‘বন্দে মাতরম’ নয় নমস্তে – নিত্যপ্রিয় ঘোষ

বন্দে মাতরম নয়, নমস্তে

নিত্যপ্রিয় ঘোষ

বাঙলাদেশের জাতীয় জীবনে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত কবে প্রবলভাবে এল, সে বিষয়ে ‘বঙ্কিম-জীবনী’ প্রণেতা শচীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ১৯১৩ সালের এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা থেকে উত্থার করেছেন এই কথাগুলো :

During Bankim Chandra’s lifetime the Bande Mataram, though its dangerous tendency was recognised, was not used as a party war-cry ; it was not raised, for instance, during the Ilbert Bill agitation, nor by the students who flocked round the court during the trial of Surendra Nath Banerji in 1883. It has, however, obtained an evil notoriety in the agitation that followed the partition of Bengal.

১৮৯৪ সালেই অবশ্য অরবিন্দ Induprakash পত্রিকায় লিখলেন, বঙ্কিম সাহিত্যের প্রভাবে, সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের প্রভাব কমে আসছে, লোকের মন হিন্দুধর্মের দিকে ফিরছে। তরুণদের মধ্যে উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মেষ হচ্ছে। কেশব সেন ও কৃষ্ণদাস পালের অনুসরণকারী দাসসুলভ ইংরেজ অনুকরণকারী তরুণদের পরিবর্তে বঙ্কিম-অনুপ্রাণিত তরুণরা এসে গেছেন।

এর আগে ১৮৮৪ সালে হিন্দুধর্ম প্রবক্তা বঙ্কিমচন্দ্র ও আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক রবীন্দ্রনাথের প্রবল মসীযুদ্ধ হয়ে গেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের ব্রাহ্মবিদ্বেষ এবং বিধবাবিবাহ-জাতীয় সংস্কারবিমুখতা তখন খুবই লোকপরিজ্ঞাত। তবে বঙ্গিমচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের অশ্রদ্ধা ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্রও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে স্নেহশীল ছিলেন।

ঠিক কবে জানা যায় না, কিন্তু ১৩৪৪ সালে রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশাতেই আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা হল, রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথমাংশ নিজে সুর বসিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে শুনিয়েছিলেন।

১৮৮৫ সালে বালক পত্রিকায় জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় দেশ রাগে ‘বন্দে মাতরম’-এর কিয়দংশ স্বরলিপি সহযোগে প্রকাশিত হল। ‘বন্দে মাতরম’ তখনই বিখ্যাত, একথা বালক পত্রিকায় লেখা হল। যদিও গানটির প্রকাশ হয় বঙ্গদর্শনে ১৮৮১ সালে আনন্দমঠ-এ, ১৮৭৫ সালে গানটির রচনা হয়েছে অনুমিত হলেও।

১৮৮৬ সালে কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশন বসল কলকাতায়, তাতে ‘বন্দে মাতরম’ গীত হল, হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাখীবন্ধন কবিতার মারফৎ সেটা আমরা জানতে পারছি। সেই অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ কিন্তু গাইলেন স্বরচিত গান, ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে।’

রবীন্দ্রজীবনীতে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় জানাচ্ছেন, ১৮৯০ সালে যোগেন্দ্রনাথ বিদ্যাভূষণ গ্যারিবল্ডীর জীবনবৃত্তান্তে লেখেন ‘বন্দে মাতরম’ এবং আনন্দমঠ-এর বাইরে জাতীয় ধবনি হিসেবে এই প্রথম এর ব্যবহার ঘটল।

১৮৯৬ সালে কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ গাইলেন উদ্বোধন সংগীত হিসেবে। ওই অধিবেশন উপলক্ষ্যেই তিনি রচনা করলেন ‘অয়ি ভুবনমনোমোহিনী’। এই গানটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলছেন, তাঁকে অনুরোধ করা হয়েছিলষ দুর্গামূর্তির সঙ্গে মাতৃভূমির দেবীরূপ মিশিয়ে গান লিখতে। অনুরোধ করেছিলেন বিপিনচন্দ্র পালের মতো লোকেরা। এই দুর্গামূর্তির জন্যই রবীন্দ্রনাথ অবশ্য ‘বন্দে মাতরম-কে গ্রহণ করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথ অস্বীকার করে লিখলেন এই ‘ভুবনমনোমোহিনী’ দেশমাতৃকার স্তব, পূজার গান নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে অবশ্য তাঁর এই গানটিও সাম্প্রদায়িক গান, সর্বভারতীয় গান নয়। পরবর্তী যুগে তিনি ‘বন্দে মাতরম’ গানের শুধু প্রথম অংশটিই সর্বভারতীয় গান বলে অভিহিত করেছেন। বাকি অংশটুকু প্রবলভাবেই সাম্প্রদায়িক গান বলে তিনি বিবেচনা করেছেন।

বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনোভাব কখনোই একরেখ ছিল না। তাঁর বয়স যখন বারো তেরো তখন বঙ্গদর্শন-এ বিষবৃক্ষ চন্দ্রশেখর বেরচ্ছে : ‘একে তো তাহার জন্য মাসান্তের প্রতীক্ষা করিয়া থাকিতাম। তাহার পরে বড়োদলের পড়ার শেষের জন্য অপেক্ষা করা আরও বেশি দুঃসহ হইত।’ (জীবনস্মৃতি)। এর পর পনেরো বছর বয়সে তিনি মরকতকুঞ্জে বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রথম দেখলেন, সেই দর্শন দেবদর্শনের মতো। একুশ বছর বয়সে তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে সন্ধ্যাসংগীত সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শুনলেন (১৮৮২)। এর পরের বছর বঙ্কিমচন্দ্র জানালেন, বউঠাকুরাণীর হাট স্থানে স্থানে অতি সুন্দর উচ্চদরের কিন্তু উপন্যাস হিসেবে নিষ্ফল। তাঁর মতে, উদীয়মান লেখকদের মধ্যে (শ্রীশচন্দ্র মজুমদার, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এবং রবীন্দ্রনাথ) রবিই বেশ গিফটেড কিন্তু প্রিকশাস। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ বউঠাকুরাণীর হাট বেরুবার পর বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ থেকে অযাচিত প্রশংসাপত্র পেয়েছিলেন, তাঁর কাছে এই উৎসাহবাণী ছিল বহুমূল্য। এর পরের বছর ঘটল ধর্ম বিষয়ে মসীযুদ্ধ রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্কিমচন্দ্রের। দ্বিজেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এই তর্কে রবীন্দ্রনাথের বিপক্ষেই ছিলেন। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন ভারতীতে তাঁর এই বঙ্কিমবিরোধী প্রবন্ধ দুটোর জন্য। ১৮৯২ সালে রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধ বেরুলে বঙ্কিমচন্দ্র এই প্রবন্ধের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানালেন। ১৮৯৩ সালে রবীন্দ্রনাথ চৈতন্য লাইব্রেরিতে পাঠ করলেন ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’। সভাপতি বঙ্কিমচন্দ্র। পাঠ করবার আগের দিন তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে বত্তৃ�তাটি দেখিয়ে এসেছিলেন, সম্ভবত রায়বাহাদুর বঙ্কিমচন্দ্রের রাজনীতিগত নিরাপত্তার জন্যই। ১৮৯৪ সালের মে মাসে বেরুল তাঁর রাজসিংহ বিষয়ে প্রশস্তিমূলক লেখা। সেই মাসেই বঙ্কিমচন্দ্র পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুর পর রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমশোকসভা আয়োজন করার চেষ্টা করলেন, নবীনচন্দ্র সেনের বিরোধিতায় সেই শোকসভা হল না। রবীন্দ্রনাথ পাঠ করলেন তাঁর বঙ্কিমচন্দ্র প্রবন্ধ চৈতন্য লাইব্রেরিতে। এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে দানের জন্য বাঙালির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। কিন্তু কয়েকমাসের মধ্যেই কৃষ্ণচরিত্র প্রবন্ধে বঙ্কিমের মননশীলতা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের সন্দেহ প্রকাশ হল। এরপর ১৯০২ আবার বঙ্কিমের সাহিত্য সমালোচনা বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করলেন, শকুন্তলা প্রবন্ধে। বঙ্কিমচন্দ্র কালিদাস ও শেক্সপীয়ারের মধ্যে সাদৃশ্য খুঁজে পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের কাছে সেই সাদৃশ্য একেবারে অমূলক।

শ্রীসরলাদেবী চৌধুরাণী তাঁর জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থে লিখেছেন :

রবীন্দ্রনাথই ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম সুর বসিয়েছিলেন। তাঁর দেওয়া সুরে ওই দুটি পদে গানটি সর্বত্র চালিত হল। একদিন মাতুল আমায় ডেকে বললেন, ‘তুই বাকিটুকুতে সুর দিয়ে ফেল না।’ ওরকম ভার মাঝে মাঝে আমায় দিতেন। তাঁর আদেশে ‘সপ্তকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদ করালে’ থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবের সঙ্গে ও গোড়ার সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুর দিয়ে ফুটিয়ে নিলুম। দুই একটা জাতীয় উৎসবে সমস্বরে বহুকণ্ঠে বহুজনকে গাইতেও শেখালুম। সেই থেকে সভাসমিতিতে সমস্তটাই গাওয়া হতে থাকল।

‘বন্দে মাতরম’ শব্দটি মন্ত্র হল সর্ব প্রথম যখন মৈমনসিংহের সুহৃদ সমিতি আমাকে স্টেশন থেকে তাদের সভায় প্রোসেশন করে নিয়ে যাবার সময় ওই শব্দদুটি হুংকার করে যেতে থাকল। সেই থেকে সারা বাংলায় এবং ক্রমে ক্রমে সারা ভারতবর্ষে ওই মন্ত্রটি ছড়িয়ে পড়ল—বিশেষ করে পূর্ববঙ্গে যখন গবর্ণর সাহেবের অত্যাচার আরম্ভ হল আহিমালয় কুমারিকা পর্যন্ত ওই বোলটি ধরে নিলে।

সরলাদেবীর স্মৃতিকথা থেকে মনে হয় ময়মনসিংহের বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মিলনী অর্থাৎ ১৯০৫ সালের আগে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় মন্ত্র হিসাবে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয়নি। সরলাদেবী তাঁর স্মৃতিকথায় সনতারিখ কখনও উল্লেখ করেননি। ফলে কয়েকটি বিষয় অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। বালক পত্রিকায় ‘বন্দে মাতরম’-এর কিয়দংশের স্বরলিপি বের হয় ১৮৮৫ সালে। তখন সরলাদেবীর বয়স তেরো। ধরে নেওয়া যায় সেই সময়ে প্রকাশিত স্বরলিপি তাঁর নয়। তিনি এই স্বরলিপি যে আছে তা জানতেনও না। সুর হয়তো রবীন্দ্রনাথের হয়তো প্রতিভাসুন্দরী দেবীর, যাঁর নামে স্বরলিপি বেরিয়েছিল। ১৮৯৬ সালের কলকাতা কংগ্রেসে রবীন্দ্রনাথ যখন ‘বন্দে মাতরম’ গাইলেন, তখনকার সুর হয়ত, প্রথম পদদুটো রবীন্দ্রনাথের, পরবর্তী অংশ সরলাদেবীর।

তবে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি জনপ্রিয় করার ব্যাপারে সরলাদেবীই ছিলেন অগ্রণী। এলাহাবাদ কংগ্রেসে (১৯১০) তিনিই সপ্তকোটির স্থলে ত্রিংশকোটি বলে গেয়ে ‘বন্দে মাতরম’-কে সর্বভারতীয় করে নিলেন।

অবশ্য সরলাদেবী বহু পরে তাঁর স্মৃতিকথা লিখেছেন। ফলে অনেক সময়েই তাঁর কালবিভ্রম ঘটে থাকতে পারে। ওই স্মৃতিকথায় কিছু আগেই তিনি লিখেছেন :

‘বন্দে মাতরম’ এর প্রথম দুটি পদে তিনি (রবীন্দ্রনাথ) সুর দিয়েছিলেন নিজে। তখনকার দিনে শুধু সেই দুটি পদই গাওয়া হত। একদিন আমার উপর ভার দিলেন। ‘বাকি কথাগুলিতে তুই সুর বসা। তাই—’ত্রিংশকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদ করালে’ থেকে শেষ পর্যন্ত কথায় প্রথমাংশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে আমি সুর দিলাম। তিনি শুনে খুশী হলেন। সমস্ত গানটা তখন থেকে চালু হল।

এমনও হতে পারে, এলাহাবাদ কংগ্রেসের আগেই, সরলাদেবী রবীন্দ্রনাথকে শোনানোর সময় ত্রিংশকোটি শব্দটিও যুক্ত করেছিলেন। অথবা এই শেষের উক্তিতে ভ্রমবশত তিনি সপ্তকোটি বলতে গিয়ে ত্রিংশকোটি বলে ফেলেছেন।

‘বন্দে মাতরম’ কীভাবে চালু হচ্ছে তার কিছু ইঙ্গিত দিচ্ছেন সরলাদেবী :

পঞ্জাবেও আমি যাবার পর থেকে মেয়েদের সঙ্গীতচর্চা ভালরকম হতে থাকল। মাদ্রাজ, মহীশূর ভিন্ন আর কোনো অংশে মেয়েদের সঙ্গীতজীবন একেবারে বিকশিত দেখিনি—সে সঙ্গীতের তুলনা উত্তর ভারতে নেই। ‘বন্দে মাতরম’ও আমার গাইবার পর থেকে ক্রমে ক্রমে ভারতে সর্বত্র মেয়েদের কণ্ঠে ধবনিত হতে লাগল। ‘বন্দে মাতরম’ এর কথায় মনে পড়ে দিল্লী থেকে একজন বৃদ্ধ বড়ো ইংরেজ ব্যারিস্টার একবার লাহোরে একটা মকদ্দমায় এসেছিলেন। আমাদের বাড়ি চায়ে এসে সেই সময় বাঙলার অফিসারদের দ্বারা স্থানে স্থানে নিষিদ্ধ গানটি শুনতে কৌতূহল প্রকাশ করেন। আমি গাইলুম—পিয়ানো সহযোগে। তিনি শুনে বললেন—By Jove ! কথা বুঝি না বুঝি তোমার গাওয়া শুনে বুঝেছি কি তুমুল আলোড়ন আনতে পারে মনে। আমার স্বামীর দিকে ফিরে বললেন—আমি যদি Bengal Government হতুম তোমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে externment order জারি করতুম, যাতে আর কখনো বাঙালায় গিয়ে বাঙালীদের মাতিয়ে তুলতে না পারে।

সরলাদেবীর বিয়ে হয় ১৯০৫ সালে। এবং বাঙলার অফিসারদের দ্বারা ‘বন্দে মাতরম’ স্থানে স্থানে নিষিদ্ধ হয়েছে ১৯০৬ সালেই। সুতরাং ধরা যায় এটা ১৯০৬ এর কাছাকাছি সময়।

১৯৩৭ সালে কলকাতায় নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটি বিবেচনা করতে বলেন ‘বন্দে মাতরম’ কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে গ্রহণ করা যায় কিনা। এই উপলক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ জওহরলাল নেহরুকে যে চিঠি লেখেন ২৬ অক্টোবর, তা থেকে আমরা এই খবর পাচ্ছি :

১ বঙ্কিমচন্দ্রের জীবদ্দশায় রবীন্দ্রনাথই প্রথম স্তবকে সুর দেন। যদুভট্টের দেওয়া সুর থাকলেও, তা তখনও পরিজ্ঞাত ছিল না, এখনও নেই।

২ কলকাতা কংগ্রেসে রবীন্দ্রনাথ প্রথম ওই গান করেন, ১৮৯৬ সালে।

এই তথ্য যদি আমরা গ্রহণ করি, তাহলে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাখীবন্ধন অবলম্বনে যে অনুমান করা হয় যে ১৮৮৬ সালেও ‘বন্দে মাতরম’ গীত হয়েছিল, তা অগ্রাহ্য করতে হয়। ১৮৮৬ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন এবং ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’ গানটি গেয়ে শুনিয়েছিলেন। বন্দেমাতরম সেই কংগ্রেসে গীত হলে রবীন্দ্রনাথের তা অজানা থাকার কথা নয়।

৩ ‘বন্দে মাতরম’-র প্রথম স্তবকটি রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল কারণ, ‘the spirit of tenderness and devotion ….. the emphasis it gave to beautiful and beneficial aspects of our motherland made special appeal.’

৪ গানটির অন্যান্য অংশ, আনন্দমঠের অনেক অংশ যার সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি বিশেষভাবে জড়িত, রবীন্দ্রনাথের কাছে ভালো লাগেনি, ‘with all sentiments of which, brought up as I was in the monotheistic ideals of my father, I could have no sympathy.’

৫ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় সঙ্গীতের মতো হয়ে ওঠে।

৬ তরুণদের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ জাতীয় স্লোগান হয়ে ওছে।

৭ সমস্ত উপন্যাসের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বন্দে মাতরম’ -এর পুরো গানটি সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট।

৮ কিন্তু গানটির প্রথম স্তবকটি পুরো গান থেকে আলাদা করে নেওয়া সম্ভব। এবং এই স্তবকটি স্বতন্ত্র এবং প্রেরণাদাত্রী বলে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বিবেচিত হওয়ার উপযুক্ত।

এইবার গানটি দেখা যাক।

বন্দেমাতরম।

সুজলাং সুফলাং মলয়জশীতলাং

শস্যশ্যামলাং মাতরম।

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম

ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম,

সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম

সুখদাং বরদাং মাতরম।

সপ্তকোটীকণ্ঠ-কলকল-নিনাদকরালে,

দ্বিসপ্তকোটীভূজৈর্ধূত খরকরবালে,

অবলা কেন মা এত বলে।

বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীং

রিপুদলবারিণীং মাতরম।

তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম

তুমি হৃদি তুমি মর্ম

ত্বং হি প্রাণাং শরীরে।

বাহুতে তুমি মা শক্তি

হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি

তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী

কমলা কমল-দলবিহারিণী

বাণী বিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাং

নমামি কমলাম অমলাং অতুলাম,

সুজলাং সুফলাং মাতরম

বন্দে মাতরম

শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাম

ধরণীং ভরণীম মাতরম।

রবীন্দ্রনাথ এবং সরলাদেবীর সাক্ষ্যে আমরা জানতে পারছি রবীন্দ্রনাথ সুর দিয়েছিলেন ‘বন্দে মাতরম’ থেকে বরদাং মাতরম পর্যন্ত। বাকি অংশে সুর দেন সরলাদেবী এবং রবীন্দ্রনাথ সেটা শুনে খুশি নন। সভাসমিতিতেও পুরো গানটাই গাওয়া হত।

গানটির দ্বিতীয় স্তবকেও রবীন্দ্রনাথের আপত্তিজনক এমন কিছু নেই, যা প্রথম স্তবকে নেই। তৃতীয় স্তবকের শেষ পঙক্তিতে ‘তোমারই প্রতিমা’ এবং চতুর্থ স্তবকের দুর্গার ছবি ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথের পৌত্তলিকতাবিরোধী সংস্কারকে আহত করে থাকবে। প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় অবশ্য রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের অভিমতের খবর দিয়েছেন—নিষ্ঠাবান ব্রাহ্ম রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় এই গানটিকে পৌত্তলিকতা-ব্যঞ্জক বা মুসলমানবিদ্বেষ-জনক বলে মনে করতেন না। সরলাদেবীর কথা যদি মানতে হয়, তাহলে ধরে নিতে হবে সভাসমিতিতে পুরো গানটাই গাওয়া হত এবং প্রথম দিকে সেই অনেক সভাসমিতিতেই রবীন্দ্রনাথ উৎসাহী অংশী ছিলেন।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত বাঙালি মনকে প্রচণ্ড উত্তেজনার খোরাক দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে দৃষ্টি এবং অনুভব বোঝার জন্য এই পারিপার্শ্বিকের সন্ধান নেওয়া প্রয়োজন। রমেশচন্দ্র মজুমদারের ‘বাংলা দেশের ইতিহাস’ (আধুনিক যুগ) থেকে কয়েকটি তথ্য দেখা যাক।

*১. ওই দিন (১৬ অক্টোবর, ১৯০৫ ·, ৩০ আশ্বিন, ১৩১২, অর্থাৎ যেদিন বঙ্গব্যবচ্ছেদের ব্যবস্থা আইন অনুসারে কার্যে পরিণত হইল) শোক প্রকাশের চিহ্নস্বরূপ শিশু ও রোগী ব্যতীত সকলেই উপবাস করিবেন এবং কাহারও পাকশালায় রন্ধনক্রিয়া অনুষ্ঠিত হইবে না। সকলেই নগ্নপদে থাকিবে। দোকানপাট বন্ধ থাকিবে। ঘোড়ার গাড়ি বা গোরুর গাড়ি চলিবে না। যুবকগণ সূর্যোদয়ের পূর্বে উঠিয়া ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত গাহিতে গাহিতে গঙ্গাস্নান করিবে।

২. (৩০ শে আশ্বিন) অপরাহ্নে অখণ্ড বঙ্গ-ভবন স্থাপনের উদ্দেশ্যে কলিকাতার পার্শিবাগান মাঠে (এখন যেখানে ব্রাহ্মবালিকা শিক্ষালয়) ফেডারেশন হল বা ‘মিলন মন্দিরে’র ভিত্তি স্থাপিত হইল। রোগশয্যাগত আনন্দমোহন বসু সভাপতিত্ব করিলেন। আরাম কেদারায় করিয়া তাঁহাকে সভাস্থলে আনা হইল। প্রায় পঞ্চাশ হাজার কণ্ঠে উচ্চারিত ‘বন্দে মাতরম’ ধবনির মধ্যে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় উঠিয়া সভাপতির অভিভাষণ পাঠ করিলেন। ইংরেজিতে আশুতোষ চৌধুরি ও বাংলায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ইহা পাঠ করিলেন।

৩. তিন সপ্তাহ পরে পশুপতি বসুর ভবনে বিজয়া দশমীর পরদিন (২১শে কার্তিক) বিজয়া সম্মিলনী অনুষ্ঠিত হইল। … এই সভায় রবীন্দ্রনাথ যে বক্তৃতা করেন তাহার উপসংহার উদ্ধৃত করিতেছি :

… আজ বাংলাদেশের সমস্ত ছায়াতরুনিবিড় গ্রামগুলির উপরে এতক্ষণ যে শারদ আকাশে একাদশীর চন্দ্রমা জ্যোৎস্নাধারা অজস্র ঢালিয়া দিয়াছে, সেই নিস্তব্ধ শুচিরুচির সন্ধ্যাকাশে তোমাদের সম্মিলিত হৃদয়ের ‘বন্দে মাতরম’ গীতধবনি এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্তে পরিব্যাপ্ত হইয়া যাক।

৪. রংপুর। রংপুরের জিলা স্কুলের হেডমাষ্টার ৩১শে অক্টোবর (১৯০৫) এক বিজ্ঞপ্তি দিলেন যে, স্বদেশি আন্দোলনে পিকেটিং প্রভৃতি কোনরূপ সক্রিয় অংশগ্রহণ করিলে ছাত্রগণকে কঠিন শাস্তি দেওয়া হইবে। ছাত্রেরা ইহা অগ্রাহ্য করিয়া ওই দিনই এক স্বদেশী সভায় যোগদান করিল। স্বদেশি গীত গাহিল এবং ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিতে সারা পথ মুখরিত করিয়া গৃহে ফিরিল।

৫. ১৯০৫ সনের ৮ নভেম্বর পূর্ববঙ্গের ছাত্র ও শিক্ষক দমনের জন্য চিফ সেক্রেটারি P. C. Lyon ঢাকা বিভাগের কমিশনারের নিকট দুইটি সার্কুলার পাঠাইলেন। তাহাতে এই দমননীতি আরও প্রকট হইয়া উঠিল। … নিষিদ্ধ আচরণগুলি এই: রাস্তায় বা প্রকাশ্যে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করা।

৬. কলিকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকায় রিপোর্ট বাহির হইল—সারা অক্টোবর মাসে (১৯০৫), বিশেষত পূজার সময়, সমগ্র বরিশাল জেলায় … শহরে ও জিলার সর্বত্র সভাসমিতির অধিবেশন হইতেছে এবং বন্দেমাতরম ধবনিতে আকাশ বাতাস পরিপূর্ণ করিতেছে। কোনো কোনো স্থানে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখা অসম্ভব হইয়াছে।

৭. হুকুমের পর হুকুম জারি করিয়া ফুলার সাহেব প্রকাশ্য স্থানে সভাসমিতি বন্ধ করিয়াছেন। কোনো ছাত্র বা অন্য কেউ রাস্তায় ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করিলেই পুলিশ তাহাকে ফৌজদারি কয়েদীর মতো গ্রেপ্তার করে।

৮. পরদিন দুপুরবেলা (১৯০৬ সনের ১৪ই এপ্রিল, বরিশাল প্রাদেশিক সম্মেলনের বার্ষিক অধিবেশনের সময়ে) সভাপতি এ. রসুল ও তাঁহার বিলাতী মেম গাড়িতে এবং সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, মতিলাল ঘোষ এবং ভূপেন্দ্রনাথ বসু প্রমুখ নেতৃবৃন্দ পদব্রজে চলিলেন। তাঁহাদের কেহ বাধা দিল না। কিন্তু তাহাদের পশ্চাতে ‘বন্দে মাতরম’ ব্যাজ ধারণ করিয়া যুবকের দল যেই রাস্তায় আসিল, অমনি ছয় ফুট লম্বা মোটা লাঠি দিয়া পুলিশ তাহাদের গুরুতর প্রহার করিতে লাগিল এবং ‘বন্দে মাতরম’ ব্যাজ জোর করিয়া ছিনাইয়া লইল। মনোরঞ্জন গুহ ঠাকুরতার পুত্র চিত্তরঞ্জনকে মারিতে মারিতে পার্শ্বের পুকুরে ফেলিয়া দিল। কিন্তু এই অবস্থাতেও সে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি করিতে বিরত হইল না।

৯. চরমপন্থী জাতীয়তাবাদীর মুখপত্র ‘বন্দে মাতরম’ পত্রিকায় জ্বালাময়ী ও অনন্যসাধারণ ভাষায় তাঁহার (ফুলারের) বিরুদ্ধে যে সকল লেখা প্রকাশিত হইত তাহার জন্য সম্পাদক হিসেবে অরবিন্দ ঘোষ বিদ্রোহের অভিযুগে অভিযুক্ত হইলেন (১৯০৭, আগস্ট)।

এই পরিপ্রেক্ষিতে রবীন্দ্রনাথের মানসিক বিবর্তনের পথ সন্ধান করা যেতে পারে। ১৩১২ সালের ৩০শে আশ্বিন সকালবেলায় রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ সম্প্রদায় পরিচালিত শোভাযাত্রার পুরোভাগে ছিলেন। ১৩১৪ সালের ৯ই ভাদ্র আমেরিকায় রথীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখছেন, ‘Statesman কাগজের চাঁদা ফুরলেই আর পাঠাব না। এখন থেকে ‘বন্দে মাতরম’ কাগজ পাঠাতে থাকব। ওটা খুব ভালো কাগজ হয়েচে। কিন্তু অরবিন্দকে যদি জেলে দেয় তাহলে ও কাগজের কি দশা হবে জানি নে।’ মধ্যে বরিশাল প্রাদেশিক সম্মিলনীর সাহিত্য সম্মিলনীর সভাপতি মনোনীত হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। যদিও বরিশালের সম্মিলনী পুলিশের তাণ্ডবে অনুষ্ঠিত হয়নি। রবীন্দ্রনাথের সভাপতি হওয়া নিয়ে কাগজপত্রে তীব্র সমালোচনা হয়েছিল, মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন বঙ্গবাসী সাপ্তাহিক। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ যোগ্য সভাপতি কিন্তু শিবনাথ শাস্ত্রী, দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, চন্দ্রনাথ বসু বা নবীনচন্দ্র সেনকে আগে সভাপতি করা উচিত ছিল। এই সময় রবীন্দ্রনাথ ২৫ চৈত্র ১৩১২ আগরতলা থেকে চিঠি লিখছেন মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘ঘুরিয়া মরিতেছি। সম্প্রতি আগরতলায় আটকা পড়ে গেছি। বরিশালে যাইতে হইবে। তাহার পর চাটগাঁয়ে যাইবার কথা কিন্তু আমার মন বিদ্রোহী হইতেছে। বোলপুরে গিয়া একেবারে নিশ্চেষ্টতার মধ্যে ডুব মারিয়া বসিতে ইচ্ছা করিতেছে। শনি আমাকে ঘুরাইতেছে। রবি তাহার সঙ্গে পারিয়া উঠিল না।’

এই বিষয়ে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখছেন :

পরযুগে অনেকে বলিতেন যে, গভর্মেন্টের ধর্ষণনীতি অবলম্বনের পর হইতে কবি রাজনীতির পথ ত্যাগ করেন। সেকথা সম্পূর্ণ ভুল। কারণ রবীন্দ্রনাথ এই আন্দোলনের সহিত যথার্থভাবে তিন মাস মাত্র যুক্ত ছিলেন—১৩১২ সালের আশ্বিন হইতে অগ্রহায়ণ মাস পর্যন্ত। এই কয়েক মাসের অভিজ্ঞতার কথা তিনি ‘বিদায়’ কবিতায় প্রকাশ করেন বলিয়া আমাদের বিশ্বাস : ‘বিদায় দেহ ক্ষম আমায় ভাই। কাজের পথে আমি তো আর নাই।’ এইটি লিখিত হয় চৈত্রমাসে (১৩১২)। তখনো বরিশালের যজ্ঞভঙ্গ হয় নাই, ইংরেজের রুদ্রশাসন দেখা দেয় নাই। বাংলাদেশে রুদ্রপন্থীদের রাজনৈতিক ইত্যাদি সংঘটিত হয় নাই। … বাঙালি তাঁহার গানগুলি কণ্ঠে তুলিয়া লইল। তাঁহার কর্মপদ্ধতি গ্রহণ করিল না।

গানগুলি কী? রবীন্দ্রনাথ এসময়ে প্রবলভাবে স্বদেশি গান লিখছেন। ১৩১২ ভাদ্র-আশ্বিনের ভাণ্ডারে প্রকাশ হল পনেরোটি স্বদেশি গান। ১৩১২ আশ্বিনের বঙ্গদর্শনে দুটো স্বদেশি গান। ১৩১২ কার্তিকের বঙ্গদর্শনে তিনটি স্বদেশি গান। এই সব গানগুলোর মধ্যে দেশকে ‘মা’ বলে ভাবা হয়েছে (বন্দেমাতরম গানের মতো) এই এই গানে : (১) আজ বাংলা দেশের হৃদয় হতে কখন আপনি। (২) মা কি তুই পরের দ্বারে। (৩) যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক। (৪) আমার সোনার বাংলা। (৫) ও আমার দেশের মাটি। (৬) সার্থক জনম আমার। (৭) আমরা পথে পথে যাব সারে সারে।

লক্ষ্য করবার বিষয়, গীতবিতানে যে ৪৬টি স্বদেশমূলক গান সংগৃহীত হয়েছে, তার ২৩টি গানই ১৩১২ সালে রচিত, ১০টি গান ১৩১২ সালে আগে এবং বাকি ১৩টি মাত্র ১৩১২-এর পর। পরবর্তী গানগুলো বেশির ভাগই নাটক রচনার সূত্রে প্রস্তুত। প্রমদারঞ্জন ঘোষ তাঁর ‘আমার দেখা রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শান্তিনিকেতন’ (১৯৬৩) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের নাতি স্বর্গীয় দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের মুখে শুনেছি, ওই যুগে দেশের গান রচনার সময় রবীন্দ্রনাথের চোখ দিয়ে জল ঝরতো।’

পরবর্তীযুগে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশমূলক গান লেখেননি কেন? এলমহারস্ট তাঁর Poet and Plowman গ্রন্থে ১৯২২ সালের ১৫ মার্চের দিনলিপিতে লিখেছেন

My father was’, Rathi said, “warned by the British Government not to compose any more songs that might fire patriotic fervour.

রোটেনস্টাইন এবং রবীন্দ্রনাথের পত্রাবলি রক্ষিত হয়েছে যে গ্রন্থে, Imperfect Encounter, সেই গ্রন্থেও আমরা খবর পাচ্ছি লর্ড কার্জন কী পরিমাণ ক্রুদ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ওপর। ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ যখন ইংল্যাণ্ডে গেলেন তখন সেখানকার রবীন্দ্র-অনুরাগীরা চেষ্টা করেছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে কোনো ডিগ্রি দেওয়ানোতে। অক্সফোর্ডের চ্যান্সেলর তখন লর্ড কার্জন। ফক্স স্ট্রঙওয়েজ তাঁর ধারণা বলছেন :

লর্ড কার্জন did not wish a University of which he is Chancellor to take public notice of one who had added politically to the labours of the Viceroy.

এর আগে, ১৯১১ সালে পূর্ববঙ্গ-আসাম সরকারের গোপন ইস্তাহারের ফলে শান্তিনিকেতন সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের পক্ষে শিক্ষার অনুপযোগী বিবেচিত হয়েছিল, ছাত্ররা দলে দলে শান্তিনিকেতন ত্যাগ করেছিল এবং শিক্ষক হীরালাল সেনকেও শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যেতে হয়েছিল। শোনা যায় রবীন্দ্রনাথের জন্য একটা কোড নম্বরও ধার্য করেছিল পুলিশ।

কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের ভয়ে রবীন্দ্রনাথ স্বদেশের কথা ভাববেন না, এটা অনুমান করা শক্ত. অবনীন্দ্রনাথ তাঁর ঘরোয়া গ্রন্থে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ যখন জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন অন্যদের সঙ্গে তখন পুলিশ প্রায়ই হানা দিত। কিন্তু তৎসত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ এই কয়টি প্রবন্ধ প্রকাশ্য সভায় পাঠ করেছিলেন অথবা প্রবন্ধ লিখেছিলেন।

দেশনায়ক : ১৩১৩, ১৫ বৈশাখ, পশুপতি বসুর গৃহগ্রাঙ্গণে।

স্বদেশি আন্দোলন : ১৩১৩, কার্তিক, ভাণ্ডার, ডন সোসাইটির সভায়।

সাহিত্য সম্মেলন : ১৩১৩ কলিকাতা কংগ্রেসের সাহিত্যসম্মেলন।

ব্যাধি ও প্রতিকার : ১৩১৪ শ্রাবণ, প্রবাসী

যজ্ঞভঙ্গ : ১৩১৪ প্রবাসী

পাবনা সম্মিলনীর সভাপতির ভাষণ : ১৩১৪

পথ ও পাথেয় : ১৩১৫, ১২ জ্যৈষ্ঠ, চৈতন্য লাইব্রেরি

সমস্যা : ১৩১৫, আষাঢ়, প্রবাসী

সদুপায় : ১৩১৫, শ্রাবণ, প্রবাসী

পূর্ব ও পশ্চিম : ১৩১৫, ভাদ্র, প্রবাসী

প্রাচ্য ও প্রতীচ্য (সংক্ষিপ্ত) : ১৩১৫ ভাদ্র, বঙ্গদর্শন

দেশহিত : ১৩১৫ আশ্বিন, বঙ্গদর্শন

১৩১৫-এর পর থেকে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক বক্তৃতা ও প্রবন্ধ অবশ্য বন্ধ হয়ে যায়। আবার শুরু হয় বহু পরে ১৩২৬ সালে ‘কর্তার ইচ্ছায় কর্ম’ বক্তৃতাপাঠের সময়।

রাজরোষের ভয়ে না হলেও, ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে রবীন্দ্রদৃষ্টি পালটাচ্ছে বোঝা যায়, এই সময়কার তাঁর বিবর্তন লক্ষ্য করলে। ১৩১৩ সালের কলকাতা কংগ্রেসের সাহিত্যসম্মেলনেও তিনি ‘বন্দে মাতরম’কে মহামন্ত্র বলছেন। কিন্তু সুরাট কংগ্রেসের তাণ্ডবের পর ১৩১৪ সালের ২৩ পৌষ রবীন্দ্রনাথ জগদীশচন্দ্রকে লিখছেন—

আমাদিগকে নষ্ট করিবার জন্য আর কারো প্রয়োজন হইবে না—মর্লিরও নয় কিচেনারেরও নয়, আমরা নিজেরাই পারিব। আমরা বন্দে মাতরম ধবনি করিতে করিতে পরস্পরকে ভূমিসাৎ করিতে পারিব।

‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে মত পরিবর্তন দুটো কারণে ঘটছে। একটা, দেশের লোকের ‘বন্দে মাতরম’ আওড়ানোই কেবল তাঁর ভালো লাগছিল না, সেই মন্ত্রের সঙ্গে প্রকৃত দেশসেবার কোনো যোগাযোগ ছিল না বলে। ২,৩ দ্বিতীয় কারণ, দেশকে মা বলে ভাবা তাঁর পক্ষে সহজ ছিল না।

দ্বিতীয় কারণটি নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাক। ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথের মানসিক গঠনে সাকার দেশমাতৃকা কল্পনা কতটা কষ্টসাধ্য ছিল, তার কিছু আভাস পাওয়া যাবে, রথীন্দ্রনাথের আচরণে। এলমহারস্ট তাঁর Poet and Plowman-এর স্মৃতিচারণায় লিখছেন :

Rathi Tagore once told me of how, after his return from studying in America in 1909, he was nearly persuaded to join the revolutionaries in Bengal who had decided that forceful methods were the sole means left to them of bringing about the overthrow of the Imperial Government. He had at the last moment been inhibited, however, by the form of oath he was told he would have to swear at his initiation in front of the image of the Goddess Kali.

সন্ত্রাসবাদীদের কাছে ‘বন্দে মাতরম’ ছিল প্রিয় মন্ত্র।

প্রমদারঞ্জন ঘোষ লিখছেন :

সে বছর দেশমাতার মূর্তি হিসাবে শিবাজীর পূজিত ভবানীদেবীর মৃণ্ময়ীমূর্তির পূজা নাকি ছিল উৎসবের অঙ্গ। প্রতিমা পূজা রবীন্দ্রনাথের সংস্কারে বাঁধে। তাই তিনি ভবানীপূজায় যোগ দিলেন না। ধূমধামের সঙ্গে পূজা হল। সেবার তিলক নাকি পঁচিশ হাজার লোকের সঙ্গে মিছিল করে গঙ্গাস্নানে গিয়েছিলেন। মিছিলে আগে ছিল অবনীন্দ্রনাথের আঁকা ভারতমাতার প্রসিদ্ধ ছবিখানা।

১৮৯৯ সালে সরলাদেবীরা অনেকে কাশী বেড়াতে গিয়ে বিশ্বেশ্বরের মন্দিরে গিয়ে আরতি দেখে প্রণাম করেছিলেন। ‘এই কথাটা কলকাতায় ফিরে গেলে রবিমামার কানে যখন পৌঁছল তিনি আমাদের প্রতি অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও রুষ্ট হয়ে বললেন, ‘তোরা এই রকম করে পৌত্তলিকতার প্রশ্রয় দিলি? মিথ্যাচার করলি?’

সরলাদেবী কিন্তু এটা লক্ষ্য করতে ভোলেননি, রবীন্দ্রনাথের হাতে ব্রহ্মসঙ্গীতের বিপুল পরিবর্তন ঘটছিল। রামমোহন যুগের পরবর্তী ব্রহ্মোৎসবের রবীন্দ্রের ব্রহ্ম বা ঈশ্বর অপাণিপাদ নন, তিনি সর্বতো অক্ষি সর্বত্র শিরোমুখ। রামমোহন রায়ের সময়কার নিরাকার ব্রহ্ম রবীন্দ্রনাথের হাতে সাকার হয়ে গেছে। ‘অথচ ভাবের চৌকাঠ পেরিয়ে গেলেই—মাটি-খড়ে, ধাতু-প্রস্তরে, বর্ণে-চিত্রে ভাবের উপলক্ষ্য ভগবানকে পূর্ণ লক্ষ্য করে মূর্ত করে আঁকড়ে ধরলেই রবীন্দ্রনাথ উত্ত্যক্ত বিচলিত হয়ে উঠতেন।

একদিকে যেমন রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্ম সংস্কারে দেশকে মূর্তিমতী মা বলে ভাবা কষ্টসাধ্য হচ্ছে, তার থেকেও বড়ো দুঃখের কারণ, রবীন্দ্রনাথের কর্মপদ্ধতি দেশের লোকে গ্রহণ করছে না।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক বক্তৃতা এবং প্রবন্ধ পাঠ করলে যে কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হল, রাজনৈতিক আন্দোলনের চাইতে তিনি গুরুত্ব দিতেন দেশগঠনের উপর বেশি। পল্লীকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে তুলতে হবে প্রথমে, তার পর রাষ্ট্রীয় আন্দোলন। একেই তিনি বরাবর বলে এসেছেন আত্মশক্তি।

রবীন্দ্রনাথের আত্মশক্তি বনাম রাষ্ট্রশক্তির এই দ্বন্দ্ব বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যাত হতে পারে। যাঁরা মনে করেন রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ সরকারের সঙ্গে সম্মুখ সমরে নামতে দ্বিধাগ্রস্ত, তাঁরা তাঁর এই আত্মশক্তির ওপর জোর দেওয়াটা তাঁর পলায়নী মনোবৃত্তি বলে মনে করতে পারেন।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পল্লি গঠনের কাজ অন্য দৃষ্টিতেও দেখা যেতে পারে, যাতে মনে হবে তাঁর এই দর্শন ছিল বিপ্লবাত্মক।

যে-কোনো যুগান্তকারী বিপ্লবের সময়ে দেখা যায়, একটা দেশে রাষ্ট্রশক্তির সার্বভৌমত্ব খণ্ডিত হয়ে যায়। ইংল্যাণ্ডের বুর্জোয়া বিপ্লবের সময় দেখা গিয়েছিল রাজার হাতে সার্বভৌমত্ব পুরো আয়ত্তে নেই, ইংল্যাণ্ডের বহু লোকের আনুগত্য চলে গিয়েছিল পার্লামেন্টের প্রতি। আমেরিকার স্বাধীনতা বিপ্লবের সময় জনসাধারণের আনুগত্য ঔপনিবেশিক সরকারের প্রতি আর থাকেনি। ফরাসী বিপ্লবের সময় জনসাধারণের আনুগত্য চলে যায় এস্টেটস জেনারেলের দিকে। সোভিয়েট বিপ্লবের সময় জনসাধারণ অনুগত হয় বিভিন্ন সোভিয়েট সংগঠনের। চীনা বিপ্লবের সময় কুওমিনটাঙ সরকারের কথাবার্তা শোনার লোক কমে যায়।

এই সব বিপ্লব পর্যালোচনা করলে যেটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হল বিপ্লব শুধু সংহারমূলক ক্রিয়া নয়, সঙ্গে সঙ্গে সৃষ্টিমূলক ক্রিয়াও। যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি বা সংগঠন ধবংস হচ্ছে তার পরিবর্তে কোন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি বা সংগঠন আসবে, তার প্রকাশ না হলে বিপ্লব ব্যর্থ হতে বাধ্য।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর দেশাত্মমূলক সংগঠনের কাজ সচেতনভাবে এই দৃষ্টিতে না দেখলেও, তাঁর কাজ বিপ্লবের এই মূল নীতির অনুসারী। ইংরেজকে দূর করাই সবচেয়ে বড়ো কাজ নয়। ইংরেজকে দূর করার পর কে এই সৃষ্টি কাজে অগ্রসর হবে, এই চিন্তা তাঁকে বিব্রত করেছিল। পল্লির দারিদ্র্য, অনৈক্য, অবিদ্যা, সংগঠনের অভাব—এই অবস্থায় দেশবাসী কোনো মহত্তর সৃষ্টির দিকে এগুতে পারবে না। সুতরাং ইংরেজ-বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত হবার আগে দেশকে তৈরি হতে হবে। এই হচ্ছে তাঁর যাবতীয় রাজনৈতিক প্রবন্ধের একমাত্র বক্তব্য। ইংরেজ সরকারের সার্বভৌমত্ব সংহার করার আগে বা সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশের নিজের কোনো সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন তৈরি না হয়ে ওঠে, তাহলে কোনো বিপ্লবই সার্থক হবে না—বর্তমান পরিভাষায় বলা যায় এই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক দর্শন। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯০৫-১৯০৬ সালে এই জাতীয় বক্তব্য আর কেউ রাখেননি। পরবর্তী যুগেও একমাত্র মহাত্মা গান্ধি এগিয়ে এসেছিলেন এই সৃষ্টিমূলক কাজে—তাঁর হরিজননীতি, চরকানীতি, পল্লি সংগঠন ইত্যাদির মধ্যে। মহাত্মা গান্ধির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক বক্তব্যে মিল ছিল না। কিন্তু সৃষ্টিমূলক কাজে গান্ধির উৎসাহের জন্যই রবীন্দ্রনাথ গান্ধীকে শ্রদ্ধা করতেন।

রাজনীতি থেকে রবীন্দ্রনাথের সরে আসার মূল কারণ, তিনি এই সৃষ্টিমূলক সংগ্রামে কোনো সমর্থন পাননি তদানীন্তন রাজনৈতিক কার্যকলাপ থেকে। বঙ্গ ব্যবচ্ছেদের তুমুল কোলাহলের পর যখন দেশ ঝিমিয়ে পড়ল, রবীন্দ্রনাথও ক্রমশঃ সরে আসতে লাগলেন এবং নিজের সাধ্যমতো শ্রীনিকেতন-শান্তিনিকেতনের কাজে, নিজের জমিদারিতে সৃষ্টির কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে’ গানটি তাঁর এই প্রসঙ্গে লেখা বলে রবীন্দ্রনাথই লিখেছেন, অ্যানড্রুজকে লেখা চিঠিতে (৭ জানুয়ারি, ১৯২১)। ১৯০৮ সালের পর তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধের অনুপস্থিতির কারণ এটাই সবচেয়ে বড়ো বলে মনে হয়।

‘বন্দে মাতরম’ এর প্রতি তাঁর বিরূপতাও সম্ভবতঃ এই কারণ থেকেই শুরু হয় এবং বাড়তে বাড়তে ‘ঘরে-বাইরে’ উপন্যাসের ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র বিপক্ষতায় পরিণত হয়। প্রমদারঞ্জন ঘোষ লিখেছেন, শান্তিনিকেতন উপাসনায় বক্তৃতা করতে গিয়ে দেশের কথা এসে গেলে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠতেন। তাঁর মুখে যেন খই ফুটতে শুরু করত। প্রথম মহাযুদ্ধের কাছাকাছি সময় তাঁরা শুনলেন রবীন্দ্রনাথের মুখে, ‘বন্দে মাতরম’ নয়, নমস্তুতে।

১৯১৬ সালে, ঘরে-বাইরে উপন্যাসের শুরুতেই বিমলা জানিয়ে দেয় :

অথচ স্বদেশি কাণ্ডের সঙ্গে যে আমার স্বামীর যোগ ছিল না বা তিনি এর বিরুদ্ধে ছিলেন তা নয়। কিন্তু ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রটি তিনি চূড়ান্ত করে গ্রহণ করতে পারেননি। তিনি বলতেন, দেশকে সেবা করতে রাজি আছি। কিন্তু বন্দনা করব যাঁকে তিনি ওর চেয়ে অনেক উপরে। দেশকে যদি বন্দনা করি তবে দেশের সর্বনাশ করা হবে।

পুরো ঘরে-বাইরে উপন্যাসটিই বলা যেতে পারে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের বিরুদ্ধে লেখা।

নেপাল মজুমদার তাঁর ‘ভারতে জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতা এবং রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তির উদ্ধৃতি দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের সত্তর বৎসর পূর্তি উপলক্ষ্যে অমৃতবাজার পত্রিকার এক সাংবাদিককে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ” ‘বন্দে মাতরম’ যথেষ্ট হইয়াছে। এখন ‘বন্দে মাতরম’ স্থানে ‘বন্দে মারতম’ বল। জাতীয় পতাকা উড়াইয়া কিংবা তোমাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ তুলা চরকায় কাটিয়া তোমরা স্বরাজ পাইবে না। জনসাধারণের জন্য গঠনমূলক কার্যের দ্বারা এবং তোমাদের দেশবাসীকে কার্যতঃ সেবা করিয়াই তুমি উহা অর্জন করিতে পারিবে।”

১৯৩৪ সালে চার অধ্যায় উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন :

শুধু মা মা স্বরে দেশকে যারা ডাকাডাকি করে, তারা চিরশিশু। দেশ বৃদ্ধ শিশুদের মা নয়, দেশ অর্ধনারীশ্বর—মেয়ে-পুরুষের মিলনে তার উপলব্ধি।

১৯৪০ সালে ‘ল্যাবরেটরি’ গল্পে লিখলেন :

বাংলাদেশে মেট্রিয়ার্কি বাইরে নেই, আছে নাড়িতে। মা মা শব্দে হাম্বাধবনি আর কোনো দেশের পুরুষমহলে শুনেছ কি?

১৯১০ সালে গোরা শেষ করেন রবীন্দ্রনাথ এই ভাবে :

গোরা কহিল, ‘মা তুমিই আমার মা। যে মাকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম তিনিই আমার ঘরের মধ্যে এসে বসে ছিলেন। তোমার জাত নেই, বিচার নেই, ঘৃণা নেই, শুধু তুমি কল্যাণের প্রতিমা। তুমিই আমার ভারতবর্ষ।’

দেশকে মা ভাবা রবীন্দ্রনাথের এই বোধ হয় শেষ। এরপর ১৯১৪ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় তিনি দেশকে মা বলে ভাবতে বিরক্ত হতেন। এবং সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে যায় তাঁর ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রতি অনুরাগ। শেষ পর্যন্ত গানটির প্রথম স্তবকটি যে তিনি অনুমোদন করেছেন, তা-ও বোধ হয় বাধ্য হয়ে।

‘বন্দে মাতরম’-এর অন্তর্লীন অর্থের জন্য ততটা হয়তো নয়, বিরূপতার বড়ো কারণই ছিল মন্ত্রটির অনুৎপাদক ব্যবহার। যে রবীন্দ্রনাথ একসময় তাঁর বক্তৃতা বা প্রবন্ধ শেষ করতেন ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিয়ে, সেই রবীন্দ্রনাথ ‘বন্দে মাতরম’ শুনলেই ক্ষেপে যেতেন কিছুদিন পরেই। পরবর্তী কালে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের অর্থ যা-ই হোক, এটা হয়ে ওঠে সাম্প্রদায়িক এবং দলীয় যুদ্ধ রব। ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘আল্লা হো আকবর’ হয়ে উঠেছিল, রবীন্দ্রনাথের জীবদ্দশায়, হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার যুদ্ধ-চিৎকার, যেমন ‘বন্দে মাতরম’ ও ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ হয়ে ওঠে পরে কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টিগুলির নির্বাচনী দলধবনি। বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রটির কংগ্রেসের এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের এই ব্যবহারে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্রনাথের মন। এই বিক্ষোভের পরবর্তী ধাপ হল রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতা থেকে আন্তর্জাতিকতায় উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়া। সেটা অন্য প্রসঙ্গ।


১. বহুদিন পূর্বে বর্তমান লেখকের গৃহে একবার কয়েকজন বিপ্লবী নেতা সমবেত হইয়াছিলেন। তাঁহাদের মধ্যে ছিলেন ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী (মহারাজ), প্রতুল গাঙ্গুলি, শ্রীনলিনীকিশোর গুহ প্রভৃতি। কথা প্রসঙ্গে তাঁহারা বলিলেন, ”বিপ্লবী জীবনে রবীন্দ্রনাথের এই শ্রেণির গীতি-কবিতাগুলি আমাদের যে কি সাহস ও সান্ত্বনা জোগাইত তাহা বলিয়া বোঝান যায় না। সারা দিন পুলিশের হাত এড়াইবার জন্য বনে জঙ্গলে ঘুরিয়া সন্ধ্যাকালে শ্রান্তদেহে অবসন্ন মনে কোনো জলাশয় দেখিলে তাহার জলে তৃষ্ণা দূর করিয়া একাকী এই সব গান গাহিতে গাহিতে দেহের শ্রান্তি দূর করিয়াছি।”

বোমার মামলায় আলিপুর আদালতের কাঠগড়ায় বিপ্লবী আসামীগণকে সমবেত করা হইত। একদিন বিচারক আসার পূর্বে একটি তরুণ বন্দী সহসা রবীন্দ্রনাথের গান গাহিয়া উঠিল: সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে। ….. আদালতের সমস্ত লোক স্তব্ধ হইয়া এই গানটি শুনিল। (বাংলা দেশের ইতিহাস, আধুনিক যুগ, রমেশচন্দ্র মজুমদার)

২. … আমি যখন ‘স্বদেশি সমাজ’ লিখেছিলুম তখন তৎকালীন কংগ্রেসওয়ালারা আমার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হয়েছিলেন। বিদেশি গভর্মেন্টের সঙ্গে অনন্তকাল ধরে রফানিষ্পত্তির কাজকেই তাঁরা ভারতবাসীর মোক্ষসাধন বলে স্থির করেছিলেন। তাঁরা অবজ্ঞা করে বলেছিলেন বেন্থাম প্রভৃতি পণ্ডিতরা স্টেট সম্বন্ধে যে মত প্রচার করেছেন আমি অশিক্ষাবশত সেসব কিছুই জানিনে বলেই এমন কথা বলতে পেরেছি যে প্রজারা নিজেদের শাসনশক্তি নিজেরাই উদ্ভাবন করতে পারে। … বহুকাল থেকে এ কথা বলতে তারা কুণ্ঠিত হয়নি যে দেশের সুখ দুঃখ সম্বন্ধে উদাসীন থেকে আমি কেবল বিদেশের সঙ্গে সখ্যস্থাপনের জন্যে ব্যস্ত। তারা জানে অথবা জেনেও জানে না যে বিদেশের জনসভায় বিদেশি সভ্যতা সম্বন্ধে আমি যা বলে থাকি তা একেবারেই শ্রুতিসুখকর নয়। (৪ কার্তিক, ১৩৩৯, হেমন্তবালা দেবীকে চিঠি, চিঠিপত্র ৯ম খণ্ড)

৩. ইংরেজের অত্যাচার সহ্য করতে হবে কিংবা ভারতবর্ষ কোনোদিন স্বাধীন হবার চেষ্টা করবে না এমন কথা আমি বলিনি। মহাত্মাজী বলেছেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যেই আমরা থাকব এবং সে রকম থাকবার ইচ্ছা না করা religiously wrong অর্থাৎ ধর্মবিরুদ্ধ। আমি তা বলি নে। আমি বলি স্বাধীনতা বাইরের কোনো একটা ঘটনার উপর নির্ভর করে না ; দেশের যে অবস্থা ঘটলে স্বাধীনতার মূলপত্তন হয়, স্বাধীনতা সত্য হয় সে অবস্থা ঘটাবার জন্যে চেষ্টা করাই আমাদের বর্তমান কর্তব্য। সে অবস্থা চরকা কেটেও হয় না, জেলে গিয়েও হয় না—তার সাধনা তার চেয়েও কঠিন ও বিচিত্র—তাতে শিক্ষার দরকার এবং দীর্ঘকালের তপস্যা চাই। হঠাৎ একটা কিছু করে বসা তপস্যা নয়।

২২ মাঘ ১৩২৮, কাদম্বিনী দেবীকে চিঠি, চিঠিপত্র ৭ম খণ্ড

৪. তোরা প্রাণ খুলে বল বন্দেমাতরম।

তোদের ঘুমের নেশা ভাঙ্গিয়ে দিলে

ক্ষুদিরামের একটি বম।

(রমেশচন্দ্র মজুমদারের ইতিহাসে উল্লিখিত)

৫. … আমরা মননের আবহাওয়ার মধ্যে জন্মাইনি—যে দেশে সকল ভাবনা ভাবিত এবং সকল কর্ম কৃত হয়ে চিরদিনের জন্যে খতম হয়ে গেচে সেই ‘আমার জন্মভূমি’তে আমরা মানুষ। (প্রথম চৌধুরীকে চিঠি, ২ ফাল্গুন ১৩২৪, চিঠিপত্র ৫ম খণ্ড)

৬. … জরুরি চিঠি জরুরি প্রবন্ধ সমস্ত ঠেলে রেখে মাঝে মাঝে প্রায়ই গান লিখি। যখন লিখি তখন মনে হয় স্বরাজ ব্যাপারটা এমন কিছু গুরুতর জিনিষ নয়—মানুষের ইতিহাসে অনেক স্বরাজ বুদ্বুদের মত উঠেচে আর ফেটে গেছে—কিন্তু যে গানগুলোকে দেখতে বুদ্বুদের মত তারা আলোর বুদ্বুদ নক্ষত্রের মতই। সৃষ্টিকর্তার খেলনাগুলির সঙ্গে তাদের রঙের মিল আছে। সেইজন্যেই যখন তারা গড়ে উঠতে থাকে তখন কর্তব্য ভুলে যাই। অথচ দেশের কর্তাব্যক্তিদের কাছ থেকে হুকুম আসচে যে, ”সময় খারাপ অতএব বাঁশি রাখ, লাঠি ধর।” যদি তা করি তাহলে কর্তারা খুশি হবেন, কিন্তু আমার এক বাঁশিওয়ালা মিতা আছেন কর্তাদের অনেক উপরে, তিনি আমাকে একেবারে বরখাস্ত করে দেবেন। কর্তারা বলেন, ”তিনি আবার কে? এক ত আছে বন্দে মাতরম।” তাঁদের গড় করে আমাকে আজ বলতে হচ্চে—’আমার বন্দেমাতরং ভুলিয়েচেন ঐ তিনি। আমি দেশছাড়া ঘরছাড়ার দলে। আমি ভূগোলের প্রতিমার পাণ্ডাদের যদি আজ মানতে বসি তাহলে আমার জাত যাবে। (১৮ কার্তিক, ১৩২৮, প্রমথ চৌধুরিকে চিঠি)

৭. ”…অদ্য কঠিন ব্রতনিষ্ঠ বঙ্গভূমির প্রতিনিধিস্বরূপ সেই কয়জন এই দুঃসহ অগ্নিপরীক্ষার জন্য বিধাতা কর্তৃক বিশেষভাবে নির্বাচিত হইয়াছেন। তাঁহাদের জীবন সার্থক। রাজরোষরক্ত অগ্নিশিখা, তাঁহাদের জীবনের ইতিহাসে লেশমাত্র কালিমাপাত না করিয়া বার বার সুবর্ণ অক্ষরে লিখিয়া দিয়াছে।—বন্দে মাতরম।”

(১৩৩২ ফাল্গুন, ভাণ্ডার, স্বদেশিদের উপর পুলিশের অত্যাচার প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *