বন্দে মাতরম ধ্বনির রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র – নারায়ণ চৌধুরী

‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনির রচয়িতা বঙ্কিমচন্দ্র

নারায়ণ চৌধুরী

স্বদেশপ্রেমের সঞ্জীবনী মন্ত্র ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের শতবর্ষপূর্তির বৎসর ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দ। গানটি ১৮৭৫ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ লেখা হয়েছিল বলে ইতিহাসকারদের অনুমান। অনুমানের পিছনে যাকে বলে ‘পাথুরে প্রমাণ তার পোষকতা না থাকলেও অভ্যন্তর প্রমাণ থেকে এই অনুমান সমর্থিত হয়। ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত-স্রষ্টা অমর ঔপন্যাসিক বঙ্কিমচন্দ্রের অনুজ পূর্ণচন্দ্র এবং নীলদর্পণ নাটকের প্রণেতা দীবন্ধু মিত্রের পুত্র ললিতচন্দ্র দুজনেই এই অনুমানের পক্ষে লিখে গেছেন। পূর্ণচন্দ্রের ধারণা, ১৮৭৫ খ্রিঃ কোনো এক সময় এই গানটি রচিত হয়েছিল এবং রচনাকাল কমলাকান্তের দপ্তর প্রবন্ধমালার অন্তর্গত ‘আমার দুর্গোৎসব’ নামক প্রসিদ্ধ প্রবন্ধের রচনাকালের অব্যহিত পরে হওয়াই সম্ভব। কেননা দুটি রচনার ভিতর গদ্য-পদ্যের মাধ্যমগত মৌলিক পার্থক্য থাকলেও বিশেষ ভাবগত মিল আছে। ‘আমার দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধে হিন্দুর আরাধ্যা শক্তিস্বরূপিণী মাতৃমূর্তির যে ধ্যান অনুপম গদ্যভঙ্গিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের উচ্চারণ তা-ই কবিতায় ছন্দিত ও সুরে বন্দিত হয়েছে। দুইয়ের ভাবের পটটিতে আশ্চর্য সৌসাদৃশ্য লক্ষ্য করা যায়। কমলাকান্তের দপ্তর বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ১৮৭৫ খ্রিঃ ধারাবাহিকক্রমে প্রকাশিত হচ্ছিল, তা থেকে ‘আমার দুর্গোৎসব’ আর ‘বন্দে মাতরম’-এর ভিতর ভাবসূত্র প্রতিষ্ঠা করা সহজতর হয়েছে।

কিন্তু রচনার উপলক্ষটি নাকি বড়োই সামান্য ! প্রায় অবিশ্বাস্য বললেও চলে। পূর্ণচন্দ্রের বঙ্কিম-প্রসঙ্গ বইয়ের সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, তাঁর দাদা এই গানটি আদিতে বঙ্গদর্শন পত্রিকার শূন্য পৃষ্ঠার পাদপূরণের অভিপ্রায়ে রচনা করেছিলেন। সাময়িক পত্র পত্রিকা সম্পাদনার প্রক্রিয়া সম্পর্কে যাঁদের ধারণা আছে তাঁরা নিশ্চয় জানেন যে, কোনো রচনার শেষ পৃষ্ঠার পাঠ্যবস্তু যদি অল্পেই শেষ হয়ে যায় তাহলে সেই পৃষ্ঠার শূন্যস্থান পরিপূরণের জন্য সম্পাদক মশাইকে ক্ষুদ্র কবিতা বা সংক্ষিপ্ত গদ্যাংশ বা কোনো উদ্ধৃতি হাতের কাছে সর্বদাই মজুত রাখতে হয়, যাতে অপূরণ অংশ পূরণ করতে কোনো অসুবিধা না হয়। তেমন কোনো আপাত-তুচ্ছ অভিপ্রায় থেকেই নাকি এই গানের জন্ম। বঙ্কিমচন্দ্র গানটি লিখে টেবিলের উপর চাপা দিয়ে রেখেছিলেন। তারপর কী ঘটেছিল তা পূর্ণচন্দ্রের জবানীতেই শোনা যাক :

ছাপাখানার পণ্ডিত মহাশয় পাতা পূরণের জন্য, এটি দেখিয়া মন্দ নয় বলিয়া কহিলে, সম্পাদক, বঙ্কিমচন্দ্র বিরক্ত হইয়া কাগজখানি টেবিলের দেরাজের ভিতর রাখিয়া বলিলেন, উহা ভাল কী মন্দ, এখন তুমি বুঝিতে পারিবে না, কিছুকাল পরে বুঝিবে—আমি তখন জীবিত না থাকিবারই সম্ভব, তুমি থাকিতে পার।

বঙ্কিমচন্দ্রের ভবিষ্যৎ বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রতিপন্ন হয়েছিল। কিন্তু তিনিও বোধ করি তখন এই গানের অন্তহীন সম্ভাবনার প্রকৃত ধারণা করে উঠতে পারেননি। সূচনাতে এই গানের যথার্থ মূল্যাবধারণ হয়নি, ইতিহাসের সরণি বেয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলন যত এগিয়ে গেছে তত এই মন্ত্রতুল্য গানটিকে ঘিরে মুক্তিযোদ্ধাদের স্বদেশ প্রেম, সংগ্রামী চেতনা, শৌর্য-বীর্য-সাহস, সঙ্কল্পের দৃঢ়তা, আত্মোৎসর্গের কামনা ক্রমশ উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। গানটি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। সেই ইতিহাসেরও আবার শীর্ষবিন্দু স্পষ্ট হয়েছে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের কালে—১৯০৫ খ্রিঃ সমেত তার আগের ও পরের বৎসরগুলিতে। এই বছর কয়টিতে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের কলি কণ্ঠে ধারণ করে কত কত বীর বাঙালি যুবক যে পুলিশের লাঠি ও গুলির মুখে অকুতোভয়ে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে, আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে তবু হাতের মুঠোয় সজোরে চেপে ধরা জাতীয় পতাকা হস্তচ্যুত করেনি, মৃত্যুঞ্জয়ী শৌর্যের অমিত আধার রূপে হাসতে হাসতে ফাঁসির মঞ্চে আরোহণ করেছে, তার সীমা-সংখ্যা নেই।

বস্তুত, ‘বন্দে মাতরম’ নিছক একটি গান নয়, নিছক একটি মাতৃস্তোত্র নয়, তার সঙ্গে বাংলার স্বদেশি যুগের গোটা ইতিহাসের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক—তার স্বাধীনতা সংগ্রামের নিত্যপ্রেরণাস্থল এই অবিস্মরণীয় সঙ্গীত। আর শুধু বাংলার কথাই বা বলি কেন, সমগ্র ভারতবর্ষের মুক্তিকামনা এই গানটিকে অবলম্বন করে একদা শ্রেষ্ঠ আত্মপ্রকাশের উপায় খুঁজে পেয়েছিল। ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতকে বাদ দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার কথা ভাবা যায় না।

গানটি রচিত হওয়ার সাত বৎসর পরে এটি আনন্দমঠ (১৮৮২ খ্রিঃ) উপন্যাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রথম সাধারণের গোচর হয়। আনন্দমঠ-এর বিষয়বস্তু, পরিবেশ, চরিত্র-পরিকল্পনা, উদ্দেশ্য—যেদিক থেকেই বিচার করা যাক না কেন—গানটি উপন্যাসের আবহের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে খাপ খেয়ে গেছে। আনন্দমঠ উপন্যাসের আর ‘বন্দে মাতরম’ গান এই দুই-ই এক অপরের পরিপূরক—দুইয়ের সম্পর্ক অচ্ছেদ্য বলা যায়। ‘বন্দে মাতরম’ সন্তানদলের সন্ন্যাসীদের মাতৃমন্ত্র, সন্তানদের স্বদেশমাতৃকার বেদীমূলে আত্মোৎসর্গের আকাঙক্ষায় নিত্যউদ্দীপক প্রেরণা। উপন্যাসের অনুষঙ্গে, এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশে জ্যোৎস্নাময়ী রজনীর অরণ্যানীসমাকুল এক নির্জন প্রান্তরের বিস্তার মধ্যে এই গানটি প্রথম গীত ও শ্রুত হয়। গায়ক সন্তানদলের অন্যতম সন্ন্যাসী ভবানন্দ, শ্রোতা মহেন্দ্র। আমরা আনন্দমঠ উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদের সংশ্লিষ্ট অংশ এখানে তুলে দিচ্ছি :

‘ভবানন্দ—আপন মনে গীত আরম্ভ করিলেন :

বন্দেমাতরম।

সুজলাম, সুফলাম মলয়জশীতলাম

শস্য-শ্যামলাম মাতরম।

‘মহেন্দ্র গীতি শুনিয়া কিছু বিস্মিত হইল, কিছু বুঝিতে পারিল না—সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শশ্যশ্যামলা মাতা কে? জিজ্ঞাসা করিল, ‘মাতা কে?’

‘উত্তর না করিয়া ভবানন্দ গাইতে লাগিলেন :

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম

ফুল্লকুসুমিতদ্রুমদলশোভিনীম,

সুহাসিনীম সুমধুরভাষিণীম

সুখদাম, বরদাম, মাতরম।

‘মহেন্দ্র বলিলেন, ‘এ ত’ দেশ, ‘এ ত’ মা নয়।’

‘ভবানন্দ বলিলেন, ‘আমরা অন্য মা মানি না—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। আমরা বলি, জন্মভূমিই জননী, আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই না, বন্ধু নাই, স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, আমাদের আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা, শস্যশামলা,—’

তখন বুঝিয়া মহেন্দ্র বলিলেন, ‘তবে আবার গাও।’

‘ভবানন্দ আবার গাইলেন—বন্দে মাতরম…।’

পরিষ্কার বোঝা যায় এ গান মাতৃস্তোত্র হলেও সাধারণ মাতৃস্তোত্র নয়। এ মৃত্তিকাময়ী জননীর স্তব নয়, চিন্ময়ী জননীর ধ্যান। কতকগুলো মাটির ঢেলা গাছপালা পাহাড়-পর্বত নদীনালা সাগর পাথারের সমাহারকে বাহ্যদৃষ্টিতে দেশজননী বলে অভিহিত করলেও যতক্ষণ না ওই মৃত্তিকা প্রস্তর তরুলতা জলসমষ্টির ভিতর চিৎশক্তির আবাহন করা হচ্ছে, ততক্ষণ তা যথার্থ স্বদেশজননীর ধ্যান মূর্তিতে অধিষ্ঠিত হতে পারে না।

প্রকৃত প্রস্তাবে, বঙ্কিমচন্দ্র এই দৃষ্টিতেই স্বদেশজননীকে দেখেছিলেন এবং ওই দর্শনের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়েই ‘বন্দে মাতরম’ গানটি লিখেছিলেন। পরবর্তীকালে অরবিন্দ ঘোষ (উত্তর জীবনে শ্রীঅরবিন্দ) এবং তাঁর বিপ্লবী সহযোগিবৃন্দ ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতধৃত মাতৃকামূর্তির ভিতর ওই চৈতন্যস্বরূপিণী মায়ের রূপটিকেই প্রত্যক্ষ করে উদ্ভাবে ভাবিত হয়ে তাঁদের বিপ্লব আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। অরবিন্দ ঘোষ ‘বন্দে মাতরম’ গানটির দ্বারা এতটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে, তিনি এটিকে বঙ্কিমের শিল্পীসত্তা থেকে ক্রান্তদর্শী সত্তায় উত্তরিত হওয়ার মূল কারক ব’লে মনে করেন এবং এখান থেকেই তাঁর ঋষিত্বের পর্বের সূচনা হয়েছিল বলে ধারণা করেন। অরবিন্দের মতে আনন্দমঠ-এর আগে পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্রের যে রূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে তা হ’লে তাঁর কবিস্বরূপ, শিল্পীস্বরূপ, কিন্তু আনন্দমঠ-এর সময় থেকে যে বঙ্কিমচন্দ্রের আবির্ভাব হল তাঁর ‘দ্রষ্টা ও জাতি-সংগঠক’ স্বরূপ। অরবিন্দ আনন্দমঠ উপন্যাস ও তদন্তর্গত ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের ভাবে উদ্বুদ্ধ হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে বড়ো দায় থাকাকালে তাঁর প্রসিদ্ধ ‘ভবানীমন্দির’ সংগঠনের পরিকল্পনা করেছিলেন। এই শতাব্দীর প্রথম দশকে আরব্ধ অগ্নিমন্ত্রশুদ্ধ বিপ্লব আন্দোলনের পদ্ধতি-প্রকরণ, ধারা-ধরনের মধ্যে ভবানীমন্দিরের আদর্শের স্পষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।

অরবিন্দ ‘বন্দে মাতরম’ গানের গদ্য ও পদ্য ইংরেজি অনুবাদ করেই শুধু ক্ষান্ত হননি, তিনি এই নামেই তাঁর যুগান্তর দলের ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার নামকরণ করেন এবং পত্রিকাটিকে বিপ্লবী ভাবপ্রচারের মুখ্য বাহনে পরিণত করেন। ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় প্রাকশিত অরবিন্দের লিখিত কিন্তু অস্বাক্ষরিত দু-তিনটি সম্পাদকীয় নিবন্ধের জন্যই অরবিন্দকে আলিপুর বোমার মামলায় জড়ানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হয় এই অজুহাতে যে, ওই অস্বাক্ষরিত প্রবন্ধগুলো তাঁর রচনা এবং সেগুলোর ভিতর তিনি ইংরেজের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের প্ররোচনা যুগিয়েছেন, অর্থাৎ হিংসার প্রচার করেছেন। সকলেই জানেন যে, তরুণ ব্যারিষ্টার চিত্তরঞ্জন দাশ (পরে দেশবন্ধু) এই মামলায় অরবিন্দের পক্ষে দাঁড়ান এবং তাঁর অপূর্ব বাগ্মিতার প্রভাবে ও সুযুক্তিজাল-বিস্তারের সাহায্যে শেষ পর্যন্ত অরবিন্দকে অভিযোগমুক্ত করতে সমর্থ হন। অরবিন্দ কারাগার থেকে ছাড়া পান।

‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় (১৯০৭-০৮ খ্রীঃ) অরবিন্দ তাঁর অন্যতম সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, রাক্ষস যদি দেশজননীর বুকের উপর চেপে বসে তাঁর রক্তপানে উদ্যত হয় তাহলে মাতৃভক্ত সন্তান মাত্রেরই কর্তব্য হল রাক্ষসকে আক্রমণ করে তার প্রাণ বন্ধ করা। ইংরেজ সরকার এই কথাগুলোর মধ্যে রাজদ্রোহের গন্ধ পেয়েছিলেন, শুধু তাই নয়, অস্ত্রধারণেরও প্ররোচনা আবিষ্কার করেছিলেন। চিত্তরঞ্জন সুকৌশলে এই অভিযোগের খণ্ডন করেন। যে সওয়ালের সাহায্যে চিত্তরঞ্জন এই কাজটি সুসম্পন্ন করেন তার ভিতর শুধু সুদক্ষ ব্যারিষ্টারসুলভ ক্ষুরধার তর্কনৈপুণ্যশক্তিরই পরিচয় ছিল না, ছিল কবিপ্রাণতারও পরিচয়। চিত্তরঞ্জন সরকারের অভিযোগ খণ্ডনে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতের নিহিত ভাবব্যঞ্জনার দ্বারা চালিত হয়েছিলেন—দেশজননী যে কেবলমাত্র মৃত্তিকাময়ী মা-ই নন, চিন্ময়ী মাও বটেন, একজন সংবেদনশীল কবির কবিদৃষ্টির দ্বারা এই ভাবটিকে তাঁর দেওয়ালের কেন্দ্রমধ্যে প্রতিষ্ঠিত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সম্পাদকীয়তে উল্লেখিত মা সত্যিকারের মা। মায়ের অপমান কোনো সন্তানই সহ্য করতে পারে না, করা উচিত নয়। রাজদ্রোহের অভিযোগে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত অরবিন্দ দেশজননীর উপমায় সত্যিকার মায়ের দুঃখের কথাই লিখেছিলেন। তিনি মৃন্ময়ী মায়ের দেহে চিন্ময়ী সত্তার আরোপ করেছিলেন।

‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকার অন্যতম এক সম্পাদকীয়তে অরবিন্দ লেখেন :

It was thirty-two years ago that Bankim wrote his great song….The Mantra had been given and in a single day a whole people had been converted to the religion of partriotism. The Mother had revealed herself…..A great nation which has had that vision can never again be placed under the feet of the conqueror.

অর্থাৎ বত্রিশ বছর আগে বঙ্কিম তাঁর মহান সঙ্গীতটি রচনা করেছিলেন। …মন্ত্র উচ্চারিত হল আর দেখতে দেখতে একটা গোটা জাতি দেশপ্রেমের ধর্মে দীক্ষিত হয়ে পড়ল। জননী আত্মপ্রকাশ করলেন।…যে বিরাট জাতির এমনতর ধ্যানদৃষ্টি খুলে গেছে, সেই জাতি আর কখনও বিজেতার পায়ের তলায় পড়ে থাকতে পারে না।

পড়ে থাকেওনি, এই ছত্রগুলো লিখিত হওয়ার ঠিক চল্লিশ বছর পরে ভারতবর্ষ ইংরেজের নাগপাশমুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে।

সর্বশেষে, মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত সম্পর্কে কী লিখেছিলেন তা উৎকলন করার লোভ সামলাতে পারছি না :

বঙ্কিমচন্দ্র যাহা কিছু করিয়াছেন….সব গিয়া এক পথে দাঁড়াইয়াছে। সে পথ জন্মভূমির উপাসনা—জন্মভূমিকে মা বলা—জন্মভূমিকে ভালোবাসা—জন্মভূমিকে ভক্তি করা। তিনি এই যে কার্য করিয়াছেন, ইহা ভারতবর্ষের আর কেহ করেন নাই। সুতরাং তিনি আমাদের পুজ্য, তিনি আমাদের নমস্য, তিনি আমাদের আচার্য, তিনি আমাদের ঋষি, তিনি আমাদের মন্ত্রকৃৎ, তিনি আমাদের মন্ত্রদ্রষ্টা। সে মন্ত্র—বন্দে মাতরম।

তবে ভিন্ন এক দৃষ্টিতে দেখলে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্যে বুঝি সাম্প্রদায়িকতার কিছু দ্যোতনা লক্ষ্য করা যায়। বঙ্কিমচন্দ্র এই ঐতিহাসিক মন্ত্র-সঙ্গীতটিতে যে মাতৃমূর্তির ধ্যান ও বন্দনা করেছেন তিনি একান্ত ভাবেই হিন্দু সম্প্রদায়ের আরাধ্য মাতৃমূর্তি। এর সঙ্গে ভারতবর্ষের অন্যান্য সম্প্রদায়ভুক্ত অধিবাসীদের ভাবাবেগ জড়ানো নেই। তাছাড়া এই গানে পৌত্তলিকতার সংস্কারও বড়ো প্রকট যেজন্য একদা মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ এই স্তবটিকে তাঁদের স্তব বলে গ্রহণ করতে অন্তরের বাধা অনুভব করেছিলেন। আর শুধু মুসলিম সম্প্রদায়ের জনসাধারণ কেন, আপত্তি উঠেছিল অন্য সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকেও। আবাল্য মূর্তিপূজার বিরোধী সংস্কারে লালিত-বর্ধিত কবি রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত গানটির অংশবিশেষের বিরুদ্ধে তাঁর আপত্তি জানাতে বাধ্য হয়েছিলেন। দুর্গাস্তবের অন্তর্নিহিত পৌত্তলিক মাতৃধ্যানের কল্পনার বিরুদ্ধে ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী কবি ১৯৩৭ সালে সংবাদপত্রে প্রদত্ত এক বিবৃতিতে তাঁর দ্ব্যর্থহীন অভিমত প্রকাশ করেছিলেন।

ওই বিতর্কের আজও যে শেষ হয়েছে এমন কথা বলা চলে না। কেননা এই সেদিনও আনন্দমঠ উপন্যাসের শতবর্ষপূর্তির বছরে (১৯৮২) এই নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। আনন্দমঠ উপন্যাসের মধ্যে বিশেষ এক সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিব্যক্ত মাত্রাহীন অসূয়ার মনোভাব ও ঘৃণা সেই সময় সম্যকদর্শী ও শুভ্রভাবাপূর্ণ অনেকেরই নিরপেক্ষ অন্তরে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, তাকে তাঁরা, সংগত সমালোচনার মধ্যে ভাষা দেন। সেই সূত্রে ‘বন্দে মাতরম’ গীতিটিও রেহাই পায় না। দেশে যে হারে যুক্তিবাদী চিন্তা-চেতনার প্রসার ঘটছে তাতে মনে হয় এ বিতর্ক চলতেই থাকবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *