বন্দে মারতম ও রবীন্দ্রনাথ – আলপনা রায়

বন্দে মাতরম ও রবীন্দ্রনাথ

আলপনা রায়

১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দের ২৮ ডিসেম্বর (১৩০৩ পৌষ ২) কংগ্রেসের দ্বাদশ অধিবেশনে ‘বন্দে মাতরম’ গান গেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ। অধিবেশন উপলক্ষে তিনি রচনা করেছিলেন ভারতমাতার বন্দনাগান : ‘অয়ি ভুবনমনোমোহিনী’। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস-সভায় গানটি না গাওয়ার কারণ কি এই যে, ‘একান্ত হিন্দুসংস্কৃতি আশ্রয়ী’ এই রচনা ‘সর্বজনীন ভারতরাষ্ট্রসভায় গাইবার উপযুক্ত নয়’? ‘ভুবনমনোমোহিনী’ সম্পর্কে পরবর্তীকালের এই অভিমত কি রচনাকালেও দ্বিধান্বিত করেছিল তাঁকে, তাই গেয়েছিলেন ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম কয়েকটি পঙক্তি? সেদিনের বিবরণ আছে রবীন্দ্রনাথের ‘পিতৃস্মৃতি’তে :

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’-এ বাবা সুর বসিয়েছিলেন। কংগ্রেস অধিবেশনের আরম্ভে বাবা একা এই গান গাইলেন, সরলাদিদি সঙ্গে অর্গান বাজিয়েছিলেন। তখন মাইক প্রভৃতি যন্ত্র আবিষ্কৃত হয়নি। বাবার গলা যন্ত্রের সাহায্য ছাড়াই প্যাণ্ডালের বিপুল জনতার শেষপ্রান্ত পর্যন্ত পরিষ্কার শোনা গিয়েছিল। ১৮৯৬ সালের কংগ্রেসে ‘বন্দে মাতরম’ প্রথম গাওয়া হয়।

অধিবেশনের আরম্ভেই গানটি হয়েছিল কি না, অমৃতবাজার পত্রিকা-র বিবরণী অনুসারে সে-বিষয়ে অবশ্য সংশয় প্রকাশ করেছেন ‘রবিজীবনী’ কার প্রশান্তকুমার পাল। এর আগেও প্রকাশ্য সভায় এই গান গেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ; ২৩ মার্চ ১৮৮৪ (১২৯০ চৈত্র ১১) সাবিত্রী লাইব্রেরির (প্রতিষ্ঠা ১২৮৬) পঞ্চম অধিবেশনের সূচনায় ছিল অক্ষয়চন্দ্র মজুমদারের ‘বন্দে মাতরম’ গান, আর সমাপ্তি হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের স্ব-রচিত কয়েকটি স্বদেশী গানের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ গানে। তবে কংগ্রেস-সভায় পরিবেশনসূত্রেই ‘বন্দে মাতরম’ প্রথম জাতীয় সংগীতের স্বীকৃতি পেল।

লক্ষ্য করা যায়, অধিবেশনের দশ বছর আগেই প্রকাশিত হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম সাত পঙক্তির স্বরলিপি, ১২৯২ সালে বালক পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় ‘গান-অভ্যাস’ বিভাগে। স্বরলিপিকার রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী প্রতিভাসুন্দরী দেবী। সুরকারের কোনো নাম অবশ্য এই পত্রিকায় নেই কিন্তু ১৩০০ সালে ভারতী পত্রিকার কার্তিক সংখ্যায় সরলা দেবী-কৃত স্বরলিপিতে সুরকারের নাম ‘শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’। দুটি স্বরলিপি প্রায় একই রকম, নির্দেশিত রাগ-তালও এক—দেশকাওয়ালি। তাই মনে হয় বালক পত্রিকার স্বরলিপিটি রবীন্দ্রনাথ-প্রদত্ত সুরের অনুসরণেই কৃত। প্রতিভাসুন্দরী দেবী জানিয়েছেন :

‘বন্দে মাতরম’ নামক বিখ্যাত গানটির সমস্তটা দেওয়া গেল না, কারণ উক্ত গানের সুর অত্যন্ত কঠিন, সমস্তটা দিলে পাঠকের সহজে আয়ত্ত হইবে না। বন্দে মাতরম গানে বিস্তর অলংকার লাগিয়াছে।

এর থেকে এমন ধারণা হওয়া অসম্ভব নয় যে, সম্পূর্ণ গানটিতেই বুঝি সুর দেওয়া হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ভাগনী সরলা দেবীর আত্মস্মৃতি থেকে জানা যায়, প্রথম দুই পদের সুর রবীন্দ্রনাথের, তাঁরই উৎসাহে বাকি অংশে সুর দিয়েছেন সরলা দেবী, ‘একদিন মাতুল আমায় ডেকে বললেন—’তুই বাকিটুকুতে সুর দিয়ে ফেল না।’ …তাঁর আদেশে ‘সপ্তকোটি কণ্ঠ কলকলনিনাদ করালে’ থেকে শেষ পর্যন্ত ভাবের সঙ্গে ও গোড়ার সুরের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সুর দিয়ে ফুটিয়ে নিলুম। দুই একটা জাতীয় উৎসবে সমস্বরে বহুকণ্ঠে বহুজনকে গাইতেও শেখালুম। সেই থেকে সভাসমিতিতে সমস্তটাই গাওয়া হতে থাকল।’ এই ঘটনা সম্ভবত বঙ্গভঙ্গ-প্রতিরোধ পর্বকালের। ১৩০০ (১৮৯৩) সালের ভারতী পত্রিকায় বা ১৩০৭ (১৯০০) সালে প্রকাশিত সরলা দেবী-কৃত স্বরলিপির সংকলনগ্রন্থ ‘শতগান’-এ কেবল প্রথম সাত পঙক্তিরই স্বরলিপি আছে ; দীর্ঘকাল পরে শতগান-এর তৃতীয় সংস্করণেই (১৩৩০) কেবল সম্পূর্ণ গানটির স্বরলিপি পাওয়া যায়। ‘দেশ’ রাগে বাঁধা এই গানের শুধু তালের পরিবর্তন হয়েছে স্বরলিপিগুলিতে ; বালক পত্রিকার ‘কাওয়ালি’ তাল ‘শতগান’ প্রথম সংস্করণে হয়েছে ‘একতালা’, আর তৃতীয় সংস্করণে বোধকরি বৈচিত্র্যের উদ্দেশ্যে ‘তাল ফেরতা’র নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, বারাণসী-কংগ্রেসের অধিবেশনে (১৯০৫) গানের ‘সপ্তকোটীকণ্ঠ’ ও ‘দ্বিসপ্তকোটীভুজৈর্ধৃত’র পরিবর্তে ‘ত্রিংশকোটি’ ও ‘দ্বিত্রিংশকোটিভুজৈর্ধূত’ গেয়েছিলেন সরলা দেবী। কিন্তু তাঁর মুদ্রিত কোনো স্বরলিপিতেই এমন নেই। মনে হয়, এটি মুখে মুখেই পরিচিত হয়েছিল, যেমন আরও পরে হয়েছিল ‘কোটী কোটী কণ্ঠ’ ও ‘কোটী কোটী ভূজৈর্ধূত’। রবীন্দ্রনাথ-সুরারোপিত অংশটি পরবর্তীকালে স্বরবিতানে (খণ্ড ৪৬) মুদ্রিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ অবশ্য কখনও সম্পূর্ণ গানটি গেয়েছেন বলে জানা যায় না। জাতীয় কংগ্রেস অধিবেশনেও তিনি নিজের সুরারোপিত শুধু প্রথম স্তবকটিই গেয়েছিলেন সম্ভবত ; দীর্ঘ একচল্লিশ বছর পরে ভিন্ন উপলক্ষ্যে এক চিঠিতে ‘বন্দে মাতরম’ প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন :

The Privilege of originally setting its first stanza to the tune was mine when the author was still alive and I was the first person to sing it before a gathering of the Calcutta Congress.

বলা বাহুল্য, এই দুটি বাক্যকে সংযুক্ত করে দেখার কোনো সংগত কারণ নেই, সকলেই জানেন বঙ্কিমচন্দ্রের প্রয়াণবর্ষ ১৮৯৪। এই বছরেই (সেপ্টেম্বর ১৮৯৪, ১৩০১ ভাদ্র ১৮) রাণাঘাটে কবি নবীনচন্দ্র সেনের বাড়িতে ‘নবযুবক’ রবীন্দ্রনাথের ‘বন্দে মাতরম’ গাইবার বিবরণ আছে নবীনচন্দ্রের ‘আমার জীবন’ গ্রন্থে : বঙ্কিমবাবুর ‘বন্দে মাতরম’ গাইতে বলিলে, কেবল প্রথম পদটি মাত্র গাইলেন। বলিলেন, গানটি তাঁহার মুখস্থ নাই।’ অনুরূপ একটি ঘটনার বিবরণ আছে রোটেনস্টাইনের আত্মজীবনীতেও ; ঈষৎ কৌতুকভরেই তিনি জানিয়েছেন, লণ্ডনের এক ভোজসভায় (২ সেপ্টেম্বর ১৯২০) নৈশ-আহারের পর ‘বন্দে মাতরম’ গাইবার অনুরোধ করা হলে রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি শব্দের পর আর মনে করতে পারলেন না, যেমন সেদিন নিজের নিজের দেশের জাতীয় সংগীতের সবটুকু মনে করতে পারেননি ইয়েটস, আর্নেস্ট রীজ এবং রোটেনস্টাইন স্বয়ং।

রবীন্দ্রনাথের এই বিস্মরণের কারণ কি এমন হওয়া সম্ভব যে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবকের পরবর্তী অংশ সম্পর্কে তিনি বিশেষ আগ্রহ বোধ করেননি, যেমন লিখেছেন তিনি পরিণত বার্ধক্যে :

…with all the sentiments of which, brought up as I was in the monothestic ideals of my father, I could have no sympathy.

‘বন্দে মাতরম’ গানে রবীন্দ্রনাথের আগেও সুর দিয়েছেন অন্তত দুজন : ক্ষেত্রনাথ মুখোপাধ্যায় ও যদুনাথ ভট্টাচার্য বা যদুভট্ট। আনন্দমঠ নির্দেশিত মল্লার রাগিণীতে বাঁধা যদুভট্টের সুরটিই বঙ্কিমচন্দ্রের বিশেষ পছন্দ হয়েছিল, শোনা যায়। রবীন্দ্রনাথ ‘মল্লার’-এর কাছাকাছি এক ভিন্ন রাগে গানটি বাঁধলেন। রবীন্দ্রনাথের বাল্যকালে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যদুভট্টের নিত্য-সংযোগ এবং দুটি রাগের নৈকট্যের কথা স্মরণ করে রাজ্যেশ্বর মিত্রের মতো আমাদেরও কৌতূহল হয়, রবীন্দ্রনাথ কি যদুভট্টা প্রদত্ত সুরটি শুনেছিলেন? শোনা অসম্ভব নয়। তবু রবীন্দ্রনাথ নতুন রাগে ‘বন্দে মাতরম’-কে চিহ্নিত করলেন : রাগটির নাম ‘দেশ’, লক্ষ করা ভালো।

রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠে এই নতুন সুর বঙ্কিমচন্দ্র শুনেছিলেন, এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য-প্রমাণ এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনকালে এই সুরসৃষ্টি বা পত্রিকায় স্বরলিপি প্রকাশ ছাড়াও ১২৯৩ বৈশাখে তৃতীয় সংস্করণ আনন্দমঠ-এর পরিশিষ্টে স্বয়ং লেখকের অনুমোদনে প্রতিভাসুন্দরী দেবী-কৃত স্বরলিপিটি মুদ্রিত হয়। তাই সংগতভাবেই অনুমান করা হয়, ‘বন্দে মাতরম’-এর এই সুরটির সঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র পরিচিত ছিলেন।

একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুদ্রিত স্বরলিপির মধ্য দিয়ে ‘বন্দে মাতরম’ গান একটি নির্দিষ্ট সুরে প্রতিষ্ঠিত হল। পরবর্তী সময়ে আরও কেউ কেউ এই গানে সুর দিয়েছেন, কিছু পরীক্ষা- নিরীক্ষাও হয়েছে। বর্তমানে যে সুরটি সরকারিভাবে স্বীকৃত ও সুপরিচিত, সেটিও দেশ রাগাশ্রিত।

‘বন্দে মাতরম’ গানের বা বিশেষত এই শব্দবদ্ধের বিপুল ও বিচিত্র পরিচয় পাওয়া যায় বঙ্গভঙ্গ প্রতিবাদ আন্দোলনে। রাখীবন্ধন-উৎসবের অন্যতম গানই ছিল ‘বন্দে মাতরম’; পতাকায় লেখা হয়েছে, শাড়ির পাড়ে বোনা হয়েছে, বন্ধুত্ব বিনিময়ের সম্ভাষণ কিংবা প্রতিবাদের ভাষা হয়েছে, কারারুদ্ধ স্বদেশীর বা প্রাণদণ্ডে দণ্ডিতের চরম উচ্চারণ হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’। সমকালের গীতিকাররা নতুন নতুন গান রচনা করেছেন, সে-গানেও অনেক সময়ে ধবনিত হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’। ‘বন্দে মাতরম’ নামে প্রকাশিত হয়েছে পত্রিকা, গীতসংকলন গ্রন্থ। এই সময়ে (১৯০৫) রবীন্দ্রনাথের পুরনো রচনা ‘একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’ গানে নতুন ধুয়োর সংযোজন হয়েছে, ‘বন্দে মাতরম’। মূল গানের (‘বন্দে মাতরম’) স্নিগ্ধতা এখানে নেই, ‘একসূত্রে বাঁধিয়াছি’ গানটির সঙ্গে সংগতি রেখে যুগের উদ্দীপনা ধবনিত হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’-এর পুনঃপুনঃ উচ্চারণে। ১৯০৬ সালে প্রকাশিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথ-গীত ‘বন্দে মাতরম’ গানের গ্রামোফোন রেকর্ড। বস্তুত স্বদেশী যুগে বঙ্কিমচন্দ্রের এই মন্ত্রবাণী হয়ে উঠেছিল শুধু বাংলা নয়, সমগ্র ভারতের তথা জাতির প্রাণের মন্ত্র।

তবু এই পর্বেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে ‘বন্দে মাতরম’ থেকে ভিন্ন এক স্বতন্ত্র মাতৃমূর্তির কল্পনা করেছেন। বঙ্কিমচন্দ্রের গানে দেশজননী আর জগজ্জননীতে ভেদ ছিল না কোনো; তিনি দশপ্রহরণধারিণী প্রতিমা। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ অন্তরঙ্গ স্নেহময়ী মাতা। ত্রিনেত্রর রূপকল্পনা কোনো গানে থাকলেও, তিনি দ্বিভূজা ; ঐশ্বর্যময়ী দেবী নন, দরিদ্রা। তাঁর পুরোনো দেশাত্মবোধক গানের মতো এখানে বিশেষ করে হিন্দু-সংস্কৃতির কোনো প্রকাশ নেই। দেশের মাটি মধ্যে এই যুগেই কবি দেখেন ‘বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা’।

স্বদেশী আন্দোলনের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যোগ ছিল নিবিড় ; এই কাজে বারবার তিনি লেখনী ধরেছেন। কিন্তু বোমা ও বয়কটে অবসিত আন্দোলন তাঁকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারল না, এই জগৎ থেকে তিনি সরে এলেন। গভীর দুঃখের সঙ্গে তিনি লক্ষ করেছেন, অপব্যবহারে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি ক্রমশ তার মহিমা হারাতে চলেছে ; মন্ত্র হয়ে উঠছে রাজনৈতিক প্রয়োজনের শ্লোগান। ১৯১৬ সালে ১৩ জানুয়ারি মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে লিখেছেন :

বন্দে মাতরমের নামে দেশে যে একটা দুষ্কৃতির ঢেউ উঠিয়াছে সেটার ত একটা Psychology আছে—ঘরে-বাইরে গল্পে তারই আলোচনা চলিতেছে। আমি ইচ্ছা করিয়া আগে হইতে ভাবিয়া একাজে প্রবৃত্ত হই নাই—আপনা-আপনি কেমন করিয়া আসিয়া পড়িয়াছে।

ঘরে-বাইরে উপন্যাসের নায়ক স্পষ্টই বলে :

দেশকে আমি সেবা করতে রাজি আছি, কিন্তু বন্দনা করব যাঁকে তিনি ওর চেয়ে অনেক পরে। দেশকে যদি বন্দনা করি তবে দেশের সর্বনাশ করা হবে।

মনে রাখতে হবে, এ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়, তখন রবীন্দ্রনাথের অনুভবে মুছে যাচ্ছে স্বদেশ ও বিশ্ব, স্বজাতি ও মানবজাতির বিভাজন রেখা। ‘বন্দে মাতরম’ বাণীটিকেও তিনি দেখতে চাইছেন নতুন তাৎপর্যে। আমেরিকা থেকে পুত্র রথীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন এই সময়েই (১৯১৬) :

বাংলাদেশের চিত্ত সর্বকালে সর্বদেশে প্রসারিত হোক, বাংলাদেশের বাণী সর্বজাতির সর্বজাতির সর্বমানবের বাণী হোক। আমাদের বন্দে মাতরম মন্ত্র বাংলাদেশের বন্দনার মন্ত্র নয়—এ হচ্ছে বিশ্বমাতার বন্দনা—সেই বন্দনার গান আজ যদি আমরা প্রথম উচ্চারণ করি তবে আগামী ভাবীযুগে একে একে সমস্ত দেশে এই মন্ত্র ধবনিত হয়ে উঠবে। মহাবিশ্বের পথকেই আমরা দেশ বলে গ্রহণ করব।

ভারতবর্ষে জাতীয়তাবাদের অনুপ্রেরণা, স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত এই ঐতিহাসিক গানটি যে অচিরেই হয়ে উঠবে বিতর্কের কেন্দ্র, এমন কি অনুমান করেছিলেন তিনি? স্মরণ করা যেতে পারে, সত্তর বছরের জন্মদিন উপলক্ষে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তাঁর বাণী ‘…ভাবোচ্ছ্বাসে তোমাদের সকল শক্তি নষ্ট হইতে দিয়ো না, তাহাকে কার্যে পরিণত করো। ‘বন্দে মাতরম’ যথেষ্ট হইয়াছে, এখন ‘বন্দে মাতরম’ স্থানে ‘বন্দে মাতরম’ বল।’ অদূর ভবিষ্যতে অনিবার্য ভ্রাতৃবিরোধ বোধকরি কল্পনায় দেখেছিলেন দূরদর্শী কবি, যে বিভেদের সূচনা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন স্বদেশী যুগেই। ১৯০৫ সালে মহাসমারোহে পালিত হল রাখীবন্ধন উৎসব, কিন্তু সংগতকারণেই বহুসংখ্যক মুসলমান এই উৎসবে যোগ দিলেন না, এই বাস্তব ঘটনাটি কবিকে উদ্বিগ্ন ও ব্যথিত করেছিল। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন :

মানুষকে যদি চাই তবে যথার্থভাবে মানুষের সাধনা করিতে হইবে ; …সে যখন বুঝিবে আমি তাহাকে আমার অনুবর্তী অধীন করিবার জন্য বলপূর্বক চেষ্টা করিতেছি না, আমি নিজেকে তাহারই মঙ্গল সাধনের জন্য উৎসর্গ করিয়াছি, তখনই সে বুঝিবে, আমি মানুষের সঙ্গে মনুষ্যোচিত ব্যবহারে প্রবৃত্ত হইয়াছি ; তখনই সে বুঝিবে, ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের দ্বারা আমরা সেই মা’কে বন্দনা করিতেছি দেশের ছোটোবড়ো সকলেই যাঁহার সন্তান।

প্রত্যাশিত সেই সাধনার যথার্থ প্রয়াস কি হয়েছিল কখনও?

১৯৩৭ সালে জাতীয় সংগীত বা national anthem প্রসঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ সম্পর্কে সাম্প্রদায়িক মুসলমান ও জাতীয়তাবাদী হিন্দুদের অনমনীয় মনোভাবের কথা সকলেই অবহিত আছেন। প্রকাশ্য জনপথে আনন্দমঠ পুড়িয়ে ফেলা, একপক্ষের সেই ক্ষোভের উগ্র অভিব্যক্তি। বার্ধক্য ও শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও রবীন্দ্রনাথ এই বিতর্কে বা দ্বন্দ্বে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এই সময়ে তাঁর লেখা প্রাসঙ্গিক তিনটি চিঠির অংশবিশেষ স্মরণ করা যেতে পারে।

প্রথমটি লিখেছিলেন সুভাষচন্দ্র বসুকে, ১৯৩৭ সালের ১৯ অক্টোবর তারিখে। ‘বন্দে মাতরম’ গানের কেন্দ্রস্থলে আছে দুর্গার স্তব এ কথা এতই সুস্পষ্ট যে এ নিয়ে তর্ক চলে না। অবশ্য বঙ্কিম এই গানে বাংলাদেশের সঙ্গে দুর্গাকে একাত্ম করে দেখিয়েছেন, কিন্তু স্বদেশের এই দশভূজা মূর্তিরূপের যে পূজা সে কোনো মুসলমান স্বীকার করে নিতে পারে না। …আনন্দমঠ উপন্যাসটি সাহিত্যের বই, তার মধ্যে এই গানের সুসঙ্গতি আছে। কিন্তু যে রাষ্ট্রসভা ভারতবর্ষের সকল ধর্মসম্প্রদায়ের মিলনক্ষেত্র সেখানে এ গান সর্বজনীনভাবে সঙ্গীত হতেই পারে না। বাংলাদেশের একদল মুসলমানের মধ্যে যখন অযথা গোঁড়ামির জেদ দেখতে পাই তখন সেটা আমাদের পক্ষে অসহ্য হয়। তাদের অনুকরণ করে আমরাও যখন অন্যায় আব্দার নিয়ে জেদ করি তখন সেটা আমাদের পক্ষে লজ্জার বিষয় হয়ে ওঠে।’

দ্বিতীয়টি সেই বিখ্যাত চিঠি, তারিখ ২৬ অক্টোবর ১৯৩৭, কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সভাপতি জওহরলাল নেহরুকে লেখা :

An unfortunate controversy in raging round the question of suitability of ‘Bande Mataram’ as national song…..I freely concede that the whole of Bankim’s Bande Mataram’ poem and together with its context is liable to be interpreted in ways that might wound Moslem susceptibilities, but a national song though derived from it which has spontaneously come to consist only the first two stanzas of the original poem, need not remind us every time of the whole of it, much less of the story with which it was accidentally associated. It has acquired a separate individuality and an inspiaring significance of its own in which I see nothing to offend an sect or community.

সম্ভবত এই অভিমত অনুসারেই দীর্ঘ আলোচনার পর ওয়ার্কিং কমিটির পক্ষ থেকে ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রথম দুই স্তবক জাতীয় সভা-সমিতিতে গাইবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। তবে, স্বাধীনতা আন্দোলনে এই বন্দনাগীতিটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব স্বীকার করার সঙ্গে সঙ্গে ‘মুসলমান বন্ধু’দের আপত্তিও যে যুক্তিসংগত এবং কংগ্রেস যে কখনো এই গান বা কোন গানকেই ভারতের ‘জাতীয় সঙ্গীত’ হিসেবে স্বীকার করেনি, একথাও জানানো হল। [ দ্র. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৯ অক্টোবর ১৯৩৭ ] সিদ্ধান্ত প্রকাশের পরের দিন, ৩০ অক্টোবর ১৯৩৭ আনন্দবাজার পত্রিকা-য় রবীন্দ্রনাথের বিবৃতিরূপে মুদ্রিত হল ২৬ অক্টোবর তারিখে জওহরলাল নেহরুকে লেখা চিঠির মর্মার্থ। এই সিদ্ধান্তের সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠলেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা, পত্রিকায় লেখা হল :

…’মুসলিম বন্ধুদের আপত্তি’—অপ্রকাশ্য গোপন আপত্তি পূরণ করিবার জন্য এবং ভারতের সর্ববিধ ধর্মসম্প্রদায়ের বুক হইতে বেদনা-শল্য তুলিয়া লইবার জন্য এত পরামর্শ, এত দুশ্চিন্তা—এমন কি বৃদ্ধ কবিবরের সার্টিফিকেট সংগ্রহ করিবার পরও, তাঁহাদের পছন্দসই অংশটুকুকে প্রত্যেক জাতীয় সম্মেলনে এবং কংগ্রেসে আবশ্যিক জাতীয় সংগীতরূপে গ্রহণ করিবার পরামর্শ দিলেন না কেন?

রবীন্দ্রনাথও যথেষ্ট সমালোচিত এবং নিন্দিত হলেন ; এমনকি তাঁর অনুরাগী ঘনিষ্ঠ বন্ধুজনও ভিন্ন মত পোষণ করে লেখনী ধরলেন। পত্রিকায় লেখা হল :

বঙ্কিমচন্দ্রের রচনায় হস্তক্ষেপ অনুমোদন করিয়া রবীন্দ্রনাথ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করিয়াছেন, তাহার কুফল যে শেষ পর্যন্ত তাঁহার উপরে আসিয়াও বর্তাইতে পারে ইহা সম্ভবত তিনি ভাবিয়া দেখেন নাই।

[আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ নভেম্বর ১৯৩৭]

এই প্রসঙ্গে হয়তো উল্লেখ করা অসংগত হবে না যে, রবীন্দ্রনাথ-রচিত ভারতবর্ষের national anthem টিও এখন খণ্ডিতভাবে শুধু প্রথম স্তবকই সর্বত্র গাওয়া হয়।

বর্তমান প্রসঙ্গে উল্লিখিত রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় চিঠিটির প্রাপক তরুণ লেখক বুদ্ধদেব বসু। তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘গান না শ্লোগান’ প্রবন্ধ উপলক্ষ্যে কবি জানিয়েছেন :

…ভারতবর্ষে ন্যাশনাল গান এমন কোনো গান হওয়া উচিত যাতে একা হিন্দু নয় কিন্তু মুসলমান খ্রীষ্টান—এমন কি ব্রাহ্মও শ্রদ্ধার সঙ্গে ভক্তির সঙ্গে যোগ দিতে পারে। তুমি কি বলতে চাও, ‘ত্বং হি দুর্গা’, ‘কমলা কমলদলবিহারিণী বাণী বিদ্যাদায়িনী’ ইত্যাদি হিন্দু নামধারিণীদের স্তব, …সর্বজাতিক গানে মুসলমানদের গলাধঃকরণ করাতেই হবে। হিন্দুর পক্ষে ওকালতি হচ্ছে ওগুলো আইডিয়ালমাত্র। কিন্তু যাদের ধর্মে প্রতিমাপূজা নিষিদ্ধ তাদের কাছে আইডিয়ার দোহাই দেবার কোনো অর্থই নেই।

জাতীয় সংগীত প্রসঙ্গে আবেগময় উত্তেজনা, উত্তপ্ত বিতর্কের সেই দিনগুলি থেকে আজ আমরা প্রায় সাত দশক দূরে। মনে হয়, সেদিন জাতীয় সংগীতের সমস্যার চেয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে বড়ো হয়ে দাঁড়িয়েছিল হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা। বঙ্গভঙ্গ-প্রতিরোধের মিলনোৎসব যে সর্বার্থ আন্তরিকতায় সফল হয়ে উঠতে পারেনি, সেই বেদনাদায়ক স্মৃতিই কি তাঁকে সতর্ক করেছিল? সতর্ক করেছিল দীর্ঘকাল ধরে হিন্দু-মুসলমানের সম্পর্কহীনতার, মানসিক বিচ্ছেদের টুকরো-টুকরো অভিজ্ঞতা? আশঙ্কা হচ্ছিল, জাতীয় সংগীতের সমস্যা থেকেই হয়তো বেধে উঠবে এক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা? সুভাষচন্দ্র বসুকে ‘বন্দে মাতরম’ বিষয়ে যে ব্যক্তিগত চিঠি লিখেছিলেন, পরিশেষে যুক্ত করেছিলেন এই কথাগুলি : ‘বাঙালি হিন্দুরা এই আলোচনা নিয়ে চঞ্চল হয়েছেন, কিন্তু ব্যাপারটি একলা হিন্দুর মধ্যে বদ্ধ নয়। উভয়পক্ষেই ক্ষোভ যেখানে প্রবল সেখানে অপক্ষপাত বিচারের প্রয়োজন আছে। রাষ্ট্রীয় সাধনায় আমাদের শান্তি চাই, ঐক্য চাই, শুভ বুদ্ধি চাই,—কোনো এক পক্ষের জিদকে দুর্দম করে হারজিতের অন্তহীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা চাই নে।’ রবীন্দ্রনাথের ভাবনাকে স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন সুভাষচন্দ্র।

রবীন্দ্রনাথের হয়তো স্বপ্ন ছিল, সাম্প্রদায়িকতামুক্ত এক ধর্মরাজ্য হয়ে উঠবে অখণ্ড ভারতবর্ষ, শুধু মানুষ-পরিচয়েই পরস্পর মেলাবেন হাত, কণ্ঠ মেলাবেন সকলে এক সংগীতে।

[ সাহিত্য একাডেমি সভাঘরে আলোচনাচক্রে পঠিত ]

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *