‘বন্দে মাতরম’ ও বাংলার যাত্রাপালা
প্রভাতকুমার দাস
প্রয়াণের ‘দুই-চারি বৎসর পূর্বে’ বঙ্কিমচন্দ্রকে তাঁর অত্যন্ত আদরের জ্যেষ্ঠা কন্যা শরৎকুমারী জানিয়েছিলেন, ‘বন্দে মাতরম’ গানটি লোকের তেমন পছন্দ নয়, এমনকী তাঁর নিজেরও ততটা নয়। মহাপুরুষ-স্রষ্টা স্বয়ং এ তথ্যে খুশি হননি, গম্ভীর বদনে বলেছিলেন : ‘একদিন দেখিবে—বিশ ত্রিশ বৎসর পরে একদিন দেখিবে, এ গান লইয়া বাঙলা উন্মত্ত হইয়াছে—বাঙালি মাতিয়াছে।’ আলোচ্য গানটির ভবিষ্যৎ বিষয়ে বঙ্কিমচন্দ্র যে অত্যন্ত আত্মপ্রত্যয় অনুভব করতেন তা আরো কয়েকটি ঘটনায় প্রমাণিত। যেমন বঙ্গদর্শন মুদ্রণকালে, পত্রিকার কার্যাধ্যক্ষ কাঁঠালপাড়া নিবাসী পণ্ডিত রামচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় পৃষ্ঠা পূরণের প্রস্তাবে যখন টেবিলে পড়ে থাকা একখণ্ড কাগজে লেখা ‘বন্দে মাতরম’-এর পাণ্ডুলিপিটি, বিলম্বে কাজ বন্ধ না রেখে ছেপে দিতে চান ‘উহা মন্দ নয় ত’ মন্তব্যে—তখন বঙ্কিমচন্দ্র বিরক্ত হয়ে টেবিলের দেরাজে নিরাপদ যত্নে সেটি গচ্ছিত রেখে বলেছিলেন ; ‘উহা ভাল কী মন্দ, এখন তুমি বুঝিতে পারিবে না, কিছুকাল পরে উহা বুঝিবে আমি তখন জীবিত না থাকিবারই সম্ভব, তুমি থাকিতে পার।’ পণ্ডিত রামচন্দ্র সম্পর্কে অন্যতর যে তথ্যটি প্রচারিত, সেটির প্রবক্তা দীনবন্ধু মিত্রের পুত্র ললিতচন্দ্র মিত্র, তিনি বলেছেন : ‘বঙ্কিমচন্দ্রের গৃহে তদানীন্তন ‘সুকণ্ঠ গায়ক ভাটপাড়ার স্বর্গীয় যদুনাথ ভট্টাচার্য সুরতাল সংযুক্ত করে প্রথম গেয়েছিলেন। সেদিন উপস্থিত রামচন্দ্রের কাছে ‘গান যাহাই হউক, বন্দেমাতরম দ্বারা বঙ্গদর্শনের পেট ভরিবে না,’ বরং তিনি একখানি উপ্যাস লিখতে আরম্ভ করুন—এই মন্তব্যে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন :
এ গানের মর্ম তোমরা এখন বুঝিতে পারিবে না ; যদি পঁচিশ বৎসর জীবিত থাক, তখন দেখিবে, এই গানে বঙ্গদেশ মাতিয়া উঠিবে।
‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের প্রথম রচনাকাল নিয়ে বিতর্কের প্রসঙ্গ উত্থাপন না করেও বলা যায়, আলোচ্য সংগীত সম্পর্কে বঙ্কিমচন্দ্র যে গভীর বিশ্বাস পোষণ করতেন তা বাস্তবে সত্যে পরিণত হয়েছিল। ১৩০০ বঙ্গাব্দের ২৬ চৈত্র রবিবার ৫৫ বৎসর ৯ মাস ১৪ দিন বয়সে ‘ক্ষণভঙ্গুর দেহ’ ত্যাগ করে ‘মহামহিমময়লোকে প্রস্থান করা’র পর বছর দশেকের মধ্যেই এই গান দেশমাতৃকার উদ্ধারে বিপুল উন্মাদনা সৃষ্টি করেছিল। ‘একদিন না একদিন ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র বাঙালীর কণ্ঠে কণ্ঠে ভক্তিপূর্বক ধবনিত হইয়া বাঙলায় নতুন জীবন আনিবে—নতুন শক্তি সঞ্চারিত করিবে’—শচীশচন্দ্র-কথিত বঙ্কিমচন্দ্রের এই দৃঢ়-বিশ্বাস তাঁর মানসভূমিতে লালিত আত্মপ্রত্যয় থেকে উৎসারিত। ১২৮৭ থেকে ৮৯ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত বঙ্গদর্শন-এ আনন্দমঠ-এর ধারাবাহিকভাবে প্রকাশের সময় থেকে হিসেব করলে পরবর্তী পঁচিশ বছর পূর্ণ করেই তার প্রবল বিস্তার পরিলক্ষিত হয়েছিল, ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের উত্তাল পর্বে। ব্রিটিশ রাজশক্তির অত্যাচার ও বিভেদ নীতির বিরুদ্ধে দলমত সংগঠনের কাজে যেসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপক প্রচারের দায়িত্ব পালন করেছিল—তার মধ্যে যাত্রাগানের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ্য। দেশের অসংখ্য নিরক্ষর কৃষিজীবী-শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে এই লোকজ নাট্যমাধ্যমের প্রসার ও জনপ্রিয়তা, সে-যুগের স্বদেশি আন্দোলনকালে চারণকবি মুকুন্দদাসের রচিত, গীত ও অভিনীত পালাতেই সুদূরপ্রসারী তীব্রতা পেয়েছিল। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, সেই বাঙালির মধ্যে ঐক্য ও স্বাদেশিকতার পরোক্ষ প্রচার প্রথম দেখা দিয়েছিল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে তখনকার জনপ্রিয় পালাকার মতিলাল রায়ের পালায়, যিনি তাঁর নিজস্ব দল নবদ্বীপ বঙ্গ গীতাভিনয় প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলার যাত্রাগানে নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন।
বঙ্কিমচন্দ্রের কাঁঠালপাড়ার ভদ্রাসনে রাধাবল্লভের আটচালায় রথের সময় যাত্রাকীর্তনের জমজমাট আদর বসত। বঙ্কিমচন্দ্র যাত্রা দেখতে ভালো না বাসলেও, গান শুনতে বড়ো আগ্রহী ছিলেন। শচীশচন্দ্র জানিয়েছেন :
শিশুপালকে বধ করিয়া শ্রীকৃষ্ণ যে আসরের মধ্যে বসিয়া কলিকা টানিবে ইহা তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। অথবা দ্রৌপদীর বস্ত্র-হরণ হইতেছে, এমন সময় দ্রৌপদী যে বেহালার সঙ্গে সুর মিলাইয়া তড়াক তড়াক করিয়া নাচিতে থাকিবে, ইহা তিনি বরদাস্ত করিতে পারিতেন না।
সেজন্য তিনি আসরে না বসে, দূরে বৈঠকখানায় বসে গান শুনতেন। তবে তথ্য হিসেবে এ ঘটনাও উল্লেখ্য, কাঁঠালপাড়ায় বঙ্কিমচন্দ্র একবার একটি অপেরা সম্প্রদায় সংগঠন করেছিলেন। আত্মীয়স্বজন ছাড়া বড়ো একটা অপর কাউকে সে দলে নেননি—তবে সেটি গঠিত হতে না হতেই অকালে অনন্তগর্ভে মিলিয়ে গিয়েছিল। তিনি কীর্তনের প্রতি অনুরাগ পেয়েছিলেন পিতা যাদবচন্দ্রের কাছ থেকে। রথযাত্রা উপলক্ষ্যে যাত্রানুষ্ঠানে আটদিনের মধ্যে গোবিন্দ অধিকারীর যাত্রা চারিদিন, মতি রায়ের দুই দিন ও অপরাপরের জন্য বাকী দুই দিন নির্দিষ্ট থাকিত।’ তাঁর মধ্যমাগ্রজ সঞ্জীবচন্দ্র শুধু যাত্রানুরাগী ছিলেন না, বঙ্গদর্শন পত্রিকায় তাঁর লেখা একাধিক প্রবন্ধ বাংলার যাত্রাগানের চর্চায় সময়োপযোগী মূল্যবান বিশ্লেষণ হিসেবে মুদ্রিত হয়েছিল।
যাত্রার আসরে পৌরাণিক পালার ভিতর দিয়ে পরোক্ষে স্বদেশ প্রেমের প্রচার ও স্বাধীনতার বিষয়ে মনোযোগী করে তুলতে প্রথম সচেষ্ট হয়েছিলেন মতিলাল। পরবর্তীকালে তাঁর মধ্যম পুত্র ভূপেন্দ্রনারায়ণ এবং চারণকবি মুকুন্দদাস তাঁর আদর্শ মাথায় রেখেই নিজেদের পালা উপস্থাপনায় অভিনবত্ব প্রদর্শনে মনোযোগী হয়েছিলেন। ভূপেন্দ্র সম্পর্কে হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য বলেছেন—’ভূপেন্দ্র ছিলেন স্বদেশি মনোভাবাপন্ন। স্বদেশ প্রেমের বীজ মতিলালই রোপণ করেছিলেন।’ নিজের শরীর ছাড়াও স্থানীয় যুবকদের শক্তিমান করে গড়ে তুলতে তিনি ‘তারা সমিতি’ গঠন করেছিলেন, যুবকদের শরীরচর্চার পাশাপাশি লাঠি খেলা, সড়কি খেলা, তলোয়ার খেলা, ছোরা খেলা শেখাতেন। তাঁর ক্লাবঘরে সারি সারি অস্ত্র ঝোলানো থাকত।
ভূপেন্দ্রনারায়ণ গত শতকের তিরিশের দশকে মতি রায়ের যাত্রা তথা নবদ্বীপ বঙ্গ গীতাভিনয় তুলে দেওয়ার আগে মহাভারতের সূর্যকন্যা তপতীর সঙ্গে পুরুবংশীয় রাজা সংবরণের পরিণয় কাহিনি অবলম্বনে ‘তপতী সংবরণ’ গীতাভিনয়ের মধ্য দিয়ে অনেকটা আনন্দমঠ-এর মতোই অভিরাম স্বামীর শিষ্য কৃতবর্মার নেতৃত্বে এক বিশাল সন্ন্যাসী সম্প্রদায়ের কীর্তি কাহিনিকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। যে-সন্ন্যাসীরা সেবাব্রতে দীক্ষিত হলেও দেশরক্ষার জন্য অস্ত্রচালনাতেও অভ্যস্থ। ভারতমাতার মহিমা কীর্তন করে সাধারণ দর্শকদের মধ্যে ভূপেন্দ্রনারায়ণ যে পথ প্রদর্শন করেছিলেন তার অন্তঃপ্রেরণায় মতিলাল থাকলেও, বহিরঙ্গের আয়োজনে মুকুন্দদাসের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের ভাবধারার অনুবর্তন মুকুন্দদাস যে গভীর উপলব্ধির মধ্যে গ্রহণ করেছিলেন, উত্তরকালের ভূপেন্দ্রনারায়ণ রায়, কুঞ্জবিহারী গঙ্গোপাধ্যায়, ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ ও ব্রজেন্দ্রকুমার দে প্রমুখ পালাকারদের মধ্যে তা অনুস্যূত হয়েছিল।
‘আগ্নেয়গিরির অগ্রিস্রাবের মতো’ মহাত্মা অশ্বিনীকুমার দত্তের ওজস্বিণী ভাষার অগ্নিবর্ষণ আর সহস্রকণ্ঠে গীত মনোমোহন চক্রবর্তী রচিত ‘বল সিংহনাদে জয় জয় রবে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের ‘গভীরম’ মন্ত্র শুনে বরিশালে যে বিপুল জনজাগরণ সংগঠিত হয়েছিল তারই ফল হিসেবে চারণকবি মুকুন্দদাসের আবির্ভাব। তিনি মতিলালের যাত্রারীতির জনপ্রিয় বক্তৃতা তাঁর যাত্রা প্রকরণে নতুন করে প্রবর্তন করেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শী রাজ্যেশ্বর মিত্র অনুমান করেছিলেন :
বরিশালের স্বনামধন্য হেম-কবি (হেমচন্দ্র মুখোপাধ্যায়) যখন অসামান্য কথকতা করতেন, তার কোনো কোনো স্টাইলও হয়তো সেখানকার যজ্ঞেশ্বরের (মুকুন্দদাসের আসল নাম) অভিনয়নৈপুণ্যে সংযোজিত হয়ে থাকতে পারে।
তার ওপরে বর্তমান বক্তার ধারণা অহীভূষণ ভট্টাচার্য যে দিবদাসরূপী বিবেক সৃষ্টি করেছিলেন ‘সুরথ উদ্ধার’ পালায়, বিংশ শতাব্দীর শুরুতে তার সাংগীতিক বৈশিষ্ট্যও মুকুন্দদাস নিজস্বরীতির আবিষ্কারের কাজে লাগিয়েছিলেন। সর্বোপরি বীর সন্ন্যাসী বিবেকানন্দের পরিধান বা আনন্দমঠ-এর সন্তানদলের অনুকরণে গৈরিক পাগড়ি ও আলখাল্লা পরা তাঁর অতি সাধারণ বেশ, আসরে আসরে যাত্রাদর্শকদের মধ্যে এক উন্মাদনা সৃষ্টি করত। সাদা পোশাকের যাত্রা হিসেবে অভিহিত তাঁর সৃষ্ট স্বদেশি দল তাঁর উদাত্তকণ্ঠে তাঁর সংগীত-সংলাপ-বক্তৃতায় মুখর যাত্রার মুগ্ধ শ্রোতাদর্শক ছিলেন হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই স্বদেশানুরক্তরা। তাঁর জাগরণের গানে সাধারণ মুসলমানেরা এতটাই উদ্দীপিত হতেন যে মুকুন্দদাসের গান গাইতে গাইতে তাঁরা রাস্তা হাঁটতেন। ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে রচিত গীত ‘মাতৃপূজা’ পালার অভিনয় এমনই জনপ্রিয় হয়েছিল যে ব্রিটিশ সরকার তাঁর অনুষ্ঠানের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন। তা সত্ত্বেও নানা কৌতুককর খেলায় সেসব নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাংলার গ্রামে গঞ্জে নগরে শহরে ঘুরে ঘুরে তাঁর যাত্রা পরিবেশন করতেন।
আমাদের দুর্ভাগ্য ‘মাতৃপূজা’ নামে যে পালাভিনয়ের জন্য তাঁকে গ্রেপ্তার ও পরে তিনশো টাকা জরিমানাসহ তিনবছরের সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়, সেই পালার পাণ্ডুলিপি তো দূরের কথা প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় বিষয়বস্তু, কাহিনি, সংলাপ কিংবা অভিনয়ের তথ্যপূর্ণ বিবরণ কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। শুধু ‘মাতৃপূজার গান’ সংকলনটি বাজেয়াপ্ত হলেও, যে গানটিতে ‘কাঁধে সাদা ভূত চেপেছে একদম দফা সারলে’ বা ‘ছিল ধান গোলা ভরা, শ্বেত ইঁদুরে করল সারা’ পঙক্তিতে স্পষ্টত যে ইংরেজকে কটাক্ষ করা হয়েছে, সেটির কারণেই তিনি যে অভিযুক্ত হয়েছিলেন তা জানা গেছে। সরকারি বিশেষজ্ঞদের চোখে অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত এই গানেরই একটি অংশে তিনি বলেছিলেন :
বন্দেমাতরম বাজাও ডঙ্কা, জাগুক ভাই সকলে
দেখে মুকুন্দ ডুবে যাক আজ
প্রেমময়ীর প্রেম সলিলে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তাঁর গানের মুগ্ধ শ্রোতারা পরিবেশনকালে করতালি আর ‘বন্দে মাতরম’ ধবনিতে তাঁকে উৎসাহিত করতেন। এমনকী ১২৪(ক) আইনে রাজদ্রোহের অপরাধে যেদিন তাঁকে রাজপথে গ্রেপ্তার করা হয়, সেদিনও দূরে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি দিয়ে তাঁর অনুরাগীরা বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন।
বিচারের রায় অনুযায়ী বাংলার জেলে রাখা নিরাপদ হবে না বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত মুকুন্দদাসকে দিল্লি পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে মার্চ অথবা এপ্রিল মাসে তিনি কারামুক্তির পর কলকাতা হয়ে বরিশাল ফিরে এসে দেখলেন তাঁর অবর্তমানে স্ত্রীবিয়োগ ছাড়াও সংসারের দারিদ্র্যে বাবা-মায়ের অবস্থা করুণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই অবস্থায় তিনি প্রথমে মুদির দোকান খুলে আর্থিক পূর্বাবস্থা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হয়ে পুনরায় দল গঠনে মনোযোগী হন। বাজেয়াপ্ত মাতৃপূজা’র উপর নিষেধাজ্ঞা নিশ্চয় তখনো প্রত্যাহৃত হয়নি—তবে উত্তরকালে অনেকেই পালার নামকরণ ‘মাতৃপূজা’ করলেও, মুকুন্দদাস আর সে চেষ্টা করেননি। বরং গিরিশচন্দ্রের ‘বলিদান’ অনুকরণে তিনি ‘সমাজ’ নামে একটি পালা লিখে নতুন করে পুনরায় যাত্রা আসরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু চৌদ্দবছর পরে লেখা ‘পল্লীসেবা’ নাটকের প্রস্তাবনা দৃশ্যে পূজারি চরিত্রের কণ্ঠ দিয়ে শ্যামামায়ের উদ্দেশ্যে গান পরিবেশিত হলেও তার বস্তৃতা অংশে তিনি উচ্চারণ করেছেন ‘বন্দে মাতরম’-এরই আবাহন মন্ত্র। পূজারীর দীর্ঘ গদ্য বত্তৃ�তায় বলা হয়েছে :
বাঙলায় আজ যে ঘোর অমানিশা। রাজরাজেশ্বরী—এসো মা, আজ সপ্তকোটি বাঙালির ভগ্ন-হৃদয়ে তোমার ভৈরবী মূর্তি নিয়ে।…সৃষ্টি করো বাঙলায় আজ এক নতুন বীর জাতি, দেও তাদের নতুন প্রাণ, নবভাবে নবোদ্দীপনায় অনুপ্রাণিত হয়ে করুক তারা পতিগৃহে তোমার শারদীয় উৎসবের মঙ্গল-ঘট স্থাপনা। বাজুক দামামা, কাড়া, ঘন্টা, ঢোল, শঙ্খ, করতাল, জয়ডঙ্কা, খোল, নাচুক ধমনী শুনিয়ে সে রোল ; সপ্তকোটি কণ্ঠ-কলকল-নিনাদে বিশ্ববিকম্পিত করে বাঙালি করুক তোমার বিজয়বার্তা ঘোষণা। দেও তাদের বাহুতে শক্তি, হৃদয়ে ধর্মের তেজ, প্রাণে নতুন প্রেরণা, জয়োল্লাসে মাতৃগরবে গর্বিত বাঙালি করুক তোমার পূজার বেদী রচনা ; বীরচারী বাঙালি বীরাচারে করুক তোমার জগন্ময়ী রূপের বিরাট আয়োজন।
এ ছাড়াও নাটকটির শেষাংশে সেবকের কণ্ঠে একপ্রস্থ ‘বন্দে মাতরম’-ধুয়া সংবলিত গান গীত হয়েছে যার প্রথম স্তবক :
জাগো ভারতবাসীরে
কত ঘুমে রবেরে,
বল সবে হয়ে একমন
বন্দেমাতরম।
আর শেষ হয়েছে মেয়েদের গান দিয়ে ;
বল ভাই মেতে যাই বন্দেমাতরম
বন্দেমাতরম, বন্দে মাতরম, বন্দেমাতরম।
ভারত সন্তান, নিয়ে মায়ের নাম,
হও আগুয়ান, নাচবে এ প্রাণ
নাম মধুরম ;
বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম।
নাম গানে, এ মরা প্রাণে,
জ্বলেছে আগুন, আগুন জ্বলিবে দ্বিগুন
নামই রুদ্রম।
বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম।
আসবে প্রাণে বল, মায়ের নাম কর সম্বল,
দেল দরিয়ায় উঠবে তুফান,
মন্ত্র গভীরম ;
বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম, বন্দেমাতরম।
মুকুন্দদাস তাঁর বন্ধু বিধুভূষণ বসুর লেখা দীনবন্ধু নাটকটিকে ‘ব্রহ্মচারিণী’ রূপে প্রস্তুত করেছিলেন বলে কেউ কেউ অনুমান করেছেন। সে নাটকের শেষে ছদ্মবেশী মা গৃহস্থ প্রজা দীনবন্ধুর ঘরে এসে বাগান ভরা ফুল আর বুক ভরা ভক্তি দিয়ে দুর্গোৎসব করার পরামর্শ শুনিয়েছেন। মাটির প্রতিমার পরিবর্তে খাঁটি প্রতিমার আবির্ভাবে পালাটি শেষ হয়েছে।
মুকুন্দদাস ‘বন্দে মাতরম’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন তাঁর বহুশ্রুত ‘ফুলার—আর কি দেখাও ভয়?’ প্রথম পঙক্তি সংবলিত গানটিতে। তাঁর শেষ চার পঙক্তিতে বলেছেন:
বন্দেমাতরম মন্ত্র কানে,
বর্ম এঁটে দেহে মনে।
রোধিতে কী পারবে রণে—
তুমি কত শক্তিময়।
‘বন্দে মাতরম’ বলে উদাত্ত কণ্ঠে উদ্দাম নৃত্য করবার আহ্বান, দামামা, কাড়া, ঘন্টা, ঢোল, শঙ্খ, করতাল, জয়ডঙ্কা খোল বাজিয়ে যে শক্তির প্রকাশ—তার একটা বীরোদাত্ত রূপটি জনমানসে নতুন উন্মাদনা সৃষ্টি করত, যে জন্যে হয়তো মামলার সওয়াল জবাবের সময় সরকার পক্ষের উকিল নলিনীভূষণ গুপ্ত তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন : ‘His motion and posture more than sadition of his language.’
২
বাবু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের বিবরণ থেকে জানা যায়, কোনো এক সন্ধ্যায় সাহিত্যসেবীদের সমাগমে নবীনবাবু কথায় কথায় আনন্দমঠ-এর সুপরিচিত ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীতটির একাংশ আবৃত্তি করে বঙ্কিমচন্দ্রকে বলেছিলেন : ‘এমন ভালো জিনিসটিকে আধ সংস্কৃত আধ বাঙলায় লিখিয়া মাটি করা হইয়াছে ; এ যেন গোবিন্দ অধিকারীর গানের মতো। লোকের ভাল লাগে না।’ ঈষৎ কুপিত স্বরে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর জবাব দিয়েছিলেন : ‘আচ্ছা ভাই, ভাল না লাগে পড়ো না। আমার ভাল লেগেছে, তাই ওরকম লিখিছি। লোকের ভাল লাগে কিনা ভেবে আমি লিখব!’ আসলে গোবিন্দ অধিকারীর কীর্তনের ভক্ত হয়েও কিংবা কোনো এক রথযাত্রার সময় পশ্চিমপ্রদেশবাসী কোনো বন্ধু-অতিথিকে গোবিন্দ অধিকারীর প্রেমার্দ্র কণ্ঠে গলদশ্রুলোচনে শ্রীরাধার মানভঞ্জন শোনার পর ‘এমন সঙ্গীত আমি কখনও শুনি নাই’ বলে কাঁদতে দেখলেও,—তাঁর রচনার সঙ্গে একজন যাত্রাওয়ালার প্রতি তুলনায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি বঙ্কিমচন্দ্র।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, নবীনচন্দ্র একবার কলকাতায় বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তদানীন্তন সাহিত্যের অবনমনের কথায় বলেছিলেন :
আপনি বঙ্গসাহিত্যের একমেটে সরস্বতীকে বটতলার ধূলা কাদা ও পূতিগন্ধময় হইতে উদ্ধার করিয়া, এবং দোমেটে করিয়া, অমল শুভ্র বর্ণে ও বহুমূল্য আভরণে সজ্জিত করিয়া, শত-শোভাপূর্ণ-সহস্রদলে স্থাপিত করিয়াছিলেন, এবং তাহার প্রাণ প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। এখন বঙ্গসাহিত্য আবার সেই ‘কি মজার শনিবার,’ ‘হদ্দ মজার রবিবার’ সাহিত্যের দিকে গড়াইতেছে। আপনি কেমন করিয়া চাহিয়া আছেন?
চিন্তাযুক্ত বিষণ্ণ মুখে বঙ্কিমচন্দ্র এই অভিযোগের যথার্থ স্বীকার করে বলেছিলেন : ‘নাতি। ‘গড়াইতেছে’ কেন, গড়াইয়াছে বল। সত্যই আমার যে বটতলা হইতে তুলিয়াছিলাম, বঙ্গ সাহিত্য আবার সেই বটতলায় গিয়াছে।’ আসলে বর্তমানে বটতলার অস্তিত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হলেও ঊনবিংশ শতক কেন, বিশ শতক পেরিয়ে আজকের একবিংশ শতকেও সাহিত্যের কোনো অধোগতির মান ও রুচি নির্ধারণে বটতলার তুলনাতেই শিক্ষাভিমানী ভদ্রসমাজ অভ্যস্থ। সময়াভাবে প্রসঙ্গটির বিস্তার স্থগিত রেখে, অন্তত তথ্যের জন্য উল্লেখ করা যায়—বিগত বিশ শতকের প্রথমার্ধ থেকেই বাঙালির জনজীবনে বিনোদন ও জাগরণের ক্ষেত্রে বটতলার সংলগ্ন যাত্রা পাড়ার ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। বিশেষ করে, শুরু থেকে পরবর্তী একটানা সাতটি দশকে, যাত্রাপালার বিবর্তনের ধারাবাহিক ইতিহাসটি পর্যালোচনা করলে আমরা বুঝতে পারব, পর্বে পর্বে কত শক্তিমান পালাকারের আবির্ভাবে যাত্রাপালার সাহিত্য নিয়ন্ত্রিত হয়েছে। একথা অস্বীকার করা যায় না, রুচিগত দিক থেকে, সমসাময়িক দর্শক-শ্রোতাদের মন জোগানের রশদই তাদের পরিবেশন করতে হয়েছে, কিন্তু দশকে-দশকে এমন কৃতী মানুষও যাত্রাসেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন যাঁদের তুল্য মনীষী সাহিত্য সংস্কৃতির ভিন্ন ধারাতেও অপ্রতুল বিবেচিত হবে। যাঁরা দেশের প্রয়োজনে সাধারণের মন জাগাতে চেয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রগণ্য ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করতে হয় ব্রজেন্দ্রকুমার দে-র নাম, যাঁর একাগ্র চেষ্টায় বাংলার যাত্রাগান সময়োপযোগী সুপরিকল্পনায় যথার্থ আধুনিকতার পথেই বিবর্তিত হয়েছে।
জন্মসালের হিসেবে বর্তমান বর্ষটি তাঁর শতবর্ষ হিসেবে চিহ্নিত। ১৯০৭-এর ১ ফেব্রুয়ারি তিনি তদানীন্তন পূর্ববঙ্গে এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও, কলকাতায় ছাত্রজীবন কেটেছে—প্রবেশিকা থেকে প্রতিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে, অর্থনীতিতে এম. এ. পাস করেও জীবনে শিক্ষকতা বৃত্তের বাইরে যাননি। কর্মজীবনে বেশি সময় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদে কাজ করলেও অবসর সময়ে যাত্রাপালা রচনাকেই ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৩০-৩১ থেকে শুরু করে ১৯৭৬-এ তাঁর প্রয়াণের বছর পর্যন্ত দীর্ঘসময়ে প্রায় একশো পঁয়ত্রিশটি পালা অভিনীত হয়েছে পেশাদার যাত্রায়—এবং সেগুলির মধ্যে কোনো কোনোটি যাত্রাগানের ঐতিহাসিকতায় এক একটি মাইল ফলক হিসেবে চিহ্নিত। বঙ্কিমচন্দ্র যেমন সাহিত্য সম্রাট হিসেবে নন্দিত হয়েছিলেন, তেমন জীবিতাবস্থাতেই ব্রজেন্দ্রকুমার আখ্যাত হয়েছিলেন পালাসম্রাট হিসেবে।
ছাত্রাবস্থায় তিনি চন্দ্রশেখর উপন্যাসের পালারূপ দিয়ে তাঁর যাত্রাপালা রচনার সূত্রপাত করলেও পরিণত বয়সে তিনি পেশাদার যাত্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের কাহিনিকে যাত্রায় রূপ দিতে সচেষ্ট হননি। হয়তো এর একটি কারণ, তাঁর অন্তরঙ্গ সুহৃদ পালাকার-গীতিকার সৌরীন্দ্রমোহন চট্টোপাধ্যায় চল্লিশের দশকে প্রথম রাজসিংহ উপন্যাসের পালারূপ ‘রূপনগরের মেয়ে’ রচনা করে প্রভূত খ্যাতির অধিকারী হন। যেজন্য এ কাজে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়ানো তাঁর অভিপ্রায় হয়নি। সৌরীন্দ্রমোহনের সেই প্রথম প্রচেষ্টার পরে, ১৩৫২ থেকে ১৩৮৮ দীর্ঘ ছত্রিশ বছরে চলচ্চিত্র কিংবা রঙ্গমঞ্চের তুলনায় পেশাদার যাত্রায় বঙ্কিমচন্দ্রের প্রায় সব কটি কাহিনিরই পালারূপ পরিবেশিত হয়েছে। এই দীর্ঘ পর্বেরই কোনো এক সময় সম্ভবত স্বাধীনতালাভের পরে পরেই ব্রজেন্দ্রকুমার, কৃষ্ণযাত্রার আঙ্গিকে নাটিকা আকারে ‘চন্দ্রশেখর’, ‘দেবী চৌধুরাণী’ ও ‘আনন্দমঠ’-এর পালারূপ দিয়েছিলেন। তাঁর পুত্র তরুণকুমার দে জানিয়েছেন, প্রকাশক সেইসব গ্রন্থে কোথাও বঙ্কিমচন্দ্রের নামোল্লেখ করেননি দেখে—বিরক্ত ও বিব্রত ব্রজেন্দ্রকুমার সে পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে আর কোনো পালারূপ দেননি।
ব্রজেন্দ্রকুমার তাঁর পালা রচনার দীক্ষা গ্রহণ করেছিলেন মতিলাল রায়, মুকুন্দদাস এবং ভোলানাথ রায় কাব্যশাস্ত্রীকে অনুসরণ করে। প্রথাগত যাত্রাপালা রচনার রীতি তিনি ধীরে ধীরে পরিবর্তন করেছেন—সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে। তাঁর প্রথম ক্রান্তিকারী পালা ‘চাঁদের মেয়ে’ থেকে বলা যায় নতুন যাত্রা যুগের সূচনা হয়েছিল। সে পালার ভূমিকায় তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি কারণে, বলেছিলেন :
বঙ্কিমচন্দ্র যখন বন্দেমাতরম গান লিখিয়াছিলেন তখন তিনি ভাবেন নাই এই স্রোতই একদিন ভারতে বন্যা আনিবে। আমি বঙ্কিমচন্দ্র নই, জয়যাত্রার পুরোভাগে সঙ্গীন লইয়া দাঁড়াইতে পারিব না, কিন্তু পিছন হইতে জয়ধবনি দিতে আমারও অধিকার আছে।
বস্তুতপক্ষে মনেপ্রাণে তিনি সর্বদা শিক্ষিত মহলে যাত্রাপালার সুনাম প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন।
‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের ভাবাবেগ, বাঙালি জনসাধারণের হৃদয়ে যে উন্মাদনা জাগিয়েছিল ব্রজেন্দ্রকুমার তাঁর একাধিক পালায় তার বাস্তব চিত্রের প্রতিফলন ঘটিয়েছিলেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর লেখা ‘মায়ের ডাক’ পালার কথা উল্লেখ করতে হয়। ১৯৪৫-এ প্রভাস অপেরা এবং নট্ট কোম্পানি দলে অভিনীত আলোচ্য পালা নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জীবন অবলম্বনে রচিত। ‘বাংলার যে দুরন্ত ছেলে জাতির উপরে ব্যক্তিকে কখনও স্থান দিল না, যাহার পদনখ হইতে কেশাগ্র পর্যন্ত দেশের সেবায় নিবেদিত, বারবার মরিয়াও যে কখনও মরিল না, তরুণ ভারতের সেই মুকুটহীন রাজা’ নেতাজি সুভাষচন্দ্রের স্মরণে ‘মায়ের ডাক’ উৎসর্গ করে তিনি ভূমিকায় বলেছিলেন :
যে লৌহমানবের আদর্শ সম্মুখে রাখিয়া মায়ের ডাক নাটক রূপায়িত, তাহার স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রণাম জানাইয়া এই রূপক-নাট্যকথা সাধারণের সম্মুখে উপস্থিত করিলাম।
চরিত্রলিপিতে ইংরেজপক্ষের প্রধান হিসেবে এসেছেন বিশ্বজিৎ, দুঃশাসন, বিভীষণ, শিরোমণি, শ্বেতকেতু প্রভৃতি। শেষোক্ত নামটির মধ্যে ‘চন্দ্রশেখর’-এর শৈবলিনীর স্বপ্নদৃশ্যে ‘শ্বেতশূকর’ কিংবা মুকুন্দদাসের ‘শ্বেত ইঁদুর’ পেরিয়ে সুভাষচন্দ্রের শেতাঙ্গ শিক্ষক ওটেনকেই চিত্রিত করা হয়েছে।
এই শ্বেতকেতুকে সব্যসাচীরূপী সুভাষচন্দ্র নিজের পরিচয় দিয়েছে মায়ের ছেলে বলে—’কে তোর মা?’ এই জিজ্ঞাসায় সে জানিয়েছে ‘আমার মা এই সুজলা সুফলা মলয়জ শীতলা শস্য শ্যামলা আর্যভূমি।’ আনন্দমঠ উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদে প্রথম গীত ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের পর মহেন্দ্রর ‘এ ত দেশ, এ ত মা নয়’—সংলাপের পর ভবানন্দ জানিয়েছিলেন : ‘আমরা অন্য মা মানি না—জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী। আমরা বলি, জন্মভূমিই জননী, আমাদের মা নাই, বাপ নাই, ভাই নাই, বন্ধু নাই—স্ত্রী নাই, পুত্র নাই, ঘর নাই, বাড়ি নাই, আমাদের কাছে কেবল সেই সুজলা সুফলা, মলয়জসমীরণ শীতলা শস্যশ্যামলা’—ভবানন্দ নিজেদের মায়ের সন্তান হিসেবেই পরিচয় দিয়েছে অশ্রুসজল কণ্ঠে। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ব্রজেন্দ্রকুমার আনন্দমঠ-এর যে ছোট নাটিকার রূপ দিয়েছিলেন তাতে ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত প্রায় সমস্ত সংলাপ সহ হুবহু তুলে দিয়েছিলেন মূল উপন্যাসের দশম পরিচ্ছেদ থেকে। নাটকের শেষ হয়েছে ‘তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম / তুমি হৃদি, তুমি মর্ম ত্বং হি প্রাণা শরীরে’—ইত্যাদি অংশের গান দিয়ে। ‘মায়ের ডাক’-এর অন্যত্র রাজা বিশ্বজিৎ আদেশ দিয়েছিলেন অহিংস সংগ্রাম বন্ধ করতে, নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন ‘বন্দে মাতরম’ উচ্চারণের। উত্তরে বিশিষ্টরূপী মহাত্মা গান্ধি বলেছিলেন : ‘আপনার এ আদেশের পরেও আমি মুক্তকণ্ঠে উচ্চারণ করছি ‘বন্দে মাতরম’। এই পালায় বশিষ্ঠের সহচর হিসেবে রূপায়িত হয়েছিলেন রামানুজ রূপে জহওরলাল নেহরু। বিবেক এসেছেন কবি-র শরীরে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-মুকুন্দদাসের স্বদেশবোধ সঞ্জাত বাণী মাহাত্মের প্রচারক হয়ে।
বছর তিনেক পরে প্রায়ই একই পটভূমিতে ‘ধরার দেবতা’ নামে একটি পালা লিখেছিলেন নিউ গণেশ অপেরার জন্য। সে পালায় নায়ক ছিলেন শুকদেব রূপী গান্ধিজী, আর তাঁর রাজনীতির সহযোগী অম্বরনাথ—বাস্তবে যিনি জওহরলাল। কাঞ্চনগিরির রাজা কীর্তিধবজ এখানে ইংরেজ শাসক, স্বেচ্ছাসেবকদের কণ্ঠে ধবনিত ‘বন্দে মাতরম’ বন্ধ করে, দেশ ছাড়ো ধবনি স্তব্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেছে। ‘সমুদ্র মন্থনে যত সুধা উঠিয়াছে, সবটুকু দেশবাসীকে বিলাইয়া দিয়া যিনি নিজে সমস্ত হলাহল আকণ্ঠ পান করিযেছেন সেই মৃত্যুঞ্জয়ী নীলকণ্ঠকে প্রণাম’ জানিয়ে ব্রজেন্দ্রকুমার ‘ধরার দেবতা’ পাঠকদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা দরকার, ‘মায়ের ডাক’ পালার সার্থকতার পথেই জিতেন্দ্রনাথ বসাক, ১৯৫১ নাগাদ লিখেছিলেন ‘বিদ্রোহী বাঙালী’—যার নায়ক সর্বদমন, উকিল সীতানাথের পুত্র পরিচয়ে চিত্রিত হলেও, নেতাজি সুভাষচন্দ্রের জীবনের ছায়া অবলম্বনে রচিত সেটি একটি কাল্পনিক পালা মহাবিদ্যালয়ের বি. এ. ক্লাসে ইতিহাসের অধ্যাপক মিঃ কোটিন, এ পালায় ওটিনের ছায়ায় গড়ে উঠেছে—এবং শ্রেণিকক্ষে নেটিভ ইণ্ডিয়ান বিতর্কে সর্বদমন সজোরে অধ্যাপকের গালে চপেটাঘাতও করেছে। কিন্তু সর্বদমন ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের সাধনায় ভারতের বুক থেকে বিদেশি শাসনের মূলোৎপাটন করতে বদ্ধপরিকর। পরের দৃশ্যে কিশোর বালক রাম নামে একটি চরিত্রের কণ্ঠে গীত হয়েছে সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের অনুবাদে ভারতের জাতীয় সংগীত :
বন্দনা করি মায়
সুজলা সুফলা শস্য-শ্যামলা চন্দন শীতলায়।
যাহার জ্যোৎস্না পুলকিত রাতি
যাহার ভূষণ বনফুল পাতি,
সুহাসিনী সেই মধুর ভাষিণী সুখদায় বরদায়।
সপ্তকোটির কণ্ঠ নিনাদ
যাহার গগন ছায়,
চৌদ্দটা কোটি হস্তে যাঁহার
চৌদ্দটা কোটি ধৃত তরবার
এত বল তাঁর তবু মা আমার অবলা কেন গো হায়।।
সম্ভবত বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় কৃত মূল সংগীতের প্রথমাংশের এই অনুবাদ—’তীর্থ সলিল’ কাব্যগ্রন্থ থেকে পালায় স্থান দিয়েছেন জিতেন্দ্রনাথ এবং পাদটীকায় নির্দেশ দিয়েছেন : ‘এস্থলে বাধা না থাকিলে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গীত হইবে।’ তবে আলোচ্য পালাকার যখন আনন্দমঠ-এর পালারূপ দিয়েছিলেন—প্রেমানন্দের কণ্ঠে মূল ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গীত হয়েছে। এই আনন্দমঠ-ই যাত্রার আসরের জন্য পৃথক উদ্যোগে প্রস্তুত করেছিলেন আনন্দময় বন্দ্যোপাধ্যায় ও রমেন লাহিড়ী। সেই দুটি পালা অভিনীত হয়েছিল সত্যম্বর অপেরায় ও নাট্যভারতী দলে। শেষোক্ত পালাটি প্রযোজিত হয়েছিল ১৯৭৯-তে।
‘ধরার দেবতা’-র বছরে ব্রজেন্দ্রকুমার লিখেছিলেন ‘স্বামীর ঘর’ নামে আর একটি পালা—যেখানে প্রধান বিপ্লবী চরিত্র সত্যকামের ছেলে বিকর্ণের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ গানটি প্রায় সম্পূর্ণ গীত হয়েছে। সত্যকাম এই পালায় বন্দনাকে ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রে উদবোধিত করেছে দেশকে মা হিসেবে কল্পনা করে, তার শাসনভার তুলে নেবার জন্য। বলেছে : ‘আমার এই দলিত নিষ্পেষিত সর্বহারা জন্মভূমি শুধু আমার মা নয়, আপনারও মা। আমার সঙ্গে আপনি গ্রহণ করুন এর সেবার ব্রত, প্রণাম করুন রাজকুমারী—সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাং শস্য শ্যামলাং মাতরম।’
আলোচ্য পালাতে আনন্দমঠ এসেছে অন্যভাবে, যেখানে দশ হাজার সৈন্য অস্ত্রশিক্ষায় নিরত, এখন তারা নিয়মিত হরিনাম গান করলেও—একদিন দেশের প্রয়োজনেই পাগল হয়ে উঠবে—এই আশ্বাস বিদ্রোহী উদয়ন নায়ক সত্যকামকে দিয়েছে।
‘বন্দে মাতরম’ এই ধবনি ব্রজেন্দ্রকুমার আর যেসব নাটকে ব্যবহার করেছেন তার মধ্যে ছোটোদের জন্য লেখা ‘উজানীর চর’, ‘প্রতিদান’ ছাড়া পেশাদার দলে অভিনীত ‘মৃত্যুঞ্জয়ী সূর্যসেন’, ‘বিদ্রোহী নজরুল’ পালা বিশেষভাবে উল্লেখ্য।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ‘উজানীর চর’ নাটকে ব্রজেন্দ্রকুমার হানিফ আর দুখীরাম নামে দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের দিকটি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এদের দুজন মারা যাওয়ার সময় পরস্পর বিপরীত ধর্মের শ্মরণ নিয়েছে—হানিফের কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছে ‘বন্দে মাতরম’ আর দুখীরাম বলেছে ‘আল্লা হো আকবর’। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে রচিত প্রতিদান নাটকে ‘রিপুদল বারিণিং মাতরম’ পর্যন্ত অংশ গীত হলেও স্বাধীনোত্তর ভারতের করুণ একটি বাস্তব পরিস্থিতি তুলে ধরেছিলেন। এতে নায়ক অধীর মল্লিক বি. সি. এস. পরীক্ষায় পাস করেও চাকরি ছেড়ে দেশোদ্ধারের কাজে যোগ দেন। পরে যাঁর আহ্বানে চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন, সেই দেশনেতা মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর—দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচার, স্বজন পোষণের নৈমিত্তিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্রের এই অপব্যবহারের পরিণতিতে অধীর আহত বোধ করেছে।
ব্রজেন্দ্রকুমারের পূর্বসূরি ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ যিনি বড়ো ফণী নামেই সমধিক পরিচিত তিনিও যাত্রাজগতে তাঁর সমকালে প্রাতস্মরণীয় মাষ্টারমশাই হিসেবেই বন্দিত হয়েছিলেন। ফণিভূষণ ‘মায়ের দেশ’ নামে একটি পালা লিখেছিলেন পৌরাণিক রাজা পৃষতাস্ব, রানি পদ্মাবতী ও রাজকুমার পদ্মবর্ণের উপাখ্যান অবলম্বনে। নিজের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছিলেন উৎসর্গপত্রে : যাঁরা / প্রকৃত দেশসেবক, / আমার/ এই / মায়ের দেশ / তাঁদেরই / কর্মালোকে / উদ্ভাসিত হোক।’ এই পালায় চতুর্থ অঙ্কের তৃতীয় গর্ভাঙ্কের শেষে শুধু ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি মুখরিত হয়নি, জনদেব নামে পুরোহিতের কণ্ঠে গীত হয়েছে ‘বন্দে মাতরম—বন্দে মাতরম—/ বন্দনা কর, বন্দনা কর বন্দনা কররে’—গীতটি।
দেশাত্মবোধে উদ্বুদ্ধ আজীবন প্রগতিশীল ফণিভূষণ বিদ্যাবিনোদ ‘নীলকুঠি’ নামে একটি পালা লিখেছিলেন, ১৮৬১ সালের নীলকর যুগের অমানুষিক অত্যাচারের কাহিনি ‘অত্যাচারিত বাঙালির হাতে সমর্পণ করে সব কথা তাঁদের স্মরণ করিয়ে’ দেওয়ার জন্য। নাটকটি কোন সময় রচিত ও অভিনীত হয়েছিল সে তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি তবে নিউ নারায়ণ অপেরা এবং মুকুন্দদাসের দলে সগৌরবে অভিনীত হয়েছিল এই উল্লেখ দেখে মনে করা যায় পালাটি স্বাধীনতালাভের আগে পরেই কাছাকাছি সময়েই অভিনীত হয়ে থাকবে। মুকুন্দদাসের দল বলতে তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে একসময় যে সব দল বাংলার নানা প্রান্তে সংগঠিত হয়েছিল, হয়তো এ দল তারই কোনো একটি।
যাই হোক, খুলনা মহকুমার বড়থালীর তীরবর্তী মোরেলগঞ্জ গ্রাম আলোচ্য পালার ঘটনাস্থল। সে গ্রামে জমিদার প্রিয়নাথ আর তাঁর পুত্র অরবিন্দ নীলকুঠির মোরেল সাহেবের অত্যচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। এই পালায় বঙ্কিমচন্দ্র এসেছেন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চরিত্রে—বাস্তবে তিনি অবশ্য ১৮৬০ থেকে ১৮৬৪ খুলনাতেই কর্মরত ছিলেন। প্রশাসক হিসেবে তাঁর কঠোর বিধানে ইংরেজদের সঙ্গে তাদের মোসাহেব বাঙালিদেরও শাস্তি দিয়েছেন—এই আনন্দে নীলকুঠির খোলা প্রাঙ্গণে বঙ্কিমচন্দ্রকে অভিনন্দন জানাতে এসেছেন পাতায় মোড়া ফুলের মালা হাতে প্রিয়নাথ মুখুজ্জে। গ্রামবাসীর হয়ে তাদের কামনার কথা বলেছেন প্রজানুরাগী সেই জমিদার ‘বাংলার এই আদর্শ মানুষটি যেন ঘুরে ফিরে বাংলায় এসেই জন্মগ্রহণ করেন।’
পালার শেষে প্রিয়নাথের আদেশের পরের দিন থেকে চণ্ডীপাঠ শুরু করার পরিবর্তে মন্দিরের পুরোহিত অঘোরনাথ—উচ্চারণ করতে চেয়েছেন জাতীয় জীবনের নতুন স্তোত্র, কেননা :
আদর্শ পুরুষ হাকিমবাবুরই এক মন্ত্র আছে তার মধ্যে অসংখ্য দেবদেবীর স্তোত্র নিহিত। সে মন্ত্র সারা ভারতবাসীকেই উনি দান করেছেন। মন্ত্রের নাম ‘বন্দে মাতরম’।
সেই ধবনি অনুসরণ করে অঘোরনাথের শিষ্য থানেশ্বরের কণ্ঠে ‘বন্দে মাতরম’ গানের প্রথমাংশ গীত হয়ে পালা শেষ হয়েছে। স্বদেশিযুগে ‘বন্দে মাতরম’ আর বাঙালির জীবন—একাত্ম হয়েছিল বলেই, পালায় স্থানকালপাত্রের বিবেচনায় তখনো এই গান বাস্তবে রচিত হয়েছিল কিনা সে প্রশ্নের যাথার্থ নিয়ে নিশ্চয় কেউ মাথা ঘামায়নি। আজও নিশ্চয় তার কোনো প্রয়োজন নেই,—শুধু দেশের সংকটকালে লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে উন্মাদনা জাগাতে যাত্রার আসরও যে উদ্বেল আয়োজন করতে এগিয়ে এসেছিল, জাতীয় জীবনে তার মূল্য অস্বীকার করা যায় না। বরং সেদিনের সেই গৌরবের কথা স্মরণে রেখে পালার যুবক-চরিত্র অরবিন্দের সংলাপ উচ্চারণ করে আজ আমরাও বলতে পারি:
হে বঙ্গবীর কৃতী পুরুষ ! দমননীতির কঠোর উপাসক। হে সত্যের শেবক। হে উদার সহিষ্ণু সিদ্ধ পুরুষ। হে বরেণ্য মহামানব। পূজারীর এই ক্ষুদ্র পূজা গ্রহণ করুন।
