিতে গীত হবে। সুভাষচন্দ্র এই সিদ্ধান্ত মেনে নেন। তবে ঐক্যের খাতিরে পরবর্তীকালে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেও, সুভাষচন্দ্র ‘বন্দে মাতরম’-এর অঙ্গচ্ছেদকে প্রসন্ন মনে গ্রহণ করতে পারেন নি। এমনকী এ ধরনের সিদ্ধান্ত যাতে না নেওয়া হয় সেজন্য তিনি রীতিমতো চেষ্টাও করেন। এ ব্যাপারে প্রথমেই তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহায্যপ্রার্থী হন। ১৯৩৭ সালের ১৯ অক্টোবর তারিখে কবি এ বিষয়ে তাঁর সুস্পষ্ট মতামত জানিয়ে সুভাষচন্দ্রকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে তিনি জানান:
বন্দে মাতরং গানের কেন্দ্রস্থলে আছে দুর্গার স্তব এ কথা এতই সুস্পষ্ট যে এ নিয়ে তর্ক চলে না। অবশ্য বঙ্কিম এই গানে বাংলাদেশের সঙ্গে দুর্গাকে একাত্ম করেছেন, কিন্তু স্বদেশের এই দশভুজা মূর্তিরূপের যে পূজা সে কোনো মুসলমান স্বীকার করে নিতে পারে না।
রবীন্দ্রনাথ এই চিঠি যখন লেখেন তখন সুভাষচন্দ্র কার্শিয়াং-এ রয়েছেন। কার্শিয়াং-এ কবির লেখা চিঠিখানি তখনও তাঁর হাতে এসে পৌঁছয়নি। ইতিমধ্যে ‘বন্দে মাতরম’-
‘-কে টিকিয়ে রাখার জন্য সুভাষচন্দ্র আরো নানাভাবে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ২০ অক্টোবর তারিখে তিনি রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে একটি চিঠি লেখেন। মূল চিঠিখানি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালায় দেখতে পাওয়া যায়। চিঠিখানির বয়ান এইরকম :
Kurseong
২০.১০.৩৭
শ্রদ্ধাস্পদেষু,
আপনার পত্র এইমাত্র পাইয়া বিশেষ আনন্দিত হইলাম। আমি কলিকাতায় ২৪ তারিখে পৌঁছিব এবং সেখানে এক সপ্তাহ থাকিব। আমার ঠিকানা ৩৮/২ এলগিন রোড। মহাত্মাজি ও পণ্ডিত জহরলাল ২৬ তারিখে কলিকাতায় পৌঁছিবেন এবং থাকিবেন—উডবার্ন পার্ক-এ। আপনি যদি মহাত্মাজিকে ‘বন্দেমাতরম’-এর বিষয়ে লেখেন তাহা হইলে বড়ো ভালো হয়। আপনার সাহায্য এ বিষয়ে একান্ত দরকার। আমি জানিনা ‘ওয়ার্কিং কমিটি’ এ বিষয়ে কি করিয়া বসিবেন, কমিটিতে আমি একমাত্র বাঙালি। যদি সম্ভব হয় তাহা হইলে কবিকে অনুরোধ করিবেন মহাত্মাজিকে লিখিবার জন্য। আমি কবিকে লিখিয়াছি, কিন্তু কি ফল হইবে জানি না। অন্যান্য বিষয়ে আপনাকে পরে লিখিতেছি।
আমার বিজয়ার প্রণাম গ্রহণ করিবেন—
ইতি
বিনীত
সুভাষচন্দ্র বসু
চিঠিখানি পাঠ করে বোঝা যায় যে ‘বন্দে মাতরম’-কে অক্ষত অবস্থায় টিকিয়ে রাখা যে একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে সেটা সুভাষচন্দ্রও টের পেয়ে গিয়েছিলেন। তাই তাঁর চিঠির ভাষায় এক ধরনের হতাশা ফুটে উঠেছে। তিনি রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখেছেন, তার উত্তর এখনও তাঁর হাতে এসে পৌঁছয়নি, কিন্তু কবির কাছ থেকে এ ব্যাপারে যে বিশেষ সাড়া পাওয়া যাবে না সেটা তিনি আগে থেকেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তিনি বিষয়টি সম্পর্কে গান্ধিজিকেও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাতেও বিশেষ ফল লাভ হয়নি। সবচেয়ে লক্ষ করার বিষয় যে সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির একমাত্র বাঙালি সদস্য বলে কমিটিতে তাঁর মতামত অগ্রাহ্য হতে পারে বলে প্রকারান্তরে একটা আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন। সুভাষচন্দ্রের সংক্ষিপ্ত চিঠিখানি পড়ে স্পষ্টভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়তো টানা চলে না। তবে একটা যেন সন্দেহের ইশারা পাওয়া যায়। ১৯৩৭-এর অক্টোবরে ‘বন্দে মাতরম’ সম্পকে কংগ্রেস যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা হয়তো সব দিক দিয়েই যথেষ্ট যুক্তিসম্মত হয়েছিল। কিন্তু তা হলে ওয়ার্কিং কমিটির একমাত্র বাঙালি সদস্য হিসেবে সুভাষচন্দ্র নিজেকে এত অসহায় বোধ করেছিলেন কেন?
‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে ওয়ার্কিং কমিটি যে সিদ্ধান্ত নেয় সুভাষচন্দ্র তা মেনে নেন এবং পরবর্তীকালে এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে তিনি নানা জায়গায় নিজের মন্তব্যও প্রকাশ করতে দ্বিধা করেননি। ১৯৩৯ সালের ১১ আগস্ট যতীন্দ্রমোহন বাগচীর ঘরে সুভাষচন্দ্র জানান, ‘সেইজন্য সর্ববাদী-সম্মতভাবে যে অংশটুকু গৃহীত হয়েছে তাতে বন্দেমাতরম সংগীতের মর্যাদা কোনো মতে ক্ষুণ্ণ হয়নি বলেই আমি মনে করি।’ এর থেকে বোঝা যায় যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একবার কোনো বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ হওয়ার পর সুভাষচন্দ্র সেটি রক্ষার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করছিলেন। তাঁর পক্ষে এটিই সবচেয়ে স্বাভাবিক। ১৯৩৭ সালের অক্টোবর মাসে লখনউ-এ অনুষ্ঠিত মুসলিম লিগের বার্ষিক অধিবেশনে কংগ্রেস যেভাবে জিন্না ও তাঁর সহযোগীদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল তার ফলে দেশের বৃহত্তর স্বার্থরক্ষার জন্য কংগ্রেসের পক্ষে এই ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া উপায়ও ছিল না। সুভাষচন্দ্র এটা বুঝেছিলেন, তাই তিনিও এই ব্যাপারে সায় দিয়েছিলেন।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ? হিন্দু সংস্কৃতি তথা হিন্দু পৌত্তলিকতার অপরাধে তিনি ‘বন্দে মাতরম’-কে বর্জন করেছিলেন। কিন্তু জনৈক রবীন্দ্র-গবেষকের মতে এটাই যদি ‘বন্দে মাতরম’-এর একমাত্র অপরাধ হয় তাহলে কবির পরবর্তীকালের রচিত ‘স্বদেশ’ পর্যায়ের আরও একাধিক গান বর্জন করতে হয়। এমন কি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতটিতেও ‘বোজা’ দেওয়ার পরিবর্তে ‘ও মা তোর চরণেতে দিলেম এই মাথা পেতে’—ইত্যাদি বিধর্মী প্রণাম পদ্ধতির কথা লেখা আছে। তা ছাড়া আরো আছে। ‘মাতৃমন্দির-পুণ্য অঙ্গন’, ‘ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে’, ‘অয়ি ভুবনমনমোহিনী মা ‘—ইত্যাদি গানগুলিও কি পৌত্তলিকতাপন্থী নয়? তবে কেন এগুলি ‘স্বদেশ’ পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা হল? এই পর্যায় বিভাগ যে-ই করুন না কেন, রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ তো একা হিন্দুর দেশ নয়। কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর আজো আমাদের পাওয়া হয়নি।
পরিশেষে আর একটি প্রাসঙ্গিক তথ্য। ‘বন্দে মাতরম’ গানে ‘দেশ’ রাগে রবীন্দ্রনাথই প্রথম সুরারোপ করেন। ১৮৯৬ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ নিজের দেওয়া সুরে এই গানটির কতকাংশ (‘সুখদাং বরদাং মাতরম’ পর্যন্ত) গেয়ে শুনিয়েছিলেন। কবি কর্তৃক সুরারোপিত কবিকণ্ঠে এই গানটির প্রথম রেকর্ড বের হয়েছিল ১৯০৫ সালে। রেকর্ডের একদিকে ছিল ‘সোনার তরী’ কবিতার কবিকণ্ঠে আবৃত্তি এবং অপরদিকে এই গান। আমহার্স্ট স্ট্রিট-এর বিখ্যাত এইচ বোস কর্তৃক ৭৮ আ. পি. এম. স্পিডে এই গানটি রেকর্ড করা হয়। রেকর্ডের নম্বর ছিল ৪৫৪৭৭। আর একটি কপি রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদর্শনী গৃহে আজো সংরক্ষিত আছে।
সবচেয়ে লক্ষ্য করার বিষয় যে, সুভাষচন্দ্র কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির একমাত্র বাঙালি সদস্য বলে কমিটিতে তাঁর মতামত অগ্রাহ্য হতে পারে বলে প্রকারান্তরে একটা আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।
প্রবন্ধটি রচনার কাজে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগ্রহশালার অধ্যক্ষ শ্রীসমর ভৌমিক নেতাজির অপ্রকাশিত চিঠিখানি ব্যবহার করার সুযোগ দিয়ে আমার কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছেন। এ ব্যাপারে আমি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক রমাপ্রসাদ দাস-এর নিকটও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ। এ ছাড়া শ্রীনিত্যপ্রিয় ঘোষ-এর লেখা ‘মুক্ত একক রবীন্দ্রনাথ’ এবং অধ্যাপক জীবন মুখোপাধ্যায়-এর ‘আনন্দমঠ ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদ’ নামক বই দুখানি থেকেও আমি মূল্যবান তথ্য সংকলন করেছি। এঁদের কাছেও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
