আনন্দমঠের আদর্শ
আল-ফারুক
বঙ্কিমবাবুর আনন্দমঠ ও ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত নিয়ে দেশের আকাশ-বাতাস মথিত হয়ে উঠেছে আন্দোলনের প্রচণ্ডতায়। ভারতের বৃহত্তম দুই রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের দরবারে পর্যন্ত আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে গেছে এবং উভয় প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ করে ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে ‘রিজুলিউশন’ পর্যন্ত পাস করতে হয়েছে। ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত আনন্দমঠ-এরই শঙ্খধবনি বা ‘বাই-প্রডাক্ট’। আনন্দমঠ-এর সত্যিকার আদর্শ নিয়ে আলোচনা সময়োপযোগী, সন্দেহ নেই।
গোড়ার কথা
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাংলা কথাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠতম না হলেও প্রথমতম শক্তিমান লেখক, তা সর্ববাদীসম্মত। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি প্রথম ‘গ্র্যাজুয়েট’। বাংলার শ্রেষ্ঠতম দানবীর মহাত্মা হাজী মোহাম্মদ মোহছেন মরহুমের করুণাধারায় প্রতিষ্ঠিত সঞ্জীবিত ‘হুগলী মোহছেন কলেজ’ থেকেই হুগলী-সমীপবর্তী নৈহাটী-কাঁঠালপাড়ার অধিবাসী যুবক বঙ্কিমচন্দ্র বি. এ. পাশ করে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের পদলাভ করেন এবং উত্তরকালে ‘রায়বাহাদুর’ ও ‘সি. আই. ই.’ খেতাবে ভূষিত হন।
প্রথমাবস্থায় জাতিধর্মনির্বিশেষে ‘হুগলী মোহছেন কলেজে’র যাবতীয় পড়ুয়ারা কোনো-না-কোনো প্রকারে হাজী মোহছেন মরহুমের ‘ওয়াকফ-ফন্ড’ হতে উপকৃত হতো। অন্ততঃ মোহছেন-ফন্ডের কল্যাণে হুগলি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলেই বালক বঙ্কিম অপেক্ষাকৃত স্বাচ্ছন্দ্যের সহিত লেখাপড়া করে মানুষ হতে পেরেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে, ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে হুগলি-কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাংলা দেশে তখন যে স্কুল-কলেজের ছড়াছড়ি ছিল না, তা খুলে বলার দরকার করে না। এই হিসেবে বঙ্কিমচন্দ্রকেও নিঃস্বার্থ দানবীর হাজী মোহছেন মরহুমের করুণাধারায় সিক্ত ও ধন্য হাজার হাজার মানুষের অন্যতম বলে নির্দেশ করা অসঙ্গত নয়।
সেকাল ও একাল
এ-কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে ডেপুটিম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ইংরেজ-মনিবের নিমক খাওয়ার সময়েই বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠ লিখেছিলেন। প্রবল প্রতাপান্বিত ব্রিটিশ গভর্নমেন্টের নিমকখোর নওকরদের নিমকহালালী ও রাজভক্তির পরাকাষ্ঠা সম্বন্ধে সন্দেহের অবসর নেই। স্বদেশি-আন্দোলন, নন-কো-অপারেশন, নিরস্ত্র প্রতিরোধ, সংবাদপত্রের প্রাচুর্য প্রতিষ্ঠা ও প্রতারণা, স্বাধীনতাপন্থী রাজনৈতিক আন্দোলন, বিপ্লবাত্মক রাষ্ট্রীয় পরিবর্তন প্রভৃতি বহুবিধ কারণে ভারতের ব্রিটিশসিংহের শক্তি ও হুঙ্কার আজ কতকটা মন্দীভূত হলেও, বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে যে ব্রিটিশ প্রতাপ অনেক বেশি প্রবল ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, তা বলাই বাহুল্য। ভারতের নতুন শাসনতন্ত্রে কংগ্রেসি প্রধানমন্ত্রীর খাতিরে, আদেশে বা চক্ষুলজ্জায় কোনো প্রাদেশিক গভর্নমেন্টের প্রবলপ্রতাপান্বিত—বিলাতের ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী মিস্টার লয়েড জর্জের ভাষায় ‘বিলাতি ইস্পাতের কাঠামো’ সম সুদৃঢ়—খাস বিলাতি সিভিলিয়ন ‘মীর মুনশী’ বা চীফ সেক্রেটারিকেও খদ্দরপোশাকে ভূষিত হয়ে আফিস করতে হয়েছে বা হচ্ছে, সংবাদপত্রপাঠকগণ তা অবগত আছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের সময়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে তা কি কেউ কল্পনাও করতে পারতো? সেই একদিন আর এই একদিন—আসমান জমিন তফাৎ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
যাক সে-কথা। এইবার ‘আনন্দমঠ’-এর পূত-প্রাঙ্গণে প্রবেশ করা যাউক।
বুনিয়াদ
উত্তর-বাংলার ‘সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ’ই যে আনন্দমঠ-এর ঐতিহাসিক বুনিয়াদ, ‘তৃতীয় বারের বিজ্ঞাপনে’ বঙ্কিমচন্দ্র নিজেই তা লিপিবদ্ধ করে গেছেন :
এবার পরিশিষ্টে বাঙ্গালার সন্ন্যাসী-বিদ্রোহের যথার্থ ইতিহাস ইংরেজি গ্রন্থ হইতে উদ্ধৃত করিয়া দেওয়া গেল। পাঠক দেখিবেন, ব্যাপার বড়ো গুরুতর হইয়াছিল। আরও দেখিবেন যে, দুইটি ঘটনা সম্বন্ধে উপন্যাসে ইতিহাসে বিশেষ অনৈক্য আছে। যে-যুদ্ধগুলি উপন্যাসে বর্ণিত হইয়াছে, তাহা বীরভূম প্রদেশে ঘটে নাই। উত্তর-বাঙ্গালায় হইয়াছিল। আর Captain Edwards নামের পরিবর্তে Major Wood নাম উপন্যাসে ব্যবহৃত হইয়াছিল। এ-অনৈক্য আমি মারাত্মক বিবেচনা করি না, কেননা উপন্যাস উপন্যাস,—ইতিহাস নহে।
পুরো বিজ্ঞাপন অবিকল উদ্ধৃত হলো। ‘পঞ্চমবারের বিজ্ঞাপন’ থেকে প্রতীয়মান হয়, উপরের ভুলগুলি উক্ত সংস্করণে সংশোধন করা হয়েছে। এই সংশোধিত সংস্করণই বর্তমানে বাজার-প্রচলিত আনন্দমঠ।
সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ
পরিশিষ্টের ‘যথার্থ ইতিহাস’ থেকে দেখা যায়, ১৭৭৩-৭৫ খ্রিস্টাব্দে এই সন্ন্যাসী বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছিল। তিববতের দক্ষিণ ভাগে পাহাড়-অঞ্চলে ছিল এই সন্ন্যাসীদের বাস। ‘সৌন্দর্যের নগ্ন আবরণে’ লজ্জানিবারণ করইে তারা বেশির ভাগ চলাফেরা করতো। বাড়ি-ঘর পুত্র-কলত্রের বালাইও তাদের ছিল না। দেশবিদেশ ঘুরাফেরার সময়ে হৃষ্টপুষ্ট ছেলেপেলেদের চুরি ক’রে নিয়ে লালন-পালন করে সন্ন্যাসে দীক্ষিত করাই ছিল তাদের ব্যবসা। তীর্থভ্রমণের অছিলায় ‘সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা’ বাংলা দেশে এসে সুযোগ পেলেই এই সন্ন্যাসী-মহাপ্রভুরা নিরস্ত্র গ্রামবাসীর টাকাকড়ি বাড়িঘর লুণ্ঠন করতো। রংপুর দিনাজপুর প্রভৃতি জিলারই প্রভুদের দৌরাত্ম্য হতো সবচেয়ে বেশি। বাঙ্গালি হিন্দু (হেস্টিংস সাহেবের কথায় ”জন্টু”) সমাজের ‘প্রবাদের মত’ উচ্ছ্বসিত দেবদ্বিজ ভক্তির কল্যাণে এই লুণ্ঠনব্যবসায়ী জোচ্চোর সন্ন্যাসীদের দমন করাও ছিল সবিশেষ কষ্টকর। তীর্থযাত্রী নগ্ন সন্ন্যাসী বলে ‘হিন্দুসমাজের সকল স্তরের নিকট ছিল তারা প্রগাঢ় ভক্তির অধিকারী’। কাজেই গুরুজীদের গতিবিধির কোনো সংবাদ দিতে বা তাদের কর্তৃপক্ষকে কোনোরূপ সাহায্য করতে স্থানীয় হিন্দুরা ছিল নারাজ।
সন্তানী আদর্শ
এই দারা-পুত্র-পরিবার-নাদারাদ লুণ্ঠনব্যবসায়ী লক্ষ্মীছাড়া লেংটা সন্ন্যাসী বা ভ্রাম্যমান দস্যু-তস্কর ছেলেধরারাই হচ্ছে হিন্দু-বাংলার ‘জীবন-বেদ’ ‘ঋষি’ বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এর অগ্নিমন্ত্র ‘বন্দে মাতরম’ দীক্ষিত ‘হরে মুরারে মধু কৈটভারে গোপাল গোবিন্দ মুকুন্দ শৌরে’ উচ্চারণকারী ‘শুভ্রশরীর, শুভ্র কেশ’, ‘শুভ্রশ্মশ্রু, শুভ্রবল্ল’ ঋষিকল্প স্বামী ‘সত্যানন্দ’ এবং তাহার মন্ত্রশিষ্য ‘সন্তান’ ভবানন্দ, জীবানন্দ, ধীরানন্দ প্রভৃতি স্বদেশপ্রেমিক বীরপুরুষদের ঐতিহাসিক আদর্শ বা Prototypes। এবং নব্যবাংলার স্বদেশি আমলের ‘বন্দে মাতরম’-বাদী স্বদেশপ্রেমিক সন্ত্রাসবাদীরা হচ্ছে এই ‘আনন্দ কোংর’ই আদর্শবাদী অনুচর ও ভক্তগণ। আনন্দমঠ-এর সত্যিকার আদর্শ অনুধাবন করতে হলে উপরোক্ত ঐতিহাসিক সত্যগুলি মনে রাখা নেহায়েৎ দরকার।
দেশোদ্ধারের স্বরূপ
উপরোক্ত সন্ন্যাসী-বিদ্রোহ বা পাহাড়ি বাবাজীদের ধর্মের নামে দস্যুবৃত্তিই আনন্দমঠ-এর ভিত্তি। বাবাজীরা লুটতরাজে নেমেছিল অর্থের লালসায়, আর বঙ্কিম-কল্পিত স্বামী-সন্তান সম্প্রদায় নিবিড় অরণ্যের অভ্যন্তরে ‘বহুবিধ দেবমন্দির’-পরিবেষ্টিত ‘এক প্রকাণ্ড ভূমিখণ্ডে’ ‘অবস্থিত’ ‘একটি বড় মঠে’—পুরাকালে যাহা বৌদ্ধদিগের বিহার ছিল—অর্থাৎ আনন্দমঠ-এর ষড়যন্ত্রে ব্যাপৃত হয়েছিল ‘সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং’ দেশমাতৃকার উদ্ধারসাধনে। কিন্তু সে দেশোদ্ধার দেশের প্রকৃত মুক্তি নয়—স্বাধীনতাও নয় ; সে দেশোদ্ধার নিছক মুসলিম-বিনাশ—সনাতন আর্যগৌরব প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় এবং ইংরেজ-প্রশস্তি—আন্তরিকতার সহিত না হলেও আত্মরক্ষার গরজে।
ঋষিত্বের দাবী
বাংলা, তথা ভারতের, তথাকথিত জাতীয়তাবাদী কংগ্রেসপন্থীগণ জোরগলায় প্রচার করে থাকেন : ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ধবংস করে ভারতবর্ষে ‘স্বরাজ’ বা ‘স্বাধীনতা’ সংস্থাপনই কংগ্রেস তথা জাতীয়তাবাদের প্রথম, মধ্যম ও শেষ কথা। বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ-এ দেশমাতৃকার স্বাধীনতার বীজ-মন্ত্র বিঘোষিত হয়েছে বলেই বাংলার ফাঁকা-আওয়াজ-সর্বস্ব জাতীয়তাবাদীরা বঙ্কিমচন্দ্রকে আজ ‘ঋষিত্বে’র দরজায় পৌঁছাবার জন্য অতটা কোশেশ ও কারসাজি কর্চ্ছেন। কিন্তু এ-আব্দার একেবারেই ভুয়ো ও ভিত্তিহীন—অন্তত আনন্দমঠ-এ তার কোনো প্রমাণ নেই। অবশ্য মুসলমানের বাড়ি-ঘর (বঙ্কিমের ভাষায় ‘শুয়ারের খোয়াড়’) ধবংস, মুসলমানের ‘মসজিদ বিনাশ করে রাধামাধবের মন্দির প্রতিষ্ঠা’, মুসলমানের ধনদৌলত লুণ্ঠন, মুসলমান শাসন-সংহার—এককথায় মুসলমান জাতিকে সমূলে ধবংস করার নামই যদি বাংলা তথা ভারতের স্বরাজ বা স্বাধীনতা হয়, তাহলে বঙ্কিমচন্দ্র ‘ঋষি’ পদবাচ্য এবং আনন্দমঠ জাতীয়তাবাদ ও স্বাদেশিকতার ‘জীবন-বেদ’, সন্দেহ নেই। আনন্দমঠ-এর আখ্যানবস্তুর আলোচনা থেকেই তা সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হবে।
প্রথম খণ্ড
সমসাময়িক অবস্থা
‘১১৭৬ সালে বাঙ্গালা প্রদেশ ইংরেজের শাসনাধীন হয় নাই। ইংরেজ বাঙ্গালার দেওয়ান। তাঁহারা খাজনার টাকা আদায় করিয়া লন। কিন্তু তখনও বাঙ্গালির প্রাণ, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের কোনো ভার লয়েন নাই। তখন টাকা লইবার ভার ইংরেজের আর প্রাণ, সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের ভার পাপিষ্ঠ, নরাধম, বিশ্বাসহন্তা, মনুষ্যকুলকলঙ্ক মীরজাফরের উপর। মীরজাফর আত্মরক্ষায় অক্ষম, বাঙ্গালা রক্ষা করিবে কি প্রকারে? মীরজাফর গুলি খায় ও ঘুমায়।’
মন্তব্য : হঠাৎ কংগ্রেস-প্রেমে মশগুল ও মাতোয়ারা মীরজাফরের বংশাবতংশ মুরশিদাবাদের নওয়াব বাহাদুরের মনোযোগ আকৃষ্ট হবে কি বঙ্কিমচন্দ্রের সুমধুর এই বিশেষণ-বৃষ্টির উপর?
আনন্দমঠ
বাঙ্গালির সেই চরম দুর্দিনে, ‘অত্যন্ত অন্ধকার’ বৃক্ষলতাকন্টকাকীর্ণ এক নিবিড় অরণ্যে, ‘বহুবিধ দেবমন্দির’ ও নাটমন্দির পরিবেষ্টিত ‘এক প্রকাণ্ড ভূমি-খণ্ডে’ অবস্থিত এক প্রকাণ্ড মঠে অর্থাৎ আনন্দমঠ-এর সত্যানন্দের নেতৃত্বে ভবানন্দ, জীবানন্দ, ধীরানন্দ, জ্ঞানানন্দ, জীবানন্দের সন্ন্যাসিনী জীবন-সঙ্গিনী শান্তি (নবীনানন্দ) প্রভৃতি দেশোদ্ধারে উৎসৃষ্টপ্রাণ স্বদেশপ্রেমিক বীরগণ অবস্থান কচ্ছে। পদচিহ্ন গ্রামের ‘বড় ধনবান’ মহেন্দ্র সিং, তার স্ত্রী কল্যাণী ও শিশু-কন্যাসহ শহরে পালাচ্ছিল প্রাণের ভয়ে মড়কের উপদ্রবে। রাস্তায় শিশুকন্যাসহ কল্যাণী ‘পেটের জ্বালায় ডাকাত’ গ্রামের চাষাভুষোদের দ্বারা অপহৃত হয়। মহেন্দ্র তখন শিশুকন্যার জন্য দুধের যোগাড়ে অন্যত্র গিয়েছিল। সত্যানন্দের কৃপায় কল্যাণী ও তাহার শিশুকন্যা রক্ষা পায়। মহেন্দ্র ও ভবানন্দ সিপাহিদিগের হাতে বন্দি হয়, কিন্তু পরে খালাস পায়। মহেন্দ্র পরে সত্যানন্দের হাতে সন্তানধর্মে দীক্ষিত হয়। মহেন্দ্রের দীক্ষার ব্যাপারেই ‘বন্দে মাতরম’-এর অবতারণা ‘ধর্ম গেল, জাতি গেল, মান গেল—এখন ত প্রাণ পর্যন্তও যায়। এ নেশাখোর নেড়েদের না তাড়াইলে আর কি হিন্দুর হিন্দুয়ানী থাকে?’ এত্যাদি ইতরজনোচিত ভাষায় মুসলমানদিগকে বঙ্কিমচন্দ্রের গালিবর্ষণ এবং মুসলমানদের বাড়ি-ঘরকে ‘বাবুয়ের বাসা’ ‘শুয়রের খোঁয়াড়’ বলে উল্লেখ। সত্যানন্দের এই স্বদেশপ্রেমিক সন্তানসেনা আনন্দমঠ-এ অবস্থান করে এবং লুঠ-তারাজ করে, জীবিকার্জন ও অর্থ সংগ্রহ করে।
দ্বিতীয় খণ্ড
শান্তির ইতিহাস
জীবানন্দের স্ত্রী শান্তির জীবনেতিহাস এবং বিবিধ তত্ত্বমূলক আলোচনা এই খণ্ডের মূলকথা। শান্তি বালক-সন্ন্যাসী-বেশে এক সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ে যোগদান করেছে—’জিতেন্দ্রিয়’ সন্ন্যাসীদের একজন পণ্ডিত তাকে পড়াতে শুরু করলে। ক্রমে শান্তির ‘যৌবন লক্ষণ দেখা দিল’। ‘শান্তির অভিনব যৌবন-বিকাশ-জনিত লাবণ্যে মুগ্ধ হইয়া’ শান্তির অধ্যাপক ‘সন্ন্যাসী ঠাকুর শান্তিকে নির্জনে পাইয়া বড়ো জোর করিয়া’ ‘শান্তির হাতখানা ধরিয়া ফেলিল’। ‘শান্তি তাঁহার কপালে এমন জোরে ঘুষা মারিল যে সন্ন্যাসী মহারাজ মূর্ছিত হইয়া পড়িল এবং শান্তি-সন্তান সম্প্রদায় পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করিল।’
খোদার দুশমন
তবে এইখণ্ডেও বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর মনের গোপন কথা প্রকাশ করতে কসুর করেনি। চতুর্থ পরিচ্ছদের শেষে মহেন্দ্রের প্রশ্নের জওয়াবে সত্যানন্দ ঠাকুর বলছে :
আমরা রাজ্য চাহি না, কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলিয়া তাহাদের সবংশে নিপাত করিতে চাই।
তৃতীয় খণ্ড
সন্তানদের কীর্তি
সত্যানন্দ ও তার চেলাদের মনস্কামনা পূর্ণ হবার পথে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।
‘সন্তান-সম্প্রদায় নিত্য সচন্দন তুলসীদলে বিষ্ণু-পাদপদ্ম পূজা করে, যার ঘরে বন্দুক পিস্তল আছে, কাড়িয়া আনে। … তারপর তাহারা গ্রামে গ্রামে চর পাঠাইতে লাগিল। চর গ্রামে গিয়া যেখানে হিন্দু দেখে বলে—’ভাই বিষ্ণুপূজা করিব?’ এই বলিয়া ২০২৫ জন জড় করিয়া মুসলমানদের গ্রামে আসিয়া পড়িয়া মুসলমানদের ঘরে আগুন দেয় মুসলমানেরা প্রাণরক্ষায় ব্যতিব্যস্ত হয়। সন্তারা তাহাদের সর্বস্ব লুঠ করিয়া নূতন বিষ্ণুভক্তদিগকে বিতরণ করে লুঠের ভাগ পাইয়া গ্রামলোকে প্রীত হইলে বিষ্ণুমন্দিরে আনিয়া বিগ্রহের পাদস্পর্শ করাইয়া তাহাদিগকে সন্তান করে।’
সন্ত্রাসবাদ
‘সন্তানত্বে বিলক্ষণ লাভ আছে’ বলে :
‘দিনে দিনে সন্তান-সংখ্যা বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। দিনে দিনে শত শত, মাসে মাসে সহস্র সন্তান আসিয়া ভবানন্দ জীবানন্দের পাদপদ্মে প্রণাম করিয়া,দলবদ্ধ হইয়া দিগদিগন্তরে মুসলমানকে শাসন করিতে বাহির হইতে লাগিল। যেখান রাজপুরুষ পায় ধরিয়া মারপিট করে, কখন কখন প্রাণবধ করে ; যেখানে সরকারি টাকা পায়, লুঠিয়া লইয়া ঘরে আনে ; যেখানে মুসলমানের গ্রাম পায়, দগ্ধ করিয়া ভগ্নাবশেষ করে।’
সন্তান শাসন
সন্তান-দৌরাত্মে অস্থির হয়ে—
‘রাজপুরুষগণ সন্তানদিগের শাসনার্থে ভুরি ভুরি সৈন্যপ্রেরণ করিতে লাগিলেন। কিন্তু এখন সন্তানেরা দলবদ্ধ শস্ত্রযুক্ত ও মহাদম্ভশালী। তাহাদিগের দর্পের সম্মুখে মুসলমান সৈন্য অগ্রসর হইতে পারে না। যদি অগ্রসর হয়, অমিতবলে সন্তানেরা তাহাদের উপর পড়িয়া তাহাদিগকে ছিন্ন ভিন্ন করিয়া হরিধবনি করিতে থাকে। যদি কখনও কোনও সন্তানের দলকে যখন সৈনিকেরা পরাস্ত করে, তখনই আর একদল সন্তান কোথা হইতে আসিয়া বিজেতাদিগের মাথা কাটিয়া ফেলিয়া দিয়া হরি হরি বলিতে বলিতে চলিয়া যায়।’
প্রাতঃসূর্য
এই সময়ে প্রতিথনামা ভারতীয় ইংরেজকুলের প্রাতঃসূর্য ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেব ভারতবর্ষের গভর্নর জেনারেল। কলিকাতায় বসে লৌহশৃঙ্খলে সদ্বীপা সসাগরা ভারতভূমিকে বাঁধবার ভাবনায় তিনি মশগুল। বঙ্কিমচন্দ্রের জগদীশ্বর সিংহাসনে বসিয়া নিঃসন্দেহে বললেন—’তথাস্তু’। কিন্তু সন্তানদের শাসন না করলে যে নয়। তাই ‘ওয়ারেন হেস্টিংস প্রথমে ফৌজদারির’ সৈন্য এবং পরে ‘কাপ্তেন টমাস নামক একজন সুদক্ষ সৈনিককে অধিনায়ক করিয়া একদল কোম্পানির সৈন্য বিদ্রোহনিবারণের জন্য প্রেরণ করিলেন।’
টমাসের দুর্গতি
কাপ্তেন টমাস বিদ্রোহদমনের অতি উত্তম বন্দোবস্ত করিতে লাগিলেন। …….কিন্তু সন্তানেরা এখন অসংখ্য অজেয়। কাপ্তেন টমাসের সৈন্যদল চাষার কাস্তের নিকট শস্যের ন্যায় কর্তিত হইতে লাগিল। হরি হরি ধবনিতে কাপ্তেন টমাসের কর্ণ বধির হইয়া গেল। সুবন্দোবস্ত করেও টমাস সাহেব পরাস্ত হলেন। ‘পিপীলিকা’বৎ সন্তানদের বাহাদুরী জাহির করা চাই ত!
* * *
ইংরেজের জয় হউক
কিছুদিন পর কাপ্তেন টমাসের অধীনে কোম্পানির ও দেশি সিপাহিদের সহিত ভবানন্দের নেতৃত্বাধীনে সন্ন্যাসীর আবার যুদ্ধ হলো। এবারও সন্তানদের জয় হলো। টমাস বন্দি; বিজয়ী ভবানন্দ বললে : ‘কাপ্তেন স তোমায় মারিব না, ইংরেজ আমাদের শত্রু নহে। কেন তুমি মুসলমানের সহায় হইয়া আসিয়াছ? আইস, তোমার প্রাণ দিলাম। আপাততঃ তুমি বন্দি। ইংরেজের জয় হউক ; আমরা তোমাদের সুহৃদ।’
ভবানন্দের কীর্তি
সন্তানেরা যুদ্ধে জয়লাভ করলে বটে, কিন্তু সেনাপতি ভবানন্দ ‘বন্দে মাতরম’ বলতে বলতে আত্মহত্যা করলে। আত্মহত্যার কাহিনিটি এই : মহেন্দ্রের স্ত্রী কল্যাণী মরবার জন্য বিষ খেয়েছিল স্বপ্নাদেশে মহেন্দ্রকে সন্তানধর্মে দীক্ষা নেবার সুযোগ দিতে। ভবানন্দের কৃপায় কল্যাণী বেঁচে উঠে এবং পাশের এক গ্রামে রক্ষিত বা রক্ষিতা হয়। সন্তানদলটি মাঝে মাঝে কল্যাণীকে দর্শন দিতে লাগলো পড়াবার অছিলায়। কিন্তু কল্যাণীর অতুলনীয় রূপরাশিতে আত্মবিহ্বল হয়ে ভবানন্দ একদিন বলেই ফেললে :
সন্তান ধর্ম আমার প্রাণ, কিন্তু আজ প্রথম বলি, তুমিই আমার প্রাণাধিক প্রাণ। যেদিন তোমার প্রাণদান করিয়াছিলাম, সেইদিন হইতে আমি তোমার পদমূলে বিক্রীত। …এমন রূপরাশি আমি কখন চক্ষে দেখিব জানিলে কখনও সন্তান ধর্ম গ্রহণ করিতাম না। …সন্তানধর্ম অতলতলে যাউক। তুমি আমার হও, আমায় বিবাহ কর।
বিবাহের ফৎওয়া
কল্যাণী বিষ খেয়ে মরে গিয়ে বেঁচে উঠেছিল বলে মহেন্দ্র বেঁচে থাকতেও ভবানন্দকে বিবাহ করতে কল্যাণীর পক্ষে কোনও দোষ নেই—এই ফতোয়াও প্রভু ভবানন্দ দিয়েছিল। কল্যাণী রাজী হয়নি। সত্যানন্দ এ-সংবাদ জানতে পারে। পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপেই ‘বীর’ ভবানন্দ আত্মহত্যা করে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র উচ্চারণ করে। (মন্তব্য :—আনন্দমঠী সন্তান-সেনাদের Second in Command সেনাপতি ভবানন্দের এই চরিত্রের অবনতিও উল্লেখযোগ্য। বাংলার ‘সন্তান’বাদীরাও যে ভবানন্দের আদর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করছে, সংবাদপত্র পাঠকগণের তা জানা আছে।)
সন্তান-সৎকার
রণজয়ের পর, ‘অজয়-তীরে’ সন্তানসেনাদের বিজয়-উৎসব। সত্যানন্দ বিমর্ষ, ভবানন্দের জন্য। ‘বন্দে মাতরম’-রবে নিহত সন্তানদের সৎকার চললো। ধূমধামের সহিত চন্দনকাষ্ঠে ‘কল্যাণীর পদমূলে বিক্রীত’ ‘বীর’ ভবানন্দের চিতা প্রজ্জ্বলিত হলো। সন্তানগণ ‘বিষ্ণুভক্ত, বৈষ্ণব সম্প্রদায়ভুক্ত নহে ; অতএব দাহ করে।’
কি করা যায়?
কানন মধ্যে গোপন সভায় সত্যানন্দ, জীবানন্দ, মহেন্দ্র, নবীনানন্দ, ধীরানন্দ আসীন। এখন কি করা যায়? সত্যানন্দ বললে :
এতদিন যে-জন্য আমরা সর্ব-কর্ম, সর্বধর্ম, সর্বসুখ ত্যাগ করিয়াছিলাম, সেই ব্রত সফল হইয়াছে। এ প্রদেশে যবন-সেনা আর নাই। যাহা অবশিষ্ট আছে, একদণ্ড আমাদের নিকট টিকিবে না। তোমরা এখন কি পরামর্শ দাও।
সৈন্য কোথায়
জীবানন্দের মত—রাজধানী আক্রমণ ও অধিকার। সত্যানন্দেরও তাই। ধীরানন্দ ধীরমস্তিষ্ক। বললে : ‘সৈন্য কোথায়?’ জীবনানন্দ বললে : ‘স্থানে স্থানে বিশ্রাম করিতেছে, ডঙ্কা দিলে অবশ্য পাওয়া যাইবে।’ ধীরানন্দ বললে : ‘একজনকেও পাওয়া যাইবে না। সবাই লুটিতে বাহির হইয়াছে। গ্রাম সকল এখনও অরক্ষিত। মুসলমানের গ্রাম আর রেশমের কুটি লুটিয়া সকলে ঘরে যাইবে। এখন কাহাকেও পাইবে না, আমি খুঁজিয়া আসিয়াছি।’
সন্তান রাজ্য
সত্যানন্দ বিষণ্ণ। বলল :
যাহা হউক, এ-প্রদেশ সমস্ত আমাদের অধিকৃত হইল। এখানে আর কেহ নাই যে, আমাদের প্রতিদ্বন্দি হয়। অতএব বরেন্দ্রভূমিতে তোমরা সন্তান-রাজ্য প্রচার কর। প্রজাদিগের নিকট হইতে কর আদায় কর এবং নগর অধিকার করিবার জন্য সেনা সংগ্রহ কর। হিন্দুর রাজ্য হইয়াছে শুনিলে বহুতর সেনা সন্তানের নিশান উড়াইবে।
জয় মহারাজ
জীবানন্দ প্রভৃতি সত্যানন্দকে প্রণাম করতঃ বললে : ‘হে মহারাজাধিরাজ, আজ্ঞা হয় ত এই কাননেই আপনার সিংহাসন স্থাপন করি।’ সত্যানন্দ চটিতং! জীবনে এই তার প্রথম রাগ। বললে ‘ছি! আমায় কি শূন্য-কুম্ভ মনে কর? আমরা রাজা নহি, সন্ন্যাসী। নগর অধিকার হইলে যাহার শিরে তোমাদের ইচ্ছা হয়, রাজ-মকুট পরাইও। কিন্তু ইহা নিশ্চিত জানিও যে, আমি ব্রহ্মচর্য্য ভিন্ন আর কোন আশ্রমই স্বীকার করিব না। এক্ষণে তোমরা স্ব স্ব কর্মে যাও।’ অর্থাৎ আবার মুসলিম-দলনে বাহির হও। সন্তানদের কর্মমুসলিম-বিনাশ।
চতুর্থ খণ্ড
বল—বন্দে মাতরম
‘সেই রজনীতে হরি-ধবনিতে সে প্রদেশভূমি পরিপূর্ণ। সন্তানেরা দলে দলে উচ্চৈস্বরে ‘বন্দে মাতরম’ ‘জগদীশ হরে’ গাহিয়া বেড়াইতে লাগিল। কেহ শত্রুসেনার অস্ত্র কেহ বস্ত্র অপহরণ করিতে লাগিল। কেহ গ্রামাভিমুখে, কেহ বা নগরাভিমুখে ধাবিত হইয়া পথিক বা গৃহস্থকে ধরিয়া বলে—’বল বন্দে মাতরম নহিলে মারিয়া ফেলিব।’
‘সেই এক রাত্রির মধ্যে গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে মহাকোলাহল পড়িয়া গেল। সকলে বলিল—’মুসলমান পরাভূত হইয়াছে, দেশ আবার হিন্দুর হইয়াছে। সকলে একবার মুক্তকণ্ঠে হরি হরি বল।’
মুই হেঁদু
‘গ্রাম লোকেরা মুসলমান দেখিলেই তাড়াইয়া মারিতে যায়। কেহ কেহ সেই রাত্রে দলবদ্ধ হইয়া মুসলমানদিগের পাড়ায় গিয়া তাহাদিগের ঘরে আগুন দিয়া সর্বস্ব লুটিয়া লইতে লাগিল। অনেক যবণ নিহত হইল। অনেক মুসলমান দাড়ি ফেলিয়া গায়ে মৃত্তিকা মাখিয়া হরিনাম করিতে আরম্ভ করিল। জিজ্ঞাসা করিলে বলিতে লাগিল : ‘মুই হেঁদু।’
সব ফাঁকি
‘মুসলমানেরা দলে দলে নগরাভিমুখে ছুটিল। সিপাহিরা সুসজ্জিত হইয়া নগরক্ষার্থে শ্রেণিবদ্ধ হইল। হিন্দুরা বলিতে লাগিল—’আসুক, সন্ন্যাসীরা আসুক। মা দুর্গা করুন, হিন্দুর অদৃষ্টে সেইদিন হউক।’ মুসলমানেরা বলিতে লাগিল—’আল্লা আকবর! এতনা রোজের পর কোরান শরফি বেবাক কি ঝুটো হলো। মোরা যে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ করি, তা এই তেলককাটা হেন্দুর দল ফতে করতে নারলাম। দুনিয়ার সব ফাঁকি।’
ভগবানের আশীর্বাদ
‘উত্তরবঙ্গ মুসলমানের হাতছাড়া হইয়াছে ; মুসলমান এ-কথা মানেন না—মনকে চোখ ঠারেন। বলেন, কতকগুলি লুঠেরা তো বড়ো দৌরাত্ম্য করিতেছে—শাসন করিতেছি। এইরূপে কত কাল যাইত, বলা যায় না। কিন্তু এই সময়ে ভগবানের নিয়োগে ওয়ারেন হেস্টিংস কলিকাতায় গভর্নর-জেনারেল। তিনি মনকে চোখ ঠারিবার লোক নহেন—তাঁর সে-বিদ্যা থাকিলে আজ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য কোথায় থাকিত? অগৌণে সন্তানশাসনার্থে Major Edward নামা দ্বিতীয় সেনাপতি নতুন সেনা লইয়া উপস্থিত হইল।’
আবার যুদ্ধ
‘আবার তুমুল যুদ্ধ হইল। যেমন দুই খণ্ড প্রকাণ্ড প্রস্তরের সংঘর্ষে মক্ষিকা নিষ্পেষিত হইয়া যায়, তেমনি দুই সন্তান-সংঘর্ষে সেই বিশাল রাজসৈন্য নিষ্পেষিত হইল। ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে লোক লইয়া যায়, এমন লোক রহিল না।’
একি মহারাজ?
‘সত্যানন্দ ঠাকুর রণক্ষেত্র হইতে কাহাকেও কিছু না বলিয়া আনন্দমঠে চলিয়া আসিলেন।’ সত্যানন্দ ধ্যানে মগ্ন, এমন সময়ে ‘চিকিৎসক’ মহাশয় শুভাগমন করলেন। বললেন—’সত্যানন্দ, আজ মাঘী পূর্ণিমা।’ সত্যানন্দ বললে—’চলুন, আমি প্রস্তুত আছি। কিন্তু মহাত্মন! আমার এক সন্দেহভঞ্জন করুন।আমি যে মুহূর্তে যুদ্ধ জয় করিয়া সনাতন ধর্ম নিষ্কন্টক করিলাম, সে সময়েই আমার প্রতি এ প্রত্যাখ্যানের আদশে কেন হইল?’
কার্যসিদ্ধি
মহাপুরুষ বললেন, ‘তোমার কার্য সিদ্ধ হইয়াছে, মুসলমান রাজ্য ধবংস হইয়াছে। আর তোমার এখন কোনো কার্য নাই। অনর্থক প্রাণী হত্যার প্রয়োজন নাই।’ সত্যানন্দ—’মুসলমান রাজ্য ধবংস হইয়াছে, কিন্তু হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হয় নাই—এখন কলিকাতায় ইংরেজ প্রবল।’
মহাপুরুষ, ‘হিন্দুরাজ্য এখনো স্থাপিত হইবে না। তুমি থাকিলে এখন অনর্থক নরহত্যা হইবে ; অতএব চল।’
মর্মপীড়ায় কাতর হয়ে সত্যানন্দ বললে, ‘হে প্রভু! যদি হিন্দুরাজ্য স্থাপিত হইবে না, তবে কে রাজা হইবে? আবার কি মুসলমান রাজা হইবে?’
আসল কথা
চিকিৎসক মহাপুরুষ বললেন, ‘না, এখন ইংরেজ রাজা হইবে।’ সত্যানন্দ বিষণ্ণ হলো। সান্ত্বনার সুরে মহাপুরুষ বললেন—’সত্যানন্দ, কাতর হইও না। তুমি বুদ্ধির ভ্রমক্রমে দস্যুবৃত্তির দ্বারা ধনসংগ্রহ করিয়া রণজয় করিয়াছ। পাপের ফল কখনও পবিত্র হয় না। অতএব তোমরা দেশোদ্ধার করিতে পারিবে না। আর যাহা হইবে, তাহা ভালই হইবে। ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই। …ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত। লোকশিক্ষার বড়ো পটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজি শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতন ধর্ম প্রচারে আর বিঘ্ন থাকিবে না। …ব্রত সফল হইয়াছে—মার মঙ্গলসাধন করিয়াছ —ইংরেজ রাজ্য স্থাপিত করিয়াছে। …শত্রু আর নাই। ইংরেজ মিত্র রাজা। আর ইংরেজের সহিত যুদ্ধে জয়ী হয় এমন শক্তি কাহারও নাই।
শেষরক্ষা
আনন্দমঠ-এর সত্যিকার উদ্দেশ্যসন্ধানের সুবিধা হবে বলে বঙ্কিমী ‘জীবন-বেদে’র সারমর্ম যথাসম্ভব তাহার নিজের ভাষায় বর্ণিত হলো। অনামা চিকিৎসক মহাপুরুষ স্বয়ং গ্রন্থকার বঙ্কিমচন্দ্র, তা সহজেই অনুমেয়। গৈরিক-পরিহিত তিলক-কাটা সন্তান-সেনাদের হাতে ইংরেজ সেনাদের নাজেহল হওয়ার কল্প-কাহিনি লিপিবদ্ধ করে ডেপুটি বঙ্কিমের হৃদয় হয়তো দুরু দুরু কেঁপে উঠেছিল। তাই কবিরাজ মহাশয়ের মুখে ইংরেজ-প্রভুদের তারিফ করে এই শেষরক্ষারই প্রচেষ্টা। তবে মনিবদের মাতৃভাষা বাংলা হলে শ্রাদ্ধ কোথায় গড়াতো, কে জানে।
অদৃষ্টের বিড়ম্বনা
আর উপরের কথাগুলি বঙ্কিমচন্দ্রের অন্তরের বাণী হলে ইংরেজ-প্রভুদের এই উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় Miss Mayo-র Mother India’র কথা পাঠকের মনে পড়া কি অস্বাভাবিক? কিন্তু অদৃষ্টের এমনই বিড়ম্বনা যে ইংরেজ শাসনেরপক্ষে ওকালতি ও প্রচারণা করে আমেরিকান Miss Mayo আজ বাঙালি তথা সমগ্র ভারতবাসী কর্তৃক শতমুখে অভিশপ্ত, আর সেই ইংরেজদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বঙ্কিমচন্দ্র আজ শতমুখে প্রশংসিত—’ঋষিত্বের’ পর্যায়ে উন্নীত! তবে ‘ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই’—এই ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য হয়তো বঙ্কিমচন্দ্রের ‘ঋষিত্বে’র দাবী নেহায়েৎ উড়িয়ে দেওয়া চলে না। বর্তমান কংগ্রেস শাসিত প্রদেশসমূহে যে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধার শুরু হয়েছে, সংবাদপত্রপাঠকগণের তাহা অবিদিত নেই।
প্রকৃতির প্রতিশোধ
মুসমলান বিনাশে না ইংরেজ না হিন্দু কাহারও আপত্তি নেই। তাই আনন্দমঠ-এর বঙ্কিমচন্দ্র প্রাণভরে মুসলমানের ধবংস কামনা করে গেছেন। দুঃখের বিষয়, সে-কামনা আজও পুরোপুরি সফল হয়নি—হবে কিনা ভবিতব্যই বলতে পারবেন। বঙ্কিমচন্দ্রের কামনায় মোনাফেকীর আমেজ ছিল বলেই হয়তো অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে আনন্দমঠ-এর ভিত্তির উপর বাংলার দুরপনেয় কলঙ্ক ও অভিশাপ সন্ত্রাসবাদের উদ্ভব হয়েছিল ইংরেজ-শাসনের ধবংসের কামনায়! হয়তো ইহা প্রকৃতিরই প্রতিশোধ।
বন্দে মাতরম
আনন্দমঠ-এর সর্বত্র মুসলমান-ধবংসের ‘রণ-হুঙ্কার’ রুপেই মুসলিম-বিদ্বেষী বঙ্কিমচন্দ্র সন্তান-সেনাদের মুখে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র ব্যবহার করিয়েছেন। আত্মসম্মান ও জাতীয় সম্মান-সম্পন্ন জিন্দা-দিল কোনো মুসলমান ‘বন্দে মাতরম’-এর বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা না করে পারে না।
ধৃষ্টতার পরাকাষ্ঠা
আনন্দমঠ-এর আদর্শ ও উদ্দেশ্য মুসলিম-বিনাশ, মুসলমানের ‘মসজিদ ভাঙিয়া রাধামাধবের মন্দিরপত্তন’। এবং সনাতন হিন্দুধর্মের প্রতিষ্ঠা ইংরেজের-শাসনের ভিতর দিয়ে, বিনাশ করে নয়। ‘বন্দে মাতরম’ সেই উদ্দেশ্যসাধনের দীক্ষামন্ত্র হতে পারে। ‘বন্দে মাতরম আনন্দমঠ-এর আগেকার রচনা, কিন্তু বন্দে মাতরম’ যে আনন্দমঠ-এর জন্যই রচনা, কিংবা আনন্দমঠ-ই ‘বন্দে মাতরম’-এর জন্য রচনা, এসম্বন্ধে সন্দেহের অবসর নেই। ভারতের নয়কোটি মুসলমানের বিনাশমন্ত্র ‘বন্দে মাতরম’ হবে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত এবং ভক্তিগদগদ-কণ্ঠে মুসলমানদিগকে উচ্চারণ করতে হবে সেই মরণ-মন্ত্র—ধৃষ্ঠতারও সীমা থাকা দরকার!
মূলে কুঠারাঘাত
তারপর ‘বন্দে মাতরম’ আগাগোড়া পৌত্তলিকতা-কন্টকিত বন্দনা-গীতি ও স্তোত্র। তৌহীদপরস্ত মুসলমান ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহারও ‘বন্দনা’ করতে পারে না—করলে তার সত্যিকার মুসলমান বিশ্বাসের মূলেই কুঠারাঘাত হয়। ইসলামের প্রধানতম মৌলিক শিক্ষাই হচ্ছে ‘তৌহীদ’—একেশ্বরবাদ। মুসলমান মাতৃভূমিকে ভালবাসে নিশ্চয়ই, কিন্তু স্বদেশপ্রীতির ক্ষণস্থায়ী হুঙ্করের জন্য তাঁরা ইসলামের শ্রেষ্ঠতম শিক্ষা ও সৌন্দর্য বিসর্জন দিতে পারে না। মুসলমানের পার্থিব ও পরলৌকিক জীবনের সহিত ধর্মের বন্ধনও অচ্ছেদ্য। ইসলামের ইহা অনবদ্য শিক্ষা ও বৈশিষ্ট্য। মুসলমান সম্প্রদায় ব্যতীতও পৌত্তলিকতা-বিরোধী ভারতবাসীর সংখ্যা বহুকোটি! তাঁরা ত ‘ত্বংহি-দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী কমলা-কমলদল-বিহারিণী বাণী-বিদ্যাদায়িণী নমামি তাং’ বলে দেশমাতৃকার চরণে প্রণতি-নিবেদন করতে পারে না। জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচন ও নির্ধারণে এই সকল অ-মুসলমান তৌহীদবাদীদের মনোভাবও কি উপেক্ষণীয়?
আকাশকুসুম
যে-সঙ্গীতে কোটি কোটি ভারতবাসীর জাতীয় সম্মান ও ধর্মীয় শিক্ষা নিষ্ঠুরভাবে ব্যাহত হয়, তাহা কখনও সমগ্র ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হতে পারে না এবং হওয়া উচিত নয়। কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির কর্তারা এই স্থূল কথাটা মনে রেখে ‘বন্দে মাতরম’-সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে এ-কূল ও-কূল দু-কূল বজায় রাখবার ব্যবস্থা না করলেই ভাল করতেন। কংগ্রেসি সিদ্ধান্তে ‘বন্দে মাতরম’ সমস্যার সমাধান হয়নি—হতে পারে না। জাতীয় সঙ্গীতরূপে ‘বন্দে মাতরম’-এর সহিত মুসলমানদের আপস-নিষ্পত্তি আকাশকুসুম।
উপসংহার
আনন্দমঠ-এর সত্যিকার আদর্শ ও উদ্দেশ্য সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের নিজস্ব মতের আলোচনা করেই প্রবন্ধের উপসংহার করবো। আনন্দমঠ সম্বন্ধে এত কথা বলবার আছে যে সংক্ষেপে তাহার আলোচনা অসম্ভব। প্রবন্ধের দীর্ঘতার জন্য তাই নাচার এবং পাঠকগণের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী।
গ্রন্থকারের কথা
আনন্দমঠ-এর প্রথমবারের বিজ্ঞাপনে লেখা রয়েছে : ‘বাঙ্গালির স্ত্রী অনেক অবস্থাতেই বাঙ্গালির প্রধান সহায় ; অনেক সময় নয়। সমাজ-বিপ্লব অনেক সময়েই আত্মপীড়ন মাত্র ; বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী। ইংরেজরা বাঙ্গলা দেশ অরাজকতা হইতে উদ্ধার করিয়াছেন। এই সকল কথা এই গ্রন্থে বোঝান গেল।’
অভিমত না ধাপ্পাবাজী?
আনন্দমঠ সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের উপরোক্ত কৈফিয়ৎ বা অভিমত পুরোপুরি মেনে নেওয়া অসম্ভব বলেই মনে হয়। ‘সমাজ-বিপ্লব অনেক সময় আত্মপীড়ন মাত্র ; বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী’—কথাগুলি বঙ্কিমচন্দ্রের অন্তরের কথা বলে মনে হয় না ; অন্তত: আনন্দমঠ-এর ঘটনা-পরম্পরার প্রকৃতি, পরিণতি ও বিবরণের ধারা থেকে তা প্রতীয়মান হয় না বা হতে পারে না বলেই আমাদের বিশ্বাস ও ধারণা।
নিগূঢ় উদ্দেশ্য
স্বদেশপ্রেমের প্ররোচনায় বিপ্লবাত্মক বিদ্রোহের আবশ্যকতা ও মহনীয়তা প্রদর্শনই বাস্তবিকপক্ষে আনন্দমঠ-এর নিগূঢ় উদ্দেশ্য। ইংরেজ-প্রভুদের বিপক্ষে তা সরাসরি শিক্ষা দেওয়া অসুবিধা ও বিপজ্জনক বলেই সরকারি নিমকখোর ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট বঙ্কিমচন্দ্র ‘সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা’ বাঙ্গলা তথা ভারতবর্ষের ভূতপূর্ব ‘ম্লেচ্ছদের’ উপর দিয়েই তা বোঝাবার কোশেশ করে গেছেন এবং প্রভুদের মনন্তুষ্টি ও আত্মরক্ষার সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই আনন্দমঠ-এর মাঝে মাঝে ‘ইংরেজ আমাদের শত্রু নয়’—’ইংরেজ মিত্র রাজা’—’ইংরেজ রাজা না হইলে সনাতন ধর্মের পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নাই’ ইত্যাদি ছিটেফোঁটা স্তোকবাক্য এবং প্রথমবারের বিজ্ঞাপনে ‘সমাজ-বিপ্লব অনেক সময়ে (সকল সময়ে নয়!) আত্মপীড়ন মাত্র ; বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী’ বলে লোকভোলানো কৈফিয়ৎ লিপিবদ্ধ করে গেছেন।’
আর্তনাদ কেন?
‘সমাজ-বিপ্লব আত্মপীড়ন মাত্র ; বিদ্রোহীরা আত্মঘাতী’—ইহাই যে বঙ্কিমচন্দ্রের অন্তরের সত্যিকার বাণী, আনন্দমঠ-পন্থী, ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রদীক্ষিত স্বদেশপ্রেমিকরাও তা অন্তরের সহিত বিশ্বাস করে না, এ-কথা বলতে দ্বিধা নেই। সরকারি গোলামি করেই বিপ্লবাত্মক স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা-মন্ত্রের শিক্ষাদাতা ও দীক্ষাগুরু আনন্দমঠ-এর ভিতর দিয়ে সুচতুর সুনিপুণ ও ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা ‘আর্টিষ্ট’রূপে স্বজাতীয়দের অন্তরে ‘সনাতন হিন্দুধর্ম ও রাজত্ব’ প্রতিষ্ঠার জন্য বিপ্লবের বীজ বপন করে গেছেন বলেই বঙ্কিমচন্দ্র আজ হিন্দু-বাংলার ‘ঋষি’-কল্প মহাপুরুষ এবং আনন্দমঠী স্বাদেশিকতা ও সন্ত্রাসবাদের প্রতি ভক্তগণের ‘মুখে-বলা-যায়-না-কিন্তু-অন্তরে-অন্তরে-অনুভব করি’-ই গোছের সত্যিকার দরদ ও প্রাণের টান রয়েছে বলেই বাংলার আকাশ-বাতাস আজ এমনভাবে মথিত হয়ে উঠেছে ‘বন্দে মাতরম’-মন্ত্রের বিলোপ বা অঙ্গচ্ছেদের প্রতিবাদের কলরব ও আর্তনাদে।
