বন্দে মাতরম ও আনন্দমঠ রচনার পটভূমি ও পরবর্তী পরিস্থিতি – সুমিত্রা পাল

বন্দে মাতরম ও আনন্দমঠ রচনার  পটভূমি ও পরবর্তী পরিস্থিতি

সুমিত্রা পাল

১৫ আগস্ট, ২০০৭। ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তির ৬০ বছর পূর্ণ হয়েছে। দেশমাতৃকার উদ্দেশ্যে আজও আমরা বলে উঠি ‘বন্দে মাতরম’ অর্থাৎ হে দেশমাতৃকা, তোমায় বন্দনা করি। এই ধবনি বা সংগীত যা স্বাধীনতা সংগ্রামের এক মুখ্য প্রেরণা ছিল, তা গাওয়া নিয়ে বিবাদ আজও চলে আসছে।

গত সাত সেপ্টেম্বর ২০০৬ ধুমধাম করে ‘বন্দে মাতরম’ গানের শতবর্ষ পালন হয়। সারা দেশ জুড়ে অনেকেই গাইলেন এই গান। দেশভক্তির এক সুন্দর দৃষ্টান্ত সন্দেহ নেই। কিন্তু এই গান গাওয়া নিয়েও হয়েছিল এক বিবাদ, বিতর্ক। কেউ কেউ বলেন, সমস্ত স্কুলে বাচ্ছাদের দেশভক্তির এই গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। আবার অনেকে প্রশ্ন রেখেছিলেন, বাধ্যতামূলকভাবে এই গান গাওয়া কী সত্যিই এক পেট্রিওটিক ডিউটি?

এই গান গাওয়া নিয়ে আছে এক জটিল, বিতর্কমূলক ইতিহাস—১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের সুরারোপিত এই ‘বন্দে মাতরম’ গানটি গাইলেও, পরে তিনি লেখেন যে :

The core of Vande Mataram is a hymn to the Goddess Durga ; this is so plain that there can be expected patrioticaly to worship the ten-handed deity as Swadesh.

এই গানের পদগুলি নিম্লরূপ :

বন্দে মাতরম।

সুজলাং সুফলাং মলয়জ শীতলাম

শস্যশ্যামলাং মাতরম।

শুভ্র-জ্যোৎস্না-পুলকিত-যামিনীম,

ফুল্লকুসুমিত-দ্রুমদলশোভিনীম।

সুহাসিনীং সুমধুরভাষিণীম।

সুখদাং বরদাং মাতরম।।

সপ্তকোটিকণ্ঠ-কল-কলনিনাদ করালে,

দ্বিসপ্তকোটী ভুজৈর্ধৃত খরকরবালে,

অবলা কেন মা এত বলে।

বহুবলধারিণীং নমামি তারিণীং

রিপুদলবারিণীং মাতরম।

তুমি বিদ্যা তুমি ধর্ম

তুমি হৃদি তুমি মর্ম

ত্বং হি প্রাণাঃ শরীরে।

বাহুতে তুমি মা শক্তি,

হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি,

তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে।

ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী

কমলা কমল-দলবিহারিণী

বাণীবিদ্যাদায়িনী নমামি ত্বাং

নমামি কমলাম অমলাং অতুলাম,

সুজলাং সুফলাং মাতরম

বন্দে মাতরম

শ্যামলাং সরলাং সুস্মিতাং ভূষিতাম

ধরণীং ভরণীম মাতরম।’

মুসলিম সমাজ এই গানের বিরদ্ধাচরণ করায় কংগ্রেস ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে সিদ্ধান্ত নেয় যে শুধুমাত্র গানের প্রথম দুটি চরণ, যেখানে মাতৃভূমির প্রতি দেবী দুর্গার মহিমা আরোপণের প্রসঙ্গ নেই, সেই দুটি চরণই গাওয়া হবে জনসমক্ষে। তা সত্ত্বেও প্রতিবাদ চলে আসছে অবিরাম। আর তাই গত বছর সাত সেপ্টেম্বর সরকার এই গানের শতবর্ষ পালনের সিদ্ধান্ত নিলেও আবার ওঠে আলোড়ন। যদিও কালচারাল মিনিস্ট্রি থেকে এই সিদ্ধান্ত বাতিল করায় আলোড়ন পরে স্তিমিত হয়ে যায়।

তবে ২০০৬ খ্রিস্টাব্দ ‘বন্দে মাতরম’ গানের শতবর্ষ ছিল না। গানটি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচনা করেছিলেন ১৮৭০-এর পরে যে-কোনো এক সময়ে। ১৮৭৫ সনে বঙ্গদর্শন পত্রিকার প্রচ্ছদ পৃষ্ঠায় কবিতা বা গানটি প্রথমবার ছাপা হয়েছিল। এর ছবছর পর থেকে এই একই পত্রিকায় আনন্দমঠ উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে। এবং তারও এক বছর পরে আনন্দমঠ উপন্যাস যখন গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়, তখন ‘বন্দে মাতরম’ গানটি তাতে যুক্ত হয়।

বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন বাংলার ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট এবং ডেপুটি কালেক্টর। ঔপনিবেশিক শাসনের ভয়ংকর পরিণতি সম্পর্কে তিনি বেশ অবহিতও ছিলেন। দেশের মানুষের মনে লেখনীর মাধ্যমে এক জাতীয়তাবাদের বোধ জাগ্রত করারও স্বপ্ন হয়তো দেখেছিলেন।

ঊনবিংশ শতাব্দীর ঐতিহাসিকেরা প্রাক ইসলামিক ভারতের স্বর্ণযুগ এবং প্রগতিশীল ব্রিটিশ শাসনের মাঝখানের মুসলিম শাসনকালকে এক ‘অন্ধকার যুগ’ বলে সাফল্যের সঙ্গে চিত্রণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্রের লেখক মনে এই অন্ধকার যুগের একটা প্রভাব তো ছিলই ; আবার বাংলার নবাব সিরাজদৌল্লার শাসনের ঠিক পরবর্তী সময়ের মুসলিম শাসকদের অত্যাচার পর্বেরও ক্ষোভ ছিল। আর এই অত্যাচার পর্বের সময়টুকুই আনন্দমঠ রচনার পটভূমি।

তা ছাড়াও ‘বন্দে মাতরম’ গান ও আনন্দমঠ উপন্যাস রচনার সরাসরি অনুঘটক হিসাবে কাজ করেছে ১২৭৩-৭৪ খ্রিস্টাব্দের বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং পাবনা-সিরাজগঞ্জ জেলার য়ুসুফশাহি পরগনার ‘কৃষক আন্দোলন’, যা ব্রিটিশ সরকার কঠোর হস্তে দমন করতে সক্ষম হয়েছিল। কৃষকদের এই দুঃখদুর্দশা তাঁকে ইংরেজদের প্রতি ক্রোধান্বিত করে তুলেছিল। সমান্তরালভাবে ঠিক সেই সময় সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহও তাঁর মনে প্রচণ্ড রেখাপাত করে।

আনন্দমঠ উপন্যাসের মূল উপজীব্য ছিল দুর্ভিক্ষের পটভূমিতে ব্রিটিশ এবং মুসলিম শক্তির বিরুদ্ধে বাংলার সন্ন্যাসীদের বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ছিল স্বদেশভূমির এবং স্বদেশবাসীর হৃতসম্মান ও হৃতগৌরব পুনরায় ফিরে পাওয়ার, অনাহুতদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, উঠে দাঁড়ানোর। যা উনিশ শতকের শেষের দিকে পরাধীন মানুষের মনে, বাঙালিদের মনে এক অসীম দেশপ্রেমের চেতনা সঞ্চার করেছে, এক একসূত্রীকরণের কাজ করেছে, তাদের চিন্তা-ধারণাকে অসীম বলে বলীয়ান করে তুলেছে। যাদেরকে সেই কিছুদিন আগেও Thomas Macaulay বর্ণনা করেছিলেন, ‘effete, effeminate, vaporous, swooning Bengali’ বলে।

আনন্দমঠ প্রকাশিত হওয়ার পরেই ‘বন্দে মাতরম’ শব্দটি হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত মন্ত্র। এই মন্ত্রের তেজে বলীয়ান হয়ে ওঠে প্রতিটি বাঙালি। তারপরে প্রতিটি ভারতবাসী। শব্দটি ওঠে স্বাধীনতা আন্দোলনের এক অদ্ভুত প্রেরণা। বিশেষ করে ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ‘বঙ্গভঙ্গ’ আন্দোলনের সময় এই গানটি আরও বিস্তৃতভাবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে যখন সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আহ্বানে টাউন হলের এক সভায় শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ, বিপিনচন্দ্র পাল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অশ্বিনীকুমার দত্ত প্রমুখ মহান দেশনায়কদের উপস্থিতিতে ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি তুলে তাঁরা স্বাধীনতার শপথ নেন, আর রাজনৈতিক শ্লোগান হিসাবেও এই শব্দটিকে জনসমক্ষে প্রথমবার তুলে ধরা হয়।

জুলিয়াস লিপনার বঙ্কিমচন্দ্রের এই আনন্দমঠ উপন্যাসের অনুবাদ (‘The Sacred Brotherhood’) করতে গিয়ে ভূমিকায় লেখেন যে :

The chanting (during the August 7, 1905, protest procession against the impending decision in Calcutta) was not confined to Hindus ; people of all communities were reported to have been involved.

উদ্দীপিত করে তুলেছিল এই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি জাতিধর্মনির্বিশেষে প্রতিটি ভারতবাসীকে যার অনেকখানি শ্রেয় আদায় করে নেয় ১৯০৬ খ্রিস্টাব্দে ৬ আগস্ট শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ দ্বারা ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকা ‘বন্দে মাতরম’। একসূত্রে গ্রথিত হয় সমস্ত ভারতবাসী। দীক্ষিত হয় জাতীয়তাবাদের বোধে। আর এই ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি উচ্চারণ করতে করতে, দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন হিন্দু-মুসলমান-শিখ … কত দেশভক্ত।

আজ তাই ‘বন্দে মাতরম’—এই ওজস্বী ধবনি বা সংগীতকে ঘৃণ্য দলাদলির মাঝখানে ঠেলে না দিয়ে, নিখাদ দেশবন্দনার মন্ত্র করে গুঞ্জিত হতে দিই আমাদের প্রতিটি ভারতবাসীর হৃদয়ে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *