ব্ল্যাক করিডর ১.১১

চোখের একটা ফিল্ড টেস্ট করতে হবে। ভাবছিলেন সুরেখা চিখানে। ডাক্তারবাবু সেরকমই বলেছেন। তার আগে ডাক্তারবাবুর কাছে গিয়ে বুঝে নিতে হবে কী কী টেস্ট করানো বাকি। গ্রামের নাম উদাওলি। মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলা। ২০০৩। ৩০ বছরের সুরেখা চিখানে এক গৃহবধূ। আজ ডাক্তারবাবু আসছেন গ্রামে। সেরকমই কথা আছে। তাই সকাল থেকে সুরেখা ব্যস্ত। চোখের সমস্যা চসবেমাত্র ধরা পড়েছে। তার আগে পর্যন্ত খুব মাথাব্যথা হত। আর চোখ দিয়ে অবিরত জল। আলোর দিকে তাকানোই যায় না। এরকমই এক সময়ে বছর খানেক হল গ্রামের মধ্যেই এক ডাক্তারবাবু আসা যাওয়া শুরু করলেন। বেশ সুন্দরভাবে কথা বলেন। অনেক সময় ধরে শোনেন কার কী অসুবিধা হচ্ছে। আর একদম কম টাকা চার্জ নেন। যেন না দিলেও চলে। অনেকে তো বাড়ি থেকে খেতের সবজি, চাল, কিংবা ফলও নিয়ে যায়। এই ডাক্তারবাবুকে একবার দেখানো হল। তিনি কী যেন একটা ওষুধ দিলেন। বেশ মাথাব্যথাটা কমে গেল। চোখ থেকে জলও পড়ছে না। দারুণ ডাক্তার তো! পাশের গ্রামে আজও বেশ উৎসব। ওরা খুব লাকি। ওখানে মাঝেমাঝেই বড় বড় হিরো হিরোইন আসে সিনেমার শুটিং করতে। একটা মারাঠা সিনেমার শুটিং এ একবার গিয়েছিলেন সুরেখা। তারপর আর যাওয়া হয়নি। সুরেখাকে সুন্দরী বলা যায়। রঙটা শ্যামলা অবশ্য। তাঁর একটাই শখ। খুব গহনা পড়তে ভালোবাসেন। হ্যাঁ, ঘরেও। বাড়ি থেকে বেরোলে তো কথাই নেই। সাড়ে ১০টা বাজতে যাচ্ছে। এখনই চলে আসবেন ডাক্তারবাবু। অবশ্য আজ ডাক্তারবাবুর আসার দিন নয়। মঙ্গলবার আসেন না তিনি । আগামীকাল আসার ডেট। কেন যেন গত শনিবার তাঁকে বলেছিলেন এই সপ্তাহে মঙ্গলবার শুধু তাঁকে দেখতেই আসবেন। কারণ তাঁর চোখের কিছু পরীক্ষার ব্যাপার আছে। কাগজপত্র টাউনে পাঠানো হয়েছিল। সেই রিপোর্ট আসবে। দ্রুত বেরোলেন সুরেখা। হ্যাঁ। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে স্কুটার। এসে গিয়েছেন ডাক্তারবাবু।

আসুন আসুন। সুরেখাকে দেখেই হেসে উঠে বললেন ডাক্তার সন্তোষ পল। তিনি এরকমই। খুব আন্তরিক। কিছু কাগজপত্র পাশে রাখা ব্যাগ থেকে বের করে বললেন, একটা প্রবলেম হয়েছে। আপনাকে আগের দিন বললাম না যে একটা ফিল্ড টেস্ট করা দরকার, সেটা একটু আর্জেন্ট। কারণ এই যা রিপোর্ট এসেছে, দেখছি ওরা বলছে গ্লুকোমা অ্যাডভান্সড স্টেজ হতে পারে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা চেক আপ দরকার আছে। এই ভয়টাই পাচ্ছিলাম। চিন্তিত ডাক্তার পল। মুখে একটা ছায়া পড়ল সুরেখার। তিনি জানেন না কাকে বলে গ্লুকোমা। হলে কী হয়? তাহলে কী করা যাবে স্যার? জানতে চাইলেন। অনেক পরে কাগজপত্র থেকে মুখ তুলে বললেন, আজই যেতে পারবেন? ভালো হত তাহলে। কাজটা হয়ে যেত তাড়াতাড়ি। সুরেখা দ্বিধায়। আজই? স্বামীকে বলা নেই তো! কী করা উচিত? তিনি বললেন, সমস্যাটা। ডাক্তার পল ভাবলেন, সত্যিই তো এটা একটা সমস্যা। একজন গৃহবধূ তো আর ধুম করে বাড়িতে না বলে এভাবে গ্রামের বাইরে টাউনে যেতে পারেন না? সুরেখা একটু ভেবে বলল, কীভাবে যাব? ডাক্তার পল বললেন, আমার স্কুটারে। সেটা প্রবলেম না। আমাকে কিছু অন্য রিপোর্টও আনতে হবে। যেতে আমাকে হতই। তাই আপনাকে বললাম। তবে বাড়িতে না বলে যাওয়াটা ঠিক নয়। আপনাকে ফিল্ড টেস্ট করিয়ে আমি বাসস্ট্যান্ডে ছেড়ে দেব। আপনি বাসে ফিরে আসবেন। আমার ফিরতে দেরি হবে। কারণ একবার হাসপাতালে কাজ আছে। সুরেখা বললেন, স্যার, একটু বাড়ির কাছে যাব। পাশের বাড়িতে বলে আসি। সুরেখার স্বামী গ্রামে থাকেন না। লক্ষ্মণ চিখানে। সাতারায় কাজ করেন কনস্ট্রাকশন সংস্থায়। মাসে এক দুবার আসেন। বাচ্চাকে নিয়ে একা সুরেখা। তাই পাশের বাড়িতে গিয়ে বলে আসবেন ছেলে স্কুল থেকে এলে যেন বলে দেয় মা টাউনে গিয়েছে ডাক্তার দেখাতে। চলে আসবে তাড়াতাড়ি ডাক্তারবাবুর সাথে। সুরেখা ফিরে এলেন। এবং তাঁকে স্কুটারের পিছনে বসিয়ে ডাক্তারবাবু হাইওয়েতে উঠে বললেন, চিন্তা নেই। তাড়াতাড়ি ফিরে আসব। খুব সাবধানে কিন্তু যথেষ্ট গতি নিয়ে স্কুটার চালালেন ডাক্তার পল। একজন অন্য মহিলা সঙ্গে রয়েছে। তাঁর দায়িত্ব তাঁকে নিরাপদে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা। পিছনে বসে সুরেখা প্রথমে বুঝতে পারছেন না কোথায় হাতটা রাখবেন। পিছনের ব্যাকরেস্টে ধরার অসুবিধা। কিন্তু কী উদার মনের ডাক্তারবাবু। নিজে থেকেই বললেন, আমার কাঁধ ধরে নিন। শক্ত করে ধরবেন চিন্তা নেই। সুরেখা আপ্লুত। অবশ্য লজ্জাও করছে। কেউ যদি দেখে ফেলে এভাবে? যদিও সেই চিন্তা ভিত্তিহীন। কারণ ডাক্তারবাবুর এটা তো রুটিন। যখনই উনি নিজের টাউনে যাবেন এভাবেই কোনো পেশেন্টকে হাসপাতালে দেখাতে নিয়ে যান। ডাক্তার তো নয়….ভগবান। মাত্র ১৫ টাকা ভিজিট নেন। নিজের কাছে যা ওষুধ থাকে সেইসব ওষুধ দিয়ে দেন রোগীদের। নয় নয় করে কিন্তু ঘণ্টা তিনেক লেগেই গেল। ডাক্তারবাবু অবশ্য আগে থেকেই বলে রাখার কারণে চোখের ক্লিনিকে বিশেষ দেরি হয়নি। তবে চোখের টেস্ট এত সময় ধরে হয় তা জানাই ছিল না। সুরেখাকে আই সেন্টারে বসিয়ে দিয়ে ডাক্তার পল নিজের কাজে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। সুরেখার সব টেস্ট হয়ে যাওয়ার আগেই অবশ্য তিনি পৌঁছে গিয়েছেন। এবার ফেরা। আগেভাগেই বলা আছে আর সুরেখার গ্রাম পর্যন্ত তিনি যাবেন না। হাইওয়ের কাছেই যে বাসস্টপ আছে সেখানে নামিয়ে দেবেন। ওখান থেকে হেঁটেই ফিরে যেতে পারেন সুরেখা। তবে তার আগে একবার ডাক্তারবাবুর গ্রামে যেতে হবে সুরেখাকে। কারণ আসার পথেই ডাক্তারবাবু বললেন, আপনাকে যে ওষুধগুলো দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে দুটো আমার কাছে আছে বাড়িতে। শুধু শুধু কিনবেন কেন? আমি দিয়ে দেব। একবার আমার বাড়ি থেকে ওষুধটা নিয়ে নিন। আর এখন তো দুপুর। চিন্তা কীসের? আপত্তি নেই তো? সুরেখার আপত্তির প্রশ্নই নেই। ফ্রিতে ওষুধ পাওয়া যাচ্ছে যখন তিনি আপত্তি করবেন কেন? একদম পাশের গ্রাম। তাই সেভাবে দেরি হওয়ার কথাই নয়। সুরেখার সমস্যা নেই। ডাক্তারবাবু স্কুটার নিয়ে নিমেষে চলে এলেন একটা বেশ খোলামেলা বাড়ির সামনে। বাড়ি নয়। অনেক বড় একটা বাগান। দূরে একটাই ছোট্ট ঘরের মতো আছে। দেখা যাচ্ছে পোলট্রিও আছে। বাগানটি বেশ ঘন। বড় বড় গাছ। ফুলের গন্ধ  
পাওয়া যাচ্ছে। স্কুটার সোজা ভেতরে ঢুকে এল। ভেতরে মানে সেই ঘন বাগানের মধ্যে। নামুন। বললেন, ডাক্তার পল। সুরেখা নামলেন। আপনি এখানে একটু দাঁড়ান। আমি ভেতর থেকে একটা ফাইল নিয়ে আসছি। সুরেখা ঘাড় নেড়ে বাড়ি দেখছেন। এটাই ডাক্তারবাবুর বাড়ি? এরকম আবার বাড়ি হয়? ডাক্তারবাবু তাঁর মনোভাব আঁচ করে হাসতে হাসতে বললেন, কী ভাবছেন? এটা আমার বাড়ি কিনা? ঠিক ধরেছেন। এটা বাড়ি না। এটা আসলে আমার একটা ছোট খামার। এখানে ওই ঘরে আমার ওই সোসাইটির কিছু কাজ করি। বাড়ি তো উত্তরদিকে। আজ কেমন ফাঁকা ফাঁকা দেখছেন। কারণ সবাই মেলা দেখতে গিয়েছে। সুরেখা হেসে ফেললেন। তিনি জানেন। দাঁড়ান আপনি…বলে চলে গেলেন ডাক্তারবাবু। বাগানে ঘুরছেন সুরেখা। বেশ অনেক রকম গাছ। আর সারি দিয়ে ফুলের বাগান অন্যদিকটায়। মিনিট পাঁচেক। ডাক্তার পল নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছেন সুরেখার পিছনে। টের পাচ্ছেন না সুরেখা। কারণ তিনি দেখছেন প্রজাপতির একটা খাঁচা। কত রঙবেরঙের। ঠিক সেই একাগ্রতার মুহূর্তে ডাক্তার পল একটা ব্যাট দিয়ে ঠিক মাথার পিছনে মারলেন সুরেখার। পড়ে গেলেন সুরেখা। উঁক করে একটা শব্দ বেরল শুধু মুখ থেকে। মাথার পিছনটা ফেটে গেছে। সেটা যথেষ্ট নয়। তাই এবার সামনে থেকে আবার মারলেন ব্যাট দিয়ে। ক্রিকেট ব্যাট। প্রায় ঘিলু বেরিয়ে এল। এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত। চোখ খোলা। অঝোরে রক্ত পড়ছে। সুরেখার চোখে অবিশ্বাস তখনও লেগে। বেঁচে আছে নাকি? ডাক্তার পল নিঃসংশয় হওয়ার জন্য একটু শ্বাস নিয়ে ধীরে সুস্থে শেষবারও মারলেন। এবং সুরেখা আর নড়লেন না। ব্যাট হাতে ডক্টর পল একটু হাঁপাচ্ছেন। ধাতস্থ হতে দেরি হল না। এবার আর একটা কাজ আছে। বডিটাকে টেনে নিয়ে যেতে হবে একটু। খুব বেশি রক্ত গড়াচ্ছে। সেটাও মোছা দরকার। তবে এই জায়গাটা ইচ্ছে করে বাছা হয়েছে। এখানেই মুর্গি জবাই করা হয় পোলট্রির। তাই রক্ত এদিক ওদিক একটু আধটু থাকেই। কাজের লোক অজয়কে আজ টাউনে পাঠানো হয়েছে মুরগির খাবার কিনতে। আগে থেকেই প্ল্যান করে। যাতে ফার্ম ফাঁকা থাকে। অতএব ভয়ের কিছু নেই। তবু সাবধানে দ্রুত কাজটা সারতে হবে। ডক্টর পল সুরেখার বডিটাকে প্রথমেই একটা স্ট্রেচারে তুললেন। সেটায় হুইল লাগানো। একা টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। সেরকমভাবেই টেনে নিয়ে যাওয়া হল বাগানের আরও গভীরে। দেখা যাচ্ছে আগে থেকেই সেখানে একটা বিরাট গর্ত। আয়তাকার। ঠিক যেন একটা কবর। হ্যাঁ। কবরটা ডক্টর পল খুঁড়ে রেখেছেন। সুরেখার বডি সেখানে নিয়ে এসে একটা সামান্য ঠেলা দিলেন। গড়িয়ে পড়ল মৃতদেহ। মাটি ফেলা শুরু হল। যতক্ষণ না গর্ত বুজে গেল সম্পূর্ণভাবে। কাজ শেষ? না এখনও একটা ছোট পর্ব বাকি। একটা জল দেওয়ার ঝারি, সার আর অনেক গাছের চারা ঘরের বারান্দায় রাখা ছিল। চারটে চারা আনা হল। সেগুলি এই বুজে যাওয়া গর্তের উপর মনোযোগ দিয়ে যত্নের সঙ্গে রোপণ করলেন ডক্টর পল। তারপর সামান্য জল। এখনই বেশি জল নয়। প্রথমে বেশি জল দিয়ে এই সুন্দর ছোট ছোট গাছগুলো মরে যাবে। ডাক্তার পল গাছ ভালোবাসেন। ফুল ভালোবাসেন। সমাজসেবী মানুষটি আশেপাশের চারটি গ্রামের মানুষের কাছে দেবতুল্য। তারপর বৃষ্টি নামল জোরে।

ওমকারা সিনেমার শুটিং দেখতে যাওয়া হবে। এর আগে অজয় দেবগণকে দেখা হয়ে গিয়েছে। গঙ্গাজলের শুটিংও এখানেই হয়েছে। এবার সঈফ আলি খান। তাঁকে খুব পছন্দ সন্তোষ পলের দুই ছেলেমেয়ের। বাবার কাছে আবদার ওই শুটিং দেখাতেই হবে। সকলেই তো যাচ্ছে। এমনকী স্কুলও ছুটি দেওয়া হয়েছে। অতএব আজ আর কিছু কাজ নেই। সন্তোষ পলের চেম্বার আছে অবশ্য। কিছু রোগী দেখতেই হবে। ডাক্তারবাবু সন্তোষ পল। কখনও রোগী ফেরান না। এলাকায় খুব নামডাক। আর সমাজেসবাতেও পিছিয়ে নেই। যে কেউ বিপদে পড়লে ডক্টর সাব আছেন। মাত্র ১৫ টাকা তার ভিজিট। তাই ভিড় লেগেই আছে সন্তোষ পলের চেম্বারে। হবে নাই বা কেন? সবথেকে কাছের হসপিটাল হল ওয়াই টাউনে। ২০ কিলোমিটার দূরে। তাই সকলেই আসে ডাক্তারবাবুর কাছে। এরকম একটি গ্রামে যে এমন এক ডাক্তার আছেন এটাই তো অনেক বড় আশীর্বাদ। শুধু একটি গ্রামেই নয়। কাছাকাছি আরও দুটি গ্রাম আছে। যেখানে সপ্তাহের দু তিনদিন সন্তোষ পল চেম্বার করতে যান। সেই গ্রামদুটির নাম উদাওলি আর রানাভেলে। সোজা কথায় একটা জিনিস স্পষ্ট। ৪২ বছরের ডাক্তার সন্তোষ পলের মতো মানুষ সত্যিই পাওয়া যায় না আজকাল! শুধু কি চেম্বারে বসে চিকিৎসা? না। তিনি অনেক পেশেন্টকে সঙ্গে করে টাউনে নিয়ে যান হাসপাতালে। কিংবা কোনো একটা টেস্ট করাতে। মানুষের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। এরকম একটা লোক আবার পরিবারঅন্ত প্রাণ। ভারি মিশুকে মানুষটা। মহারাষ্ট্রের সাতারা জেলার এক ছোট্ট জনপদ ধম। গ্রামই বলা যায়। একদিকে কৃষ্ণা নদী বয়ে যাচ্ছে। সেই নদীতীরে সারি দিয়ে একের পর এক মন্দির। আর গোটা গ্রামকে ঘিরে রেখেছে ঘন সবুজ গাছ আর অরণ্য। দূরে দেখা যায় টিলাসদৃশ পাহাড়শ্রেণি। ঠিক এই কারণেই এই জায়গাটা মুম্বই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির প্রিয় শুটিং স্পট। এই তো গঙ্গাজল নামে একটি সিনেমার শুটিং হল কিছুদিন আগেই। অনেক আগে থেকে জানা হয়ে যায় যে আবার আসছে সিনেমার লোকেরা। শুধু যে গ্রামের মানুষ শ্যুটিং দেখতেই যান তা নয়। তারা চান্স পান সিনেমায়। এক্সট্রা হিসাবে। অতএব সিনেমার গ্রামবাসীরা আসলে সত্যিকারের গ্রামবাসীবৃন্দই। তাই ডাবল মজা। সকাল থেকে প্রস্তুতি শুরু হয় শুটিং দেখার জন্যই শুধু তাই নয়, শুটিং করার জন্যও। কারণ তারাও তো সিনেমাটির অঙ্গ। অতএব সিনেমার শুটিং মানে বেশ কয়েকদিন ধরে ধর্ম গ্রামে এক উৎসবের পরিবেশ। মেলা বসে কৃষ্ণা নদীর অদূরে। আসে কতরকম খাবারের দোকান। মুম্বইয়ের হালফ্যাশনের জামাকাপড় নিয়ে আসে কিছু স্টল। একদিকে চলে শুটিং। আর অন্যদিকে কিছুটা দূরে বসে যায় মেলা। তাই ধর্ম গ্রামের নিত্যবছরের এক অন্য পরবের নাম শুটিং উৎসব। সকাল থেকে আকাশ মেঘলা। বৃষ্টি হবে নাকি? তাহলে তো শুটিং ক্যান্সেল! আশঙ্কায় ধর্ম গ্রামের বাসিন্দারা। বারংবার সকলেই আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। যদি মেঘ কেটে যায়। একটা সমস্যা হয়েছে। ডক্টর সন্তোষ পলের আজ একটু জরুরি কাজ আছে। তাই তিনি ছেলেমেয়েকে নিয়ে যেতে পারছেন না। স্ত্রী সন্ধ্যাকে বললেন, তুমি একটু প্লিজ নিয়ে যাও। আমার একটা জরুরি পেশেন্ট আসবে। আর ওয়াই টাউন থেকে কিছু রিপোর্ট আসার কথা। সেগুলো এসে পড়ে থাকলে হবে না। সন্ধ্যা হাসলেন। তিনি জানেন স্বামী এরকমই। একদম যাকে বলে কাজপাগল। তাই স্বামীর মাথায় হাত রেখে আদরের ভঙ্গিতে বললেন, চিন্তা কোরো না তো! আমিই নিয়ে যাব। সন্তোষ ২০০ টাকা স্ত্রীর হাতে দিয়ে বললেন, এই নাও..ওদের কিছু কিনে টিনে দিও। আর সেজেগুজে যেও। বলা যায় না আমার সুন্দরী বউকেও হয়তো সিনেমার লোকদের পছন্দ হয়ে যাবে। আর তুমিও চান্স পেয়ে যাবে সঈফ আলি খানের সঙ্গে। আমরা হয়ে যাব সেলেব্রিটি। বলে হা হা হা হা করে হাসতে লাগলেন সন্তোষ পল। হেসে উঠলেন সন্ধ্যাও। এই লোকটাকে বাড়িতে দেখলে কে বলবে এত ব্যস্ত আর জনপ্রিয় এক ডাক্তার। অথচ কী নরম মন। এই তো কালই একটা বিয়েবাড়ি ছিল। নামেই বিয়েবাড়ি। আসলে পঞ্চায়েতের কমিউনিটি হলে। গ্রামের জমাদারের মেয়ের বিয়ে। সন্তোষ পলের নিজের একটা সমাজসেবার সংস্থাও আছে। সেই সংস্থা থেকেই এই জমাদারকে অর্থসাহায্য করা হয়েছে। নামে সংস্থা। আসলে তো সবই ডাক্তারবাবু। গ্রামের মানুষ বিয়েতে এসে ধন্য ধন্য করেছেন ডাক্তারবাবুর। সন্ধ্যার এইসব সময় গর্বে প্রাণটা ভরে যায়। কত যে ভাগ্য করে এরকম একটা মানুষের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল। আর ফুটফুটে দুটি ছেলেমেয়ে। লোকটাকে কাজ করতে দিলে আর কোনো ঝামেলা নেই। সন্ধ্যা বললেন, কোনো চিন্তা কোরো না। বাচ্চাদের নিয়ে আমি যাব। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন সন্তোষ পল। তিনি চলে গেলেন চেম্বারে। যদিও আজ চেম্বারে তেমন লোকজন নেই। রোগীর সংখ্যা কম। কারণ আজ শুটিং। বেশিরভাগ মানুষই শুটিং দেখতে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ চেম্বার করার পর যখন সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে গেল তখন বেরোলেন ডাক্তার পল। নিজের বাড়ির দিকে। কিন্তু পিছনের রাস্তা দিয়ে। নিজের বাড়ির ঠিক উলটোদিকের একটি বাড়িতে ঢুকলেন। পিছনের দরজা দিয়ে। তিনি নক করেছিলেন। দরজা খুলে গেল। বোঝা গেল এই যাতায়াতটি আছে। আর তিনি যে পিছনের দরজা দিয়েই যাতায়াত করেন তাও এই বাড়ির বাসিন্দাদের জানা। বাসিন্দারা বলতে কেউ নেই। থাকেন একা এক মহিলা। বনিতা গায়কোয়াড়। ওজন কমে যাচ্ছিল বনিতার। ৪৩ বছর বয়স। হু হু করে ওজন কমছে। চুলও পড়তে শুরু করেছে। সবথেকে বড় সমস্যা খুব ঘন ঘন জ্বর আসছে। কই ওষুধ খেলেও তো জ্বর কমে না। কেন? ডাক্তার পল কয়েকটি রক্ত পরীক্ষা করার পর বনিতাকে জানিয়েছেন আপনার একটা কঠিন রোগ হয়েছে। তবে ঘাবড়াবেন না। আমি ঠিক করে দেব। কী রোগ? এটাকে বলে অ্যাকিউট ইমিউনো ডেফিসিয়েন্সি সিনড্রোম। তার মানে কী? বনিতা বোঝেন না এত জটিল নাম। ডাক্তার পল একটু থেমে বলেছিলেন, এর নাম এইচ আই ভি পজিটিভ। আপনার এইডস ইনফেকশন হয়েছে। চমকে উঠেছিলেন বনিতা। রোগটার নাম তিনি শুনেছেন। মানুষ তো মারা যায় এই রোগে! তাহলে কি তিনিও মারা যাবেন? বিনয়ী সহানুভূতিশীল আর প্রচণ্ড দয়ালু ডাক্তার সন্তোষ পল তাঁকে বলেছিলেন অনেক মানুষ বেঁচে আছে। কোনো চিন্তা নেই। আমি আছি। মাঝেমধ্যেই টাউনে গিয়ে রক্ত পরীক্ষা। আর কিছু কিছু ব্যাপার মেইনটেইন করতে হবে। তবে সাবধান কেউ যেন না জানে। তাহলে আপনাকে সবাই গ্রাম থেকে বের করে দেবে। বনিতার চোখে জল এসে গিয়েছিল। এরকম এক মানুষ তাঁর চিকিৎসা করেন ভেবে। আজ ডাক্তার পল আবার এসেছেন। আজকাল তিনি নিজেই আসেন। চেম্বারে যেতে বারণ করেন। ছোট্ট চেম্বার। ভিতরে ডাক্তার আর রোগীর মধ্যে কী কথা হচ্ছে তা সবই শোনা যায় বাইরে থেকে। অনেক রোগী অপেক্ষা করে বাইরের বেঞ্চে। তাই কখন কার কানে যায়। দরকার কী? আমিই আসব। বলেছিলেন ডাক্তার। রেডি হয়ে নিন ম্যাডাম! বনিতা অবাক! কী ব্যাপার? ডাক্তার বললেন, একটা টেস্ট আছে। ব্লাড নিতে হবে। বনিতা বললেন, সেই টাউনে যেতে হবে? না না …আজ আর টাউন নয়…আমার ফার্মের ঘরেই অ্যাপারেটাস আছে। ওখানে আজ ওয়াই হাসপাতাল থেকে একটা ছেলে আসবে। ছেলেটা কয়েকটা স্যাম্পল নিয়ে চলে যাবে। ভাবলাম তাই আপনিও করিয়ে নিন। প্রায় দেড় মাস হয়ে গেল। আধঘণ্টার ব্যাপার। চলুন। এখনই ? বনিতার প্রশ্ন? হ্যাঁ। এখনই। অগত্যা। বনিতা গেলেন। এবং ফিরলেন না। রাস্তায় কারও সঙ্গে দেখা হয়নি। কেউ দেখেনি তিনি কোথায় যাচ্ছেন। ডাক্তারের স্কুটারে চেপে সেই ফার্ম হাউস। তবে এবার একটু ফারাক আছে। বনিতাকে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করাতে পেরেছিলেন যে সত্যিই তাঁর চিকিৎসা হচ্ছে। কারণ এবার আর বাগান নয়। নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ফার্মের মধ্যে ছোট ঘরের মধ্যে। একটা ক্যাম্প খাট পাতা। সেখানে বনিতাকে শুয়ে পড়তে বললেন ডাক্তার পল। বললেন, একটা ইঞ্জেকশন দিতে হবে। হাতে নেবেন নাকি কোমরে? বনিতার খুব ইঞ্জেকশনে আতঙ্ক। ভয়ে ভয়ে বললেন, আপনি যা ঠিক মনে করবেন। কিন্তু ইঞ্জেকশন কেন? আপনি তো বললেন ব্লাড টেস্ট। ডক্টর পল হাসলেন..। সিরিঞ্জ একটা ভায়ালে ঢুকিয়ে টেনে নিচ্ছেন একটি তরল….জবাব দিলেন না…। বনিতার ভয় লাগছে। খুব লাগবে না তো! এবার মুখ খুলছেন ডাক্তারবাবু। বললেন, একদম বুঝতেই পারবেন না। শুধু সামান্য ঘুম আসবে। বাড়ি ফিরে খেয়েই ঘুম দেবেন। আবার কাল আমি গিয়ে ব্লাড রিপোর্ট দিয়ে আসব আপনাকে। বনিতা ইঞ্জেকশনটি তাঁর শরীরে ঢোকার মুহূর্তে চোখ বুজলেন। চোখ আর খোলেনি। সেটি ছিল হাই ডোজের এক অ্যানাস্থেশিয়া। চিরঘুমে চলে যাওয়ার পর বনিতার বডি স্ট্রেচারে করে নিয়ে যাওয়া হল বাগানে। সেখানে আগে থেকেই খোঁড়া ছিল একটি বড় গর্ত। আয়তাকার। মানুষের দেহ যাতে মাপমতো ঢুকে যায়। বনিতার দেহ মাটিতে পুঁতে দেওয়ার পর সেখানে লাগানো হল নতুন গাছের চারা। এবার দেবদারু…। তখন বৃষ্টি পড়ছে। একটু আগেই ছিল ঝিরিঝিরি। এখন মুষলধারে।

আর সেখান থেকে সোজা কৃষ্ণানদীর তীরে। বৃষ্টি ধরেছে। তবে শুটিং হচ্ছে না। আকাশে মেঘ। একটু পরিষ্কার হলে শুরু হবে। ভিড় ঠেলে এগনো যাচ্ছে না। প্রায় মিনিট দশেক দাঁড়িয়েও সন্ধ্যাকে দেখা যাচ্ছে না। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ একজন জড়িয়ে ধরল। চমকে উঠলেন ডক্টর পল। পরক্ষণেই হেসে উঠলেন। ছেলে। ঘুরে দাঁড়িয়ে ছেলেকে কোলে তুলে আদর করতে লাগলেন ডাক্তারবাবু। একটু দূরে ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছেন সন্ধ্যা। জানতে চাইলেন..কাজ হয়ে গেল তোমার? ডক্টর পল হেসে জবাব দিলেন, হ্যাঁ…আরে হাসপাতালের ছেলেটা এত দেরি করে এল…তা না হলে তো আরও আগে আসতাম…চলো কিছু খাওয়া যাক….। সুখী পরিবারটি হেঁটে গেল মেলার দিকে..।

২০০৭। ডক্টর সন্তোষ পল একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি। শুধুই ডাক্তার নয়। সমাজসেবী। তাই তাঁকে গ্রামবাসী বিপুল ভোটে জয়ী করিয়েছেন পঞ্চায়েত নির্বাচনে। ওই ঘটনাগুলির পর এখন ডক্টর সন্তোষ পল একজন পঞ্চায়েত সদস্য। এখন আর তিনি ওই ধর্ম গ্রামে থাকছেন না। বাড়ি, ফার্ম হাউস সবই আছে। তিনি নিজে শিফট হয়েছেন ওয়াই টাউনে। কাজের চাপ এত বেশি যে প্রায় সপ্তাহে দু তিনদিন আসতেই হয়। তার থেকে বরং ওয়াই টাউনে থাকা ভালো। আর নিয়ম করে ধর্ম গ্রামে গিয়ে চেম্বার করা কিংবা ফার্ম হাউসের দেখভাল। ওয়াই টাউনে শিফট হওয়ার আর একটি কারণ আছে। একটি প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি পাওয়া গিয়েছে। ৩৫ বেডেড হাসপাতালটির মালিক ডক্টর বিদ্যাধর ঘোটওয়াদেকর। কী কারণে হাসপাতালটির নামডাক দারুণ বেড়ে গেল? কারণ আইসিইউ বিভাগে একজন নতুন ডাক্তার এসেছে। তার কাজ অবশ্য আইসিইউতে নয়। নেহাৎ সার্জারিতে সাহায্য করা তাঁর ডিউটি। তাছাড়া হাসপাতালের আউটডোরে বসা। কিন্তু সারারাত আইসিইউতে থাকেন ওই ডাক্তার। নাম ডক্টর সন্তোষ পল। একটাই সুবিধা তাঁকে রাখার। ইনি হোম ভিজিট করতে ভালোবাসেন। তাই কোনো অপারগ রোগী যদি হাসপাতালে বা ক্লিনিকে আসতে না পারে তাহলে হাসপাতালে খবর দিলে বা রোগীর আত্মীয়রা নিয়ে গেলে একমাত্র যখন তখন যেতে রাজি একজনই। ডক্টর পল। তিনি যে পরিপূর্ণ চিকিৎসা করেন সেখানে গিয়ে তা নয়। কিন্তু প্রাথমিক ভাবে পরীক্ষা করে ফিরে এসে রিপোর্ট দেন। তারপর সেইমতো অ্যাম্বুলেন্স পাঠানো হবে দরকার পড়লে। ডক্টর পলের উপর কর্মীরা খুশি। ডক্টর পলের সঙ্গে দারুণ সম্পর্ক মালিকেরও। সকলেই এরকম এক মানুষকে পেয়ে খুব আনন্দিত। এই প্রথম একজন ডাক্তার যার টাকার প্রতি লোভ নেই। ডিউটিতে কোনো ফাঁকি নেই। অন্যের কাজ করে দেন। এমনকী অন্যের নাইট ডিউটির সময় বলেন তোমরা ঘুমাও, আমি আছি। লোকটা কী অদ্ভুত! তাই ডক্টর পলের প্রেমে পড়লেন সালমা শেখ। হাসপাতালের এক নার্স। ২৮ বছর বয়স। তবে অনাথ। পেয়িং গেস্ট হিসাবে কাছেই থাকেন। আত্মীয়স্বজন বলতে তেমন কেউ নেই। তাঁর এই একাকিত্বে প্রধান সহায় হয়ে উঠেছেন ডাক্তারবাবু। বিভিন্ন রোগীর বাড়ি থেকে কল এলে ডাক্তার ছাড়াও একজন নার্স সঙ্গে যায়। আজকাল দেখা যাচ্ছে। সেই নার্স সর্বদাই সালমা। কখন কী দরকার হয় তাই। এছাড়া আবার ডক্টর পলের গুণের শেষ নেই। তিনি দুর্দান্ত ফিজিওথেরাপিস্টও বটে। আজকাল ফিজিওথেরাপিস্টের চাহিদা আকাশছোঁয়া। তাই এই ব্যাপারেও প্রচণ্ড কাজের চাপ তাঁর। বাড়িতে গিয়ে ফিজিওথেরাপি করে আসেন এবং হাসপাতালেও একটি পৃথক রুম তাঁকে দেওয়া হয়েছে।

ওয়াই শহরের স্বর্ণকার নাথমল ভান্ডারির বয়স ৬৩ বছর। অনেকদিন হয়ে গেল বিছানায় শোয়া। প্রায় প্যারালাইসিস। তাঁকে নিয়ম করে করতে হয় ফিজিওথেরাপি। এতদিনে মোটামুটি জানা হয়ে গিয়েছে রোগীকে দেখতে বাইরের কল থাকলে সাধারণত যাবেন ডক্টর পল আর সঙ্গী বেশিরভাগ সময় সালমা। আজ পর্যন্ত সালমাকে কখনও অন্য কোথাও নিয়ে যাননি ডাক্তারসাব। তাঁদের যাবতীয় দেখাসাক্ষাতের স্থান এক ও একমাত্র হাসপাতাল। কতবার সালমা চেয়েছে একটু বেড়াতে যেতে। ডক্টর পল রাজি নয়। কারণ তিনি একদিনও কাজ ছাড়া নাকি থাকতে পারেন না। সালমার প্রশ্ন আমি কী করব ডাক্তারসাব? আমার তো আর কেউ নেই! আপনি ছাড়াও আর কাউকে আমার বিয়ে করাও আর সম্ভব নয়। ডক্টর পল সময় পেলেই বোঝান সালমাকে। আমার একটা পরিবার আছে। আমি তাদের ভালোবাসি। তোমাকেও আমি ভালোবাসি। কিন্তু তাই বলে তো আমি তোমাকে নিয়ে আলাদা সংসার করতে পারি না। সেটা আমার পক্ষে সম্ভবই না। ঠিক এই কারণেই সালমা আরও বেশি করে ভালোবেসে ফেলছে লোকটাকে। এই সততা তাঁকে খুব টানে। আর ওই যে নিজের স্ত্রী আর ফ্যামিলির প্রতি একটা টান। আজকাল দেখাই যায় না। সালমা মুগ্ধ। তাঁর কাছে স্বপ্নের মানুষ এই লোকটা। রবিবার যেতে হবে আবার সেই ভান্ডারির কাছে। সালমাও যাবে। ভান্ডারি যে একা থাকে তা নয়। তবে তাঁর কাছে নাসিক থেকে ছেলেরা আসে সপ্তাহে একদিন। আর একজন সর্বক্ষণের কাজের লোক আছে। তবে রাতে সে চলে যায়। নিয়ম হল যখনই তাঁরা সেখানে যান তখন ওই লোকটি কিছুক্ষণ পরই বেরিয়ে নিজের বাড়িতে চলে যায়। সাধারণত রাতে যাওয়া হয় ফিজিওথেরাপির জন্য। ফিজিওথেরাপিতে অনেক সময় লাগে। সেই ফাঁকে ওই পরিচারক রান্নাবান্না সেরে নেয়। এবং চলে যায় নিজের বাড়ি এই ব্যবস্থা ডাক্তারবাবুই করেছেন। তাই ডাক্তারবাবুর কাছে কৃতজ্ঞ সেই কাজের লোকটিও। রবিবার সালমা দেখলেন আজ ডক্টর পলের হাতে ফার্স্ট এইড বক্স। এবং গাড়ি নিয়ে এসেছেন। কী ব্যাপার? কোনো বিশেষ দরকার? ডক্টর পল বললেন, একটা স্টেরয়েড দিতে হবে আজ ভান্ডারিকে। আর আমাকে একবার গ্রামে যেতে হচ্ছে। কাল ফিরব। আজ থেকে ভান্ডারির নতুন একটা কোর্স শুরু হচ্ছে। সালমার সন্দেহ হল না কিছু। তাঁর চোখের সামনেই একটা ইঞ্জেকশন দেওয়া হল। ইনজেকশনের নাম স্কোলিন। মাসল রিলাক্সেন্ট। ভান্ডারির প্যারালিসিস। তাঁর বোধ হল না কী ঢুকছে শরীরে। ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর সালমাকে ফিজিওথেরাপির কিট বের করতে বললেন ডাক্তার। সেইমতো সালমা সবই নিয়ে এসেছেন। রোজের মতোই চলতে লাগল। তবে আজ পেশেন্ট নড়ছে না একটুও। সালমার মনে একটু খুঁতখুঁত করছে। কী ব্যাপার? সালমা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। ডাক্তার পল আচমকা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন। আর বললেন, সালমা ইউ আর সুইট অ্যান্ড সিম্পল..। মানে কী? হঠাৎ সালমাকে একটু কাছে টেনে নিচ্ছেন ডাক্তার। একী? সালমা অপ্রস্তুত। এরকম তো কখনও করেন না উনি। কিন্তু সে বাধা দিল না। সে তো কবে থেকেই ভালোবাসে। তাহলে ডাক্তারসাহেবের ধ্যান ভেঙেছে অবশেষে? সালমা একটু ঘন হয়ে কাছে সরে আসতেই আচমকা কোমরে তীব্র এক যন্ত্রণা। হাসছেন ডাক্তার তখনও। এটা আর একটা ইঞ্জেকশন। এটাও স্কোলিন। গোটা ভায়াল ঢুকে গেল সালমা শেখের শরীরে। রাতের অন্ধকারে দুটি মৃতদেহ একা হাতে বের করে গাড়িতে তুলেছেন ডাক্তার পল। আর সোজা ড্রাইভ করে তাঁর মৃত্যু সাধনা কেন্দ্র সেই ধর্ম গ্রামের নিজের ফার্ম হাউস। এবং সেই একই দৃশ্য। আগে থেকেই দুটি আয়তাকার গর্ত খোঁড়া আছে। সেই দুটি গর্তে দুজনকে সমাধিস্থ করে হাত ধুচ্ছেন ডক্টর পল। কারণ মাটি লেগে গিয়েছে হাতে। অন্ধকারে কবরের উপর গাছ লাগাতে হয়েছে তো…!! তবে মাটি ধুয়ে যাচ্ছে কবরেরও। কারণ একটু পর বৃষ্টি নামল। একটি নয়..দুটি নয়…তিনটি নয়। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত এরকমভাবে সকলের অলক্ষে প্রায় সাতটি খুন করেছে যে সাইকিক ডাক্তার, তার নাম সন্তোষ পল। এবং যেদিন সে খুনগুলি করেছে প্রতিটি দিনই বৃষ্টি হয়েছে তুমুল। অথবা গ্রামে ছিল শ্যুটিং। সে কী বর্ষার সম্ভাবনা দেখেই খুনের প্লট ঠিক করত? ২০১৬ সালে সে গ্রেপ্তার হয়েছিল। কিন্তু কেন খুন করেছে একের পর এক ? ডাক্তারবাবু তাঁর সামনে জেরা করতে বসা পুলিশ সুপার সন্দীপ পাতিলের চোখে চোখ রেখে বলেছেন, আমিই খুন করেছি। কিন্তু কেন করেছি? তা আমি বলব না? আপনাদের খুঁজে বের করতে হবে। পারবেন? মোটিভ কী? জানা যাবে? ডক্টর সন্তোষ পলের নাম কেন হয়ে উঠেছিল ডক্টর ডেথ? পুলিশকে প্রথম কু দিয়েছিলেন কে? একটি নিরীহ মেয়ে।..ডাক্তার ডেথ জানতেই পারেননি তাঁর আড়ালে সেই মেয়ে তীক্ষ্ণভাবে লক্ষ করছে বাগানের গর্ত খোঁড়া…। মেয়েটির কী হল?

গুলাবরাও পল মুম্বইয়ের বাস কোম্পানি বেস্টের একজন সাধারণ কর্মী। সন্তোষ পল তাঁর মেজ ছেলে। ছোট থেকে চুপচাপ। তার জীবনের দুটি লক্ষ্য। ডাক্তার হওয়া আর প্রশাসনের অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা। এমন এক শক্তিশালী সংস্থা গড়ে তোলা যাকে পুলিশ থেকে কালেক্টর সকলেই যেন ভয় পায়। সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাশ করার পর সন্তোষ পল ঢুকেছিলেন গৌরী শংকর মেডিকেল কলেজে। মহারাষ্ট্রের সাতারা টাউন । ১৯৯৪। পাশ করলেন অদ্ভুত নামের কোর্স। ইলেকট্রোপ্যাথি মেডিসিন অ্যান্ড সার্জারি। ১৯৮৬ সাল থেকে মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন কলেজে এই বিশেষ চিকিৎসা প্রক্রিয়ার কোর্স চালু হয়েছিল। অ্যালোপ্যাথির বিকল্প অন্য একরকমের চিকিৎসা পদ্ধতি। কিন্তু ফের আর একটি অল্টারনেটিভ চিকিসা ব্যবস্থা শুরু হলে আবার মানুষকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দেওয়া হবে না তো? গ্রামেগঞ্জে শুরু হবে না তো অন্তহীন মৃত্যু মিছিল? হাতুড়ে ডাক্তারদের হাতে! বিধানসভায় বিরোধীদের এবং বাইরে বিভিন্ন ডাক্তারি সংগঠনের পক্ষ থেকে আন্দোলন শুরু হল। এই ব্যবস্থা যেন বন্ধ হয়। সন্তোষ পলের দুর্ভাগ্য, ঠিক যে বছর তিনি পাশ করলেন, সেই বছরেই এই কোর্সকে সরকার বাতিল করে দিল। এই কোর্স থেকে পাশ করা কেউই আর নিজেকে চিকিৎসক আখ্যা দিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারবে না। বিজ্ঞপ্তি জারি হয়ে গেল। সন্তোষ পল ডাক্তারি পাশ করেছেন। কিন্তু ডাক্তার হওয়া তাঁর হল না। অথচ জীবনের একমাত্র শপথ ডাক্তারি করা। তাই তিনি হাল ছাড়লেন না। সোজা নিজের জন্মভূমি যেখানে সেই ধর্ম গ্রামের বাড়িতে চলে গেলেন। আর শুরু করলেন প্রাইভেট প্র্যাকটিস। সাদা রঙের বাড়ির বাইরে একদিন গ্রামবাসী আবিষ্কার করলেন একটি নেমপ্লেট লেখা-ডক্টর এস জি পল! গ্রামে নতুন ডাক্তার? গুলাবরাও পলের এটাই পিতৃপুরুষের বাড়ি। তিন প্রজন্ম ধরে আছেন তাঁরা। আজ তিনি নেই। তাঁর ছেলে মুম্বই থাকে। সেই মেজ ছেলেই এতদিন পর গ্রামে ফিরে এসেছে ডাক্তার হয়ে। গ্রামের ছেলে ডাক্তার! আর গ্রামেই প্র্যাকটিস করবে? বাহ! এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে? অতএব অল্পদিনের মধ্যে শুধু যে পসার সাংঘাতিক জমে গেল তাই নয়, চারটি গ্রাম ডাক্তারসাব বলতে অজ্ঞান।

এহেন এক নিরীহ ও জনপ্রিয় ডাক্তার একের পর এক সাতটি খুন করেছিলেন! কেন? যা গোটা মহারাষ্ট্র ছাপিয়ে দিল্লির গোয়েন্দাদের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। দুটি গ্রাম পিছু একজন করে থাকে পুলিশ পাতিল। কাকে বলে পুলিশ পাতিল? পুলিশের ইনফর্মারকে। মহারাষ্ট্রে যাদের নাম হয় পুলিশ পাতিল। সাধারণ গ্রামবাসী কিংবা কোনো ছোটখাটো ব্যবসা করে। আসলে পুলিশের চর। মাসিক বেতনের বন্দোবস্ত আছে। এই হল পুলিশ পাতিল। ধম গ্রামের পুলিশ পাতিলের নাম বসন্ত নায়গোয়াডে। চায়ের দোকান। অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী মঙ্গলা জেরের সঙ্গে যোগাযোগ আছে পূর্ব প্রাথমিক শিক্ষা সেবিকা কেন্দ্রের। একটি রাজনৈতিক সংগঠন। সেখানে যাতায়াত আছে মঙ্গলার। বছরভর আশেপাশের চারটি গ্রামে ঘুরে ঘুরে তাঁর ডিউটি। তাই প্রায় প্রতিটি গ্রামবাসীর পরিবারকে তিনি চেনেন। এই যে সুরেখা, বনিতা আর তারপর আবার জাহ্নবী উধাও হয়ে গেল এর মধ্যে একটা অদ্ভুত মিল আছে না? একদিন নিজের সাইকেল নিয়ে যেতে যেতে আচমকা মাথায় এল মঙ্গলার। ডক্টরের সঙ্গে কী কোনো সম্পর্ক আছে ওই সব ভ্যানিশের!

ওহ, জাহ্নবীর উধাও হওয়ার গল্পটি তো এখনও জানা হয়নি। কৃষ্ণা নদীর তীর ধরে সোজা হেঁটে গেলে ধম গ্রামের শেষপ্রান্তে পড়বে একটি বাঁশবাগান। সেটি পেরোলেই এক ছোট্ট জনপদ। আছে প্রাইমারি স্কুল, সপ্তাহে দুদিনের হাট আর ধানকল। গ্রামের নাম নায়াগা। এখানে থাকেন জাহ্নবী পল। ডক্টর পলের দূর সম্পর্কিত বোন। জাহ্নবীর সংসারে প্রবল অশান্তি। পরিবারের মধ্যে নয়। আত্মীয়দের নিয়ে। কারণ চার একর জমি। পৈতৃক সম্পত্তি হিসাবে সেই জমি পাওয়ার কথা জাহ্নবীর স্বামীর। কিন্তু স্বামীর দুই ভাই কিছুতেই সেই জমির কাগজপত্র দেবে না। মাসের পর মাস…এবং বেশ কয়েক বছর চলে গেল। জমি আর পাওয়া হল না। এভাবেই একদিন স্বামী অজয় জমির দখল পাওয়ার আগেই মারা গেলেন। এক মেয়েকে নিয়ে জাহ্নবী একা। তাঁর জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ওই জমিটির অধিকার পাওয়া। স্বামীর অন্তিম ইচ্ছে। তিনি কিছুতেই অধিকার ছাড়বেন না। কিন্তু এজন্য তো ল্যান্ড রেভিনিউ দপ্তরে যাতায়াত করা দরকার। তিনি যে একা বিধবা। কিছুই জানেন না। কার কাছে সহায়তা চাইলেন? দাদার কাছে। ডক্টর সন্তোষ পল। প্রায় সপ্তাহে দুদিন ধরে দেখা হচ্ছে। চেম্বার করে সন্তোষ পল সোজা চলে আসেন এই বাড়ি। শুধু যে জমির কাগজপত্র নিয়ে আলোচনা তাই নয়। জাহ্নবীর মেয়ে পল্লবীকে একটু অঙ্ক দেখিয়ে দিতে হয়। বাবা নেই। মেয়েটিকে দাঁড় করাতে হবে না? এটুকু সাহায্য না করলে আর আত্মীয় কিংবা স্বজন কীসের? নিয়ম করে আসতেন জাহ্নবীর সন্তোষ ভাইয়া। ওয়াই টাউনের জমিজমা সংক্রান্ত কেস হ্যান্ডল করেন এক উকিল। তিনি সন্তোষ ভাইয়ার বন্ধু। তাঁর কাছেই কাগজপত্র দেখিয়েছে সন্তোষ ভাইয়া। জাহ্নবীকে বলেছেন, কোনো চিন্তা নেই। মনে হচ্ছে দলিল বের করা যাবে। যদি তোমার শ্বশুরবাড়ির ওরা না দেয়, আমাদের মামলা করা ছাড়া উপায় নেই। সেসব আমি দেখব। তুমি ভেবো না। ভাববেই বা কেন জাহ্নবী? এরকম এক পরোপকারী মানুষ তাঁদের পাশে আছেন। অতএব পল্লবীর সেকেন্ডারি পরীক্ষার টেস্ট এক্সাম শেষ হলে এক বুধবার সন্তোষ বললেন, জানু, কাল একবার যেতে হবে টাউনে। উকিলের সঙ্গে ল্যান্ড অফিসে যাব। আমি একা গেলে তো আমাকে কোনো দলিল দেখতে দেবে না। তোমাকে দরকার। জাহ্নবীর ভালো লাগল। জমি পাওয়ার একটা ব্যবস্থা হচ্ছে সেই আশার আলোর জন্য নয়। এই যে একটি দিন পাওয়া যাবে এই বদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির। খোলা আকাশের বাইরে। সারাদিন ওয়াই টাউনে কাটানো। একটা যেন দখিনা বাতাস। কতদিন ‘উর্বশী’ হলে সিনেমা দেখা হয়নি। কতদিন খাওয়া হয়নি আলু টিক্কি। জাহ্নবীর মন ভালো হয়ে গেল। কোন শাড়িটা পরা যায়? পরদিন বৃহস্পতিবার। এই দিনেই গণপতি পুজো করেন জাহ্নবী। আজ সকাল সকাল সেরে নিলেন। ভাইয়াকে বলা আছে। জাহ্নবী সোজা ভাইয়ার কাছে যাবেন। সেখান থেকে টাউনে যাওয়া হবে। স্কুটারে। ভাইয়া তো আবার সকালের চেম্বার মিস করবে না। রোগী দেখা আছে। জাহ্নবী একটা গোলাপি রঙের শাড়ি পরলেন। দূর থেকে তাঁকে দেখে ডক্টর পল হাত নেড়ে বললেন, দারুণ দেখাচ্ছে! লজ্জা পেলেন জাহ্নবী! ডক্টর পল জাহ্নবীকে নিয়ে ওয়াই টাউনে গিয়ে সবার আগে ঢুকেছিলেন লস্যির দোকানে। জাহ্নবীর কী যে ভালো লাগল! কতদিন পর..। এরপর উকিলের বাড়ি। দেখা গেল লোকটিকে আগে থেকে সব বলা আছে। এবং স্ট্যাম্প পেপারের ওপর কিছু কাগজপত্র লাগানো। সেখানে সই করা। কাগজগুলি নিয়ে যেতে হবে ল্যান্ড অফিসে। প্রতাপ ফড়ানবিস। ল্যান্ড রেকর্ড সুপারভাইজার। সন্তোষকে দেখেই হাসলেন। স্যার কেমন আছেন?

প্রতাপের চোখ ততক্ষণে জাহ্নবীর দিকে। চোখে প্রশ্ন। সন্তোষের প্রশ্নের জবাবে বললেন, আমি ভালো।

ইনিই জমির মালিকানা চাইছেন?

হ্যাঁ স্যার। ইনিই। আমার বোন।

আচ্ছা। কাগজপত্র এনেছেন?

হ্যাঁ এই যে দেখুন এমনিতে ঠিক আছে। কিন্তু চেইন দলিল তো আপনাদের কাছে নেই। অন্য পার্টির কাছে। তাই ঝামেলা আছে।

স্যার, ইনি তো কোনো বেআইনি ক্লেইম করছেন না। আপনি চাইলে কী না হয়। প্রতাপ হাসলেন। আমি তো চাইলেই হবে না। আপনাদেরও চাইতে হবে । আপনারা কত তাড়াতাড়ি চান? ভেবে দেখুন!

ডক্টর সন্তোষ পল নিমেষে বুঝে গেলেন ইঙ্গিত। তাঁর মুখে একটা রহস্যময় হাসি। বললেন, কত স্যার?

প্রতাপ বললেন, একা তো নই…আরও অনেক লোক আছে..ভাগ দিতে হয়। তবু আপনি এক দেবেন।

এক লাখ? বেশি হয়ে যাচ্ছে স্যার আমাদের কাছে।

আরে জমির পরিমাণটা ভাবুন।

আচ্ছা স্যার। ওটাই হবে। কবে? প্রতাপ বললেন, আগে দলিলটা আদায় করি। তারপর। আমার কোনো কাঁচা কাজ নেই।

এক কাজ করুন আপনি। প্রতাপ এবার তাকালেন জাহ্নবীর দিকে। পরশু একবার আসুন। সন্তোষ বলছেন, স্যার পরশু আমার চেম্বার আছে অন্য জায়গায়। পারব না। প্রতাপ বললেন, আপনার আসার দরকার নেই। উনি সকালে চলে আসবেন। আমি শুধুমাত্র কয়েকটা কাগজে সই করিয়ে নেব। আধ ঘণ্টার ব্যাপার। প্রতাপ কথা বলছেন, আর বারংবার জাহ্নবীর দিকে তাকাচ্ছেন। জাহ্নবীর মুখেও একটা চাপা হাসি কেন? সন্তোষ পলের চোখে পড়ছে।

জাহ্নবী বললেন, ঠিক আছে ভাইয়া। কতবার তুমি আসবে? আমি এবার পারব। একদিনের ব্যাপার তো। চিন্তা কোরো না। চিনেই তো গেলাম।

সন্তোষের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। জাহ্নবী যে তাঁকে ছাড়া নিজেই একা আসতে রাজি হবে তা তিনি ভাবেননি। যাই হোক। কাজটা তাড়াতাড়ি হওয়া দরকার। অতএব তাঁর আপত্তি নেই। তাই হবে।

জাহ্নবীকে নিয়ে বেরিয়ে এলেন সন্তোষ। এবার কিছু খাওয়া যেতে পারে। সেইমতো লাঞ্চ সেরে একবার মার্কেটে যেতে চান জাহ্নবী। তাই হোক। মেয়ে আর নিজের জন্য কিছু কেনাকাটা সেরে জাহ্নবী ফিরলেন ডাক্তার ভাইয়ার সঙ্গে। সন্ধ্যা হয়েছে। স্কুটার এসে দাঁড়াল ডাক্তার পলের ফার্ম হাউসে। কিছু জরুরি ফাইল নিতে হবে। দু মিনিটের ব্যাপার। আমি এখান থেকে চলে যাই ভাইয়া? বললেন জাহ্নবী। সন্তোষ পল মাথা নেড়ে বলছেন, না না দাঁড়াও। আমি দুটো পেপারের ফোটোকপি দিচ্ছি। সেটায় সই করে রাখবে। সোমবার আবার সেই উকিলের কাছে যেতে হবে। আর তুমি তো পরশু যাবেই। ওই প্রতাপকে জিজ্ঞাসা কোরো ভাইয়ার ডেথ সার্টিফিকেট কিংবা কোনো অফিসের কাগজপত্র চাই কিনা। স্কুটার ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে এলেন ডক্টর পল। এবার আর কোনো প্রস্তুতি নয়। নেমেই গলা চেপে ধরলেন জাহ্নবীর। চোখ ঠিকরে বেরোচ্ছে। হাত দিয়ে ছাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা। কিন্তু জাহ্নবীর সেই শক্তি নেই। ধীরে ধীরে লোহার মতো শক্ত ডাক্তারের হাতটা গলায় চেপে বসছে। হাঁ করে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা। ততক্ষণে মাটিতে বসে পড়েছেন জাহ্নবী। পা দুটো ছটফট করছে। কী হচ্ছে এসব? কেন হচ্ছে? বুঝতে পারলেন না। হিসহিস করে ডক্টর সন্তোষ পল বলছেন, প্রতাপকে খুব ভালো লেগেছে জানু… একটা ঘুষখোরকে খুব ভালো লেগেছে… একা একা পরশু দেখা করতে যাবে জানু.. গলায় সাঁড়াশির চাপ বাড়াচ্ছেন সন্তোষ ভাইয়া। হাত নাড়াচ্ছেন…বলার চেষ্টা করছেন কিছু…কিন্তু আর কথা নেই। সন্তোষ পল সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছেন। সুতরাং বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না জাহ্নবী। ঢলে পড়লেন নিস্তেজ হয়ে। মুখের কষ বেয়ে বেরোচ্ছে রক্ত। তখনও চোখ বিস্ফারিত। সেই চোখে অবিশ্বাস। কিন্তু একটাই সমস্যা। আপাতত কোনো গর্ত খোঁড়া তো নেই। এই কাজটা তো প্ল্যানের মধ্যে ছিল না। মেয়েটা এমনিতে ভালো। কিন্তু ওই যে বলে লোভ। সামান্য সংযম নেই। একজনকে ভালো লেগেছে ঠিক আছে। তাই বলে চোখের সামনে এক মিনিট আগে যে ঘুষ চাইছে তাঁর চোখের ইশারায় সাড়া দিয়ে একা দেখা করতে যেতে রাজি হয়ে গেল? ছি ছি ছি..আজকাল মহিলাদের কোনো সংযমই নেই..ভাবলেন ডক্টর।

কিন্তু রাখাটা কোথায় হবে বডিটা? এবার থেকে আগেই কিছু খুঁড়ে রাখতে হবে। কখন কবে দরকার হয়। এই তো আজকেই বিনা প্ল্যানে করতে হল। কেন এভাবে একজন মেয়ের মা, বিধবা এবং ভাইয়ের প্রতি আস্থাশীল মহিলা এক মিনিটের মধ্যে অন্য পুরুষের কথায় আকৃষ্ট হবে? এসব পছন্দ করেন না ডক্টর পল। তাই তো এসব করতে হল। হাতে সময় নেই একদম। তাই ফার্ম হাউসের পিছনেই যেতে হল। সেখানে রাখা আছে কোদাল আর কুড়ুল। এমনিতে যখনই বডি পুঁতে ফেলার দরকার হয় তার আগে জেসিবি কোম্পানির মাটি খোদাই মেশিন বুক করে ডাকিয়ে আনেন। ওই মেশিন এসে খোদাই করে রাখে। তারা ভাবে ডাক্তারবাবু এখানে বোধহয় সার আর ইঞ্জেকশন বা চিকিৎসার বর্জ্য পুঁতে ফেলেন। আসলে পোঁতা হয় ডেডবডি। সবাই তো জানে তাঁর বাগানের শখ। এখন আর সেসব করা হল না। তাই ওই কোদাল আর কুড়ুল। প্রায় ঘণ্টা দেড়েকের চেষ্টায় একটা গর্ত খোঁড়া সম্ভব হল। তবে বড় হল না। মনের মতো নয়। জাহ্নবীর দেহকে একটু ভাঁজ করে রাখতে হবে ছোট গর্তে। তাই করলেন তিনি। পুঁতে ফেলা হল। তবে মনটা খুব খারাপ। বেচারি জাহ্নবীর ওভাবে পা ভাঁজ করে শুয়ে থাকতে নিশ্চয়ই কষ্ট হবে। আমিই তো চিকিৎসা করতাম ওর বাতের ব্যথার। অস্টিও আরথ্রারাইটিস ছিল মেয়েটার..আহারে..। ভাবলেন ডক্টর পল।

তারপর স্নান করে নিলেন। সর্বদাই এই ফার্ম হাউসে একসেট জামাকাপড় থাকেই। এই খুন করার পর আগের জামাকাপড় পরতে ভালো লাগে না। তাই চেঞ্জ করে নেন তিনি। ফিটফাট। তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে। কারণ এরপর একটা প্ল্যান আছে। জামাকাপড় পরে বেরোলেন ডক্টর পল। হাতে জাহ্নবীর শপিং এর জিনিসপত্র। স্কুটার নিয়ে সোজা হাজির পাশের গ্রাম নাগারায়। জাহ্নবীর বাড়িতে। মেয়ে পল্লবী পড়তে বসেছে বটে। কিন্তু এখনও মা আসছে না কেন ভাবছে। খাবারটা কি নিজেই করে নেবে? কখন মা আসবে কে জানে? বাইরে স্কুটারের আওয়াজ। ওই তো এসেছে নিশ্চয়ই।

কই! না তো! মামা একা। কী ব্যাপার। মামা সন্তোষ পল এসে বললেন, দ্যাখ তোর জন্য মা কতকিছু কিনেছে। একটু চা কর তো! তোর মা আসছে। মুদি দোকানে গেল। বলল কিছু রান্নার জিনিসপত্র কিনে ঢুকছে। আর এই দ্যাখ তোর জন্য কত কিছু কিনেছে। পল্লবীর চোখে আলো জ্বলে উঠল। নতুন জামাকাপড় দেখে খুশি হয়ে সে গেল চা করতে। এক ঘণ্টা…দু ঘণ্টা…রাত ১০টা বাজতে যায়। মা আসছে না কেন? ডক্টর পলেরও মুখে খুব দুশ্চিন্তা। কোথায় গেল রে? এই তো আমার স্কুটার থেকে নেমে বলল ১০ মিনিটের মধ্যেই নাকি আসবে। আমাকেও তো ওয়েট করতে বলেছে। আর কারও বাড়ি যেতে পারে? পল্লবী মাথা নেড়ে বলছে জানি না। কখনও তো এতক্ষণ বাইরে থাকেনি অনেকদিন। তবে মুদিবাজারে গেলে অন্য কোথাও যায় না! চল তো বেরিয়ে দেখি। বললেন, ডক্টর পল। সেদিন অনেক রাত পর্যন্তও যখন জাহ্নবী ফিরলেন না, তখন মেয়ে পল্লবীকে নিয়ে ডক্টর পল গেলেন থানায়। মিসিং ডায়েরি করতে। স্যার..যেভাবেই হোক সিরিয়াসলি দেখুন..এই বাচ্চা মেয়েটা কার কাছে থাকবে বলুন! পুলিশ ফাঁড়ির সাব ইনস্পেক্টর টিকারাম ওয়াগলের মাথায় প্রথম যেটা এল তা হল এই গ্রামগুলো থেকে একের পর এক মহিলা উধাও হচ্ছে কেন? কোথায় যাচ্ছে তারা?

আর পরদিন সকালে আবার ওয়াই টাউনে গিয়ে ডক্টর সন্তোষ পল ডেপুটি পুলিশ সুপারের অফিসে অভিযোগ দায়ের করে বললেন, ল্যান্ড রেকর্ড দপ্তরের প্রতাপ ফাড়নবিস একটা কাজ করে দেওয়ার জন্য এক লক্ষ টাকা ঘুষ চেয়েছেন। এর বিহিত করতে হবে। তা না হলে আমাদের সংগঠন কিন্তু আন্দোলনে নামবে। ততদিনে ডক্টর পল অ্যান্টি করাপশন ব্যুরো নামক একটি সামাজিক দুর্নীতি বিরোধী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন এবং তাঁকে চিনে গিয়েছে পুলিশ কর্তারা। কারণ একের পর এক আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে এসে পল লড়ে যাচ্ছেন উচ্চপদস্থ কর্তাদের বিরুদ্ধে। তিনি তখন একাধারে গ্রামে ডাক্তারি করেন, সমাজসেবী এবং দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের মুখ ওয়াই টাউনে। নার্সিংহোমের ডাক্তারবাবু। তাঁর নতুন এক ফ্যান হয়েছে। এক নার্স। জ্যোতি। ডাক্তারবাবুকে জ্যোতি ভালোবাসে। ঠিক যেমন সালমা শেখ ভালোবাসে। কিন্তু সে যে কোথায় গেল? হঠাৎ এক রাতে ভ্যানিশ! ডাক্তারবাবুর সাথেই তো বেরিয়েছিল। তারপর? অনাথ সালমা শেখের হয়ে বারংবার পুলিশের কাছে গিয়ে খোঁজ করার কেউ নেই। তাই। সে আর ফিরে এল না।

৬ মাস পর। সারাদিন এ গ্রাম সে গ্রাম ঘুরে বাচ্চাদের ট্যাবলেট, মিল্ক পাউডার আর প্রতিষেধক টিকা দেওয়ার কাজ সেরে বসন্ত নায়গোয়াডের চায়ের দোকানে এসে বসলেন মঙ্গলা জেরে অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী। এবং বসন্ত ভাইয়াকে বললেন, ভাইয়া আপনি লক্ষ করেছেন একটা ব্যাপার? এ পর্যন্ত সুরেখা থেকে জাহ্নবী যাঁরাই নিখোঁজ হয়েছে সবাই ডক্টর পলের পেশেন্ট? ধর্ম গ্রামের পুলিশ পাতিলের চোখ কুঁচকে গেল। তাই তো! কিন্তু ডক্টরকে তো পুলিশ থানায় ডেকে নিয়ে গিয়েছে এর আগেও। কিছুই ধরা পড়েনি। তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সুরেখার স্বামী পুলিশে এফআইআর করে বলেছেন, ডাক্তারের সঙ্গে বেরিয়েছিলেন সুরেখা। ডাক্তারকে জেরা করেছে পুলিশ। তিনি বলেছিলেন, আমি তো হাইওয়েতে ছেড়ে দিয়েছিলাম ওনাকে। তারপর তো আর কিছু জানা নেই। পুলিশ তাঁর কথামতো প্রত্যেক লোকেশনে গিয়ে দেখেছে ডাক্তার ঠিক বলছেন। সত্যিই তিনি সুরেখাকে নিয়ে আই সেন্টারে যান। সত্যিই হাসপাতালে যান। ফিরেছেনও সুরেখাকে নিয়ে। একটি রাস্তার পাশের ধাবায় খেয়েছেন দুজনে। তারাও সাক্ষী দিয়েছে। সুতরাং ঠিক হাইওয়েতে তিনি যেভাবে নিখোঁজ হয়েছেন সেটা স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না মঙ্গলাকে। জানতেই হবে কী ব্যাপার? কোথায় গিয়েছিলেন জাহ্নবী টাউন থেকে ফিরে? কই মুদিখানায় তো তাঁকে কেউ দেখেনি? তবে? সোমবার। সেদিন সকাল থেকে প্রবল বৃষ্টি। আজ গ্রামের চেম্বারে আসবেন ডক্টর পল। রোগীরা বসে আছেন। এবং এসে বসে আছেন আর একজন। মঙ্গলা। তিনি ডাক্তারের অপেক্ষা করছেন। কেন? আজ একটা দীর্ঘদিনের সন্দেহ দূর করা দরকার। আধঘন্টা পর ডক্টর পল এসে নামলেন চেম্বারে। ঢুকছেন। এবং মঙ্গলাকে তিনি চেনেন। মেয়েটা অনেক সমাজসেবার কাজ করে। অঙ্গনওয়াড়ির কর্মী। ওকে তো ওয়াই টাউনেও দেখেছেন। কী ব্যাপার? কেমন আছো?

মঙ্গলা হেসে মাথা নাড়ল।

ডক্টর পল বললেন, এসো ভিতরে।

মঙ্গলা চেম্বারে ঢুকে চেয়ারে বসে বললেন, ডাক্তারসাব একটা কথা বলার ছিল। আপনার রেজিস্ট্রেশন নম্বরটা দেবেন? আমাদের অফিসে একটা ক্লিনিক খুলতে চাই। সবরকম ডাক্তার থাকবে। কিন্তু পারমিশনের জন্য নাকি ডাক্তারদের রেজিস্ট্রেশন নম্বর চাই। হাসলেন ডক্টর পল। বললেন, আরে আমাকে তো সবাই চেনে। আমার জন্য রেজিস্ট্রেশন নম্বর দরকার কী?

মঙ্গলা স্থির চোখে তাকিয়ে। আপনার রেজিস্ট্রেশন নম্বর মনে নেই ডাক্তারসাব? ডক্টর পল থমকে গেলেন। মেয়েটির কণ্ঠে যেন সন্দেহের গন্ধ? কী ব্যাপার? তিনি বললেন, তোমাদের ক্লিনিকে কবে কবে বসতে হবে আমাকে? মঙ্গলা শীতল কণ্ঠে বললেন, দুদিন। শনি আর রবি। ওয়ার্কাররা তো এই দুদিন টাইম পাবে।

এবার মুখের হাসি চওড়া হল ডক্টরের। বললেন, ও হো! তাহলে তো হবে না। ওই দুদিন তো আমার চেম্বার অন্য জায়গায়।

মঙ্গলাও মুখে হাসি টেনে এনে বললেন, আপনি ভুলে যাচ্ছেন বোধহয়। শনিবার আপনার সকালে চেম্বার ওয়াইতে। আর রবিবার বিকেলে এখানে। আমাদের ওখানে তো শনিবার রাতে আর রবিবার বিকেলে। তাই কোনো অসুবিধা নেই।

এবার ডক্টর পলের চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠছে। তিনি বলছেন, দেখি যদি সম্ভব হয়। স্যার তাহলে কবে ফোন করব আপনার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের জন্য?

ডক্টর পল কয়েকটি মুহূর্ত তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, আজ সোমবার। তুমি আমাকে বৃহস্পতিবার ফোন করো। এখানেই তো আসব।

মঙ্গলা মাথা নেড়ে চলে গেলেন।

বৃহস্পতিবার ধম গ্রামের বাইরে একটি অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে ছিল। হাইওয়েতে। চারজন যাত্রী অপেক্ষা করছে বাসস্টপে। একজন মঙ্গলা। একটি মেয়ে এগিয়ে গেল তাঁর দিকে। মেয়েটিকে চেনেন মঙ্গলা। নাম জ্যোতি। কিছু একটা কথা হচ্ছে। হাসছেন দুজনেই। বাস এসে গিয়েছে। মঙ্গলা সেই বাসে উঠতে যাবেন। তবে জ্যোতি হাত বাড়িয়ে তাঁকে কিছু বলার পর তিনি গেলেন না। বাসটি চলে গেল। জ্যোতি বলেছে, আমি আবার নার্সিং হোমেই ফিরব। আমার সঙ্গে চলো। এখানে একটা ব্লাড ক্যাম্প ছিল। তাই আসা হয়েছিল। চলো গল্প করতে করতে যাওয়া যাবে। মঙ্গলা ফিরবে ওয়াই টাউনে। সকালেই কথা হয়েছে ডক্টর পলের সঙ্গে। তিনি ফোন ধরেননি। এখন আর একবার করা দরকার। করবেন করবেন ভাবছিলেন। সেই সময় এই জ্যোতি। এই মেয়েটি যেখানে নার্সের কাজ করে সেখানেই তো ডক্টর পল আছেন। অ্যাম্বুলেন্সে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মঙ্গলা পাথর হয়ে গেলেন। কারণ চালকের আসনে ডক্টর পল। জ্যোতি ধড়াম করে দরজা বন্ধ করলেন। মঙ্গলা একটু ভয় পাচ্ছেন। কেন তা তিনি জানেন না। ডক্টর পল পিছনে মুখ ফিরিয়ে বললেন, কী কেমন সারপ্রাইজ দিলাম। চলো তোমাকে আমার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের ফোটোকপিটা দেব। মঙ্গলা ধাতস্থ হয়ে বলল, না না স্যার..আমার ফোটোকপি চাই না। শুধু নম্বরটা হলেই তো হবে।

ডক্টর পল শুনে হাসছেন। আরে তবু নিজের চোখে দেখে নেওয়া ভালো। আমাকে তো সন্দেহও হতে পারে! তাই না? শ্যেন দৃষ্টি নিবদ্ধ মঙ্গলার মুখে। মঙ্গলার মনে গভীর শঙ্কা। তাহলে কি লোকটা ধরে ফেলছে যে তাঁকে সন্দেহ করা হচ্ছে? লোকটার এই সামাজিক চেহারাটা মুখ নাকি মুখোশ সেটা মঙ্গলা যে আসলে জানতে চাইছে, তা কি আন্দাজ করছে ডাক্তার? তাহলে এরপর কী হবে? মঙ্গলার বুক কাঁপছে। কিন্তু মুখ স্বাভাবিক। অ্যাম্বুলেন্স ঘুরপথে যাচ্ছে ধম গ্রামে।

এটা জঙ্গলের পথ। সোজা রাস্তা নয়। উঁচুনীচু। সমতল দেখে একটা জায়গায় আচমকা দাঁড়িয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্স। চারদিক ফাঁকা। জ্যোতি চুপ করে তাকিয়ে আছে। ডক্টর পল দরজা খুলে নেমে এসে পিছনে উঠলেন। মঙ্গলা এবার আন্দাজ করছেন কিছু। তিনি চিৎকার করে উঠলেন। কিন্তু কে শুনবে। জনমানবহীন জঙ্গল। একটা ইনজেকশন দেওয়া হল মুখ চেপে ধরে। একটু পর নিস্তেজ হয়ে গেল মঙ্গলা। ঘুমিয়ে পড়েছে। জ্যোতিকে জড়িয়ে ধরে একটা চুম্বন করলেন ডক্টর পল। গ্রেট জব ডিয়ার..। এই মেয়েটা আমাকে জেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করছিল বুঝলে। আমার সংগঠনের কাজকর্ম এদের সংগঠনের লোকজন দুচক্ষে দেখতে পারে না। তাই হিংসায় সরিয়ে দিতে প্ল্যান করেছে। জ্যোতি জানে। গতকালই তাঁকে এসব কথা ডক্টর সাব বলেছেন। ডক্টর সাবকে কেউ ক্ষতি করার চেষ্টা করলে জ্যোতি ছেড়ে দেবে না। দরকার হলে খুন করবে। তাই করেছে। এরপর সেই অ্যাম্বুলেন্স যথারীতি সেই ফার্ম হাউসে এসেছিল। এবং আগে থেকেই খোঁড়া ছিল গর্ত। মঙ্গলার স্থান হল বাকিদের আশেপাশেই। তাঁর কবরে বসানো হল গোলাপ গাছ। কালই কেনা হয়েছে। মঙ্গলার মোবাইল ফোনটা ডক্টর পল দিয়ে দিলেন জ্যোতিকে। বললেন, আগামী দুদিন তুমি এটা ব্যবহার করো। কিছু দোকান, অফিসে ফোন করবে মাঝেমধ্যে। আর সকালে চলে যাও নাসিক। আমি ব্যবস্থা করে দিচ্ছি। কেন? কারণ আছে। বললেন ডক্টর।

কারণটা আর কিছুই নয়। পরদিন দুটি মিসিং ডায়েরি দায়ের করা হল। একটি অ্যাম্বুলেন্স এবং আর একটি মঙ্গলার। মঙ্গলার পরিবার থানায় মেয়ের উধাও হওয়ার খবর জানিয়ে ডায়েরি করেছে। আবার অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছে না বলে এফআইআর হয়েছে একটি। সেই যে নার্সিং হোমে ডক্টর পল কাজ করেন সেই নার্সিং হোমের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। পুলিশ মঙ্গলার মোবাইল ফোন ট্র্যাক করে দেখছে সেটি তো যথারীতি কাজ করছে। এমনকী বেশ কয়েকটি কলও করা হয়েছে। দেখা গেল মঙ্গলা নাসিকে কোথাও ঘুরছে। কারণ মোবাইলের সিগন্যাল তেমনই দেখাচ্ছে। তার মানে তো নিখোঁজ নয়। কিন্তু কেন নাসিকে যাবে সে? পরিবার মানতে নারাজ? ফোন করা হলে কেন ফোন ধরছে না? অথচ ওই মোবাইল থেকেই ফোন করা হচ্ছে অন্যত্র। এরকম অদ্ভুত আচরণ কেন করবে কেউ? ঠিক তিনদিন পর ওয়াই থানার পুলিশের কাছে এল পুলিশ পাতিল। বসন্ত। সেই ধর্ম গ্রামের চায়ের দোকান। আসলে পুলিশের চর। পুলিশকে জানালেন, সব কথা। বললেন, মঙ্গলা কয়েকদিন আগে তাঁকে বলেছেন ডক্টর পলের ব্যাপারে। সে নিজে এসব ব্যাপারে খোঁজ করতে শুরু করেছিল। সেই কারণে কিছু হয়নি তো?

এদিকে ঠিক সেই মুহূর্তে নাসিকে থাকা জ্যোতির হাতের মোবাইলে একটি মেসেজ এল। ডক্টর পল। জানাচ্ছেন বেশিদিন বাইরে থাকা যাবে না। এবার ওয়াই টাউনে ফিরে যাও। আমিও ফিরছি। কারও সন্দেহ হবে না। কিন্তু সে গিয়ে কী বলবে সবাইকে? সে কোথায় গিয়েছিল? এটা তো জানা হল না। তাই ডক্টর পলকে জ্যোতি ফোন করে বসল। মারাত্মক ভুল! কারণ ফোনটা টেনশনে সে করেছে মঙ্গলার ফোন থেকে। ফোনটা ধরলেন ডক্টর পল। এবং প্রথমেই জানতে চাইলেন এটা থেকে কেন করেছ? অত মনে নেই স্যার..ইউ ইডিয়ট…চিৎকার করে উঠলেন ডক্টর পল। তিনি তখন ধম গ্রামে। একটু পরই বেরোলেন। মুম্বইয়ে যেতে হবে। পুলিশ কিন্তু গোটাটাই সক্রিয়। মঙ্গলার মোবাইল নেটওয়ার্ক ফলো করে দেখা গেল সেটি চলে এসেছে ওয়াই টাউনে। জ্যোতি তখনও মঙ্গলার ফোনটি সুইচ অফ করেনি। ভুলে গিয়েছে। তাই সে ধরা পড়ে গেল। এবং এক সাইকিক ডাক্তারকে ভালোবেসে ফাঁদে পড়া মেয়েটি স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের জেরায় ভয়ে সব বলে দিল। ডক্টর পল তখন মুম্বইয়ের দাদরে। একটা প্লট কেনার কথা আছে বোরিভিলিতে। সেই বিষয়ে কথা বলতে। একটা ফোন এল। জ্যোতির। ডক্টর পল বললেন, হ্যাঁ বলো..।

জ্যোতি বলছে, স্যার, এখানে সকলে জানতে চাইছে আপনি কবে ফিরবেন? নার্সিংহোম জানে আপনি কোথায়?

ডক্টর পল বললেন, তুমি কোথায়?

জ্যোতি বললেন, আমি তো নার্সিংহোমেই স্যার.. মর্নিং ডিউটি শেষ হয়েছে। বাসায় যাব। কোনো চিন্তা নেই। কেউ সন্দেহ করেনি।

শ্বাস ফেললেন ডক্টর। যাক! বললেন, আমি আসছি আজ রাতেই। কাল দেখা হবে নার্সিং হোমে। আর ওই মোবাইল অফ রেখেছ তো?

কাঁপা গলায় জ্যোতি বললেন, হ্যাঁ…।

কাঁপা গলায়। কারণ তাঁর পাশে তখন দাঁড়িয়ে সন্দীপ পাতিল। পুলিশ সুপার। ফোনটা কেড়ে নিয়ে তিনি বললেন, লেট হিম কাম। এবং পরদিন ধরা পড়ে গেলেন ডক্টর পল। কেন খুন করলেন সুরেখাকে? গয়নার জন্য? ডক্টর পল ঘৃণায় মাথা নাড়ছেন। গয়না? ওসব আপনাদের দরকার হয়! তাহলে? জেরা চলছে। পুলিশ সুপার জানতে চান তাহলে আর কী কারণ? ডক্টর পল বলছেন, আমার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল কেন? যাঁর স্বামী বাইরে থাকে, সেই লোকটা কত কষ্ট করছে পরিবার থেকে দূরে। তাঁকে এভাবে চিট করবে কেন? মানে? হতবাক পুলিশ সুপার। মানে হল সুরেখা আমাকে প্রেম নিবেদন করেছেন তা জানেন? এই সামান্য কারণে? পুলিশ সুপার বিস্মিত! ডক্টর পল হাসলেন, এটা সামান্য কারণ? সমাজকে এভাবেই আপনারা নষ্ট করছেন।

বনিতাকে কেন খুন করলেন?

ডক্টর পল একটু চুপ। তারপর উদাসীন কণ্ঠে বলছেন, যে মহিলা একা থাকেন। স্বামী নেই। তাঁর এইডস হয় কেন? জানেন না? এসব বন্ধ করতে পারবেন? বাঁচাতে পারছেন এই চরিত্রহীনতাকে? ডক্টর পলকে তারপর নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাঁর কুখ্যাত ফার্ম হাউসে। তাঁর দেখানো স্থানগুলিকে গোলাপ ফুল বা গাঁদা গাছ অথবা দেবদারুর নীচে থেকে আবিষ্কার করা হয়েছে একের পর এক ডেডবডি। কঙ্কাল। সেগুলি তো খুনের প্রমাণ। কিন্তু তার থেকে ভয়ংকর দৃশ্য কী ছিল? একটি নতুন গর্ত খোঁড়া রয়েছে। অব্যবহৃত। তার মানে আরও একটি খুনের প্ল্যান ছিল? এবার কে ছিল টার্গেট? চমকে গেলেন গোয়েন্দারা। পরবর্তী টার্গেট ছিল একটি মেয়ে। ডক্টরকে গভীরভাবে ভালোবেসে খুনে সাহায্য করেছে সেই মেয়ে…জ্যোতি..! সন্তোষ পল। এক সাইকিক খুনি। যার নাম ডক্টর ডেথ!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *