বঙ্কিমচন্দ্র : বহরমপুর – অরবিন্দ সরকার

বঙ্কিমচন্দ্র : বহরমপুর

অরবিন্দ সরকার

চাকরি সূত্রে বঙ্কিমচন্দ্র তখনকার বেঙ্গল গভর্নমেন্টের অর্থাৎ এখনকার পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা এবং অধুনা বাংলাদেশের একাধিক জেলায় অবস্থান করেন। এর মধ্যে মুরশিদাবাদ জেলার বহরমপুরে থাকেন চার চারটি বছর। এই সময়টি যেমন বঙ্কিম-জীবনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও চরম এবং পরম সন্ধিক্ষণ। আবহমানের বাংলা সাহিত্যধারার ক্ষেত্রে বিশেষ করে সাময়িক পত্রিকার ক্ষেত্রে গৌরবময় ওই চুয়ান্নমাস স্বর্ণখচিত সময়।

১৮৬৯-৭৪ খ্রি. পর্যন্ত তিনি ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে বহরমপুরে পোস্টেড থাকাকালীন সময়ে ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় বহরমপুর থেকে মাসিক বঙ্গদর্শন পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আর গুছিয়ে বললে বলতে হয়—১নং পিপুলপট্টি লেন কলকাতায় ‘সাধারণী যন্ত্র’ হতে বঙ্গদর্শন ছাপা শুরু হয় এবং প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা বৈশাখ ১২৭৯ (ইং. এপ্রিল ১৮৭২ খ্রি.) ব্রজমাধব বসু কর্তৃক বহরমপুর থেকে প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন পত্রিকা বঙ্গভাষা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে এক নিবিষ্টতম এবং মধুরতম ঐতিহাসিক ঘটনা। একদিকে জোয়ার এল নিবন্ধ সাহিত্যে, সমালোচনা সাহিত্যে অন্যদিকে রস রচনা সাহিত্যে—সর্বোপরি দেশপ্রেম উন্মেষের ক্ষেত্রে অবশ্যই এই পত্রিকার কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। বঙ্কিমের কলমে ফুটে ওঠে মানবমনের অনন্ত ভাণ্ডার। তাঁর নিজের কথায় বলতে গেলে বলতে হয়: সকলপ্রকার মানসিক বৃত্তির সম্যক অনূশীলন, সম্যক স্ফূর্তি ও যথোচিত উন্নতি এবং বিশুদ্ধিই মনুষ্য জীবনের উদ্দেশ্য।

পত্রিকা প্রকাশের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে আহ্বান রাখলেন বাঙালি সমাজে [বাঙালি কৃতবিদ্য সমাজ] বিদ্যা, কল্পনা, লিপিকৌশল এবং মুষলধারে ভাববর্ষণে বঙ্গসাহিত্যের পূর্ববাহিনী ও পশ্চিমবাহিনী সমস্ত নদী নির্ঝরিণী অকস্মাৎ পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হইয়া যৌবনের আনন্দ বেগে ধাবিত হইতে লাগিল। এই বহরমপুরে থাকাকালীন সময়ে বঙ্গদর্শন-এর জন্য বঙ্কিমচন্দ্র সৃষ্টি করলেন বিষবৃক্ষ (১৮৭৩), ইন্দিরা (১৮৭৩), যুগলাঙ্গুরীয় (১৮৭৪), চন্দ্রশেখর (১৮৭৪), রহস্যপ্রবন্ধ (১৮৭৪)। যশস্বী সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র এক শুভপ্রাতে আলোকসামান্য সম্পাদক বঙ্কিমচন্দ্র রূপে আবির্ভূত হলেন। চারিদিকে সাজ সাজ রব। তাঁর বঙ্গদর্শন-কে কেন্দ্র করে ওই সময়ে গণজাগরণের সৃষ্টি হল। সারা বাংলায় শিক্ষিত মহলে সেই ঢেউ বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়ল।

ওই সময়েই বহরমপুরে সেকালের উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্বদের মহামিলন উৎসব বর্ণাঢ্যভাবে শুরু হয়ে যায়। একদিকে রেভারেন্ড লালবিহারী দে, প্রত্নতাত্ত্বিক রামদাস সেন, রামগতি ন্যায়রত্ন, লোহারাম শিবরত্ন, এ্যাডভোকেট অক্ষয়কূমার সরকার, প্রিন্সিপ্যল রবার্ট হ্যান্ড, অন্যদিকে গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, দীনবন্ধু মিত্র, চন্দ্রশেখর মুখোপাধ্যায়, ভূদেবচন্দ্র মুখোপাধ্যায়, বৈকুন্ঠনাথ সেন প্রমুখ।

বঙ্কিমচন্দ্র বহরমপুরে চাকরিসূত্রে ছিলেন চার বছর ছয় মাস অর্থাৎ ১৮৬৯-এর ডিসেম্বর মাস থেকে ১৮৭৪-এর মে মাস অব্দি। এখন বহরমপুর শহরে যে রোডের নাম হয়েছে ১১৫ নং বনবিহারী সেন রোড, তার দোতলায় বিশাল হল ঘরে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব রামদাস সেনের পাঠাগারটি ছিল যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তাবিদ বঙ্কিমচন্দ্রের সারস্বত সাধনার কর্মস্থল। রামদাস সেনের পরম যত্নে গড়া লাইব্রেরি কক্ষটি বঙ্কিমচন্দ্রের উজ্জ্বল উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রখ্যাত গুণিজনের সমাবেশে হয়ে উঠত মৌনমুখর সাহিত্যচর্চার একটি অমলিন মিলনকেন্দ্র। উল্লেখ্য যে, এই চর্চাকেন্দ্রটি সেই সময় বহরমপুর এমনকি বাংলার বিশিষ্ট একটি সাহিত্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যায়। বঙ্গদর্শন পত্রিকার সৃষ্টির যাবতীয় পরিকল্পনা এই লাইব্রেরিকে ঘিরে গড়ে ওঠে। ওই পাঠাগার ছাড়া বহরমপুরে আর দুটি জায়গায় তাঁকে কেন্দ্র করে সাহিত্যবাসর বসত (১) দীনবন্ধু সান্যাল-এর আবাস যেটিকে বঙ্কিমের গৃহ বলেই সকলে জানত। এবং (২) গ্রান্ট হল [বর্তমানে এই নামে পরিচিত]।

বঙ্কিমচন্দ্র বহরমপুরে যে বাড়িতে থাকতেন তা হল রামদাস সেনের আবাসগৃহ ও পাঠাগারের কাছাকাছিই বলা যায়। এখনকার বহরমপুর মিউনিসিপ্যালিটির ১২ নং ওয়ার্ড-এর অন্তর্গত রাধারঘাটে ভট্টাচার্যপাড়ার যোগমায়া বাড়ির [৬নং দীনু স্যানাল লেন] একটি ঘরে তিনি থাকতেন। এই ঘরটি দীনু সান্যালের বিরাট বাড়ির উত্তর দিকের একটি বড়োসড়ো ঘর। এই যোগমায়া বাড়ির দক্ষিণ দিকে অতিপ্রাচীন কাশীনাথ শিবের মন্দির এবং খোলামেলা একটি বিশাল উঠোন। পূর্বদিকে একটি পুকুর, এখনো বেড়াতে গেলে বোঝা যায় সেখানে পুকুরটির অবস্থান ছিল। ওরই একান্ত নিকটে ভাগীরথী-গঙ্গানদীর রাধার ঘাট যা সকলের বিশেষ পরিচিত।

এ ছাড়া আরও একটি বাড়িতে বঙ্কিমবাবু বেশ কিছুকাল থাকতেন বলে জানা যায়। তার অবস্থান হল বহরমপুর শহরের উত্তর দিকে। ঘাটবন্দর ও সৈদাবাদের মাঝামাঝি জায়গা, জোড়া শিবমন্দিরের খুবই কাছে। সেই গৃহের অস্তিত্ব এখন নেই।

বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শন চার বছর সম্পাদনার পর সরাসরি দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন (১২৮২)। ১২৮৪ থেকে ১২৮৯ পর্যন্ত সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বঙ্গদর্শন সম্পাদনা করেন। ১২৯০ বঙ্গাব্দের কার্তিক থেকে মাঘ পর্যন্ত সম্পাদনার দায়িত্ব বর্তেছিল শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের ওপর।

বঙ্কিমচন্দ্রের জীবনাবসান ঘটে তাঁর মাত্র ৫৬ বৎসর বয়সের সময়ে। এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সাহিত্যচর্চা অতুলনীয়। জন ও জাতির উন্নতির ক্ষেত্রে তাঁর মৌলিক ভাবনাচিন্তা সর্বত্রগামী। ঐতিহাসিক উপন্যাস সৃষ্টিতে (দুর্গেশনন্দিনী ও রাজসিংহ) তিনিই পথ প্রদর্শক। ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত ও আনন্দমঠ উপন্যাস রচনা তাঁর সৃষ্ট দেশপ্রেমের অত্যুজ্বল নিদর্শন। বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবীরা ‘বন্দে মাতরম’ মন্ত্র উচ্চারণ করেই ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের এক হাতে ছিল ‘গীতা’—অন্যহাতে আনন্দমঠ এবং বন্দে মাতরম মন্ত্র। অগ্নিযুগের বিপ্লবী শ্রীঅরবিন্দ ‘বন্দে মাতরম’-কে ‘vision of mother’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত এবং আনন্দমঠ উপন্যাস রচনার ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক প্রেক্ষিত কী তা আজও অনুমান সাপেক্ষ বলে অনেকে মনে করেন।

প্রচলিত স্বীকৃত মতটি হল—’বন্দে মাতরম’ সংগীতটি ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে চুঁচুড়ার জোড়াঘাটের এক গৃহে বঙ্কিমচন্দ্র সৃষ্টি করেন। এ বিষয়ে এখন দ্বিমত দেখা দিয়েছে।

বঙ্কিমচন্দ্র যখন মুরশিদাবাদ জেলায় বহরমপুরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন—সেই সময় একদিন [১৮৭০ খ্রি. ১৫ ডিসেম্বর] পালকি চড়ে বহরমপুর স্কোয়ার ফিল্ড-এর মধ্য দিয়ে বঙ্কিমচন্দ্র যাচ্ছিলেন। তখন ওই মাঠে চলছিল ক্রিকেট খেলা। কর্নেল ডাফিন নামে এক ইংরেজ সাহেব [ যিনি তখন ক্রিকেট খেলায় ব্যস্ত ] চটে গিয়ে বঙ্কিমের পালকি আটকায় এবং চূড়ান্ত অপমান এমনকি প্রহার করে। তেজস্বী বঙ্কিম ওই ইংরেজ সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। মামলার রায় বের হয় [১২ জানুয়ারি: ১৭৭৪] বঙ্কিমের সপক্ষে। বিচারক ন্যায্যভাবে কালা-আদমি বঙ্কিমচন্দ্রের কাছে ওই ইংরেজ সাহেবকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে [ বিপুল জন সমাবেশে ] বাধ্য করেন।

আর এই মামলার সূত্র ধরেই বঙ্কিমচন্দ্রের সঙ্গে লালগোলার রাজা যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়ের আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। তিনি তখন রাজ অতিথি হিসেবে লালগোলার রাজবাড়িতে অবস্থান করেন। সেই সময়ে একদিন তিনি দেখলেন, রাজবাড়ির উত্তরদিকের পথ স্পর্শ করে ‘কলকলি’ নামে একটি ছোটো নদী প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর দু-প্রান্তে দিগন্ত বিস্তৃত অরণ্যরাজি। একটু দূরে পূর্বদিক দিয়ে বয়ে চলেছে পদ্মা আর ভৈরবী নদী। দুই নদীর মাঝে গভীর অরণ্য। আর অনন্ত প্রসারিত বালুকা খচিত তীরভূমি। এই অরণ্যভূমিতে অসংখ্য বট, পাকুড়, কদম, অশ্বত্থ, আম, জাম, আরও নানা প্রজাতির গাছ। এই নদীর তটে অবস্থান বহু সাধকের সাধনক্ষেত্র। ত্রিস্রোতার সঙ্গমস্থলেই ছিল তান্ত্রিকদের আড্ডা। বঙ্কিমচন্দ্র রাজবাড়ি-সংলগ্ন এই গভীর অরণ্যের মধ্যে দেবী জগদ্ধাত্রী মন্দির, ভয়ংকর শৃঙ্খলিত নগ্নিকা মহাকালী মন্দির এবং দশভুজা দেবী দুর্গার মন্দির দেখে অভিভূত হয়ে পড়েন। এখনও অবশ্য নীরব সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকটি দেওয়ালের ভগ্নস্তূপ।

বঙ্কিমচন্দ্র বনমধ্যস্থ রাজপথ ও কলকলি ক্ষেত্রটির হুবহু বর্ণনা দিয়েছেন আনন্দমঠ উপন্যাসে। তাঁর ভাষায় :

আনন্দারণ্য হইতে বাহিরে আসিলে কিছু দূরে সবৃক্ষ প্রান্তর আরম্ভ হইল। প্রান্তর একদিকে রহিল, বনের ধারে ধারে রাজপথ, একস্থানে অরণ্য, মধ্য দিয়া একটি ক্ষুদ্র নদী কলকল শব্দে বহিতেছে, জল অতি পরিষ্কার নিবিড় মেঘের মতো কালো।

লালগোলার শৃঙ্খলিত আনন্দময়ী মা কালীর কোল ছুঁয়ে ক্ষুদ্র নদীটি ‘কলকল’ ধবনি তুলে প্রবাহিত হত। আজও এই নদীটি ‘কলকলি’ নামে পরিচিত। লালগোলার এই গভীর বনে সর্বালংকারভূষিতা দেবী জগদ্ধাত্রী মূর্তিটি নিঃসন্দেহে আনন্দমঠ-এর মা। এই বনের শৃঙ্খলিত নগ্নিকা কালীমূর্তিকে পরাধীন ও দুর্ভিক্ষপীড়িত ভারতের শৃঙ্খলিত মাতৃরূপে বঙ্কিম কল্পনা করেন এবং আনন্দমঠ উপন্যাসে কালীমূর্তির বর্ণনা—এর ভিত্তিতেই তিনি রচনা করেন।

এই শৃঙ্খলিত মার সঙ্গে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশকে থাকতে দেখে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর জীবনবোধ দিয়ে উপলব্ধি করেন—এই কালীই হচ্ছেন দশপ্রহরণ ধারিণী দুর্গা। তাই তিনি ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতে লিখেছিলেন—ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী।

বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস আনন্দমঠ মুখ্য যে তিনটি দেবী মূর্তির সঙ্গে বঙ্গজননীর অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ রূপ তুলনা করেছেন তা কোনো কাল্পনিক বা রূপক নয়, এই তিনটি মন্দির তিনি লালগোলার বনে তন্ত্র সাধনার সময় প্রত্যক্ষ করেছিলেন। উল্লেখ্য যে, আজও এই তিনটি মন্দির কালের কবলে নষ্ট হয়ে যায় নি।

১২৮০ বঙ্গাব্দ। মাঘীপূর্ণিমা তিথি। প্রত্যেক বারের মতো এবারও লালগোলা রাজবাড়িতে সমবেত হয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধুসন্তরা। সেই উপলক্ষ্যে রাজবাড়ির নাটমন্দিরে একটি ধর্মসভার আয়োজন করা হয়েছিল। বহু সজ্জনমণ্ডলী উপস্থিত। বঙ্কিমচন্দ্র আনন্দমঠ-এ এই মাঘী পূর্ণিমা তিথিকে এক সুমহান ঐতিহ্যের সঙ্গে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। ১২৮০ বঙ্গাব্দের মাঘীপূর্ণিমায় বিশালাক্ষি কালীমন্দিরের বেদীতলে ধ্যানে বসলেন শুদ্ধাচারী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। পূর্ণিমার আলোকে শোভিত স্নিগ্ধ দৃশ্য—ধ্যানমগ্ন অবস্থায় মানসিক পটভূমিতে রচিত হল ‘বন্দে মাতরম’ সংগীত। তাই এ বিষয়ে এখন নিশ্চিত করে বলা যেতে পারে—১৮৭৬ এ চুঁচুড়া বা নৈহাটি নয়, ১২৮০ বঙ্গাব্দের (জানু-ফেব্রু ১৮৭৪) মাঘীপূর্ণিমার তিথিতে লাল গোলার এই বেদীতলে রচিত হয়েছে ভারতের জাতীয় সংগীত ‘বন্দে মাতরম’। এ বিষয়ে অন্য একটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করা যেতে পারে—তা হল এই, বঙ্কিমচন্দ্রের সৃষ্ট ‘বন্দে মাতরম’ সঙ্গীত মূলত তাঁর মৌলিক রচনা নয়—এটি ওই সময়ের তান্ত্রিকদের মধ্যে প্রচলিত সংস্কৃত স্তোত্র থেকে নেওয়া—মূল রচনাকার কে তা এখনও জানা যায়নি। এ বিষয় নিয়ে এখনও গবেষণা করা যায়। তবে একটা কথা নিশ্চিত যে, মূল রচনাকার সম্বন্ধে সন্দেহ দেখা দিলেও—বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর নিবিষ্ট ভাবনা চিন্তার মধ্য দিয়ে ওই সংগীতের একটি সুসংস্কৃত রূপ দিয়েছেন—ভারতের সুমহান ঐতিহ্যকে মনে রেখে—সেখানেই আমরা তাঁর কাছে চিরকৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকব।

আবার অন্য দিকে একটি বিষয়ে নিশ্চিত হয় যে আনন্দমঠ উপন্যাসের জীবন্ত চরিত্রগুলি লালগোলা রাজবাড়ি সংলগ্ন গভীর বনের মধ্যে সাধুসন্তদের চরিত্র, যা বঙ্কিমচন্দ্র পরোক্ষ করেছিলেন তাই অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চিত্রণ করেছেন। কেউ যদি ওই অঞ্চলে বেড়াতে যান এখন তিনি সেই বঙ্কিমের দেখা প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখার ক্ষেত্রে খুব বেশি প্রতারিত হবেন না এটুকু আশা করা যেতে পারে।

পরিশেষে, বাংলা সাহিত্যের মহান কীর্তিমান পুরুষ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ব্যক্তিজীবন তথা সাহিত্যজীবনের সঙ্গে মুরশিদাবাদ এইভাবে ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে—তাঁর মৃত্যুর শততম বর্ষে এসে বারবার আমাদের মধ্যে এ কথাটিই ফিরে আসে।

গ্রন্থঋণ :

১ জীবনস্মৃতি : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

প্রথম গ্রন্থপ্রকাশ ১৩১৯, সুলভ সংস্করণ, পৌষ ১৩৭৮

২ ‘ভূমিকা’, বঙ্কিম রচনাবলী : যোগেশচন্দ্র বাগল, সংসদ

৩ ‘ভূমিকা’, বঙ্কিম রচনাবলী : গোপাল হালদার, রিফ্লেক্ট

৪ বঙ্গদর্শন পত্রিকা : ১ম বর্ষ, ১ম সংখ্যা, বৈশাখ ১২৭৯

৫ বঙ্গদর্শন পত্রিকা : ২য় সংখ্যা, ১২৭৯

৬ গণকণ্ঠ : বিশেষ সংখ্যা, ১৯৯৪

৭ গণকণ্ঠ পাক্ষিক সংবাদপত্র, ১৭ বর্ষ সংখ্যা ১০, ১১

৮ বীক্ষণ পাক্ষিক সংবাদপত্র, মুরশিদাবাদ ১০ বর্ষ সংখ্যা, ১০, ১১, ১২

৯ শ্রীঅরবিন্দ-এর রচনাবলী : পণ্ডিচেরি আশ্রম

১০ রবীন্দ্র রচনাবলী : বিশ্বভারতী

ব্যক্তিঋণ : রমেন্দ্রনাথ রায়, সুদীপা বসু, প্রাণরঞ্জন চৌধুরী, কিষাণচাঁদ ভকত, অপরেশ চট্টোপাধ্যায়, শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায়, তপন চক্রবর্তী, শর্মিষ্ঠা সরকার, সেন্ট্রাল লাইব্রেরী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান জেলা গ্রন্থাগার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *