প্রসঙ্গ : ‘বন্দে মাতরম’ এবং জাতীয় সঙ্গীত ‘জনগণমন’
অমলেন্দু দত্ত
‘সেই জ্যোৎস্নাময়ী রজনীতে দুইজনে নীরবে প্রান্তর পার হইয়া চলিল। মহেন্দ্র নীরব, শোককাতর, গর্বিত, কিছু কৌতূহলী। … ভবানন্দ হাস্যমুখ, বাঙ্ময়, প্রিয় সম্ভাষী হইলেন। কথাবার্তার জন্য বড়ো ব্যস্ত। ভবানন্দ কথোপকথনের অনেক উদ্যম করিলেন, কিন্তু মহেন্দ্র কথা কহিল না। তখন ভবানন্দ নিরুপায় হইয়া আপন মনে গীত আরম্ভ করিলেন:
বন্দে মাতরম।
সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাম
শস্যশ্যামলাং মাতরম।
মহেন্দ্র গীত শুনিয়া কিছু বিস্মিত হইল, কিছু বুঝিতে পারিল না।—সুজলা সুফলা মলয়জশীতলা শস্যশ্যামলা মাতা কে,—জিজ্ঞাসা করিল, ”মাতা কে?”
উত্তর না করিয়া ভবানন্দ গায়িতে লাগিলেন :
”শুভ্র জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম
ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম,
সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম
সুখদাং বরদাং মাতরম।”
মহেন্দ্র বলিল, ”এ ত দেশ, এ ত মা নয়—”
ভবানন্দ বলিলেন, ”আমরা অন্য মা মানিনা—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। আমরা বলি, জন্মভূমিই জননী, আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই,— স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ি নাই, আমাদের আছে কেবল সেই সুজলা, সুফলা, মলয়জসমীরণশীতলা শস্যশ্যামলা—”
তখন বুঝিয়া মহেন্দ্র বলিলেন, ”তবে আবার গাও।’
এরপর ভবানন্দ সম্পূর্ণ গানটিই গেয়েছিলেন।
অনুমান করতে পারি, সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ উপন্যাসটি সকল বাংলাভাষীই পড়েছেন। এই উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদ থেকে উপরের উদ্ধৃত অংশটিও হয়তো বারবারই পড়েছেন। কারণ গত ১২৫ বছর ধরে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি বাংলা তথা ভারতের প্রায় সব রাজ্যের মানুষের কাছেই কেবল পরিচিত—তাই নয়, এই গানকে কণ্ঠে নিয়ে কিংবা ‘বন্দে মাতরম’ এই ললিত শব্দটিকে সশ্রদ্ধ উচ্চারণে এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলমোচনে মনপ্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। এখনো কয়েকটি রাজনৈতিক দল ‘বন্দে মাতরম’ শব্দবন্ধটিকে শ্লোগান রূপে ব্যবহার করে থাকেন। সে যুগে অহিংস এবং সহিংস সকল স্বদেশানুরাগীই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি ও সংগীতকে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী তথা স্বদেশের মুক্তি কামনায় সংগ্রাম আন্দোলনে ব্রতী হওয়ার অনুপ্রেরণা লাভ করেছেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে তাই এই গানটির তাৎপর্য বিশেষভাবেই স্বীকৃত। এই গানটিই যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের রক্তদান ও আত্মদানের প্রতীক হয়ে আছে।
সে সময়ে দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক মঞ্চ সারা ভারত কংগ্রেস দলও যে ভবিষ্যতে স্বাধীন ভারতের জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচনের প্রশ্নে এ. আই. সি. সি.-র অধিবেশনে এই গানটিকেই গ্রহণ করার প্রস্তাব উত্থাপন করেছিল সঙ্গতভাবেই। জাতীয় কংগ্রেসের সভা সমিতি ও অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতটি ছাড়াও বিভিন্ন দিনে অন্যান্য দেশাত্মবোধক সঙ্গীতও গাওয়া হত। একবার টাউন হলে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নিজের আরোপিত সুরে ‘বন্দে মাতরম’ গেয়েছিলেন। একজন প্রবীণ স্বাধীনতা সংগ্রামীর কাছে পাওয়া তথ্যে জানা যায় তিনি দেশ রাগে গানটি স্বকন্ঠে পরিবেশন করেন। অন্যান্য দেশাত্মবোধক সঙ্গীতের মধ্যে থাকত ‘দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরী’ এবং ‘জনগণমন অধিনায়ক জয় হে,’ ‘ভারততীর্থ’ কিংবা সরলা দেবী রচিত ‘অতীত গৌরব কাহিনি’ প্রভৃতি।
সকলেই জানেন কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যে দুটি মতবাদ পাশাপাশি বিরাজ করত—এবং একেক সময় প্রাধান্য লাভ করত দুইয়ের মধ্যে একটি। সাধারণ্যে এঁরা চিহ্নিত ছিলেন ‘নরমপন্থী’ (moderate) এবং চরমপন্থী (extremist) রূপে। খোলসা করে বলতে গেলে বলা যায় প্রবীণরা ছিলেন নরমপন্থী এবং নবীনরা পরিচিত ছিলেন চরমপন্থী রূপে। ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এ. আই. সি. সি.-র অধিবেশন হয় কলকাতায়। তখন কংগ্রেসে চরমপন্থীদেরই প্রতিপত্তি। অধিবেশনের প্রথম দিনে (২৬ ডিসেম্বর, ১৯১৭) চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী মতো ‘বন্দে মাতরম’ গান দিয়েই শুরু হয় তবে ওই দিন ‘দেশ দেশ নন্দিত করি’ গানটিও গাওয়া হয়। দ্বিতীয় দিনে গাওয়া হয় সরলা দেবীর ‘অতীত গৌরব কাহিনি’ এবং তৃতীয় দিনে আবার রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানটি।
১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২৮ অক্টোবরে কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভায় সংগীত পরিবেশন সংক্রান্ত যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় তার বয়ানে ছিল :
Taking all things into consideration, therefore, the committee recommends that wherever the ‘Bande Mataram’ is sung at national gatherings only the first two stanzas should be sung, with perfect freedom to the organisers to sing any other song of an unobjectionable character, in addition to or in place of the ‘Bande Mataram song.
অর্থাৎ ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবক মাত্র গাওয়া হবে এবং উদ্যোক্তারা চাইলে ‘বন্দে মাতরম’ ছাড়াও তদতিরিক্ত কিংবা তার বদলে অন্য কোনও গানও গাওয়া যাবে—তবে দেখতে হবে তার মধ্যে যেন আপত্তিকর কিছু না থাকে। ‘বন্দে মাতরম’-এ প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার কথা বিশেষভাবে বলার উদ্দেশ্য, মনে হয়, কংগ্রেসের মুসলমান সদস্যদের উক্ত গানটির কোনো কোনো অংশ সম্পর্কে আপত্তি ছিল বলেই এই ব্যবস্থা। উপরন্তু অন্য গান সম্পর্কেও যেন তা ‘unobjectionable character’-এর হয়—এরূপ সাবধানবাণীও উচ্চারিত।
ওই একই ওয়ার্কিং কমিটির সভায় আরও প্রস্তাব গৃহীত হয় যে ‘বন্দে মাতরম’-এর অতিরিক্ত কিংবা তার বদলে অন্য যে গান গাওয়া হবে তা নির্বাচন করার জন্য ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যদের নিয়ে একটি উপসমিতি (sub-committee) করা হবে। তৎকালীন কংগ্রেস সভাপতি জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে ওই সাবকমিটি গঠিত হল। গান নির্বাচনের ব্যাপারে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরামর্শ গ্রহণ করার কথাও বলা হয়েছে। ওই একই সময়ে কলকাতাতে এ. আই. সি. সি.-র অধিবেশন ছিল—সেখানেই ওয়ার্কিং কমিটির প্রস্তাব অনুমোদিত করিয়ে নেওয়া হয়।
বেশ বোঝা যাচ্ছে ‘বন্দে মাতরম’ নব্যপন্থীদের ‘প্রথম পছন্দের’ গান রূপে মর্যাদা হারিয়েছে—কিন্তু সম্পূর্ণ পরিত্যক্তও হয়নি। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র উভয়েরই পছন্দ রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানটি। পরবর্তীকালে এই গানটিকেই ভারতের ‘জাতীয় সঙ্গীত’ রূপে গ্রহণ করা হয়। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য যে জার্মানিতে আজাদহিন্দ ফৌজ গঠন করার সময়ে এবং পরবর্তীকালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আজাদহিন্দ সরকার গঠনকালেও ‘জনগণমন’-এর হিন্দিসংস্করণটিকেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র জাতীয় সঙ্গীতরূপে গ্রহণ ও মর্যাদা দান করেছিলেন।
ইতঃপূর্বে বলা হয়েছে যে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুটি স্তবক গাওয়া হবে—এই মর্মে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিতে প্রস্তাব গৃহীত হয়। ‘বন্দে মাতরম’ গানটিকে খণ্ডিত করার প্রস্তাবে সুভাষচন্দ্রেরও সায় ছিল। তাঁর অভিমত ছিল :
The congress cannot consider anything from the point of view of Bengal or any particular community alone—to-day all problems must be considered from an all-India view-point.’ He also had no objection to accepting any other songs as the National Anthem if that song were found to be more suitable and appropriate in tune and idea than ‘Vande Mataram’.
সুভাষচন্দ্রের কথায় পরোক্ষভাবে ‘বন্দে মাতরম’ গান সম্পর্কে কোনো মহলের আপত্তি তথা এর সুর সম্পর্কেও বলা হয়েছে। একথা সত্য যে মুসলিম সদস্যগণের গানটির কোনো কোনো অংশে আপত্তি যেমন ছিল, তেমনি এই গানের সুরেও সহজতার বদলে কিছু কাঠিন্যও ছিল, যার ফলে খুব পারদর্শী শিল্পী ছাড়া এ গান সর্বসাধারণের গাইবার উপযুক্ত নয়। আরও একটা বিষয় প্রণিধানযোগ্য—’বন্দে মাতরম’ ব্যান্ডে বাজানোর পক্ষেও কঠিন অথচ জাতীয় সঙ্গীত-এর সুর এমনই হওয়া বাঞ্ছনীয় যাতে সেনাবাহিনীর ব্যান্ড-এ সহজেই তোলা যায় এবং বাজানো সম্ভব হয়—এটা আবশ্যিক-এর মধ্যেই গণ্য। ‘জনগণমন অধিনায়ক’ গানটি এই প্রেক্ষিতে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গ্রাহ্য।
স্বাধীনতালাভের (১৫ আগস্ট, ১৯৪৭) পর গণপরিষদ অর্থাৎ Constitunent Assembly গঠিত হয় (উল্লেখ্য এই পরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয় ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত দিয়ে এবং শেষ হয় ‘জনগণমন’ দিয়ে)। Constituent Assembly থেকেই একটি কমিটি গঠন করা হয়—যে কমিটি জাতীয় সঙ্গীত নির্বাচনের সর্বশেষ প্রস্তাব (recommendations about the final selection of a National Anthem) দেবে। কিন্তু আলাপ-আলোচনার পর ঠিক হয় যে President স্বয়ং জাতীয় সঙ্গীত বিষয়ে সিদ্ধান্ত Assembly-তে ঘোষণা করবেন। তদনুসারে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ জানুয়ারি constitution বা গঠনতন্ত্রে সাক্ষর দানের সময় Constitution Hall-এ President ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ তার ভাষণের শুরুতেই ঘোষণা করলেন : একটা বিষয় অর্থাৎ জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা বাকি রয়ে গেছে। এক সময়ে ভাবা হয়েছিল যে ব্যাপারটা House-এ প্রস্তাব আকারে উপস্থাপিত করে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু পরে চিন্তা করে দেখা গেল তার চেয়ে জাতীয় সঙ্গীত ব্যাপারে আমিই যেন একটি বিবৃতি দিই। আমি সেই বিবৃতি এখন দিচ্ছি :
The composition consisting of the words and music known as Janaganamana is the National Anthem of India subject to such alteration in the words as Government may authorise as occasion arises ; and the song Vande Mataram which has played a historic part in the struggle for Indian freedom shall be honoured equally with Janaganamana and shall have equal status with it.
(Constituent Assembly Debate, XII. ii)
অর্থাৎ শব্দ ও সঙ্গীতে উৎকর্ষের বিচারে ‘জনগণমন’ হবে জাতীয় সঙ্গীত এবং স্বাধীনতা আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালনের জন্য ‘বন্দে মাতরম’ লাভ করবে ‘জনগণমন’-এর সঙ্গে সমমর্যাদা।
অনেকেরই ভুল ধারণা আছে যে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত বুঝি দুটি—’জনগণমন’ এবং ‘বন্দে মাতরম’। তাদের এই ভ্রান্তির হয়তো নিরসন হবে। বহু ভাষাভাষী দেশের মধ্যে বাঙালি কবি ও লেখকের রচিত সঙ্গীত জাতীয় সঙ্গীতরূপে গৃহীত হওয়ায় (তথা একটিকে জাতীয় সঙ্গীতের সমমর্যাদায় বিবেচিত করায়) আমাদের স্বাভাবিকভাবেই গর্ব ও আনন্দের কারণ আছে।
পরিশিষ্ট
রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন অধিনায়ক’ (অর্থাৎ ‘ভারতবিধাতা’ শীর্ষক কবিতা) সম্পর্কে এক সময়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াবার যে উদ্দেশ্যমূলক প্রয়াস ছিল পরবর্তীকালে তা হয়তো অনেকাংশেই অসত্য প্রমাণিত। তথাপি কারোর কারোর মনে এখনও সন্দেহ উঁকিঝুঁকি দেয়। এ বিষয়ে সংক্ষেপে কিছু বলা প্রয়োজন বলে এখানে সে প্রসঙ্গের অবতারণা করা হল।
‘ভারত বিধাতা’ কবিতা/সঙ্গীত ঠিক কবে এবং কোথায় রচিত হয়েছিল তা জানা যায় না, কেননা রচনার পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় না। রবীন্দ্র-জীবনীকার শ্রীযুক্ত প্রশান্ত পাল লিখেছেন, ‘গানটিকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপিত হলে রবীন্দ্রবিরোধীরা প্রচার করেন, গানটি সম্রাট পঞ্চম জর্জের কলকাতা আগমনকে কেন্দ্র করে রচিত। বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র পুলিনবিহারী সেন গানটি রচনার উপলক্ষ্য জানতে চেয়ে রবীন্দ্রনাথকে পত্র লিখলে তিনি 20 Nov. 1937 (রবি ৪ অগ্র, ১৩৪৪) তাঁকে লেখেন :
সে বৎসর ভারতসম্রাটের আগমনের আয়োজন চলছিল। রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনো বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন অভ্যুদয় বন্ধুর পন্থায় যুগযুগধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথী, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথ পরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ বা কোনো জর্জই কোনোক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন। কেননা তাঁর ভক্তি যতই প্রবল থাক বুদ্ধির অভাব ছিল না।
গানটি গাওয়া হয়েছিল ২৭ ডিসেম্বর ১৯১১ কলকাতায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের ২৬তম অধিবেশনের দ্বিতীয় দিনে সমবেতকণ্ঠে।
পঞ্চম জর্জ কলকাতায় আসেন ৩০ ডিসেম্বর, শনিবার ১৯১১। ৫ জানুয়ারি শুক্রবার ১৯১২ ময়দানে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা জানানো হয়। ৮ জানুয়ারি ১৯১২ দুপুরে তিনি কলকাতা ত্যাগ করেন।
শ্রীযুক্ত প্রশান্ত পাল উল্লেখ করেছেন যে, ‘কংগ্রেসের উক্ত দ্বিতীয় দিনের অধিবেশনে সমবেতকণ্ঠে ‘জনগণমন’ উদ্বোধনী সংগীতের পর রাজদম্পতিকে স্বাগত জানিয়ে ও বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা করার জন্য পঞ্চম জর্জের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে দুটি প্রস্তাব আলোচিত ও গৃহীত হয় এবং তারপরে ‘A Hindi song paying heartfelt homage to their Majesties was sung by the Bengali boys and girls [The Bengalee, 28 Dec.] এই তথ্যই বিকৃতভাবে The Englishman ও The Statesman পত্রিকায় ও রয়টারে টেলিগ্রাম অবলম্বনে বিলেতের India পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ‘জনগণমন’ রাজপ্রশস্তি উপলক্ষ্যে রচিত হয়েছিল, এই বিভ্রান্তিমূলক প্রচারের জন্য এই তিনটি পত্রিকাই দায়ী। কলকাতার অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান পত্রিকাগুলিতে প্রকাশিত বিকৃত সংবাদগুলির প্রতি সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়। তিনি মাঘ সংখ্যা তত্ত্ববোধিনীতে ‘ভারতবিধাতা/(ব্রহ্ম সঙ্গীত) (পৃঃ ২১৯) শিরোনামায় গানটি ছাপিয়ে তাঁর ক্ষোভ ব্যক্ত করেন। কয়েকদিন পরে ১১ মাঘ (বৃহ. ২৫ জানুযারি) গানটি মাঘোৎসবে ব্রহ্মসঙ্গীত হিসবেই গীত হয়”
সঞ্চয়িতা-য় এটি সংযোজন রূপে সংকলিত এবং রচনার তারিখ? ১৩১৮’ রূপে মুদ্রিত।
তথ্যপঞ্জী :
১. আনন্দমঠ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্কিমরচনাবলি, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, একাদশ প্রকাশ, জ্যৈষ্ঠ ১৩৯১ (যোগেশচন্দ্র বাগল লিখিত ভূমিকা সংবলিত)
২. India’s National Anthem, Probodh Chandra Sen, Visva Bharati Calcutta – 1972
৩. রবিজীবনী, ষষ্ঠখণ্ড, প্রশান্তকুমার পাল, আনন্দ পাবলিশার্স, প্রথম সংস্করণ ১৩৯৯
৪. সঞ্চয়িতা, বিশ্বভারতী, পুনর্মুদ্রণ ১৩৫৬ আশ্বিন পৃ. ৭২৫-৭২৬
