চারদিকে অন্ধকার। দূরের বাসস্টপ থেকে সামান্য আলো আসছে। গিরনা রিভার ব্রিজের নীচে একটি আবছা মানুষ দাঁড়িয়ে। হাতে ব্যাগ। জায়গাটা মহারাষ্ট্রের মালেগাঁও টাউন থেকে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে। গিরনা নদীতে জল নেই তেমন। ব্রিজের নীচে তাই অনায়াসে নেমে যাওয়া যায়। দুপুরে কিংবা বিকেলে প্রেমিক প্রেমিকাদের শহর থেকে দূরে এসে কিছু সময় কাটানোর আদর্শ স্পট হিসাবে পরিচিত গিরনা ব্রিজ। কিন্তু সন্ধে হলেই শুনশান। লোকটির সাধারণ পাজামা পাঞ্জাবি। হাইট তেমন বেশি নয়। চশমা পরা। মুখে দাড়ি আছে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখা গেল আর কেউ নেই। থাকার কথাও নয়। তবু সাবধানের মার নেই। এবার ব্যাগটি খুলে লোকটি কিছু টুকরো জিনিস বের করল। অন্ধকারে বোঝা সম্ভব নয়। অন্য পকেটে অবশ্য টর্চ আছে। টর্চ জ্বালিয়ে দাঁত দিয়ে চেপে ধরে দুই হাতে অত্যন্ত সাবধানে লোকটি ওই টুকরো জিনিসগুলি একটির সঙ্গে অন্যটি লাগাচ্ছে। মন দিয়ে। বেশি সময় লাগেনি। কাজ শেষ। তৈরি হল যে জিনিসটি তাকে অপরাধজগৎ আর পুলিশের পরিভাষায় বলা হয় আইইডি। ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস। সাধারণ ভাষায়বিস্ফোরক! কিন্তু বাস আসছে। যদিও এই নির্জন বাসস্ট্যান্ডে এই রাতে খুব বেশি যাত্রীর ওঠানামার সম্ভাবনা নেই। সিংহভাগ যাত্রী যাবে দূরে। তবু বাসটি যেতে দিল লোকটি। যদি এক আধজন যাত্রী এসে যায়। তাহলে প্ল্যান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যাবে। অবশেষে বাস চলে গেল। হয়তো যাত্রীদেরও পদশব্দ মিলিয়ে গেল। ঠিক সেই সময় লোকটি ওই বিস্ফোরকের টাইমার অন করেই অনেকটা পিছিয়ে চলে গেল ব্রিজের নীচেরই অন্য প্রান্তে। যাতে দূরত্ব তৈরি হয়। ১০ সেকেন্ড….২০ সেকেন্ড….৩০ সেকেন্ড…প্রবল শব্দ। ফেটে গেল এক শক্তিশালী বোমা। যার উপকরণ লোকটি ব্যাগে করে নিয়ে এসেছিল। একটা আগুনের শিখা দপ করে জ্বলে উঠে এক নিমেষের জন্য জায়গাটি আলোকিত করে তুলল। তারপর ধোঁয়ায় ঢেকে গেল গিরনা ব্রিজের নীচের চরাচর। এবং মধ্যচল্লিশের লোকটি বাচ্চা ছেলের মতো আনন্দে হাততালি দিয়ে হা হা হা হা করে হাসতে শুরু করল। সাকসেসফুল তার পরীক্ষা… অবশেষে একক প্রয়াসে সে একটি বিধ্বংসী বিস্ফোরক তৈরি করতে সফল। অনেকদিন ধরেই তার টার্গেট ছিল ফাঁকা কোনো জায়গায় পরীক্ষা করা। এই জায়গাটি দেখে যাওয়া হয়েছিল আগে কয়েকবার। সেইমতোই প্ল্যান করা। তবে আজ শুধুই পরীক্ষা। কোনো নির্দিষ্ট টার্গেট ছিল না। ছিল না ক্ষয়ক্ষতির লক্ষ্য। শুধু নিজেদেরই যাচাই করা যে সন্ত্রাসের দুনিয়ায় পা রাখার কতটা যোগ্য আমি।
বাসটি যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখানেও শুনশান অন্ধকার। কোনো শব্দও নেই। কিন্তু আসলে শব্দ আছে। ফিসফিস করে কয়েকটি গলার শব্দ। কয়েকফুট দূরের কেউই শুনতে পাবে না। চারজন কিশোরের কণ্ঠস্বর। তারা হল চোর। মালেগাঁও বাসস্ট্যান্ড থেকে যে কোনো দূরপাল্লার বাস রাতে যখন এই পথে যাওয়ার সময় এই গিরনা ব্রিজের নিকটের বাসস্টপেজে দাঁড়ায় তখন এই কিশোরদের অপারেশন শুরু হয়। বাসটি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ঝোপের আড়াল থেকে একটি কিশোর বেরিয়ে পিছনে লাগানো সিঁড়ি বেয়ে চোখের পলকে নিঃশব্দে বাসের ছাদে উঠে যায়। এবং ত্বরিৎগতিতে সামনে থাকা ডাঁই করে রাখা যাত্রীদের লাগেজের ব্যাগগুলি পরীক্ষা শুরু করে। কয়েকটি চেইন খুলে চেক করেই সে বুঝে যায় কোনটায় মাল পাওয়া যাবে। সেইমতো একটি দুটি ব্যাগ সে নিমেষে ছাদ থেকে মাটিতে ফেলে দেয় পিছনদিকে। কিন্তু শব্দ হয় না। কারণ নীচে দাঁড়িয়ে আছে তার শাগরেদ বাকি ছেলেরা। তারা নিখুঁতভাবে ক্যাচ নেয়। এবং দ্রুত পালায় ব্রিজের দিকে। বিন্দুমাত্র বুঝতে পারে না কনডাক্টর, চালক ও যাত্রীরা। এরপর বাসটি চলতে শুরু করলেই বাসের ছাদে থাকা সেই কিশোর সেকেন্ডের মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে আবার নেমে আসে। বাস অন্ধকার রাতে ফাঁকা রাস্তায় দ্রুত স্পিড নেয়। পিছনে পড়ে থাকে হতভাগ্য কোনো কোনো যাত্রীর ব্যাগ। যারা তখন ঘুমাচ্ছে। এই অপারেশনের পর চার কিশোর আবার মিলিত হয় ব্রিজের কাছে কোনো এক জায়গায়। এবং ব্যাগ থেকে মালপত্র বের করে নিজেদের কাছে থাকা ব্যাগে ভরে যাত্রীদের ব্যাগ ছুড়ে ফেলে দেয় নদীর জলে। এটাই নিয়ম। যাকে বলা হয় মোডাস অপারেন্ডি। এদিনও ঠিক ওই অভিযানে বেরিয়েছিল চার কিশোর। লক্ষ্য নাসিকের বাস। তবে সেদিন বাসস্ট্যান্ডের আলোর তেজ কম। কারণ একটি বালব ভাঙা। এই কিশোরের দলই ভেঙে দেয় অপারেশনের আগের দিন ভোরে। কম আলোয় চুরি করে পালানো সহজ। কেউ দেখলেও চিনতে পারবে না। ঠিক যেভাবে প্রতিদিনই ব্যাগচুরির পর্বটি শুরু হয় সেরকমই হয়েছিল। এবং শেষটিও তাই। বাস চলে গেল। যাত্রী বিশেষ কেউ ছিল না। আজ দুটি ব্যাগ জোগাড় করা গিয়েছে। কারণ বেশি যাত্রী না থাকায় বাস দাঁড়ায়নি। সেটা বোঝাও যাচ্ছিল। সেভাবেই ক্যালকুলেশন করা হয়েছে। ব্যাগ থেকে একে একে বিভিন্ন জিনিস বের করে নিয়ে ফাঁকা ব্যাগ ব্রিজের কাছে নিয়ে গিয়ে নদীতে ছোড়ার আগেই আচমকা ওই ব্যাগ চোর কিশোরের দল চমকে গেল। কারণ একটা আলোর ঝলক দূর থেকে। আর প্রচণ্ড শব্দ। চমকে দিয়ে প্রথমে চার কিশোর ছুটতে শুরু করল উলটোদিকে। কিছুটা যাওয়ার পরই থেমে গেল তারা। এবং পরস্পরের মধ্যে চোখাচোখি করে স্থির করল আবার যাওয়া হবে ব্রিজের দিকে। দেখতে হবে কী ব্যাপার! সেইমতো তারা ব্রিজের কাছে এল। কিন্তু ভয় কাজ করছে। তাই নীচে নামার সাহস হল না। ব্রিজের উপর থেকেই উঁকি মেরে তাকাল চারজন। এবং তাকিয়ে দেখতে পেল এক অদ্ভুত দৃশ্য। কুণ্ডলী পাকিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। তখনও রয়ে গিয়েছে কিছু আগুনের শিখা। জ্বলছে নদীতীরের শুকনো ঘাস, পাতা ঝরে যাওয়া ছোট গাছ আর স্তূপীকৃত কিছু জঞ্জাল। আর সেসবের সামনে হা হা হা হা করে উন্মত্তের মতো হাসছে একটি লোক। হাত দুটি উঁচু করা।
দৃশ্যটা দেখেই চমকে গেল তারা। কিন্তু একটা ইনস্টিংকট সঙ্গে সঙ্গে কাজ করল। টেররিস্ট! দৌড়ে গেল চারজন। পিছনে থেকে জাপটে ধরল। লোকটি হাসতে হাসতে পারিপার্শ্বিক ভুলে গিয়েছে। ওই অন্ধকার নিকষ কালো রাতে এই চরাচরের মধ্যে যে সে ছাড়া আর কেউ থাকতে পারে তা কল্পনাই করেনি। তাই বাধা দেওয়ার আগেই সে এতটাই বিস্মিত হয়েছিল যে নড়তেই পারল না। কিছু করে ওঠার আগেই বন্দি হয়ে গেল চার কিশোরের হাতে। মধ্যবয়স্ক লোকটিকে তুলে দেওয়া হল মালেগাঁও পুলিশের হাতে।
মালেগাঁও টাউনের পুলিশ ইনস্পেক্টর সুরেশ ওয়ালিশেট্টি প্রায় চেয়ার ছেড়ে পড়ে যাচ্ছিলেন জেরা করার সময়। এই আনইম্প্রেসিভ সাধারণ চেহারার সাদা পাজামা পাঞ্জাবি আর দাড়িমুখের মতো লোক মালেগাঁও টাউনের মেইন মার্কেটে কমপক্ষে হাজারের বেশি পাওয়া যাবে। আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতো কিছুই নেই। একেবারে সাধারণ ফিচার। । জানা গেল লোকটি নিজেই বোমা বানিয়ে সেটি টেস্ট করতে এসেছিল। তাও না হয় মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু লোকটির পরিচয় জেনে ওই ইনস্পেক্টর হতভম্ব। তিনি তৎক্ষণাৎ বড়সাহেবদের খবর দিলেন। পুলিশ সুপার, ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী ছুটে এল মালেগাঁও পুলিশ স্টেশনের মধ্যে। কারণ ঘটনাটি আপাতভাবে অবিশ্বাস্য! কে লোকটি? ডক্টর জালিস আনসারি! মুম্বইয়ের অন্যতম খ্যাতনামা আন্ধেরি ওয়েস্টের কুপার হাসপাতালের সিনিয়র ডাক্তার। মুম্বইয়ের মদনপুরায় বাড়ি এবং সবথেকে বড় কথা হল তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই। জালিস আনসারি গ্রেপ্তার হয়ে গেল। এবং তাঁর গ্রেপ্তারির খবর পেয়েই ছুটে এলেন তাঁর স্ত্রী এবং ভাইয়েরা। তাঁরা স্তম্ভিত।
মদনপুরার আনসারি পরিবারের সবথেকে বড় ছেলের নাম জালিস আনসারি। আর একেবারে ছোট ভাই মেডিকেল কলেজে পড়ছে। সেও ডাক্তার হয়ে যাবে। আনসারি পরিবারের সাত পুত্রকন্যা। দুজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দুই মেয়ে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট করার পর শিক্ষিকা। এক ভাই মুম্বইয়ের বিখ্যাত এক কলেজের লেকচারার। সেটা আশির দশকের শেষ দিক। গোটা মদনপুরায় আনসারি পরিবারের খ্যাতি তাই আকাশছোঁয়া। ডক্টর আনসারি নিজে মেডিকেল পড়াশোনা করেছেন জে জে গ্রুপ অফ হসপিটাল মেডিকেল কলেজ থেকে অনেক বেশি গ্রেড পেয়ে। কুপার হাসপাতালে শুরুতেই তাঁকে দেওয়া হয় রেডিওলজির ভার। এবং একসময় ডক্টর আনসারির পরিচয় হয় হেড অফ দ্য ডিপার্টমেন্ট অফ রেডিওলজি প্লাস এক্স রে ডিপার্টমেন্ট। কিন্তু ঠিক যখন তার কেরিয়ার ধীরে ধীরে আকাশ স্পর্শ করার কথা ছিল তখনই আচমকা দিক বদল করতে শুরু করল আনসারির পথচলা। কারণ দেখা হল আবদুল করিম টুন্ডার সঙ্গে। উত্তরপ্রদেশের হাপুর জেলার পিলখুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল করিম টুন্ডা এসে জালিস আনসারি তো বটেই, ভারতের নিরাপত্তার আকাশে একটি কালো মেঘের সঞ্চার করল। মদনপুরার কাছেই এক অডিটোরিয়ামে আয়োজিত হতে শুরু করল তবলিগি জামাত। তবলিগি জামাতের অর্থ যে গোষ্ঠী বাণীপ্রচার করে বক্তৃতার মাধ্যমে। সেই তবলিগি জামাতের প্রত্যেকটি সমাবেশে দিন দিন প্রবল ভিড় হতে শুরু করে। কারণ একের পর এক তুখড় বক্তা সেখানে এসে ইসলামের পথ এবং দিশা নিয়ে সহজ সরল ভাষায় মানুষকে বুঝিয়ে প্রকৃত ইসলামের বাণী শোনাতেন। কিন্তু আবদুল করিম টুন্ডা এসে সেই প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ অন্য খাতে বইয়ে দিতে শুরু করে। তার বক্তৃতার প্রধান টার্গেট যুব সম্প্রদায়। তাদের সে নিয়ম করে বলতে শুরু করল ইসলামকে তার হারানো মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে হবে। তার জন্য দরকার অবিশ্বাসী কাফেরদের ধ্বংস করা। এই গোটা দুনিয়া হয়ে উঠবে শুদ্ধ ইসলামের সাম্রাজ্য। কিন্তু মদনপুরার সকলে এই ধরনের বক্তৃতা পছন্দ করছে না। তারা প্রফেট মহম্মদের বাণী শুনতে চায়, পবিত্র কোরানের ব্যাখ্যা শুনতে চায়। সুতরাং ধীরে ধীরে আবদুল করিম টুন্ডার জমায়েতে লোক কমছে। কয়েক সপ্তাহ পর টুন্ডা নিজেই বুঝে গেল জমছে না। মদনুপরার আয়োজকরা তাকে জানিয়ে দিল এসব প্ররোচনামূলক কথাবার্তা তারা শুনতে চায় না। ইসলামের শান্তির বাণীই তাঁদের লক্ষ্য। যদি তিনি সেসব বলতে পারেন তাহলে বলুন। নয়তো আর তাঁকে ডাকা হবে না। অতএব টুন্ডা বাছাই করা কিছু মানুষকে নিয়ে মোমিনপুরের এক সভাগৃহ বুক করল। সেখানে সে আমন্ত্রিত বক্তা নয়। নিজেই প্রচারক। এবং আর কোনো বাধা নেই। প্রধান কাজই হল যুবকদের বোঝানো যে তাদের একমাত্র লক্ষ্য ইসলামকে হৃতসাম্রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া। ভারত ছিল মুসলিম শাসকদের হাতে। আবার যেন সেই সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়া সম্ভব হয়। প্রত্যেক শুক্রবার সন্ধ্যায় ফুফাতো ভাই সেলিমের সঙ্গে নমাজ সেরে মদনপুরায় ওই তবলিগি জামাতে আসা যাওয়া ছিল কুপার হাসপাতালের ডাক্তার জালিস আনসারির। এবং সকলের অজান্তে তার মধ্যে সবথেকে বেশি প্রভাব বিস্তার করল আর কোনো প্রচারক নয়। আবদুল করিম টুন্ডা। সুতরাং সেই আবদুল করিম যদি না থাকে বক্তা তালিকায়, তাহলে আর আসার দরকার কী? অতএব ডক্টরসাব আর এল না। বরং যাওয়া মনস্থ করল মোমিনপুরায়। এবং নিয়ম করে যেতে শুরু করল। সেই আলাপ টুন্ডার সঙ্গে। সন্ত্রাসের সঙ্গে।
টুন্ডা তার সাপ্তাহিক বক্তৃতায় একদিন বলল, আমি যখন ছোট ছিলাম একদিন আমাদের পাড়ায় এক ম্যাজিসিয়ান এল। সেই জাদুকর একটা স্টিক হাতে নিয়ে সেটার গায়ে কিছু সাদা ময়দার মতো জিনিস লাগাল। এবং হাতে গ্লাভস পড়ে আর একরকম সাদা পাউডার নিয়ে সেই স্টিকে ঘষতে ঘষতে বলল, বাচ্চারা এবার দ্যাখো..এবার এই লাঠি থেকে বেরোতে শুরু করবে আগুনের শিখা…তাকিয়ে থাকো তোমরা…তাকিয়ে থাকো…চোখ সরিও না..। সামনে বসে থাকা বাচ্চারা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকত। আর সত্যিই আচমকা এক আগুনের শিখা দপ করে জ্বলে উঠত লাঠিতে। বাচ্চাদের হাততালিতে ভরে উঠত পাড়ার ওই ছোট্ট মাঠ। কীভাবে সম্ভব হল? আবদুল করিম টুন্ডা বাচ্চা বয়স থেকেই কৌতূহলী। সে তারপর থেকেই তক্কে তক্কে থাকত কীভাবে জ্বলে ওই আগুন তা জানতে হবে। এবং অবশেষে ম্যাজিসিয়ানের সহকারীকে অনেকদিন ধরে নানারকম উপহার দিয়ে দিয়ে জানা গেল ওই সাদা পাউডার হল পটাশিয়াম এবং গুঁড়ো করা চিনি। এবং এই দুটির কম্বিনেশন যদি অ্যাসিডে মেশানো যায় তৎক্ষণাৎ জ্বলে ওঠে আগুনের শিখা। আবদুল করিম টুন্ডা সেই ছেলেবেলায় জেনে গেল বোমা তৈরির প্রাথমিক ফরমুলা! টুন্ডার সামনে এইসব সময় বসে থাকত একদঙ্গল মুসলিম যুবা। যাদের সে ব্রেইন ওয়াশ করানোর জন্য সারাক্ষণ বলে যেত বিভিন্ন কাল্পনিক সত্য মিথ্যা মেশানো মুসলিমদের বঞ্চনার কথা। যুবকবৃন্দ ভিতরে ভিতরে উত্তেজিত হত। এবং সেই উত্তেজনার আগুনে ঘি দিয়ে টুন্ডা বলেছিল, তোমরা কেউ জন্নত যেতে চাও না? একমাত্র কওমের জন্য যদি কিছু করে যেতে পারো তাহলেই যেতে পারবে জন্নত। আমাকে দ্যাখো…আমি গোটা যৌবন সেই ছোটবেলার শিক্ষা কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছি কীভাবে একটা মহা বোমা তৈরি করা যায়। আর এই বানানো আর টেস্ট করতে করতে একদিন আমার বাঁ হাতটাই উড়ে গেল বিস্ফোরণে। বলেই বরাবর কাঁধে জড়ানো সবুজ রঙের চাদরটা এক নিমেষে খুলে ফেলল আবদুল করিম টুন্ডা। সকলেই চমকে উঠে দেখতে পেল টুন্ডার বাঁ হাত নেই। আর তাই…বন্ধুরা…আর তাই আজ আর আমি বোমা বানাতে পারি না। তোমরা পারবে না আমার স্বপ্নকে পূরণ করতে? তোমাদের মধ্যে সেই যোগ্যতা আছে….। তোমরা পারবে এই দেশে আমাদের কওমের জন্য ইতিহাস তৈরি করতে। টুন্ডা আশা করেছিল কেউ কেউ হাত তুলবে। কেউ বলবে আমি আছি জনাব..আমি করব আপনাকে সাহায্য। কিন্তু সেভাবে কেউই সাড়া দেয়নি। সভা সমাপ্ত। টুন্ডা সামান্য হতাশ। সে ভাবছিল কাজ শেষ হয়নি। মুখ ধোয়ার জন্য টয়লেটে গিয়ে যখন বেরোচ্ছে, তখনই দেখতে পেল দুই ব্যক্তি বাইরে দাঁড়িয়ে। দুজনেই ছিল একটু আগেই সভায়। তার মধ্যে একজন টুন্ডার হাত ধরে বলল, জনাব আমি আপনার ভক্ত! আমি পারব আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে। আর আপনি আমাকে যদি শিখিয়ে দেন কীভাবে বোমা তৈরি হয় তাহলে আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিখে আপনাকে দেখিয়ে দেব যে আমি সত্যিই কী পারি! বিশ্বাস রাখুন জনাব..। লোকটির নাম ডক্টর জালিস আনসারি। মহাভারতের যুগের হাজার হাজার বছর পর আজও প্রত্যেক সমাজের একজন করে দ্রোণাচার্য থাকেন যিনি সর্বদা এক প্রিয়, আদর্শ আর যোগ্যতম শিষ্যের খোঁজে থাকেন। আবদুল করিম টুন্ডা অবশেষে খুঁজে পেল এক আদর্শ শিষ্য। মৃদু হাসল টুন্ডা। বলল, কাল থেকে তুমি আমার বাড়িতে এসো। আমি শেখাব আমি যতটুকু জানি! এক্স রে মেশিন আর রেডিওলজি ডিপার্টমেন্টে সারাদিন কাটানো ব্যস্ত ডাক্তার ডক্টর জালিস আনসারির নতুন জীবন শুরু হল রাতে। সকলের অজান্তে সে হয়ে উঠতে লাগল মুম্বইয়ের ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড…।
প্রত্যেকদিন নিয়ম করে বোমার ক্লাস হয়ে যাওয়ার পর জালিসের কাজ ছিল বাড়ি ফিরে তাড়াতাড়ি খেয়ে নিজের স্টাডিরুমে চলে যাওয়া। এবং সেখানে বসে বসে রিসার্চ করে বের করা কতটা কম উপাদান ব্যবহার করে কতটা বেশি বিস্ফোরণ ঘটানো সম্ভব। এভাবেই জালিস আনসারি রাতের পর রাত জেগে একটি করে বোমা তৈরি করে দেখাতে নিয়ে যায় গুরু আবদুল করিম টুন্ডাকে। এবং সেটি হাতে নেড়েচেড়ে দেখার পর টুন্ডা মতামত প্রদান করে ভালো হয়েছে অথবা হয়নি। এভাবেই একদিন যখন টুন্ডা স্থিরভাবে বিশ্বাস করেছে যে জালিস একজন বোমা বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠতে পারে তখনই জালিস জানাল সে নিজে তখনই সন্তুষ্ট হবে যখন পুরোদস্তুর টেস্ট করা সম্ভব হবে। কিন্তু কোথায়? মুম্বই শহরে তো আর বোমা ফাটিয়ে টেস্ট করা সম্ভব নয়। তাহলে? হদিশ দিল টুন্ডাই। তার চাচাতো ভাইয়ের বাড়ি মালেগাঁও। চলো কদিন সেখান থেকে ঘুরে আসা যাক। সেই যাওয়া। কয়েকদিন থাকাই শুধু নয়। প্রচুর ঘোরাঘুরি করে জেনে নেওয়া গেল মালেগাঁওয়ের সুযোগসুবিধা। শহর নয়। শহরের বাইরেটা কেমন? এবং সেভাবেই আবিষ্কার হল গিরনা ব্রিজ। সকালে….দুপুরে.………. সন্ধ্যায়…রাতে। স্থির হল রাতে হবে পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা করতেই মালেগাঁও এসে হাজির হয়েছিল ডক্টর জালিস আনসারি। আর ধরা পড়ে গেল চারটি বাচ্চা ছেলের হাতে। এরপর? গুরু কি কখনও শিষ্যের বিপদ দেখে দূরে থাকতে পারে? তাই চুপ করে বসে নেই আবদুল করিম টুন্ডা। কোনোভাবেই এতদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা শিষ্যকে এভাবে জেলের অন্ধকারে যেতে দেওয়া চলে না। এবং টুন্ডার ক্ষুরধার বুদ্ধির কাছে হেরে গেল মালেগাঁও পুলিশ। কারণ দিনের পর দিন মাসের পর মাস যাওয়া আসা করতে করতেই টুন্ডা দেখেছে মাঝেমধ্যে. জালিসের হিস্টিরিয়া গোছের হয়। হাত পা বেঁকে যায়…মুখ থেকে কথা বেরোয় না… দাঁত আটকে যায়। সেলিমকে জেরা করে টুন্ডা জেনে নিল আসলে জালিস ভাইয়ার এপিলেপসি বা মৃগী আছে। আগে যখন তখন হত অ্যাটাক। আজকাল আর হয় না। ডাক্তারও দেখানো হয়েছিল। জালিস ভাইয়া ওষুধও খায়। ব্যস! সেকথা মনে পড়ে গেল। তৎক্ষণাৎ জালিস আনসারির উকিলদের কাছে টুন্ডা পৌঁছে দিল তাব প্রেসক্রিপশন। এবং আদালতে বলা হল জালিস আনসারির মাথার ঠিক নেই। পাগলামোর রোগ আছে। সন্ত্রাসের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। সে নিশ্চয়ই পাগলামির ঝোঁকে এসব করেছে।
আদালত সমস্ত কাগজপত্র এবং জালিস আনসারির কোনোরকম অপরাধের ইতিহাস নেই জেনে বিস্ফোরণের মামলা থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি দিয়ে দিল। জালিস ফের এক মুক্ত পুরুষ। কিন্তু একজন মানসিক ভারসাম্যহীন পেশেন্টকে কুপার হাসপাতাল কেন চাকরিতে রাখবে? রাখেওনি। চাকরি গেল জালিসের। আয় নেই। তিনটি সন্তান। স্ত্রী। কী করবে ডক্টর জালিস আনসারি? তার নিজের কোনো ভ্রুক্ষেপই নেই। সে মদনপুরায় একটি ঘর ভাড়া নিয়ে ক্লিনিক চালু করল। রোজ সকালে শুরু হয় জালিস ভাইয়ার চেম্বার। কিন্তু সন্ধ্যায় সেই চেম্বার খোলা হবে না। কারণ কোথায় যেন যায় জালিস ভাইয়া। অতএব সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত যখন আসো ক্ষতি নেই। সন্ধ্যায় পাওয়া যাবে না। কারণ কী? কারণ ততদিনে মোমিনপুরায় একটি এক কামরার ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সেখানে রোজ দরজা বন্ধ করে একদল মানুষ ভিতরে আলোচনা করে। কী আলোচনা? কেউ জানে না। প্রত্যেক শনিবার শুধু বেছে বেছে ১০ জন আসে সেই ঘরে। কংক্রিটের ছাদ দেওয়া সেই ঘরে আদতে জালিস আনসারি ১০জন শিষ্যকে বিস্ফোরক বানাতে শেখায়। আর ওই শনিবার শনিবার আসে জালিস আনসারির মুর্শিদ আবদুল করিম টুন্ডা। ঠিক এক বছর এভাবেই কেটে গেল। জালিস আনসারি পুলিশের হাত থেকে মুক্তি পেয়েছে ১ বছরের বেশি। সকালে কোনোমতে চেম্বার চলে। আর অপেক্ষা নয়। এবার কাজ করতে হবে। না হলে এই সাধনার দাম কী? অতএব এক শনিবার শপথ নেওয়ার দিন। এবার অ্যাটাক।
প্ল্যান হল অভিনব । প্রত্যেক শুক্রবার একটি করে ব্যাগে বিস্ফোরক রেখে আসা হবে কোনো একটি রেলস্টেশনে অথবা লোকাল ট্রেনে। ১৯৯০ সালের মার্চ মাস থেকে আচমকা মুম্বইয়ের একের পর এক স্টেশনে কিংবা ট্রেনে শুরু হল ছোট ছোট বিস্ফোরণ। কল্যাণ…মাতুঙ্গা….কুরলা…। একটি নয়…দুটি নয়…তিনটি নয়… কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে মুম্বই শহর ও শহরতলির স্টেশনগুলিতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। কারণ ৮০টি বোমা ফেটেছে। কে এর পিছনে? এভাবে কখন সকলের অজান্তে বোমা রেখে যাচ্ছে তারা? সমস্ত স্টেশনে যখন প্রচুর পুলিশ বাড়িয়ে দেওয়া হল তখন দেখা গেল আক্রমণকারীদের প্ল্যান আরও বৃহত্তর। কারণ এতদিন মনে করা হচ্ছিল নিছক রেলস্টেশন টার্গেট। আদতে তা নয়। গোটা মুম্বই টার্গেট। কারণ এরপর বিস্ফোরণ হতে শুরু করল কোলাবার রিগাল সিনেমা….মালাড ..কান্দিভিলি…সেন্ট্রাল মুম্বইয়ের শিবসেনা অফিস…অন্ধেরির কারশেডে….দাদরের সিমেন্ট কারখানায়…। কে করছে? মুম্বই পুলিশ দিশাহারা।
থিওডর জন কাগনিস্কিকে আমেরিকার তদন্তকারী সংস্থা ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন নাম দিয়েছিল আনবম্বার। ইলিনয়েসের এভারগ্রিন পার্কে বড় হওয়া কাগনিস্কি হার্ভার্ড থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি পেয়েছিল ১৯৬২ সালে মিশিগান ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স এবং পিএইচডি। মাত্র ২৫ বছর বয়সে ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর।
১৯৭১ সালে এই চুড়ান্ত উজ্জ্বল কেরিয়ার ছেড়ে কাগনিস্কি আচমকা চলে যায় এক নির্জন নির্বাসনে। মনটানার লিংকনে সে একাকী থাকতে শুরু করে। সে ঠিক করে গরম জল লাগবে না….ফোন লাগবে না…কিছু লাগবে না। শুধু সে একা থাকবে প্রকৃতির মধ্যে। এবং তার কাজ হবে বোমা তৈরি করা। সেগুলি ফাটছে কিনা কীভাবে প্রমাণ হবে? তার জন্য আছে ক্যুরিয়ার সার্ভিস! সে কী প্রমাণ করতে চায়? প্রমাণ করতে চায় মানুষের লোভ সাংঘাতিক। বিরাট বড় প্যাকেট পেলেই ভাবে একটা উপহার এসেছে। সেই লোভ সে ভাঙতে চায় মানবসমাজ থেকে।
১৯৭৮ সালের ২৫ মে নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মেটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ার প্রফেসর বাকলে ক্রিস্ট নিজের বাড়িতে গিয়ে পেলেন একটি প্যাকেট। পার্কিং লটে রাখা। উপরে তার নাম উইথ লাভ…রিটার্ন অ্যাড্রেস সহ। থমকে গেলেন ক্রিস্ট। কাছেই থাকা পুলিশ অফিসারকে ক্রিস্ট ভাগ্যক্রমে বললেন এই প্যাকেটের কথা। পুলিশ অফিসার টেরি মার্কার। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ও মাই গড! মিস্টিরিয়াস গিফট! লেস ওপেন স্যার..। বলে নিজেই এগিয়ে এসে প্যাকেটটি হাতে নিলেন এবং ধুম ধুম ধুম করে সেটি বিস্ফোরণ! উড়ে গেল পুলিশ অফিসার টেরি মার্কারের বাঁ হাত! ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট নম্বর ৪৪৪ বোয়িং সেভেন ফোর সেভেনের কার্গো হোল্ডে প্রবল ধোঁয়া। এবং বিস্ফোরণ…। সল্ট লেক সিটিতে একটি কম্পিউটার ফার্মের রিসেপশনে বিস্ফোরণ..ইয়েল ইউনিভার্সিটির ইনফরমেশন টেকনলজি ডিপার্টমেন্টে একটি ক্যুরিয়ার এল। সেটি খুলেছিলেন ডেভিড গার্লনার। খোলার সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ। নিউ জার্সির নর্থ কাল্ডওয়ালে বার্সন মার্স্টটেলার সংস্থার এক্সিকিউটিভ টমাস মোজার এরকমই এক মেইল বম্ব ডেলিভারি নিতেই সেই ক্যুরিয়ার বক্সে বিস্ফোরণ। সব মিলিয়ে ১৬টি বোমা বিস্ফোরণ…তিনজনের মৃত্যু…২৩ জন আশঙ্কাজনক। এবং অসংখ্য আহত। বছরের পর বছর চলছে এরকম অদৃশ্য এক অপরাধীর বোমা নিক্ষেপ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়ায় যে আমেরিকার শহর ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে কেউ আর কোনো প্যাকেট ডেলিভারি নিতে চাইছে না। চরম আতঙ্ক। কেন ধরতে পারছে না বিশ্বের সেরা তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই? কারণ তাদের থেকেও বুদ্ধিমান ছিল সেই কাগনিস্কি। সে প্রতিটি বোমার প্যাকেটে এমন কিছু প্রমাণ বা ব্লু রেখে দিয়েছিল যা প্রাথমিকভাবে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করে দিচ্ছিল। কখনও লেখা এফ সি। কোথাও লেখা একটা মেটাল বক্সের মধ্যে থাকা চিরকুট। যেখানে লেখা, ইউ..ইট ওয়ার্কস..আই টোল্ড ইউ ইট উড..আর ভি…। কোথাও একটি বক্সে ১ ডলারের ইউজেন ও নিলের স্ট্যাম্প লাগানো। সবটাই আসলে তদন্তকারীদের বোকা বানানো। অবশেষে এক হলিউড থ্রিলারের কায়দায় বছরের পর বছরের তদন্তের পর জানা যায় আসল কালপ্রিট কে। টেড কাগনিস্কি। তাহলে আজ ডক্টর জালিস আনসারির কাহিনি বলতে গিয়ে হঠাৎ থিওডর ওরফে টেড কাগনিস্কির কথা টেনে আনার কারণ কী? কারণ হল টেডকে নাম দেওয়া হয়েছিল আনবম্বার। অদৃশ্য এক বোমারু। সে কবে কোথায় কীভাবে কেন এবং কখন বিস্ফোরক ঘটাবে কেউ জানত না। তবে এটা জানা গিয়েছিল সে থাকে শিকাগোতে। এবং তাই নাম দেওয়া হয়েছিল ‘শিকাগো আনবম্বার’। মুম্বই পুলিশকে হতচকিত করে নাজেহাল করে দেওয়া ডক্টর জালিস আনসারির নতুন নাম হয়েছিল সেরকমই ‘মুম্বই আনবম্বার…।
কিন্তু এসব ছোটখাটো লোকাল ট্রেন আর মুম্বই শহরের আনাচে কানাচে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তো বিরাট কোনো প্রভাব ফেলা যাচ্ছে না? তাহলে আমরা কী এইটুকুতেই সন্তুষ্ট থাকব? জালিস জানতে চাইছে আবদুল করিম টুন্ডার কাছে। শনিবার সন্ধ্যা। মোমিনপুরার সেই ঘর। এর মধ্যে টিম মেম্বারের সংখ্যা বেড়েছে। অন্তত ১৮ জন আছে আজকের মিটিংয়ে। সকলে একজোট হয়েছে। আজ নতুন প্ল্যান। টুন্ডা তার শিষ্য জালিসের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। সকলে চুপ। তার উত্তরের দিকে তাকিয়ে সবাই। আবদুল করিম একটা পান মুখে দিয়ে বলল, আর স্যাকরার মতো খুটখুট করে লাভ নেই। এবার আমাদের কামারের মতো বয়স। ঘা দিতে হবে। কী সেই ঘা? রাজধানী এক্সপ্রেস উড়িয়ে দিতে হবে। দিল্লি-হাওড়া…। সকলে চমকে গেল? এত বড় কাজ! এটা আদৌ সম্ভব? কীভাবে? অবশ্যই সম্ভব, বলল টুন্ডা। সবার আগে দরকার নতুন রিক্রুটমেন্ট। আর ফান্ডিং। সকলে মন দিয়ে শোনো। কার কী দায়িত্ব এখনই বলে দিচ্ছি। টুন্ডা বলতে শুরু করল রাজধানী এক্সপ্রেস বিস্ফোরণের ব্লু প্রিন্ট!
আর সকলের অলক্ষ্যে ওই ঘরে উপস্থিত থাকা একজন জেহাদি তার পকেটে থাকা গোপন ছোট টেপ রেকর্ডারটিতে সব কথা রেকর্ড করতে লাগল! কে সে? এই দলে থেকে গোপন প্ল্যান কেন রেকর্ড করছে? তার নাম জুলফিকার…ভারতের গুপ্তচর সংস্থা আইবির আন্ডারকভার এক এজেন্ট….।
মুম্বইয়ের মাজেগাঁও ডকে নতুন এক কর্মী এসেছে। দীপক। লোকটি দেখতে সুন্দর। সবথেকে বড় কথা সর্বদাই হাসছে। বয়স বেশি নয়। যুবক বলাই ভালো। আর এরকম অদ্ভুত ভালোমানুষি দেখা যায় না। দীপক নিজে থেকেই সকলের কাজ করে দেয়। কেউ যদি বলে ধুস, আজ আর ভালো লাগছে না.. সকাল থেকে জ্বর… তার মধ্যেই ডিউটি…পারছি না। সেকথা কানে গেলে দীপক এগিয়ে আসবে। আর সুপারভাইজারের অলক্ষ্যে সেই শ্রমিক ভাইয়ের হয়ে সে কাজ করে দেবে। নিজের ডিউটির পাশাপাশি অন্যদের জন্য এরকম জান কবুল মানুষকে তাই ভালো না বেসে পারা যায় না। সবেমাত্র এক দুমাস হয়েছে লোকটি এসেছে। এবং এখনও পর্যন্ত একদিনও কামাই করেনি। রোজ আসে সময় মতো। রোজ যায় সমস্ত কাজ হয়ে যাওয়ার পর। সকলের সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলে কুশল সংবাদ নেয়। এই মাজেগাঁও ডকস লিমিটেডের এক সিনিয়র কর্মীকে সবাই সমীহ করে। তার নাম সেলিম আনসারি। ডক্টর জালিস আনসারির সম্পর্কিত ভাই। আবার অন্যদিকে সেলিমের এক বোনের সঙ্গেই বিয়ে হয়েছে জালিস আনসারির। সেলিম জালিস আনসারির সবথেকে প্রিয় এক সাথী। আবদুল করিম টুন্ডার সাপ্তাহিক ভাষণে এই সেলিমের সঙ্গেই যাতায়াত করেছে জালিস। আর তারপর থেকে তার প্রতিটি প্ল্যানের নিখুঁত প্রয়োগের জন্য সঠিক লোক বেছে দেওয়ার দায়িত্বে থাকে এই সেলিম। মাজেগাঁও ডকসে অবশ্য সেলিম সকলের সঙ্গে মেশে না। তার বৃত্তটি অত্যন্ত ছোট। কেউ যেচে এসে কথা বললেও সেলিম সচরাচর এড়িয়ে যায়। কারণ সেলিমের একটি গুণ হল বিশেষ করে মুসলিম শ্রমিকের কাছে সে হল মুশকিল আসান ভাই। বাড়িতে কেউ অসুস্থ, ডাক্তার দেখাতে টাকা লাগবে। সেলিম ভাই আছে। মেয়ের বিয়ে..সাহায্য চাই। সেলিম ভাই আছে। ডকের কাছেই থাকার জায়গা চাই। সেলিম ভাই ব্যবস্থা করে দেবে। তাই সেলিম ভাই এক জনপ্রিয় নাম। এই জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে কারণ সেলিম ভাইয়ের এক দাদা আছে। ডাক্তার। তিনি তো সকলের কাছে শ্রদ্ধার পাত্র। কারণ রবিবার সারাদিন তিনি রোগী দেখেন বিনা পয়সায়। সপ্তাহের অন্যদিন কিছু টাকা দিতে হয়। কিন্তু সেও সামান্য। জালিস আনসারি সেই ডাক্তারের নাম। সব মিলিয়ে সেলিম আর জালিস দুজনকে মদনপুরা, মোমিনপুরা, মাজেগাঁও এলাকার মানুষ প্রচণ্ড বিশ্বাস করে।
সেলিমের কানে খবর এল নতুন একটি কর্মীর নাম। দীপক। সে নাকি হঠাৎ করে খুব বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছে সকলের কাছে। সকলেই তাকে ভালোবাসে। দেখতে হচ্ছে তো ব্যাপারটা! এরকম তো হয়নি! তাও আবার হিন্দু এক নতুন লেবার মুসলিম শ্রমিকদের মধ্যেও পপুলার! সেলিম চিন্তিত। তাকে বলা হল কর্মীটি হিন্দু হলেও মুসলিমদের উপর যে নানারকম অত্যাচার আর বঞ্চনা হয়, সে ব্যাপারে খুবই সহানুভূতি জানায়। আর সকলের আপদে বিপদেই দৌড়ে যায়। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রবল ভিড় ডক ক্যান্টিনে। খাবার পচা। দুপুরে সকলে বাড়ির খাবার খায় না। অনেকেই বাড়ি থেকে সবজি বা রুটি নিয়ে আসে। বাকিটা ক্যান্টিন থেকে ডাল বা অন্য কিছু নিয়ে নেয়। সেই ডাল থেকে পচা গন্ধ বেরোচ্ছে। এই ডাল খাওয়া যায়? গোটা ডালের গামলা উলটে ফেলে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে থইথই করছে ডাল। মুস্তাক ভাই ক্যান্টিনের মালিক। সে বলছে, আমি কি ইচ্ছে করে ডাল নষ্ট করেছি? কেন ডাল পচে গিয়েছে তা কীভাবে জানব? সেসব কথা শুনতে রাজি না বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের দল। তারা প্রায় মারতে উদ্যত। ঠিক সেই সময় একটি শ্রমিক হঠাৎ পিছন থেকে বলল ভাইসব, এই দ্যাখো। সবাই ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল একটা মরা ছুঁচো তার হাতে ধরা। আর সেটা থেকে প্রবল দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। মুস্তাক ভাইয়ের কোনো দোষ নেই। জলের কন্টেনারে এই মরা ইঁদুর ছিল। সেই জল মেশানো হয়েছে ডালে। তাই এই অবস্থা। পরিস্থিতি শান্ত হল। মুস্তাক ভাই অভিভূত। সে তো সেই সকালে সমস্ত এঁটো কন্টেনার বারান্দার পিছনে ডাঁই করে রেখেছে। তার তো মনে পড়েনি একবারও চেক করতে। এই লোকটা তাকে তো বিরাট বাঁচা বাঁচিয়ে দিল! সবার আগে সে দৌড়ে এল লোকটির কাছে। হাত দুটো জড়িয়ে বলল আল্লার কাছে দোয়া করি তোমার জন্য ভাইয়া। তুমি বাঁচালে আমার ইজ্জৎ। লজ্জা পেয়ে দীপক বলল, একটু সাবধানে রেখো এরপর জিনিসপত্র। এই কাণ্ডটি প্রচার পেল যথেষ্ট। কিন্তু গোটা ব্যাপারটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে লক্ষ করেছে একজন। সেলিম আনসারি। এবং এক মুহূর্তে তার মনোভাব পালটে গেল এই লোকটির প্রতি। মুস্তাক ভাইয়ের মতো একজন মুসলমানকে যেভাবে আজ রক্ষা করেছে দীপক তাতে অবশ্যই গোটা কমিউনিটির কাছে সে হিরো। এই লোকের সঙ্গে কথা বলে ধন্যবাদ জানাতে হবে। তাই পরদিনই ডিউটির পর সেলিম চলে এল অন্য ইউনিটে। যেখানে দীপক কাজ করে। এবং বেরনোর সময় নিজেই এগিয়ে গিয়ে কথা বলল। দীপক বিস্মিত। সে বলল, ও আচ্ছা..আপনিই সেলিমভাই। অনেক কথা শুনেছি আপনার নামে। সকলে আপনাকে কত ভালোবাসে। আমার কথা বলার খুব ইচ্ছে ছিল। মুখে সরল হাসি… কী সুন্দরভাবে বলছে দীপক। চকিতে সে মন জয় করে নিয়েছে সেলিমের। আর তারপর থেকে দেখা গেল সেলিম আর দীপক একসঙ্গে ক্যান্টিনে লাঞ্চ খায়। কোথায় থাকে দীপক? সেলিম জানতে চায়। দীপক হেসে বলে, তার এক মাসি আছে ভাহিন্দরে। সেখানে। এত দূর থেকে? কেন? এখানে একটা ব্যবস্থা করে দিচ্ছি..সেলিম কাঁধে হাত রাখল। দীপক আরও বেশি হাসছে। না না ভাইয়া…আমার মাসি আমাকে পেয়ে খুব খুশি। আমার ওখানেই ঠিক আছে। তাছাড়া আমার ওখানে একটা বস্তি আছে। ওদের আমি ছুটির দিন পড়াই, একটু ছবি আঁকা শেখাই। সব মুসলিম তো। তেমন লেখাপড়াও নেই। তাই একটু হেল্প করি। সেলিম চমৎকৃত। এভাবে একটা হিন্দু ছেলের মতো আমাদেরই কমিউনিটির ছেলেরাও যদি ভাবত আমাদের দুর্দশার কথা..তাহলে এত খারাপ অবস্থা হয় না…ভাবছে সেলিম। আর তখন দীপক কানে কানে বলল আপনারা নিজেদের কমিউনিটির জন্য কিছু একটা করুন। চমকে উঠল। সেলিম। ছেলেটি কি মনের কথাও পড়তে পারে নাকি? ক্রমেই বোঝা গেল দীপক সেলিমকে খুবই পছন্দ করে ফেলেছে। এবং সে একটা সামান্য জামা কিনতে হলেও সেলিমকে জিজ্ঞাসা করে। অর্থাৎ দীপক শিষ্য, সেলিম গুরু। এর মধ্যে একদিন মোমিনপুরায় নিয়ে গিয়েছিল দীপককে। ঠিক হয়েছে সেখানে একটা সাপ্তাহিক স্কুলে দীপক ইংরাজি শেখাবে লোকাল বাচ্চাদের। আর এসবের আড়ালে সেলিম কিন্তু একবারও বুঝতে দেয়নি তার আসল পরিচয়। এই যে একের পর এক মুম্বইয়ের লোকাল ট্রেন আর স্টেশনগুলিতে বিস্ফোরণ হচ্ছে তার পিছনে প্রধান মাস্টারমাইন্ড সেলিমের দাদা জালিস। আর রিক্রুটার কে? সেলিম! ঠিক একমাস পর সেলিমকে একদিন ক্যান্টিনে দীপক বলল, ভাইয়া..একটা কথা আছে…আজ ছুটির পর তোমাকে বলব… এখন না। ছুটির পর দুজনেই বেরিয়ে এল। আজ সেলিম তার সঙ্গীদের বলেছে কাউকে আসতে হবে না সঙ্গে। আজ তার অন্য কাজ আছে। আন্ধেরি ওয়েস্ট স্টেশনের বাইরের এক জায়গায় চা খাওয়ার পর দীপক বলল, ভাইয়া আমি মুসলিম হতে চাই…! আমি বুঝেছি মুসলিম ধর্ম আমাকে টানছে। তুমি আমাকে একটা কিছু ব্যবস্থা করে দাও..। সেলিম চমকে গেল। এরকম একটা কথা যে দীপক বলতে পারে তা ভাবা যায়নি। যদিও বিগত একমাসে টের পাওয়া যাচ্ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের সমস্যা নিয়ে একটা কোনো এনজিও খোলা যায় কিনা কিংবা কীভাবে তাদের আর একটু শিক্ষা বা টাকাপয়সা দিয়ে উন্নতি করা যায় সেসব নিয়ে খুবই চিন্তিত দীপক। তাই বলে একেবারে মুসলিম হতে চাওয়া? এর থেকে আনন্দের আর কী হতে পারে? অতএব সেলিম সানন্দে সেদিনই রাতে ডক্টর জালিস আনসারিকে একথা জানাল। জালিস আনসারিও খুশি। এটা তো ভালো কথা। একটা দিন ফিক্সড করা হোক। সেদিনই ধর্মান্তর হবে দীপকের। সব ব্যবস্থা হয়ে গেল। সকলে একটা ব্যাপারেই চিন্তিত ছিল। এত বড় বয়সে সুন্নৎ হলে সেটি খুবই কষ্টদায়ক হবে নিশ্চয়ই। দীপক কি পারবে সেটা সহ্য করতে? দেখা গেল সে নিজেই আগ্রহী। কারণ প্রকৃত মুসলিম হয়ে উঠতে চায় সে। অতএব সব প্রক্রিয়াই সুষ্ঠুভাবে হয়ে গেল। দীপক হয়ে উঠল সেলিম আনসারি, জালিস আনসারির কাছের লোক। কিন্তু নাম পালটাতে হবে তো? সেটাই তো নিয়ম। দীপকের নতুন নামকরণ হল। জুলফিকার। রাজস্থানের গঙ্গানগরের যুবক রবীন্দর দারুণ নাটক করে। গ্রামেগঞ্জে, কোনো অনুষ্ঠানে, মেলায় রবীন্দর ঘুরে বেড়ায় নাটকের দলের সঙ্গে। তার সবথেকে বড় যে শক্তি, সেটি হল দুর্দান্ত ভাষাজ্ঞান। অন্য যে কোনো ভাষা কয়েকদিন শুনলেই সে ওই উচ্চারণটি হুবহু তুলে নেয়। পুষ্কর মেলায় দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। রবীন্দর সেজেছে দারা শিকোহ। অতএব সরকারের সংস্কৃতি দপ্তরের এক কর্মী ঠিক করল এই টিমকেই পাঠানো হবে ইন্টারস্টেট ড্রামা ফেস্টিভ্যালে। হবে লখনউতে। ১৯৭৩ সাল। লখনউ এর সেই ড্রামা ফেস্টিভ্যালে রাজস্থানের গ্রুপের দারা শিকোহকে দেখার পর করতালিতে ফেটে যাচ্ছে রাণাপ্রতাপ ময়দান। আর সকলের আড়ালে একটি সিগারেট ধরিয়ে অপেক্ষা করছিলেন এক ব্যক্তি। মাথায় টুপি। ভিড় কমে গেল। ওই নাটকের দলের কলাকুশলীরা দ্রুত জামাকাপড় গোছাচ্ছেন। আগামীকাল ভোরের ট্রেনেই ব্যাক করতে হবে। তাই গ্রিনরুম থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে হোটেলে ফিরে গোছানো বাকি। সকলেই ব্যস্ত। ঠিক দারা শিকোহের রাস্তা আটকে দাঁড়ালেন সেই মাথায় টুপি পরা লোকটি। রাজস্থানের এক রাজনৈতিক নেতা এই দারা শিকোহের খবর দিয়েছে। যার নাম রবীন্দর কৌশিক। সরাসরি তাকে বলা হল একটা চাকরি করবে? রবীন্দর বিস্মিত। এরকম নিশুত রাতে তাকে চাকরির অফার দিচ্ছে কে? লোকটি রহস্যময় হেসে বলল, তোমার বাবা রিটায়ার্ড তো! টেক্সটাইলস মিলের কর্মী ছিলেন না? রবীন্দর আরও চমকে গেল! কে এই লোক? সবই জানে তার সম্পর্কে! ভেবে দ্যাখো…এই নাটক করে সংসার কি চলবে? তার থেকে ফিক্সড সরকারি চাকরি করো। তিনদিন পর জয়পুরে চলে আসবে এই ঠিকানায় বলে একটা চিরকুট হাতে গুঁজে দিয়ে চলে গেল সেই লোক। হতভম্ব হয়েই বাড়ি ফিরল। বাবাকে সবটা বলার পর বাবা জানালেন একবার দেখা করা উচিত। সরকারি চাকরি তো বলে বলে পাওয়া সম্ভব নয়। তিনদিন পর রবীন্দর জয়পুরে। এবং জানা গেল চাকরিটা করার আগে ২ বছরের একটা ট্রেনিং হবে। তারপর তাকে যেতে হবে পাকিস্তানে। পাকিস্তানে যাওয়ার জন্য তাকেই বেছে নেওয়া হল কেন? কারণ সে অনায়াসে উর্দু ভাষাটা শিখে নিতে পারবে। যেভাবে নাটকে সে উর্দু বলেছে, তা চমকপ্রদ। সুতরাং সেই এই কাজে আদর্শ। চাকরির শর্ত হল পাকিস্তান থেকে ভারতে আবার বাড়ি ফেরা যাবে তা নিশ্চিত নয়৷ চাকরিটা কী? চাকরিটা হল ভারতীয় গুপ্তচর সংস্থা RAW এর এজেন্ট হতে হবে। এবং রবীন্দরকে পাকিস্তানে যাওয়ার আগে হতে হবে মুসলিম। করতে হবে সুন্নৎ। রবীন্দর কৌশিক। জীবনে বোর হতে শেখেনি। একটাই জীবন। একটু অ্যাডভেঞ্চার করে নিতে আপত্তি কী? আমি সত্যি কতটা পারি? নিজের সহজ জীবনযাপনের বৃত্তের বাইরে গিয়ে আগুনের মধ্যে বাস করার মতো আত্মপরীক্ষার সুযোগ তো আসবে না বেশি! তাই চান্সটা হারাল না রবীন্দর কৌশিক। ২ বছরের ট্রেনিং। একজন দুর্ধর্ষ RAW এজেন্ট হতে হলে সম্পূর্ণ পাকিস্তানী হয়ে যেতে হবে। ইতিহাস, ভূগোল, কালচার এবং মুখের লক্জ। সবই অবিকল হতে হবে পাকিস্তানের ঘরের ছেলের মতো। রবীন্দর কৌশিক এক মহা বিস্ময়ের নাম। সে ১৯৭৯ সালের এক মধ্যরাতে পেরিয়ে গেল বর্ডার। এবং করাচিতে গিয়ে তার শুরু হল এক একক লড়াই। প্রতিবেশীরা সকলে জানতে পারছে মুলতান থেকে এসেছে একটি নতুন যুবক। নাম নাবি আহমেদ শাকির। পড়াশোনা করবে। প্রথম ভর্তি হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আইন পড়ার জন্য। তার জন্য তো বি এ পাশ করা দরকার! সে ব্যবস্থাও আগে থেকেই তৈরি ছিল। ভারতের দূতাবাস থেকে জাল মার্কশিট কিনে নেওয়া আছে নাবি আহমেদ শাকিরের নামে। করাচিতে এক চাচাতো ভাই এল একদিন নাবির সঙ্গে দেখা করতে। সে দিয়ে গেল একটা ট্রাংক। সকলেই জানছে, মুলতান থেকে আসা এক আত্মীয়। আসলে কিন্তু তা নয়। ওই চাচাতো ভাই আগে থেকেই করাচিতে গোপনে থাকা আর এক ভারতীয় স্পাই। পাকিস্তানে পয়সা দিলে. পাওয়া যায় জাল মার্কশিট। সেই জাল মার্কশিট নিয়ে রবীন্দর ওরফে নাবি ভর্তি হয়ে গেল আইন বিশ্ববিদ্যালয়ে। দু বছর ধরে পড়াশোনা। আসল লক্ষ্য কিন্তু অন্য। পাকিস্তান আর্মিতে ঢোকা! হ্যাঁ। এই অসম্ভব আর ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিই ছিল রবীন্দরের প্রধান মিশন। যেভাবেই হোক পাকিস্তানের আর্মির মধ্যে এক ভারতীয় স্পাই ঢুকিয়ে দিতে হবে এটা ছিল ইন্দিরা গান্ধীর ব্রেইনচাইল্ড। সুতরাং সেই প্ল্যান সামনে রেখে আর্মির পরীক্ষায় বসা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন পাশ করা এমএএলএলবি-দের বেশি সুযোগ। লিগ্যাল সেলে ঢোকার। যত গোপন কাগজপত্র আর নথি তো থাকবে আর্মির লিগ্যাল সেলেই। অসামান্য পারফরম্যান্স রবীন্দরের। সে পাশ করে গেল। এবং পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের পর সেই প্রথম সবথেকে বড় গোপন যুদ্ধে পরাজিত। তাদের সেনাবাহিনীর মধ্যে ঢুকে গিয়েছে এক ভারতীয় স্পাই। রবীন্দর ওরফে নাবি নিজেকে এতটাই পাকিস্তানী করে তুলতে বদ্ধপরিকর, যে এর পরের ধাপ বিয়ে। যাকে তাকে নয়। এক প্রাক্তন এয়ারফোর্স অফিসারের মেয়ে আমানতকে বিয়ে করে ফেলল। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত লাগাতার নাবি আহমেদ ওরফে রবীন্দর ভারত সরকারের কাছে সাপ্লাই করে গিয়েছে একের পর এক গোপন তথ্য। ১৯৮৩ সালে ঘটল সবথেকে বড় বজ্রপাত। আগে থেকেই রবীন্দর খবর পাঠিয়েছিল যে একটা প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ নথি তার হাতে এসেছে। সেটি সে হাতে করে যাচ্ছে অমৃতসর বর্ডারের কাছে। কাউকে একটা পাঠাতে হবে। ভারতের গুপ্তচর সংস্থা RAW তাদের এক নতুন এজেন্টকে এই কাজে নিয়োগ করেছিল। যুবক। এর আগে ছোটখাটো কাজ করেছে। কিন্তু অমৃতসর বর্ডার পেরিয়ে একেবারে লাহোরের কাছে জাল্লো পার্কে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। পরনে থাকতে হবে হলুদ জামা। ছেলেটির নাম মাশিত। হাতে লাহোর টাইমস। অন্যদিক থেকে আসছে রবীন্দর। বাসে। কিন্তু দুদিক থেকে দুজনে আসছে। দুটি বাসে। এবং মাশিত চরম একটি ভুল করেছিল। হাতে ছিল ব্যাগ। যেটিতে লেখা জলন্ধরের নাম। ব্যস! ধরা পড়ে গেল সে। এবং ফাঁস করে দিয়েছিল রবীন্দর কৌশিকের নাম। লাহোরের দিক থেকে আসা বাস থেকে নামানো হয়েছিল রবীন্দরকে। এবং গ্রেপ্তার করা হয়। ১৮ বছর পাকিস্তানের এক জেল থেকে অন্য জেলে ঘোরানো হয়েছে রবীন্দরকে। সঙ্গে অত্যাচার। ২০০১ সালে মুলতান জেলে রবীন্দর কৌশিক একাকী এক নির্জন সেলে মারা গেল। যক্ষ্মা।
এই কাহিনিটি নতুন নয়। কমবেশি সকলেরই জানা। চর্চিতও বটে। তাই গোটা অপারেশনের বিস্তারিত পুনরায় বিবরণ নিষ্প্রয়োজন। বিশেষ করে সলমন খানের ‘এক থা টাইগার’ সিনেমার আসল টাইগার যে এই রবীন্দর, সেকথাও সর্বজনবিদিত। রবীন্দর কৌশিকের সেই অপারেশনের নামও ছিল ‘অপারেশন ব্ল্যাক টাইগার’। এই ডক্টর জালিস আনসারির কাহিনির মধ্যেই একটি উপকাহিনি হিসাবে ঢুকে পড়ল কেন? কারণ ভারতীয় গুপ্তচর বাহিনীর স্পাই ও গোয়েন্দাদের অসাধ্যসাধনের, জীবনকে বাজি রেখে আগুনে ঝাঁপ দেওয়ার কাহিনিগুলোর মধ্যে এটি একটি সর্বোৎকৃষ্ট রেফারেন্স। প্রতিপক্ষের গোপন খবর পাওয়ার জন্য চর ঢুকিয়ে দেওয়ার প্রচলন নতুন নয়। এতকাল ছিল শত্রুপক্ষ বলতে শত্রুরাষ্ট্র। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু হল আর এক ট্রেন্ড। সন্ত্রাস। সুতরাং নতুন শত্রুপক্ষ হয়ে উঠল একের পর এক জঙ্গি গোষ্ঠী আর তাদের স্লিপার সেল। কীভাবে পাওয়া যাবে তাদের গোপনীয় প্ল্যানের সন্ধান? সেই কারণে তখন থেকে শুরু হয়েছিল অন্য রাষ্ট্রের উপর গোপন নজরদারির পাশাপাশি দিকে দিকে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসবাহিনীর মধ্যেও ঢুকিয়ে দেওয়া সরকারি স্পাই। অথবা স্পাইবাহিনীর গোপন ইনফর্মার। কিন্তু অপারেশনে নিছক ইনফর্মার ঢুকিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়া যায় না। কারণ একটাই। যে কোনো সময় ইনফর্মার হয়ে যায় ডাবল এজেন্ট। আবদুল করিম টুন্ডার ওপর নজরদারি ছিলই। সে যে মুম্বইয়ের মদনপুরা এলাকার সমাবেশে ঘৃণা ছড়াচ্ছে এবং উত্তেজক ভাষণ দিচ্ছে, সেসব রিপোর্ট জমা পড়ছিল মুম্বইয়ের ক্র্যাফোর্ড মার্কেটের উলটোদিকে মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ অফিসে। অতএব প্রথম কাজ ছিল কারা আসছে টুন্ডার কাছে জানা। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই জানা হয়ে গিয়েছিল সবথেকে বেশি কাদের আনাগোনা। এবং মোমিনপুরের শনিবারের বৈঠকের খবরও জানা ছিল। কিন্তু সবথেকে বড় সমস্যা হল কীভাবে জানা সম্ভব যে আদতে ওইসব বৈঠকে কী হচ্ছে ওই ছোট্ট ঘরটির মধ্যে? আর ডক্টর জালিস আনসারি এলাকায় প্রবল জনপ্রিয়। নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব নয় তাকে আগাম গ্রেপ্তার করা। কিন্তু সেসব তো পরে। আগে জানা দরকার এদের আসল প্ল্যান কী? এবং সেখানেই ছিল চরম এক নাটকীয়তা। কারণ যেহেতু একের পর এক বিস্ফোরণ হয়ে চলেছে স্টেশন ও লোকাল ট্রেনে, তাই স্বাভাবিকভাবেই রেলমন্ত্রক সবথেকে বেশি উদ্বিগ্ন। তারাই জানাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে উদ্বেগের কথা। এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক দায়িত্ব দিল ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ ও সিবিআই দু পক্ষকেই। একদল স্পাইং করে। অন্য গোয়েন্দারা তদন্ত করে। আর ওই দুই বাহিনীর যৌথ প্ল্যান— চর ঢুকিয়ে দেওয়া হোক জালিস আনসারির গ্রুপে। কে সেই চর? দীপক। না না…ভুল বলা হল..এখন তো আর সে দীপক নয়! জুলফিকার….! ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চের এক তুখড় আন্ডারকভার স্পাই। যাঁর উপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল যেভাবেই হোক ঢুকে পড়তে হবে জালিস আনসারির গ্রুপে। প্রমাণ বের করতে হবে এই গ্রুপই আছে তাও মুম্বই বিস্ফোরণের পিছনে। জেনে নিতে হবে পরবর্তী অপারেশন কী! অতএব দীপক সম্পূর্ণ আস্থা অর্জন করে নিয়ে ঢুকে পড়লেন নিঃশব্দে জালিসের গ্রুপে। দীপক ধর্মান্তর করে মুসলিম হয়ে গেলেন। ওহ! সরি! দীপক না। জুলফিকার…।
প্রথম টার্গেট তাহলে নিউ দিল্লি হাওড়া রাজধানী এক্সপ্রেস? কিন্তু কবে? সেটাই তো সবথেকে দামি প্রশ্ন। কারণ সময়টা জানা না থাকলে তা কোনো ইন্টেলিজেন্স রিপোর্টের অর্থই হয় না। অতএব শনিবারের সেই মিটিং থেকে বেরিয়ে জুলফিকারের প্রথম কাজই হল সিদ্ধান্ত নেওয়া এরপর কী? মিটিং-এ সেলিম আছে। সকলে চলে গেল। একসঙ্গে ফিরবে সেলিম আর জালিস আনসারি। দাঁড়িয়ে আছে জুলফিকার। রওনা হওয়ার আগে তার দিকে চোখ পড়ল সেলিমের। কিছু বলার আছে? জানতে চাইছে, সেলিম ভাইয়া আমাদের ডিউটি কী? আমাকে কোথায় রাখতে হবে বোমা? আমি কাজ করতে চাই। সেলিম কিছু বলার আগে জালিস আনসারি এগিয়ে এসে বলল, আমরা ঠিক টাইমেই জানিয়ে দেব। এত অস্থির হতে হবে না। আর তোমাকে তো কাজে লাগানো হবেই।
জুলফিকার আর কিছু না বলে হাসল। সে কিন্তু জানতেও পারল না আদতে তাকে কোনো কাজের ভার দেওয়া হবে না। কারণ জালিসের মাথায় আছে অন্য প্ল্যান। তার গ্রুপের কেউই ওই কাজে যুক্ত হবে না। রিক্রুট করতে হবে অন্য লোক। লখনউ-এর ছেলে বোমা রেখে আসবে দিল্লিতে। জয়পুরের ছেলে বোমা রাখতে যাবে জম্মু। সেইমতো কাউকে কিছু না জানিয়ে পরদিন ভোরে বেরিয়ে পড়ল জালিস। আসলে তার লক্ষ্য আরও বেশি। ভারতের সর্বত্র একসঙ্গেই রাজধানী এক্সপ্রেসগুলিতে বিস্ফোরণ ঘটাতে হবে। যাত্রা শুরু হল। প্রথমে কানপুর, তারপর রায়বেরেলি, হায়দরাবাদ আর নাগপুর। এই সফরে সে কাদের সঙ্গ পেল?
একঝাঁক প্রথম সারির বুদ্ধিজীবীকেও। জামাল আলভি অর্থনীতির মাস্টার্স ডিগ্রি করা শিক্ষক, রায়বেরিলি থেকে হাবিব আহমেদ। দিল্লি থেকে কাইরি কাশ্মীরি। কিন্তু টাকা কোথায় পাওয়া যাবে? এদের থেকে বেশি টাকা পাওয়া সম্ভব নয়। টুন্ডার নেটওয়ার্কের এক সোর্স ছিল। তার নাম মির্জা দিলশাদ বেগ। থাকে কাঠমান্ডুতে। কপিলাবস্তু কেন্দ্র থেকে তিনবারের নির্বাচিত এমএলএ। রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির। তার কাছে অগাধ টাকা। আর ভারতে কোনো অপারেশন করতে হলে তাকে সাহায্য করার জন্য আছে দুবাইয়ের একটি লোক। মির্জার মেন্টর। লোকটির নাম দাউদ ইব্রাহিম। জালিস আনসারি ঠিক করল এরপর তাহলে যেতে হবে তাকে কাঠমান্ডু। এবং সব পরিকল্পনা যখন চলছে ঠিক তখনই আচমকা একটি দুপুরে জালিস আনসারি আর সেলিম আনসারি এবং আবদুল করিম টুন্ডারা সকলে কেঁপে উঠল। কারণ গোটা বম্বে শহরে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণ। এবং অন্তত ৩০০ লোক মৃত। চমকে উঠেছিল জালিস। সে থাকতে এতবড় একটা ঘটনা অন্য কেউ ঘটাল? কয়েকদিনের মধ্যেই জানাজানি হয়ে গেল কে করেছে? দাউদ। কাকে দিয়ে করিয়েছে? মেমন পরিবারকে দিয়ে। মাহিমের মেমন ভাইয়েরা এতবড় কাজ করে ফেলল? আর আমি পারলাম না কিছুই? জালিস ছটফট করছে। এবং চেপে বসল রকসৌলের ট্রেনে। এবং রকসৌল থেকে বেরিয়েই কাঠমান্ডু। কিন্তু জালিসের কপাল খারাপ। বম্বের বিস্ফোরণের পরই গোটা অপরাধ সাম্রাজ্য তছনছ হতে শুরু করেছে। দাউদ দুবাই ছেড়ে চিরতরে চলে গেল করাচি। বম্বের ড্রাগ মাফিয়াদের সম্রাট ইকবাল মির্চি পালিয়ে গেল লন্ডন। আর কাঠমান্ডুতে মির্জার কোনো ক্ষমতাই রইল না আর। তাই খালি হাতেই ফিরল জালিস। কিন্তু তাই বলে কী হাল ছেড়ে দিতে হবে? একদমই না। নিজেই ঠিক করল যতটা ক্ষমতা সেই দিয়েই আঘাত হানতে হবে। অতএব বিভিন্ন শহর ঘুরে তৈরি করা সেইসব যুবককে নিয়ে তৈরি হল এক নয়া বাহিনী যার নাম দেওয়া হয়েছে ক্রাশ ইন্ডিয়া ফোর্স!
এদিকে জুলফিকার অস্থির হয়ে যাচ্ছে। কোথায় গেল জালিস আনসারি? অলক্ষ্যে কী ঘটে যাচ্ছে? কোনোরকম ভাবে ঠেকাতে তো হবেই। কিন্তু আগে তো জানতে হবে? সেলিমকে একবার জিজ্ঞাসা করার পরও কোনো উত্তর পায়নি। বেশি জানতে চাওয়া বোকামি। সন্দেহ হবে। এদিকে কেউই জানে না যে আসলে জালিস ফিরবেও না। কারণ ইতিমধ্যেই সে ঠিক করেছে গোটা অপারেশন লখনউ থেকে প্ল্যান আর এক্সিকিউট করা হবে। হাওড়া রাজধানীতে বোমা রাখবে মকসুদ। হায়দরাবাদে রাখবে সামসুদ্দিন। দিল্লিতে যাবে জয়পুর থেকে রুখবানুর। সকলকে বলা হয়েছে টাইম।
৬ ডিসেম্বর ১৯৯৩। প্রথম বোমাটি ফাটবে দিল্লি হাওড়া রাজধানী এক্সপ্রেসে। সেরকমই প্ল্যান। কিন্তু একী? ওই ট্রেনে বোমা ফেটে গেল ৫ ডিসেম্বর রাত ১১ টায়। যাত্রীরা সবাই ঘুমোচ্ছে। এটা কী হল? কিছুই হল না। শুধু আতঙ্ক ছড়াল একটু। কারণ কোনো বড় মাপের বিস্ফোরকই ছিল না। পরদিন মরিয়া হয়ে আবার টার্গেট করা হল। এবার হাওড়া থেকে দিল্লি যাওয়ার রাজধানী। এটা ফেটে গেল ভোর ৫ টায়। টয়লেটে। এবং এবারও কোনো হতাহত নেই। তৃতীয় বোমা বিস্ফোরণ হল বম্বে দিল্লি রাজধানীতে। চতুর্থ বোমা বিস্ফোরণ সুরাত থেকে দিল্লি ফ্লাইং কুইন এক্সপ্রেসে। পঞ্চম বোমা ফাটল এপি এক্সপ্রেসে। হায়দরাবাদ থেকে নিজামউদ্দিনগামী রুটে। আর এটাই সবথেকে মারাত্মক। বহু যাত্রী আহত। দুজন মৃত। কিন্তু যতটা সাড়া ফেলার কথা ততটা ক্ষতি করা গেল না। অতএব জালিস আনসারি সম্পূর্ণ হতাশ। এবং তার থেকেও হতাশ আর একজন। জুলফিকার। কারণ তিনি জালিসের গ্রুপে আছেন। অথচ জানতেই পারছেন না কবে কোথায় অপারেশন। তাহলে ওপরতলায় কী জবাব দেবেন? জালিস এতটাই হতাশ যে শনিবারের মিটিং বন্ধ হয়ে গেল। এইসব বিস্ফোরণের সঙ্গে জালিসই যুক্ত। সেটা জানা। কিন্তু প্রমাণ কই? একমাত্র একটা টেপরেকর্ডারের কথাবার্তা। ওটা তো প্রমাণ করে না যে সে করেছে। তাহলে কি জালিস আর কোনো অপারেশন করবে না? ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল এই গ্রুপ? ভাবছিল জুলফিকার ওরফে দীপক। তবু তাকে তার দিল্লির বসেরা বলল থেকে যেতে হবে গ্রুপে। কারণ এখনও সন্দেহ আছে। কোনো একটা মিশন হবেই। আর এত কাছে এসে জালিসকে ছেড়ে দেওয়া যাবে না। অতএব থেকে গেল জুলফিকার। এবং সত্যিই সুযোগ এসে গেল। এক মাস উধাও থাকার পর একদিন আবার শহরে হাজির আবদুল করিম টুন্ডা। এবং এসেই মিটিং ডাকা হল। শনিবার। সন্ধ্যায়। মোমিনপুরার সেই কংক্রিটের ভাড়া করা বাড়ি। এবার জমায়েতে লোক একটু কম। কিছু ছেলে ছিটকে গিয়েছে। আবদুল করিম টুন্ডা সকলকে দেখে নিয়ে বলল, ডক্টরসাব খুব ভেঙে পড়েছে। এই খেলায় করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে। তাই হাল ছেড়ে দেওয়া বেওকুফি…না মর্দওয়ালি বাত… আমরা এবার সেরা কাজটা করব। ভারতে আজ পর্যন্ত কেউ করতে পারেনি। আগামীদিনে কেউ পারবেও না। আমরাই প্রথম আমরাই লাস্ট..। সকলে ব্যগ্র। কী এমন অপারেশন? টুন্ডা একটু থেমে গেল। সকলের মুখের দিকে দেখে নিল। জালিস ভাই উদাসীন। একদৃষ্টিতে সামনে তাকালো। কারণ সে জানে প্ল্যানের কথা। তাই এখন থেকেই মনোনিবেশ করছে যেন। যাতে আগের ভুল না হয়। টুন্ডার কণ্ঠ শোনা গেল, ২৬ জানুয়ারি..দিল্লি… প্যারেডে..। এবার আমি আর জালিস বোমা বানাব। আর কেউ না। বোমা প্ল্যান্ট করতে যাবে জুলফিকার আর সেলিম। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না জুলফিকার। তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এটা বড় কথা নয়। বম্বের একটি ঘিঞ্জি এলাকা মোমিনপুরায় প্ল্যান হচ্ছে ১৯৯৪ সালের ২৬ জানুয়ারি রিপাবলিক ডের প্যারেডে ব্লাস্ট হবে! চোয়াল শক্ত হয়ে গেল জুলফিকারের। অবশেষে। এবার আর কোনো ভুল হবে না। সময় জায়গা আর মিশন জানা হয়ে গেছে। পকেটে টেপ রেকর্ডার ঘুরছে। কাউন্টডাউন শুরু। জুলফিকার মনে মনে বলল..জালিস আনসারি তুমহারা অন্ত শুরু হো রাহা হ্যায়… তৈয়ার হো যাও…।
সকলে একে একে জড়িয়ে ধরছে জুলফিকার আর সেলিমকে। কারণ তারা এত বড় একটা কাজের দায়িত্ব পেয়েছে। মৃদু হাসি জালিস আনসারির মুখে। এই দুজনের প্রতি তার সম্পূর্ণ বিশ্বাস আছে। আর বিশেষ করে দুজনেই জালিস আনসারির একেবারে নিজের লোক। কোনোরকম পাকামি নেই কারও। এদের দিয়ে কাজ করানো সহজ। সে এগিয়ে এসে সেলিম আর জুলফিকারের কাঁধে হাত রেখে জড়িয়ে ধরে বলল, ক্রাশ ইন্ডিয়া ফোর্সের নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে। তোমাদের নাম উঠবে আমাদের এই যুদ্ধের ইতিহাসে। আমার পুরো বিশ্বাস তোমরাই পারবে। সব ব্যবস্থা আমি করে দেব। কোনো চিন্তা নেই। আর এবার এমন এক বোমা বানাব যা গোটা দুনিয়াকে তাক লাগিয়ে দেবে…। জুলফিকার হাসল। জুলফিকার হাসির জন্যই সকলের কাছে এত প্রিয়। সেলিম হাসল। তার ঠোঁটে একটি রহস্যময় হাসি। সেদিন মধ্যরাতে একটি টেলিফোন বুথে ঢুকতে দেখা গেল জুলফিকারকে। জায়গাটা ছিল চার্চ গেটের উলটোদিকের রাস্তার পিছনে। নিউ সিভিল লাইনস..।
১৫ জানুয়ারি ক্রাশ ইন্ডিয়া টিম দিল্লিতে পৌঁছে যাবে। কারণ রিপাবলিক ডে উপলক্ষ্যে যা কিছু কড়াকড়ি সেসব শুরু হয়ে যাবে ২০ জানুয়ারি থেকে। অতএব তার আগে এই টিম ঢুকে যাবে তিনটি আলাদা হোটেলে। দরিয়াগঞ্জ, ওখলা আর আজাদপুর মান্ডি। সেই কংক্রিটের ভাড়া করা ঘরে দিনরাত দরজা বন্ধ। কারণ কী? কারণ টুন্ডা আর জালিস বোমা বানাচ্ছে। সবথেকে শক্তিশালী হওয়া চাই। ৭ জানুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা। জুলফিকারকে শেষবারের জন্য দেখা গেল বম্বের বাইকুল্লা স্টেশনের দিকে হেঁটে যাচ্ছে। হাতে একটি ব্যাগ। আর সেদিন রাত দেড়টায় বিআইটি ব্লকের বিল্ডিং নম্বর ওয়ানে দেখা গেল প্রায় এক ডজন লোক ঢুকছে। দোতলার সিঁড়ি ভেঙে আস্তে আস্তে যাচ্ছে তারা। যাতে শব্দ না হয়। চারদিকে অন্ধকার, সরু গলি। শুনশান। তবে বম্বের এই জায়গাগুলো মোটেই অতটা শুনশান নয়। তাই যখনই একটি অ্যামবাসাডর আর দুটি জিপ থেকে শক্তপোক্ত এই লোকগুলো নেমে গলিতে ঢুকল তৎক্ষণাৎ খবর ছড়িয়ে গেল। রুম নম্বর ৩৬ এ টোকা দেওয়া হল। যে টিমটি মদনপুরার এই এলাকায় ঢুকল তারা হল সিবিআই-এর স্পেশাল টাস্ক ফোর্স। লিড করছেন ডিআইজি এসসি ঝা। সঙ্গে এমন এক অফিসার যার অপারেশন সিবিআই-তে মিথ হয়ে গিয়েছে। তাঁর নাম ইনস্পেক্টর ত্যাগী। ত্যাগীর দুবারের টোকায় দরজা খুলে গেল। সেটি খুলেই মুখে হাত চাপা দিয়ে পিছনে সরে গেলেন যে ভদ্রমহিলা তার চোখেমুখে ঘুম স্পষ্ট। মৃদু আর্তনাদ। নিমেষে ঢুকে এলেন ত্যাগী আর আরও দুজন অফিসার। মেঝেতে একটি সস্তার কার্পেটে শুয়ে আছে এক ব্যক্তি। শব্দ শুনেও ঘুম ভাঙেনি। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ত্যাগী হাঁটু মুড়ে বসে লোকটিকে ধাক্কা দিয়ে বলল ডক্টর সাব…। হ্যাঁ সেই লোকটি ছিল ডক্টর জালিস আনসারি..। বম্বে আনবম্বার। লাফ দিয়ে উঠল জালিস। এবং ততক্ষণে বোঝা হয়ে গিয়েছে কী হতে পারে। কারণ ত্যাগীর চোখেই পুলিশ পুলিশ ছাপ। যা জালিসের চেনা। জালিস কিন্তু কোনো বাধা দিল না। শুধু বলল লুঙ্গিটা চেঞ্জ করে নেব? ত্যাগী রাজি নয়। আমরা জামাকাপড় নিয়ে যাচ্ছি। ওখানেই চেঞ্জ করবে। বেরিয়ে এল জালিস..। এবং সে বাধা না দিলেও বাইরে বেরিয়েই হতভম্ব গোটা বাহিনী। গোটা মহল্লা ভেঙে পড়েছে সামনে। দুজন এগিয়ে এল। জালিস ভাইকা কুসুর কেয়া হ্যায়….
ত্যাগী বললেন, জনাব পহেলে তো তহকিকা ত করনা পয়েগা…উসকে বাদ হি পাতা চলেগা কুসুর …কিন্তু একটি মুখও স্বাভাবিক হল না। বরং আরও ভিড় বাড়ছে। গুঞ্জন বাড়ছে। যে কোনো সময় অ্যাটাক হতে পারে।
একটা সময় ভিড়ের মধ্যে থেকেই কেউ বলে উঠল..হাম জালিস ভাইয়াকো লে যানে নেহি দেঙ্গে৷৷৷
এবার টেনশন বাড়ছে। কারণ একটাই। এই গোটা অপারেশন সিবিআই এর। লোকাল পুলিশ থানা জানেই না। এখন তাদের খবর দিতে গেলে ইগো আর প্রোটোকলের ঝামেলা থাকবে। তবু ত্যাগী বলল, দেখিয়ে হামলোগ আনে সে পহলে র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সকো খবর কর দিয়া থা। উও লোগ আতে হি হোঙ্গে..। অর উসকে বাদ মাহোল ভি খারাব হোগা… কথাগুলি বলতে বলতে ত্যাগী জালিসকে এক হাতে ধরে এগোচ্ছেন। তাঁর টার্গেট এভাবেই বড় রাস্তায় গাড়ির কাছে যাওয়া। পিছনে জনতা। এবং পৌঁছে গেলেনও। আগে থেকেই সেগুলি স্টার্ট দেওয়া ছিল। মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ত্যাগী এক ধাক্কায় জালিসকে জিপের মধ্যে তুলে ফেললেন…. আর জনাত গর্জন করার আগেই জিপ আর গাড়ির ইঞ্জিন তীব্রভাবে গর্জন করে বেরিয়ে গেল…। জালিস আনসারি গ্রেপ্তার। অপারেশন রিপাবলিক ডে আটকে গেল। অবশেষে ধরা পড়ে গেল রহস্যময় সেই বম্বে আনবম্বার!!
এত বড় একটা সন্ত্রাসের ছক আটকে দিলেন জুলফিকার। সেই মিটিং-এর দিন মাঝরাতে পাবলিক বুথ থেকে দিল্লিতে ফোন করেছিলেন। তখনই টিম তৈরি হয়ে যায় সিবিআই আর আইবির। সেই টিমই ৭ জানুয়ারি মাঝরাতে আচমকা হানা দিল মিশন জালিস আনসারি অ্যারেস্টে। আর সেই ৭ জানুয়ারি সকালেই বাইকুল্লা স্টেশন থেকে উধাও হয়ে যায় জুলফিকার। ও না না ….জুলফিকার নয়। দীপক। এবার আসল কথাটা বলা যাক। দীপকও নয়। ওটাও ছদ্মনাম। আন্ডারকভার এজেন্টের প্রকৃত পরিচয় কখনওই জানায় না কোনো স্পাইবাহিনী। তাই তাঁর নাম যে আসলে কী কেউ জানে না। কারণ আজ হয়তো সেই যুবক অনেক পরিণত এক স্পাইতে পরিণত হয়েছেন।
এবং এই মুহূর্তে অন্য কোনো মারাত্মক অপারেশনে নেই কে বলতে পারে!! কোনো টেররিস্ট গ্রুপে হয়তো আজও তিনি এক আন্ডারকভার এজেন্ট….।
