ব্ল্যাক করিডর ১.৬

বরফ পড়ছে শ্রীনগরে। অবিশ্রান্ত। এই ডিসেম্বরের শুরুতেই এতটা বরফ সব বছরে পড়ে না। বিকেল পৌনে চারটে বাজে। পপলার গাছগুলো সাদা। গুঁড়ো গুঁড়ো তুষারের আস্তরণে। ডাল লেক খুব ভোরের দিকে জমে যায়। তাই শিকারাগুলো এখন বিশ্রাম নিচ্ছে হাউসবোটের সামনে। একটাই সমস্যা। তুষার পড়ার সময় মিনিবাসগুলো কমে যায় রাস্তায়। পাওয়া যায় না অটোও। যাতায়াত করা এক যন্ত্রণা। লাল ডের মেমোরিয়াল উওম্যানস হাসপাতালের গেট থেকে ২৩ বছরের এক যুবতী বেরিয়ে এলেন। এই হাসপাতালের ইন্টার্ন। ডাক্তারি পড়ার শেষ কয়েকটি ধাপ চলছে। শনিবার বেশি ক্লাস থাকে না। আর ওয়ার্ডেও ডিউটি ছিল মর্নিং থেকে। তাই কাজের চাপ নেই। বাড়ি ফেরাই যায়। মেয়েটি পরিবারের মধ্যে সবথেকে চুপচাপ। তাঁর বাড়িতে রাজনীতির চর্চা। সে আর ছোট ভাই নিক্কি শুধু আলাদা রকম। ইচ্ছে করলেই পারিবারিক গাড়িতে যাতায়াত করতে পারে মেয়েটি হাসপাতালে। কিন্তু সামান্য দূরত্ব সে চায় না আবার গাড়ি নিয়ে আসা যাওয়া করে বন্ধুদের থেকে দূরত্ব বাড়াতে। ফিরনির ক্যাপটা আরও বেশি করে টেনে নিলেন যুবতী। তুষারপাতটা যেন বরফ ঝড়ে পরিণত হচ্ছে। উফফ..কী অসম্ভব ঠান্ডা। লালচকের দিক থেকে একটি ট্রানজিট ভ্যান আসছে। JKF ৬৭৭। অল্প লোক ধরে। যদিও এই সময় কে আর বেরোবে? তাই যাত্রী বেশি নেই। মেয়েটি হাত দেখানোয় ট্রানজিট ভ্যান দাঁড়িয়ে গেল। নওগাঁও? হাঁ..আ যাইয়ে ম্যাডাম..। ভ্যান স্টার্ট নিচ্ছে। আচমকা পিছন থেকে আবছা কুয়াশার মতো বরফ পাতের আড়াল থেকে আপাদমস্তক ঢাকা তিনজন লোক ছুটে ভ্যানে উঠে পড়ল। একটু হলেই ভ্যান মিস হয়ে যেত তাদের। হাঁফাতে হাঁফাতে স্বস্তির হাসি ফুটল। একেবারে সামনের দুটি সিট ফাঁকা। সেখানে বসে তারা জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল। ভ্যান চলছে। বাইরে চলছে তুষারপাত। বন্ধ জানালার উপর আছড়ে পড়ছে সাদা সাদা তুষারের গুঁড়ো। রাস্তায় বরফ। গাছে বরফ। ছাদে বরফ। মেয়েটি ভাবছে আগামী তিনমাস ধরে এই অবিরাম স্নো ফল চলবে। স্বাভাবিক জীবন বন্ধ। ভোরে হাসপাতালে যাওয়া সবথেকে কঠিন আর কষ্টকর। ডাক্তারির কোর্সটা শেষ হলে দিল্লি গিয়ে এম ডি করার ইচ্ছা। আর মাত্র হাফ কিলোমিটার। তারপর বাড়ি গাড়ি জোরে চলতে পারছে না এই বরফে। আরও স্লো হয়ে গেল। কারণ সামনের লোক দুটো উঠে দাঁড়িয়েছে। তারা নামবে এই স্টপেজে। কিন্তু কই নামছে না তো? বরং এগিয়ে আসছে ভ্যানের পিছনের দিকে। যুবতীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে ফিরনি থেকে হাত বের করে আনল তারা। দুজনের হাতে পিস্তল। অন্যজন দরজায়। একজন পিস্তল মেয়েটির মাথায় ঠেকিয়ে বলল ওঠো। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। কোথায়? সেসব পরে জানবে..। ঠিক কপালের পাশে পিস্তলের নলটি ঠেকানো হল। থরথর করে কাঁপছে মেয়েটি। ভ্যানের বাকি পাঁচ যাত্রীর একই দশা। চালকের কাছে গেল এক যুবক। কানের কাছে পিস্তলটা ঠেকিয়ে বলা হল দাঁড়াও এখানে। কেউ চালাকি কোরো না..। আর মেয়েটির দিকে ফিরে তারা চিৎকার করে বলল, ওঠো! কেঁদে ফেলছে মেয়েটি। ভ্যান দাঁড়াল মেয়েটির বাড়ি নওগাঁও থেকে মাত্র ৪০০ মিটার দূরে। ভ্যান দাঁড়াতেই তিন যুবক লাফ দিয়ে নেমে পড়ল। বাগালিকালীপুরা এলাকা। বরফ না পড়লে এতক্ষণে এই অঞ্চল বেশ ভিড় থাকারই কথা। এই চাপোর রোড ধরে সোজা পহেলগাঁও যাওয়া যায় অন্য রুটে। নির্জন ফাঁকা রাস্তায় অবিশ্রান্ত তুষারপাতে এরপর কী? কোথায় যাওয়া হচ্ছে? কেঁদে চলেছে মেয়েটি। কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা। ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে হাজির হল একটি নীল মারুতি। এক ঝটকায় দরজা খুলে গেল। তরুণীকে ধাক্কা মেরে ভিতরে ঠেলে দিয়ে তিন যুবক ঢুকে পড়ল। ওই অবিরাম তুষারপাতে এবার কিন্তু ঝড়ের গতি নিল নীল মারুতি ভ্যান। ঠিক দেড়ঘণ্টা পর ‘কাশ্মীর টাইমস’ পত্রিকা দপ্তরে একটি ফোন এল। ‘জেকেএলএফ (জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্ট) থেকে বলছি। আমাদের হাতে মুফতি সাহেবের ডাক্তার মেয়ে। তিনজনকে মুক্তি দিতে হবে। নইলে…।’ ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। শ্রীনগরের রাস্তা থেকে বিকেলে কিডন্যাপ হয়ে গেলেন রুবাইয়া সঈদ। মাত্র পাঁচদিন আগে ৫ ডিসেম্বর যাঁর বাবা মুফতি মহম্মদ সঈদ দেশের নব গঠিত কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছেন। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মেয়েকেই তাঁর বাড়ির কাছ থেকে অপহরণ করে নেওয়া হয়েছে। এর থেকে বড় ধাক্কা ভারতের সন্ত্রাস ইতিহাসে আসেনি। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেসকে বোফর্স দুর্নীতিতে বিদ্ধ করে বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং-এর নেতৃত্বে তৃতীয় ফ্রন্ট সবেমাত্র জয়ী হয়েছে। বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং-এর সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন কাশ্মীরের নেতা মুফতি মহম্মদ সঈদ। মাত্র পাঁচদিন আগে কার্যভার নিয়েছেন। কিছুই জানেন না। তাই ৮ ডিসেম্বর বিকেলে ছিল নর্থ ব্লকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের অফিসে ব্রিফিং। সেদিন ছিল কাশ্মীর নিয়ে ব্রিফিং। অফিসারদের মুফতি মহম্মদ সঈদ তিনটে নাগাদ বলছিলেন, আমি যতটুকু জানি বলি আপনাদের। আপনারা ওভার অল হয়তো বেশি জানেন। বাট আমি কাশ্মীরের মানুষ। তাই একটু নিজের জানকারি বলছি। সবথেকে অ্যাক্টিভ গ্রুপ জেকেএলএফ। ১৯৭৭ সালে পাকিস্তানের আমানুল্লা খান আর মকবুল ভাট দুজনে মিলে এই গ্রুপ তৈরি করে কাশ্মীরের আজাদির জন্য। পিছনে পাকিস্তানের জিয়া উল হকের প্ল্যান K-২। কে টু মানে? কে টু মানে হল কাশ্মীর অ্যান্ড খলিস্তান। ভারত থেকে এই দুটিকে আলাদা করতে হবে। মকবুল ভাটের ১৯৮৪ সালে ফাঁসি হয়ে যায়। তারপর সংগঠনের ভার চলে গেল চারজনের হাতে। যার কোড নেম HAJY। তার মানে কী? চারজনের নামের আদ্যাক্ষর। হামিদ শেখ, আসফাক মজিদ ওয়ানি, জাভেদ মির এবং ইয়াসিন মালিক। অফিসাররা ভাবছেন নতুন মন্ত্রী তো কাশ্মীর নিয়ে বেশ অনেকটা জানেন। ভালোই হল। যত দিন যাচ্ছে ততই কাশ্মীরের সংকট নতুন দিকে টার্ন নিচ্ছে। আইবির ‘কে’ ডেস্ক (কাশ্মীর ডেস্ক) জানাচ্ছে আজাদির নামে এবার ভায়োলেন্স শুরু হতে পারে। দিল্লির নর্থ ব্লকে যখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেই কাশ্মীরের সন্ত্রাস নিয়ে রিপোর্ট তৈরি করছেন, ঠিক তখন ওই মুহূর্তে তাঁর নিজের মেজ মেয়ে রুবাইয়া সঈদকেই যে সন্ত্রাসবাদীরা অপহরণ করে সোপোরের দিকে অজানা কোনো হাইড আউটে চলে গিয়েছে, তা তিনি জানতেই পারলেন না। অথচ কী আশ্চর্য। কাল রাতেই তিনি বাড়িতে ফোন করে ছোট ছেলে নিক্কিকে বলেছিলেন, বাড়ি থেকে যেন না বেরোয় সে। কারণ রিপোর্ট আছে গন্ডগোল হতে পারে। ১৪ বছরের কিশোর নিক্কি বাড়ি থেকে বেরোয়নি। কিন্তু রুবাইয়া প্রত্যেক একদিন অন্তর হাসপাতালে যায়। তাকে বারণ করা হয়নি কেন? কারণ কাশ্মীরে মেয়েদের সম্মান অনেক উচ্চস্থানে। টেররিস্ট কারা? কাশ্মীরের লোকাল ছেলেরাই তো! তাই তারাও এই অন্যায় করবে না। মেয়েদের গায়ে হাত দেবে না। মেহবুবা আর রুবাইয়াকে নিয়ে ভয় নেই। বিকেল সাড়ে পাঁচটা। ‘কাশ্মীর টাইমস’ পত্রিকা দপ্তরে ফোন এল। জেলে বন্দি থাকা কয়েকজনকে মুক্তি দিতে হবে। জে কে এল এফ এরিয়া কমান্ডার শেখ আবদুল হামিদ, মকবুল ভাটের ভাই গুলাম নবি ভাট, আর মুসতাক আহমেদ জারগর। তিনজনই জে কে এল এফের সুপ্রিমো। ‘কাশ্মীর টাইমসের’ সম্পাদক মহম্মদ সোফি ভাবলেন এবার কী করা উচিত? আগে কি লোকাল পুলিশকে জানানো দরকার? নাকি সোজা মুফতি সাহেবকে? তিনি অনেক ভেবে দুটি কাজই করলেন। দিল্লিতে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানালেন এই দুঃসংবাদ। আর একই সঙ্গে জম্মু কাশ্মীর সরকারকেও। আধঘণ্টার মধ্যে ভারত জেনে গেল এই ভয়াবহ দুঃসাহসিক ঘটনা। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কন্যাকে কিডন্যাপিং। আর ভি পি সিং সরকারের কাছে যা প্রবল অস্বস্তি। মাত্র এক সপ্তাহের সরকারের এই হাল? এবার কী করা হবে? জম্মু কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ফারুখ আবদুল্লা। মুফতি মহম্মদ সঈদের চরম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। আর সবথেকে মারাত্মক কথা হল ফারুখ সাহেব ঠিক এই সময়টাই কাশ্মীরে নেই। তিনি লন্ডনে। যেটা এই আবদুল্লা পরিবারের দ্বিতীয় বাসস্থান বলা যায়। আর ফারুখ সাহেব নেই মানে সরকারই নেই। কারণ ফারুখ আবদুল্লার মন্ত্রিসভায় কোনো দ্বিতীয় নেতা নেই। তিনিই এক থেকে ১০ নম্বর। এমনকী ফারুখ সাহেব কাশ্মীরে না থাকলে একটিও মন্ত্রিসভার বৈঠক হয় না। একটিও সরকারি সিদ্ধান্ত বিজ্ঞপ্তি সার্কুলার প্রকাশ হয় না।

কিন্তু প্রথম প্রশ্ন হঠাৎ করে রুবাইয়া সঈদ কেন? কেন তাঁকেই কিডন্যাপ করা হল? সত্যিই আদতে সে আসল টার্গেট ছিলই না। জেকেএলএফ বহুদিন ধরেই চাইছে এমন একটি কাজ করতে, যা আন্তর্জাতিকভাবে কাশ্মীর ইস্যুকে সামনে নিয়ে আসবে। তাই প্রথম প্ল্যান হল মুখ্যমন্ত্রী ফারুখ আবদুল্লার বড় মেয়ে সাফিয়া আবদুল্লাকে কিডন্যাপ করা। সেইমতো সব পরিকল্পনা করে দেখা গেল সাফিয়া প্রথমত ঘর থেকে প্রায় বেরোয় না। আর দ্বিতীয়ত মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবন গুপকর রোডের গোটা সিকিউরিটি এমনই কড়া তুষারপাতের মরশুমে একবার চেজিং করা হলে গাড়ি স্কিড করে দুর্ঘটনা হবে। সবাই ধরা পড়ে যাবে। অতএব মুখ্যমন্ত্রীর কন্যাকে কিডন্যাপিং-এর প্ল্যান ক্যান্সেল। তাহলে? রজৌরির এক গোপন আস্তানায় বসে ইয়াসিন মালিক প্রস্তাব দিল সিনিয়র সুপারিন্টেন্ডেন্ট অফ পুলিশ আল্লা বকশের মেয়েকে অপহরণ করা হবে। ঠিক আছে। তাহলে এটাই ফাইনাল। আল্লা বকশ প্রচণ্ড কড়া ধাতের পুলিশ অফিসার। ডান্ডা ছাড়া কিছু বোঝেন না। ইলেকশনের সময় জেকেএলএফের একের পর এক ক্যাডারকে জেলে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ মুখ্যমন্ত্রী ফারুখ আবদুল্লার প্রিয়পাত্র। সুতরাং রাইট চয়েস। কিন্তু সব হিসাবে গোলমাল হয়ে গেল ৩ ডিসেম্বর। ঘোষণা করা হল কেন্দ্রে নতুন সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হবেন কাশ্মীরের নেতা মুফতি মহম্মদ সঈদ। ব্যস! আবার প্ল্যান বদল। কারণ এটাই সহজতম এবং সবথেকে জোরাল টার্গেট। খোদ দেশের হোম মিনিস্টারের মেয়েকেই কিডন্যাপ। ঠিক তাই হল। খবর ছড়াতেই মুফতির দিল্লির বাসভবনে সন্ধ্যা থেকে ভিআইপির ঢল। বাইরে আছড়ে পড়ছে মিডিয়া। প্রথমেই এলেন প্রধানমন্ত্রী ভি পি সিং। তারপর আই কে গুজরাল, আরিফ মহম্মদ খান। সেখানে বসেই ঠিক হল আরিফ মহম্মদ খান আর ইন্দ্রকুমার গুজরাল যাবেন শ্রীনগরে। নেগোসিয়েশনের জন্য। কিন্তু সন্ত্রাসবাদী অপহরণকারীদের সঙ্গে দর কষাকষি কারা করবে? শ্রীনগরের ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ হেড এ এস ধূলত। আর চিফ সেক্রেটারি মুসা রেজাকে বাছাই করা হল ব্যাকআপ হিসাবে। সামনে থাকবে দুই সাংবাদিক। যাঁদের জেকেএলএফ আর মুফতি সাহেব দুজনের সঙ্গেই যোগাযোগ ভালো। কারা তাঁরা? ‘কাশ্মীর টাইমসের’ জাহির মেহরাজ আর ফ্রি লান্স মহম্মদ সঈদ মালিক। কথাবার্তা, আলোচনা শুরু হওয়া দরকার যত দ্রুত সম্ভব। কারণ রুবাইয়া কী অবস্থায় আছে তা অজানা। জাফর মেহরাজ একটা ক্রু বের করলেন। প্রথম অ্যাপয়েন্টমেন্ট আসফাক মজিদ ওয়ানির বাবার সঙ্গে। আসফাক কিডন্যাপিং এর মাস্টারমাইন্ড। তাঁর ইনফরমেশনের পাইপলাইন বাবা। বাবাকে জানানো হোক ইন্ডিয়া কী চায়! আই বি চিফ ধূলত, সাংবাদিক জাহির আর চিফ সেক্রেটারি মুসা রাত সাড়ে ১০টায় শ্রীনগরের বাইরে এক জঙ্গলে ঘেরা সরকারি আবাসনের দ্বিতীয় তলের বি ফোর টু থ্রি ফ্ল্যাটে ডোরবেল বাজালেন। দরজায় এক সত্তর বছরের বৃদ্ধ। আপনারা কী চান? ধূলত বললেন, আপনার ছেলে কী চায়? আগে সেটা বলুন!

ওরা সাধারণ নিরীহ ছেলে। হামিদ শেখ অসুস্থ। ওদের নেতা। হাসপাতালে শুনছি চিকিৎসা চলছে জেলে। তাকে ছেড়ে দিন আপনারা।

কোথায় ছাড়া হবে? লালচকে?

বৃদ্ধ (একটু ভেবে।) আপনারা একটা কাজ করতে পারেন না? ইরানিদের হাতে তুলে দিন ওকে।

ইরানিদের হাতে? মানে? এখানে আবার ইরানি কোথায়?

আসফাকের বাবা জানাল, ইরানি এমব্যাসিতে!

ইরানি এমব্যাসি একজন টেররিস্টকে নেবে কেন? এসব কী বলছেন পাগলের মতো কথা?

আচ্ছা তাহলে বরং বর্ডারে ছেড়ে দিন। শেখ সোজা পাকিস্তানের কাশ্মীরে ঢুকে যাবে! রাজি?

ধূলত : আচ্ছা সেটা করা যেতে পারে। আমরা আলোচনা করে জানাচ্ছি। তবে ওই একজনকেই। আর কাউকে নয়।

বৃদ্ধ : স্যার..আমি বলছি মেয়েটির ক্ষতি হবে না। সে ওদের বোন। সেইমতোই ওরা তাকে দেখভাল করছে।

সেখান থেকে অনেক দূরের রজৌরির কাছে এক গ্রামে কাঠের বাড়ির দোতলায় ততক্ষণে চারজন জেকেএলএফ টেররিস্টের নার্ভ ফেল করছে। কারণ রুবাইয়া সঈদ কিছুই খাচ্ছে না। জলও না। আসফাক গেল উপরে। হাত বাঁধা রুবাইয়ার। পা বাঁধা। একটা চেয়ারে বসানো। সামনে টেবিল। সেটা উলটে পড়া। একটু আগেই লাথি মেরে ফেলে দিয়েছে রুবাইয়া।

আসফাক : সিস্টার আপনি এমন কেন করছেন? খাচ্ছেন না কেন?

রুবাইয়া : আমি না খেয়ে মরে গেলে তোমাদের এই চারজন নয়, গোটা অর্গানাইজেশন ধ্বংস হয়ে যাবে। গোটা কাশ্মীর মেনে নেবে না যে একটা মেয়েকে কিডন্যাপ করে অত্যাচার করে তোমরা খুন করেছ। মনে রেখো তোমাদের কী হাল হয়।

আসফাক : অত্যাচার! আমরা তোমাকে টাচ করেছি? আল্লার নামে শপথ করো। রুবাইয়া : নিজেদের গ্রুপ আর মুভমেন্ট বজায় রাখতে চাইলে ছেড়ে দাও। নাহলে কাশ্মীরের মানুষই তোমাদের জ্যান্ত মেরে ফেলবে।

আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না আসফাক। চিৎকার করে বলল, চুপ রহো বত্তমিজ লড়কি! এক সেকেন্ডমে গোলি চল যায়েগা।

রুবাইয়া ঠান্ডা চোখে আসফাককে বলল, হিম্মৎ হ্যায়! চালাও গোলি ডরপোক! একা এক মেয়েকে যারা কিডন্যাপ করে নিজেদের দলের স্বার্থে, তারা আবার সাহসী নাকি? কাশ্মীরিয়ৎ-এর লজ্জা তোমরা! কাঁপতে কাঁপতে আসফাক নীচে চলে এল। এবং টেনশন বেড়ে যাচ্ছে। সত্যি যদি কিছু না খায় আর কিছু একটা হয়ে যায়? গোটা ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে আজাদি মুভমেন্টের।

ঠিক এসবের আড়ালে রাজধানী দিল্লিতে শুরু হয়ে গিয়েছিল সম্পূর্ণ অন্য এক খেলা। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফারুখ আবদুল্লার সরকারকে ফেলে দিলে কেমন হয়? সরকার নাগরিকদের সিকিউরিটি দিতে ব্যর্থ। তাই অপদার্থ ফারুখ সরকারের আর দরকার নেই। এই গোপন মিশনের কথা অবশ্য ঘুণাক্ষরেও কেউ জানতে পারল না। তৈরি হল ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ মন্ত্রিসভার মধ্যে। অরুণ নেহরু, আরিফ মহম্মদ খান আর ইন্দ্রকুমার গুজরাল। আর কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী যেহেতু দেশের বাইরে, তাই রাজ্যের মুখ্যসচিব মুসাকে বলা হল আপনি প্রতিটি আপডেট ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে ব্রিফ করবেন নিয়ম করে। অর্থাৎ নেগোসিয়েশন কেমন হচ্ছে। এই সবই চলছে কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীর অজান্তে। জানা গেল একজনই ব্যক্তি আছে যাকে জেকেএলএফ মান্য করে। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার। ডাঃ আবদুল গুরু। ঘটনাচক্রে তিনিই হামিদ শেখের চিকিসার দায়িত্বে। ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চের চিফ এ এস ধূলত চান্স নিলেন একটা। সকাল আটটায় তিনি চেম্বার করেন বারজালায় নিজের বাড়ি কাম ক্লিনিকে। প্রবল ঠান্ডা আর তুষারপাতে পৌঁছে গেলেন ধূলত। অসংখ্য ভিড় বাইরে। ধূলত একটা চিরকুট পাঠালেন ভিতরে। বেরিয়ে এলেন ডাঃ গুরু। কী চাই?

ধূলত : আপনি তো সবই জানেন। আপনাকে হামিদ শেখ মান্য করে। জেকেএলএফের ছেলেরাও সম্মান করে। আপনিই আমাদের সাহায্য করুন।

ডাঃ গুরু বললেন, হামিদ শেখ আমার কাছে স্রেফ এক রোগী। আর কোনো রিলেশন নেই। আর রুবাইয়া সঈদের ব্যাপার তো পুলিশের কাজ! আমি কী করব? আচ্ছা খুদা হাফেজ..অনেক পেশেন্ট ওয়েট করছে। ধূলত বুঝলেন আসাটাই বৃথা। ১১ ডিসেম্বর। দুপুরেই নাটকীয়তায় বদল। লন্ডন থেকে চলে এসেছেন ফারুখ আবদুল্লা। মুখ্যমন্ত্রী। এসেই প্রথম যে কাজ করলেন, সেটি হল চিফ সেক্রেটারিকে সরিয়ে দিলেন। মুসা রেজা অবাক। তাঁর কী অপরাধ? ফারুখ বললেন, আপনার এত সাহস! আপনি আমার ক্যাবিনেটকে কিছু না জানিয়ে সোজা দিল্লিকে রিপোর্ট করছেন? মুসা বললেন, স্যার আমি কাকে রিপোর্ট করব এখানে বলে দিন? যাঁকেই বলেছি, তিনিই বলেছেন ফারুখ সাহেবকে আসতে দাও। তিনিই যা করার করবেন। আর দিল্লির ক্যাবিনেট সেক্রেটারিকে আপনি তো স্যার চেনেন। পাঁচ মিনিট পরপর ফোন করে জানতে চান কী হচ্ছে! একটু কম ইনফরমেশন হলে ধমক। হ্যাঁ ফারুখ জানেন। দিল্লির ক্যাবিনেট সেক্রেটারি একটু বাড়াবাড়ি করেন। নিজেকে মন্ত্রী, প্রশাসনেরও উপরে ভাবা অভ্যাস। কাউকে রেয়াত না করা একটা প্রবণতা। ফারুখ বললেন, আজ থেকে ওনাকে এক লাইনও কিছু জানাবেন না। আমি বুঝে নিচ্ছি। ঠিক দু ঘণ্টা পর ফারুখের ঘরে হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকলেন মুসা রেজা। স্যার..স্যার.. আবার ক্যাবিনেট সেক্রেটারি। কী করব? ফারুক উত্তেজিত। বললেন আমাকে লাইন ট্রান্সফার করো। তাই করলেন মুসা। এবং ফারুখ কানে ফোন নিয়ে বললেন, এই যে মিস্টার টি এন শেষন! আপনি কি জম্মু কাশ্মীরের কোনো অফিসার? আপনি স্রেফ সেন্ট্রাল গভর্নমেন্টের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি। ভারতের সব রাজ্যের কর্তা নয়। তাহলে আমার চিফ সেক্রেটারিকে আপনি রিপোর্ট চাইছেন কোন অধিকারে? কার অর্ডারে? পি এম বলেছেন? ক্যাবিনেট সেক্রেটারি টি এন শেষনের ওই প্রান্তে মুখচোখ ততক্ষণে লাল। এই ভাষায় কথা শোনার অভ্যাস তাঁর নেই। কিন্তু বুঝতে পারছেন একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী পদাধিকারে কোন পর্যায়ে। আর সত্যিই তিনি রাজ্যের কাছে জবাবদিহি, সাফাই, নিয়ম করে রিপোর্ট চাইতেও পারেন না। এসব তাঁকে করতে হচ্ছে কেন্দ্রের চাপে। তিনি পড়ে গিয়েছেন দুই যুযধান রাজনৈতিক শিবিরের ইগোর লড়াইয়ের মাঝপথে। ঠিক সন্ধ্যার পর ফারুখ নিজের সোর্সে খবর পেলেন দিল্লিতে একসঙ্গে দুটি গেমপ্ল্যান চলছে। প্রথমত কীভাবে টেররিস্টদের কত দ্রুত মুক্তি দিয়ে রুবাইয়া সঈদকে ছাড়িয়ে আনা যায়। আর দ্বিতীয়ত ফারুখ আবদুল্লার সরকারের পতন ঘটানো। দুটি ভিন্ন টিমকে দুটি ভিন্ন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি কিডন্যাপিংকে কেন্দ্র করে এরকম এক অবিশ্বাস্য রাজনৈতিক খেলা ভারতের পাওয়ার করিডরে আগে হয়নি। ১২ ডিসেম্বর। দিল্লির দুই প্রতিনিধি আরিফ মহম্মদ খান আর ইন্দ্রকুমার গুজরাল এলেন আবার। এবার দেখা করবেন তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। মিটিং শুরু হল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বোঝা গেল দিল্লির মন্ত্রীরা সিদ্ধান্ত নিয়েই এসেছেন টেররিস্টদের শর্ত মেনে রুবাইয়াকে যত তাড়াতাড়ি মুক্তি পাইয়ে দিতে হবে। তাই ফারুখের সঙ্গে আলোচনা স্রেফ এক নাটকে পরিণত হল। ফারুখ যখন বলছেন, আপনারা জানেন এই হামিদ শেখকে কত কষ্ট করে গুলির লড়াই করে ধরা হয়েছিল? আর তাকে এভাবে ছেড়ে দেওয়া হবে? ইন্দ্রকুমার গুজরালের স্ট্র্যাটেজিটা দেখা গেল অন্যরকম। যখনই ফারুখ কোনো বিরুদ্ধাচারণের কথা বলছেন, তখনই ইন্দ্রকুমার গুজরাল কানে হাত দিয়ে হিয়ারিং এইডটা চেপে ধরে বলছেন, হ্যাঁ..কী বললেন? শুনতে পেলাম না! আবার আরিফ মহম্মদ খান যে কোনো অবাঞ্ছিত কথা শুনলেই বলছেন, সেকি! তাই নাকি! আমরা তো জানতামই না এসব! কী আর করা যাবে! ফারুখ সাহেব একটা কথা বলুন, আজ আপনার নিজের মেয়ে হলে কি এত সব নিয়ম নীতির কথা বলতেন আপনি? তিনবার চা খাওয়া হয়ে গিয়েছে। ফারুখ এই অভিযোগে স্তম্ভিত। তিনি তৎক্ষণাৎ বললেন, আপনাদের সামনেই আমি ফোন করছি মুফতি সাহেবকে। সত্যিই করলেন। বললেন, মুফতি সাহেব আমার উপর বিশ্বাস রাখুন। আমি বিনা শর্তে আপনার মেয়েকে মুক্তি পাইয়ে দেব। আমি মনে করি রুবাইয়া আমারই মেয়ে। আমার মেয়ের জন্য যা করতাম, আজ আমি তাই করব। প্রান্তে মুফতি সাহেব শুধু বললেন, ফারুখ সাহেব দেরি হয়ে যাচ্ছে। ওরা বাচ্চা বাচ্চা সব মাথা গরম ছেলে। কী যে করে বসবে। আপনি আর না বলবেন না প্লিজ।

গেম ইজ ওভার! ফারুখ বুঝলেন তিনি একা। সত্যিই তো! যদি কিছু হয়েই যায় মেয়েটার। ফারুখের যুক্তি ছিল কিছুতেই মেয়েটির কোনো ক্ষতি করবে না তারা। তাহলে কাশ্মীরের মধ্যেই জেকেএলএফ একঘরে কোণঠাসা হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই চারদিকে এই নিয়ে তীব্র নিন্দাও শুরু হয়েছে। জেকেএলএফ বাধা হয়ে এক বিবৃতি দিয়ে বলেছে, ইন্ডিয়ান আর্মি যখন আমাদের মেয়েদের, মায়েদের উপর অত্যাচার করে, তখন আপনাদের এই দুঃখ কোথায় থাকে? কিন্তু ফারুখের গায়ে তকমা লাগানোর চেষ্টা হয়েছে নিজের মেয়ে নয় বলে তিনি এত দেরি করে নার্ভের লড়াই দেখাচ্ছেন। সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি এম এল কল হাজির হলেন। বললেন, স্যার আর উপায় নেই। পাঁচজনকে আমাদের ছেড়ে দিতেই হবে! পাঁচজন? মানে? এরা প্রথমে বলল একজন। তারপর তিনজন। এখন পাঁচজন? এটা কি ছেলেখেলা? তখনও শ্রীনগরে বসে আছেন দুই মন্ত্রী আরিফ মহম্মদ খান আর ইন্দ্রকুমার গুজরাল। স্টেট গেস্ট হাউসে ফোন করে তাঁদের ফারুখ বললেন, আজ যে সিদ্ধান্ত আপনারা নিলেন, আমার আপত্তি রইল। তবু গো অ্যাহেড! শুধু একটা কথা। এটা এক নতুন ট্রেন্ড শুরু হল। কাশ্মীরে নতুন রকমের টেররিজম শুরু হবে আজ বলে দিলাম। কিডন্যাপ করলেই সন্ত্রাসবাদীদের মুক্তি দেওয়ানো যায়। এটা সবাই জেনে যাবে।

সাড়ে তিনটে। ১৩ ডিসেম্বর। রজৌরির কাদাল এলাকায় দুটো অ্যামবাসাড়ার গাড়ি এসে দাঁড়াল। ঠিক চকে এসে কিছুক্ষণ থমকে রইল। দুদিকের সামনে পিছনের দরজা আচমকা খুলে গেল। পাঁচজন নেমে এল দুটি অ্যাম্বাসাডার থেকে। একজন হাঁটতে পারছে না। পায়ে ব্যান্ডেজ। অন্য দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে সে এগিয়ে গেল একটু দূরে থাকা দুটি অটো রিকশর দিকে। অ্যাম্বাসাডার দুটি চলে গেল। ঠিক এক ঘণ্টা পর ‘কাশ্মীর টাইমসের’ সাংবাদিক জাহিব মেহরাজ নিজের টেবিলে একটা ফোন পেলেন। জম্মু কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টের মুখপাত্র জাভেদ আহমেদ মীর ওপ্রান্তে। ‘আমাদের লোক আমরা পেয়ে গিয়েছি। থ্যাংক ইউ ভাই। ইনশাল্লা ১ ঘণ্টার মধ্যে মেয়েটাকে তোমরা পেয়ে যাবে।’ ঠিক তাই। আসফাক হাসতে হাসতে দোতলায় গেল। ঘুমিয়ে পড়েছে রুবাইয়া। সিস্টার.. গম্ভীর কণ্ঠে ধড়ফড় করে উঠে বসেছে রুবাইয়া। এবার কি সত্যিই মেরে ফেলবে? আসফাকের মুখে হাসি কেন? আসফাক বলছে, তোমাদের সরকার সারেন্ডার করেছে। আমাদের দাবি মেনে নিয়েছে। তোমাকে তাই ছেড়ে দিচ্ছি। খুশ হো না? রুবাইয়ার হাত পা ভেঙে আসছে অবসাদে। একটু পর চাপোর রোডে একটা অটো থেকে নামলেন রুবাইয়া সঈদ। সেরকমই বলা ছিল। আগে থেকেই গোটা কাশ্মীর পুলিশ প্রশাসন অপেক্ষা করছিল। স্বস্তির নিঃশ্বাস। শুধু তখন রজৌরিতে অকাল দেওয়ালি চলছে। ঘনঘন বাজির শব্দ। আতসবাজি ছোড়া হচ্ছে। কারণ একটা পরীক্ষা সফল হয়েছে। দাবি আদায়ের নতুন অস্ত্র কিডন্যাপিং। সেটাই ছিল শুরু। ১৯৮৯ সালের ৮ ডিসেম্বর। যে কোনো সন্ত্রাসবাদীকে ছাড়ানোর দরকার? কাউকে না কাউকে বন্দি করে নাও। এভাবেই ১৯৯৫ সালে ৬ জন বিদেশিকে হিমালয়ের ট্রেকিং করার সময় কিডন্যাপ করে নেওয়া হয়। করেছিল আল ফারহান গ্রুপ। তাদের টার্গেট ছিল মাসুদ আজহারকে মুক্ত করা। সেবার কিন্তু মাসুদকে ছাড়া হয়নি। ইচ্ছে করে টালবাহানা করেছিল সরকার। ফলে সবার আগে নরওয়ের বাসিন্দা হানস ক্রিস্টান অস্ট্রোর মুন্ডু কাটা হয়েছিল। বুকে বুলেট দিয়ে লেখা হয়েছিল আল ফারহান। আর খুঁজে পাওয়া যায়নি বিদেশিদের। স্রেফ ভ্যানিশ করে দেওয়া হয়েছিল।

কাশ্মীরের পণবন্দি করার প্রবণতার সেরা সাফল্য তখনও আসতে চার বছর বাকি। ১৯৯৯ সালের ২৪ ডিসেম্বর কাঠমান্ডু থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের আই সি ৮১৪ বিকেল পাঁচটার সময় টেক অফ করল। ১০ মিনিট। তখনও সিট বেল্টের সবুজ সংকেত বহাল। কিন্তু আচমকা মাস্ক পরা দুই যাত্রী উঠে দাঁড়ায়। “না না..উঠবেন না…এখনও সিট বেল্ট সাইন ইজ অন স্যার…।” বলেছিলেন, এয়ার হোস্টেস কল্পনা মজুমদার। তাঁকে থামিয়ে দিয়ে দুটি জার্মান কোল্ট রিভলবার হাতে দুই যাত্রী বলেছিল ককপিটে চলুন। ক্যাপ্টেন দেবী সারণ ছিলেন পাইলটের সিটে। তাঁকে বলা হল ক্যাপ্টেন, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে জানিয়ে দিন প্লেন হাইজ্যাক হয়েছে। আমরা ওয়েস্টে যাব। ঘাড় ঘুরিয়ে ঠান্ডা মাথার ক্যাপ্টেন দেবী সারণ বলেছিলেন, কোথায় যাব? হাইজ্যাকাররা বলেছিল, সেটা আমরা বলে দেব। আপনাকে যা বলা হচ্ছে করুন!

ক্যাপ্টেন সারণ পালটা বলেন, তোমরা বললে তো হবে না। ফুয়েল নেই। রিফুয়েল করতে হবে..। না হলে কিন্তু প্লেন ক্র্যাশ করবে…এবার কিছুটা ভয় পেল হাইজ্যাকাররা। কিন্তু সেই ভয় সাময়িক। কারণ তাদের টাগেট হয়েছিল সফল। কাঠমাণ্ডু…অমৃতসর….. লাহোর…কান্দাহার..। সেবার ছিল সেরা সাফল্য। কারণ মাসুদ আজহারকে সঙ্গে করে এনডিএ সরকারের বিদেশমন্ত্রী যশবন্ত সিং কান্দাহারে স্পেশাল এয়ারক্রাফটে নিয়ে গিয়ে পৌঁছে দিয়েছিলেন তালিবানদের হাতে। সে কাহিনি তো সকলের জানা…। মাসুদকে ছেড়ে দেওয়ার জের আজও ভুগতে হচ্ছে ভারতকে। পাঞ্জাবে পাঠানকোটের মতো দুর্ভেদ্য এয়ারফোর্স বেস স্টেশনে চারজন সুইসাইডাল স্কোয়াডের জঙ্গিকে ঢুকিয়ে দিয়েছিল মাসুদ। কীভাবে ঢুকে পড়ল। কোড ছাড়া তো গেট ক্রস করা যাবে না! তাহলে কি এয়ারফোর্সের মধ্যে আইএসআই চর ঢুকে গিয়েছে ভারতে? এসব প্রশ্নের জবাব কোথায়?

লেখকের “গুপ্তচর : ভারত-পাকিস্তান” গ্রন্থে ওই হাইজ্যাকিং কাণ্ডের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *