বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্যকথা – পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

বঙ্কিমচন্দ্রের বাল্যকথা

পূর্ণচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়

সেকালের পল্লিগ্রাম মাত্রেই পাঠশালা থাকত। আমাদের গ্রামেও পাঠশালা ছিল, আমাদের বাটির সন্নিকটে একটি ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র কখনও পাঠশালায় পড়েন নাই, আমার জ্ঞানে তো নয়। হুগলি কলেজে ভরতি হইবার পূর্বে তাঁহাকে একজন private tutor সকালে ও সন্ধ্যার পর পড়াইয়া যাইত। বঙ্কিমচন্দ্র তখন বালক, উপনয়ন হয় নাই। এই অবস্থায় তিনি মধ্যে মধ্যে ওই পাঠশালায় উপস্থিত হইতেন। গুরুমহাশয় কায়স্থ-সন্তান, বড়ো রাসভারি লোক, ছাত্রেরা তাঁহাকে যমের ন্যায় ভয় করিত। যখন তিনি ভূমিতে বেত আছড়াইয়া, ‘লেখ লেখ শূয়াররা’ বলিয়া চীৎকার করিতেন, তখন ছাত্রেরা থরহরি কাঁপিতে থাকিত। বালক বঙ্কিম, একদিন বৈকালে এই পাঠশালায় উপস্থিত হইলে অভ্যর্থনাস্বরূপ গুরুমহাশয় হাসিয়া তাঁহার হস্তে বেতগাছটি তুলিয়া দিতেন। বালক বঙ্কিম বেত লইয়া কোনো কোনো ছাত্রের নিকট গিয়া তাহার পরীক্ষা করিতেন। ছাত্রেরা কেহ বা তাঁহার বয়োজ্যেষ্ঠ, কেহ সমবয়স্ক, কেহ বা বয়ঃকনিষ্ঠ। অধিকাংশ ছাত্র তাঁহার বয়োজ্যেষ্ঠ ছিল। এইরূপ ঘুরিতে ঘুরিতে দুই তিন জন বালকের নিকট দাঁড়াইয়া তাহাদের মাথার উপর বেত দুলাইয়া বলিতেন :

মারি মারি? আজ তোমরা কেন আমাদের বাড়ি তাস খেলতে যাও নাই?’ বঙ্কিমচন্দ্র বাল্যকালে খেলার মধ্যে কেবল তাস খেলিতেন, দুই প্রহরের সময় ঐ কয়জন বালকের সহিত কোনো কোনো দিন তাস খেলিতেন। বালকদিগের দৌড়াদৌড়ি এবং অন্যান্য বেলা—যাহাতে শরীরের পুষ্টিসাধন করে—তাহা খেলিতেন না। খেলিতে ভালো লাগিত না, সেইজন্য দুর্বল ও ক্ষীণদেহ ছিলেন। এইরূপে মধ্যে মধ্যে বালকদিগের পরীক্ষা করাতে তাহাদের উৎসাহ হইত। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রতিভা বাল্যকালে দিন দিন প্রস্ফুটিত হইতেছিল, উহার প্রভাবে অন্যান্য বালকেরা তাঁহাকে ভক্তি করিত, সকলে তাঁহার নিকট ঘেঁষিত পারিত না। তিনি কাহাকেও ভালো বলিলে তাহার আনন্দ ও উৎসাহ বর্ধিত হইত। স্কুলে, কলেজে তাঁহার সমধ্যায়ীদিগের উপরও ঐরূপ প্রভাব ছিল, ইহা তাঁহার অমান্য প্রতিভারই মহিমা। লেখাপড়ায় উৎসাহ প্রদান করা তাঁহার জীবনের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল। যখন যৌবনে একজন বিখ্যাত বাংলা লেখক হইলেন, তখন অনেকগুলি সুশিক্ষিত যুবককে উৎসাহ দিয়া লেখক করিয়াছিলেন, তাঁহারা এক একজন বিখ্যাত লেখক হইয়াছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র না জন্মাইলে রমেশচন্দ্র দত্ত, চন্দ্রনাথ বসু প্রভৃতি কখনও বাংলা ভাষার লেখক হইতেন না, চিরকাল ইংরেজি লেখক থাকিতেন। বঙ্কিমচন্দ্রের প্ররোচনায় ও অনুপ্রাণনে তাঁহারা বাংলা ভাষায় লিখিতে আরম্ভ করিলেন।

পৌষ কি মাঘ মাসে একদিন সূর্যোদয়ে পাঠশালায় যাইয়া গুরুমহাশয় দত্ত বেত লইয়া, বালক বঙ্কিম কোনো একটি বালকের নিকট বসিয়া তাহার লেখাপড়া দেখিতেছিলেন, এমন সময় একটা গোল উঠিল যে, গঙ্গার ঘাটে গোরার বহর লাগিয়াছে। এই সংবাদে চারিদিকের লোকজন কী পুরুষ, কী স্ত্রীলোক, কী বালক ছুটাছুটি করিয়া পলাইতে লাগিল। পাঠশালার ছাত্রগণ পাততাড়ি ফেলিয়া পলাইল। গুরুমহাশয় চটি জুতা পায়ে ফটফট শব্দে পলাইলেন। এক ব্যক্তি এক ঝুড়ি বেগুন লইয়া নৈহাটির বাজারে বিক্রি করিতে যাইতেছিল, সে উহা আমাদের ঠাকুর বাড়ির দরজার নিকট ফেলিয়া পলাইল। মুহূর্তের মধ্যে রাস্তাঘাট নির্জন হইল। সকল বাটির দরজা বদ্ধ হইল, কেবল বালক বঙ্কিমের জন্য আমাদের বাড়ির দরজা খোলা রহিল, তিনি গুরুমহাশয়-প্রদত্ত বেত হাতে করিয়া আমাদের বাটির দরজার নিকট রাস্তার ধারে দাঁড়াইলেন, সুতরাং আমাদের যত লোকজন ছিল, তাঁহার নিকট আসিয়া দাঁড়াইল। পিতৃদেব তখন তাঁহার কর্মস্থলে, অগ্রজদ্বয়ও তাহার নিকটে। গ্রামে গোরার বহর লাগিয়াছে শুনিয়া গ্রামবাসীরা বিপদের ভয়ে পলায় কেন সেকালে পশ্চিমাঞ্চল হইতে গোরারা দলবদ্ধভাবে কলিকাতায় আসিত, কিন্তু পীড়িত গোরারা নৌকাযোগে আসিত। যে স্থানে সূর্যোদয় হইত, সেই স্থানে ঐ সকল গোরা প্রাতঃক্রিয়ার জন্য ডাঙায় উঠিত, এবং গ্রামে প্রবেশ করিয়া নানাপ্রকারে উৎপাত করিত। দুই তিন বৎসর পূর্বে একবার গ্রামে নামিয়া ঐরূপ অত্যাচার করিয়াছিল। সেই অবধি গোরার বহর শুনিলে আমাদের গ্রামের লোকের হৃৎকম্প হইত। বঙ্কিমচন্দ্র গুরুমহাশয়-প্রদত্ত বেত্রহস্তে দাঁড়াইয়া আছেন এমন সময় একদল গোরা আসিতেছে, দেখা গেল। তাহারা আসিয়া বঙ্কিমচন্দ্রের সম্মুখে দাঁড়াইয়া কী কথা কহিতে লাগিল, একজন বেতটি লইয়া দেখিতে লাগিল। এইরূপ দলে দলে গোরা আসিতে লাগিল। বালক বঙ্কিম স্থিরভাবে সেখানে দাঁড়াইয়া রহিলেন। আধ-ঘন্টার মধ্যে তাহারা ফিরিয়া গেল, বহর ছাড়িয়া দিল, গ্রাম আবার সজীব হইল।

কথাটা অতি সামান্য বটে, কিন্তু যে গ্রামের লোকেরা গোরার ভয়ে পলাইল, সকল দরজা বন্ধ হইল, বালক বঙ্কিম সেই গ্রামেই পাতিপালিত, আকাশ হইতে পড়েন নাই। তিনি নির্ভয়ে বেত্রহস্তে গোরার সম্মুখে দাঁড়ান কেন, এই তেজটুকু বালকের পক্ষে অসামান্য বোধ হওয়াতেই এই স্থলে এই ঘটনাটির উল্লেখ করিলাম। তিনি নিজেই চন্দ্রশেখরের একস্থানে লিখিয়া গিয়াছেন যে, বাঙালির ছেলে মাত্রেই জুজুর নামে ভয় পায়, কিন্তু এক একটি এমন নষ্ট বালক আছে যে, জুজু দেখতে চায়।

বঙ্কিমচন্দ্র চিরকালই ষাঁড় গোরু ইত্যাদি দেখিলে দূরে সরিয়া যাইতেন, মই দিয়া ছাদে উঠিতে পারিতেন না, সাঁতার জানিতেন না, একজন ভালো Executive officer ছিলেন, তথাপি কখনও ঘোড়ায় চড়িতে পারিতেন না। ১৭।১৮ বৎসর বয়ঃক্রম কালে আমি পিতৃদত্ত একটি ঘোড়ায় চড়িয়া বেড়াইতাম। তিনি পূজার ছুটিতে কর্মস্থল হইতে বাড়ি আসিয়া, উহা জানিতে পারিয়া ঘোড়াটি বিক্রয় করাইলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় এই যে, ইনিই বাল্যকালে একদিন ডাকাতদের ভয় করেন নাই ; কৈশোরে নদীবক্ষে ঝড় তুফানের ভয় করিতেন না, আর যৌবনে গুলিভরা পিস্তল গ্রাহ্য না করিয়া একজন সাহেবকে গ্রেপ্তার করিয়াছিলেন।

যখন বঙ্কিমচন্দ্রের বয়স দশ কী এগারো বৎসর, তখন একদিন সংবাদ আসিল যে, একদল ডাকাত আমাদের বাটিতে ডাকাতি করিবে। পিতৃদেব তখন বাটিতে ছিলেন না, জেঠামহাশয়, খুড়ামহাশয়, পিসেমহাশয় প্রভৃতি মুরুবিবগণ বন্দোবস্ত করিলেন যে, স্ত্রীলোকেরা ও আমার চার ভ্রাতা কয়েক রাত্রের জন্য প্রতিবাসীর গৃহে বাস করিব। ইহা শুনিবামাত্র বালক বঙ্কিম বাঁকিয়া বসিলেন, কুঞ্চিত কেশরাশি দুলাইয়া ঘাড় নাড়িয়া বলিলেন, ‘তাহা কখনই হইতে পারে না, বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাইব না।’ পিসেমহাশয় বলিলেন, ‘তবে ডাকাত আসিয়া সকলকে কাটিয়া যাক।’ বঙ্কিম বলিলেন, ‘কেন কেটে যাবে? আমাদের বাড়ীতে ত অনেক লোক আছে, আর গ্রামের তেওর বাগদি যাহারা এক একজন লাঠিয়াল ও বোম্বেটেগিরি করে, তাহাদের নিযুক্ত করুন, সাধ্য কি যে ডাকাতরা আমাদের কেটে খায়।’ তাঁহার অগ্রজদ্বয়েরও ঐ মতে মত হওয়াতে, বালক বঙ্কিমেরই পরামর্শ মতে কার্য হইল। কয় রাত্রি ধরিয়া অনেক লোক আমাদের বাড়ি পাহারা দিত। ডাকাত আসিয়া ফিরিয়া গেল। ওই দিন হইতে গুরুজনেরা বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘বাঁকা’ বলিয়া ডাকিতেন।

আমাদের গ্রামের অপর পারে হুগলি কলেজ, প্রায় সাত আট বৎসর ধরিয়া বঙ্কিমচন্দ্র নৌকা চড়িয়া ওই কলেজে যাইতেন। বৈশাখ মাসের প্রারম্ভেই এক এক দিন ছুটির সময় আকাশ মেঘাচ্ছন্ন হইত। বঙ্কিমচন্দ্র মাঝিকে জিজ্ঞাসা করিতেন, ‘কেমন রে, নৌকা ছাড়বি?’ মাঝি নৈহাটির পাটনী কখনও ‘না’ বলিত না, নৌকা খুলিয়া দিত। কোনো কোনো দিন ঝড় উঠিবার পূর্বে নৌকা ঘাটে গিয়া পৌঁছিত, আর কোনো কোনো দিন মাঝ গঙ্গায় পৌঁছিতে না পৌঁছিতে কালো মেঘ দিগন্ত অন্ধকার করিত। নদীর জল কালো হইত। অল্পক্ষণ মধ্যেই প্রবল বেগে ঝড় উঠিত। ভীষণ তরঙ্গ সকলের মাথাগুলি ভাঙিয়া ফেনার রাশিতে যেন নদীর বক্ষে তুলার মাড় ভাসিত। যাঁহারা নদীবক্ষে ঝড়ে পড়িয়াছেন, তাঁহারাই বুঝিতে পারিবেন কী ভয়ানক দৃশ্য ! বঙ্কিমচন্দ্র একদৃষ্টে ইহাই দেখিতেন। যিনি ষাঁড় গোরু দেখিয়া ভয় পাইতেন, তিনি প্রকৃতির এই সর্বসংহারিণী মূর্তি অজ্ঞান হইয়া দেখিতেন। বঙ্কিমচন্দ্রের কলেজ পরিত্যাগ করিবার তিন-চার বৎসর পূর্বে, আমি ওই কলেজে ভরতি হই, সুতরাং আমাকেও মধ্যে মধ্যে তাঁহার সহিত এই বিপদে পড়িতে হইত।

বাইশ-তেইশ বৎসর বয়সে বঙ্কিমচন্দ্র খুলনা মহকুমার ম্যাজিষ্ট্রেট ছিলেন। এই সময় একজন নীলকর সাহেব, হাতীর শুঁড়ে মশাল বাঁধিয়া একখানি গ্রাম জ্বালাইয়া দিয়াছিল। তখন বেঙ্গল পুলিশের সৃষ্টি হয় নাই, ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে পুলিশ কাজ করিত। দারোগাগণ ওই সাহেবটিকে কোনোমতে ধরিতে পারিল না, কেন না তাঁহাদের নিকট সর্বদা গুলিভরা পিস্তল থাকিত। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্র তাহার পিস্তল গ্রাহ্য না করিয়া সাহেবটিকে গ্রেপ্তার করিলেন। সাহেবটি British-born-subject, সুতরাং হাইকোর্টে সোপর্দ হইয়াছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রকে ওই আদালতে সাক্ষ্য দিতে হইয়াছিল ; কেন-না তিনি উহাকে গ্রেপ্তার করিয়াছিলেন।

বঙ্কিম চরিত্রে এইরূপ বিচিত্র অসামঞ্জস্য মধ্যে মধ্যে লক্ষিত হইত।

এই সঙ্গে একটা রহস্যের কথা মনে পড়িল, উহা না লিখিয়া থাকিতে পারিলাম না। এক দিবস এরূপ কুয়াশা চারিদিক ব্যাপিয়া ছিল যে, কোলের মানুষ পর্যন্ত দেখা যায় নাই। আমার জীবনে কখনও ঐরূপ কুয়াশা দেখি নাই ; উহা প্রায় ১০/১১টা অবধি ছিল। আমরা কলেজে যাইবার সময় নৌকায় উঠিলাম। মাঝি নৌকা ছাড়িতে বিশেষ আপত্তি করিল, বলিল, দিক ঠিক করিতে পারিব না। বঙ্কিমচন্দ্র তাহা শুনিলেন না, নৌকা ছাড়িতে হুকুম দিলেন। তখন ভাঁটা, নৌকা ক্রমাগত চলিতে লাগিল। আমাদের নৌকা দশ-পনেরো মিনিটে কলেজ ঘাটে পৌছিত, কিন্তু প্রায় একঘন্টা হইল, নৌকা চলিতেছে, কোথায় কলেজ ঘাট ! নৌকা কেবল চলিতেছে, চলিতেছে। বঙ্কিমচন্দ্র মাঝিকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কোথায় যাচ্ছিস রে?’ মাঝি বলিল, ‘আজ্ঞে তা জানি না।’ ‘সে কি রে?’ ‘আজ্ঞে বোধহয় ভাটার স্রোতে দক্ষিণ দিকে যাচ্ছি।’ মাঝি হাল ছাড়িয়া বসিয়া আছে, নৌকা ক্রমাগত স্রোতে ভাসিতেছে, বঙ্কিমচন্দ্র কেবল হাসিতেছেন। কিছুক্ষণ পরে নৌকা আপনা-আপনি এক স্থানে তীরলগ্ন হইল। বঙ্কিমচন্দ্র জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘এ কোন জায়গা?’ মাঝি বলিল, ‘বুঝি মূলাজোড়।’

কপালকুণ্ডলা গল্পটি যে কুজ্ঝটিকায় আরম্ভ হইয়াছিল তাহা নিশ্চয়ই এই দিনের ঘটনাবলম্বনে।

বঙ্কিমচন্দ্র বাল্যে এবং কৈশোরে গল্প শুনিতে ভালবাসিতেন। কিন্তু যে সে লোকের নিকট নহে, কিংবা যা তা গল্প নহে—সেকালের লোকের নিকট সেকালের গল্প। বঙ্কিমচন্দ্রের দুই একখানি উপন্যাস কোনো কোনো ঘটনা অথবা কোনো কোনো গল্প অবলম্বনে রচিত হইয়াছিল। গত চৈত্রমাসের ভারতীতে বঙ্কিমচন্দ্র ও দীনবন্ধু প্রবন্ধে কী ঘটনা অবলম্বনে কপালকুণ্ডলা রচিত ইয়াছিল, তাহা লিখিয়াছি. এই প্রবন্ধে আরও দুইখানির কথা লিখিব। আমাদের খুল্লপিতামহ একশত আট বৎসর বয়ঃক্রম পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি আমার পিতামহের মধ্যম ভ্রাতা, তাঁহাকে আমরা মেজঠাকুরদা বলিয়া ডাকিতাম। তাঁহার নিকট বঙ্কিমচন্দ্র ও আমরা সকলে গল্প শুনিতাম। যাহা শুনিতাম তাহা বাঙালার ইতিহাসের অন্তর্গত ; উহা প্রায়ই বঙ্গের মুসলমান রাজত্বের অবসানকালের কথা। ইনি গল্প করিতে ভালবাসিতেন ও গল্প করিতে জানিতেন। আধুনিক কোনো কোনো বিদেশি গল্প লেখকেরা যেমন নায়ককে মিস্টার এবং নায়িকাকে মিস লিখিয়া থাকেন, এই বর্ষীয়ান তেমনি তাঁহার নায়ককে মির্জা এবং নায়িকাকে বিবি বলিতেন। তাঁহার নিকট বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম গড়মান্দারণের ঘটনা শুনিয়াছিলেন ; যদিও ওই ঘটনা আকবর শাহ বাদশাহের সময় ঘটিয়াছিল, অথচ তিনি উহা জানিতেন। সেকালের প্রাচীনেরা মুসলমান বাদশাহদিগের সময়ের অনেক ঘটনা জানিতেন। আমাদের মেজঠাকুরদাদার মধ্যে মধ্যে বিষ্ণুপুর অঞ্চলে যাতায়াত ছিল। মান্দারণ গ্রাম, জাহানবাদ ও বিষ্ণুপুরের মধ্যস্থিত। ওই অঞ্চলে মান্দারণের ঘটনাটি উপন্যাসের ন্যায় লোকমুখে কিংবদন্তীরূপে চলিয়া আসিতেছিল। মেজঠাকুরদা উহা ওই স্থানে শুনিয়াছিলেন, মান্দারণের জমিদারের গড় ও বৃহৎ পুরী ভগ্নাবস্থায় দেখিয়াছিলেন। তাঁহারই মুখে প্রথম শুনি যে উড়িষ্যা হইতে পাঠানেরা মান্দারণ গ্রামের জমিদারের পুরী লুটপাট করিয়া তাঁহাকে তাঁহার স্ত্রী ও কন্যাকে বন্দী করিয়া লইয়া যায়, রাজপুতকুলতিলক কুমার জগৎসিংহ তাঁহাদের সাহায্যার্থে প্রেরিত হইয়া বন্দী হইয়াছিলেন। এই গল্পটি বঙ্কিমচন্দ্র আঠারো-উনিশ বর্ষ বয়ঃক্রমকালে শুনিয়াছিলেন। তাহার কয়েক বৎসর পরে দুর্গেশনন্দিনী রচিত হইল। সরকারি কার্যোপলক্ষে সঞ্জীবচন্দ্র কিছুকাল জাহানাবাদে ছিলেন। তিনিও ঘটনাটি সেখানে শুনিয়া আমাদের নিকট গল্প করিয়াছিলেন। তখন বোধ হয় দুর্গেশনন্দিনী প্রকাশিত হইয়াছিল।

কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের ‘মতিবিবি’ বোধ হয় একটা গল্প অবলম্বনে অঙ্কিত হয়। কোনো দরিদ্র গৃহস্থের বধূ যৌবনারম্ভে কুলত্যাগিনী হইয়া কোনো ধনাঢ্য সুবার রক্ষিতা হয়। প্রায় পাঁচ -ছয় বৎসর পরে হঠাৎ একদিন তাহার স্বামীকে দেখিয়া তাহার হৃদয় কাঁদিয়া উঠিল, সে কান্না আর থামিল না। কিছুদিন পরে প্রভুর অতুল ঐশ্বর্য তাহার যাহা কিছু সঞ্চিত ধন ছিল, তাহা লইয়া স্বামীদর্শন আকাঙক্ষায় তাহাদের গ্রামে আসিয়া বাস করিল। এমত স্থানে বাসা লইল, যাহাতে প্রতিদিন স্বামীকে দেখিতে পায়। প্রতিদিন তাহাকে দেখিত আর কাঁদিত। এইরূপ দিবানিশি কাঁদিত। কুলত্যাগিনী হইলেও তাহার প্রতিবেশিনীগণ তাহার দুঃখ শুনিয়া তাহাকে সান্ত্বনা করিতে আসিত। এইরূপে কিছুদিন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়া এই চির অভাগিনীর যৌবনেই জীবনান্ত হইল।

ইহার চরিত্রের সঙ্গে মতিবিবির কোনা সাদৃশ্য নাই বটে, কিন্তু ঘটনার সাদৃশ্য আছে।

বর্ষীয়ান খুল্লপিতামহের নিকট আমরা কয় ভ্রাতা ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের কথা প্রথম শুনি। ইঁহার গল্প করিবার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল। যেরূপে বই সময়ের অবস্থা বিবৃত করিয়াছিলেন, তাহা আমার বোধ হয় একজন লেখকও পারিত কিনা সন্দেহ। সেকালের লোক ‘ফসল অজন্মা’ এই সকল কথার সর্বদা আন্দোলন করিতে ভালবাসিত। মেজঠাকুরদা প্রথমে ফসলের কথা তুলিলেন। পরে কী প্রকারে তিল তিল করিয়া মন্বন্তর ভীষণ মূর্তি ধারণ করিয়া বঙ্গদেশ ছারখার করিল, তাহা বিবৃত করিলেন। তিন-চার বৎসর পূর্ব হইতে অজন্মা হইল, আর ওই বৎসর (১২৭৬ সালে) ফসল হইল না ; এই কয় বৎসর অজন্মার ফলে নিম্লশ্রেণির লোকদের আহার বদ্ধ হইল, পরে মধ্যশ্রেণির গৃহস্থের, পরে ধনবানদেরও আহার বন্ধ হইল। এই শেষোক্ত শ্রেণির লোকদিগের কাহারও কাহারও লক্ষ লক্ষ টাকা মাটিতে পোতা থাকিত, (সেকালে এইরূপে টাকা সঞ্চিত থাকিত), তবুও তাহারা অনাহারে মরিতে লাগিল, কেন না টাকা খাইতে পারে না, টাকাতে ধানচাল কিনিবে, তাহা দেশে নাই। এইরূপ অবস্থাতে বঙ্গে নানাপ্রকার পীড়ার আবির্ভাব হইয়া, অবশেষে চুরি ডাকাতি আরম্ভ হইল। যাহাদের ঘরে টাকা পোতা ছিল, তাহারাও অন্নাভাবে চোর ডাকাত হইল। এই গল্পটি আমি ভুলিয়া গিয়াছিলাম কিন্তু আমার অগ্রজের উহা মনে ছিল ; কেন না, ১৮৬৬ সালে উড়িষ্যার দুর্ভিক্ষের সময়ে ওই গল্পটি আবার তাঁহার মুখে শুনিলাম। আমার বোধ হয় ছিয়াত্তরের মন্বন্তর অবলম্বনে কোনো উপন্যাস লিখিবার তাঁহার অনেক দিন ইচ্ছা ছিল, কিন্তু যৌবনে লেখেন নাই, কিঞ্চিৎ পরিণত বয়সে আনন্দমঠ লিখিলেন।

‘বন্দে মাতরম’ গীতটি উহার বহুদিন পূর্বে রচিত হইয়াছিল। এই গীতটি সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্রের একটি ভবিষ্যৎবাক্য আছে। কয়েক বৎসর হইল শ্রীমান ললিতচন্দ্র মিত্র ‘সাহিত্যে’ উহা সবিস্তারে লিখিয়াছেন বটে তথাপি আমার যতটুকু স্মরণ আছে, আমিও লিখিলাম। বঙ্গদর্শন-এ মধ্যে মধ্যে দুই এক পাতা matter কম পড়িলে পণ্ডিতমশায় আসিয়া সম্পাদককে জানাইতেন। তিনি তাহা ওই দিনেই লিখিয়া দিতেন। ওই সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রবন্ধের মধ্যে দুই একটি লোকরহস্যে প্রকাশিত হইয়াছে, কিন্তু অধিকাংশ প্রকাশিত হয় নাই। ‘বন্দে মাতরম’ গীতটি রচিত হইবার কিছু দিবস পরে পণ্ডিতমহাশয় আসিয়া জানাইলেন, প্রায় একপাতা matter কম পড়িয়াছে। সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র বলিলেন, ‘আচ্ছা আজই পাবে।” একখানা কাগজ টেবিলে পড়িয়াছিল, পণ্ডিত মহাশয়ের উহার প্রতি নজর পড়িয়াছিল বোধ হয় উহা পাঠও করিয়াছিলেন, কাগজখানিতে ‘বন্দে মাতরম’ গীতটি লেখা ছিল। পণ্ডিতমহাশয় বলিলেন, ‘বিলম্বে কাজ বন্ধ থাকিবে, এই যে গীতটি লেখা আছে,—উহা মন্দ নয় ত—ওটাই দিন না কেন।’ সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র বিরক্ত হইয়া কাগজখানি টেবিলের দেরাজের ভিতর রাখিয়া বলিলেন, ‘ওটা ভাল কী মন্দ, এখন তুমি বুঝিতে পারিবে না, কিছুকাল পরে উহা বুঝিবে—আমি তখন জীবিত না থাকিবারই সম্ভব, তুমি থাকিতে পার।’ এই গীতিটির সুর বসাইয়া উহার গাওনা হইত। একজন গায়ক প্রথমে উহা গাহিয়াছিলেন। বহুকাল পরে ‘বন্দে মাতরম’ সম্প্রদায় কোরাসে গাহিবার জন্য মিশ্র সুর বসাইয়াছিলেন ; পরে শ্রীমতী প্রতিভা দেবী আর একটি সুর বসাইয়াছিলেন। বেহাগ সুরে ভালো লাগিলে লাগিতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *