হ্যালো জেন্টলম্যান।
ব্লন্ড চুল। টিপিক্যাল আমেরিকান উচ্চারণে মে আই। বলে একটি ফাঁকা চেয়ারে বসে পড়ল লোকটি। হংকং-এর কাই টেক এয়ারপোর্টের ভি টেন রেস্তোরাঁয় বাইরের কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এই ছোট্ট পরিসরটি শুধুই এয়ারক্র্যাফট ক্রু, পাইলট আর গ্রাউন্ড মেইনটেনান্স ইঞ্জিনিয়ারদের জন্য। ১৯৫৫ সালের ১১ এপ্রিল। প্রচণ্ড গরম পড়েছে। ভেতরে কুলার চলছে। তবুও ঘামছেন এয়ার ইন্ডিয়া সেভেন ফোর নাইন এ এয়ারক্র্যাফটের পাইলট ডি কে জাতার, কো পাইলট এম সি দীক্ষিত, মেইনটেনান্স ইঞ্জিনিয়ার অনন্ত কার্নিক, নেভিগেটর জে সি পাঠক। এয়ারহোস্টেস গ্লোরিয়া বেরিকে দেখা যাচ্ছে না। সে কোথায় গেল? কার্নিক বললেন, গ্লোরিকে দেখলাম ডিউটি ফ্রির দিকে যেতে। হাসলেন পাঠক। আরে এই একদিনের মাত্র জার্নি। তার মধ্যেও মিস গ্লোরি আবার কেনাকাটা করবে? উফফ, আমার বউও গেলে ছেঁকে ধরবে কী কী এনেছি হংকং থেকে? কালই তো বম্বে ফেরত যাব। কী দরকার ভাই পয়সা খরচ করে। সকলেই হেসে উঠলেন উচ্চস্বরে। ঠিক তখন সেই আগন্তুকের প্রবেশ। একবারও জানতে চাইল না ওই টেবিল বুকড কিনা..একবারও টেবিলে বসা অন্যদের অনুমতির অপেক্ষাই করল না..। স্রেফ ‘মে আই’ বলে বসে গিয়ে প্রথম প্রশ্ন সোজা ক্যাপ্টেন জাতারের দিকে তাকিয়ে, আপনারা তো চাইনিজ ডেলিগেশন নিয়ে বান্দুং যাচ্ছেন? তাই না? এয়ার ইন্ডিয়ার ক্রু ও পাইলটরা পরস্পরের দিকে একবার দ্রুত চোখাচোখি করলেন। কেউ কোনো উত্তর না দিয়ে তীক্ষ্ণভাবে তাকিয়ে রইলেন আগন্তুকের দিকে। সে অগ্রাহ্য করল। আবার বলল, এইসব চিংকসগুলো খুব সিক্রেটিভ হয়..আপনাদের কিছুই বলছে না তাই না? চিনা প্রতিনিধিদের ‘চিংকস’ বলে লোকটি বুঝিয়ে দিল সে অবশ্যই আমেরিকান। কিন্তু কে এই লোকটি? এয়ারপোর্টের স্টাফ? আজ হংকং এয়ারপোর্ট থেকে এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিশেষ চার্টার্ড প্লেন যে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং-এ যাবে একঝাঁক চীনের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি নিয়ে, সেটা আপাতত গোপন আছে। একমাত্র এয়ারপোর্টের স্টাফদের পক্ষে জানা সম্ভব। এমনকী কোনো অন্য ফ্লাইট রাখাই হয়নি ওই সময়সীমায়। গোপনীয়তা বজায় রাখতে মিলিটারি রানওয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ লোকটি জানল কীভাবে? কোন ডিপার্টমেন্ট? আপনারা তো বাই ইভনিং রিচ করবেন জাকার্তা তাই না? উত্তরের অপেক্ষা না করে প্রশ্নের পর প্রশ্ন। এবং মুখে একটা কূট হাসি ঝুলিয়ে। একটু কড়াভাবে কিছু বলতে যাচ্ছিলেন দীক্ষিত। তখনই এয়ারপোর্টের এক কর্মী এসে গেলেন। ক্যাপ্টেন জাতারকে তিনি বললেন, স্যার, প্যাসেঞ্জারস লাগেজ লোড করা কমপ্লিট। কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স? জানতে চাইছেন ক্যাপ্টেন! একটু থমকে সেই কর্মী উত্তর দিলেন, না কাস্টমস এক্সামিনেশন নিডেড স্যার.. দে আর ডিপ্লোম্যাটস। সামনের লোকটির মুখে একথা শুনে চাপা হাসি। হঠাৎ সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ওকে জেন্টলম্যান…হ্যাভ আ নাইস জার্নি। বলেই দ্রুত হেঁটে চলে গেল। সকলেই এক মুহূর্তের জন্য চিন্তান্বিত। লোকটি কে? কেনই বা এল? রহস্যময় কিছু আচরণ করে আবার উধাও হয়ে গেল! এয়ারপোর্ট কর্মীকে জিজ্ঞাসা করা হল এই বিদেশি লোকটা কে? চিনতে পারছ? সেই কর্মী মাথা নাড়িয়ে বললেন, আমি তো জানি না স্যার…চিনি না..।
ট্রানজিট ড্রিল সমাপ্ত। রিফুয়েলিং শেষ। এবার উড়ে যেতে প্রস্তুত ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’। এই এয়ারক্র্যাফটের নাম। প্যাসেঞ্জার কারা? চীনের একদল হাই পাওয়ার প্রতিনিধি। কিন্তু শেষ মূহূর্তেও তাঁদের নাম পরিচয় জানা যাচ্ছে না। একেবারে টেক অফের পর তাঁদের টিকিট চেক করা হবে। সেই সময়, একটি লিস্ট তৈরি করে রাখতে হবে এয়ারক্র্যাফটে। সেটি বান্দুং-এ গিয়ে জমা করতে হবে চাইনিজ আর ভারতীয় অফিসিয়ালদের হাতে। আপাতত এটাই বলে দেওয়া হয়েছে এই এয়ারক্র্যাফটের কর্মীদের। কিন্তু সব কিছু চাপা থাকে? ভারতের এয়ারইন্ডিয়ার এই হাই প্রোফাইল বিমানে যে চীনের প্রতিনিধিরা যাবেন, তার মধ্যে থাকার কথা স্বয়ং চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইয়ের, সেকথা ক্যাপ্টেন জাতারের এই টিম জানে। তাই এত গোপনীয়তা? আফ্রো এশিয়ান কনফারেন্স হবে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায়। জওহরলাল নেহরু যার প্রধান উদ্যোক্তা। এপ্রিলের ১৮ থেকে ২৪ হবে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং-এ। তাই তার নাম বান্দুং কনফারেন্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নির্জোট আন্দোলনকে আরও অগ্রসর করতে সম্মেলনের সফল হওয়া খুব দরকার। সবেমাত্র স্বাধীন হওয়া এশিয়া আর আফ্রিকার ২৫টি রাষ্ট্র মিলে এই সম্মেলনের আয়োজক। বোম্বে থেকে পিকিং। পিকিং থেকে ব্যাংকক। ব্যাংকক থেকে হংকং। হংকং থেকে জাকার্তা। এই হল এয়ার ইন্ডিয়ার রুট। চীনের অনুরোধে জওহরললাল নেহরু এয়ার ইন্ডিয়াকে পাঠিয়েছেন ওই হাইপ্রোফাইল ডেলিগেট টিমকে জাকার্তা নিয়ে আসার জন্য।
গুড আফটারনুন জেন্টলমেন…এয়ার ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল ওয়েলকামস ইউ অ্যাবর্ড দ্য কাশ্মীর প্রিন্সেস…দ্য লোকাল টাইম ইজ টুয়েলভ পাস্ট টেন আওয়ারস….উই আর অ্যাবাউট টু টেক অফ..। মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এল অন বোর্ড এয়ারক্র্যাফটের মধ্যে। গ্লোরিয়া বেরি। একমাত্র এয়ারহোস্টেস। নর্মাল রুটিন হল লেডিস অ্যান্ড জেন্টলমেন বলা। এক্ষেত্রে শুধুই জেন্টলমেন বলার কারণ হল এয়ারক্র্যাফটে কোনো মহিলা যাত্রী নেই। আকাশ নীল, একদিকে সমুদ্র। তিনদিকে পাহাড়। হংকং এয়ারপোর্টের এই অংশটিতে ল্যান্ডিং টেকঅফের জন্য চাই প্রচণ্ড অভিজ্ঞ আর আত্মবিশ্বাসী কোনো পাইলট। যেমন এই ক্যাপ্টেন জাতার। তিনি অনায়াসে এসব টেক অফ করে চলেছেন বিগত ৮ বছর ধরে। সাত ঘণ্টা ত্রিশ মিনিটের নন স্টপ ফ্লাইট শুরু করল কাশ্মীর প্রিন্সেস। এবং ততক্ষণে এটিসি থেকে কোড ল্যাংগুয়েজে পাইলটকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে চৌ এন লাই..চিনের প্রিমিয়ার বিমানে নেই। ওঠেননি। কেন? আশ্চর্য তো! ভিআইপি মুভমেন্ট লাস্ট মোমেন্টে ক্যান্সেল হলে আগে থেকে জানানো নিয়ম। সেসব করা হল না। অ্যানাউন্সমেন্টের পর ফ্লাইট। মেইনটেনান্স ইঞ্জিনিয়ার অনন্ত কার্নিকের পাশে এসে বসলেন গ্লোরিয়া। বললেন, আমি এসব ভিআইপি ফ্লাইট পছন্দ করি না ইউ নো..। কার্নিক জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে তাকালেন। গ্লোরিয়া একটা সফট ড্রিংকসের গ্লাস এগিয়ে দিয়ে বললেন, সিকিউরিটি নিয়ে ভয় লাগে। আর এত কড়াকড়ি নিয়ে কাজ করা যায় নাকি? কার্নিক হাসলেন।
আরে ধুস…একদম এসব ভেব না। আই ক্যান অ্যাসিওর ইউ..। কিচ্ছু চিন্তা নেই। কাল এই সময় আমরা সবাই বম্বে। লিভ ইট। এনজয় দ্য ড্রিংক। তোমারটা কি অরেঞ্জ? গ্লোরিয়া হেসে বলল, জানো তো ডিকুনহো ক্যামেরা এনেছে। ডিকুনহো হলেন একজন কেবিন ক্রু। তাঁর ফোটো তোলার শখ সবাই জানে। জাকার্তায় মাত্র কয়েকঘণ্টা থাকা। আজ সন্ধ্যায় পৌঁছে, কাল ভোরেই ব্যাক। এইটুকুর জন্য আবার ক্যামেরা! পাগল আছে ডিকুনহো। হাসলেন দুজনেই। কার্নিকের খিদে পেয়েছে। উঠে গিয়ে দুটো স্যান্ডউইচ, একটা কেক আর কফি নিয়ে রেডিও অফিসারের টেবলে বসলেন। ঘুম ঘুম পাচ্ছে।
প্রায় আড়াই ঘণ্টা কেটে গিয়েছে। সঠিক রুটে এগোচ্ছে ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’। ঠিক আধ ঘণ্টা পর ককপিট থেকে বেরিয়ে এলেন ক্যাপ্টেন জাতার। আপাতত প্রিন্সেসের দায়িত্ব কো পাইলটের হাতে। একটা কফি নিয়ে ক্যাপ্টেন জাতার নেভিগেটর জে সি পাঠকের কাছে এসে বললেন, পাঠক, আমরা ঠিক কোথায়? পাঠক চট করে উঠে দাঁড়িয়ে সসম্ভ্রমে হাতে একটা পেনসিল তুলে নিয়ে চার্টের উপর রাখলেন। বললেন, স্যার, এই যে..আমরা এই মাত্র প্যারাকেল আইল্যান্ড ক্রস করলাম। এখন বম্বে রিফের উপর দিয়ে যাব। বম্বে রিফ? হাসলেন জাতার। কী আশ্চর্য ব্যাপার দ্যাখো পাঠক! সাউথ চায়না সমুদ্রের একটা ছোট কোরালের টিলার নাম কে যেন দিয়েছে ভারতের একটা শহরের নামে..। অদ্ভুত না? পাঠকও হাসলেন। ককপিটে ফিরে এসে দীক্ষিতকে সিঙ্গাপুর কন্ট্রোলকে ধরতে বললেন ক্যাপ্টেন জাতার। দীক্ষিত মাইক্রোফোন নিয়ে সিঙ্গাপুর কন্ট্রোল টাওয়ার ট্রাই করছেন। হ্যালো সিঙ্গাপুর..দিস ইজ ভিক্টর ইকো পাপা কলিং..(এটাই হল কাশ্মীর প্রিন্সেসের রেডিও কল সাইন, কোড ল্যাংগুয়েজ)। পজিশন ল্যাটিচিউড ফোর নর্থ অ্যান্ড লংগিচিউড ওয়ান ও থ্রি ইস্ট…হাইট এইট্রিন থাউজ্যান্ড ফিট…। সিঙ্গাপুর কন্ট্রোল রুমের ভয়েস স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে… বেশ চিৎকার করে জানতে চাইছে, চাইনিজ প্রিমিয়ার কি এয়ারক্র্যাফটে আছেন? দীক্ষিত তাকালেন ক্যাপ্টেনের দিকে। ক্যাপ্টেন জাতার মাথা নাড়ার পর দীক্ষিত মাইক্রোফোন মুখের কাছে নিয়ে এসে বললেন, নেগেটিভ….। অর্থাৎ না, তিনি নেই। বাট এরকম প্রশ্ন মিড এয়ারে পাইলটকে করার মানে কী? আর তখনই…
ভুউউস! শোঁ..শোঁ…শোঁ…। আচমকা তীব্র শব্দ শোনা গেল। প্রায় হন্তদন্ত হয়ে দরজা খুলে ঢুকে এলেন পাঠক। স্যার…রাইট উইং এ ফায়ার..। ফায়ার? আগুন? হ্যাঁ স্যার। তার আগে ব্লাস্ট হয়েছে ব্যাগেজ কম্পার্টমেন্টের কাছে। ব্লাস্ট? তাহলে কি স্যাবোটেজ? একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল ককপিটে। নিজের কেবিনে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন অনন্ত কার্নিক। মেইনটেনান্স ইঞ্জিনিয়ার। প্রবল হইচইয়ের শব্দে ঘুম ভাঙল। উঠেই বেরিয়ে এসে দেখলেন গ্লোরিয়ার মুখ হলুদ। চোখ স্থির। এক্সট্রা লাইফ জ্যাকেট বের করছে। কী হয়েছে গ্লোরি? ফ্যাকাশে ভাবে হাসার চেষ্টা করল গ্লোরিয়া…ফায়ার…। অনন্ত কার্নিক এয়ারহোস্টেস গ্লোরিকে দুহাতে ধরে ঝাঁকাতে শুরু করলেন, বি ব্রেভ গ্লোরি…কোথায় ফায়ার?..আমাকে বলো… রিয়ার ব্যাগেজ কম্পার্টমেন্টে। ছুটে ককপিটে গেলেন কার্নিক। তাকালেন ক্যাপ্টেন জাতার। সেই সময় দীক্ষিত ঠান্ডা স্বরে জানতে চাইলেন, ক্যাপ্টেন, ‘মে ডে’ সিগন্যাল দেব? ‘মে ডে’ সিগন্যাল হল আকাশে উড়ান চলাকালীন বিরাট বিপদে পড়া এয়ারক্র্যাফটের এস ও এস কোড ওয়ার্ড, যার অর্থ যে কোনো সময় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে….যে কোনো ঘটনা হতে পারে, এমনকী ক্র্যাশ করার আগের মুহূর্তে পাইলট ইস্যু করেন ‘মে ডে’ সিগন্যাল।
এক মুহূর্ত ভাবলেন ক্যাপ্টেন। তারপর বললেন, এখনই দরকার নেই। আমি একটু ট্রাই করি কী করা যায়। শীতল স্বর ক্যাপ্টেনের। কার্নিক বললেন, ক্যাপ্টেন একটাই অলটারনেটিভ আছে.. ডিচ ইট…(অর্থাৎ সমুদ্রের জলে এয়ারক্র্যাফটকে ফেলা) তার আগে পরে ইমার্জেন্সি ডোর ওপেন করে সবাইকে বের করা হবে লাইফ জ্যাকেট দিয়ে। ঠিক তখনই ডি কুনহা এসে জানালেন চরম দুঃসংবাদ। হাইড্রলিক সিস্টেম ফেল করেছে স্যার। সর্বনাশ। তার মানে তো ক্র্যাশের দিকে এগোচ্ছে। সকলের মুখ সাদা হয়ে যাচ্ছে। কোনো আশা নেই? ক্যাপ্টেন জাতার শুধু কো পাইলটকে বললেন, ডিক্কি তুমি কন্ট্রোল নাও। আমি একটু দেখে আসি ফায়ারের কী অবস্থা.. তারপর দেখি কী করা যায়। দীক্ষিত অটোমেটিক পাইলট কন্ট্রোল সুইচ অফ করে ম্যানুয়াল কনভারসন করতে শুরু করলেন। কারণ ততক্ষণে বাঁদিকে হেলে যাচ্ছে এয়ারক্র্যাফট। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ককপিটে ফিরে এলেন ক্যাপ্টেন। আর ধীর কণ্ঠে বললেন, দীক্ষিত মে ডে সিগন্যাল পাঠাও। ততক্ষণে কার্নিক তাঁর কাজে নেমেছেন। কীভাবে আগুন লাগল? বিস্ফোরণের ফলে প্রথম সন্দেহ হয়েছিল। কিছুপরেই নিশ্চিত হওয়া গেল কেন এই বিস্ফোরণ আর কেন এই আগুন দ্রুত ছড়াচ্ছে। টাইম বম্ব! রাখা হয়েছিল রাইট হুইলের উপরের ক্যাভিটিতে। আর তার কাছেই ফুয়েল ট্যাংক। সেই টাইম বম্ব ব্লাস্ট করেছে। গ্লোরিয়া আর ডি কুনহোকে বলা হল ফায়ার এস্টিংগুইশার নিয়ে চেষ্টা করতে। ততক্ষণে ভিতরে চলে এসেছে আগুন। কিন্তু ওই লেলিহান আগুন সামান্য হ্যান্ড এস্টিংগুইশার দিয়ে সামলানো সম্ভব নয়। তাহলে উপায় কী? ততক্ষণে ভয়ংকরভাবে প্লেন দুলছে। কারণ প্রায় রাইট উইং ভস্মীভূত। একটু পরই ফুয়েল ট্যাংকে আগুন পৌঁছবে। তারপর মিড এয়ারেই বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী। একমাত্র উপায় ছিল কাছে কোনো ভূমিখণ্ডে ল্যান্ড করা। কিন্তু তা সম্ভব নয়। কারণ সবথেকে কাছের ভূমিখণ্ড আপাতত সিঙ্গাপুরে। প্রায় ৩৫০ মাইল দূরে। তাহলে? অবশেষে যেটি প্রত্যাশিত তাই স্থির হল। ক্যাপ্টেন জাতার জানিয়ে দিলেন আমরা ডিচ করছি। অর্থাৎ জলেই ঝাঁপ দেবে ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’। এতক্ষণে ককপিটের এই সিদ্ধান্তগ্রহণের আলোচনায় কারও মাথায় আসেনি প্যাসেঞ্জারদের কথা। সেখানে কী হচ্ছে? জলে ঝাঁপ দিতে হলে এখনও সমস্ত যাত্রীকে তো তৈরি করতে হবে! অনন্ত কার্নিক কেবিনের দরজা খুলে সামনে এসেই হতভম্ব হয়ে গেলেন। প্রত্যেক যাত্রী নিজেদের সিটে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। আর প্রত্যেকের পরনে লাইফ জ্যাকেট। মুখের সামনে ইতিমধ্যেই অক্সিজেন মাস্ক ঝুলছে। অর্থাৎ তাঁরা ককপিটের মধ্যে যখন কী করা হবে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছিলেন, তখন একাকী এয়ার হোস্টেস গ্লোরিয়া নিজের কাজটি সুসম্পন্ন করে চলেছেন নিঃশব্দে। প্রত্যেক যাত্রীর চোখেমুখে স্পষ্ট আতঙ্ক। কয়েকজন প্রায় কাঁদছেন। সকলেই চাইছেন ইমার্জেন্সি ডোর খুলে দেওয়া হোক। অন্তত কিছুটা হলেও বাঁচার চান্স থাকবে ঝাঁপ দিলে। ততক্ষণে পোলান্ড থেকে আসা এক যাত্রী বুকে চেপে বসে পড়েছেন। চোখমুখ লাল। হার্ট অ্যাটাক হল নাকি? গ্লোরিয়া ছুটে গিয়ে তাঁকে ফার্স্ট এইড দেওয়ার চেষ্টা করলেন। সকলেই প্রায় জানালা থেকে বাইরে তাকাচ্ছেন। তাকিয়ে আছেন গ্লোরিয়া। তাকিয়ে আছেন কার্নিক। তাকিয়ে আছেন পাঠক। যাত্রীদের চোখে শূন্যতা। কারণ জানালা থেকে বাইরে তাকানোর অর্থ জীবনের শেষ কয়েকটি মুহূর্ত বাইরের জগৎ, এই পৃথিবীর দৃশ্যকে দেখে নেওয়া…। এক মিনিট…দু মিনিট…তিন মিনিট…চার মিনিট… কয়েকজন যাত্রী চোখ বুজে ফেললেন। কেউ আর কোনোদিন নিজের পরিবারকে দেখতে পাবেন না। কেউই আর ছেলেমেয়ের মুখ দেখতে পাবেন না। বাঁদিকের জানালার দিক থেকে প্রথম ব্লাস্ট। আর আগুন এল কেবিনে। নেভিগেটর জি সি পাঠকের হাতে তখনও চার্ট। কারণ তাঁকেই বেছে দিতে হবে ঠিক কোথায় ঝাঁপ দেবে কাশ্মীর প্রিন্সেস। বাঁচার ঝাঁপ হবে? নাকি মৃত্যুঝাঁপ হবে? ততক্ষণে ওই মরণপণ পরিস্থিতির মধ্যেই সকলের মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে এক উত্তর না মেলা প্রশ্ন। যে উত্তরটি না পেয়েই তাঁদের চলে যেতে হবে পৃথিবী ছেড়ে। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। আপাতত শেষ বারের বাঁচার আশা। পাঠক জানাচ্ছেন সামনেই ইন্দোনেশিয়া আর সিঙ্গাপুরের মাঝে নাতুনা গ্রুপ অফ আইল্যান্ডস। সেখানে পাহাড়। আর জলে ঘেরা দ্বীপপুঞ্জে থাকতে পারে ভূমিখণ্ড। অন্তত সমুদ্রের জলে পড়ার পর বেঁচে গেলে লাইফ জ্যাকেটের ভরসায় কাছাকাছি সেই পাহাড়ি পাদদেশে পৌঁছনোর সম্ভাবনা আছে। আর কয়েক মিনিট। হু হু করে ধোঁয়া ঢুকছে কেবিনে। চোখ জ্বালা করছে সকলের। বুকে যেন পাথর বসে আছে। শ্বাস নেওয়া অসম্ভব। সকলে অপেক্ষা করছেন কখন ইমার্জেন্সি ডোর খোলা হবে। ক্যাপ্টেন জাতার সকলের দিকে একবার শেষবারের জন্য তাকালেন। বললেন, ডিক্কি, ওদের বলে দাও আমাদের প্লেনে কেউ অন্তর্ঘাত করে বোমা রেখেছিল। আমরা ঝাঁপ দিচ্ছি।
দীক্ষিত সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বাঁদিকে রাখা হুক থেকে মাইক্রোফোন খুলে আনলেন। বটন টিপলেন। কিন্তু একি! বাটন টেপার সঙ্গে সঙ্গে একটা গোঁ গোঁ শব্দ শুরু হয়ে যায়। এখন কোনো শব্দ নেই। স্তব্ধ ট্রান্সমিটার। আবার বাটন টিপছেন দীক্ষিত। সেই অবস্থায় বললেন, দিস ইজ ভিক্টর ইকো পাপা..মে ডে..। কোনো সাড়া নেই অন্য প্রান্তের। তার মানে রেডিও ট্রান্সমিটার ডেড? ক্যাপ্টেন! আরটি ইজ ডেড আই বিলিভ…ইলেকট্রিকাল সিস্টেম ফেল করছে। ক্যাপ্টেন জাতার শূন্য চোখে তাকাচ্ছেন। শুধু যন্ত্রের মতো বললেন, ডিকুনহো জেনারেটর আর ব্যাটারি বন্ধ করে দাও। আর তোমরা সকলেই ভেস্ট পরেছ তো? আমি থ্রি বলার সঙ্গে সঙ্গে জাম্প করবে। আর আপনি? প্রায় মরিয়া হয়ে জানতে চাইছেন কার্নিক। ক্যাপ্টেন হাসলেন। বললেন, জেন্টলমেন..আই অ্যাম দ্য ক্যাপ্টেন…আই কান্ট লিভ দ্য সিট..অ্যাট এনি কস্ট…না স্যার.. এই রিস্কের মানেই হয় না। প্লিজ ট্রাই টু আন্ডারস্ট্যান্ড। ক্যাপ্টেন বলছেন, আমার জন্য ভেবো না। জ্যাকেট পরাই আছে। লেটস হোপ এভরিথিং উইল বি অলরাইট…। গ্লোরি…ওপেন দ্য ইমার্জেন্সি ডোর…ক্যাপ্টেন জাতারের শেষ বাক্য শোনা গেল….জেন্টলমেন….উই আর ডিচিং…। আর তখনই জল স্পর্শ করার আগেই প্রবল শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে গেল। ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’ ভস্মীভূত। ভেঙে পড়ল দক্ষিণ চীন সাগরে। আপনি কীভাবে বেঁচে গেলেন?
তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রয়েছেন আর এন কাও। ভারতের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর (সিকিউরিটি)। বস্তুত ভারতের সেরা গোয়েন্দা অফিসার। তাঁর সামনে হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন অনন্ত কার্নিক। কাশ্মীর প্রিন্সেসের ফ্লাইট মেইনটেনান্স ইঞ্জিনিয়ার। কার্নিক, নেভিগেটর জি সি পাঠক আর কো পাইলট দীক্ষিত বিস্ময়করভাবে বেঁচে গিয়েছেন। কীভাবে? ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’ জল স্পর্শ করার আগেই তাঁরা ঝাঁপ দিয়েছিলেন। ককপিটের জানালা থেকে।
ইমার্জেন্সি ডোর খোলা হয়েছিল। অনেকেই ঝাঁপ দিয়েছেন বটে। কিন্তু ঝাঁপ দেওয়ার সময় পাননি হতভাগ্য বাকিরা। ১৬ জন যাত্রী। যাঁদের মধ্যে প্রায় সিংহভাগই দেশি-বিদেশি সাংবাদিক, মারা গেলেন তৎক্ষণাৎ। পোল্যান্ডের সাংবাদিক জেরেমি স্টার্ক, অস্ট্রেলিয়ার ফ্রেডেরিক জেনসেন। আর বাকিরা ভিয়েতমিং, চীনের সরকারি প্রতিনিধি, মিডিয়া ডিরেক্টরের দল। বাঁচলেন না এয়ার হোস্টেস গ্লোরিয়া। কারণ তিনি ঝাঁপ দেননি। সকলের পিছনে ছিলেন। যাতে যাত্রীরা আগে নিরাপদে ঝাঁপ দিতে পারে। কালান্তক আগুনে ঝলসে গেলেন গ্লোরিয়া। আত্মাহুতি দিয়ে চলে গেলেন ডিকুনহো। আর পাঁচদিন পর সিঙ্গাপুরের উদ্ধারকারী টিম এসে যখন ধ্বংসস্তূপ সন্ধান করছে, তখন দেখা যায় ভস্মীভূত একটি দেহ তখনও পাইলটের সিট আঁকড়ে রয়েছে। দেহটি ক্যাপ্টেন জাতারের। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যিনি ঝাঁপ দেননি।
ঠিক সাতদিন পর বম্বের হাসপাতালে শুয়ে আর এন কাও প্রশ্ন করলেন অনন্ত কার্নিককে, আপনি কীভাবে বেঁচে গেলেন? অনন্ত কার্নিক প্রশ্নটা শুনে বললেন, আমি কীভাবে বেঁচে গেলাম? এতক্ষণ আপনাকে প্রিন্সেসের ধ্বংস হওয়ার যে বিবরণটি দিলাম, আমার বেঁচে থাকার গল্পটি কিন্তু তার থেকেও দীর্ঘ। সেটি এই ঘটনার তদন্তের জন্য খুব প্রয়োজনীয় নয়। পরে আপনি ফ্রি হলে শুনবেন। চাইলে এখনও বলতে পারি। গোটা বিশ্ব কিন্তু জানতে চাইছে আসল তথ্য। কে রেখেছিল বোমা? আপনার যতটা সহায়তা দরকার, আমি করতে রাজি। যখনই দরকার হবে বলবেন। কার্নিক ঠিকই বলেছেন, সেই ঝাঁপ দেওয়ার পর তিনি দক্ষিণ চীন সমুদ্রে ৯ ঘণ্টা ভেসে ছিলেন। দুবার দক্ষিণ চীন সমুদ্রে ভয়াল হাঙর প্রায় তাঁকে গিলে ফেলেছিল। কিন্তু দুবার অসীম সাহসিকতায় আর প্রবল মনের জোরে তিনি সেই গ্রাস থেকে বেঁচেছেন। ৯ ঘণ্টা সাঁতারের পর অবশেষে সম্পূর্ণ অজানা এবং জনবসতিহীন একটি ছোট পাহাড় ঘেরা দ্বীপে পৌঁছলেন। দ্বীপ নয়, আসলে একটি ভূমিখণ্ড। খাবার নেই। পানীয় জল নেই। কীভাবে বাঁচলেন কার্নিক, পাঠক এবং দীক্ষিত? সেটি সম্পূর্ণ আলাদা এক রোমহর্ষক কাহিনি। ঠিক যেরকম কাহিনি আমরা হলিউডের বহু সিনেমায় দেখেছি। আমরা বরং শুধু এটুকু জেনে নিই এক ব্রিটিশ মাছধরা জাহাজ উদ্ধার করে তাঁদের আলাদাভাবে। কিন্তু আর এন কাও এখানে হঠাৎ করে ঢুকলেন কীভাবে? তাঁর আবার কী ভূমিকা? কে তিনি? এখান থেকে শুরু হচ্ছে ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’ রহস্যের দ্বিতীয় পর্ব। বিমান দুর্ঘটনার ঠিক পরেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠেছিল— যে বিমানে চীনের প্রিমিয়ার চৌ এন লাইয়ের যাওয়ার কথা ছিল সেই বিমানেই বোমা বিস্ফোরণ? তার মানে তো টার্গেট ছিলেন তিনিই। অথচ তাঁর যাওয়া যেখানে নিশ্চিত, সেখানে কেন তিনি এলেন না? কারণ হিসাবে জানা গেল চৌ এন লাইয়ের সেদিনই অ্যাপেন্ডিক্স ব্যথা প্রবল আকার নিয়েছিল। আর সেই বিকেলেই তাঁর অপারেশন হয় অ্যাপেন্ডিক্স। সেই ১৯৫৫ সালে অ্যাপেন্ডিক্স অপারেশনের পর একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের অন্তত কতদিন বিশ্রামে থাকা উচিত ছিল? উত্তরটি যাই হোক না কেন, চৌ এন লাই অপারেশন এবং সেই দুর্ঘটনার ঠিক তিন দিন পরই রেঙ্গুন চলে যান। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হয় জওহরলাল নেহরুর। দুজনের একটি বৈঠকে চৌ এন লাই নেহরুকে বলেন, ব্রিটিশরা তদন্ত করবে বলেছে। আমি ওদের বিশ্বাস করি না। আমার দরকার নিরপেক্ষ একটি তদন্ত। আপনি প্লিজ আমাকে সাহায্য করুন। নেহরু আশ্বাস দিলেন, আপনি চিন্তা করবেন না । আমাদের সবথেকে সেরা গোয়েন্দা টিম যাবে হংকং। কারণ আমাদের এয়ার ইন্ডিয়াকে টার্গেট করা হয়েছে। আমাদেরই এত সব অমূল্য জীবন চলে গিয়েছে। আমাকে জানতেই হবে এসবের পিছনে কে? ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের ডিরেক্টর বি এন মল্লিককে নেহরু বললেন, সেরা টিম পাঠাতে হবে মল্লিক। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস্টিজ। অসামান্য এক ইন্টেলিজেন্স অফিসার বি এন মল্লিক গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কম কথা বলেন। কিন্তু অত্যন্ত কাজের ও ঠান্ডা মাথার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পর তাঁর টিম চীন সীমান্তে পায়ে হেঁটে গিয়ে মাসের পর মাস থেকে ভারতের সীমান্ত চিহ্নিত করেছেন মান্ধাতার আমলের এক ব্রিটিশ মানচিত্র সঙ্গে নিয়ে। সেই কাহিনিগুলো কম রোমহর্ষক নয়। সুতরাং স্বাধীন ভারতের সেই প্রথম যুগে দুর্ধর্ষ সব গোয়েন্দা আর গুপ্তচর ছিলেন ভারতীয় আইবি দপ্তরে। বি এন মল্লিক নেহরুকে বললেন, ইটস ডান স্যার। তিনিই স্থির করলেন কে যাবেন হংকং এবং তদন্ত করবেন এই হাই প্রোফাইল ইন্টারন্যাশনাল কেস। ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আর এন কাও। আর ডেপুটি সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স অফিসার চন্দ্র পল সিং এবং হিন্দুস্থান এয়ারক্র্যাফট ফ্যাক্টরির সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার জি বিশ্বনাথন। এই হল গোয়েন্দা টিম। সেরার সেরা।
এই দায়িত্ব পেয়েই আর এন কাও সর্বাগ্রে বেঁচে যাওয়া তিন অফিসার কার্নিক, পাঠক এবং দীক্ষিতের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। ২০ এপ্রিল। বম্বে। একেবারে শুরু থেকে, শুনতে চান আর এন কাও।
কাও জানতে চাইলেন, এয়ারক্র্যাফটের একেবারে ডাইরেক্ট টাচে কারা আসতে পারে? কার্নিক : গ্রাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা, রিফুয়েলিং স্টাফ, ট্রানজিট চলাকালীন মেনটেন্যান্স পার্সন। কাও : কারা মেনটেন্যান্সে আছে হংকং এ?
কার্নিক : এয়ারক্র্যাফট ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি।
কাও : আপনার সেদিনের টেক অফের আগের মোমেন্টগুলো মনে আছে মিস্টার কার্নিক? ঠিক কী কী হয়েছিল? মিনিট বাই মিনিট বলা সম্ভব? অবশ্য আপনার যদি শরীর পারমিট করে। এই স্টেটমেন্ট ভেরি মাচ ইমপরট্যান্ট ইউ নো..
কার্নিক হাসলেন। এবং একটা শ্বাস ফেলে পুরোটা বললেন। নোট নিচ্ছেন কাও। একটা জায়গায় এসে নলেন, বাট আপনি রেস্তোরাঁর পার্টটা ভুলে যাচ্ছেন মনে হচ্ছে? বিস্মিত কার্নিক। রেস্তোরাঁ মানে? কাও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছেন। তারপর বললেন, সামথিং স্পেশাল হ্যাপেনড ইন দ্য গ্রাউন্ড রেস্টোরান্ট। আপনার মনে আছে? কার্নিকের ভুরু কুঁচকে গেল। এবার মনে পড়েছে। ইয়েস। সেই ব্লন্ড চুলের লোক। যে আচমকা এসে জিজ্ঞাসা করেছিল ফ্লাইট সম্পর্কে। কাও জানলেন কীভাবে? কার্নিক বিস্মিত। তারপর বললেন, হ হয়েছিল..। কাও হেসে বললেন, ইওরস ইজ আ লাভলি মেমারি। আই অ্যাপ্রিসিয়েট! কেমন দেখতে সেই লোকটিকে? কার্নিক যথাসম্ভব বললেন। কাও বিদায় নেওয়ার আগের মুহূর্তে কার্নিক জানতে চাইলেন, বাট হাউ ডিড ইউ নো দ্যাট স্যার? আর এন কাও রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, আপনি সেদিন ব্লু শার্ট পরেছিলেন? আর গ্লোরিয়া সেদিন ওই রেস্তোরাঁয় আসেননি, তাই না? কার্নিক বুঝলেন আর এন কাও হংকং যাওয়ার আগেই হোমওয়ার্ক সেরে নিয়েছেন তুখড়ভাবে। রহস্যভেদ করতে পারলে এই লোকটাই পারবে। তীক্ষ্ণ নাক। চোখ সর্বদা যার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন সেদিকেই নিবদ্ধ থাকে। ব্যাকব্রাশ করা চুল।
চিবুকে আত্মবিশ্বাস লেগে আছে। গম্ভীর থাকলেও ঠোঁট দেখে মনে হয় সর্বদা একটু স্মিত হাসি লেগে আছে। থ্রি পিস স্যুট পরা। এই হলেন ভারতের অন্যতম সেরা গোয়েন্দা আর এন কাও।
২৩ এপ্রিল ১৯৫৫। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর আর এন কাও আর তাঁর সহকারী চন্দ্রপল সিং সিঙ্গাপুরে গেলেন। অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডিরেক্টর অফ সিভিল অ্যাভিয়েশনের সঙ্গে। ভারতের। তিনি ওখানে তখন। কারণ কাশ্মীর প্রিন্সেসের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার চলছে তখনও। তারই সুপারভাইজ করতে হচ্ছে। ভদ্রলোকের নাম জানা গেল ডক্টর এস রাহা। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল ঠিক কী ধরনের টাইম বোমা ডিভাইস ব্যবহার করা হয়েছিল। আর সবথেকে বড় যে তথ্য সেটি হল কারা কারা সেদিন ওই গ্রাউন্ড মেনটেনান্সে ডিউটিতে ছিল। সেখান থেকে সোজা বান্দুং। জওহরলাল নেহরু কাওকে বললেন আপনি একবার কথা বলুন চৌ এন লাইয়ের সঙ্গে। উনি আপনার সঙ্গে মিট করতে চান। চৌ এন লাই বললেন, আমাকে এক্সাকটলি বলুন তো ঠিক আপনি কী কী পাচ্ছেন? কাও একটা কাগজ নিয়ে স্কেচ করে আঁকলেন দক্ষিণ চীন সাগরের নাতুনা আইল্যান্ডের পটভূমি। এবং বোঝালেন কীভাবে ব্লাস্ট হয়েছিল কোথায়। এটা করতে গিয়ে আঙুলে আচমকা কালি লেগে গেল কাও-এর। তারপর ঘটল এক আশ্চর্য দৃশ্য। চীনের প্রধানমন্ত্রী উঠে গিয়ে দরজা খুলে এক অ্যাটেন্ডেন্টকে ডাকলেন এবং একটা ট্রেতে টাওয়েল নিয়ে এসে বললেন, কালিটা মুছে নিন। কাও এতই অভিভূত এই ঘটনায় যে তিনি বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইলেন। চৌ এন লাই বললেন, আপনাকে একটা কথা দিতে হবে। যা ইনফেরমেশন পাবেন, ব্রিটিশ সরকারকে দেবেন না। আমি ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম আই সিক্সকে বিশ্বাস করি না। কাও বললেন, বাট স্যার সেটা কীভাবে সম্ভব? হংকং-এ ঘটনা। সেখানে আমাকে তদন্ত করতে হবে। সেটা ব্রিটিশ পুলিশ ছাড়া তো সম্ভবই নয়। চৌ এন লাই একটু চুপ। তারপর বললেন, আপনি ঠিক করুন যে কতটা শেয়ার করবেন। তবে আমার পরামর্শ হল ওদের বেশি বিশ্বাস করবেন না। আমি কিন্তু তাই চেয়েছি ইন্ডিয়ার হেল্প। আর শুনেছি আপনিই বেস্ট! কাও সম্মতি জানালেন। এবং বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে তাঁর যাওয়াটা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দেখলেন চীনের প্রিমিয়ার। আর তারপরই একটি হটলাইন কানেকশনে পিপলস লিবারেশন আর্মির মিলিটারি ইন্টেলিজেন্সের ডিরেক্টরকে মান্দারিন ভাষায় কিছু বললেন। অন্যমনস্ক হয়ে একটু হাসি ফুটল তাঁর ঠোঁটে।
কাও এবার যাবেন অবশেষে হংকং। গাড়ি ছুটছে দ্রুত। আচমকা রিয়ার ভিউ মিররে চোখ পড়ল কাও-এর। পিছনে একটা গাড়ি চাইনিজ নম্বরপ্লেট। খুব আস্তে আস্তে আসছে। তাঁকে কি ফলো করা হচ্ছে? কাও ভাবলেন। এখানে কে জানবে তাঁর গতিবিধি? জানা সম্ভব নয়। কেউ চেনেও না। তাহলে? সুতরাং ভুল ধারণা। কেউ ফলো করছে না। একটাই বিস্ময়। তাঁর গাড়ির চালক বারংবার সাইড দেওয়া সত্ত্বেও পিছনের গাড়িটি ওভারটেক করছে না কেন? কাও-এর গাড়ি খুবই আস্তে চলছে। তাঁর তাড়া নেই। আর একবার পিছনে তাকিয়ে দেখলেন ড্রাইভিং সিটের পাশে বসা এক সওয়ারি আনমনে বাইরের দিকে তাকিয়ে। ভাবনা ঝেড়ে ফেলে নিশ্চিন্তে কাও আর একবার খুললেন নোটবুক। ডুবে গেলেন কিছু মিসিং লিংকে। এবং সোজা এয়ারপোর্ট। সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্সে শেষ। কাও এক কাপ কফি খাবেন। কফিশপে এগোলেন। আধ ঘণ্টা পর অ্যানাউন্সমেন্ট বোর্ডিংয়ে। কাও টাকা মেটানোর জন্য কাউন্টারে আসতেই আগে থেকে সেখানে থাকা একটি লং কোট পরা মঙ্গোলিয়ান ধাঁচের লোক পেমেন্ট করছিলেন। তিনি সরে যেতে কাও এগোলেন। এবং লোকটি পিছনে না তাকিয়ে এত দ্রুত সরে এলেন যে কাও কিছুটা ধাক্কা খেয়ে পিছু হটলেন। সঙ্গে সঙ্গে হাত থেকে কালো সুটকেস পড়ে গেল মাটিতে। তৎক্ষণাৎ লোকটি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। বলে উঠলেন, ও আই অ্যাম এক্সট্রিমলি সরি…হোপ ইউ আর অলরাইত..। নিজেই সুটকেস কুড়িয়ে নিয়ে কাও-এর হাতে দিয়ে বললেন, এই নিন। আমি আসলে দেখতে পাইনি। কাও ঠান্ডা মাথায় লোকটিকে দেখলেন। হেসে মাথা নাড়লেন। অর্থাৎ তিনি ঠিক আছেন। কিন্তু….কিন্তু….কিন্তু..। লোকটি চেনা নয়? কোথায় দেখেছেন? বান্দুং-এ? মনে আসছে না। কাও মুখে হাসি টেনে বললেন, ওহ নো নো ইটস পারফেক্টলি অলরাইট…। বলেই সুটকেসের দিকে তাকালেন কাও। এটা তো তাঁর নয়? আরে? কোথায় গেল তাঁর সুটকেস? নিমেষে চোখ পড়ল লোকটি চলে যাচ্ছে। অবিকল একই রকম সুটকেস হাতে। দুটিই একরকম। তাহলে? কোনটা তাঁর? এক্সকিউজ মি স্যার… কাও চিৎকার করলেন। লোকটি শুনতে পেল না। এগিয়ে যাচ্ছে আরও দ্রুত। ঠিক সেই সময় একজন মহিলা পাশ থেকে যাচ্ছিলেন। এবং লোকটিকে ডেকে দেখালেন যে কেউ একজন ডাকছেন। সুতরাং বাধ্য হয়ে এবার মুখ ফেরাতেই হল। স্পষ্ট হতাশা মুখে। কাও দ্রুত এগোলেন। বললেন, আমাদের সুটকেস বদল হয়ে গিয়েছে মনে হয়। লোকটি বিস্মিত! অবাক চোখে তাকালেন কাও-এর হাতের দিকে। তিনি বললেন, আই সি! লেটস চেক ইট। দুজনের সুটকেস খুলে দেখা গেল সত্যিই অদল বদল হয়ে গিয়েছে। কী আশ্চর্য একেবারে একই রকম সুটকেস! হাসিমুখে করমর্দন করে এবার দুজনে দুদিকে চললেন। আরও আধঘণ্টা পর। এয়ারক্র্যাফটের মধ্যে বসে যখন সিকিউরিটি অ্যালার্ট সংক্রান্ত এয়ারহোস্টেসের অ্যাড্রেস চলছে, তখনও কাও-এর ভ্রু কুঁচকে আছে। কিছু একটা টিকটিক করছে তাঁর মনে। সামথিং ফিশি..। জানালা থেকে বাইরে তাকিয়ে আচমকা কাও-এর মনে পড়ল, ইয়েস.. এই লোকটিই ছিল পিছনের গাড়িতে। সেই যখন এয়ারপোর্টে আসছিলেন। ধূসর লং কোট আর চোখে রিমলেস চশমা ছিল তখনও। বাক্স বদলটা কি নেহা চোখে ধূলো দেওয়া? কাও তৎক্ষণাৎ বুঝলেন ওই যে নিজের সুটকেস খুলে লোকটিকে দেখিয়ে দেওয়া হল, ওটাই মস্ত ভুল হয়েছে। ওটাই কি আসলে প্ল্যান ছিল লোকটির? এক ঝলকে তাঁর সুটকেসটি দেখে নেওয়া কী আছে ভিতরে? তার মানে কী? কাওকে এখন থেকেই ফলো করা হচ্ছে! কারা করছে? তাহলে কি কাশ্মীর প্রিন্সেসের ক্র্যাশ হওয়ার পিছনে আছে কোনো আন্তর্জাতিক প্ল্যান? কী সেটা? ইন্টারেস্টিং কেস তো? কী অপেক্ষা করে আছে হংকং-এ? রহস্য ভেদ করতে পারা যাবে তো? ভারতের প্রেস্টিজও তো যুক্ত হয়ে আছে! জাকার্তা এয়ারপোর্ট থ্রি এ থেকে ফ্লাইট টেক অফ করল। এবার লক্ষ্য হংকং। একরাশ দুশ্চিন্তা থাকলেও ঠান্ডা মাথার আইবি অফিসার আর এন কাও চোখ বুজলেন উইনডো সিটে বসে….।
সবটাই ধোঁকা। আসলে কিন্তু ভারতের গোয়েন্দা কর্তা আর এন কাও মোটেই সেই বিমানে হংকং যাচ্ছেন না। বিমানটি ছিল ভায়া পিকিং। এবং কাও জাকার্তা থেকে হংকং যাবেন বলে উঠলেও আসলে পিকিং এ নেমে যাবেন। এয়ারপোর্ট অথরিটির সঙ্গে সেরকমই কথা রয়েছে। টিকিটও সেরকমই। কিন্তু জাকার্তার সকলে জেনেছে তিনি যাচ্ছেন হংকং। কেন এই লুকোচুরি? তাঁকে একটা জরুরি কাজে যেতেই হবে পিকিং। চীনের প্রিমিয়ারের সঙ্গে সেই বৈঠকটির দু ঘণ্টার মধ্যেই আবার জাকার্তার হোটেলে একটি ফোন এসেছিল কাও-এর কাছে। অজানা কণ্ঠ তাঁকে জানাল মিস্টার কাও, ইওর লাইফ মে বি ইন ডেঞ্জার! হংকং এ আপনার একা যাওয়া সম্ভব নয়। আপনার জন্য একটা বিশেষ মেসেজ অপেক্ষা করছে। প্লিজ প্রসিড টু পিকিং। কাও জানতে চান, আপনি কে? কণ্ঠটি জানাল, আমার নাম আমি জানাতে পারব না। বাট আপনি চীন সরকারের সঙ্গে কথা বলুন। এমব্যাসি আপনার ফোনকলের অপেক্ষায় আছে। তারা বলে দেবে আপনার নেক্সট মুভ। কাও ঠান্ডা গলায় কেটে কেটে বললেন, আপনাকে কে বলেছে চীন সরকার আমার মুভমেন্ট ঠিক করে দেবে? আমি ভারত সরকারের কর্মী। ভারত সরকারের নির্দেশে আমার কাজকর্ম। ওপার প্রান্তের লোকটি একটু চুপ। তারপর বলল, আপনার সরকার এসবই জানে মিস্টার কাও। মনে রাখবেন আপনি একটা ইন্টারন্যাশনাল অপারেশনে যাচ্ছেন। সুতরাং ব্যাপারটা এত হালকাভাবে নেবেন না। আর এন কাও এই ফোনটির পরই সোজা হোটেলের লবিতে গিয়ে চীনের এমব্যাসিতে ফোন করলেন। এবং তাঁকে বলা হল আপনাকে আমাদেরই লোক ফোন করেছে। আপনি অপেক্ষা করুন। আপনার জন্য পিকিং এর টিকিট যাচ্ছে। এরপরই কাও ট্রাংক কল বুক করে কথা বলে নিলেন তাঁর বসের সঙ্গে। দিল্লিতে বসে থাকা বি এন মল্লিক। ডিরেক্টর ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ। তিনি হেসে বললেন, আই নো কাও..ইউ ক্যান প্রসিড। বেস্ট অফ লাক। কাও বিস্মিত। তাঁকে জানানো হল না কেন আগে? তবে কোনো প্রশ্ন করার নিয়ম নেই বিশ্বের কোনো গুপ্তচর আর গোয়েন্দা সংস্থায়। শুধু নির্দেশ পালন করতে হয়।
এয়ারক্র্যাফটের উইন্ডো সিটে বসে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন আর এন কাও। পাইলটের অ্যাড্রেসে ঘুম ভাঙল। সামনেই পিকিং আসছে। ল্যান্ডিং অ্যানাউন্সমেন্ট শুরু হওয়ার আগেই কাও একবার টয়লেট গেলেন। তীক্ষ্ণ চোখে দেখে নিলেন কোনো সন্দেহজনক চোখ তাঁকে দেখছে কিনা। সেরকম কেউ চোখে পড়ল না। তবে একেবারে সামনের সারিতে একজন প্যাসেঞ্জার অস্বাভাবিকভাবে চোখের সামনে কাগজ খুলে নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। সেই যাত্রীর মুখ দেখা গেল না। পিকিং এ নেমে কাও কী করবেন? কাউকে তো চেনেন না! আগে থেকেই বলা ছিল। একটি লাল ব্যানারে সাদা কালিতে লেখা থাকবে ওয়েলকাম টু পিআরসি। সাধারণত এয়ারপোর্ট বা স্টেশনে অচেনা মানুষকে রিসিভ করতে আসেন যাঁরা তাঁদের হাতের প্ল্যাকার্ডে লেখা থাকে নাম। এক্ষেত্রে অত্যন্ত গোপনীয় রাখা হয়েছে আর এন কাও-এর ভিজিট। তাই নাম লেখা প্ল্যাকার্ড রাখা হয়নি। লেখা হয়েছে পি আর সি। অর্থাৎ পিপলস রিপাবলিক অফ চায়না। যথারীতি দূর থেকে সেটা দেখতে পেয়েছেন কাও। এবং এগিয়ে এসে দেখলেন একজন নয়, দুজন ধরে আছেন সেই প্ল্যাকার্ড। তাঁদের একজন অন্য হাতে ধরা একটি কাগজের দিকে মাঝেমধ্যে তাকাচ্ছেন। তিনি সেদিকে এগিয়ে যেতেই তাঁরাও এগিয়ে এলেন। এবং আবার সেই হাতের কাগজের দিকে তাকিয়ে হেসে করমর্দন করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আড়চোখে কাও দেখলেন ওই লোকটির হাতে কাগজ নয়, রয়েছে তাঁর একটি ফোটোগ্রাফ। সেটি দেখেই যাতে চিনে নেওয়া যায়। কিন্তু এই ছবি কবে তোলা হল? এটা তো অফিসিয়াল একটি ছবি। প্রশ্ন এল কাও-এর মনে। কিন্তু ওই যে বলছিলাম, গুপ্তচর আর গোয়েন্দা দুনিয়ায় পালটা প্রশ্ন করার নিয়ম নেই কূটনীতিক স্তরে। গাড়িটি চলছে হাইওয়ে ধরে। সবথেকে বিস্ময়কর কেউ কোনো কথাই বলছেন না। একটা সময় কাও ভাবলেন চিনে অতিথি আপ্যায়ন তো দেখা যাচ্ছে খুবই খারাপ। অতিথির সঙ্গে কেউ কথা বলে না? কাও একবার কিছু একটা জানতে চাইলেন। সামনে বসা পাথরের মতো মুখ চিনা লোকটি শুধু বলল, নো ইংলিশ…। অর্থাৎ ইংরাজি জানে না। আশ্চর্য! ইংরাজি না জানা লোককে পাঠানো হয়েছে? ইচ্ছে করেই? কেন? প্রায় ৪৫ মিনিট পর একটি বিরাট বড় বিল্ডিং। সেখানে ঢুকে যাওয়ার পর গাড়ি থেকে নেমে কাও-এর দরজা খুলে দেওয়া হল। এবং তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল তিনতলার একটি বিরাট কনফারেন্স হলে। সেখানে আগে থেকেই বসে আছেন চার ব্যক্তি। দুজন ইংরাজি জানেন। দুজন জানেন না।
মাত্র আধঘণ্টা। শুধু আধঘণ্টা কথা বলার জন্য এতদূর আসা? মাত্র ৩০ মিনিটের একটা মিটিংয়ের জন্য এত গোপনীয়তা? নাটকীয়তা? কিন্তু যে আর এন কাও ওই মিটিং-এ ঢুকেছিলেন, আর যিনি বেরোলেন আধঘণ্টা পর, তাঁরা আসলে দুটি আলাদা মানুষ। কারণ চীন সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের চার কর্তা কাওকে জানালেন, যে তাঁরা জানেন কারা কাশ্মীর প্রিন্সেস অন্তর্ঘাতের পিছনে। কাও চমকে উঠেছিলেন। তার মানে? এই কদিনের মধ্যেই চীন জেনে গেল কারা এয়ার ইন্ডিয়ার ওই বিমানে টাইম বোমা রেখেছিল? কারা? আর জানেই যখন তখন আর এভাবে ভারতের সাহায্য নেওয়ার দরকার কী? প্রশ্নটা কাও করেছিলেন। চীনের গোয়েন্দা কর্তাদের জবাব, আমরা আরও জানতে চাই যে কীভাবে গোটা ব্যাপারটা সংঘটিত হল। কাও পালটা প্রশ্ন করলেন কারা আছে এর পিছনে? চীনের গোয়েন্দারা জানালেন, কেএমটি এজেন্টরা। আবার চমক? কেএমটি? তার মানে কুয়ো মিন টিং! ১৯১১ সালে সান ইয়াৎ সেন প্রতিষ্ঠা করেন কে এম টি। তখন নাম ছিল রিভলিউশনারি অ্যালায়েন্স। পরবর্তীকালে চিয়াং কাই শেকের নেতৃত্বে এই কে এম টি গঠন করেছিল একটি জাতীয় আর্মি। দীর্ঘকাল ধরে চীনের মূল ভূখণ্ডকে শাসন করার পর কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার সঙ্গে কে এম টির সংঘাত শুরু হয়। শুরু হয় এক গৃহযুদ্ধ। ১৯৪৯ সালে কে এম টি নিরবচ্ছিন্নভাবে পিছু হটে তাইওয়ানেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। সঙ্গে থাকে প্রায় ২০ লক্ষ অধিবাসী, যাদের মধ্যে উদ্বাস্তু আর সামরিক বাহিনীও আছে। এবং সেই থেকে কে এম টি বনাম কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়নার বিবাদ অব্যাহত। কে এম টির প্রধান টার্গেট হয় কীভাবে কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায়। তাহলে কি ওই রাজনৈতিক সংঘাতটি একটি ক্রাইম থ্রিলারে রূপান্তরিত হয়ে গেল? চীনের গোয়েন্দারা জানালেন, আমাদের সোর্স থেকে আমরা জেনেছি কেএমটি এজেন্টরা করেছে। তাদের টার্গেট প্রাইম মিনিস্টার চৌ এন লাই। ওই এয়ারক্র্যাফটে প্রধানমন্ত্রীর যাওয়ার কথা ছিল। সেটি আগাম ফাঁস হয়ে যায়। আর সেই থেকেই চক্রান্ত শুরু। লাস্ট মোমেন্টে প্রাইম মিনিস্টার যেতে পারেননি। তাই বেঁচে গেলেন। কিন্তু জানতেই হবে কীভাবে ওই বিমানে রাখা হয়েছিল টাইম বোমা। তাই আপনাকে সাহায্য করতে হবে। স্থির হয়ে আর এন কাও পুরোটা শুনলেন। ভিতরে ভিতরে তিনি উত্তেজিত। কিন্তু এই ঝকঝকে শাণিত বুদ্ধির গোয়েন্দাটি অনেক পোড় খাওয়া। তিনি অবশেষে বললেন, আমার কিছু জানার আছে। কী? চিনা গোয়েন্দারা সতর্ক। কারণ তাঁরা জানেন এই লোকটি বিপজ্জনক গোয়েন্দা। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সিদ্ধান্তের পর অবিভক্ত ভারতের ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের হেডকোয়ার্টারে একদিন আগুন ধরে যায়। বহু নথিপত্র ধ্বংস হয়েছিল। কী ছিল সেইসব নথিপত্রে? কারা আগুন দিল? জানা যায় বেশিরভাগ নথি ছিল ভারতের রাজনীতিক আর স্বদেশি রাজ্যগুলির রাজাদের সম্পর্কে গোপন ফাইল। তাঁদের গোপন জীবন সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকারের কাছে রিপোর্ট করা হত। সেই ফাইল অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল। আর সেই অগ্নিকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্বেও একটা সময় ছিলেন এই আর এন কাও। সুতরাং খুব সাবধানে থাকতে হবে লোকটির সম্পর্কে। চিনা গোয়েন্দাদের অনুমান তথা আশঙ্কা সঠিক ছিল। কারণ আর এন কাও তারপর একটি মোক্ষম প্রশ্ন করেছিলেন, ঠিক কবে এবং কখন ঠিক হয়েছিল যে আপনাদের প্রাইম মিনিস্টার যাবেন না ওই বিমানে? কোন সময় তাঁর অ্যাপেনডিক্সের ব্যথা শুরু হয়েছিল? চার চিনা গোয়েন্দা কর্তা এক পলকের জন্য একে অন্যের দিকে তাকিয়েছিলেন। তারপর হেসে বললেন, আমরা আপনার সঙ্গে এই নিয়ে পরে কমিউনিকেট করব ইন ডিটেইলস! আপাতত আপনি বাই রোড যাবেন হংকং। ওকে? কাও মৃদু হাসলেন। এবং বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে।
হংকং এ কাও-এর জন্য বুক করা হয়েছে হোটেল মীরামার। ততক্ষণে জানা হয়েছে কারা এয়ারক্র্যাফট মেনটেন্যান্সের দায়িত্বে থাকে। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে আর এন কাও হংকং এর পুলিশ কমিশনার ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। ম্যাক্সওয়েল নিজেও তুখড় পুলিশ অফিসার। ততদিনে তিনি নিজেও অনেকটা তদন্তের কাজ এগিয়েছেন। বললেন, আমাদের সন্দেহের তালিকায় আছে এয়ারক্র্যাফট ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির কয়েকজন স্টাফ। কয়েকজনকে অ্যারেস্ট করা হয়েছে। ওই কোম্পানির তাইওয়ানের এক আমেরিকান অফিসার রিড জোনস। আর যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা কোথায়? কাও জানতে চাইলেন। ম্যাক্সওয়েল বললেন, তাদের অনেককে জেরা করে বিশেষ কিছু পাওয়া যায়নি। তাই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আমি সেই লিস্ট পেতে পারি? কাও বললেন। ম্যাক্সওয়েল লিস্ট দিলেন কাওকে।
হোটেলে ফিরেছেন কাও। সামনে লিস্ট। এক কাপ কফি। একবার টেম্পল স্ট্রিটে যেতে হবে। এয়ারক্র্যাফট ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির অফিসে। সেই অফিসে যখন গেলেন কাও তখন প্রায় সকলেই চলে গিয়েছে। কাও-এর সঙ্গে রয়েছেন হংকং পুলিশের গোয়েন্দা। সন্ধ্যা হয়েছে। তিনজনের মধ্যে একজন টাইপ করছে একমনে। আর বাকি দুজনের হাতে ফাইল। কাও এসে পরিচয় দিয়ে তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। দোভাষীর কাজ করলেন হংকং পুলিশের গোয়েন্দারা। কাও-এর দরকার লিস্ট। কারা ছিলেন সেদিনের এয়ারক্র্যাফট মেনটেন্যান্সে? জানা গেল পাঁচজন। তাঁদের পাওয়া যাবে? আজ তো আর পাওয়া যাবে না। কাল নিশ্চয়ই আসবে। তবে তাদের মধ্যে একজন আগামীকালই জয়েন করবে। সে পরশু ছিল ছুটিতে। আজ তো তার ডিউটিই নেই। তার নাম কী? চাও চু। লিস্ট নিয়ে আর এন কাও ফিরছেন হোটেলে। একটি ফোনকল আছে। জানালেন রিসেপশনিস্ট। কে ফোন করেছে? সামবডি ফ্রম চায়না। আবার চীন থেকে ফোন? অপেক্ষা করলেন কাও।. আবার যাতে ফোনটি আসে। কিন্তু এল না কোনো ফোন। এল পরদিন খুব ভোরে। চীনের সেই চার গোয়েন্দার মধ্যে একজন। তিনি জানতে চাইলেন, কোনো ডেভেলপমেন্ট আছে? কাও বললেন, এগোচ্ছে। এবার সেই গোয়েন্দাটি কাওকে বললেন, আপনাকে একটি ইমপরট্যান্ট মেসেজ দেওয়ার ছিল। আমরা জানতে পেরেছি কার মাধ্যমে গোটা অপারেশন করা হয়েছে। কাও বিস্মিত। এত বড় একটা ইনপুট, এভাবে উদাসীন ভাবে দেওয়া হচ্ছে? তিনি অপেক্ষা করছেন চিনা গোয়েন্দা কী বলেন তা শোনার জন্য। ওপ্রান্ত থেকে বলা হল, কালপ্রিটের নাম চাও চু। চমকে গেলেন নামটি শুনে কাও। কারণ এই নামটিই তো কয়েকদিন হল আসছে না সেই মেনটেন্যান্স অফিসে। তার মানে সেই আসল অপরাধী? কাও তবু জানতে চাইলেন আপনারা কীভাবে জানছেন? চিনা গোয়েন্দাটি বলল আমাদের আনঅফিসিয়াল সোর্স। তবে এটা আমরা অফিসিয়াল করছি। আমরা হংকং অথরিটিকে সরকারিভাবে জানাব আমাদের সাসপেক্ট কে? আমরা চাই আপনি দেখুন কীভাবে চাও চুকে ধরা যায়।
সেদিন বিকেলের মধ্যে জানাজানি হয়ে গেল আসল অপরাধীর নাম। চাও চু। চীন সরকার একটি প্রেস স্টেটমেন্ট ইস্যু করে জানিয়ে দিয়েছে তাদের সন্দেহের কথা। হংকং সরকার সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি প্রকাশ করে পালটা জানাল আমাদের কাছে এরকম কোনো তথ্য এখনও আসেনি। তাই আমরা যতক্ষণ না খতিয়ে দেখছি ততক্ষণ এই নামের কাউকে মেইন সাসপেক্ট হিসাবে ধরতে পারছি না। কাও কিন্তু আবার গেলেন সেই অফিসে। এবং তাঁদের কাছে জানতে চাইলেন কোথায় চাও চু। বজ্রপাত হল! চাও চু অফিসেই আসছে না। সেকী? কবে থেকে? ১১ এপ্রিলের সেই দুর্ঘটনার পর এসেছিল? কর্মীরা জানালেন, হ্যাঁ তারপর তো প্রতিদিনই সে কার্ড পাঞ্চ করেছে। এমনকী এয়ারপোর্টেও গিয়েছে। আপনি একটা কাজ করবেন? কী? কাও জানতে চান। আপনাকে একটা ফ্ল্যাটের নম্বর দিচ্ছি। সেখানে গেলে পেতে পারেন। হয়তো অসুস্থ। ফ্ল্যাটের নম্বরটি নিয়ে কাও সোজা এলেন হংকং স্পেশাল ব্রাঞ্চের ডিরেক্টর জন উইলকক্সের অফিসে। এবং তাঁকে সবটা বলার পরই ঠিক হল তাঁরা দুজনে যাবেন। গেলেনও। ডোরবেল বাজছে। কেউ খুলছে না। এবার দরজায় ধাক্কা। খুলল দরজা। ভয়ে ভয়ে। একটি আতঙ্কিত মুখ বেরিয়ে এল। চৌ সি হক তার নাম। হ্যাঁ। এই ফ্ল্যাটেই তার সঙ্গে রুম শেয়ার করে থাকে চাও চু। কিন্তু সে তো এখন নেই? অফিসে গিয়েছে? অফিসে? সে অফিসে ইদানীং যাচ্ছে না আপনি জানেন না? লোকটি অবাক। যাচ্ছে না? সেকি? কবে থেকে? দুদিন তো নাইট ডিউটি ছিল? নাইট ডিউটি? কাও জানতে চাইলেন। লোকটি উত্তরে বলল, হ্যাঁ স্যার, আমাকে তো সেরকমই বলেছিল। কাও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন লোকটির দিকে। তারপর উইলকক্সকে বললেন, চলুন তাহলে আর কী করা যাবে? দুজনেই ফিরে এলেন।
রাত গভীর হয়েছে। হোটেল মীরামার থেকে সম্পূর্ণ লং কোট পরা একটি মূর্তি বেরিয়ে এল। কোনো গাড়ি নেই। লোকটি হাঁটছে। যথাসম্ভব নিজেকে লুকিয়ে। মাঝেমধ্যেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছেনও। কেউ ফলো করছে না তো? এখনও পর্যন্ত মনে হচ্ছে কেউ ফলো করছে না। গতি বাড়িয়ে দিয়ে একেবারে বড় রাস্তায় এসে একটি নাইট ট্যাক্সি পেয়ে লোকটি একটি ঠিকানা বলল। দেখা যাচ্ছে ট্যাক্সিটি ঠিক সেই ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যেখানে চাও চু আর চৌ সি হক থাকে রুম শেয়ার করে। ট্যাক্সি থেকে নামা লোকটি আর কেউ নয়। আর এন কাও। সোজা দোতলায় উঠে এলেন। এবং ডোরবেল না বাজিয়ে শুধু নক করলেন কয়েকবার। কয়েকবার নক করার পরই দরজা খুলে গেল। এবং সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করার চেষ্টা। কারণ লোকটি চিনতে পেরেছে কাওকে। কাও এজন্য তৎপর ছিলেন। আগে থেকে একটি হাত বাড়িয়ে লোকটিকে ধাক্কা। রোগা বেঁটে চৌ সি হক কাও-এর শক্তির কাছে শিশু। অতএব কাও ঢুকলেন ঘরে। কাও ঠান্ডা স্বরে বললেন, আমাকে হেল্প করলে আপনার বিরাট লাভ হবে। লোকটি বলল, আমি তো যেটা জানতাম সবই বলেছি। আমি আর তো কিছু জানি না। কাও বললেন, জানেন। বলুন। লোকটি মুখ বন্ধ করে বসে রইল। কাও ফিসফিস করে বলছেন, লক্ষ ডলার পেতে কেমন লাগবে? চেয়ারে বসে ছিল চৌ সি হক। চমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। ১ লক্ষ ডলার! মানে! কাও এবার হাসলেন। বললেন, আপনি চাইলেই কিন্তু ১ লক্ষ ডলার পেতে পারেন চাও চু সম্পর্কে যতটুকু জানেন তা বললে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না লোকটি। ১ লক্ষ হংকং ডলার তার কাছে কেন, যে কোনো সাধারণ হংকংবাসীর কাছে স্বপ্ন। সে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে কাওকে জিজ্ঞাসা করল, কে দেবে এত টাকা? কাও বললেন, সরকার দেবে। চৌ সি হক তাও অবিশ্বাসী। কারণ কই, সরকার তো এরকম তো কিছু বলেনি? তাহলে? কাও বললেন, ঠিক আছে, আপনি আগামীকাল সকাল ১০ টার সময় আসবেন পুলিশ কমিশনার অফিসে। সেখানেই বুঝে যাবেন। কাও বেরিয়ে এলেন ফ্ল্যাট থেকে।
ঠিক পরদিন সকালে হংকংয়ের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হল একটি বিজ্ঞাপন। হংকং পুলিশের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা। ১ লক্ষ ডলার পুরস্কার পাওয়া যাবে যদি কেউ চাও চু সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে। সর্বপ্রথম যে লোকটি হংকং পুলিশ কমিশনারের অফিসে এসেছিল তার নাম সেই চৌ সি হক। সে স্টেটমেন্ট দিতে চায়। সে জানাল চাও চু তাকে একদিন রাতে মদ খেয়ে এসে সব ফাঁস করে দিয়েছে। আর মুখ বন্ধ রাখার জন্য দিয়েছে ১ হাজার ডলার। কী হয়েছিল আগে থেকে সেখানে থাকা কাও জানতে চাইছেন। চৌ সি হকের বক্তব্য হল, সেদিন ৩০ এপ্রিল। অনেক রাতে ফিরল চাও। এসেই কাবার্ড থেকে হেরোইন পাউডার বের করল। ওটা চাও-এর অনেকদিনের নেশা। অন্তত দুটি পুরিয়া শেষ করার পর চাও-এর জিভ জড়িয়ে এসেছিল। সে জড়ানো কণ্ঠে বলেছিল, তার কষ্টের দিন শেষ। এবার বড়লোক হওয়ার সময় এসেছে। সেই এয়ার ইন্ডিয়ায় বোমা রেখেছিল। হ্যাঁ। চিনা গোয়েন্দাদের খবরই ঠিক। কেএমটি এজেন্টরাই এই চক্রান্ত করেছে। চাও চুকে দেওয়ার কথা ছিল ৬ লক্ষ ডলার। পরিবর্তে তাকে ওই বোমা রাখতে হবে। ঠিক যেদিন ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’ বিস্ফোরণে ভেঙে পড়ল সমুদ্রে তার আগের রাতে চাও চুকে ডেকে পাঠানো হয়েছিল মুভিল্যান্ড হোটেলে। সেখানেই তার হাতে তুলে দেওয়া হয় র্যাপ করা টাইম বোমা। পরদিন সকালে একটি গাড়ি আসে তাদের ফ্ল্যাটের সামনে। গাড়িতে ছিল কেএমটি এজেন্টরাই। তারাই এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দেয় চাও চুকে। আপনাদের ফ্ল্যাটে আর কে এসেছিল? জানতে চাইলেন কাও। চৌ সি হক একটু ভেবে বললেন, চাও-এর কাকা তো মাঝেমধ্যেই আসতেন। তিনিও তো একই কোম্পানিতে কাজ করেন। এমনকী যেদিন ‘কাশ্মীর প্রিন্সেসকে’ বোমায় উড়িয়ে দেওয়া হল সেদিন তিনিও ছিলেন ডিউটিতে। কে তিনি? নাম কী? তার নাম পার্সি চাও। পাওয়া যাবে তাঁকে? কেন পাওয়া যাবে না? আজ খুব ভোরে এসেছিলেন তো আমাদের ফ্ল্যাটে। চাও চু নেই জেনেও আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন এর মধ্যে কেউ আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছে কিনা! আমি বললাম কাল মাঝরাতে মিস্টার কাও এসেছিলেন। আর এন কাও হিসহিস করে বলে উঠলেন, মাই গড! সেকি? আপনি বলে দিলেন? তারপর? ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চৌ সি হক বললেন, তারপর পার্সি আমাকে বাজে একটা গালাগাল দিয়ে দৌড়ে নেমে গেলেন। একথা শুনেই সঙ্গে সঙ্গে আর এন কাও লাফ দিয়ে উঠলেন চেয়ার ছেড়ে এবং ইন্টারোগেশন রুমে থাকা অন্যদের বললেন, জেন্টলমেন আমি আসছি একটু। হংকং পুলিশ কমিশনারের অফিস থেকে বেরিয়ে ছুটছেন কাও। পার্কিং লটে গাড়ি চালককে বললেন, টেম্পল স্ট্রিট! গুরুত্ব বুঝলেন চালক। ঝড়ের গতিতে সেই এয়ারক্র্যাফট মেনটেন্যান্স অফিসে পৌঁছল গাড়ি কাও এক নিমেষে নেমেই অফিসের মধ্যে। সোজা ম্যানেজারের ঘরে। জানতে চাইলেন পার্সি চাও লাস্ট কবে কার্ড পাঞ্চ করেছে? ম্যানেজার বলছেন, পার্সি চাও? হ্যাঁ। তিনি রোজই ডিউটি করছেন। এখন কোথায়? ম্যানেজার বললেন, এয়ারপোর্টে। বাট কী হয়েছে? চাও চুর খবরটা পেপারে আমরা দেখলাম। আমাদের হেল্প চাইলে আমরা আছি। কাও কোনো কথা না বলে সেখান থেকে হংকং পুলিশকে বললেন, আপনারা এয়ারপোর্টে আসুন। বলেই দৌড়লেন কাও। এয়ারপোর্ট। ঠিক দেড় ঘণ্টা পর একটি বিমান উড়বে। ফরমোজার দিকে। সেই বিমানের প্যাসেঞ্জার লিস্ট চাই কাও-এর। কাউন্টারে যেতেই কাও লিস্ট পেয়ে নিঃশ্বাস ফেললেন। তাঁর হিসাব মিলে যাচ্ছে। এই তো পার্সি চাও। তার মানে আজ সকালে সংবাদপত্রে ভাগ্নের নামের পুরস্কারের বিজ্ঞাপনটি দেখেই পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনিও। নিমেষে গোটা ওয়েটিং হল আর বোর্ডিং লাউঞ্জ কর্ডন করে দিল হংকং পুলিশ। টয়লেট থেকে আসার পরই কোনো কিছু বোঝার সুযোগ না পেয়েই ধরা পড়ে গেল পার্সি চাও। এবং তাঁকে জেরা করে জানা গেল মারাত্মক তথ্য। ঠিক যেদিন আর এন কাও পিকিং থেকে হংকং-এ প্রবেশ করেছেন, তার ৬ ঘণ্টা আগে চাও চু একটি আমেরিকান বিমানে চেপে ফরমোজা অর্থাৎ তাইওয়ানে চলে গিয়েছে। তাহলে যে এতদিন ধরে তাকে দেখা গিয়েছে ডিউটি করতে হংকং এয়ারপোর্টে? এবার জানা যাচ্ছে আসলে মোটেই সে ডিউটি করেনি। তার কার্ড নিয়ে তার কাকা এতদিন ধরে পাঞ্চ করেছে অফিসে অ্যাটেনডেন্স। সকলে জানছে চাও চু রোজকার মতোই নর্মাল ডিউটি করছে। আসলে সে তাইওয়ানে।
এই গোটা চক্রান্তের সূত্রপাত হয় ১১৩ টেম্পল স্ট্রিটের একটি ইলেকট্রিকের দোকানে। দোকানটি আসলে কেএমটি এজেন্টদের আন্ডারকভার কেন্দ্র। সেখানেই পার্সি চাও-এর যাতায়াত ছিল। কেএমটি প্রথমে চেয়েছিল চৌ এন লাই কে হত্যা করবে ১৯৫৪ সালে যখন তিনি জেনিভা থেকে ফিরছেন। কিন্তু সেই প্ল্যান সফল হয়নি। তারপর প্ল্যান করা হল ভারতে অনুষ্ঠিত এশিয়ান কনফারেন্সে যাওয়া চীন সরকারের অন্যতম প্রধান এক কর্তা কুয়ো মোও ঝুকে হত্যা করা হবে। কিন্তু ঠিক তখনই খবর পাওয়া গেল স্বয়ং চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই যাচ্ছেন বান্দুং। তাও আবার হংকং থেকে। একটি বিরাট চিনা প্রতিনিধিদল নিয়ে। এই সুবর্ণ সুযোগ ছাড়া যায় না। তাই কে এম টি গোটা অপারেশনটি সাজিয়েছিল। কিন্তু ‘কাশ্মীর প্রিন্সেসের’ বিস্ফোরণের পরদিন যখন প্রধান অভিযুক্ত চাও চু ওই টেম্পল স্ট্রিটের ইলেকট্রনিক দোকানে গিয়ে টাকা চাইল, তাকে বলা হয়েছিল যেহেতু চৌ এন লাই নিজে বিমানে ছিলেন না, তাই টাকার অঙ্ক অত দেওয়া যাবে না। তবে দেওয়া হবে নির্দিষ্ট সময়েই। কবে? সেটা কে এম টি বলে দেবে। কিন্তু আর এন কাও যেদিন পিকিং থেকে হংকং এ ঢুকলেন সেদিনই দুপুরের ফ্লাইটে ঠিক ৬ ঘণ্টা আগে চাও চু হংকং ছেড়ে পালালেন কেন? কে খবর দিয়েছিল যে ভারতীয় কোনো গোয়েন্দা আসছে গোটা তদন্তে সহায়তা করার জন্য? চাও চুকে আর চিনে ফেরত আনা সম্ভব হয়নি। বহু আবেদন নিবেদন কূটনৈতিক চেষ্টা ব্যর্থ হয়।
এসবের থেকেও বড় প্রশ্ন অন্য। কেন শেষ মূহূর্তে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই বিমানে সফর করলেন না? তাহলে কি তিনি বা চীন সরকার আগেই জেনে গিয়েছিল এই অন্তর্ঘাতের কথা? কারণ ওই ফ্লাইট আগে স্থির ছিল ১৮ এপ্রিল যাবে। পরে হঠাৎ পরিবর্তন করা হয়ে ঠিক হয়েছিল ১১ এপ্রিল। এবং ৭ এপ্রিল হঠাৎ করেই যাত্রী তালিকায়। পরিবর্তন হয়। আর একেবারে শেষ মুহূর্তে চৌ এন লাই এর অ্যাপেন্ডিক্স যন্ত্রণা শুরু হল? যদি তাই হয় তাহলে তো তৎক্ষণাৎ এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটও ক্যান্সেল হওয়া উচিত ছিল। প্রাইম মিনিস্টারের চার্টার্ড ফ্লাইট তাঁকে না নিয়েই চলে গেল? সোজা কথায় এই গোটা মার্ডার প্লট আগাম জানা সত্ত্বেও এতগুলো নির্দোষ মানুষকে বিমানে পাঠিয়ে দেওয়া হল? কেন? ধোঁয়াশা রয়েই গেল। তবে আর এন কাও-এর তুখোড় প্রত্যুৎপন্নমতিত্বে মুগ্ধ চীন সরকার তাঁকে বিশেষ সম্মানিত করে। তাঁর অনারে ডিনার দেওয়া হয়। ঠিক পরের বছর গোয়েন্দা অফিসার আর এন কাও-এর ডাক পড়বে আফ্রিকার ঘানায় এক অন্য অভিযানে। কিন্তু সে এক অন্য কাহিনি। পরে বলা যাবে কোনোদিন।
আপাতত মোক্ষম প্রশ্ন, কে ছিল ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’ উড়ে যাওয়ার আগে সেই আমেরিকান যুবকটি? যিনি পাইলটদের কাছে এসে যেচে আলাপ করে সন্দেহজনক আচরণ করছিলেন! চাও চু যে বিমানে তাইওয়ানে পালিয়েছিল সেটি ছিল আমেরিকান বিমান! তাহলে কি আমেরিকার দুর্ধর্ষ গুপ্তচর সংস্থা সেন্ট্রাল ইনটেলিজেন্স এজেন্সির (সি আই এ) কোনো ভূমিকা ছিল আড়ালে? চিনা গোয়েন্দারা সেরকমই রিপোর্ট দিয়েছিল। অনেক পরে ১৯৭১ সালে চৌ এন লাই বেজিং-এর গ্রেট হলে আয়োজিত একটি স্টেট ডিনারের মধ্যেই সরাসরি আমেরিকার ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইসর হেনরি কিসিংগারকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, আপনাদের স্পাই এজেন্সি কি সত্যিই ছিল? কিসিংগার শীতল কণ্ঠে বলেছিলেন, অনারেবল প্রাইম মিনিস্টার, আপনারা সিআইএ-র ক্ষমতাকে একটু বেশিই মূল্য দিয়ে ফেলছেন! আমাদের সিআইএ অতটা শক্তিশালী নয়। তারপর দুজনেই দুজনের চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন পলক না ফেলে!
এয়ার ইন্ডিয়া ‘কাশ্মীর প্রিন্সেস’ আজও একটি রহস্যময় অধ্যায়!
