জাতীয় সংগীত জাতীয় সংহতি
ভবতোষ দত্ত
স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পরে আজও ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত নিয়ে বিতর্ক শেষ হয়নি। এই সেদিনও দক্ষিণ ভারতে জনগণমন নিয়ে আপত্তি শোনা গেল। সে-বিতর্ক ভারতের সর্বোচ্চ বিচারালয় পর্যন্ত গড়িয়েছে। কেউ আপত্তি করেছেন, এ গান ঠিক দেশভক্তির গান নয়, ভগবদ্ভক্তির গান। সুতরাং, নতুন গান তৈরি হওয়া দরকার, যে গান সত্যি জাতীয়তাবোধ জাগিয়ে তুলতে পারবে। এই বিতর্কের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ হিন্দি বা উর্দু ভাষায় লেখা জাতীয় সংগীতের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন। আমাদের জাতীয় সংগীত সম্বন্ধে সব সংশয়ের নিরসন যে এখনও ঘটেনি, ভারতীয় হিসাবে সেটা আমাদের নিয়তি। যে-দেশে এত অজস্র বৈচিত্র্য সে দেশের চিন্তার ধারাকে একটি খাতে বইয়ে দেওয়া শক্ত। অবশ্য দেশ বা জাতি সম্পর্কে তো কোনো সংশয় থাকবার কথা নয়। এ দেশ আমার বা আমি ভারতীয়—এই বোধ ভারতবর্ষ নামক ভূখণ্ডের যে-কোনো প্রান্তেরই মানুষের বোধ হওয়া উচিত। কিন্তু আজ চারিদিকে তাকালে অবস্থা যেন অত সহজ মনে হয় না। শক, হূণ, পাঠান, মোগল, হিন্দু, মুসলমান, দ্রাবিড়, আর্য, কিরাত, শবর—সবাইকে নিয়ে যে জাতি তার ইতিহাস অন্য দেশের মতো নয়। সে-কথা রবীন্দ্রনাথ স্পষ্ট ভাষায় বলে গিয়েছেন এবং তাঁর গান ‘জনগণমন’-এ তার স্পষ্ট স্বীকৃতি আছে।
জাতীয় সংগীত সম্বন্ধে বলতে গেলে স্বভাবতই জাতির ধারণাটা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। কারণ জাতীয় সংগীত কোনো সম্প্রদায় অর্থে জাতির গান নয়, ক্ষত্রিয় বা ব্রাহ্মণ, হিন্দু বা মুসলমানের গান নয়। জাতি সম্বন্ধে আমাদের এই পূর্বতন ধারণা থেকে উত্তীর্ণ হতে বহু সময় লেগেছে। এখনও আমরা উত্তীর্ণ হতে পেরেছি কিনা সন্দেহ। একরাষ্ট্র-পরিচালিত সমমনোভাবাপন্ন একটি বৃহৎ মানবসমাজকে আমরা আজকাল বলি জাতি। এর দৃষ্টান্ত পাশ্চাত্যে সর্বত্র। প্রায় সব দেশেই এক জাতির ভাষা একটা ; কোনো কোনো ক্ষেত্রে একাধিক ভাষা থাকলেও ভাষার পার্থক্যটা বড়ো না হয়ে সমমনোভাবটাই বড়ো হয়েছে। তাই তারাও জাতি। ভারতবর্ষে ভাষা অজস্র, ধর্মও বহু, আচার বিধিও অঞ্চলভেদে বহু। আমরা যখন বলি, উত্তরে হিমালয় থেকে দক্ষিণে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত একটি অখণ্ড ঐক্য বিরাজমান, তখন কথাটা হয়তো এক অর্থে ঠিকই বলি, তবু মনে রাখা দরকার এর মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমানের ধর্মের মধ্যেও আচার বিধিতে পার্থক্য আছে। এমনি করে আরও অন্যান্য সম্প্রদায়ের পার্থক্যকেও দেখানো যেতে পারে। তবু ইতিহাসের নিয়তি আমাদের সবাইকে একসূত্রে গেঁথেছে। আজ বহু বৈচিত্র্য ও বর্ণভেদ সত্ত্বেও আমরা একজাতি। এই বৈচিত্র্যকে নিয়ে যে জাতীয় সংগীত সেটাই আমাদের সংগীত। এ কথাটা মনে রাখার দরকার এইজন্যই যে, সম্ভবত পৃথিবীর আর কোনো দেশের জাতীয় সংগীতে বৈচিত্র্যকে স্বীকার করবার দরকার হয় না।
এই বৈচিত্র্যকে নিয়ে আত্মচেতনার অভিব্যক্তির একটি ইতিহাস আছে। আমাদের জাতীয় সংগীত তারই প্রবণতায় আত্মপ্রকাশ করেছে। আমাদের পূর্বতন সাহিত্যে বা শাস্ত্রে আজকের মতো রাষ্ট্রনির্ভর জাতিচেতনার কথা পাওয়া যায় না। এই জাতিচেতনার সূচনা হল ঊনবিংশ শতাব্দীতে। প্রথমে দেশচেতনা তারপরে জাতিচেতনা। যে-মাটিতে বা যে কুলে জন্মেছি, তার প্রতি আকর্ষণ মানুষ মাত্রেরই স্বাভাবিক। বাল্মীকি রামায়ণের বঙ্গীয় সংস্করণে একটি সুন্দর শ্লোক আছে :
ন সে স্বর্ণময়ী লঙ্কা রোচতে তাত লক্ষ্মণ।
জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী ৷৷
এই সমতা রাজনৈতিক অর্থে দেশপ্রীতি নয়, জন্মভূমির প্রতি স্বাভাবিক ভালোবাসা। এর কোনো কারণ খোঁজবার দরকার হয় না। উনিশ শতকে এই দেশপ্রীতিই সাহিত্যে ও সংগীতে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তার রূপ একটু অন্যরকমের হল। দেশ বলতে একটা বিশেষ ভৌগোলিক সীমায় সীমাবদ্ধ ভূমিকে বোঝানোর দরকার। ভারতবর্ষ এবং বঙ্গদেশ তখন আমাদের সাহিত্যে ও কবিতায় স্থান নিয়েছে। সাহিত্যে দেশচেতনার স্থান পাওয়ার তাৎপর্য গভীর। কারণ শাস্ত্রে বা পুরনো সাহিত্যে নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমায় আবদ্ধ কোনো অখণ্ড দেশের কথা প্রচলিত ছিল না। বিষ্ণুপুরাণে জম্বুদ্বীপের প্রশস্তি আছে। কিন্তু আমার দেশ বলে কবি কখনো নির্দিষ্ট সীমাকে নির্দেশ করেননি। ভারত বা বঙ্গভূমিকে স্বদেশ বলে নির্দেশ করে গৌরব বোধ করার দৃষ্টান্ত নেই। আমাদের পুরনো বাংলা সাহিত্যে সে-রকম কিছু পাওয়া যায় না। উনিশ শতকে ডিরোজিওর ইংরেজি কবিতায় প্রথম পাওয়া গেল To India my native land. বাংলা ভাষাতে ভারতবর্ষের উল্লেখ পাওয়া যায় ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায়। তিনিই প্রথম ভারতভূমিকে ‘জননী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন :
জননী ভারতভূমি আর কেন থাক তুমি
ধর্মরূপ ভূষাহীন হয়ে?
এটা ১৮৪৭ সালে লেখা কবিতা। তখন থেকেই ধরা যেতে পারে ভারতবর্ষ কবিদের চেতনায় জননীরূপে দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। বাংলাদেশ এবং বাঙালির কথা স্বাভাবিকভাবেই নানা উপলক্ষে পূর্ববর্তী লেখকদের লেখা থেকেই পাওয়া যায়। বাংলা ভাষাই ছিল এই বাংলাদেশচেতনার কারণ। সেটা বোঝা যায়, কিন্তু ভারতভূমিকে মাতৃভূমিরূপে গ্রহণ করে নেবার কল্পনা কীভাবে এসেছিল বলা যায় না। কয়েক বৎসর পর মধুসূদন লিখেছেন ‘বঙ্গভূমির প্রতি’। সেখানে বঙ্গভূমিকেই তিনি জননী স্বরূপা জ্ঞান করেছেন। আর তাঁর অন্তিম প্রার্থনা ছিল ‘জ্যোর্তিময় কর বঙ্গ ভারতরতনে’ (১৮৬৫)। এখানে ভারতবর্ষ ও বঙ্গদেশ মিশে গেছে।
দেশচেতনার সঙ্গে ক্রমে অনুভূত হল জাতিচেতনা। জাতিচেতনার সৃষ্টি বিশেষ তাৎপর্যসহ ঐতিহাসিক ঘটনা। যে-বঙ্গ এবং ভারতকে কবিরা দেশ হিসাবে গ্রহণ করে নিয়েছেন, তার অধিবাসীরা সবাই একটি সমাজে বদ্ধ। সেই সমাজ সম্বন্ধে একটা সমগ্রতা ও অখণ্ডতাবোধেই জাতিধারণার উদ্ভব। আগে আমরা ছোটো ছোটো গণ্ডিতে বাস করেছি। দেশচেতনা স্পষ্ট হয়ে উঠবার সঙ্গে সঙ্গে বৃহত্তর সমাজ বা জাতির অনুভব দেখা দিতে লাগল। নানা ধর্ম আছে তাতে, নানা মত এবং নানা রূপ নিয়ে এই বৃহত্তর জাতিকে আমার ক্ষুদ্রতর জাতির ঊর্ধ্বে স্থান দেবার কর্তব্যবোধ আমাদের কাছে নতুন আদর্শ স্থাপন করেছে। এই জাতিভাবনাটিও নতুন। তখনও পর্যন্ত ভারতীয়রা একজাতি কিনা—এ বিষয়ে বিচারবিশ্লেষণ আরম্ভ হয়নি কিন্তু অগোচরেই যেন একজাতীয়তাবোধ জেগে উঠেছে। কয়েক বছর পর বঙ্কিমচন্দ্র বঙ্গদর্শনে জাতিচেতনার বিশ্লেষণ করে লিখেছিলেন ভারতকলঙ্ক প্রবন্ধ (১৮৭৩)। তাতে ভারতীয়দের মধ্যে একজাতীয়তাবোধ গড়ে উঠবার বাধা কোথায়, তার ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা করেছিলেন। বিভিন্ন যুগে বহু জাতির মিশ্রণে ভারতীয় জাতির বর্তমান রূপ। তাই ভারতীয়দের মধ্যে এতো বৈচিত্র্য। রবীন্দ্রনাথ বলবার আগেই উনিশ শতকের মনীষীদের দৃষ্টিতে ভারতীয় ইতিহাসের এই দিকটি চোখে পড়েছিল। তবু ভারতীয়রা সবাই যে এতো বৈচিত্র্য নিয়েই এক জাতি, এ কথাটিও তাঁরা অনুভব করেছেন।
বৈচিত্র্যময় ভারতীয় জাতীয়তার সংগীত প্রথম শোনা গিয়েছিল ১৮৬৭ সালের হিন্দুমেলার অনুষ্ঠানে। হিন্দুমেলার পরিকল্পনা এসেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি থেকে। প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবগোপাল মিত্র। তাঁরা অনুপ্রেরিত হয়েছিলেন ঋষি রাজনারায়ণ বসুর দ্বারা। রাজনারায়ণ জাতীয় ‘গৌরবেচ্ছাসঞ্চারিণী সভাস্থাপনের প্রস্তাব’ নামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল দেশের লোকের মধ্যে জাতীয়তার ভাব সঞ্চারিত করা। এই ভাবটি নিয়ে নবগোপাল মিত্র আরম্ভ করেন হিন্দুমেলা ১৮৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল। দেশানুরাগ জাগিয়ে তুলবার উদ্দেশ্যে জাতীয় শিল্প প্রদর্শনী, দেশীয় খেলাধুলা, ব্যায়াম, কবিতাপাঠ ইত্যাদির আয়োজন হয়। এই মেলার উদবোধন হত সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘গাও ভারতের জয়’ গানটি দিয়ে।
মিলি সবে ভারতসন্তান, একতান মনপ্রাণ
গাও ভারতের যশোগান।
ভারতভূমির তুল্য আছে কোন স্থান?
কোন অদ্রি হিমাদ্রি সমান।
ফলবতী বসুমতী, স্রোতঃস্বতী পুণ্যবতী
শতখনি রত্নের নিধান।
হোক ভারতের জয়, জয় ভারতের জয়
গাও ভারতের জয়, কি ভয় কি ভয়
গাও ভারতের জয়।
অতঃপর এই গানে ভারতের অতীত গৌরবগাথা ও আদর্শ চরিত্রের উল্লেখের দ্বারা উদ্দীপনা সৃষ্টির প্রয়াসে জাতীয় সংগীতের পূর্বাভাস রচিত হয়েছে। ১৮৭৫-এ হিন্দুমেলায় বালক রবীন্দ্রনাথ যে ‘হিন্দুমেলার উপহার’ কবিতাটি পড়েছিলেন এই গানে ছিল তারই পূর্বসূত্র। বঙ্কিমচন্দ্র ১২৭৯-এর চৈত্র সংখ্যার বঙ্গদর্শনে রাজনারায়ণ বসুর ‘হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা’ বইটির সমালোচনায় এই গানটি সম্পূর্ণ উদ্ধৃত করে বললেন—
‘রাজনারায়ণ বাবুর লেখনীর উপর পুষ্পচন্দন বৃষ্টি হউক। এই মহাগীত ভারতের সর্বত্র গীত হউক। হিমালয় কন্দরে প্রতিধবনিত হউক। গঙ্গা যমুনা সিন্ধু নর্মদা গোদাবরী তটে বৃক্ষে বৃক্ষে মর্মরিত হউক। পূর্ব পশ্চিম সাগরের গম্ভীর গর্জনে মন্দ্রীভূত হউক। এই বিংশতি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়যন্ত্র ইহার সঙ্গে বাজিতে থাকুক।’
তখনও পর্যন্ত বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দে মাতরম গানটি কল্পনায় আসেনি। কিন্তু সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই গানটির মধ্যে দেশমূর্তি দেখা দিয়েছে, সেইসঙ্গে দেখা দিয়েছে জাতীয় উদ্দীপনা :
কেন ডর, ভীরু, কর সাহস আশ্রয়
যতোধর্ম স্ততো জয়।
ছিন্নভিন্ন হীন বল, ঐক্যেতে পাইবে বল
মায়ের মুখ উজ্জ্বল করিতে কি ভয়?
এর প্রায় দশ বৎসর আগে রঙ্গলালের পদ্মিনী উপাখ্যান কাব্যে রাজপুত স্বাধীনতার গৌরব কল্পনা করে কবি লিখেছিলেন :
স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়।
বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানে এই দুই গানের ভাবনির্যাস ছিল। সত্যেন্দ্রনাথের এই গানটিতে আর একটি বিশেষত্ব ছিল যার পূর্ণ অভিব্যক্তি ঘটেছে প্রায় পঁয়তাল্লিশ বৎসর পর রচিত রবীন্দ্রনাথের জনগণমন গানটিতে। জাতীয় ভাবের উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে গিয়ে কবি ভোলেননি ধর্মের জয়ের কথা। মনে রাখা ভালো, ‘যতোধর্ম স্ততো জয়’ এই মহাবাক্য উচ্চারণ করেছিলেন মহাভারতের যুদ্ধের প্রাক্কালে গান্ধারী। দুর্যোধন যখন জননীর কাছে আশীর্বাদ ভিক্ষা করতে গেলেন, তখন গান্ধারী বলতে পারেননি—তোমাদের জয় হোক। তিনি বললেন, যেখানে ধর্ম সেখানে জয়। আমাদের জাতীয় উদ্দীপনাতেও আমরা ধর্মকেই স্মরণ রেখেছি—যে-ধর্ম সর্বজনীন মানবধর্ম। আমাদের জাতীয় সংগীতের মধ্যে এই তিনটে বৈশিষ্ট্যই দেখতে পাই—দেশের ভৌগোলিক প্রতিমা, ঐক্য ও সংহতি চেতনা এবং ধর্মবোধ। এই তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি একান্তই আমাদের। পৃথিবীর অন্যান্য জাতির সংগীতে দেশের জন্য গৌরববোধ আছে, দেশমূর্তিকেও উজ্জ্বল করে তোলার প্রয়াস আছে সেই সঙ্গে আছে একত্রে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রেরণাদায়ক রৌদ্রভাব। রৌদ্রভাব আমাদের সেকালের প্রায় সব দেশাত্মবোধক গানেই থাকত। আজ মনে হয় তার দরকারও ছিল। একটি বিখ্যাত গান সরলাদেবীর ‘হিন্দুস্থান’। এই গান প্রথম গাওয়া হয়েছিল কলকাতায় কংগ্রেসের সপ্তদশ অধিবেশনে ১৯০১ সালে :
অতীত গৌরব বাহিনী সম বাণী, গাহ আজি হিন্দুস্থান
মহাসভাউন্মাদিনী সম বাণী, গাহ আজি হিন্দুস্থান।
কর বিক্রম বিভব যশ সৌরভ পূরিত সেই নাম গান
বঙ্গ বিহার উৎকল মারাঠা গুর্জর পঞ্জাব রাজপুতান
হিন্দু পার্সি জৈন ইসাই শিখ মুসলমান,
গাও সকল কণ্ঠে সকলভাবে—নমো হিন্দুস্থান।
জয় জয় জয় হিন্দুস্থান, নমো হিন্দুস্থান।
ভেদরিপু বিনাশিনী সম বাণী, গাহ আজি ঐক্য গান।
মহাবলবিধায়িনী সম বাণী, গাহ আজি ঐক্য গান।
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের অতীত গৌরববোধ, ভারতীয় জাতিসংহতি এবং প্রবল অনুপ্রেরণা এই গানটিতে সার্থকতর শিল্পরূপ লাভ করেছে। সংহতি ও বৈচিত্র্য একই সঙ্গে এতে আছে, রবীন্দ্রনাথের জনগণমন-এ সেই কল্পনারই নবরূপ।
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ওই গানটি যেমন সরলা দেবী ও রবীন্দ্রনাথের গানের পূর্বরূপ, তেমনি বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম’-এরও অঙ্কুর সেখানেই। এই গান বঙ্কিমকে কতখানি অভিভূত করেছিল, বঙ্কিমের শ্রদ্ধাপূর্ণ মন্তব্যই তার প্রমাণ। ১৮৭৫ সালে বঙ্কিম যখন ‘বন্দে মাতরম’ গান রচনা করেন, তখন এই গানটি তাঁর মনে ছিল না তা হতে পারে না। বঙ্কিম তখন দেশভাবনায় মগ্ন। কিছুকাল আগে সুহৃদ রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ‘প্রথম শিক্ষা বাংলার ইতিহাস’ বেরিয়েছে যাকে তিনি বলেছিলেন একমুঠো সোনা। বাংলাদেশ ও বাঙালির ইতিহাস নিয়ে বঙ্কিম বেশ কিছুদিন থেকেই জিজ্ঞাসু ছিলেন। বাংলার ইতিহাস নেই বলে তাঁর দুঃখও কম ছিল না। রাজকৃষ্ণের বইতে তিনি বাঙালির গৌরবের প্রমাণ পেলেন। তা ছাড়া ‘বন্দে মাতরম’ রচনার অন্য উপলক্ষ্য ছিল। আনন্দমঠ তখনও ভবিষ্যতের গর্ভে। সত্যেন্দ্রনাথের গানের সঙ্গে ‘বন্দে মাতরম’ গানের মিল প্রধানত দুদিক দিয়ে। দেশের একটা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরূপ দুজনের গানেই পাওয়া যায়, দুজনের গানেই আছে বীর্যের প্রণোদনা। ‘ফলবতী বসুমতী স্রোতঃস্বতী পুণ্যবতী’র ছবিটি বঙ্কিমের গানে সুজলা সুফলা মাতৃভূমির রূপ নিয়েছে।
যে রূপান্তর বঙ্কিম করলেন সেটির তাৎপর্য হল সুদূর প্রসারী। সত্যেন্দ্রনাথের গানটি মূলত বিবৃতিধর্মী, তাতে ভাবাবেগের স্বতঃস্ফূর্ততা কম। ‘বন্দে মাতরম’ গড়ে উঠল এক মাতৃমূর্তি, সংগীতের ঝঙ্কারে, ছন্দস্পন্দনে চিত্ররূপময়তায় ‘বন্দে মাতরম’ হল একটি পরিপূর্ণ সার্থক কবিতা। এই গানের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হল এর নারীরূপ। দেশকে জননী বলে সম্বোধন করেছেন আগের কবি, কিন্তু মায়ের মূর্তিতে তাকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেননি। ‘বন্দে মাতরম’-এর চোখে পড়বার মতো বৈশিষ্ট্য হল দুটি—একটি ওই দেবী বা মাতৃরূপ, অন্যটি এর বিষয়, বাংলাদেশ। সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং গণেন্দ্রনাথ যে-গান লিখেছিলেন, ভারতচেতনা তার অবলম্বন। কবি গোবিন্দচন্দ্র রায়ও লিখেছিলেন ‘কতকাল পরে বল ভারত রে! দুখসাগর সাঁতারি পার হবে।’ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন ‘মলিন মুখচন্দ্রমা ভারত তোমারি।’ হেমচন্দ্রের ভারতবিলাপ ভারতসংগীত প্রভৃতি কবিতাও বঙ্কিমের বঙ্গদর্শনের যুগের রচনা। এই পরিপূর্ণ ভারতীয় দেশচেতনার মধ্যে বঙ্কিম যে-সংগীত রচনা করলেন সেটি বঙ্গভূমিকে নিয়ে। আজকালকার সমালোচকেরা হয়তো বলবেন, বঙ্কিমের দেশচেতনা সংকোচনধর্মী। কথাটা নিয়ে তর্ক হতে পারে, কিন্তু কথাটা ঠিক নয়। যে-সময় তিনি ‘বন্দে মাতরম’ লেখেন, তার কিছু আগেই ভারত সম্বন্ধে প্রবন্ধও তিনি লিখছেন। তবু যে তিনি বাংলাদেশকেই তাঁর প্রগাঢ় দেশপ্রেমের অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে নিলেন, তার কারণ বঙ্গভূমি স্বভাবতই অধিকতর প্রত্যক্ষের বস্তু, বিশেষ করে ভাষার মাধ্যম থাকায়। এটা বলার দরকার নেই যে সপ্তকোটিকণ্ঠ কলকলনিনাদিত বঙ্গভূমির প্রশস্তি রচনার উদ্দেশ্য অবশ্যই বাঙালিকে জাতি হিসেবে আলাদা করে নেওয়ার জন্য নয়, সেটা তখন কল্পনাতেও ছিল না। বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতি সম্বন্ধে একাধিক প্রবন্ধ লিখলেও ভারতবর্ষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে জাতি হিসেবে ভাববার কোনো প্রমাণ কোথাও নেই।
এই বাংলাদেশকেই বঙ্কিম নারী প্রতিমায় রূপ দিলেন। তবে এই প্রতিমা ঠিক যে দুর্গা তা বলা চলবে না। তাঁকে বলেছেন ত্বং হি দুর্গা দশপ্রহরণধারিণী আবার তাঁকেই বলেছেন কমলা কমলদলবিহারিণী। অর্থাৎ তিনি দুর্গা এবং কমলা—কোনো একটা বিশেষ প্রচলিত রূপ তাঁকে দেননি। দুর্গার বরাভয় শক্তি এবং কমলার ঋদ্ধি সবকিছুরই তিনি সম্মিলিত প্রতিমা। আবার তিনি বাণীও। বঙ্কিমের দেশমাতৃকা শক্তি, ঐশ্বর্য, বিদ্যা, ধর্ম, মানুষের পরমার্থ বলতে যা বোঝায় সব কিছুরই প্রতীক। এবং তাঁর প্রত্যক্ষ রূপ হচ্ছে শস্যশ্যামলা শুভ্রজ্যোৎস্নাপুলকিত ফুল্লকুসুমিতদ্রুমদলশোভিত বঙ্গভূমির নিসর্গ প্রকৃতি। এই বর্ণনার ফলে এই গানটির মধ্যে এসেছে ভাবরূপ, শুধু ঐতিহাসিক তথ্য নয়, কিংবা প্রত্যক্ষ উন্মাদনা সৃষ্টিও নয়। অবশ্য হিন্দুর দুর্গামূর্তি লক্ষ্মী সরস্বতীকে নিয়ে অসুরবিনাশিনী শক্তির ভাবমূর্তি। আমরা এমন একটা শক্তির আরাধনা করি যে শক্তি অশুভকে বিনাশ করবে এবং সেই সঙ্গে বিদ্যা ঋদ্ধি এবং সিদ্ধি দেবে। সেই মূল শক্তির রূপকল্পনা করা হয় লক্ষ্মী সরস্বতী বেষ্টিত দশভুজা মূর্তিতে। বঙ্কিমের মাতৃমূর্তিতেও সব শক্তির সমাহার। কিন্তু প্রচলিত কল্পনাতে দুর্গা লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক গণেশের আলাদা আলাদা মূর্তি। ‘বন্দে মাতরম’-এর দেবীমূর্তি একজন, তিনি একাই সব বৃত্তি এবং কাঙিক্ষত ধর্ম অর্থ মোক্ষের প্রতীক। সুতরাং, মানুষ যে শক্তি বিদ্যা ও ধর্ম কামনা করে বঙ্কিমের দেশজননী সেই সবকিছুরই সংহত রূপ। এই কল্পনাতে দুর্গার প্রচলিত রূপ নেই, তবে মানুষের সকল কাম্যবস্তুর একটি রূপ কল্পিত, যার সঙ্গে মিশেছে স্বদেশের নিসর্গ রূপের চেতনা। সব মিলিয়ে বঙ্কিমের জননী হচ্ছেন প্রত্যক্ষ দেশচেতনা। কাব্য হিসেবে এর সার্থকতা হচ্ছে ভাবময়তার উত্তরণে। দেশের নিসর্গ প্রকৃতির সঙ্গে দেশের মানুষের বাসনা ও আকাঙক্ষাকে মিলিয়ে এর রচনা। বঙ্কিমের কমলাকান্তের একটি রচনায় কালসমুদ্রে নিমজ্জিতা দুর্গাকে আবার উদ্ধার করে নিয়ে আসবার স্বপ্ন আছে। সেখানে দুর্গাকেই বলেছেন ‘চিনিলাম এই আমার দেশ’। ব্যক্তিগত বর্ণনাতেও দেখা যায়, বঙ্কিমগৃহে কোনো এক দুর্গাপূজার রাত্রিতে তাঁর মনে ভাবের প্রেরণা এসেছিল। ‘বন্দে মাতরম’-এর দেশমূর্তির উৎস হিসেবে অষ্টমী পূজার দিনের দুর্গাধ্যান হয়তো কাজ করেছিল। অর্থাৎ বঙ্কিমের একটা প্রবর্তনা এসেছিল ধর্মানুষ্ঠান থেকে, কিন্তু তাঁর উদ্দিষ্ট বস্তু ধর্মীয় প্রতিমা নয়। মাতৃমূর্তি কল্পনাতেই ধর্মের রূপকল্প তিনি কাজে লাগিয়েছেন।
বোধ হয় দেশবোধকে সত্য এবং ভাবাবেগপূর্ণ করতে অভ্যস্ত ধর্মের সংস্কার বলাধান করে। রবীন্দ্রনাথের ‘জনগণমন’ গানটিতেও যাকে সম্বোধন করা হয়েছে তিনি প্রত্যক্ষভাবে দেশ নন, দেশের এবং মানবমাত্রেরই অধিষ্ঠাতা দেবতা—ব্রহ্ম। ব্রহ্মোপাসনায় তাঁকে স্মরণ করা হয় ‘পিতা নেঽসি’ বলে। তিনি পিতা, মাতা নন। অর্থাৎ নারীরূপে তাঁকে ভাবা হয়নি। জনগণমন গানটি সেদিন ব্রহ্মসংগীতরূপেই তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাতে নির্দিষ্ট হয়েছিল ১৯১১ সালে। ‘বন্দে মাতরম’ গানটি মনে ভাবাবেগের সৃষ্টি করে, শক্তি ও জ্ঞানের সঙ্গে অকল্যাণকে দূর করবার উৎসাহমূর্তি রচনা করে, জনগণমন গানে অনেকটা চিরন্তন ভাগ্যবিধাতার কল্পনায় মনকে শান্ত করে, নির্বেদ-জাতীয় ভাবমণ্ডল রচনা করে। এইজন্যই বন্দেমাতরম হিন্দুর ধর্ম চেতনা থেকে সৃষ্টি হলেও কর্মে ও অনুষ্ঠানে প্রবর্তিত করে—আমাদের জাতীয় আন্দোলনের ইতিহাসেই তার সাক্ষ্য আছে। এ কথা তো সকলেরই জানা যে জনগণমনের ভাগ্যবিধাতা কোনো সম্প্রদায়ের সংস্কার থেকে কল্পিত নয়, তিনি হিন্দু-মুসলমান যে-কোনো সম্প্রদায়েরই ধ্যানযোগ্য কল্পনা। ‘বন্দে মাতরম’-এর দেশজননী বিশেষ কোনো অনুষ্ঠেয় ধর্মের কল্পিত প্রতিমা না হলেও হিন্দুর প্রচলিত চিত্রকল্প দিয়ে তৈরি ; মন্দিরে মন্দিরে প্রতিমা গড়বার কল্পনাতে সেই সংস্কার অলক্ষ্যে কাজ করেছে। সেইজন্যই পরে একশ্রেণির মুসলমানদের মধ্যে এই নিয়ে আপত্তিও হয়েছে।
আনন্দমঠ ‘বন্দে মাতরম’ সন্নিবিষ্ট হবার পরেও দীর্ঘকাল এই আপত্তি শোনা যায়নি। আপত্তি হওয়ার রাজনৈতিক যোগাযোগ আমরা আলোচনা করছি না। জাতীয় সংগীত হিসেবে ‘বন্দে মাতরম’-এর বৈশিষ্ট্য আলোচনা করছি। আমাদের জাতীয় জাগরণে মুসলমান সম্প্রদায় দীর্ঘকাল নানা ঐতিহাসিক কারণে কিছু উদাসীন ছিল। তখনকার বাংলাসাহিত্য ও সমাজে হিন্দু ধর্মভুক্ত চিন্তা ও কর্মনায়কদেরই দেখতে পাই। বঙ্কিমও সে রকমই একজন ভাবুক। তাই তাঁর রচিত গানেও তার ছায়া পড়েছে। বিশেষ করে আনন্দমঠ প্রযুক্ত হওয়াতে এই গানের সাম্প্রদায়িক চেতনা যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ সেই বইতে আঠারো শতকের মুসলমান রাজশক্তি সম্পর্কে মন্তব্য অকরুণ।
কিন্তু ইতিহাসের এ তথ্য অস্বীকার করব কী করে যে এই গান জাতীয় জীবনে কী অসাধারণ প্রেরণা দিয়েছে। এই প্রেরণার কারণ ‘বন্দে মাতরম’-এর প্রত্যক্ষ দেশবর্ণনা ও মানবিকভাবের রূপায়ণ। সত্য সত্যই মানুষের মন যে ভাবের আলোড়নে আলোড়িত হয়, এই গানে তারই প্রতিফলন। তাই সহজেই এই গান মনকে উদবেলিত করে। রচনার পরেও কয়েকবছর বঙ্কিম গানটি প্রকাশ করেননি। তারপর ১৮৮২ সালে আনন্দমঠ এটি যথাযোগ্যভাবে সন্নিবিষ্ট হলে, বাঙালি এই গানের কথা জানতে পারে এবং আলাদা করে এটি খ্যাতিলাভ করে। ১৮৮৫ সালে ঠাকুরবাড়ির বালক পত্রিকায় ‘গান অভ্যাস’ বিভাগে এই গানটিকে উদ্ধৃত করে বিশেষিত করা হয় ‘বিখ্যাত’ বলে। সেইসঙ্গে একটি ছবিও ছাপা হয়েছিল হরিশচন্দ্র হালদারের আঁকা। ছবির বিষয় বহু সন্তান বেষ্টিত এক জননী। সেই জননী একজন সাধারণ বাঙালি মূর্তি, তাতে কোনো পৌরাণিক গরিমা আরোপিত হয়নি। ছবিটির নাম দেওয়া হয়েছিল ‘বন্দে মাতরং’। এটি যে বঙ্কিমের গান থেকেই অনুপ্রেরিত তাতে সন্দেহ নেই কিন্তু গানের দেবীর দেবী ঐশ্বর্য এতে দেখানো হয়নি। আনন্দমঠ সন্নিবিষ্ট হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিখ্যাত হয়ে পড়ার আরও নিদর্শন আছে। কবি হেমচন্দ্র লিখেছিলেন :
গাহিল সকলে মধুর কাকলি, গাহিল বন্দেমাতরম
সুজলাং সুফলাং মলয়জসশীতলাং সুখদাং বরদাং মাতরম।
১৮৮৬ সালে কলকাতার জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশন উপলক্ষে হেমচন্দ্রের এই কবিতা লেখা। এই অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ গেয়েছিলেন ‘আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে’ গানটি। ‘বন্দে মাতরম’ এই সভায় সত্য সত্যই গাওয়া হয়েছিল কিনা বলা যায় না। রবীন্দ্রনাথের পরিবার সমাজে সুপরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও সত্যেন্দ্রনাথ তখন সকলেরই পরিচিত। সেইজন্যই অনুমান করা যায় কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ তখন নবীন হলেও গান গাইবার জন্য আহূত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের এই গানটি রামপ্রসাদী সুরে, গানের বর্ণনাও খুবই সাধারণ আকুল ভাবের সরল অভিব্যক্তি:
আমরা মিলেছি আজ মায়ের ডাকে
ঘরের হয়ে পরের মতন ভাই ছেড়ে ভাই কদিন থাকে
প্রাণের মাঝে থেকে থেকে আয় বলে ওই ডেকেছে কে
সেই গভীর স্বরে উদাস করে—আর কে কারে ধরে রাখে ৷৷
এই গানে ‘বন্দে মাতরম’-এর ধ্রুপদী গাম্ভীর্য নেই, পৌরাণিক কল্পনা নেই, ‘বন্দে মাতরম’-এর মা যেন আমাদের ঘরের মা হয়ে এসেছেন, পুরাণের চণ্ডী যেমন রামপ্রসাদের আগমনি গানে ঘরের মেয়ে হয়ে এসেছিলেন। বঙ্কিমের মাতৃআহ্বান নানারূপে নানাভাবে ছড়িয়ে গিয়েছে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথের গানে কবিতায় সরল সুরের মধ্য দিয়ে দেশমাতাই নানাভাবে দেখা দিয়ে বাঙালি চিত্তকে ভরে দিয়েছেন।
আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি
চিরদিন তোমার আকাশ, তোমার বাতাস, আমার প্রাণে বাজায় বাঁশি
ও মা ফাগুনে তোর আমের বনে ঘ্রাণে পাগল করে
মরি হায়, হায় রে—
কিংবা
আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি
তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
কিংবা
সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে
সার্থক জনম মাগো, তোমায় ভালোবেসে।
ইত্যাদি বহুগানে রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকেই জননীরূপে আহ্বান করেছেন। দেশকে মা বলে ডাকাটা আমাদের রক্তের সংস্কারই বলতে পারি। এর কারণ খুবই সহজ—মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্কের মতো এতো সহজ স্বাভাবিক এবং নিকটতম সম্পর্ক আর নেই। শিশু মাকে সর্বদা ঘরে পায়, পিতা থাকেন তাঁর গাম্ভীর্য নিয়ে বাইরের কাজে।
বঙ্কিমের মাতৃভাবনার পৌরাণিক কল্পনা থেকে রবীন্দ্রনাথ সরে এসেছেন মায়ের লৌকিক রূপে। শুধু মাতৃভাবনায় নয়, রবীন্দ্রনাথ বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের যুগে আরও বহু স্বদেশি গান রচনা করেছিলেন। তার সবগুলি যে মাতৃরূপের প্রশস্তি তা নয়, আশা উৎসাহ উদ্দীপনা ভরসা জাগানোর জন্য সেগুলি রচিত। কিন্তু সেগুলি বাঙালি সমাজ ছাড়িয়ে প্রচারিত হয়নি। সেগুলি বাঙালিরই গান, বাঙালিরই সুর, বাঙালি হৃদয়কেই বিশেষভাবে স্পর্শ করে। বঙ্কিমের জাগানো বঙ্গচেতনারই পরবর্তী বিকাশ, তাই বোধ হয় বাঙালির মধ্যেই প্রচলিত। বিশেষ করে বঙ্গভঙ্গ নামক ঐতিহাসিক ঘটনার ফলে। একে বলতে পারি বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ আমাদের মধ্যে ফলপ্রসূ হয়নি, হয়েছে অনেক পরে ১৯৭২-এ বাংলাদেশ নামক স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্মের ফলে।
আবার ‘বন্দে মাতরম’ সংগীতের মধ্যে সপ্তকোটি বাঙালির কথা থাকলেও এ গানটিকে সর্বভারতই গ্রহণ করে নিয়েছিল জাতীয় সংগীত বলে। ১৮৯৬ সালে কলকাতা কংগ্রেসের প্রথম দিনের উদবোধন করেন রবীন্দ্রনাথ এই গানটি গেয়ে। তারপরেও জাতীয় কংগ্রেসে বিভিন্ন বৎসরে অধিবেশনের উদবোধন করা হয়েছে বন্দেমাতরম গান দিয়ে। এখানে অবশ্য একটি কথা বলা দরকার। রবীন্দ্রনাথ ১৮৯৬-র অধিবেশনে বন্দেমাতরম গাইলেন, প্রবোধচন্দ্র সেন অনুমান করেন, ‘তিনি সম্ভবত এই গানের প্রথম অনুচ্ছেদ সুখদাং বরদাং মাতরম পর্যন্তই গেয়েছিলেন। ১৯০০ সালে প্রকাশিত সরলাদেবীর ‘শতগান’ পুস্তকেও শুধু এই অংশটুকুরই রবীন্দ্রনাথের দেওয়া সুর পাওয়া যায়।’ পরে যখন জাতীয় সংগীত নির্বাচনের প্রয়োজন হয়, তখনও রবীন্দ্রনাথের মত ছিল এই যে ‘বন্দে মাতরম’কে যদি জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করতেই হয়, তবে ওই প্রথমাংশ টুকুকেই করা যেতে পারে।
‘বন্দে মাতরম’ গানটি কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই অনায়াসে প্রচারিত হয়ে গেল। দেশের মুক্তিকামী তরুণ সন্ত্রাসবাদীরা এই গানটিকে কণ্ঠে ধারণ করলেন। পরবর্তীকালে অনুশীলন সমিতি গঠিত হয় বঙ্কিমের অনুশীলন ধর্মের নাম নিয়ে, তাঁরা আনন্দমঠ ‘বন্দে মাতরম’ আর গীতা এই নিয়ে দেশের জন্য আত্মোৎসর্গে ব্রতী হলেন। ফলে এঁদের মুখে মুখে ‘বন্দে মাতরম’ বাংলার বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। অরবিন্দ-তিলক ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিয়ে গ্রহণ করে নিলেন। সখারাম গণেশ দেউস্কর বাংলার ভাবধারাকে মহারাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করবার অন্যতম বাহক হলেন। সরলাদেবী কাশীর কংগ্রেস অধিবেশনে সপ্তকোটিকে ত্রিংশকোটিতে পরিবর্তিত করে সর্বভারতের ক্ষেত্রে এর প্রযোজ্যতা প্রতিপন্ন করেছিলেন। শাসক ইংরেজও পরোক্ষে ‘বন্দে মাতরম’কে জাতীয় সংগীতের মর্যাদা দিতে বাধ্য হলেন যখন এই গান গাওয়া নিষিদ্ধ হল এবং ‘বন্দে মাতরম’ ধবনি উচ্চারণ করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হল। এই গানের গুরুত্ব স্বীকৃত হল এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকাতে আলোচনাযোগ্য হওয়ায়, বিদেশে ইংরেজি পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন আলোচনা প্রকাশিত হওয়ায়। আনন্দমঠ প্রধান উপলক্ষ্য হলেও গানের তাৎপর্য প্রাসঙ্গিক ভাবেই ব্যাখ্যাত হয়েছে।
লক্ষ করবার বিষয় এই যে ‘বন্দে মাতরম’ আর বঙ্গভূমির প্রশস্তি রইল না, সে হল সমগ্র ভারতের জাতীয় সংগীত। এরকম প্রশ্ন কেউ তুলে ছিলেন কিনা জানি না যে, এতে তো সমগ্র ভারতের অন্তরের কথা নেই, এ কেবল বাংলা অঞ্চলের কথা। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে ‘জাতিধর্ম’ বা nation এবং nationality নিয়ে নানা আলোচনার সূত্রপাত হল। সমগ্র ভারতবর্ষ এবং তার সভ্যতার প্রকৃতির আলোচনা চলতে লাগল। সেই আলোচনা করলেন রবীন্দ্রনাথ রামেন্দ্রসুন্দর ব্রহ্মবান্ধব প্রভৃতি মনীষী। রবীন্দ্রনাথের এ সময়ের বিভিন্ন লেখায় ভারতের ইতিহাসের নিজস্ব প্রকৃতি এবং তার বৈচিত্র্যধর্ম, ভারতচিত্তর মানবতাবোধ—এইসব বৈশিষ্ট্যগুলি ব্যাখ্যাত হতে থাকে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময়ে তিনি যেমন বঙ্গভূমিকে নিয়ে প্রচুর গান রচনা করেছিলেন, কথা ও কাহিনীর ‘দুই বিঘা জমিতে’ প্রণাম করে বলেছিলেন :
নম নম নম সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি
গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি।
তেমনি আবার সেই সময়েই লিখছেন :
দেশ দেশ নন্দিত করি মন্দ্রিত তব ভেরী
আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি
দিন আগত ওই ভারত তবু কই
সে কি রহিল লুপ্ত আজি সব-জন-পশ্চাতে
লউক বিশ্বকর্মভার মিলি সবা সাথে।
কিংবা ভারতবর্ষের অতি অপূর্ব ভৌগোলিক মাতৃমহিমা—
অয়ি ভুবনমনোমোহিনী
অয়ি নির্মলসূর্যকরোজ্জ্বল ধরণী জনকজননীজননী।।
নীল-সিন্ধুজল-ধৌতচরণতল অনিলবিকম্পিত শ্যামল অঞ্চল
অম্বরচুম্বিত ভালে হিমাচল শুভ্রতুষারকিরীটিনী।।
ধ্যানী ভারতবর্ষের রূপ—
ধ্যানগম্ভীর এই যে ভূধর
নদীজপমালা-ধৃত প্রান্তর
হেথায় নিত্য হেরো পবিত্র ধরিত্রীরে।
এই তৃতীয় গানটি সেই ভারতবর্ষেরই স্তুতি যে-ভারতকে কবি তাঁর নিজের দৃষ্টিতে দেখেছেন—শুধু কবির দৃষ্টিতে নয়, ইতিহাস-তত্ত্বজ্ঞের দৃষ্টিতে। ভারতবর্ষের যে-অধ্যাত্মসাধনা হোমরত তপস্বী প্রতীকে কবির নানা রচনায় প্রকাশিত, এখানে ভারতের হিমালয়-নদী প্রান্তরের প্রাকৃতিক চিত্রে তাই কাব্যরূপ লাভ করেছে। আবার ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ যে-বহুসংস্কৃতির দ্বন্দ্বমিলনের ইতিহাস রচনা করেছেন, ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রভৃতি প্রবন্ধে তিনি যে বহুজাতির মিলনমূলক সভ্যতার কথা পুনঃপুনঃ উচ্চারণ করেছেন তার ছবি এঁকেছেন এই কবিতাতেই :
কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে
কত মানুষের ধারা
দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে
সমুদ্রে হল হারা
হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড় চীন—
শকহুনদল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীন।।
এই ছবিটিই কবি আবার এঁকেছেন জনগণমন গানটিতেও। শেষ পর্যন্ত জনগণমনই ভারতবর্ষের জাতীয় সংগীত হল। আকস্মিকভাবে নয়, এ গানেরও ইতিহাস আছে।
এ গান রচিত হয় ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। রচনার একটি উপলক্ষ্য ছিল। এই উপলক্ষ্য নিয়ে অনেক তর্কবিতর্ক হয়েছে। আজ অবশ্য সংশয়াতীতভাবে তার অবসান হয়েছে। ১৯১১-র ৩০-এ ডিসেম্বর কলকাতায় পঞ্চম জর্জের আগমনের তিনদিন আগে কংগ্রেসের অধিবেশন হয়। ইতিপূর্বে দিল্লিতে ভারতসম্রাট বঙ্গভঙ্গ রহিত হওয়ার আদেশ দিয়েছেন। এজন্য বাঙালি নেতারা স্থির করেন কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে সম্রাটকে ধন্যবাদ দিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে। সেজন্য উপযুক্ত গানও চাই, গানটি রাজপ্রশস্তিমূলক হওয়া দরকার। সে-সময় রবীন্দ্রনাথের কথাই সবার মনে পড়ল। নেতৃস্থানীয় রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান জনৈক ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথকে এরকম একটি গান রচনা করে দিতে অনুরোধ করেন। তখন রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাতে—
‘রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনো বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, এই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল। তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জনগণমনঅধিনায়ক গানে সেই ভারত ভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন অভ্যুদয়বন্ধুর পন্থায় যুগযুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথি, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক।’
গানটি সম্রাটের রাজপ্রশস্তি নয় অবশ্যই, তবে রচনার উপলক্ষ্য ছিল সম্রাটের কলকাতা আগমন। কলকাতা কংগ্রেসের প্রথম দিনে গাওয়া হল ‘বন্দে মাতরম’, দ্বিতীয় দিনে গাওয়া হল জনগণমন এবং একটি হিন্দি রাজপ্রশস্তিমূলক গান ‘যুগজীব, মেরা বাদশা চহুঁ দিশ রাজ সবায়া’। এই গানটির রচয়িতা সরলা দেবীর স্বামী রামভুজ দত্ত চৌধুরী। তৃতীয় দিনে গাওয়া হল সরলা দেবীর ‘অতীত গৌরব বাহিনি’। রাজস্তুতিমূলক হিন্দিগানটি গাওয়ার দিনে জনগণমন গান গীত হওয়ায় এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে পরবর্তীকালে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানটির সৌন্দর্য সম্পর্কে কোনো সন্দেহ ছিল না বলেই এবং সেই গান অনুষ্ঠানের গৌরব বৃদ্ধি করবে বলেই গাওয়া হয়েছিল। প্রশস্তির উদ্দেশ্যে নয়। প্রশস্তির উদ্দেশ্যে ফরমায়েশ দিয়ে রচিত হয়েছিল হিন্দি গানটি। কিন্তু এই জনগণমন গানটিই কয়েকদিন পর মাঘ মাসের তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় মুদ্রিত হয়। তাতে পরিচয় হিসেবে লেখা হয় ‘ব্রহ্মসংগীত’। এর দ্বারা আর কোনো সংশয়ই থাকে না যে জনগণমনের ভারতভাগ্যবিধাতা পরব্রহ্ম ছাড়া কেউ নন, সম্রাট তো ননই, দেশও নয়। এতে জাতীয় সংগীত বলতে আমাদের যা ধারণা, দেশ-এর উদ্দিষ্ট নয় বলাতে এতে সেই ধারণার সমর্থন হয় না।
পরন্তু এই ব্রহ্মসংগীতটিই জাতীয় সংগীতরূপে ‘বন্দে মাতরম’-এর সঙ্গে গণ্য হয়েছিল অন্তত ১৯১৭ সাল থেকে। সেবারকার কলকাতায় অনুষ্ঠিত কংগ্রেস অধিবেশনেও এই গান গাওয়া হয় তৃতীয় দিনে। অবশ্য প্রথম দিনের উদবোধন হয়েছিল ‘বন্দে মাতরম’ দিয়েই। রবীন্দ্রনাথের জনগণমন গানটি সমকালীন সাময়িক পত্রের বিবরণে ‘Magnificient’ ‘Patriotic song’ বলে বর্ণিত হয়েছে। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন তাঁর বত্তৃ�তায় বললেন—It is a song of the victory of India. তারপর থেকেই এই গান জাতীয় সংগীত বলেই গণ্য হয়ে আসছে। আজাদ হিন্দ বাহিনীতে এর হিন্দি অনুবাদ জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ এর দুটি ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন।
ব্রহ্মসংগীতকে জাতীয় সংগীত রূপে গ্রহণ করায় বাধা হল না কেন? তার কারণ ওই গান বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যায়। ভারত ভাগ্যবিধাতা ব্রহ্ম বটে, কিন্তু তিনি যে ভারতের বিধাতা সেই ভারতেরই অধিবাসী আমরা। সেই ভারতের রূপ ফুটেছে এতে। সেই রূপ রবীন্দ্রনাথেরই সৃষ্ট, যার ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা দিয়েছেন নানা জায়গায়। এখানে আছে পঞ্জাব-সিন্ধু-গুজরাট-মরাঠা-দ্রাবিড়-উৎকল এবং বঙ্গ অর্থাৎ ব্যাপ্ত বিস্তীর্ণ এই ভারতভূমি যার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সম্পদ বিন্ধ্য হিমাচল যমুনা গঙ্গা প্রভৃতি পর্বত এবং নদী। সরলা দেবীর অতীত গৌরববাহিনী গানে এই বিস্তৃত অঞ্চলগুলির উল্লেখ আছে। কবি এইসব অঞ্চলে ব্যাপ্ত জনসমাজের দিকে তাকিয়ে তাদেরই অন্তরের প্রার্থনাকে ভাষা দিয়েছেন। এই সমাজে আছে হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন, পারসিক, মুসলমান এবং খ্রিস্টান। এই বিস্তৃত ভারতসমাজ যাকে অন্য কবিতায় বলেছেন মহামানবসাগর। তারা পেরিয়ে এসেছে অনেক দুঃখের রাত্রি, অনেক সংকটের মুহূর্ত। তাকে তিনি বলেছেন :
পতনঅভ্যুদয়বন্ধুর পন্থা যুগ যুগ ধাবিত যাত্রী
হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।
দারুণ বিপ্লব মাঝে তব শঙ্খধবনি বাজে
সঙ্কট দুঃখত্রাতা।
আমাদের এত বৈচিত্র্য, এত স্ববিরোধিতা, এত বিপ্লব থেকে উত্তীর্ণ করিয়ে দিতে যিনি পারেন, তিনি ভারত ভাগ্যবিধাতা এবং তিনি ঐক্যবিধায়ক।
সুতরাং, জনগণমন গানের মূল মর্মটি হচ্ছে বিচিত্রের মধ্যে ঐক্য। বিচিত্রকে নিয়েই এক ভারতীয় জাতি। অন্যত্র রবীন্দ্রনাথ বলেছেন :
ভারতবর্ষের চিরদিনই একমাত্র চেষ্টা দেখিতেছি, প্রভেদের মধ্যে ঐক্যস্থাপন করা, নানা পথকে একই লক্ষ্যের অভিমুখীন করিয়া দেওয়া এবং বহুর মধ্যে এককে নিঃসংশয়রূপে অন্তরতররূপে উপলব্ধি করা, বাহিরের যে সকল পার্থক্য প্রতীয়মান হয় তাহাকে নষ্ট না করিয়া তাহার ভিতরকার নিগূঢ়যোগকে অধিকার করা।
এই গানটি নিছক গান নয়, এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ভারত ইতিহাস পাঠও আছে। প্রায় ১৯০১ থেকে ১৯১২ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের যে দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট ছিল নানা প্রবন্ধে কবিতায় এবং গোরা উপন্যাসে—এই গানটিতে তারই সংহত অভিব্যক্তি। সেই অর্থেই জনগণমন ভারতীয় জাতির গান। ভারতীয় জাতির বৈশিষ্ট্য এক ধরনের ধর্মপ্রাণতায়। সংকীর্ণ অর্থে ধর্ম নয়, উদার অর্থে সেই নৈর্ব্যক্তিক দৈবানুভবকে কবি এই কবিতায় ফুটিয়ে তুলেছেন। সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানে আছে ‘যতো ধর্মস্ততো জয়’। সেই ধর্মবোধ থেকে রবীন্দ্রনাথও এক পরম নৈর্ব্যক্তিক বিধাতার অনুভব লাভ করেছেন। তিনিই ভারতভাগ্যবিধাতা। দেশানুভবের সঙ্গে ঈশ্বরানুভবকে মেলানো অন্য দেশের জাতীয় সংগীতের তুলনায় অভিনব অবশ্যই। কিন্তু এই অনুভব থাকাতে সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ কলুষমুক্ত হয়েছে। য়ুরোপে ধর্মহীন দেশচেতনার পরিণাম তো আমরা জানি। ‘প্রতিনিধি’ কবিতাতে শিবাজির রাজধর্মের নির্দেশ গুরু রামদাস দিয়েছিলেন :
পালিবে যে রাজধর্ম
জেনো তাহা মোর কর্ম
রাজ্য লয়ে রবে রাজ্যহীন।
এই আত্মবিমুখ ত্যাগধর্মের উৎস এক ধর্মবোধ। সেই ধর্মকেই রবীন্দ্রনাথ ভারতের জাতীয় সংগীতে নিত্যস্মরণীয় করে রাখতে চেয়েছেন।
এই ভাবটি মনে রাখলে বঙ্কিমের ‘বন্দে মাতরম’-এর সঙ্গে এর একটা ভিন্নতর দৃষ্টি বোঝা যায়। বঙ্কিম দেশজননীর অভয়মূর্তি রচনা করেছেন ‘দ্বিসপ্তকোটিভুজৈর্ধৃতখরকরবাল’ এবং ‘বহুবলধারিণী’র উল্লেখ করে। ‘বন্দে মাতরম’-এ মায়ের শাসক এবং পালকরূপ দুইই আছে। এই প্রভাবেই রবীন্দ্রনাথও বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় লিখেছিলেন :
ডান হাতে তোর খড়গ জ্বলে বাঁ হাত করে শঙ্কাহরণ
দুই নয়নে স্নেহের হাসি ললাটনেত্র আগুনবরণ।
এই মূর্তি তিনি জনগণমন গানে দেননি। তাতে এনেছেন শান্তি সহিষ্ণুতা মৈত্রী ও ঐক্য। বঙ্কিমের গানে উদ্দীপনা, অধীরতা, চাঞ্চল্য, এককথায় রজোগুণ। রবীন্দ্রনাথের গানে ভারতভাগ্যবিধাতার ধ্যান ও তাঁর প্রতি আত্মনিবেদন।
